Browsing Tag:সিকিম

the-mysterious-silk-route-part-nine-in-the-land-of-snow
sudip paul
সুদীপ পাল

পপকর্ন খেতে খেতে যাত্রা শুরু। কিছুটা যাওয়ার পর গতি মন্থর করে ভূপাল দেখাল – ওই দেখুন পুরোনো সিল্ক রুট।

অনেকগুলো ডব্লিউ-এর আকারে একটা সরু পথ নীচের দিকে নেমে গিয়েছে। দেখামাত্র একটা শিহরণ জাগল। এই সেই সিল্ক রুট! বিশ্বের প্রথম সুপার হাইওয়ে! এ যেন এক জীবন্ত ইতিহাস। এই সেই পথ যার মাধ্যমে সারা বিশ্বের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ হত এক সময়। চলত রেশম, ধাতু, অলংকার, কাপড়, সুগন্ধি দ্রব্য, মশলা, মূল্যবান পাথর প্রভৃতির ব্যবসা-বাণিজ্য। প্রায় ৬৫০০ কিমি এই পথ তিব্বতের রাজধানী লাসা হয়ে (অধুনা চিন) মধ্য এশিয়া চলে গিয়েছে।

আরও পড়ুন রহস্যময় রেশম পথ / পর্ব ৮ : জুলুকের উষ্ণ আপ্যায়ন

দ্বিতীয় খ্রিস্টপূর্বাব্দেও এই পথে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চলত। পরে ইউরোপ থেকেও মধ্য এশিয়া হয়ে বণিকরা আসত লাসায়। লাসা থেকে জেলেপ-লা দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে কুপুপ লেকের পাশ দিয়ে সোজা এই পথে জুলুক হয়ে ক্রমে সমতলে চলে আসত এবং সারা ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চালাত। যারা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে শ্রীলংকা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে চাইত তারা সিল্ক রুট দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে সোজা বঙ্গের তাম্রলিপ্ত বন্দর (অধুনা মেদিনীপুরের তমলুক) দিয়ে জাহাজে সমুদ্রযাত্রা করত।

junction of old and new silk route
পুরোনো ও নতুন রেশম পথের মিলন।

এ পথ শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ ছিল না। এই পথেই যেমন বিভিন্ন দেশের শিল্প-সংস্কৃতি ভারতে প্রবেশ করেছে তেমনই ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতি বিশ্বের দরবারে পৌঁছে গিয়েছে। এই পথেই গ্রিক শিল্পকলা ভারতে এসেছে। এই পথেই ভারত থেকে বৌদ্ধধর্ম বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতের গণিতশাস্ত্র ও বিজ্ঞান আরবে ছড়িয়ে পড়েছিল এই সিল্ক রুট ধরেই। চিনা পরিব্রাজক ফা-হি-য়েন এবং হিউ-এন সাং এ পথেই ভারতে এসেছিলেন। ভারত থেকেও এই পথে তিব্বত বা চিনে গিয়েছেন অতীশ দীপঙ্কর, শান্ত রক্ষিত, শরৎচন্দ্র দাস প্রমুখ পরিব্রাজক। এমনকি রাজা রামমোহন রায়ও  জেলেপ-লা দিয়ে তিব্বত যান।

near thambi view point
থাম্বি ভিউ পয়েন্টের কাছে।

ভারত-চিন যুদ্ধের আগে পর্যন্ত এ পথে ব্যবসা-বাণিজ্য চলত। যুদ্ধের পর এই পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখন অবশ্য এ পথ সক্রিয় করার জন্য ভারত-চিন ভাবনাচিন্তা চালাচ্ছে।

আমরা এগিয়ে চলেছি। কখনও মেঘ আমাদের গ্রাস করছে, আবার কখনও উগরে দিচ্ছে। গাড়িতে ভালো ভালো গান বাজছে, কিন্তু সে দিকে কারওর খেয়াল নেই। জোড়া জোড়া চোখ বন্ধ জানলার বাইরে পাড়ি দিয়েছে। থেকে থেকেই উল্লাসধ্বনি বেরিয়ে আসছে মুখ থেকে। বয়সকে সবাই যেন কখন ছুড়ে ফেলে দিয়েছে পাহাড়ের খাদে।

thambi view point
থাম্বি ভিউ পয়েন্ট।

থাম্বি ভিউ পয়েন্টে যখন গাড়ি থেকে নামলাম মনে হল ঠান্ডায় জমে যাব। চারিদিকে ঘন মেঘ বা কুয়াশায় ৫০ ফুট দূরও দৃশ্যমান নয়। থাম্বি ভিউ পয়েন্টের উচ্চতা ১১২০০ ফুট। এখান থেকে পরিষ্কার আকাশে সুন্দর নিসর্গ দেখা যায়, আমাদের কপাল মন্দ। আমরা ছাড়াও আরও দু’গাড়ি ট্যুরিস্ট এসেছে। চলছে ফটোসেশন। একটা হলুদ কংক্রিটের ফলকে কালো রং দিয়ে ‘থাম্বি ভিউ পয়েন্ট’ লেখা। এই ফলককে পাশে রেখে ছবি তোলারও উন্মাদনা রয়েছে। এখানে আসার প্রমাণ সবাই ছবিতে রাখতে চাইবে, সেটাই তো স্বাভাবিক।

rhodendron flower
আবার রডোডেনড্রন ফুল।

এখানে আবার রডোডেনড্রন ফুল। এ বারে সে রাঙা পোশাকে হাজির হলেও কালকের সেই রূপ আজ আর নেই। কেমন একটা লাবণ্যহীনতা গ্রাস করেছে। গাছে ফুটে থাকা ফুলগুলিকে দু’হাত দিয়ে স্পর্শ করলাম। বড় কোমল এ ফুল। রডোডেনড্রন ফুল থেকে টপ টপ করে ঝরে পড়ছে কুয়াশার জলরূপী অশ্রু, যার ছোঁয়া লাগল আমারও চোখে-মুখে।

playing with snow
বরফ নিয়ে খেলা।

মেঘের পর্দার ওড়াউড়ির ফাঁকে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম লক্ষ্মণচক। জায়গাটা নাথাং এলাকায়। একটা ক্যাফেটেরিয়া কাম গিফট শপের সামনে গাড়ি দাঁড়াল। এটি সিকিম পর্যটন দফতরের তৈরি। এখানে দাঁড়ানোর কারণ দু’টো – এক, এখানেই প্রথম বরফ দেখলাম। ক্যাফেটেরিয়ার চালে কাল রাতে যে বরফ পড়েছিল সেগুলো গড়িয়ে নীচে এসে জড়ো হয়েছে। সেই বরফ একটু ঘাঁটার সাধ হয়েছে। দুই, যদি কেউ গরম চায়ে একটু গলা ভেজাতে চায়। কিন্তু গরম চা বা কফিতে গলা না ভিজিয়ে সবাই বরফ ছোড়াছুড়িতেই ব্যস্ত হয়ে গেল। ক্যাফেটেরিয়ার পাশেই কর্নেল লক্ষ্মণ সিং-এর স্মৃতিসৌধ। তাঁর নামেই এই জায়গার নাম।

tukla valley
টুকলা ভ্যালি।

আবার যাত্রা। যত যাচ্ছি ততই বরফের পরিমাণ অল্প অল্প করে বাড়ছে। জানলার কাচ সামান্য নামিয়ে ফটো তুলছি, গ্লাভস পরা নেই, হাত যেন জমে যাচ্ছে। টুকলা ভ্যালিতে যখন এলাম চারিদিকে কুয়াশায় ভরে গিয়েছে। বরফের ঘনত্ব আরও বেড়েছে। রাস্তার উপরে বরফের পাতলা চাদর।

নাথাং ভ্যালি চলে এলাম। উচ্চতা ১৩১৪০ ফুট। ভিউ পয়েন্টে গাড়ি থামতেই নেমে পড়লাম। রাস্তা থেকে একটা ঢাল নীচে নামতে নামতে কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে গিয়েছে। এখানে বরফ আর কুয়াশা, উভয়েরই আধিক্য বেশি। হাতের সামনে বরফ পেয়ে খুশির অন্ত নেই। বরফে পা হড়কে যাচ্ছে। খুব সাবধানে হাঁটতে হচ্ছে।

gnathang valley view point
নাথাং ভ্যালি ভিউ পয়েন্ট।

গাড়িতে উঠে আবার যাত্রা। একটু এগিয়েই বাঁ দিকে কিছুটা নীচে বেশ কিছু বাড়ি দেখলাম। অনেকেই এখানে এসে রাত্রিযাপন করেন। সম্ভবত এগুলোই সেই সব হোমস্টে। রাস্তায় এখন ইঞ্চি ছয়েক পুরু বরফ। পৃথিবীর সব রং এখান থেকে মুছে গিয়েছে। প্রকৃতি শুধু সাদা আর কালো। এ রকম মনোক্রম প্রকৃতি আগে কখনও দেখিনি। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা।

আমরা এখন পুরোনো বাবামন্দিরের দিকে চলেছি। বরফের আধিক্যে বহু ট্যুরিস্ট গাড়ি ফিরে আসছে। গাড়িগুলিকে পাশ দিতে গিয়ে আমাদের গাড়িকে বারে বারে খাদের কিনারায় চলে যেতে হচ্ছে। এটা খুবই বিপজ্জনক। এই বরফে গাড়িতে ব্রেক মারলেও চাকা স্লিপ করে, ফলে গাড়ির উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এই ভয়েই অধিকাংশ ড্রাইভার ফিরে আসছে। অনেক ড্রাইভারই ইশারায় বা চেঁচিয়ে আমাদের ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিল। ভূপাল কাউকে পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে চলল।

– যাওয়া যাবে তো?

– দেখি না, যত দূর যাওয়া যাবে তত দূর যাব। আট বছর এই রুটে গাড়ি চালাচ্ছি, এদের আমি খুব ভালো করেই জানি। জবাব ভূপালের।

going back
গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে চলা।

কথা না বাড়িয়ে চুপ করে বসে রইলাম। চকলেট, পপকর্ন দিয়ে সবাই মুখ চালাতে লাগল।  কিছু দূর যাওয়ার পর দাঁড়িয়ে পড়তে হল। একটা গাড়ি ফেঁসে গিয়েছে ইউ টার্ন করতে গিয়ে। ঠেলেও গাড়িটাকে নড়ানো যাচ্ছে না। দু’ জন জওয়ানও হাত লাগিয়েছেন। গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। মাটিতে পা দিতেই পুরো জুতোটাই বরফে ঢুকে গেল। অবশেষে সেই গাড়ি ঘুরল। আমরা এগোলাম, আমাদের সঙ্গে এখন আর একটাই গাড়ি। একটা মাইলস্টোন দেখলাম, লেখা কুপুপ ৬ কিমি। ভূপাল জানাল, পুরোনো বাবামন্দির আসতে সামান্যই বাকি।

১০ মিনিট বাদেই চলে এলাম বাবামন্দির। ট্যুরিস্ট বেশি নেই। আমাদের গাড়ি ছাড়া আর গোটা তিনেক গাড়ি। আমাদের সঙ্গে যে গাড়িটা আসছিল সেটাও আছে। পরে জেনেছিলাম ওই গাড়ির সওয়ার পাঁচ বান্ধবী, সিল্ক রুট বেড়াতে এসেছে।

area of old babamandir
বাবা মন্দিরের চারপাশ।

বাবামন্দিরে পিতলের সিংহাসনে বাবা হরভজন সিং-এর একটি মূর্তি ও একটা ফটো রাখা আছে। এ ছাড়াও আরও কিছু ঠাকুর-দেবতার ফটো রাখা আছে এবং শিখ, খ্রিস্টান ও মুসলিমদের কিছু ধর্মীয় ছবিও রাখা আছে।

হরভজন সিং ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর পঞ্জাব রেজিমেন্টের এক জওয়ান। ঠিক এই জায়গাতেই ছিল তাঁর বাঙ্কার। ১৯৬৮ সালে সিকিমে এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে। প্রবল বৃষ্টিতে বন্যা দেখা দেয়। বহু জায়গায় ধস নামে। কয়েকশো মানুষ প্রাণ হারান। ভারতীয় সেনাবাহিনী স্বাভাবিক ভাবেই উদ্ধারকাজে হাত লাগায়। ১৯৬৮ সালের ৪ অক্টোবর হরভজন সিং টুকলাদাড়া কিছু মানুষকে উদ্ধার করে ব্যাটেলিয়ানের হেড কোয়ার্টার ছোঙ্গুচুইলায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথে পা পিছলেই হোক বা জলের তোড়েই হোক তিনি এক খরস্রোতা নালায় পড়ে যান। জোরদার তল্লাশি চালিয়েও সেনাবাহিনী তাঁর দেহ খুঁজে পায় না। অবশেষে পাঁচ দিন পর তাঁর এক সহকর্মীকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে তিনি তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে বলেন। তাঁর দেহ কোন জায়গায় আছে তা-ও বলেন। পরে সেই জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে তাঁর দেহ উদ্ধার হয়।

এর পর তাঁর সহকর্মীরা ছোঙ্গুচুইলায় অর্থাৎ এই স্থানে তাঁর একটি মন্দির তৈরি করেন। শোনা যায় হরভজন সিং-এর আত্মা এখনও এখানে বিরাজমান। বিপদে পড়লে অনেককেই তিনি উদ্ধার করেছেন। ডিউটিরত অবস্থায় ঘুমিয়ে যাওয়ার কারণে বা কর্তব্যে ঢিলে দেওয়ার কারণে অনেক জওয়ানই তাঁর অদৃশ্য হাতের চড় খেয়েছেন।

babaji ki bunker
বাবাজির বাঙ্কার।

মন্দিরের পাশেই হরভজন সিং-এর বাঙ্কারের সিঁড়ি। জুতো খুলে রেখে সেনাবাহিনীর রেখে দেওয়া হাওয়াই চপ্পল পরে যেতে হবে। আর কেউ যাবে না, আমি একাই চললাম। ভূপাল তাড়াতাড়ি আসতে বলল। আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করেছে। বরফ পড়া শুরু হলে ভীষণ বিপদ হয়ে যাবে। ৩০/৩৫টা সিঁড়ি দৌড়ে উঠে। উপরে ছোটো ছোটো তিনটে ঘরে হরভজন সিং-এর ব্যবহৃত জিনিসপত্র রাখা। প্রসঙ্গত বলি, হরভজন সিংকে এখনও সেনাবাহিনীর একজন মনে করা হয়। প্রতি বছর তাঁর জন্য পোশাক ও অন্যান্য জিনিস বরাদ্দ হয়। মিটিং-এ তাঁর জন্য একটা চেয়ার ফাঁকা থাকে। ওই চেয়ারে তাঁর ফটো রাখা থাকে।

মন্দিরের সামনেই একটা স্টিলের গুমটি। তার ভিতরে এক গামলা কিশমিশ রাখা। বাবা হরভজন সিং-এর প্রসাদ। কাছে যেতেই এক জওয়ান আমায় একমুঠো কিশমিশ দিয়ে দিলেন। কিশমিশ গুলো খেতে খেতে গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। টিপটিপ করে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। (চলবে)

ছবি লেখক

0 Comments
Share
army-rescues-tourists-from-sikkim

ওয়েবডেস্ক: উত্তর ও পূর্ব সিকিমে প্রবল তুষারপাতের জেরে আটকে পড়া প্রায় দেড়শো পর্যটককে উদ্ধার করল সেনা। বুধবার রাতে ৫০ জনকে উদ্ধার করে ডোগরাতে সেনা ব্যারাকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। বাকিদের উদ্ধার করে লাচুং-এর হোটেলে পাঠানো হয়েছে।

বুধবার বিকেল থেকেই প্রবল তুষারপাত শুরু হয় সিকিমে। পূর্বাভাস মতো উত্তর সিকিমের লাচেন, লাচুং, গুরুদংমার এবং পূর্ব সিকিমের ছাঙ্গু, নাথুলা-সহ বিভিন্ন জায়গায় দফায় দফায় বরফ পড়ে। সেনা সূত্রে খবর, বরফে আটকে পড়া পর্যটকদের উদ্ধারে নামেন সেনাবাহিনীর ত্রিশক্তি কোরের শিখ রেজিমেন্টের জওয়ানরা।

প্রবল তুষারপাতের পরে সিকিমের কিছু জায়গায় তাপমাত্রা নেমে যায় হিমাঙ্কের অনেকটাই নীচে। ফলে আটকে পড়া পর্যটকদের মধ্যে অনেকেই শ্বাস-প্রশ্বাস সহ নানান সমস্যায় ভুগতে শুরু করেন। এই সব পর্যটককে উদ্ধার করে খাবার এবং চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া হয়।

তুষারপাতের পূর্বাভাস আগে থেকেই ছিল। সেই কারণেই অনেক পর্যটক সেখানে গিয়েছিলেন তুষারপাতের সাক্ষী থাকতে। কিন্তু সেই তুষারপাত যে এ রকম ভয়ংকর রূপ নেবে সেটা আন্দাজ করা যায়নি। এর ফলেই বিপদ আরও বাড়ে।

প্রবল তুষারপাতের ফলে আপাতত বন্ধ রয়েছে লাচুং থেকে ইয়ুমথাংগামী রাস্তা। অন্য দিকে গ্যাংটক থেকে নাথুলাগামী রাস্তাও বন্ধ রাখা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সেই রাস্তা খোলা হবে কি না পরিস্থিতি বিচার করে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সিকিম পুলিশ।

0 Comments
Share
the-mysterious-silk-route-part-8-the-warm-reception-at-zuluk
sudip paul
সুদীপ পাল

হোমস্টের বৃদ্ধ মালিকের তত্ত্বাবধানে ভূপাল গাড়ির ছাদ থেকে মালপত্র নামিয়ে দিল। আমরা সেগুলো দু’টো ঘরে নিয়ে এসে রাখলাম। টিনের চাল, টিনের দেওয়াল। ঘরের ভিতরটা প্লাইউড দেওয়া থাকলেও এই স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় ঠান্ডা যেন কামড়ে দিচ্ছে। বিকেলেই এই অবস্থা! রাতে কী হবে ভগবান জানে।

গৃহকর্তা আমাদের হাত-মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে আসতে বললেন। অরূপদা ঠান্ডায় বেশ কাবু হয়ে পড়েছে। তবে যতটা কাবু হয়েছে তার থেকে বেশি আতঙ্কিত। যা-ই হোক, দু’টো ঘরে দু’খানা রুমহিটার জ্বালানো হয়েছে। ১৫০ টাকা করে এক একটার ভাড়া।

খাবার টেবিলে কথাবার্তা চলছে। অবেলা হয়ে গেলেও আমরা অল্প করে ডিমের ঝোল, ভাতই খাচ্ছি। এ ছাড়া কোনো উপায় নেই। রূপের আবার জ্বর আসছে। ওকে নিয়ে খুব চিন্তায় আছি।

রূপের জ্বরের খবর শুনে গৃহকর্তা আশ্বস্ত করলেন। বিকেলে এখানকার মিলিটারি ট্রানজিট ক্যাম্পে ডাক্তারবাবু বসেন। সেখানে নিয়ে যাবেন বললেন। এক জন ভালো ডাক্তার দেখানো যাবে জেনে একটু আশ্বস্ত হলাম।

rows of pine trees
পাইনের সারি।

টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তায় নেমে পড়লাম। আমাদের সামনে বিশাল এক পর্বত দেওয়ালের মতো দাঁড়িয়ে। পাহাড়ের মাথাটা মেঘের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে। তার ফলে পাহাড়টা ঠিক কত উঁচু বুঝতে পারলাম না। সন্ধের মুখে এখনও ট্যুরিস্টবোঝাই গাড়ি ওই পাহাড়ে উঠছে। ওরা এই পথে নাথাং ভ্যালি যাচ্ছে। ওখানেই রাত কাটাবে। এখান থেকে নাথাং পৌঁছোতে আরও প্রায় ৩ ঘণ্টা সময় লাগবে। আকাশের এই অবস্থায় ওই উচ্চতায় পাহাড়ের বুকে অন্ধকারে গাড়ি চালানো! সত্যিই বড়ো দুঃসাহস এঁদের। কাল ভোরবেলা আমরাও ওই পথে যাত্রা করব।

জুলুক আসলে একটি কুলিবস্তি ছিল। এখানকার বাসিন্দারা সেনাবাহিনীর মালপত্র পৌঁছে দেওয়া, ফাইফরমাশ খাটা ও রাস্তা সারাইয়ের কাজ করত। এখনও অনেক বাসিন্দাই এ সব কাজই করে। আমরা যে হোমস্টেতে আছি তার মালিক গাড়ি করে সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে সবজি ও অন্যান্য জিনিস পৌঁছে দিতেন এবং মালকিন রাস্তা সারাইয়ের কাজ করতেন। এখন বার্ধক্যের কারণে সে সব কাজ ছেড়ে হোমস্টে খুলেছেন। ওঁদের ছেলে এখন ট্যুরিস্ট গাড়ি চালায়। শুনলাম সে-ও ট্যুরিস্ট নিয়ে এসেছে এখানে। বাড়িতেই আছে এখন, যদিও তার দেখা পাইনি আমরা।

আরও পড়ুন রহস্যময় রেশম পথ / পর্ব ৭ : অবশেষে জুলুক

৯০০০ ফুট উচ্চতা থেকে জুলুক শুরু হয়ে ১১৫০০ ফুটে গিয়ে শেষ হয়েছে। জুলুকের  দু’টো অংশ – আপার জুলুক ও লোয়ার জুলুক। ট্যুরিস্টরা সব লোয়ার জুলুকেই থাকে। আপার জুলুকে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। একটা মন্দির আছে সেখানে। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি। ঘণ্টার আওয়াজও কানে আসছে। ওখানেও এক চক্কর দেব ভাবলাম। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। অগত্যা আবার হোমস্টের চার দেওয়ালের মধ্যে সেঁধিয়ে গেলাম। অরূপদার বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলের নখ মাংসের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে। বেচারা ঠিকমতো হাঁটতে পারছে না। যন্ত্রণা হচ্ছে। অরূপদাও মিলিটারি ক্যাম্পে ডাক্তার দেখাতে যাবে।

কিছুক্ষণ পরেই হালকা বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ট্রানজিট ক্যাম্প আরও উপর দিকে। পাঁচ মিনিটের রাস্তা। ট্রানজিট ক্যাম্পের গেটে জওয়ানরা আমাদের এখানে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। কারণ জানানোর পর অভ্যর্থনা করে নিয়ে গিয়ে বসালেন। এর আগেও আমি ট্যুরিস্ট হিসাবে সেনাক্যাম্পে গিয়েছি, ওঁদের ব্যবহার সত্যিই মন ছুঁয়ে যায়।

আমাদের নাম-ঠিকানা লিখে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর দু’জন মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট এসে সব জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। তাঁরা অরূপদার পায়ের বুড়ো আঙুল পরীক্ষা করলেন। ডাক্তার আসার আগেই ওই দুই অ্যাসিস্ট্যান্ট পাশের ঘরে অরূপদাকে নিয়ে গিয়ে তাঁর চেঁচামেচির মধ্যেই নখ কেটে মাংস থেকে বের করে দিয়ে ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলেন।

একটু পরে মহিলা ডাক্তার এলেন। রূপকে দেখে জানতে চাইলেন কী হয়েছে। রূপকে কী ওষুধ খাইয়েছি সব বললাম। উনি ওগুলোই চালু রাখতে বললেন, সঙ্গে পেটে ইনফেকশনের একটা সিরাপ দিয়ে দিলেন।

Zuluk Basti
এক ঝলক জুলুক।

সন্ধ্যায় অরূপদার ঘরে আড্ডা চলছে। আমারও কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে। নিঃশ্বাসও খুব সাবলীল লাগছে না। সবটাই উচ্চতাজনিত কারণে। কাল অনেক উপরে উঠব তাই একটু চিন্তায় আছি। একটু কোকা ৩০ খেয়ে নিলাম। রাত আটটায় খাবার টেবিলে চলে গেলাম। লোহার টেবিল, নীচে আগুন জ্বলছে। বেশ আরামদায়ক ব্যাপার।

গল্প করতে করতে খাচ্ছি। গৃহকর্তা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে খাবারের তদারকি করছেন। এই ট্যুরে এই প্রথম হোমস্টের এতটা উষ্ণ আপ্যায়ন পেলাম। মালিকের একটি কন্যাসন্তান আছে। কালিম্পং-এ বিয়ে হয়েছে। এ সব এলাকায় বিয়ের পাত্র হিসাবে ড্রাইভার ছেলের ভীষণ কদর। গাড়ি চালিয়ে তারা প্রচুর উপার্জন করে। একটা গাড়ির উপার্জন থেকে অনেকেই অনেক গাড়ি কিনেছে। অনেকে আবার হোমস্টে, হোটেল পর্যন্ত করে ফেলে।

খাওয়া শেষ করে উঠে পড়লাম। বাইরে তখন মুষলধারায় বৃষ্টি। কনকনে ঠান্ডা। কাল যত সকালে সম্ভব বেরিয়ে পড়তে হবে।

জুলুক ভিউ পয়েন্টে

সারা রাত তুমুল বৃষ্টি হল। বার বার বৃষ্টির আওয়াজে ঘুম ভেঙেছে। যত বার ঘুম ভেঙেছে তত বার জানলার পর্দা সরিয়ে দেখেছি বরফ পড়ছে কিনা। দাম্পত্যজীবনে কখনও কখনও মাথায় বরফ চাপা দিয়ে রাখলেও জীবনে কখনও বরফ পড়া দেখিনি। সকালে দরজা খুলে বাইরে উঁকি মেরেও বরফের চিহ্ন খুঁজে পেলাম না। প্রকৃতি এ যাত্রা বেইমানি করল।

কনকনে ঠান্ডায় হাত-পা পেটে সেঁধিয়ে যাওয়ার দশা। বাড়ির মালিক গরম জলের ব্যবস্থা করে দিলেন। ওই জলের উপর ভরসা করেই আমাদের প্রস্তুতি চলতে লাগল।

তৈরি হয়ে খাবারঘরে চলে এলাম সবাই। টেবিলের তলায় হালকা আগুন করা আছে। চলে এল অরূপদার প্রেসক্রাইব করা গরম গরম রেসিপি। নর সুপের মধ্যে ম্যাগি দিয়ে রান্না করা খাবার। ম্যাগি সুপ নাম দেওয়া যেতে পারে। এক চামচ মুখে দিয়েই আঁতকে উঠলাম। এমন বাজে স্বাদের খাবার আমি জীবনে কখনও খেয়েছি কিনা মনে করার চেষ্টা করলাম। অরূপদা খাবারটা একবার নাড়ছে আর ট্যাবলেট খাওয়ার মতো কোঁত করে গিলে নিচ্ছে। বাকিদেরও মুখ সিঁটকে আছে। এ বার নিজের খাবারের দিকে তাকিয়ে বললাম, খাবারটা দারুণ হয়েছে। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত, তার পরেই হাসিতে ঘর ভরে গেল।

এত উচ্চতায় জার্নির জন্য সহজপাচ্য খাবার খাওয়াই উচিত। সে দিক থেকে দেখলে আজকের জার্নির উপযুক্ত খাবারই খাচ্ছি। বিস্বাদকে সুস্বাদে ফেরাতে বেশ করে টোম্যাটো সস ঢাললাম। আমার দেখাদেখি বাকিরাও তা-ই করল।

white rhododendron
সাদা রডোডেনড্রন।

সকাল ৮টা। আবার যাত্রা। সামনের ওই উঁচু পাহাড়টা আমাদের পেরিয়ে যেতে হবে। পাহাড়ের গায়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে আমাদের চলার পথ। আকাশ এখনও মেঘলা। জায়গায় জায়গায় ঘন কুয়াশা। হঠাৎ ভূপাল গাড়ি থামিয়ে বলল, ওই দেখুন সাদা রডোডেনড্রন। গাড়ি থেকে নেমে ছবি তুললাম। কাল যে লাল রডোডেনড্রন দেখেছিলাম, তার রূপের কাছে এ কিছুই নয়।

এগিয়ে চলেছি। যত এগোচ্ছি ততই মেঘেরা ঘিরে ধরছে। যেন কী একটা আক্রোশে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। পাহাড়শ্রেণির অজানা কোনো গহীন অন্তরাল থেকে তারা দলে দলে ছুটে এসে আমাদের ঘিরে ফেলছে। এরই মাঝে মেঘেদের ফাঁক দিয়ে দূরে অনেক নীচে দেখা গেল আমাদের কাল রাতের আস্তানা। উড়ন্ত ঈগল পাখির চোখে জুলুক কেমন দেখায় তা কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি। সবুজ জুলুক যেন সাদা মেঘের মুকুট পরে আছে। আমাদের ফেলে আসা অর্ধচন্দ্রাকার পথগুলো মনে হচ্ছে তার গলায় ঝুলন্ত মালা।

পাহাড়ের গায়ে শুধুই ঘাস জাতীয় গাছ। মাঝে মাঝে দু-একটা পাইন মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। এক সময় এসে পৌঁছোলাম জুলুক ভিউ পয়েন্টে। উচ্চতা ১০৪৫০ ফুট। এখান থেকে অনেক নীচে জুলুককে বড়ো সুন্দর দেখায়।

Zuluk View Point
জুলুক ভিউ পয়েন্ট।

গাড়ি থেকে নেমে কাঙালের মতো এ-দিক ও-দিক করছি যদি হঠাৎ মেঘ সরে গিয়ে প্রকৃতির দর্শন পাওয়া যায়। আমরা ক’জন ছাড়া এখানে আর এক জনও ট্যুরিস্ট নেই। এখান থেকে ভালো সানরাইজ দেখা যায়, কিন্তু মেঘই বাধা। “বাবুজি খুলজা সিম সিম বলিয়ে। মেঘ ক্লিয়ার হো জায়েগা।” ভূপালের কথায় হেসে ফেললাম। ওর কথা শুনে মৌসুমী চিৎকার জুড়ে দিল, “খুল যা সিম সিম।”

পাশেই বাঁশ ও টিন দিয়ে তৈরি এখানকার একমাত্র দোকানঘরটিতে হাজির হলাম। খানকয়েক পপকর্নের প্যাকেট কিনলাম। পপকর্ন শুধু যে পেট ভরায় তা নয়, এটি উচ্চতাজনিত কারণে শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যা থেকে রক্ষা করে।

দাম মিটিয়ে দুই দোকানির সঙ্গে গল্প জুড়ে দিলাম। ভোরবেলা নাথাংগামী কোনো গাড়িতে করে ওরা এখানে চলে আসে। সারা দিন বেচাকেনা করে বিকেলে ফিরে যায় লোয়ার জুলুক। বড়ো কষ্টের জীবন ওঁদের কিন্তু মুখের হাসিটি বড়ই স্বতঃস্ফূর্ত।

সবাইকে এ বার ডেকে নিলাম। যেতে হবে অনেক দূর। জুলুক থেকে নাথাং, কুপুপ হয়ে গ্যাংটক – ৯৩ কিমি রাস্তা। পথের উচ্চতা আরও বাড়বে। বেলা বাড়লে আবহাওয়া খারাপ হয় এই উচ্চতায়। এক বার আবহাওয়া খারাপ হলে বিপদে পড়তে হতে পারে। (চলবে)

ছবি: লেখক

 

0 Comments
Share
the-mysterious-silk-route-part-7-at-last-reached-zuluk
sudip paul
সুদীপ পাল

নিমাচেনে একটা ঝরনা আছে। নাম কিউখোলা ফল্‌স। এ পথের যাত্রীদের কাছে খুবই পরিচিত ঝরনা। ঝরনার কাছেই আমাদের গাড়ি দাঁড়াল। ১৫ ফুট উপর থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে জল নেমে আসছে। তবে শিস্নের ভুতখোলা ফলসের মতো অত জল নেই। সে অর্থে কিউখোলা ফলস দরিদ্রই বলা যায়। পাশেই বাঁ দিক থেকে একটা জলধারা এসে সমগ্র জায়গাটা জলময় করে রেখেছে। এই জল আন্ডারপাসের মাধ্যমে রাস্তার এ পার থেকে ও পারে গিয়ে কোন অজানার উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছে কে জানে?

ঝরনার পাশে একটা বছর পাঁচেকের শিশু জানি না কীসের খুশিতে আপন মনে হাততালি দিচ্ছে আর লাফাচ্ছে। এই বয়সটাই এমন, কারণে অকারণে মন খুশিতে ভরে যায়। এই শিশুদের কাছে বাস্তবের কোনো গুরুত্ব নেই। বাস্তবকে ছাপিয়ে যায় কল্পনার রং। হয়তো সে স্পাইডারম্যান হয়ে ঝরনার মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে উপরে উঠছে। কিংবা মাছ হয়ে সামনের জলে সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে। কল্পনার রাজ্যে তার অবাধ বিচরণ। আমরা বড়োরা শিশুদের এই কল্পনার রাজ্যে কোনো ভাবেই আর প্রবেশ করতে পারব না। আমাদের ছেলে রূপের বয়সও পাঁচ। তার ড্রইং খাতায় মাঝে মাঝেই কল্পনাশক্তির পরিচয় পাই। হয়তো এরা কী  দেখছে সে সব কয়েক সপ্তাহেই ভুলে যাবে। আকাশের মেঘের মতো সব কিছুই এদের কাছে ক্ষণস্থায়ী হলেও সব কিছুই রামধনুর মতো বর্ণময়।

que khola falls
কিউখোলা ফল্‌স।

আধ ঘণ্টা সময়  এখানে কাটিয়ে কিছু ছবি তুলে গাড়িতে ফিরে এলাম। রাস্তার ও পাশে ফুড কর্নারে ভূপাল কিছু খাওয়াদাওয়া করছে। দুপুর একটা। খিদে পাওয়ারই কথা। আমরাও ভূপালকে দেখে ড্রাই ফুডের প্যাকেট খুলে মুখ চালানো শুরু করলাম। কিছুক্ষণ বাদে ভূপাল ফিরে আসতেই আবার পথ চলা শুরু।

উচ্চতা যে বাড়ছে, গাছপালা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। এর মধ্যে আবার কুয়াশার উৎপাত। এমনিতেই পাহাড়ে বেলা বারোটার পর থেকেই আবহাওয়া খারাপ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে, তার উপর মেঘলা থাকলে তো কথাই নেই।

pamgolakha checkpost
প্যাঙ্গোলাখা চেকপোস্ট।

চলতে চলতে এক সময় গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। আশেপাশে দু’ চারটে বাড়ি দেখতে পাচ্ছি। রাস্তার ডান দিকে একটা সাদা রঙের ঘর। ঘরের দেওয়ালে লেখা আছে ‘প্যাঙ্গোলাখা চেকপোস্ট’। ঘরের পাশে সবুজ রঙের একটা বোর্ডে সাদা রং দিয়ে লেখা ‘ফরেস্ট চেক পয়েন্ট’।

আসলে এখান থেকে শুরু করে ছাঙ্গু লেক পর্যন্ত পুরো এলাকাটাই প্যাঙ্গোলাখা ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি। এখানে সিকিমের রাজ্য পাখি মোনাল তো আছেই এ ছাড়াও সিকিমের রাজ্য পশু রেড পান্ডা , হিমালয়ান মাস্ক ডিয়ার, লেপার্ড, গাউর, ফ্লাইং স্কুইরেল, হিমালয়ান ব্ল্যাক বিয়ার, বুনো শুয়োর, জংলী কুকুর প্রভৃতি আছে। ২০০২ সালে সিকিম সরকার ১২৮ বর্গ কিমির এই জঙ্গল এলাকাকে অভয়ারণ্য হিসাবে ঘোষণা করে। ১৩২০ মিটার উচ্চতা থেকে শুরু করে ৪৬০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত এর বিস্তৃতি।

আরও পড়ুন: রহস্যময় রেশম পথ / পর্ব ৬ : অরিটার হয়ে রংলি ছুঁয়ে জুলুকের পথে

গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। বেশ ঠান্ডা। যে হেতু অভয়ারণ্যে প্রবেশ করছি তাই একটা প্রবেশ মুল্য দিতে হবে। ভূপাল টাকা নিয়ে সাদা ঘরে চলে গেল। আমিও ক্যামেরা নিয়ে রেডি। মিনিট পাঁচেক পরেই শুনি ভূপাল ডাকছে। দুর বাবা, এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল! এখনও তো গাছের ফাঁক দিয়ে কোনো পান্ডা বা ভাল্লুক উঁকি মারছে কিনা তার সন্ধান করা হল না। নীচের দিকে কোনো মাস্ক ডিয়ার ঘাসপাতা চিবাতেও তো পারে। কি আর করব? অগত্যা আবার গাড়িতে গিয়ে বসলাম। আবার চলা শুরু।

towards Zuluk
জুলুকের পথে প্রকৃতির সাথে।

রাস্তার দু’ ধারে কুয়াশায় ঢাকা পাইন গাছের সারি। গাছের ডাল থেকে টপ টপ জল ঝরে পড়ছে। মাঝে মাঝে বৌদ্ধদের রঙবেরঙের প্রেয়ার ফ্ল্যাগ। দূরের পাহাড়গুলো থেকে সাদা মেঘেরা গুঁড়ি মেরে উপরে উঠে আসছে। পথের পাশে আর খাদ দেখা যাচ্ছে না। সমস্ত খাদ কেউ মেঘ ঢেলে ভর্তি করে দিয়েছে। আচমকা চোখে পড়ল লাল থোকা থোকা ফুল ফুটে আছে সামনের একটা গাছে। ভূপাল বলে উঠল, “ওই দেখুন রডোডেনড্রন।“

রডোডেনড্রন! আমার এই সময় এখানে আসার মূল কারণ দু’টি – এক, রডোডেনড্রন ফুল দেখা। এই সময়ই ফোটে এই ফুল। রডোডেনড্রন সিকিমের রাজ্য ফুল। আর দুই, বরফ দেখা, যার দর্শন হয়তো জুলুকের পর থেকে পাব।

“গাড়ি দাঁড় করাও, আমি নামব”, উত্তেজিত ভাবে বলে উঠলাম। আমার স্বপ্নের ফুল। কত ইচ্ছা ছিল রডোডেনড্রন ফুল দেখবো। আজ এই ফুল আমার সামনে! নিজের চোখে দেখেও যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। জীবনে প্রথম দেখছি রডোডেনড্রন ফুল। এর উজ্জ্বল লাল রং দেখে আমি মুগ্ধ।  হিংসুটে কুয়াশা শত চেষ্টা করেও এর রংকে চাপা দিতে পারেনি। কুয়াশা ভেদ করে ফুটে বেরোচ্ছে এর রূপ।

rhododendron flower 1
কুয়াশা মাখা রডোডেনড্রন।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দু’ চোখ ভরে দেখছিলাম রডোডেনড্রন ফুল। সম্বিত ফিরল ভূপালের ডাকে – “চলে আসুন। অনেকটা পথ যেতে হবে। সামনে আরও গাছ আছে, একটা ভালো জায়গা দেখে আবার দাঁড়াব।“

ঝরে পড়া কয়েকটা রডোডেনড্রন ফুল কুড়িয়ে নিয়ে ফিরে এলাম গাড়িতে। আবার পথ চলা শুরু। কিছুক্ষণ পরে মেঘ থেকে বেরিয়ে এলাম। পাইন গাছও আমাদের সঙ্গ ত্যাগ করেছে। এখন রাস্তার দু’পাশে শুধু ঘাস, আখের মতো সরু সরু বাঁশ গাছের ঝাড় আর গুল্মরাজি। পাহাড়ের খাদ তুলোর মতো সাদা মেঘে পরিপূর্ণ। এমন সময় আবার তার দর্শন পেলাম। এ বার ভুপাল নিজেই গাড়ি থামাল। এক গাল হেসে বলল, “এ বার নেমে দেখুন।”

দুমদাম সপার্ষদ গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। যেন নন্দন কাননে এসেছি। কানে যেন বেজে উঠল খিল খিল হাসি। পিছন ঘুরে দেখি রডোডেনড্রন ফুল আমার দিকে তাকিয়ে যেন হাসছে। কোন দিক দেখি? বাঁ দিকে রডোডেনড্রন ফুল আর ডান দিকে নিসর্গ। আমি তালকানা হয়ে গেছি।

rhododendron
মন ভরাল রডোডেনড্রন।

রডোডেনড্রনের সঙ্গে মনে মনে আমার অনেক কথা হল। আমার অবস্থা দেখে মনে হল ও যেন হাসছে। রডোডেনড্রন দেখার জন্য আমার এত বছরের অপেক্ষা আজ সার্থক হল। কিন্তু মেঘগুলো এমন উৎপাত করছে যে ভালো করে দেখা হচ্ছে না তাকে। কিন্তু আমি তো পথিক, আমায় তো এগোতেই হবে। কিন্তু তার আগে কিছু ভালো ছবি চাই তার।

কিন্তু ভালো ছবি পেতে হলে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে হবে যে। চেষ্টা করলাম, পারলাম না। আমার আকুলতা দেখে ভুপাল এগিয়ে এসে কী ভাবে উঠতে হবে দেখিয়ে দিল। ব্যাস আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তরতরিয়ে উঠে গেলাম ফুট দশেক উপরে। রডোডেনড্রন ফুল এল আরও কাছে। স্পর্শ করলাম, ছবি তুললাম। বললাম, এ বার আমায় যেতে হবে।

রডোডেনড্রন তো যেতে দিতে চায় না। সে যেন চায় রাতের আঁধারে চাঁদের আলোয় নীল আকাশের চাঁদোয়ার নীচে মেঘের বিছানায় রাত কাটিয়ে দিই।

না লাল রূপসী। এ বার আমায় যেতেই হবে। আবার দেখা হবে একদিন।

অরূপদা ডাকাডাকি করছে। ঘোর কাটিয়ে নীচে নেমে আবার গাড়িতে গিয়ে বসলাম। ইচ্ছা করছে এখানেই থাকি আজকের রাতটা। কিন্তু বাস্তব বড়ো কঠিন ঠাই। সেখানে ইচ্ছার বড়ো একটা মূল্য নেই।

near zuluk
জুলুকের কাছে।

গাড়ি চলছে, জুলুকের দূরত্ব ক্রমশ কমছে। আকাশে বাড়ছে মেঘের ঘনঘটা। আধ ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম আমাদের আজকের গন্তব্য জুলুকে। ঘড়ি বলছে এখন বিকাল চারটে। ঘড়ি যা-ই বলুক তাতে আমাদের কিছু যায়-আসে না। আজ আমরা সময়ের দাসত্ব শৃঙ্খলকে ছিন্ন করে ফেলেছি। গাড়ি থামল, শুরু হল টিপ টিপ বৃষ্টি । (চলবে)

ছবি লেখক

0 Comments
Share
the-mysterious-silk-route-part-6-on-the-way-to-zuluk-via-aritar-and-rongli
sudip paul
সুদীপ পাল

আজ আমাদের গাড়ি ও ড্রাইভার বদল হয়েছে।  রিশিখোলায় প্রাতরাশ সেরে মহীন্দ্রা কোম্পানির একটি গাড়িতে যাত্রা শুরু করেছি। সারথিও বদল হয়েছে। পেয়েছি ভূপাল ছেত্রীকে।

রিশিখোলার কাছেই রুংডিং দিয়ে যাওয়ার সময় ভূপাল বলল- “এখানে একটা মন্দির আছে। বিশ্ববিনায়ক মন্দির। যাবেন?”  যাব না মানে? আলবাত যাব। বেড়াতেই তো এসেছি। দু’-তিন মিনিটের মধ্যেই বিশ্ববিনায়ক মন্দির পৌঁছে গেলাম। বিশাল আকারের গণেশ মন্দির। ইট, বালি, সিমেন্টের তৈরি মন্দিরের গায়ে শিল্পকর্ম বিশেষ কিছু নেই তবে মন্দিরের ভিতরে বিশাল গণেশমূর্তিটি খুব সুন্দর। হলুদ ও রুপোলি মূর্তির দু’ দিকে ৮টি করে ১৬টি হাত আছে। রুপোলি পদ্মফুলের উপর গণেশ উপবিষ্ট। ফলকে দেখলাম সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী পবন চামলিং ২০০৮-এর ২০ এপ্রিল এই মন্দিরের শিলান্যাস করেন। মন্দিরের দরজা খোলে ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর।

Vishwa Vinayak temple
বিশ্ব বিনায়ক মন্দির।

কাল রিশিখোলা নদীতে স্নান করেই হোক বা অন্য কোনো কারণেই হোক, রাত থেকে রূপের জ্বর এসেছে। আমরা মন্দির দর্শন করলেও মৌসুমী গাড়িতেই ছিল ছেলেকে নিয়ে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য লামপোখরি লেক। নেপালি ভাষায় ‘পোখরি’ শব্দের অর্থ পুকুর। লেকটা অরিটারে, তাই একে অরিটার লেকও বলা হয়।

লেকে ঢোকার মুখেই সবার টিকিট, পার্কিং চার্জ, সব মিটিয়ে ফেলতে হল। গাড়ি সমেত ভিতরে ঢুকে গেলাম। আমরা গাড়ি থেকে নেমে এলেও মৌসুমীকে গাড়িতেই থাকতে হল। ছেলেটা ঘুমোচ্ছে। গাড়িতে বসেই অবশ্য সে লেক দেখতে পাচ্ছে।

rungding
রুংডিং গ্রাম।

পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম লেকের ধারে। পান্না সবুজ লেকের ধারে দু’টো রাজহাঁস খুনসুটি করছে। লেকের ধারে গোলাপ ও অন্যান্য ফুলের গাছে ফুল ফুটে আছে। এখানকার উচ্চতা ৪৬০০ ফুট। ঠান্ডা বা গরম, কোনোটাই অনুভূত হচ্ছে না। লেকের দৈর্ঘ্য ১১২০ ফুট ও ২৪০ ফুট চওড়া। উপর থেকে লেকটা পুরো বুটের মতো লাগে, তাই অনেকে একে বুট লেকও বলে।

লেকের ধার বরাবর রেলিং দেওয়া রাস্তা। হাঁটতে হাঁটতে প্রায় অর্ধেক চলে এসেছি। পান্না সবুজ জলে বোটিংও করছে কেউ কেউ। আমার নিশ্চিত ধারণা জলে প্রচুর পরিমাণ ফাইটোপ্ল্যাংটন থাকার কারণে জলের রং সবুজ। পাইন ও অন্যান্য গাছে ঘেরা লেকের ওপারে একটা ছোটো মন্দির। সম্ভবত শিবমন্দির।

ratay khola falls
রাতেখোলা ফল্‌স।

আধ ঘণ্টা কাটিয়ে গাড়িতে ফিরে এলাম। যেতে হবে বহু দূর। মাঝে রংলিতে অনেকটা সময় ব্যয় হবে। যেতে যেতে গাড়ি থেকে অরিটার জায়গাটা দেখে মনে হল বেশ বর্ধিষ্ণু এলাকা। বাড়ি, হোটেল সবই সুদৃশ্য ও সাজানোগোছানো। জায়গাটা সিকিমে। আমি আজ পর্যন্ত সিকিমে কোথাও ঝুপড়ি বা ভাঙাচোরা বাড়ি দেখিনি।

রংলির পথে চলতে চলতে পেয়ে গেলাম একটা ঝরনা, বোর্ডে লেখা ‘রাতেখোলা ফলস’। জায়গাটার নাম দালাপচাঁদ। গাড়ি দাঁড় করিয়ে নেমে এলাম। প্রায় ৮ ফুট উপর থেকে ক্ষীণকায়া এই ঝরনা ঝাঁপ দিয়ে পড়ছে। তার পর রাস্তা পেরিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে রংপোখোলায় মিশেছে। এ জায়গার উচ্চতা অরিটারের থেকেও কম, মাত্র ৩১৫০ ফুট। আমরা ক্রমশ নীচের দিকে নামছি। রংলির উচ্চতা আরও কম, ২৭০০ ফুট।

writer with dilip raj pradhan
দিলীপরাজ প্রধানের সঙ্গে লেখক।

কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা রংলি চলে এলাম। গাড়ি সোজা মঙ্গলদীপ রিসর্টের সামনে এসে থামল। আমার পূর্ব-পরিচিত দিলীপরাজ প্রধান এই রিসর্টের মালিক। তিনিই আমাদের এই ট্যুরের ব্যাবস্থাপনার দায়িত্বে। গাড়ি থেকে নেমে রিসেপশন কাম অফিসে ঢুকলাম। ভিতরে দিলীপজি চেয়ার-টেবিলে বসে কিছু লিখছিলেন। আমাদের দেখে উঠে দাঁড়িয়ে এক গাল হেসে অভ্যর্থনা জানালেন। তার সঙ্গে এই প্রথম সাক্ষাৎ আমাদের। আলাপ-পরিচয়ের মধ্যেই ধপধপে সাদা কাপ-প্লেটে চা এল।

সিল্ক রুট বা রেশম পথে যাওয়ার অনুমতি নিতে হয় রংলি থেকেই। দিলীপজি আমাদের জন্য সেই অনুমতির আবেদনপত্র পূরণ করে ভূপালের হাতে ধরিয়ে দিলেন। রিসর্টের লনে চলে এলাম। দিলীপজি আমাদের সবাইকে খাদা পরিয়ে সম্মান জানালেন। খাদা হল মাফলারের আকারের একটা রেশম বা টেরিকটের কাপড়। সিকিমে এটাই সম্মান জানানোর রীতি। এমন সম্মান আমি বা আমাদের দলের কেউই আগে কখনও পায়নি। আমরা অভিভূত।

rongli market
রংলি বাজার।

রংলি বাজারে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ভূপাল পারমিশন করাতে গেল। এই ফাঁকে আমরা কিছু ওষুধ কিনে নিলাম। অরূপদা  সেলুনে ঢুকল। সেলুনে তো রীতিমতো পাখা চলছে। বেশ গরম এখানে। কপালে ঘাম জমছে বুঝতে পারছি। কিছুক্ষণ ভূপাল অনুমতিপত্র নিয়ে এল। বিরতি শেষে আবার আমাদের যাত্রা শুরু হল।

রংলি থেকে রাস্তা চড়াই হচ্ছে পরিষ্কার বুঝতে পারছি। কিছুটা যাওয়ার পর ভূপাল গাড়িটা রাস্তার এক ধারে দাঁড় করিয়ে দিল। আমরাও গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। জায়গাটার নাম শিস্নে। আমাদের ডান দিকে সুগভীর খাদ থাকলেও অনেকটা নীচে একটা সেতু সামনের পাহাড়ের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করছে। আর কংক্রিটের সেতুর পাশেই একটা মনোরম ঝরনা পাশের পাহাড় থেকে দৌড়ে এসে সোজা খাদে ঝাঁপ দিয়েছে। ঝরনার নাম ভুতখোলা ফলস। আমরা যেখানে আছি সেখান থেকে ঝরনার কাছে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। যেতে হলে আমাদের পিছনে ফিরে যেতে হবে এবং অনেকটা ঘুরে ঘুরে যেতে হবে। কাছে গেলে ঝরনাটা সামনে থেকে দেখতে পাব ঠিকই, কিন্তু বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সবুজ পটভূমিতে আমরা সাদা ঝরনার যে রূপ এখান থেকে দেখতে পাচ্ছি সেটা কোনো মতেই পেতাম না।

bhootkhola falls
ওই দেখা যায় ভুতখোলা ফল্‌স।

রংলিতে যেমন একটা গরম ভাব ছিল এখানে সেটা নেই। কিন্তু ঠান্ডাও নেই। বেশ মনোরম একটা তাপমাত্রা। আমাদের সামনে সবুজ গাছে মোড়া উঁচু উঁচু পাহাড় পরিষ্কার বুঝিয়ে দিচ্ছে আমরা আরও অনেক উপরে উঠব অর্থাৎ আমাদের জন্য আরও অনেক সৌন্দর্য নিয়ে প্রকৃতি অপেক্ষা করছে। পাহাড়ের গা বেয়ে আমরা যত যাচ্ছি ততই উচ্চতা বাড়ছে একটু একটু করে, তার কারণে তাপমাত্রাও ক্রমশ কমছে। গাছপালার ধরনও বদলে যাচ্ছে। প্রকৃতির রূপ আরও খুলছে।এক সময় গাড়ির জানলার কাচ তুলে দিতে হল। গাড়ি এসে থামল লিংতামে।

lingtam
পুলিশ চৌকিতে পরীক্ষা হোল অনুমতিপত্র। লিংতাম।

লিংতাম একটা ট্যুরিস্ট স্পট। সিল্করুটগামী অনেক ট্যুরিস্টই এখানে একটা রাত কাটিয়ে যান। রাস্তার ধারে বাড়ি, হোটেল, হোমস্টের ছড়াছড়ি। আমরা এখানে থাকব না বা ঘুরে দেখবও না। পুলিশ চেকপোস্টে অনুমতিপত্র দেখিয়ে এগিয়ে যাব। ভূপাল গাড়ি থেকে নেমে অনুমতিপত্র দেখিয়ে আবার ফিরে এল। মিনিট পাঁচেকের বিরতি শেষে আবার যাত্রা।

আরও পড়ুন: রহস্যময় রেশম পথ / পর্ব ৫ : রিশিখোলার আলোছায়া

লিংতাম থেকে যত সামনে এগোচ্ছি পাহাড়গুলো ততই বিশালাকৃতি হয়ে উঠছে। আমাদের ফেলে আসা পথ পাশের পাহাড়ের গায়ে আলপনা এঁকে এগিয়ে গিয়েছে দেখতে পাচ্ছি। নীচের দিকে তাকালে মাথা ঘুরে যাওয়ার উপক্রম। ভূপাল একটা উঁচু পাহাড়ের মাথার দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, “ওই পাহাড়ের মাথায় আমরা যাব। ওই যে সাদা বাড়িটা দেখা যাচ্ছে বিন্দুর মতো, ওখানেই যাব।“

after lingtam
লিংতাম ছাড়িয়ে ফেলে আসা পথ।

যাব তো বুঝলাম কিন্তু এর উচ্চতা এখান থেকে অনেক। এমন এক জায়গায় আছি যেখান থেকে নীচের দিকে তাকালে মনে ভীতির সঞ্চার হয়, আবার উপর দিকে গন্তব্যের দিকে তাকালেও প্রাণে ভীতির সঞ্চার হয়। আমাদের বুক ঢিপ ঢিপ করলেও ভূপাল কিন্তু ভীষণ স্বাভাবিক। সে হাসছে, গল্প করছে। তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। উচ্চতায় আমার একটু ভয় আছে যার কারণে ছাদের চওড়া রেলিং পেলেও সেখানে বসতে পারি না বা উঁচু দোলনায় চাপতে পারি না। মনে হয় মাথা ঘুরে পড়ে যাব। আমার কথা বাদ দিলাম, দলের বাকিদের মুখেও তেমন সাড়াশব্দ পাচ্ছি না। সব নির্বাক হয়ে আছে।

সব কিছুরই শেষ আছে। এই পথেরও শেষ হল এক সময়। সেই পাহাড়ের মাথায় এলাম অবশেষে। জায়গাটার নাম নিমাচেন। উচ্চতা ৩৬০০ ফুট। রংলির উচ্চতা ২৭০০ ফুট। এত উঁচু উঁচু পাহাড় পেরিয়ে মাত্র ৯০০ ফুট উচ্চতা বাড়ল! এখন যে উচ্চতায় আছি আজই এর প্রায় তিন গুণ উচ্চতায় পৌঁছোব আমরা। আমাদের আজকের গন্তব্য জুলুক, উচ্চতা ৯৫০০ ফুট। (চলবে)

ছবি লেখক

 

0 Comments
Share
the-mysterious-silk-route-part-5-the-light-and-shade-of-rishikhola
sudip paul
সুদীপ পাল

কথা চলছে, উনিও রঙের ব্রাশ চালিয়ে যাচ্ছেন। জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার নাম তো সেবাস্টিয়ান প্রধান। আপনি কোন ধর্মের মানুষ?

মৃদু হেসে বললেন, আমি হিন্দু, আমি বৌদ্ধ আবার আমি খ্রিস্টান

– মানে?

– আমি ছিলাম খ্রিস্টান। পরে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করি, বহু দিন এই ধর্মে থেকেও মনের শান্তি পাইনি। অবশেষে হিন্দুধর্মের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করি। বুঝতে পারি এখানেই আমার শিব লাভ হবে। এখানেই পাব শান্তি। তাই আবার ধর্ম পরিবর্তন করে হিন্দু হলাম।

– শান্তি পেয়েছেন? পেয়েছেন ঈশ্বর?

– হ্যাঁ, আমি ঈশ্বর লাভ করেছি। আমি তাঁর দর্শনও পেয়েছি।

কথাটা শুনে চমকে উঠলাম। ঈশ্বর পাওয়া কি এত সোজা? বছরের পর বছর সাধনা করেও সাধু-সন্তরা ঈশ্বরের দেখা পান না। ইনি তো গৃহী মানুষ। কিন্তু তাঁকে অবিশ্বাস করতেও ইচ্ছা হচ্ছে না। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝে দাঁড়িয়ে আছি। মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন ঘুরছে। জিজ্ঞাসা করব, কিন্তু অরূপদা আমার নাম ধরে হাঁকডাক জুড়ে দিয়েছে। “আবার পরে কথা বলবো” বলে চলে এলাম।

আরও পড়ুন রহস্যময় রেশম পথ / পর্ব ৪ : রিশিখোলায় জলকেলি

অরূপদার হাওয়াই চপ্পলও ওই ফেলে আসা ব্যাগে রয়ে গিয়েছে। একটা চপ্পল কেনার জন্য সে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। খবর নিয়ে জানলাম সামনে বাজার বলতে হেঁটে ২ কিমি যেতে হবে পাকা রাস্তায়। হেঁটে গিয়ে চপ্পল কিনে ফিরে আসতে আসতে আজকের দিনটার বারোটা বেজে যাবে। রিসর্টের কেউ বাজার যাবে কিনা খবর নিলাম। জানলাম ওরা আজ সকালেই বাজার করে এনেছে। আবার কাল।

অরূপদার সঙ্গে কথা বলে বিকেলের প্রোগ্রাম, সন্ধের ক্যাম্পফায়ার ইত্যাদির ব্যবস্থা করে ফেললাম। ক্যাম্পফায়ার হবে, হবে মাংসের বার্বিকিউ। রিসর্ট সব ব্যবস্থা করে দেবে।

wooden bridge over rishi river
রিশি নদীতে সাঁকো।

এ বার সবাই মিলে একটু পদচারণা করতে বেরোলাম। অরূপদাকে আমার হাওয়াই চটিটা দিয়ে আমি খালি পায়ে চললাম। রিশিখোলা নদীর ধার ধরে পাথরের উপর দিয়ে হাঁটছি। নির্জন পরিবেশে নদীর ছলাত ছলাত শব্দ একটা অন্য রকম আবহ সৃষ্টি করেছে। মাঝেমাঝে ছোটো ছোটো দু’-একটা পাখি ইতিউতি উড়ে যাচ্ছে। নদীর দু’ পাশে জঙ্গল। মাথার উপর নীল আকাশ। নদীর বুকে নীল-সবুজের প্রতিফলনের মাঝে ছিটকে-ওঠা জলের আলপনা দেখতে দেখতে কখন যেন হারিয়ে গিয়েছি। পিছন ফিরে দেখি আমার সঙ্গে শুধু রূপ, এই জঙ্গুলে পরিবেশে হরিণশিশুর মতোই লাফাতে লাফাতে চলেছে। বাকিরা পাথরের উপর হাঁটতে না পেরে রণে ভঙ্গ দিয়ে একটা বড়ো পাথরে বসে পড়েছে।

আমরা বাপ-বেটা প্রকৃতিকে গায়ে মেখে তার না-বলা কথা শুনতে শুনতে আরও এগিয়ে চললাম। মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন পাথরের গায়ে রঙের আলপনা দেখছি। আজ যেখানে হিমালয় পর্বত এক সময় এখানেই ছিল টেথিস সাগর। সমুদ্রগর্ভে একের পর পলি জমে জমে এ পাথরের সৃষ্টি। পাথরগুলি ভালো করে দেখলে পলির স্তরগুলো পরিষ্কার বোঝা যায়।

road being built along rishi river
রিশি নদীর ধার দিয়ে তৈরি হচ্ছে রাস্তা।

অনেকটাই চলে এসেছি। আলো কমতে শুরু করেছে। এ বার ফেরা যে পথে এসেছিলাম। ২০০০ ফুট উচ্চতায় এই রিশিখোলা আর কিছু দিন পর আর এত শান্ত থাকবে না। নদীর ধার দিয়ে রাস্তা তৈরি হচ্ছে। বছর খানেক পরেই রিশিখোলার গায়ে লাগবে কৃত্রিমতার ছোঁয়া।

নদীর ধার থেকে একটা রাস্তা উপর দিকে উঠে গিয়েছে। সেই রাস্তায় এ বার পাড়ি জমালাম। জংলা পথ। খালি পায়ে হাঁটতে একটু ভয় লাগলেও এগিয়ে চললাম সাবধানে। কিছুটা গিয়েই একটা হোমস্টে। পুরো জঙ্গলের মধ্যেই বলা যায়। আরও একটু এগিয়ে গেলাম। খচমচ আওয়াজ শুনে পিছন ঘুরে দেখি একটা ১২/১৩ বছরের ছেলে আসছে। এখানে তো সর্বমোট ৩টে হোমস্টে দেখলাম। তার মধ্যে একটায় আমরা আছি। এই জঙ্গলে স্থানীয় মানুষের বসতিও নেই। তা হলে ছেলেটা কোথা থেকে এলো?

কিছু বলার আগেই ছেলেটি আমায় হিন্দিতে প্রশ্ন করল – এ দিকে কোথায় যাচ্ছেন?

– এই একটু ঘুরে দেখছি। আচ্ছা এই রাস্তা কোথায় গেছে?

– মেন রোডে।

– এখান থেকে কত দূর?

– আমার যেতে ১৫/২০ মিনিট লাগবে। আপনাদের অভ্যাস নেই, আধ ঘণ্টা লেগে যাবে।

jungle path
জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পথ।

এইটুকু ছেলে এত হিসাব জানে! ছেলেটা আমায় ছেড়ে হন হন করে এগিয়ে গেল। জঙ্গলের মেঠোপথে গাছপালার আড়ালে চলে গেল। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়া দেখলাম। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে আলোআঁধারি ফুঁড়ে ছেলেটা কতটা পথ পাড়ি দেবে কী জানি! ছেলেটা কোথা থেকে এল, সেটাও তো জানা হল না।

ফিরে এলাম হোমস্টের সামনে। সুর্যদেব সামনের পাহাড়ের আড়ালে গা ঢাকা দিয়েছেন অনেকক্ষণ। চার পাশে এখনও বেশ আলো, তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকারে ডুব দেবে রিশিখোলা। হোমস্টে থেকে ৫০ টাকা দিয়ে ছিপ ভাড়া করে কয়েক জন নদী থেকে বরোলি মাছ ধরছেন। মৌরলা মাছের মতো ছোটো ছোটো মাছ।

একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, “মাছ উঠছে?”

তিনি হাসিমুখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওই উঠছে আর কী।”

– কতগুলো ধরলেন?

fishing in rishi river
রিশি নদীতে মাছ ধরা।

ভদ্রলোক একটা ছোটো বালতি তুলে দেখালেন। তাতে ১০/১২টা মাছ আছে। বুঝলাম ৫০ টাকা খরচ করে এঁরা আনন্দ কিনছেন। যাঁদের ছিপ ফেলার নেশা আছে তাঁরা লাভ-ক্ষতির হিসাব জানেন না। এই আনন্দ সবাই বোঝে না, বোঝানোও সম্ভব নয়। মনে আছে ছোটোবেলায় পাড়ার একজনের পুকুরে ছিপ ফেলতে গিয়েছিলাম। সেটাই ছিল জীবনে প্রথম বার ছিপ ফেলা। অপটু হাতে দু’টো তেলাপিয়াও ধরেছিলাম। কিন্তু বাড়িতে আমার এই সাফল্যের কেউ মূল্য দিল না। বাবা এমন মার মারল যে সে দিনই জীবনের শেষ ছিপ ফেলা হয়ে গেল আমার।

ঘরের সামনে বারান্দার মতো কিছুটা জায়গা। সেটা আসলে চলাচলের রাস্তা। সেখানে চেয়ার পেতে মৌসুমী, অরূপদা, বৌদি বসে আছে। এখান থেকে নদী-সহ সামনের নিসর্গ বড়ো সুন্দর লাগে। এমন নিসর্গ দেখতে দেখতে চা খাওয়ার সুযোগ কদাচিৎ পাওয়া যায়।

আঁধার নেমেছে। হালকা মেঘলা আকাশ। কোনো তারা দেখা না গেলেও হালকা একটা আলো-আলো ভাব। ক্যাম্পফায়ারের আগুন জ্বলা শুরু হয়েছে এ-দিকে ও-দিকে। আমাদের এখনও শুরু হয়নি। মিস্টার প্রধানের ছোটো মেয়ের কাছে খোঁজখবর নিতে গেলাম। ক্যাম্পফায়ারের ব্যাপারটা সে-ই দেখে। সে জানাল, কাঠ সাজানো আছে। আমাদের যথাস্থানে বসতে বলল।

ঠিক সাড়ে ৮টা। আমাদের ক্যাম্পফায়ারের আগুন জ্বলে উঠল। গান-বাজনার ব্যবস্থা নেই। নিজেরাই হুল্লোড় করছি। আমাদের পাশে কয়েকটি ছেলেমেয়ে ক্যাম্পফায়ারে মদের ঝরনাধারা বইয়ে দিয়েছে। আমরা হাঁ করে ওদের বিচিত্র কাণ্ডকারখানা দেখছি। এমন সময় দেখি, মিস্টার প্রধানের ছোটো মেয়ে আসছে, সঙ্গে হুঁকো টানতে টানতে আসছে ১২/১৩ বছরের এক কিশোর। অর্থাৎ হুঁকোর আগুনটা ভালো করে ধরানোর জন্য বাচ্চাটাকে দিয়ে টানানো হচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে থাকতে না পেরে তীব্র প্রতিবাদ করলাম। কিন্তু আমার কথার কোনো জবাব না দিয়ে তারা চলে গেল।

এখানে এসে অব্দি দেখতে পাচ্ছি শৈশবকে জাঁতায় পেশা হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। এ সব দেখে মিস্টার প্রধানের প্রতি শ্রদ্ধা ও অশ্রদ্ধা দু’দিকের পাল্লাই সমান হয়ে উঠেছে আমার মনে। এ সব এখানে দেখার প্রত্যাশা আমি করিনি।

৫০০ গ্রাম মুরগির মাংসের বার্বিকিউ করা হয়েছিল। দু-এক পিস করে খেয়ে ক্যাম্পফায়ারে ইতি টানলাম টেনে দিলাম। সাড়ে ৯টা বাজে। আমাদের পাশের ছেলেমেয়েগুলো তখনও জঠরে তরল ঢেলে চলেছে। কথা জড়িয়ে গিয়েছে কিন্তু হাত সাবলীল। মদবিহীন আমাদের ক্যাম্পফায়ার নেহাত মন্দ হয়নি। আজকের এই সন্ধ্যা আমাদের বহু দিন মনে থাকবে।

কাল সকালে এখান থেকে চলে যাব। কিন্তু এই একটা দিন আমাদের যেন অনেক কিছু দিয়ে গেল। জীবনে আর কখনও এখানে আসব কিনা জানি না তবে ভবিষ্যতে রিশিখোলার কী হাল হতে চলেছে সেটা অনুমান করে আজ আমরা গর্ব করতেই পারি। কারণ আমরা যা দেখলাম আগামী দিনে রিশিখোলার এই রূপ আর কেউ দেখবে না। (চলবে)

ছবি লেখক

0 Comments
Share
eastern-himalaya-tour-operators-advise-to-avoid-night-travel

কলকাতা : সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে পাহাড়-পর্যটনে সুরক্ষার দিকটিকে। পাহাড়ে ভ্রমণের সময় কী করা উচিত, আর কী করা উচিত নয় সে সম্পর্কে পর্যটকদের সতর্ক করার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে হোমস্টেগুলিকেও কাজে লাগানোর কথা ভাবা হচ্ছে।

গত সোমবার রাতে পশ্চিম সিকিমের তিনজেরবঙ্গিনে হাজার ফুট গভীর খাদে একটি গাড়ি পড়ে গিয়ে কলকাতার পাঁচ পর্যটক মারা যান। পুলিশ পরে জানায়, পর্যটকরা রাতে ভ্রমণ করছিলেন। গাড়ির চালক বাঁকের মুখে একটি গাড়িকে ওভারটেক করতে গেলে গাড়িটি খাদে পড়ে জায়।

ইস্টার্ন হিমালয় ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশনের এক্সিকিউটিভ প্রেসিডেন্ট তুষার ঘোষ বলেন, দুর্ঘটনা আটকানোর জন্য সব রকম ব্যবস্থা সম্পর্কে সকলে সজাগ থাকুন। অনেকেরই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অর্জনের ইচ্ছা থাকে। অনেকে রাত্রে পাহাড়ের পথে যাত্রা করেন। এই ব্যাপারটা খুবই বিপজ্জনক। এখন পাহাড়ের আনাচেকানাচে প্রচুর হোমস্টে হয়েছে। অতএব রাত কাটানোর কোনো  অসুবিধা নেই। সুতরাং ঝুঁকি নিয়ে রাতে পাহাড়ি পথে ভ্রমণ না করাই ভালো।

অনেক পর্যটক থাকেন যাঁরা কোনো পর্যটন সংস্থার মারফত আসেন না। তাঁরা নিজেদের মতো করে ঘুরতে পছন্দ করেন। সে ক্ষেত্রে সতর্কতা অনেক বেশি জরুরি। কারণ তাঁরা স্থানীয় গাড়ি ভাড়া করে স্থানীয় চালক নিয়ে পাহাড়ে পাড়ি দেন।

আরও পড়ুন উত্তরবঙ্গের পর্যটকদের জন্য সুখবর, বিশেষ প্যাকেজে গ্যাংটক নিয়ে যাচ্ছে এনবিএসটিসি

হিমালয়ান হোমস্টে ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক প্রশান্ত প্রধান বলেন, পর্যটকদের অনুরোধ করা হচ্ছে দিনের আলো পড়ে গেলে তাঁরা যেন আর পাহাড়ি পথে গাড়ি নিয়ে না বেরোন। তাঁরাই অনুমোদিত পর্যটক সংস্থা আর গাড়ি চালকদের যোগাযোগের নম্বর সরবরাহ করবেন। যাঁরা পাহাড়ি জায়গা আর পাহাড়ে গাড়ি চালানোর বিষয়ে অভিজ্ঞ। পাহাড়ের খাঁজ, বাঁক খুব ভালো করে চেনেন, জানেন। তাতে পর্যটকরাই নিরাপদে থাকবেন।

মিরিকের একটি হোমস্টের মালিক সোনাম রাই বলেন, পর্যটকরা যাতে সন্ধের পর না বেরোন, তার জন্য সন্ধ্যায় নানা রকম অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কী করবেন আর কী করবেন তা দেখে নেওয়া যাক এক ঝলকে —–

১) সূর্যাস্তের পর পাহাড়ি পথে গাড়ি চালাবেন না।

২) পাহাড়ি পথে গাড়ি চালানোর আগে চালককে যথেষ্ট পরিমাণ বিশ্রাম দিতে হবে।

৩) গাড়ির বোঝা বাড়াবেন না।

৪) পর্যটন সংস্থার মারফত ঘুরতে গেলে একটি অনুমোদিত ওপিটি নিয়ে রাখতে হবে।

৫) পাহাড়ি পথে গাড়ি নিয়ে ঘুরলে অভিজ্ঞ চালক নিয়ে ঘুরবেন।

৬) গাড়িটি সম্পূর্ণ ভালো অবস্থায় থাকতে হবে। আলো বা যে কোনো যন্ত্রাংশ ঠিক থাকতে হবে।

0 Comments
Share
kolkata-sikkim-flights-before-puja

কলকাতা: মাস ছয়েক হল খুলে গিয়েছে সিকিমের প্রথম বিমানবন্দর। এ বার সেই পেকং বিমানবন্দর থেকে সরাসরি কলকাতার উড়ান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। বেসরকারি বিমানসংস্থা স্পাইসজেট জানিয়েছে আগামী ৪ অক্টোবর থেকে কলকাতা-পেকং উড়ান চালাবে তারা। সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী পবন চামলিংকে পাশে বসিয়ে একটি বিবৃতির মধ্যে এই ঘোষণা করে স্পাইসজেট।

প্রতি দিনই কলকাতা এবং পেকং-এর মধ্যে একটি করে উড়ান চালাবে তারা। ১৬ অক্টোবর থেকে পেকং-এর সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যাবে গুয়াহাটিও। এই দুটি রুটে ‘বম্বাডিয়ার কিউ-৪০০’ বিমান নামাবে তারা।

আরও পড়ুন পেলিং-সাঙ্গাচোলিং রোপওয়ে, মৈনাম পাহাড়ে স্কাইওয়াক, পর্যটন প্রসারে সিকিমের নানা উদ্যোগ

প্রতি দিন সকাল সাড়ে ন’টায় কলকাতা থেকে পেকং-এর উদ্দেশে উড়বে স্পাইসজেটের ‘এসজি ৩৩২৪’ উড়ানটি। অন্য দিকে গুয়াহাটি থেকে ‘এসজি ৩৩২৫’ উড়ান উড়বে প্রতি দিন সকাল সওয়া এগারোটা থেকে।

দেশের একশোতম বিমানবন্দর হিসেবে গত মার্চে এই বিমানবন্দর খুলে গেলেও যাত্রীবাহী বিমান ওঠানামার অনুমতি মেলে মে মাসে। সিকিমই ভারতের একমাত্র রাজ্য ছিল যেখানে কোনো বিমানবন্দর ছিল না।

0 Comments
Share
a-trip-to-sikkims-okhre-hilley-varsey
avijit chatterjee
অভিজিৎ চ্যাটার্জি

ছোট্টবেলা থেকে মা-বাবার সঙ্গে কোলে চেপে, হাত ধরে, প্রচুর ভ্ৰমণ করেছি। যাওয়ার আগে তোড়জোড়, প্যাকিং করা থেকেই মনটা ঘুরতে শুরু করে দেয়। অনিন্দ্যকাকুরা, মানসকাকুরা আর আমরা সাত জন য্খন একেএকে সকলে শিয়ালদহ স্টেশনে এসে পোঁছোলাম মনটা আমার এ বার ভাসতে শুরু করে দিল।

এ বারের বেড়ানোয় আমার একটা অন্য ভূমিকা আছে আর সেটা হল এ বার বেড়ানোর গল্পটা বাবা আমায় বলতে দিয়েছে। যে হেতু সামনের বছর আমি ভোট দেব তাই আমি আর এখন ছোটো নই, ফলে আমার গল্পতে একটু ‘অ্যাডাল্ট’ গন্ধ থাকতে পারে! সেটা আগেই বলে নেওয়া ভালো।

দাৰ্জিলিং মেলের পাশাপাশি দু’টি কূপের একটিতে আমরা চার জন মহিলা আর অন্যটাতে বাবা আর কাকুরা মিলে তিন জন থিতু হতেই খাওয়া আর গল্প শুরু। এর মধ্যে জানলার বাইরে তাকাতেই চোখ পড়ল গোল চাঁদের দিকে, পরশু দোলপূর্ণিমা! রূপ যেন ফেটে পড়ছে! কেমন যেন ঘোর লেগে গেল। তার পর ট্রেনের এক টানা ঝমঝম শব্দে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম কে জানে!

mt. kanchanjangha
ভার্সে থেকে সূর্যোদয়।

সকালে ফ্রেশ হয়ে সিকিমের বইটা খুললাম। একটা লাইনে চোখ আটকে গেলো “উদ্ধত যত শাখার শিখরে রডোডেনড্রনগুচ্ছ” আরে এ তো শেষের কবিতার লাইন! অমিত, লাবণ্য আর রডোডেনড্রন, ভাবতে ভাবতে দেখি এনজেপি পৌঁছে গেছি। এই স্টেশনটায় এলে প্রতি বারই কেমন যেন একটা পাহাড় পাহাড় গন্ধ পাই। এ বারেও তাই, কারণ গাড়িতে উঠে বাবা বলল এ বারে আমাদের গন্তব্য সিকিম পাহাড়ে প্রকৃতির কোলে “নিঃশব্দ সংগীতের আখড়া” ওখরে, সেখান থেকে  হিলে-ভার্সে।

কিছুক্ষণ পরেই থামলাম তিস্তার ধারে এক চায়ের দোকানে। গিয়ে দাঁড়ালাম আমার বহু পরিচিত তিস্তার পাড়ে। কিন্তু পাহাড়ের বাঁকে বয়ে চলা সেই একই তিস্তা দেখে এ বারে মনের মধ্যে কেন জানি না, শিরশির করে উঠল! বুঝতে পারলাম না! মনে হল, সে যেন সমবয়সি আমারই এক চপলা সখী। মানসকাকু গুনগুন করে উঠল, “মেঘ পিওনের ব্যাগের ভেতর মনখারাপের তিস্তা”! 

কিছুক্ষণের মধ্যেই গেট পেরিয়ে সিকিমে ঢুকে পড়লাম। এ বারে আমার মোবাইলে গুগুল ম্যাপ! তাই দেখেই আমি নেভিগেট করছি আমাদের দলকে। সেই দেখেই আমি বুঝলাম, যে শিলিগুড়ি থেকে অলরেডি ৮৪ কিলোমিটার দূরে চলে এসেছি, জোড়থাংএ। দেখা পেলাম রঙ্গীত নদীর।  ওখরে আরও ৫৪ কিলোমিটার!

অপরূপ সেই পাহাড়ি রাস্তা, বাঁকের পর বাঁক। শীত-ঘুমের পর পাহাড় সেজে উঠছে নানা রঙের ফুলে, ছোটো ছোটো বাড়িগুলোতেও নানা ফুলের সমারোহ। যেন “আজি বসন্ত এসেছে বনে বনে।”

এসে গেলাম সোমবাড়িয়া। এটা একটু জমজমাট জায়গা, দোকানপাট বেশ কিছু আছে। এখান থেকেই ডান দিকে গিয়েছে কালুক হয়ে রিনচেনপং যাওয়ার রাস্তা।

অবশেষে চলে এলাম আমাদের আজকের গন্তব্য ‘ওখরে’। ওখরের হোমস্টেতে দাঁড়িয়ে মনে হল যেন পৃথিবীর শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছি! অনেক চলার পরে এ যেন দু’ দণ্ড বিশ্রামের আর নিশ্চিন্ত ঘুমের এক আদর্শ জায়গা! জিনিসপত্র রেখে, লাঞ্চ সেরে বেরিয়ে পড়লাম, একটু আশপাশ ঘুরে দেখতে, ‘রেইকি’ করা যাকে বলে, আর কী! ঠান্ডাটা বেশ মালুম হচ্ছে। জনপ্রিয়তা যদি গুণমানের মাপকাঠি হয়, ওখরে কিন্তু আম-ভ্রামণিদের হতাশ করবে। সাইটসিয়িং সত্যি বলতে তেমন কিছুই নেই, তবে ঘন নীল আকাশ, কনকনে কড়া শীত, ঝলমলে নরম রোদ আর উত্তুরে হাওয়াকে, যদি সঠিক পরিমাণে মেশাতে পারেন, তবেই ওখরে-কে আন্দাজ করতে পারবেন! হরেক রকম পাখি আর যে দিকে তাকাও রক্তবর্ণ রডোডেনড্রন।

bunch of flowers
কত না রঙবাহারি ফুলের মেলা।

আমরা কয়েকটি প্রাণী ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছি, প্রাণ ভরে উপভোগ করছি প্রকৃতির এই মৌন মুখরতা। কে যেন গুনগুন করছে রবীন্দ্রসংগীতের কলি, শুনে শিরিশির করে উঠল শরীর, শীতের জন্যই বোধহয়, নাকি অন্য কিছু!

বাবারা, ক’জন চা খাবার ছুতো তুলল। সামনেই এক চায়ের ঠেক – একাধারে মুদি, স্টেশনারি, রেস্টুরেন্ট আবার হোমস্টে। আমরা সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠলাম, ওখানেই চা সার্ভ করা হবে। ধূমায়িত পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে হঠাৎ আমাদের চোখ আটকে গেল পশ্চিমাকাশে। সেখানে চলছে সূর্যাস্তের রঙের খেলা! কে যেন রং তুলি নিয়ে আকাশের ক্যানভাসে এঁকে দিচ্ছে এক অপার্থিব ছবি! আগামী কালের দোলের পূর্বাভাস হবে হয়তো! নিঃশব্দ প্রকৃতিতে, গম্ভীর পাহাড়ের উপস্থিতি এক অন্য মাত্রা যোগ করেছে, আমরা যাকে বলে ‘স্পেল বাউন্ড’!

পাহাড়ে সন্ধ্যা নামা দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। ছোট্ট বাটির মতো উপত্যকায় সূর্য ঢলে গেলেই ঝুপ করে নেমে আসে অন্ধকার। তার সঙ্গে জাঁকিয়ে বসে শীত। আমরা তাড়াতাড়ি পা চালালাম আমাদের ডেরার দিকে।

বাবার প্রস্তাবনায় আমাদের হোমস্টের মালকিন, আন্টি, লজের লনে এক ট্রাইবাল ডান্সের আয়োজন করে ফেললেন। আশেপাশের কয়েক জন কিশোর-কিশোরী সেজেগুজে হাজির। ঝলমলে আদিবাসী পোশাক। স্বচ্ছ পবিত্র, যেন দেবকন্যা! আগুন জ্বালানো হল। শুরু হল নাচ। ভাষা না জানা থাকায় গানের অন্তর্নিহিত অর্থ না বুঝলেও সুরে এক আশ্চর্য মাদকতা আছে! চলে এল বারবিকিউ চিকেন, পনির ইত্যাদি। আমরা চেয়ার নিয়ে গোল করে ঘিরে বসে আছি। আমি আর পারলাম না, যোগ দিলাম ওদের সঙ্গে! দেখি আরও কয়েক জন পা মেলাচ্ছে আমাদের সঙ্গে!

এর মধ্যে দেখি আস্তে আস্তে মেঘ-কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে চারি দিক, এ এক অদ্ভুত দৃশ্য। এসে গেল ডিনারের ডাক! খাওয়ার পর হি-হি ঠান্ডায় আশ্রয় নিলাম গোটা দুয়েক লেপের মধ্যে!

ভোরে ঘুম ভাঙল, বাবার চালানো রবীন্দ্রসংগীতের আওয়াজে। ঘুম ভেঙে যাওয়ার বিরক্তি নিয়ে বাইরে বের হতেই সব রাগ যে কোথায় চলে গেল। দেখি প্রকৃতির অঢেল সৌন্দর্য, অপেক্ষা করে আছে আমাকে আনন্দ দেওয়ার জন্য যেন শুধু আমারই জন্য! দেখি সকলেই উঠে পড়ে আস্বাদন করছে, ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামটার ভোরের রূপ। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম সামনের রাস্তা দিয়ে। রং বেরঙের ফুলের আসর, কত নাম না জানা পাখির কুজন আর তারই প্রেক্ষাপটে নতুন সূর্যের নরম আলো, আমাকে এক অন্য আবেশে ভরিয়ে দিল। ভারতবর্ষের এই পরিচয়, ক’জন বিদেশি জানেন! “ভারত আমার ভারতবর্ষ, স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো”!

on the way to school
স্কুলের পথে।

ইতিমধ্যেই হাতে গরম চায়ের কাপ এসে গিয়েছে। সামনেই একটা স্কুল। ছেলেমেয়েরা আস্তে শুরু করেছে। চা শেষ করেই আমি ওদের সঙ্গে পা মেলালাম, আমিও ঢুকে পড়লাম ভিতরে। ওদের প্রেয়ার, ক্লাসরুমে পড়াশোনা, এ সব দেখতে দেখতে ফিরে গেলাম নিজের ছোটোবেলার দিনগুলোতে।

আজ আমাদের যাওয়ার কথা ভার্সে। গরম আলুপরোটা আর আরেক প্রস্থ চা দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরেই উঠে পড়লুম গাড়িতে। ড্রাইভারকাকু বলল, ওখরে থেকে ১০ কিলোমিটার গেলে হিলে। ওখান থেকে ফরেস্ট পারমিট করিয়ে তবে যেতে হবে ৪ কিলোমিটার ট্রেক করে, ভার্সে। মায়ের কাছে জানতে পারলাম ভারতের একমাত্র রডোডেনড্রন অভয়ারণ্য সিকিমের এই ভার্সতেই। আরও জানলাম ভার্সে নামটা এসেছে লেপচা শব্দ ‘বার্সে’ থেকে। এর মানে ‘বর্ষা’।

colourful flowers on trek path
রডোডেনড্রনের বাহার।

হিলে যাওয়ার রাস্তাটা অনবদ্য, দু’ পাশে রোডোডেন্ড্রনের জঙ্গল – বিভিন্ন প্রজাতির নানা রঙের! যখন লাল তো, তখন যেন আবির ছড়ানো বা কখনো সাদা বা পিঙ্ক। হিলে পৌঁছে গেট পেরিয়ে ঢুকে পড়লুম স্যাংচুয়ারির মধ্যে, এই বনপথই চলে গেছে ভার্সে। ওক, পাইন, ফার, জুনিপার, ধুপি, বহু রংয়ের বাঁশ, ফার্ন ও নানা অজানা প্রজাতির গাছের সমারোহ এই জঙ্গল। কয়েকশো বছরের ওক গাছ গুলোকে দেখে মনে হয় যেন ভূত দাঁড়িয়ে আছে। নানা ধরনের রোডোডেন্ড্রন তো আছেই, তার সঙ্গে আছে বহু বর্ণের গোলাপ অর্কিডের ধ্রুপদ যুগলবন্দি। এ ছাড়া এঞ্জেলিয়া, ধুতরা, আমন্ড লিলি, কসমস, প্রিমুলা প্রচুর পরিমাণে ফুটে আছে। আর আছে পথের ধারে অযত্নে ফুটে থাকা কত নাম না জানা সুন্দর ফুল বোধহয় আমার পথচলাকে মনোরম করে তুলতে। অসম্ভব সুন্দর এই দৃশ্য। গাছ ভর্তি ফুটে থাকা লাল ম্যাংগোলিয়া আর লাল, সাদা গোলাপি রডোডেনড্রন এর সমারোহ। এ যেন এক নন্দনকানন! এই ফুলের জলসায়, নিজেকে মনে হচ্ছিল এক অনাহুত অতিথি। গাইড বলল, স্থানীয় ভাষায় রডোডেনড্রনকে বলে ‘গুরাস’। এই অভয়ারণ্য আবার বিলুপ্ত প্রায় রেড পান্ডার বাসভূমি। কালো ভালুকের দেখা মেলে কখনও সখনও।

resting place on trek path
ভার্সের ট্রেক পথে বসার জায়গা।

শুকনো পাতা মাড়িয়ে বা বুনো ফুলের ঝোপ সরিয়ে হেঁটে চললাম। মাঝে মাঝে কুয়াশা এসে পথ ঢেকে দিচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন মেঘের ওপর দিয়ে হাঁটছি। যত ভিতরে ঢুকছি গাছপালাগুলো যেন আরও আমায় জড়িয়ে ধরছে আর ফিসফিস করে বলছে, আরও গভীরে, আরও গভীরে যাও! পথের আকর্ষণে আর ফুলের গন্ধে নিজেকে শীঘ্রই হারিয়ে ফেললুম। পথে ১ কিলোমিটার বাদে বাদে বসার বেঞ্চ। একাকী বেঞ্চটাকে দেখে মনে হল, যেন আমায় বলছে “একটু বসে যাও, দু’টো কথা বলে যাও! সত্যি একাকিত্বের কী দুঃখ!

অবশেষে গিয়ে পৌঁছোলাম ওপরে। এখানের একমাত্র থাকার জায়গা গুরাস কুঞ্জ। কী দারুন লোকেশন! সামনে খোলা হিমালয়। কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মেলে এখান থেকে।

ফিরে এসে ঘোর কাটল। জীবনের প্রথম ট্রেক। মনে মনে এই ট্রেকটার নাম দিলাম “Hungry Eye Avenue”..যত হাঁটছিলাম চোখে দেখার খিদে তত বেড়ে যাচ্ছিল। লাল গুরাসের জঙ্গল আমাকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে পথের ক্লান্তির কথা বুঝতেই পারিনি।

ওখরে ফিরে আবার ইতস্তত ঘোরাফেরা। বাবা জানাল, সোমবাড়িয়ার কাছে ‘এন্ডেন’, যাওয়ার রাস্তাটা নাকি অসাধারণ। সবাই এক কথায় রাজি। চলো ওখানে – অসাধারণ শান্তির রাস্তা!  আমরা সবাই গাড়ি ছেড়ে, একটু হাঁটলাম! নিঃশব্দতা একেই বলে – নিঃশব্দতার মধ্যে কেবল পাখির ডাক আর আমাদের কলকলানি। দু’ দণ্ড দাঁড়ালাম! বসেও পড়লাম পথের ধারে! মনের মধ্যে কে যেন গেয়ে উঠল আমার প্রিয় এক গানের কলি “আমি তুমি আজ একাকার হয়ে মিশেছি আলোর বৃত্তে”!

মুগ্ধ নয়নে বসে থাকতে ইচ্ছা করছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা! আবার কেন, মনের কোণে উঁকি দিচ্ছে অমিত-লাবণ্যর কথা!

অনিন্দ্যকাকু টিপ্পনি কাটল, “কী! রে! Honeymoon Spot টা fixed করে ফেললি নাকি”!

‘যত অলিগলি আকুলি বিকুলি এই পথ চলা কতদুর..

আগুনের আঁচে, আনাচে কানাচে তুমি আর আমি রোদ্দুর,

তুমি আমি তিন সত্যি হয়ে, বাকি সব আজ মিথ্যে!

মম চিত্তে হৃতি নৃত্যে..

মেঘের পালক চাঁদের নোলক কাগজের খেয়া ভাসছে!

guras kunj
গুরাস কুঞ্জ।
প্রয়োজনীয় তথ্য

নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে ওখরে ১২৯ কিমি। আমরা ছিলাম ‘দাওলাকি হোমস্টে’তে (ফোন -০৯৭৩৩২০২৯১৫)। এ ছাড়াও আরও হোমস্টে আছে ওখরে’তে। ভার্সেতে থাকার জন্য আছে ‘গুরাস কুঞ্জ’, ওদের ওয়েবসাইট (http://guraskunj.weebly.com)। লগইন করুন পেয়ে যাবেন সব তথ্য।

ছবি: লেখক

0 Comments
Share