Browsing Category:ভ্রমণ কাহিনি

a-trip-to-garhwal-part-1-snow-covered-badrinayh
ashok ghosh
অশোক কুমার ঘোষ

গিন্নির বড়ো দুঃখ, কেদার-বদরী দর্শন হল না। অতীতে তিনি অমরনাথ এবং হর-কি-দুন গিয়েছেন ট্রেকিং করেই, কিন্তু এখন হাঁটু সহযোগিতা করবে না কেদারনাথের চড়াইয়ের সঙ্গে। সহধর্মিনীর দুঃখ লাঘবের জন্য ঘোলের প্রস্তাব দে‌ওয়া হল দুধের বদলে। সিদ্ধান্ত গৃহীত হল বদরীনাথের পাশাপাশি প‍‌ঞ্চম কেদার কল্পেশ্বর, তৎসহ কার্তিকস্বামী ইত্যাদি দর্শনের। আমরা দু’ জন এবং অনুজ বন্ধু অনুপমদের তিন জন, এই পঞ্চপাণ্ডবের দল রওনা হলাম। হরিদ্বার থেকে গাড়িতে জোশীমঠ, বদরীনাথদেবের শীতকালীন আবাস।

৩ নভেম্বর। চলছে টিপটিপ বৃষ্টি। তারই মধ্যে সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ রওনা জোশীমঠ থেকে। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টির মুষলধার রূপ। অলকানন্দা পার হয়ে কিছুটা যাওয়ার পর চোখে পড়ল বদরীনাথ থেকে নামা গাড়ির ছাদে এবং উইন্ডশিল্ডে বরফ, অতএব প্রমাণিত বদরীনাথে বরফ। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের যাত্রাপথে তুষারপাত শুরু। আমাদের আনন্দ দেখে কে! জানলার কাচ নামিয়ে ছবি তোলার হুড়োহুড়ি।

আরও পড়ুন কুমারী সৈকত চাঁদপুরে একটা দিন

তুষারপাতের মধ্য দিয়ে চলেছি আমরা, পথের পাশে গাছে গাছে বরফের আস্তরণ। রাস্তার ওপরের বরফ শক্ত হতে শুরু করায় গাড়ির চাকা স্কিড করতে লাগল। গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। ওপর থেকে একটা বড়ো ট্রাক নীচে নামার ফলে যে চওড়া চাকার দাগ তৈরি হল, সেই দাগে চাকা ফেলে আমাদের গাড়ি চলল এগিয়ে।

অবশেষে বদরীনাথ। বরফ ঠেলে ভারত সেবাশ্রম সংঘ বিনোদ ভিউ। সেখানকার বারান্দাও তুষারাবৃত। কিছুক্ষণ পরে তুষারপাতের মধ্যেই ছাতা আর পঞ্চু চাপিয়ে প্রায় এক ফুট নরম বরফ ঠেলে মধ্যাহ্নভোজ সেরে আসা হল। তুষারপাতের বিরাম নেই। চারপাশ ঘোলাটে। বরফের ভারে গাছের ডালপালা নুয়ে পড়েছে। আমরা বাধ্য হয়ে ঘরবন্দি। বিকেলে বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন। অন্ধকারের মধ্যেই ভক্তি মহারাজের বৈরাগ্যআলেখ্য শোনা হল। রসিক ব্যক্তি, নিজেকে নিয়ে মজা করতে পারেন।

তুষারপাত বেড়েছে, তারই সঙ্গে বেড়েছে হাওয়ার দাপট‌ও। চার পাশের অন্ধকার, তাই তুষারের ধারাপাত স্পষ্ট। জেনারেটারের কারণে শুধুমাত্র বদরীনাথ মন্দির আলোকসজ্জায় সুসজ্জিত। সকালের আনন্দভাবের ওপর ধীরে ধীরে চিন্তার প্রলেপ পড়তে শুরু করেছে। একে অন্ধকার, তায় অবিরাম বরফবৃষ্টি। তাই বাইরে খেতে যাওয়া নাকচ হল। নৈশভোজ সারা হল সঙ্গের চিঁড়ে ভাজা আর খেজুর দিয়ে। আমাদের থার্মোমিটারে -৬ সেলসিয়াস। গরম জামাকাপড় গায়ে চাপিয়ে লেপ কম্বলের নীচে। কানে আসছে একটা ঝরনার আওয়াজ, সঙ্গে অলকানন্দার প্রবাহের শব্দ।                           

badrinath temple
বদরীনাথ।

ভোররাত্রে ধুপধাপ আওয়াজ। হয়তো বরফের চাঙড় খসে পড়ছে। তাড়াতাড়ি উঠেই বা কী হবে? থাকতে তো হবে ঘরবন্দি। দরজার নীচে দিয়ে ঢোকা আলো দেখে বাইরে এসে তাজ্জব। হাই ফোকস্! ইট্‌স আ ব্রাইট ডে। সবাই বাইরে। ছবি তোলার ধুম। ঝকঝক করছে চার পাশ। রোদ এসে পড়েছে পাহাড়ের এক দিকে। বদরীনাথ মন্দির পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। এক জন বাড়ির ছাদে উঠে থালায় করে বরফ পরিষ্কার করছেন। মন্দিরচত্বরে লোকজনের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে এখানকার বারান্দা থেকেই। আমরাও র‌ওনা দিলাম।

কিছু কিছু বরফ গলে পথ পিচ্ছিল। অতি সাবধানে পদচারণা করতে হচ্ছে। বেলচা দিয়ে বরফ সরানো হচ্ছে। অলকানন্দার ওপর যে ব্রিজ, তাতেও বরফ। অবশেষে বদরীনাথ দর্শন। মন্দির প্রায় খালি। বদরীনাথজি ভালো দর্শন দিলেন। মাথায় রত্নখচিত মুকুট অথচ দেখতে কী মায়াময়। মায়াবী, সংবেদনশীল দৃষ্টিতে দেখছেন। মনের থলি ভরে নিয়ে মন্দির প্রদক্ষিণ ক‍রে বাইরে আসতেই দেখি, দর্শনার্থী সমাগম বেশ হয়েছে, তার সঙ্গে হাজির পেশাদার আলোকচিত্রীর দল। ঝকঝকে রোদে চার পাশ ঝলমল করছে। হলুদ ঠোঁট চাও ওড়াউড়ি করছে। আমরাও মন্দির থেকে ফেরার পথ ধরলাম।

আরও পড়ুন বিশ্বনাথের বারাণসী, বারাণসীর বিসমিল্লাহ

একটি গাড়িও র‌ওনা দিল, কিন্তু যেতে পারল না বিশেষ। বদরীনাথ ঢোকা-বেরোনোর চৌকিতে আটকে দেওয়া হল, রাস্তা চলাচলের উপযুক্ত না হ‌ওয়ায়। ষোলো ঘণ্টার অবিরাম তুষারপাতের ফলে জায়গায় জায়গায় দু’ ফুট তুষারের আস্তরণ।

ঘরবন্দি হয়ে থাকতে আর ভালো লাগছে না, বিকেলে পায়চারি করতে বেরোলাম। মাথার ওপর হেলিকপ্টারের চক্কর। অনুপম বলল, “রিপোর্টার”। সেটা যে ভুল তা বুঝেছিলাম পরের দিন। যা-ই হোক বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে একেবারে মন্দিরচত্বরে, দর্শনার্থীদের লম্বা লাইন। সকালের মতো আর ফাঁকা নেই। মন্দিরের বাঁহাতি রাস্তা ধরে চলতে লাগলাম চরণপাদুকার দিকে। দু’ পাশের দোকানগুলোর ছাদ থেকে বরফগলা জল টপ টপ করে পড়ছে। রাস্তায় বরফকুচি আর জলের কাদা। সাবধানে চলতে হচ্ছে। চরণপাদুকার দিকে ওঠার সিঁড়ি বরফে ভর্তি। স্থানীয় একজন উঠতে বারণ করলেন। উঠতে পারলে‌ও নামা কঠিন হবে। অগত্যা ফিরতি-পথ। অলকানন্দার ওপর সাঁকো পার হতেই চোখে পড়ল এক সাধু তাঁর ক্রাচ দিয়ে বসার বেঞ্চ থেকে বরফ সরাচ্ছেন। একটা জলুস আসছে বাজনা বাজিয়ে। এক আঞ্চলিক গ্রাম্য দেবতাকে আনা হচ্ছে বদরীনাথ দর্শনের জন্য। ছবি তুলতে গিয়ে দেখি চার্জ শেষ। গতকাল থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই পাওয়ার ফল্টের কারণে।

first sunrays on neelkantha peak
নীলকণ্ঠ শিখরে প্রথম সূর্যকিরণ।

পরের দিন সকালে ঠিক হল ফিরতি পথে র‌ওনা হ‌ওয়ার আগে চেষ্টা হবে মানা গ্রামে যাওয়ার। জানা গেল রাস্তা খোলা। গাড়ির সামনের বরফ পরিষ্কার করতে হাত লাগাল অনুপম। বরফ পরিষ্কার করে মানা যাওয়ার রাস্তা গাড়ি চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। ফৌজি চৌকি থাকায় এই রাস্তার গুরুত্ব অপরিসীম। এই অঞ্চলে ভালো আলুচাষ হয়। এখন জমি ফাঁকা। জানা গেল, ইন্টারনেটের দৌলতে আগাম আবহা‌ওয়ার পূর্বাভাস পেয়ে চাষিরা আলু তুলে বিক্রি করে দিয়েছেন। সামরিক বাহিনীর ক্যাম্প পর্যন্ত‌ই রাস্তা পরিষ্কার। এর পর গাড়ি আর বেশি দূর এগোতে পারল না।

ফিরে আসার জন্য গাড়ি ব্যাক করতে লাগল। কিন্তু জমাট বরফে চাকা স্কিড করে একেবারে খাদের ধারে। সারথি বাপি চরম দক্ষতায় ব্রেক কষল। এর পর? গাড়ি চালু করলে চাকা বরফের উপর ঘুরে ঘুরে আর‌ও হড়কে যাবে। সারথি জানালেন, অন্তত পাঁচ জন যদি গাড়ি ঠেলতে পারে তবেই গাড়ি সোজা করা যাবে।  আমরা চললাম সামরিক ক্যাম্পের উদ্দেশে, ওঁদের সাহায্য যদি পাওয়া যায়, সেই আশায়। দেখা হয়ে গেল যমুনোত্রী থেকে আসা কয়েক জনের সঙ্গে। ওঁরাও চলেছেন মানাগ্রাম। ওঁরা রাজি হলেন। দলে আমরা সাত জন। প্রথমে গাড়ির সামনে থেকে ঠেলা, পরে পিছন থেকে ঠেলা। পা হড়কে যাচ্ছে, তবুও পরিশ্রম কাজে এল।             

আরও পড়ুন ওখরে-হিলে-ভার্সে, যেন মেঘ-বালিকার গল্প

বদরীনাথ ঢোকার চৌকিতে আটকে দেওয়া হল। নীচের রাস্তায় গলা জল রাত্রে জমে গিয়ে বিপজ্জনক অবস্থা। অ্যাক্সিডেন্টের আশঙ্কা প্রবল। রোদে বরফ গলে গেলে গাড়ি ছাড়া হবে। অগত্যা অপেক্ষা। নেমে পায়চারি করা ছাড়া উপায় নেই। হঠাৎ কিছু ব্যস্ততা চোখে পড়ল। একটা গাড়ি ছেড়ে দে‌ওয়া হল। যাত্রী মুকেশ আম্বানি। কিছুক্ষণ পর ওঁকে নিয়ে হেলিকপ্টার উড়ে গেল। গতকালের হেলিকপ্টার-রহস্যের সমাধান।

আবার অপেক্ষা। সকাল দশটা নাগাদ নীচে থেকে গাড়ি আসতে শুরু করল। স্থানীয় প্রশাসনের গাড়ি এসে সবুজ সংকেত দেওয়ার পর আমাদের যাত্রা শুরু হল। তুষারাবৃত বদরীনাথকে প্রণাম জানিয়ে এগিয়ে চললাম পরবর্তী গন্তব্যের দিকে। (চলবে)

ছবি: লেখক 

 

0 Comments
Share
the-mysterious-silk-route-last-part-returning-home-from-gangtok
sudip paul
সুদীপ পাল

গ্যাংটকের হোটেলে ঘরগুলো খুব সুন্দর পজিশনে ছিল। বড়ো বড়ো জানলা দিয়ে দূরের পাহাড় দেখা যায়। পরে জেনেছিলাম ওই পাহাড়েই বোনঝাকরি ফলস-সহ কিছু ট্যুরিস্ট স্পট আছে। যদিও জানলা দিয়ে বিশাল সবুজ পাহাড় ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। এমনকি পাহাড়ের গায়ে কোনো বাড়িঘরও দেখা যাচ্ছে না।

ঝটপট ব্যাগপত্র রেখে ঘরে তালা মেরে ডাইনিং হলে চলে এলাম। এখন ৩টে বাজে। খিদেয় পেট জ্বলছে। এই ট্যুরে এই প্রথম মাছ খেলাম। হোটেলের মালিক ও ম্যানেজার দু’জনেই বাঙালি, তাই বেশ একটা স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করছি।  খাওয়াপর্ব মিটে যাওয়ার পর ভূপালকে বিদায় জানানোর পালা। সত্যি এই ট্যুরে ও না থাকলে হয়তো ওই পথ পুরো কভার করে আসতে পারতাম না।

আরও পড়ুন রহস্যময় রেশম পথ / পর্ব ১০ : কুপুপ থেকে গ্যাংটক

ক্যালেন্ডারে দেখেছিলাম আজ বুদ্ধপূর্ণিমা। তাই ভেবেছিলাম, পুজোপাঠ ও উৎসব দেখার জন্য রুমটেক মনাস্টেরি যাব। কিন্তু হোটেল-মালিক কোথাও ফোন করার পর জানালেন, পূর্ণিমা আজ সকালেই ছেড়ে গিয়েছে। প্রোগ্রাম সব কাল ছিল, আজ কোনো প্রোগ্রাম নেই। মনটা দমে গেল।

MG marg in the evening
বৃষ্টিভেজা সন্ধের এম জি মার্গ।

হতচ্ছাড়া বৃষ্টি যেন পিছু ছাড়ে না। টিপ টিপ করে পড়ছে। বৃষ্টির মধ্যেই ছাতা চলে এলাম এমজি মার্গে। আলো ঝলমলে এমজি মার্গ, গ্যাংটকের ম্যাল। বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট, বসার জায়গা সব ভিজে গিয়েছে। রাস্তার দু’দিকে হরেক রকম সম্ভার নিয়ে সাজানোগোছানো প্রচুর দোকান। বৃষ্টির মধ্যেই রাস্তায় মানুষের ঢল। অধিকাংশই বাঙালি ট্যুরিস্ট। আমরাও সেই দলে মিশে গেলাম। দু’ ঘণ্টা হাঁটাহাঁটি করে পায়ের অবস্থা খারাপ। তাই ১০০ টাকা দিয়ে ট্যাক্সি ভাড়া করে হোটেলে ফিরে এলাম।

আমাদের কাররওই এটা প্রথম বার গ্যাংটকভ্রমণ নয়, জনপ্রিয় স্পটগুলো সবারই ঘোরা। অথচ কালকের পুরো দিনটা আমাদের হাতে। হোটেলবন্দি হয়ে থাকার কোনো মানেই হয় না। তাই অনেক মাথা ঘামিয়ে কালকের ভ্রমণসূচি বানালাম –  ইঞ্চে মনাস্ট্রি, দো দ্রুল চোর্তেন, গ্যাংটক ফ্লাওয়ার একজিবিশন সেন্টার আর ইনস্টিটিউট অফ টিবেটোলজি। রাতের খেতে যাওয়ার আগে ম্যানেজারকে দিয়ে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করলাম।

enchey monastery
ইঞ্চে মনাস্টেরি।

পরের দিন ৯টার মধ্যে স্নান সেরে প্রাতরাশ সারা। গাড়ি সময়মতো চলে এসেছে। আমাদের প্রথম গন্তব্য আপার গ্যাংটকে, ইঞ্চে মনাস্টেরিতে।

আপার গ্যাংটক অভিজাত এলাকা। মন্ত্রী থেকে শুরু করে বড়ো বড়ো সরকারি পদাধিকারীরা এখানে থাকেন। জায়গাটাও বেশ সুন্দর। রাস্তার ধারে পাইন গাছের সারি। এ সব দেখতে দেখতে চলে এলাম ইঞ্চে মনাস্টেরি। নানা রঙের তিব্বতি কলকা ফটকে। গাছপালায় ঢাকা পথ ধরে অনেকটা হেঁটে যেতে হয়। হেঁটে যাওয়ার পথে বাঁ দিকের মনোমুগ্ধকর নিসর্গ দেখা যায়। তবে যে হারে ঘরবাড়ি তৈরি হচ্ছে, এ দৃশ্য আর কত দিন দেখা যাবে জানি না।

view from enchey monastery
ইঞ্চে মনাস্টেরি থেকে।

১৮৪০ সালে তিব্বতি লামা দ্রুপথ্রব কার্পো এই গুম্ফাটি নির্মাণ করেন। শোনা যায় তিনি দৈবক্ষমতা বলে উড়তে পারতেন। এর পর ১৯০৮ সালে তখনকার ১০ম রাজা সিকিয়ং টুলকু এই গুম্ফার পুনর্নির্মাণ করেন। সিকিয়ং টুলকু গুম্ফার যে রূপ দান করেন আমরা এখন সেটাই দেখতে পাই। পথের দু’ পাশেই রঙিন প্রার্থনাপতাকা ও প্রার্থনাচক্র সারিবদ্ধ ভাবে লাগানো আছে। ডান দিকের চক্র ঘোরাতে ঘোরাতে মনাস্টেরিতে  যেতে হয় এবং বিপরীত দিকের চক্রগুলো ঘোরাতে ঘোরাতে ফিরতে হয়।

বেশ বড়ো গুম্ফা। জুতো খুলে সাত ধাপ সিঁড়ি বেয়ে ভিতরে ঢুকলাম। বিশাল বুদ্ধমূর্তি মুর্তি। ভিতরে চলার পথের দু’ পাশে পাঁচ জন করে মোট দশ জন সন্ন্যাসী মুখোমুখি বসে মন্ত্রপাঠ করছেন। তাঁদের মন্ত্রোচ্চারণের সুর মুগ্ধ হয়ে বসে শুনতে হয়। এত সুন্দর ছন্দ আমি কখনও শুনেছি বলে মনে পড়ে না। তন্ময় হয়ে ধীর পায়ে তাঁদের সামনে দিয়ে মূর্তির কাছে এলাম। তিব্বতি কারুকার্য করা বেদিতে অনেক বাতি জ্বলছে। প্রচুর ফুল দিয়ে সাজানো। ভিতরের দেওয়ালেও তিব্বতি কারুকার্য। মন্ত্রোচ্চারণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনলাম। তার পর বেরিয়ে এলাম। কানে তখনও বাজছে সেই সুর। কয়েকটা মিনিট মনের আবহই পালটে দিল।

 flower exhibition centre
ফ্লাওয়ার একজিবিশন সেন্টার।

এ বারের গন্তব্য গ্যাংটক ফ্লাওয়ার একজিবিশন সেন্টার। টিকিট কেটে প্রবেশ। ভিতরে ঢুকেই চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। কত রকমের কত ফুল রে ভাই! কলকাতায় শীতকালে কিছু পুষ্পপ্রদর্শনী দেখেছি, কিন্তু এত ফুলের সমাহার দেখিনি। চতুর্দিক আলো করে আছে বিভিন্ন রঙের ফুল। আমরা যেন ফুল বাগিচার মৌমাছি । কোন দিকে কোন ফুলের কাছে যাব তা যেন ঠিক করতে পারছি না।

 flower exhibition centre 2
ফুলের জলসা।

ঘন্টা খানেক ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়িয়ে বেরিয়ে এলাম। কিন্তু গাড়ি কথায় গেল? সারথিকে ফোন করে জানলাম গাড়ি যেখানে আছে সেখানে যেতে আমাদের হাফ কিমি হাঁটতে হবে। গ্যাংটকের ট্র্যাফিক পুলিশ বেশ কড়া। রাস্তার ধারে ফাঁকা জায়গা রয়েছে। তা সত্ত্বেও পার্কিং-এ গাড়ি রাখা বাধ্যতামূলক। হাঁটতে হাঁটতে গাড়ির কাছে এলাম। সুন্দর সাজানো গোছানো শহর, গাছে ঢাকা অথচ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তা। 

near flower exhibition centre
ফ্লাওয়ার একজিবিশন সেন্টারের কাছে।

সারথি জানালেন, এ বারের গন্তব্য দো দ্রুল চোর্তেন। চোর্তেনের কাছে পৌঁছে গাড়ি থেকে নেমে কিছুটা হাঁটতে হয়। হাঁটতে হাঁটতে এই স্তুপ সম্পর্কে যেটুকু জানি সেটা বলি। দ্রোদুল চোর্তেন ১৯৪৫ সালে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের নিংমা সম্প্রদায়ের প্রধান ত্রুলসিক রিনপোচে নির্মাণ করেছিলেন। তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মের চারটি প্রধান সম্প্রদায় হল নিংমা, কাগিউ, শাক্য ও গেলুগ। নিংমা শব্দের অর্থ হল প্রাচীন। এখানে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের অনেক দুষ্প্রাপ্য পুথি রাখা আছে। 

dro dul chorten
দ্রো দুল চোর্তেন।

ভিতরে ঢুকে স্তূপগুলোর ছবি তুললাম। দু’জন সন্ন্যাসীকে দেখে এগিয়ে গেলাম। নমস্কার জানিয়ে এই চোর্তেন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলাম। এই চোর্তেনের প্রধানের সঙ্গে দেখা করার পরামর্শ দিয়ে তাঁরা চলে গেলেন। আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁদের চলে যাওয়া দেখলাম। 

মৌসুমীকে সঙ্গে নিয়ে চোর্তেনের অফিসে প্রধান আধিকারিকের কাছে এলাম। তাঁর অনুমতি নিয়ে অফিসের ভিতরে ঢুকলাম। সাজানো-গোছানো ঘর। দামি চেয়ার-টেবিলে বসে আধিকারিক একজন সন্ন্যাসীর সঙ্গে কথা বলছিলেন। আমরা যাওয়ার পর উঠে দাঁড়ালেন, তবে তা আমাদের প্রতি সৌজন্যতা প্রকাশ করার জন্য নয়, বাইরে বেরোনোর জন্য।  আমাদের আসার কারণ জানালাম। সব শুনে তিনি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকলেন। তার পর যা বললেন তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। ওঁর মোদ্দা কথা, উনি এখানে নতুন এসেছেন। এখানকার চোর্তেন সম্পর্কে কিছু জানেন না। এ সম্পর্কে কোনো বুকলেটও নেই। কিছু জানতে হলে গুগুল সার্চ করতে হবে। 

ব্যথিত হলাম। বৌদ্ধধর্মকে আমি শ্রদ্ধা করি। এই ধর্মে শিক্ষার একটা আলাদা গুরুত্ব আছে। বৌদ্ধ সংস্কৃতি আমাদের অনেক কিছু শেখায় কিন্তু আজ যা অভিজ্ঞতা হল তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। 

 institute of tibetology
ইনস্টিটিউট অব টিবেটোলজি।

চোর্তেন থেকে বেরিয়ে এলাম। কিছুটা হেঁটেই ইনস্টিটিউট অফ টিবেটোলাজি। চোর্তেন যাওয়ার সময় এর পাশ দিয়েই যেতে হয়। আগে চোর্তেন দেখে এখন ফেরার পথে ঢুকছি। সত্যজিৎ রায়ের ‘গ্যাংটকে গণ্ডগোল’-এ এই জায়গার নাম পাই। গল্পে ‘যমন্তক’ নামে এক বুদ্ধমূর্তির উল্লেখ আছে যার  ৯টা মাথা ও ৩৪টা হাত। এখানে কি সেই মূর্তির দেখা পাব? নাকি সবটাই নিছক গল্প! 

মাথাপিছু ৪০ টাকা করে টিকিট কেটে ঢুকলাম। ভিতরে ফটো তোলা নিষেধ। মাঝারি সাইজের হলঘরে বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য জিনিস রাখা আছে।  প্রাচীন বই, পুথি, চিত্র, অস্ত্র, মুদ্রা, কার্পেট/কাঁথা, মূর্তি, বাসন ইত্যাদি। ইংরাজিতে তার বিবরণ ও লেখা আছে।

 on the way to institute of tibetology
ইনস্টিটিউট অব টিবেটোলজির পথে।

কিন্তু কোথায় যমন্তক? গল্পের বইয়ে সবটাই কি গল্প? এই সব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে যাচ্ছি, হঠাৎ সামনের দেওয়ালে একটা মূর্তি চোখে পড়ল। এটা কী? হ্যাঁ, এই তো সেই যমন্তক! নাহ্‌, সব গল্প ছিল না। গুনে দেখলাম ফুট খানেক বা তার সামান্য কিছু বড়ো মূর্তিটার ৫ ধাপে মোট ১১টা মাথা এবং গোল করে সাজানো মোট ৪২টা হাত।

ইনস্টিটিউট অফ টিবেটোলাজি থেকে বেরিয়ে এলাম। রাস্তার ও পারে একটা স্মারকের দোকান। সেখানে ঢুকলাম। সবই প্রায় বৌদ্ধ বা তিব্বতি সংস্কৃতির দ্রব্য।  এটা ওটা দেখলাম, দাম করলাম। দাম শুনেই পকেটে আগুন লেগে যাচ্ছে। তবুও সাধ্যমতো দু’টো জিনিস কিনলাম। একটা ড্রাগন আর একটা বুদ্ধমূর্তি। এখনকার মতো ঘোরা শেষ করে ফিরে চললাম হোটেলে। 

একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার পথে। আকাশের অবস্থা খুব একটা ভালো না। পাহাড়ে ওঠা ইস্তক ভালো আবহাওয়া পাইনি বললেই চলে। সব সময় আকাশের মুখ ব্যাজার। কোনো জায়গা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার টিকিটাও দেখতে দিল না!

লাল মার্কেটে চক্কর মেরে এলাম মূল ম্যালে। এ-দোকান ও-দোকান ঘুরছি। অল্পবিস্তর কেনাকাটি হয়েছে। গ্যাংটকে এসে  অব্দি মোমো খাওয়া হয়নি। মোমো আমার খুব পছন্দের খাবার। আমি আজ মোমো খাবই পণ করেছি। ও দিকে অরূপদাও চা চা করছে। অতএব মোমো তো খাওয়া হলই, সঙ্গে শিঙাড়া, মিষ্টি, কফি – কিছুই বাদ গেল না।

বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে। এ বৃষ্টি আরও বাড়বে। ছাতাও আনিনি, ঘোরাঘুরি মাথায় উঠল। হাঁটার তো প্রশ্নই নেই, ট্যাক্সি খুঁজতে খুঁজতেই জোর বৃষ্টি এল।  বেশি টাকা কবুল করে একটা ট্যাক্সি ঠিক করলাম। ততক্ষণে ভিজে গিয়ে আমার অবস্থা  লর্ড চমচমের মতো।

view from of hotel
ততক্ষণে কাঞ্চনজঙ্ঘা আবার মুখ লুকিয়েছে।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই জানলার পর্দা সরিয়ে রোজকার মতোই বাইরের দিকে তাকালাম। বাইরে তাকিয়েই চক্ষু স্থির! এ কী দেখছি আমি! অবশেষে কাঞ্চনজঙ্ঘা! সামনের পাহাড়ের পিছনে লুকিয়ে থেকে কেবল মাথাটা বাড়িয়ে উঁকি মেরে আমাদের দেখছে কাঞ্চন। সমগ্র ট্যুরের মাঝে তাকে খুঁজে পাইনি, আজ ফেরার দিন তাকে ধরে ফেলেছি। না না, ভুল হল। আমরা তাকে ধরিনি, শেষ দিন বলে সেই-ই আমাদের কাছে ধরা দিল। 

আনন্দে সবাইকে ডেকে দেখালাম। না-ই বা দেখা গেল পুরো কাঞ্চনকে, কিছুটা তো দেখা যাচ্ছে। সবাই সম্মোহিতের মতো সে দিকে তাকিয়ে রইলাম। অনেকক্ষণ ধরে দেখেও সাধ মেটে না, কিন্তু উপায় নেই। এখনও কিছু গোছগাছ বাকি। একটু পরেই তো রওনা হতে হবে বাড়ির পথে। (শেষ)

ট্যুর প্ল্যান-

দিন ১ – এনজেপি থেকে রামধুরা। রাত্রিবাস।

দিন ২ – সকালে বেরিয়ে ইচ্ছেগাঁও, সিলারিগাঁও ঘুরে রিশিখোলায় রাত্রিবাস।

দিন ৩ – সকালে বেরিয়ে অরিটার লেক ঘুরে রংলি থেকে পারমিশন করে জুলুক। রাত্রিবাস।

দিন ৪ – সকালেই বেরিয়ে জুলুক ভিউ পয়েন্ট, থাম্বি ভিউ পয়েন্ট, নাথাং ভ্যালি, বাবা মন্দির, কুপুপ লেক, ছাঙ্গু লেক হয়ে সোজা গ্যাংটক। রাত্রিবাস।

দিন ৫ – গ্যাংটকে বিশ্রাম।

দিন ৬- এনজেপি থেকে ফেরার ট্রেন ধরা।

ছবি লেখক

0 Comments
Share
the-mysterious-silk-route-part-10-from-kupup-to-gangtok
sudip paul
সুদীপ পাল

পুরোনো বাবা মন্দির থেকে মাত্র কয়েক কিমি রাস্তা, আধ ঘণ্টায় চলে এলাম কুপুপ লেক। বরফ গলতে শুরু করেছে। রাস্তায় কাদা-কাদা ভাব। অত্যন্ত স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়া। হালকা কুয়াশায় চারিদিকে একটা বিবর্ণতার প্রলেপ। এটাই এই পথের সর্বোচ্চ স্থান, ১৪০০০ ফুট।

আরও পড়ুন রহস্যময় রেশম পথ / পর্ব ৯ : বরফের রাজ্যে

গাড়ি থেকে নেমে এলাম। জুতো অনেক আগেই ভিজে গিয়ে রসবড়া হয়ে গিয়েছে, সুতরাং আর জুতো ভেজার ভয় নেই। অরূপদাও নামল। বাকিরা গাড়ির বন্ধ জানলার ভিতর থেকে কুপুপ লেক দর্শন করেই সন্তুষ্ট। আমাদের পিছনে পিছনে মহিলাদের গাড়িটাও চলে এসেছে। ওঁরাও নেমে পড়লেন। এ-দিক ও-দিক কিছু ফোটো তোলার পর আমার ক্যামেরাটা ওঁদেরই একজনের শ্রীহস্তে সমর্পণ করলাম আমাদের দু’জনের চাঁদবদনের ছবি তোলার জন্য। 

kupup lake
কুপুপ লেক।

জায়গাটার নাম কুপুপ, সেখান থেকেই কুপুপ লেক নামে পরিচিতি। আসল নাম এলিফ্যান্ট লেক। উপর থেকে লেকের আকার হাতির মতো দেখতে লাগে। লেকের বাম তীর বরাবর জেলেপ-লা যাওয়ার রাস্তা সরু ফিতের মতো দেখা যাচ্ছে। এ পথ এখন সেনাবাহিনীর দখলে, সাধারণ মানুষের যাওয়া নিষিদ্ধ। ভারত, চিন ও ভুটানের সংযোগস্থলে ডোকলা সীমান্ত। এই ডোকলা নিয়ে বছরখানেক ধরে ভারত ও চিনের মধ্যে উত্তপ্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আর এই পথ হল ডোকলা যাওয়ার।

চারিদিক কুয়াশাচ্ছন্ন ও বরফাবৃত হয়ে থাকার কারণে লেকের জল কাকচক্ষুর মতো কালো দেখাচ্ছে।  এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে মিলিটারি ক্যাম্প ও বিশ্বের সর্বোচ্চ ইয়াক গলফ কোর্স।

আমরা ফিরতেই ভূপাল গাড়ি ছেড়ে দিল। সেই সঙ্গে জানিয়ে দিল, আমরা এ বার মিলিটারি ক্যাম্প এরিয়ার ভিতর দিয়ে যাব। কেউ যেন কোনো ফোটো না তুলি। ধরা পড়লে ক্যামেরা বাজেয়াপ্ত হওয়া, জেল প্রভৃতি অনেক কিছুই সাজা হতে পারে। ক্যামেরা অফ করে রেখে দিলাম। 

yak golf course and ice hockey ground
ইয়াক গলফ কোর্স ও আইস হকির মাঠ।

সেনাশিবির পেরিয়ে আসার পরেই ডান দিকে বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তর পেলাম। এটাই ইয়াক গলফ কোর্স। ইয়াক গলফ কোর্সের এক ধারে আইস হকি ফিল্ড। আইস হকি ফিল্ডের পিছনে একটা গ্রাম দেখা যাচ্ছে । ২০/২৫ টা বাড়ি নিয়ে এই গ্রাম। এই গ্রামে বাইরের লোক বা ট্যুরিস্টদের থাকার অনুমতি দেওয়া হয় না। এখানে থাকার জন্য গ্রামবাসীদের প্রতি মাসেই অনুমতি নবীকরণ করাতে হয়। 

বরফ গলা শুরু হয়ে গিয়েছে। চারিদিক থেকে জল বয়ে যাচ্ছে ফলে একটা কেমন একঘেয়ে ঝিম ধরা আওয়াজ। এক সময় ইয়াক গলফ কোর্স আড়ালে চলে গেল। আমাদের বাঁ পাশে বিশাল এক খাদ রাস্তা বরাবর চলেছে। খাদে ও পাহাড়ের গায়ে হাজার হাজার পাইন গাছ। ভূপাল জানাল, ওই খাদেই কোনো এক জায়গায় রয়েছে মেমেঞ্চ লেক। মেমেঞ্চ লেকে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল কিন্তু এখন সম্ভব নয়। কারণ, ২/৩ কিমি ট্রেক করে লেকে পৌঁছোতে হয়।

new baba mandir
নতুন বাবা মন্দির।

চলে এলাম নতুন বাবা মন্দিরে। আমরা পুরোনো বাবা মন্দির দেখে আসছি, যা আসল বাবা মন্দির। দীর্ঘ জার্নিতে শরীরের সঙ্গে মনেও একটা ক্লান্তি এসেছে। তাই কেউ নামতে রাজি হল না। মন্দিরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ি থেকেই দেখে নিলাম। ভিতরে সিংহাসনে হরভজন সিং-এর ছবি। পুরোনো বাবা মন্দির অনেক উঁচুতে আর অনেকটাই দূরে। সবাই সেখানে যেতে পারেন না। তাই অনেকটা নীচে এখানে এই নতুন বাবামন্দির তৈরি হয়েছে।

বরফঢাকা পরিবেশের মধ্যে চলেছি। এ দিকে রূপের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। ওর জ্বর এসেছিল লক্ষ্মণচকে। নাথাং ভ্যালি পৌঁছোনোর আগেই ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। এখন ক্লান্তির কারণে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে সম্ভবত। ওকে কোকা ৩০ খাইয়ে হাতে কর্পূরের শিশি ধরিয়ে দেওয়া হল শোঁকার জন্য। এই দু’টো জিনিসই শ্বাসকষ্টে খুব কাজের।

hangu lake with welcome gate
হাঙ্গু লেক ও ওয়েলকাম গেট।

আমাদের গাড়ি হাঙ্গু লেকের (ছাঙ্গু নয়) সামনে চলে এল। এটাই হল পৃথিবীর উচ্চতম লেক যেখানে বোটিং হয়। একটা ওয়েলকাম গেট রয়েছে। গেটে লেখা অ্যালপাইন পার্ক। কোত্থাও কেউ নেই। লেকে যাওয়ার জন্য প্রবেশমূল্য লাগে কিনা জানি না। একটাও বোট চোখে পড়ল না। বরফে চাপা পড়ে থাকতে পারে। 

ganju lama war museum
গঞ্জু লামা ওঅর মিউজিয়াম।

হাঙ্গু লেকের পাড় বরাবর রাস্তা। লেক পেরিয়ে কিছুটা আসার পর বাঁ দিকে পড়ল গঞ্জু লামা ওঅর মিউজিয়াম। ভারত-চিন যুদ্ধের স্মৃতিতে এই মিউজিয়াম। মিউজিয়াম সম্ভবত খোলা আছে কিন্তু কোনো জনপ্রাণীও নেই। তবে এখন মিউজিয়াম দেখতে যাওয়ার মতো ধৈর্যও আমাদের নেই।

কিছু পরে রাস্তার ডান দিকে নাথুলা যাওয়ার রাস্তা উপর দিকে উঠে গিয়েছে দেখলাম। রাস্তার শুরুতেই একটা ওয়েলকাম গেট। নাথুলা যাওয়ার জন্য আলাদা অনুমতি নিতে হয় গ্যাংটক থেকে। আমাদের সেই অনুমতি নেই, তাই যাওয়ার প্রশ্নই নেই। 

sherthang
শেরথাং।

রাস্তার বাঁ দিকে আবার এক লেকের দেখা পেলাম, নাম মঞ্জু লেক, হাঙ্গু বা ছাঙ্গুর তুলনায় অনেক ছোটো। লেকের জল পুরো হোয়াইট ওয়াশ হয়ে গিয়েছে। রাস্তার ধারে ৬ ইঞ্চি পুরু বরফ। এখানেও গাড়ি না থামিয়া চলে এলাম শেরথাং। নাথুলা বর্ডার দিয়ে যে সব ট্যুরিস্ট কৈলাস-মানস সরবোর যান তাঁদের জন্য সুন্দর সুন্দর কিছু ঘর করা আছে এখানে। অর্থাৎ তাঁদের আক্লাইমেটাইজ করার জন্য ব্যবস্থা। দুধ-সাদা বাড়িগুলির সবুজ ছাদ এখন বরফে সাদা।

গাড়ি চলছে থেগুর উপর দিয়ে। ছাঙ্গু এখনও ৪ কিমি দূরে। হঠাৎ ‘মোনাল’,  ‘মোনাল’, বলে ভূপাল সজোরে গাড়ি ব্রেক কষল। খ্যাসসসস করে আওয়াজ তুলে বরফে ফুট খানেক হড়কে গিয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। চেয়ে দেখি সামনে ডান দিকে সিকিমের রাজ্য পাখি মোনাল। হাঁসের মতোই আকার। দেহের গঠন ময়ুরের মতো। সবুজ মাথায় ময়ুরের মতোই একটা ঝুঁটি। সামান্য লম্বা গলায় উজ্জ্বল লাল ও হলুদ রঙ থেকে যেন দ্যুতি বেরোচ্ছে। উজ্জ্বল ঘন নীল রঙের দেহ। পানকৌড়ির লেজের মতো লেজ। লেজের শেষ দিকটা কমলা রঙ। মোনালের সারা শরীরের সমস্ত রঙই মেটালিক। অপুর্ব তার রূপ। যারা মোনাল চেনে না তারা ময়ূর বলে ভুল করতে পারে।

monal
মোনালের ছবি তোলার ব্যর্থ চেষ্টা।

জীবনে প্রথম মোনাল দেখলাম। পাখিটা ব্রেকের শব্দে ও আকস্মিক গাড়ি থামার কারণে ভয় পেয়ে ডান দিকের পাহাড় বেয়ে দ্রুত উঠতে শুরু করেছে। আমি বিহ্বল হয়ে তাকে দেখছি। গলায় ক্যামেরা ঝুলছে কিন্তু ফোটো তোলার কথা ভুলে গিয়েছি।

ক্যামেরা বার করুন – ভূপালের কথায় সংবিৎ ফিরল। ক্যামেরার ব্যাগ থেকে দ্রুত ক্যামেরা বার করে অন করতে করতে সে আরও খানিকটা উপরে। মোটামুটি ক্যামেরার রেঞ্জের বাইরে। তার উপর উজ্জ্বল সাদা আকাশের ব্যাকগ্রাউন্ড। ছবি কালো আসছে, তবুও শট নিলাম। মনের মধ্যে মিশ্র অনুভুতি। এক দিকে মোনাল দেখার আনন্দ অপর দিকে তাকে ঠিকমতো ক্যামেরাবন্দি করতে না পারার দুঃখ।  

মোনাল চোখের আড়ালে যেতেই আবার যাত্রা শুরু। রাস্তার বাম দিকে গভীর খাদ। খাদের অপারে উত্তুঙ্গ পর্বতশ্রেণি মাথায় বরফের মুকুট পরে দাঁড়িয়ে আছে। ওই পাহাড়শ্রেণির যে রাস্তা লেপটে আছে সেই রাস্তায় কিছুক্ষণ পরেই চলে এলাম। ছাঙ্গু লেক আর দু’ কিলোমিটার।

way to tsomgo lake
ছাঙ্গু যাওয়ার পথ।

রাস্তায় জওয়ানদের আনাগোনা দেখতে পাচ্ছি। আমরা হাত নাড়লে তাঁরাও হাত নেড়ে অভিনন্দন জানাচ্ছে। এক সময় অনেক উপর থেকে লম্বালম্বি ভাবে ছাঙ্গু লেককে দেখতে পেলাম। লেকের দু’ দিক পাহাড় দিয়ে ঘেরা। আমরা যে দিকে এখন আছি সে দিক ধরলে তিন দিক হয়। মনে হল বিশাল দৈত্যাকার সাদা রঙের এক নৌকার খোলে খানিকটা জল জমে আছে। খানিকক্ষণ বাদে বাদে ইউ টার্ন নিয়ে গাড়ি ক্রমশ নীচের দিকে নামতে থাকল। যত এগোচ্ছি লেকের আকার ততোই বড়ো হচ্ছে আমাদের চোখে।  এর আগে ২০১৫-য় গ্যাংটক থেকে ছাঙ্গু লেক পর্যন্ত আসতে পেরেছিলাম। বরফের কারণে রাস্তা বন্ধ থাকায় আমরা আর যেতে পারিনি। এ বারেও যাঁরা নাথুলা বা বাবা মন্দির যাওয়ার জন্য গ্যাংটক থেকে আসছেন তাঁদের ছাঙ্গু লেকের পরে আর যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।  আমরা বিপরীত দিক থেকে আসছি, তাই আমাদের এ পথে যাওয়ার সৌভাগ্য হল। 

tsomgo lake
রাস্তার পাশেই ছাঙ্গু লেক।

লেকের পাশে রাস্তার এক ধারে গাড়ি দাঁড়াল। সবাই নেমে পড়লাম। লেকের জলে পাশের পাহাড়শ্রেণির প্রতিবিম্ব।  ২০১৫ সালে ছাঙ্গু এত ঘিঞ্জি ছিল না। প্রচুর ঘরবাড়ি হয়েছে, রোপওয়ে চালু হয়েছে। সেবার লেকের ধার ধরে হেঁটে হেঁটে ও পারে গেছিলাম। এ বার আর সেই এনার্জি আর নেই। তা ছাড়া চারিদিকে মোটা বরফের স্তর। বরফগলা জলে ইয়াকের বিষ্ঠা মিশে যাচ্ছেতাই নোংরা হয়ে আছে।

রোপওয়ে স্টেশনে যাওয়ার সিঁড়ির কাছেই লেক থেকে একটা জলধারা বেরিয়ে এসেছে। এটাই রোরো নদী। এই নদী তিস্তার সাথে মিশেছে। মেঘলা স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায় লেকের ধারে আধ ঘণ্টা ঘোরাঘুরি করে ফটোসেশন করে গাড়িতে উঠলাম। 

market area neas tsomgo lake
ছাঙ্গু পেরিয়ে এসে বাজার এলাকা।

কয়েকটা হেয়ারপিন বেন্ড দিয়ে দু’ কিমি রাস্তা পেরিয়ে একটা বাজার এলাকা পেলাম। বাজার বলতে মূলত রেস্টুরেন্ট, শীতবস্ত্রের আর  মেমেন্টোর দোকান। একটা দোকানে মোমোর অর্ডার দিলাম। চা-ও খেতে হবে। ভেজ মোমো আমার ভীষণ পছন্দের খাবার। ভূপাল দেখি থুকপার বাটি নিয়ে বসেছে। খাওয়ার পর গরম চা-এর কাপে চুমুক। কী আরাম যে লাগল। সব ক্লান্তি যেন নিমেষে গায়েব। খাওয়ার পর্ব শেষ, আবার যাত্রা।  

 way to gangtok
গ্যাংটকের পথে ক্রমশই নেমে যাওয়া।

এই রাস্তাটাও বড়ো সুন্দর। চারিদিকে সবুজ ঘাসে মোড়া পাহাড়ের গায়ে পাইন গাছের ছড়াছড়ি। পাইন গাছের ফাঁক দিয়ে মেঘের লুকোচুরি। চলতে চলতে একটা ঝরনার সামনে থামলাম। এই ঝরনার নাম কংনসলা ওয়াটার ফল্‌স। এই জায়গা বোধহয় সারা বছরই কুয়াশাঢাকা থাকে। গাড়ি থেকে কেউ নামল না। আমি একা নেমে ঝরনার ক’টা ঝাপসা ছবি তুলে আনলাম।

temporary falls
হঠাৎ ঝরনা।

খানিকক্ষণের মধ্যেই শুরু হল ঝিমঝিম বৃষ্টিল। এই আবহাওয়ায় পাহাড়ে চলার মজা হল, রাস্তার ধারে ধারে হঠাৎ তৈরি হওয়া ঝরনা দেখতে পাওয়া যায়। আমরাও পথের ধারে তেমন কিছু ঝরনা পেলাম। ক্রমশ নীচের দিকে নামছি। গাছপালারও পরিবর্তন হচ্ছে। পাইন গাছের পাশাপাশি ঝোপঝাড় ও অন্য বড়ো গাছও চোখে পড়ছে।

ঝিমঝিমে বৃষ্টিতেই ঢুকে পড়লাম গ্যাংটকে। কিছুক্ষণ আগেও যে পরিবেশে ছিলাম তার সঙ্গে কিছুতেই যেন মেলাতে পারছি না। কংক্রিটের জঙ্গল, গাড়ির ভিড়, মানুষের কোলাহল। অসহ্য। এম জি মার্গের নীচের দিকেই আমাদের লজ। পৌঁছে গেলাম সেখানে। (চলবে)

ছবি লেখক

0 Comments
Share
the-mysterious-silk-route-part-nine-in-the-land-of-snow
sudip paul
সুদীপ পাল

পপকর্ন খেতে খেতে যাত্রা শুরু। কিছুটা যাওয়ার পর গতি মন্থর করে ভূপাল দেখাল – ওই দেখুন পুরোনো সিল্ক রুট।

অনেকগুলো ডব্লিউ-এর আকারে একটা সরু পথ নীচের দিকে নেমে গিয়েছে। দেখামাত্র একটা শিহরণ জাগল। এই সেই সিল্ক রুট! বিশ্বের প্রথম সুপার হাইওয়ে! এ যেন এক জীবন্ত ইতিহাস। এই সেই পথ যার মাধ্যমে সারা বিশ্বের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ হত এক সময়। চলত রেশম, ধাতু, অলংকার, কাপড়, সুগন্ধি দ্রব্য, মশলা, মূল্যবান পাথর প্রভৃতির ব্যবসা-বাণিজ্য। প্রায় ৬৫০০ কিমি এই পথ তিব্বতের রাজধানী লাসা হয়ে (অধুনা চিন) মধ্য এশিয়া চলে গিয়েছে।

আরও পড়ুন রহস্যময় রেশম পথ / পর্ব ৮ : জুলুকের উষ্ণ আপ্যায়ন

দ্বিতীয় খ্রিস্টপূর্বাব্দেও এই পথে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চলত। পরে ইউরোপ থেকেও মধ্য এশিয়া হয়ে বণিকরা আসত লাসায়। লাসা থেকে জেলেপ-লা দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে কুপুপ লেকের পাশ দিয়ে সোজা এই পথে জুলুক হয়ে ক্রমে সমতলে চলে আসত এবং সারা ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চালাত। যারা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে শ্রীলংকা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে চাইত তারা সিল্ক রুট দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে সোজা বঙ্গের তাম্রলিপ্ত বন্দর (অধুনা মেদিনীপুরের তমলুক) দিয়ে জাহাজে সমুদ্রযাত্রা করত।

junction of old and new silk route
পুরোনো ও নতুন রেশম পথের মিলন।

এ পথ শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ ছিল না। এই পথেই যেমন বিভিন্ন দেশের শিল্প-সংস্কৃতি ভারতে প্রবেশ করেছে তেমনই ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতি বিশ্বের দরবারে পৌঁছে গিয়েছে। এই পথেই গ্রিক শিল্পকলা ভারতে এসেছে। এই পথেই ভারত থেকে বৌদ্ধধর্ম বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতের গণিতশাস্ত্র ও বিজ্ঞান আরবে ছড়িয়ে পড়েছিল এই সিল্ক রুট ধরেই। চিনা পরিব্রাজক ফা-হি-য়েন এবং হিউ-এন সাং এ পথেই ভারতে এসেছিলেন। ভারত থেকেও এই পথে তিব্বত বা চিনে গিয়েছেন অতীশ দীপঙ্কর, শান্ত রক্ষিত, শরৎচন্দ্র দাস প্রমুখ পরিব্রাজক। এমনকি রাজা রামমোহন রায়ও  জেলেপ-লা দিয়ে তিব্বত যান।

near thambi view point
থাম্বি ভিউ পয়েন্টের কাছে।

ভারত-চিন যুদ্ধের আগে পর্যন্ত এ পথে ব্যবসা-বাণিজ্য চলত। যুদ্ধের পর এই পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখন অবশ্য এ পথ সক্রিয় করার জন্য ভারত-চিন ভাবনাচিন্তা চালাচ্ছে।

আমরা এগিয়ে চলেছি। কখনও মেঘ আমাদের গ্রাস করছে, আবার কখনও উগরে দিচ্ছে। গাড়িতে ভালো ভালো গান বাজছে, কিন্তু সে দিকে কারওর খেয়াল নেই। জোড়া জোড়া চোখ বন্ধ জানলার বাইরে পাড়ি দিয়েছে। থেকে থেকেই উল্লাসধ্বনি বেরিয়ে আসছে মুখ থেকে। বয়সকে সবাই যেন কখন ছুড়ে ফেলে দিয়েছে পাহাড়ের খাদে।

thambi view point
থাম্বি ভিউ পয়েন্ট।

থাম্বি ভিউ পয়েন্টে যখন গাড়ি থেকে নামলাম মনে হল ঠান্ডায় জমে যাব। চারিদিকে ঘন মেঘ বা কুয়াশায় ৫০ ফুট দূরও দৃশ্যমান নয়। থাম্বি ভিউ পয়েন্টের উচ্চতা ১১২০০ ফুট। এখান থেকে পরিষ্কার আকাশে সুন্দর নিসর্গ দেখা যায়, আমাদের কপাল মন্দ। আমরা ছাড়াও আরও দু’গাড়ি ট্যুরিস্ট এসেছে। চলছে ফটোসেশন। একটা হলুদ কংক্রিটের ফলকে কালো রং দিয়ে ‘থাম্বি ভিউ পয়েন্ট’ লেখা। এই ফলককে পাশে রেখে ছবি তোলারও উন্মাদনা রয়েছে। এখানে আসার প্রমাণ সবাই ছবিতে রাখতে চাইবে, সেটাই তো স্বাভাবিক।

rhodendron flower
আবার রডোডেনড্রন ফুল।

এখানে আবার রডোডেনড্রন ফুল। এ বারে সে রাঙা পোশাকে হাজির হলেও কালকের সেই রূপ আজ আর নেই। কেমন একটা লাবণ্যহীনতা গ্রাস করেছে। গাছে ফুটে থাকা ফুলগুলিকে দু’হাত দিয়ে স্পর্শ করলাম। বড় কোমল এ ফুল। রডোডেনড্রন ফুল থেকে টপ টপ করে ঝরে পড়ছে কুয়াশার জলরূপী অশ্রু, যার ছোঁয়া লাগল আমারও চোখে-মুখে।

playing with snow
বরফ নিয়ে খেলা।

মেঘের পর্দার ওড়াউড়ির ফাঁকে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম লক্ষ্মণচক। জায়গাটা নাথাং এলাকায়। একটা ক্যাফেটেরিয়া কাম গিফট শপের সামনে গাড়ি দাঁড়াল। এটি সিকিম পর্যটন দফতরের তৈরি। এখানে দাঁড়ানোর কারণ দু’টো – এক, এখানেই প্রথম বরফ দেখলাম। ক্যাফেটেরিয়ার চালে কাল রাতে যে বরফ পড়েছিল সেগুলো গড়িয়ে নীচে এসে জড়ো হয়েছে। সেই বরফ একটু ঘাঁটার সাধ হয়েছে। দুই, যদি কেউ গরম চায়ে একটু গলা ভেজাতে চায়। কিন্তু গরম চা বা কফিতে গলা না ভিজিয়ে সবাই বরফ ছোড়াছুড়িতেই ব্যস্ত হয়ে গেল। ক্যাফেটেরিয়ার পাশেই কর্নেল লক্ষ্মণ সিং-এর স্মৃতিসৌধ। তাঁর নামেই এই জায়গার নাম।

tukla valley
টুকলা ভ্যালি।

আবার যাত্রা। যত যাচ্ছি ততই বরফের পরিমাণ অল্প অল্প করে বাড়ছে। জানলার কাচ সামান্য নামিয়ে ফটো তুলছি, গ্লাভস পরা নেই, হাত যেন জমে যাচ্ছে। টুকলা ভ্যালিতে যখন এলাম চারিদিকে কুয়াশায় ভরে গিয়েছে। বরফের ঘনত্ব আরও বেড়েছে। রাস্তার উপরে বরফের পাতলা চাদর।

নাথাং ভ্যালি চলে এলাম। উচ্চতা ১৩১৪০ ফুট। ভিউ পয়েন্টে গাড়ি থামতেই নেমে পড়লাম। রাস্তা থেকে একটা ঢাল নীচে নামতে নামতে কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে গিয়েছে। এখানে বরফ আর কুয়াশা, উভয়েরই আধিক্য বেশি। হাতের সামনে বরফ পেয়ে খুশির অন্ত নেই। বরফে পা হড়কে যাচ্ছে। খুব সাবধানে হাঁটতে হচ্ছে।

gnathang valley view point
নাথাং ভ্যালি ভিউ পয়েন্ট।

গাড়িতে উঠে আবার যাত্রা। একটু এগিয়েই বাঁ দিকে কিছুটা নীচে বেশ কিছু বাড়ি দেখলাম। অনেকেই এখানে এসে রাত্রিযাপন করেন। সম্ভবত এগুলোই সেই সব হোমস্টে। রাস্তায় এখন ইঞ্চি ছয়েক পুরু বরফ। পৃথিবীর সব রং এখান থেকে মুছে গিয়েছে। প্রকৃতি শুধু সাদা আর কালো। এ রকম মনোক্রম প্রকৃতি আগে কখনও দেখিনি। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা।

আমরা এখন পুরোনো বাবামন্দিরের দিকে চলেছি। বরফের আধিক্যে বহু ট্যুরিস্ট গাড়ি ফিরে আসছে। গাড়িগুলিকে পাশ দিতে গিয়ে আমাদের গাড়িকে বারে বারে খাদের কিনারায় চলে যেতে হচ্ছে। এটা খুবই বিপজ্জনক। এই বরফে গাড়িতে ব্রেক মারলেও চাকা স্লিপ করে, ফলে গাড়ির উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এই ভয়েই অধিকাংশ ড্রাইভার ফিরে আসছে। অনেক ড্রাইভারই ইশারায় বা চেঁচিয়ে আমাদের ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিল। ভূপাল কাউকে পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে চলল।

– যাওয়া যাবে তো?

– দেখি না, যত দূর যাওয়া যাবে তত দূর যাব। আট বছর এই রুটে গাড়ি চালাচ্ছি, এদের আমি খুব ভালো করেই জানি। জবাব ভূপালের।

going back
গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে চলা।

কথা না বাড়িয়ে চুপ করে বসে রইলাম। চকলেট, পপকর্ন দিয়ে সবাই মুখ চালাতে লাগল।  কিছু দূর যাওয়ার পর দাঁড়িয়ে পড়তে হল। একটা গাড়ি ফেঁসে গিয়েছে ইউ টার্ন করতে গিয়ে। ঠেলেও গাড়িটাকে নড়ানো যাচ্ছে না। দু’ জন জওয়ানও হাত লাগিয়েছেন। গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। মাটিতে পা দিতেই পুরো জুতোটাই বরফে ঢুকে গেল। অবশেষে সেই গাড়ি ঘুরল। আমরা এগোলাম, আমাদের সঙ্গে এখন আর একটাই গাড়ি। একটা মাইলস্টোন দেখলাম, লেখা কুপুপ ৬ কিমি। ভূপাল জানাল, পুরোনো বাবামন্দির আসতে সামান্যই বাকি।

১০ মিনিট বাদেই চলে এলাম বাবামন্দির। ট্যুরিস্ট বেশি নেই। আমাদের গাড়ি ছাড়া আর গোটা তিনেক গাড়ি। আমাদের সঙ্গে যে গাড়িটা আসছিল সেটাও আছে। পরে জেনেছিলাম ওই গাড়ির সওয়ার পাঁচ বান্ধবী, সিল্ক রুট বেড়াতে এসেছে।

area of old babamandir
বাবা মন্দিরের চারপাশ।

বাবামন্দিরে পিতলের সিংহাসনে বাবা হরভজন সিং-এর একটি মূর্তি ও একটা ফটো রাখা আছে। এ ছাড়াও আরও কিছু ঠাকুর-দেবতার ফটো রাখা আছে এবং শিখ, খ্রিস্টান ও মুসলিমদের কিছু ধর্মীয় ছবিও রাখা আছে।

হরভজন সিং ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর পঞ্জাব রেজিমেন্টের এক জওয়ান। ঠিক এই জায়গাতেই ছিল তাঁর বাঙ্কার। ১৯৬৮ সালে সিকিমে এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে। প্রবল বৃষ্টিতে বন্যা দেখা দেয়। বহু জায়গায় ধস নামে। কয়েকশো মানুষ প্রাণ হারান। ভারতীয় সেনাবাহিনী স্বাভাবিক ভাবেই উদ্ধারকাজে হাত লাগায়। ১৯৬৮ সালের ৪ অক্টোবর হরভজন সিং টুকলাদাড়া কিছু মানুষকে উদ্ধার করে ব্যাটেলিয়ানের হেড কোয়ার্টার ছোঙ্গুচুইলায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথে পা পিছলেই হোক বা জলের তোড়েই হোক তিনি এক খরস্রোতা নালায় পড়ে যান। জোরদার তল্লাশি চালিয়েও সেনাবাহিনী তাঁর দেহ খুঁজে পায় না। অবশেষে পাঁচ দিন পর তাঁর এক সহকর্মীকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে তিনি তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে বলেন। তাঁর দেহ কোন জায়গায় আছে তা-ও বলেন। পরে সেই জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে তাঁর দেহ উদ্ধার হয়।

এর পর তাঁর সহকর্মীরা ছোঙ্গুচুইলায় অর্থাৎ এই স্থানে তাঁর একটি মন্দির তৈরি করেন। শোনা যায় হরভজন সিং-এর আত্মা এখনও এখানে বিরাজমান। বিপদে পড়লে অনেককেই তিনি উদ্ধার করেছেন। ডিউটিরত অবস্থায় ঘুমিয়ে যাওয়ার কারণে বা কর্তব্যে ঢিলে দেওয়ার কারণে অনেক জওয়ানই তাঁর অদৃশ্য হাতের চড় খেয়েছেন।

babaji ki bunker
বাবাজির বাঙ্কার।

মন্দিরের পাশেই হরভজন সিং-এর বাঙ্কারের সিঁড়ি। জুতো খুলে রেখে সেনাবাহিনীর রেখে দেওয়া হাওয়াই চপ্পল পরে যেতে হবে। আর কেউ যাবে না, আমি একাই চললাম। ভূপাল তাড়াতাড়ি আসতে বলল। আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করেছে। বরফ পড়া শুরু হলে ভীষণ বিপদ হয়ে যাবে। ৩০/৩৫টা সিঁড়ি দৌড়ে উঠে। উপরে ছোটো ছোটো তিনটে ঘরে হরভজন সিং-এর ব্যবহৃত জিনিসপত্র রাখা। প্রসঙ্গত বলি, হরভজন সিংকে এখনও সেনাবাহিনীর একজন মনে করা হয়। প্রতি বছর তাঁর জন্য পোশাক ও অন্যান্য জিনিস বরাদ্দ হয়। মিটিং-এ তাঁর জন্য একটা চেয়ার ফাঁকা থাকে। ওই চেয়ারে তাঁর ফটো রাখা থাকে।

মন্দিরের সামনেই একটা স্টিলের গুমটি। তার ভিতরে এক গামলা কিশমিশ রাখা। বাবা হরভজন সিং-এর প্রসাদ। কাছে যেতেই এক জওয়ান আমায় একমুঠো কিশমিশ দিয়ে দিলেন। কিশমিশ গুলো খেতে খেতে গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। টিপটিপ করে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। (চলবে)

ছবি লেখক

0 Comments
Share
the-mysterious-silk-route-part-8-the-warm-reception-at-zuluk
sudip paul
সুদীপ পাল

হোমস্টের বৃদ্ধ মালিকের তত্ত্বাবধানে ভূপাল গাড়ির ছাদ থেকে মালপত্র নামিয়ে দিল। আমরা সেগুলো দু’টো ঘরে নিয়ে এসে রাখলাম। টিনের চাল, টিনের দেওয়াল। ঘরের ভিতরটা প্লাইউড দেওয়া থাকলেও এই স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় ঠান্ডা যেন কামড়ে দিচ্ছে। বিকেলেই এই অবস্থা! রাতে কী হবে ভগবান জানে।

গৃহকর্তা আমাদের হাত-মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে আসতে বললেন। অরূপদা ঠান্ডায় বেশ কাবু হয়ে পড়েছে। তবে যতটা কাবু হয়েছে তার থেকে বেশি আতঙ্কিত। যা-ই হোক, দু’টো ঘরে দু’খানা রুমহিটার জ্বালানো হয়েছে। ১৫০ টাকা করে এক একটার ভাড়া।

খাবার টেবিলে কথাবার্তা চলছে। অবেলা হয়ে গেলেও আমরা অল্প করে ডিমের ঝোল, ভাতই খাচ্ছি। এ ছাড়া কোনো উপায় নেই। রূপের আবার জ্বর আসছে। ওকে নিয়ে খুব চিন্তায় আছি।

রূপের জ্বরের খবর শুনে গৃহকর্তা আশ্বস্ত করলেন। বিকেলে এখানকার মিলিটারি ট্রানজিট ক্যাম্পে ডাক্তারবাবু বসেন। সেখানে নিয়ে যাবেন বললেন। এক জন ভালো ডাক্তার দেখানো যাবে জেনে একটু আশ্বস্ত হলাম।

rows of pine trees
পাইনের সারি।

টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তায় নেমে পড়লাম। আমাদের সামনে বিশাল এক পর্বত দেওয়ালের মতো দাঁড়িয়ে। পাহাড়ের মাথাটা মেঘের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে। তার ফলে পাহাড়টা ঠিক কত উঁচু বুঝতে পারলাম না। সন্ধের মুখে এখনও ট্যুরিস্টবোঝাই গাড়ি ওই পাহাড়ে উঠছে। ওরা এই পথে নাথাং ভ্যালি যাচ্ছে। ওখানেই রাত কাটাবে। এখান থেকে নাথাং পৌঁছোতে আরও প্রায় ৩ ঘণ্টা সময় লাগবে। আকাশের এই অবস্থায় ওই উচ্চতায় পাহাড়ের বুকে অন্ধকারে গাড়ি চালানো! সত্যিই বড়ো দুঃসাহস এঁদের। কাল ভোরবেলা আমরাও ওই পথে যাত্রা করব।

জুলুক আসলে একটি কুলিবস্তি ছিল। এখানকার বাসিন্দারা সেনাবাহিনীর মালপত্র পৌঁছে দেওয়া, ফাইফরমাশ খাটা ও রাস্তা সারাইয়ের কাজ করত। এখনও অনেক বাসিন্দাই এ সব কাজই করে। আমরা যে হোমস্টেতে আছি তার মালিক গাড়ি করে সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে সবজি ও অন্যান্য জিনিস পৌঁছে দিতেন এবং মালকিন রাস্তা সারাইয়ের কাজ করতেন। এখন বার্ধক্যের কারণে সে সব কাজ ছেড়ে হোমস্টে খুলেছেন। ওঁদের ছেলে এখন ট্যুরিস্ট গাড়ি চালায়। শুনলাম সে-ও ট্যুরিস্ট নিয়ে এসেছে এখানে। বাড়িতেই আছে এখন, যদিও তার দেখা পাইনি আমরা।

আরও পড়ুন রহস্যময় রেশম পথ / পর্ব ৭ : অবশেষে জুলুক

৯০০০ ফুট উচ্চতা থেকে জুলুক শুরু হয়ে ১১৫০০ ফুটে গিয়ে শেষ হয়েছে। জুলুকের  দু’টো অংশ – আপার জুলুক ও লোয়ার জুলুক। ট্যুরিস্টরা সব লোয়ার জুলুকেই থাকে। আপার জুলুকে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। একটা মন্দির আছে সেখানে। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি। ঘণ্টার আওয়াজও কানে আসছে। ওখানেও এক চক্কর দেব ভাবলাম। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। অগত্যা আবার হোমস্টের চার দেওয়ালের মধ্যে সেঁধিয়ে গেলাম। অরূপদার বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলের নখ মাংসের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে। বেচারা ঠিকমতো হাঁটতে পারছে না। যন্ত্রণা হচ্ছে। অরূপদাও মিলিটারি ক্যাম্পে ডাক্তার দেখাতে যাবে।

কিছুক্ষণ পরেই হালকা বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ট্রানজিট ক্যাম্প আরও উপর দিকে। পাঁচ মিনিটের রাস্তা। ট্রানজিট ক্যাম্পের গেটে জওয়ানরা আমাদের এখানে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। কারণ জানানোর পর অভ্যর্থনা করে নিয়ে গিয়ে বসালেন। এর আগেও আমি ট্যুরিস্ট হিসাবে সেনাক্যাম্পে গিয়েছি, ওঁদের ব্যবহার সত্যিই মন ছুঁয়ে যায়।

আমাদের নাম-ঠিকানা লিখে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর দু’জন মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট এসে সব জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। তাঁরা অরূপদার পায়ের বুড়ো আঙুল পরীক্ষা করলেন। ডাক্তার আসার আগেই ওই দুই অ্যাসিস্ট্যান্ট পাশের ঘরে অরূপদাকে নিয়ে গিয়ে তাঁর চেঁচামেচির মধ্যেই নখ কেটে মাংস থেকে বের করে দিয়ে ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলেন।

একটু পরে মহিলা ডাক্তার এলেন। রূপকে দেখে জানতে চাইলেন কী হয়েছে। রূপকে কী ওষুধ খাইয়েছি সব বললাম। উনি ওগুলোই চালু রাখতে বললেন, সঙ্গে পেটে ইনফেকশনের একটা সিরাপ দিয়ে দিলেন।

Zuluk Basti
এক ঝলক জুলুক।

সন্ধ্যায় অরূপদার ঘরে আড্ডা চলছে। আমারও কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে। নিঃশ্বাসও খুব সাবলীল লাগছে না। সবটাই উচ্চতাজনিত কারণে। কাল অনেক উপরে উঠব তাই একটু চিন্তায় আছি। একটু কোকা ৩০ খেয়ে নিলাম। রাত আটটায় খাবার টেবিলে চলে গেলাম। লোহার টেবিল, নীচে আগুন জ্বলছে। বেশ আরামদায়ক ব্যাপার।

গল্প করতে করতে খাচ্ছি। গৃহকর্তা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে খাবারের তদারকি করছেন। এই ট্যুরে এই প্রথম হোমস্টের এতটা উষ্ণ আপ্যায়ন পেলাম। মালিকের একটি কন্যাসন্তান আছে। কালিম্পং-এ বিয়ে হয়েছে। এ সব এলাকায় বিয়ের পাত্র হিসাবে ড্রাইভার ছেলের ভীষণ কদর। গাড়ি চালিয়ে তারা প্রচুর উপার্জন করে। একটা গাড়ির উপার্জন থেকে অনেকেই অনেক গাড়ি কিনেছে। অনেকে আবার হোমস্টে, হোটেল পর্যন্ত করে ফেলে।

খাওয়া শেষ করে উঠে পড়লাম। বাইরে তখন মুষলধারায় বৃষ্টি। কনকনে ঠান্ডা। কাল যত সকালে সম্ভব বেরিয়ে পড়তে হবে।

জুলুক ভিউ পয়েন্টে

সারা রাত তুমুল বৃষ্টি হল। বার বার বৃষ্টির আওয়াজে ঘুম ভেঙেছে। যত বার ঘুম ভেঙেছে তত বার জানলার পর্দা সরিয়ে দেখেছি বরফ পড়ছে কিনা। দাম্পত্যজীবনে কখনও কখনও মাথায় বরফ চাপা দিয়ে রাখলেও জীবনে কখনও বরফ পড়া দেখিনি। সকালে দরজা খুলে বাইরে উঁকি মেরেও বরফের চিহ্ন খুঁজে পেলাম না। প্রকৃতি এ যাত্রা বেইমানি করল।

কনকনে ঠান্ডায় হাত-পা পেটে সেঁধিয়ে যাওয়ার দশা। বাড়ির মালিক গরম জলের ব্যবস্থা করে দিলেন। ওই জলের উপর ভরসা করেই আমাদের প্রস্তুতি চলতে লাগল।

তৈরি হয়ে খাবারঘরে চলে এলাম সবাই। টেবিলের তলায় হালকা আগুন করা আছে। চলে এল অরূপদার প্রেসক্রাইব করা গরম গরম রেসিপি। নর সুপের মধ্যে ম্যাগি দিয়ে রান্না করা খাবার। ম্যাগি সুপ নাম দেওয়া যেতে পারে। এক চামচ মুখে দিয়েই আঁতকে উঠলাম। এমন বাজে স্বাদের খাবার আমি জীবনে কখনও খেয়েছি কিনা মনে করার চেষ্টা করলাম। অরূপদা খাবারটা একবার নাড়ছে আর ট্যাবলেট খাওয়ার মতো কোঁত করে গিলে নিচ্ছে। বাকিদেরও মুখ সিঁটকে আছে। এ বার নিজের খাবারের দিকে তাকিয়ে বললাম, খাবারটা দারুণ হয়েছে। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত, তার পরেই হাসিতে ঘর ভরে গেল।

এত উচ্চতায় জার্নির জন্য সহজপাচ্য খাবার খাওয়াই উচিত। সে দিক থেকে দেখলে আজকের জার্নির উপযুক্ত খাবারই খাচ্ছি। বিস্বাদকে সুস্বাদে ফেরাতে বেশ করে টোম্যাটো সস ঢাললাম। আমার দেখাদেখি বাকিরাও তা-ই করল।

white rhododendron
সাদা রডোডেনড্রন।

সকাল ৮টা। আবার যাত্রা। সামনের ওই উঁচু পাহাড়টা আমাদের পেরিয়ে যেতে হবে। পাহাড়ের গায়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে আমাদের চলার পথ। আকাশ এখনও মেঘলা। জায়গায় জায়গায় ঘন কুয়াশা। হঠাৎ ভূপাল গাড়ি থামিয়ে বলল, ওই দেখুন সাদা রডোডেনড্রন। গাড়ি থেকে নেমে ছবি তুললাম। কাল যে লাল রডোডেনড্রন দেখেছিলাম, তার রূপের কাছে এ কিছুই নয়।

এগিয়ে চলেছি। যত এগোচ্ছি ততই মেঘেরা ঘিরে ধরছে। যেন কী একটা আক্রোশে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। পাহাড়শ্রেণির অজানা কোনো গহীন অন্তরাল থেকে তারা দলে দলে ছুটে এসে আমাদের ঘিরে ফেলছে। এরই মাঝে মেঘেদের ফাঁক দিয়ে দূরে অনেক নীচে দেখা গেল আমাদের কাল রাতের আস্তানা। উড়ন্ত ঈগল পাখির চোখে জুলুক কেমন দেখায় তা কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি। সবুজ জুলুক যেন সাদা মেঘের মুকুট পরে আছে। আমাদের ফেলে আসা অর্ধচন্দ্রাকার পথগুলো মনে হচ্ছে তার গলায় ঝুলন্ত মালা।

পাহাড়ের গায়ে শুধুই ঘাস জাতীয় গাছ। মাঝে মাঝে দু-একটা পাইন মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। এক সময় এসে পৌঁছোলাম জুলুক ভিউ পয়েন্টে। উচ্চতা ১০৪৫০ ফুট। এখান থেকে অনেক নীচে জুলুককে বড়ো সুন্দর দেখায়।

Zuluk View Point
জুলুক ভিউ পয়েন্ট।

গাড়ি থেকে নেমে কাঙালের মতো এ-দিক ও-দিক করছি যদি হঠাৎ মেঘ সরে গিয়ে প্রকৃতির দর্শন পাওয়া যায়। আমরা ক’জন ছাড়া এখানে আর এক জনও ট্যুরিস্ট নেই। এখান থেকে ভালো সানরাইজ দেখা যায়, কিন্তু মেঘই বাধা। “বাবুজি খুলজা সিম সিম বলিয়ে। মেঘ ক্লিয়ার হো জায়েগা।” ভূপালের কথায় হেসে ফেললাম। ওর কথা শুনে মৌসুমী চিৎকার জুড়ে দিল, “খুল যা সিম সিম।”

পাশেই বাঁশ ও টিন দিয়ে তৈরি এখানকার একমাত্র দোকানঘরটিতে হাজির হলাম। খানকয়েক পপকর্নের প্যাকেট কিনলাম। পপকর্ন শুধু যে পেট ভরায় তা নয়, এটি উচ্চতাজনিত কারণে শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যা থেকে রক্ষা করে।

দাম মিটিয়ে দুই দোকানির সঙ্গে গল্প জুড়ে দিলাম। ভোরবেলা নাথাংগামী কোনো গাড়িতে করে ওরা এখানে চলে আসে। সারা দিন বেচাকেনা করে বিকেলে ফিরে যায় লোয়ার জুলুক। বড়ো কষ্টের জীবন ওঁদের কিন্তু মুখের হাসিটি বড়ই স্বতঃস্ফূর্ত।

সবাইকে এ বার ডেকে নিলাম। যেতে হবে অনেক দূর। জুলুক থেকে নাথাং, কুপুপ হয়ে গ্যাংটক – ৯৩ কিমি রাস্তা। পথের উচ্চতা আরও বাড়বে। বেলা বাড়লে আবহাওয়া খারাপ হয় এই উচ্চতায়। এক বার আবহাওয়া খারাপ হলে বিপদে পড়তে হতে পারে। (চলবে)

ছবি: লেখক

 

0 Comments
Share
the-mysterious-silk-route-part-7-at-last-reached-zuluk
sudip paul
সুদীপ পাল

নিমাচেনে একটা ঝরনা আছে। নাম কিউখোলা ফল্‌স। এ পথের যাত্রীদের কাছে খুবই পরিচিত ঝরনা। ঝরনার কাছেই আমাদের গাড়ি দাঁড়াল। ১৫ ফুট উপর থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে জল নেমে আসছে। তবে শিস্নের ভুতখোলা ফলসের মতো অত জল নেই। সে অর্থে কিউখোলা ফলস দরিদ্রই বলা যায়। পাশেই বাঁ দিক থেকে একটা জলধারা এসে সমগ্র জায়গাটা জলময় করে রেখেছে। এই জল আন্ডারপাসের মাধ্যমে রাস্তার এ পার থেকে ও পারে গিয়ে কোন অজানার উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছে কে জানে?

ঝরনার পাশে একটা বছর পাঁচেকের শিশু জানি না কীসের খুশিতে আপন মনে হাততালি দিচ্ছে আর লাফাচ্ছে। এই বয়সটাই এমন, কারণে অকারণে মন খুশিতে ভরে যায়। এই শিশুদের কাছে বাস্তবের কোনো গুরুত্ব নেই। বাস্তবকে ছাপিয়ে যায় কল্পনার রং। হয়তো সে স্পাইডারম্যান হয়ে ঝরনার মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে উপরে উঠছে। কিংবা মাছ হয়ে সামনের জলে সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে। কল্পনার রাজ্যে তার অবাধ বিচরণ। আমরা বড়োরা শিশুদের এই কল্পনার রাজ্যে কোনো ভাবেই আর প্রবেশ করতে পারব না। আমাদের ছেলে রূপের বয়সও পাঁচ। তার ড্রইং খাতায় মাঝে মাঝেই কল্পনাশক্তির পরিচয় পাই। হয়তো এরা কী  দেখছে সে সব কয়েক সপ্তাহেই ভুলে যাবে। আকাশের মেঘের মতো সব কিছুই এদের কাছে ক্ষণস্থায়ী হলেও সব কিছুই রামধনুর মতো বর্ণময়।

que khola falls
কিউখোলা ফল্‌স।

আধ ঘণ্টা সময়  এখানে কাটিয়ে কিছু ছবি তুলে গাড়িতে ফিরে এলাম। রাস্তার ও পাশে ফুড কর্নারে ভূপাল কিছু খাওয়াদাওয়া করছে। দুপুর একটা। খিদে পাওয়ারই কথা। আমরাও ভূপালকে দেখে ড্রাই ফুডের প্যাকেট খুলে মুখ চালানো শুরু করলাম। কিছুক্ষণ বাদে ভূপাল ফিরে আসতেই আবার পথ চলা শুরু।

উচ্চতা যে বাড়ছে, গাছপালা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। এর মধ্যে আবার কুয়াশার উৎপাত। এমনিতেই পাহাড়ে বেলা বারোটার পর থেকেই আবহাওয়া খারাপ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে, তার উপর মেঘলা থাকলে তো কথাই নেই।

pamgolakha checkpost
প্যাঙ্গোলাখা চেকপোস্ট।

চলতে চলতে এক সময় গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। আশেপাশে দু’ চারটে বাড়ি দেখতে পাচ্ছি। রাস্তার ডান দিকে একটা সাদা রঙের ঘর। ঘরের দেওয়ালে লেখা আছে ‘প্যাঙ্গোলাখা চেকপোস্ট’। ঘরের পাশে সবুজ রঙের একটা বোর্ডে সাদা রং দিয়ে লেখা ‘ফরেস্ট চেক পয়েন্ট’।

আসলে এখান থেকে শুরু করে ছাঙ্গু লেক পর্যন্ত পুরো এলাকাটাই প্যাঙ্গোলাখা ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি। এখানে সিকিমের রাজ্য পাখি মোনাল তো আছেই এ ছাড়াও সিকিমের রাজ্য পশু রেড পান্ডা , হিমালয়ান মাস্ক ডিয়ার, লেপার্ড, গাউর, ফ্লাইং স্কুইরেল, হিমালয়ান ব্ল্যাক বিয়ার, বুনো শুয়োর, জংলী কুকুর প্রভৃতি আছে। ২০০২ সালে সিকিম সরকার ১২৮ বর্গ কিমির এই জঙ্গল এলাকাকে অভয়ারণ্য হিসাবে ঘোষণা করে। ১৩২০ মিটার উচ্চতা থেকে শুরু করে ৪৬০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত এর বিস্তৃতি।

আরও পড়ুন: রহস্যময় রেশম পথ / পর্ব ৬ : অরিটার হয়ে রংলি ছুঁয়ে জুলুকের পথে

গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। বেশ ঠান্ডা। যে হেতু অভয়ারণ্যে প্রবেশ করছি তাই একটা প্রবেশ মুল্য দিতে হবে। ভূপাল টাকা নিয়ে সাদা ঘরে চলে গেল। আমিও ক্যামেরা নিয়ে রেডি। মিনিট পাঁচেক পরেই শুনি ভূপাল ডাকছে। দুর বাবা, এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল! এখনও তো গাছের ফাঁক দিয়ে কোনো পান্ডা বা ভাল্লুক উঁকি মারছে কিনা তার সন্ধান করা হল না। নীচের দিকে কোনো মাস্ক ডিয়ার ঘাসপাতা চিবাতেও তো পারে। কি আর করব? অগত্যা আবার গাড়িতে গিয়ে বসলাম। আবার চলা শুরু।

towards Zuluk
জুলুকের পথে প্রকৃতির সাথে।

রাস্তার দু’ ধারে কুয়াশায় ঢাকা পাইন গাছের সারি। গাছের ডাল থেকে টপ টপ জল ঝরে পড়ছে। মাঝে মাঝে বৌদ্ধদের রঙবেরঙের প্রেয়ার ফ্ল্যাগ। দূরের পাহাড়গুলো থেকে সাদা মেঘেরা গুঁড়ি মেরে উপরে উঠে আসছে। পথের পাশে আর খাদ দেখা যাচ্ছে না। সমস্ত খাদ কেউ মেঘ ঢেলে ভর্তি করে দিয়েছে। আচমকা চোখে পড়ল লাল থোকা থোকা ফুল ফুটে আছে সামনের একটা গাছে। ভূপাল বলে উঠল, “ওই দেখুন রডোডেনড্রন।“

রডোডেনড্রন! আমার এই সময় এখানে আসার মূল কারণ দু’টি – এক, রডোডেনড্রন ফুল দেখা। এই সময়ই ফোটে এই ফুল। রডোডেনড্রন সিকিমের রাজ্য ফুল। আর দুই, বরফ দেখা, যার দর্শন হয়তো জুলুকের পর থেকে পাব।

“গাড়ি দাঁড় করাও, আমি নামব”, উত্তেজিত ভাবে বলে উঠলাম। আমার স্বপ্নের ফুল। কত ইচ্ছা ছিল রডোডেনড্রন ফুল দেখবো। আজ এই ফুল আমার সামনে! নিজের চোখে দেখেও যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। জীবনে প্রথম দেখছি রডোডেনড্রন ফুল। এর উজ্জ্বল লাল রং দেখে আমি মুগ্ধ।  হিংসুটে কুয়াশা শত চেষ্টা করেও এর রংকে চাপা দিতে পারেনি। কুয়াশা ভেদ করে ফুটে বেরোচ্ছে এর রূপ।

rhododendron flower 1
কুয়াশা মাখা রডোডেনড্রন।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দু’ চোখ ভরে দেখছিলাম রডোডেনড্রন ফুল। সম্বিত ফিরল ভূপালের ডাকে – “চলে আসুন। অনেকটা পথ যেতে হবে। সামনে আরও গাছ আছে, একটা ভালো জায়গা দেখে আবার দাঁড়াব।“

ঝরে পড়া কয়েকটা রডোডেনড্রন ফুল কুড়িয়ে নিয়ে ফিরে এলাম গাড়িতে। আবার পথ চলা শুরু। কিছুক্ষণ পরে মেঘ থেকে বেরিয়ে এলাম। পাইন গাছও আমাদের সঙ্গ ত্যাগ করেছে। এখন রাস্তার দু’পাশে শুধু ঘাস, আখের মতো সরু সরু বাঁশ গাছের ঝাড় আর গুল্মরাজি। পাহাড়ের খাদ তুলোর মতো সাদা মেঘে পরিপূর্ণ। এমন সময় আবার তার দর্শন পেলাম। এ বার ভুপাল নিজেই গাড়ি থামাল। এক গাল হেসে বলল, “এ বার নেমে দেখুন।”

দুমদাম সপার্ষদ গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। যেন নন্দন কাননে এসেছি। কানে যেন বেজে উঠল খিল খিল হাসি। পিছন ঘুরে দেখি রডোডেনড্রন ফুল আমার দিকে তাকিয়ে যেন হাসছে। কোন দিক দেখি? বাঁ দিকে রডোডেনড্রন ফুল আর ডান দিকে নিসর্গ। আমি তালকানা হয়ে গেছি।

rhododendron
মন ভরাল রডোডেনড্রন।

রডোডেনড্রনের সঙ্গে মনে মনে আমার অনেক কথা হল। আমার অবস্থা দেখে মনে হল ও যেন হাসছে। রডোডেনড্রন দেখার জন্য আমার এত বছরের অপেক্ষা আজ সার্থক হল। কিন্তু মেঘগুলো এমন উৎপাত করছে যে ভালো করে দেখা হচ্ছে না তাকে। কিন্তু আমি তো পথিক, আমায় তো এগোতেই হবে। কিন্তু তার আগে কিছু ভালো ছবি চাই তার।

কিন্তু ভালো ছবি পেতে হলে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে হবে যে। চেষ্টা করলাম, পারলাম না। আমার আকুলতা দেখে ভুপাল এগিয়ে এসে কী ভাবে উঠতে হবে দেখিয়ে দিল। ব্যাস আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তরতরিয়ে উঠে গেলাম ফুট দশেক উপরে। রডোডেনড্রন ফুল এল আরও কাছে। স্পর্শ করলাম, ছবি তুললাম। বললাম, এ বার আমায় যেতে হবে।

রডোডেনড্রন তো যেতে দিতে চায় না। সে যেন চায় রাতের আঁধারে চাঁদের আলোয় নীল আকাশের চাঁদোয়ার নীচে মেঘের বিছানায় রাত কাটিয়ে দিই।

না লাল রূপসী। এ বার আমায় যেতেই হবে। আবার দেখা হবে একদিন।

অরূপদা ডাকাডাকি করছে। ঘোর কাটিয়ে নীচে নেমে আবার গাড়িতে গিয়ে বসলাম। ইচ্ছা করছে এখানেই থাকি আজকের রাতটা। কিন্তু বাস্তব বড়ো কঠিন ঠাই। সেখানে ইচ্ছার বড়ো একটা মূল্য নেই।

near zuluk
জুলুকের কাছে।

গাড়ি চলছে, জুলুকের দূরত্ব ক্রমশ কমছে। আকাশে বাড়ছে মেঘের ঘনঘটা। আধ ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম আমাদের আজকের গন্তব্য জুলুকে। ঘড়ি বলছে এখন বিকাল চারটে। ঘড়ি যা-ই বলুক তাতে আমাদের কিছু যায়-আসে না। আজ আমরা সময়ের দাসত্ব শৃঙ্খলকে ছিন্ন করে ফেলেছি। গাড়ি থামল, শুরু হল টিপ টিপ বৃষ্টি । (চলবে)

ছবি লেখক

0 Comments
Share
the-mysterious-silk-route-part-6-on-the-way-to-zuluk-via-aritar-and-rongli
sudip paul
সুদীপ পাল

আজ আমাদের গাড়ি ও ড্রাইভার বদল হয়েছে।  রিশিখোলায় প্রাতরাশ সেরে মহীন্দ্রা কোম্পানির একটি গাড়িতে যাত্রা শুরু করেছি। সারথিও বদল হয়েছে। পেয়েছি ভূপাল ছেত্রীকে।

রিশিখোলার কাছেই রুংডিং দিয়ে যাওয়ার সময় ভূপাল বলল- “এখানে একটা মন্দির আছে। বিশ্ববিনায়ক মন্দির। যাবেন?”  যাব না মানে? আলবাত যাব। বেড়াতেই তো এসেছি। দু’-তিন মিনিটের মধ্যেই বিশ্ববিনায়ক মন্দির পৌঁছে গেলাম। বিশাল আকারের গণেশ মন্দির। ইট, বালি, সিমেন্টের তৈরি মন্দিরের গায়ে শিল্পকর্ম বিশেষ কিছু নেই তবে মন্দিরের ভিতরে বিশাল গণেশমূর্তিটি খুব সুন্দর। হলুদ ও রুপোলি মূর্তির দু’ দিকে ৮টি করে ১৬টি হাত আছে। রুপোলি পদ্মফুলের উপর গণেশ উপবিষ্ট। ফলকে দেখলাম সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী পবন চামলিং ২০০৮-এর ২০ এপ্রিল এই মন্দিরের শিলান্যাস করেন। মন্দিরের দরজা খোলে ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর।

Vishwa Vinayak temple
বিশ্ব বিনায়ক মন্দির।

কাল রিশিখোলা নদীতে স্নান করেই হোক বা অন্য কোনো কারণেই হোক, রাত থেকে রূপের জ্বর এসেছে। আমরা মন্দির দর্শন করলেও মৌসুমী গাড়িতেই ছিল ছেলেকে নিয়ে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য লামপোখরি লেক। নেপালি ভাষায় ‘পোখরি’ শব্দের অর্থ পুকুর। লেকটা অরিটারে, তাই একে অরিটার লেকও বলা হয়।

লেকে ঢোকার মুখেই সবার টিকিট, পার্কিং চার্জ, সব মিটিয়ে ফেলতে হল। গাড়ি সমেত ভিতরে ঢুকে গেলাম। আমরা গাড়ি থেকে নেমে এলেও মৌসুমীকে গাড়িতেই থাকতে হল। ছেলেটা ঘুমোচ্ছে। গাড়িতে বসেই অবশ্য সে লেক দেখতে পাচ্ছে।

rungding
রুংডিং গ্রাম।

পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম লেকের ধারে। পান্না সবুজ লেকের ধারে দু’টো রাজহাঁস খুনসুটি করছে। লেকের ধারে গোলাপ ও অন্যান্য ফুলের গাছে ফুল ফুটে আছে। এখানকার উচ্চতা ৪৬০০ ফুট। ঠান্ডা বা গরম, কোনোটাই অনুভূত হচ্ছে না। লেকের দৈর্ঘ্য ১১২০ ফুট ও ২৪০ ফুট চওড়া। উপর থেকে লেকটা পুরো বুটের মতো লাগে, তাই অনেকে একে বুট লেকও বলে।

লেকের ধার বরাবর রেলিং দেওয়া রাস্তা। হাঁটতে হাঁটতে প্রায় অর্ধেক চলে এসেছি। পান্না সবুজ জলে বোটিংও করছে কেউ কেউ। আমার নিশ্চিত ধারণা জলে প্রচুর পরিমাণ ফাইটোপ্ল্যাংটন থাকার কারণে জলের রং সবুজ। পাইন ও অন্যান্য গাছে ঘেরা লেকের ওপারে একটা ছোটো মন্দির। সম্ভবত শিবমন্দির।

ratay khola falls
রাতেখোলা ফল্‌স।

আধ ঘণ্টা কাটিয়ে গাড়িতে ফিরে এলাম। যেতে হবে বহু দূর। মাঝে রংলিতে অনেকটা সময় ব্যয় হবে। যেতে যেতে গাড়ি থেকে অরিটার জায়গাটা দেখে মনে হল বেশ বর্ধিষ্ণু এলাকা। বাড়ি, হোটেল সবই সুদৃশ্য ও সাজানোগোছানো। জায়গাটা সিকিমে। আমি আজ পর্যন্ত সিকিমে কোথাও ঝুপড়ি বা ভাঙাচোরা বাড়ি দেখিনি।

রংলির পথে চলতে চলতে পেয়ে গেলাম একটা ঝরনা, বোর্ডে লেখা ‘রাতেখোলা ফলস’। জায়গাটার নাম দালাপচাঁদ। গাড়ি দাঁড় করিয়ে নেমে এলাম। প্রায় ৮ ফুট উপর থেকে ক্ষীণকায়া এই ঝরনা ঝাঁপ দিয়ে পড়ছে। তার পর রাস্তা পেরিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে রংপোখোলায় মিশেছে। এ জায়গার উচ্চতা অরিটারের থেকেও কম, মাত্র ৩১৫০ ফুট। আমরা ক্রমশ নীচের দিকে নামছি। রংলির উচ্চতা আরও কম, ২৭০০ ফুট।

writer with dilip raj pradhan
দিলীপরাজ প্রধানের সঙ্গে লেখক।

কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা রংলি চলে এলাম। গাড়ি সোজা মঙ্গলদীপ রিসর্টের সামনে এসে থামল। আমার পূর্ব-পরিচিত দিলীপরাজ প্রধান এই রিসর্টের মালিক। তিনিই আমাদের এই ট্যুরের ব্যাবস্থাপনার দায়িত্বে। গাড়ি থেকে নেমে রিসেপশন কাম অফিসে ঢুকলাম। ভিতরে দিলীপজি চেয়ার-টেবিলে বসে কিছু লিখছিলেন। আমাদের দেখে উঠে দাঁড়িয়ে এক গাল হেসে অভ্যর্থনা জানালেন। তার সঙ্গে এই প্রথম সাক্ষাৎ আমাদের। আলাপ-পরিচয়ের মধ্যেই ধপধপে সাদা কাপ-প্লেটে চা এল।

সিল্ক রুট বা রেশম পথে যাওয়ার অনুমতি নিতে হয় রংলি থেকেই। দিলীপজি আমাদের জন্য সেই অনুমতির আবেদনপত্র পূরণ করে ভূপালের হাতে ধরিয়ে দিলেন। রিসর্টের লনে চলে এলাম। দিলীপজি আমাদের সবাইকে খাদা পরিয়ে সম্মান জানালেন। খাদা হল মাফলারের আকারের একটা রেশম বা টেরিকটের কাপড়। সিকিমে এটাই সম্মান জানানোর রীতি। এমন সম্মান আমি বা আমাদের দলের কেউই আগে কখনও পায়নি। আমরা অভিভূত।

rongli market
রংলি বাজার।

রংলি বাজারে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ভূপাল পারমিশন করাতে গেল। এই ফাঁকে আমরা কিছু ওষুধ কিনে নিলাম। অরূপদা  সেলুনে ঢুকল। সেলুনে তো রীতিমতো পাখা চলছে। বেশ গরম এখানে। কপালে ঘাম জমছে বুঝতে পারছি। কিছুক্ষণ ভূপাল অনুমতিপত্র নিয়ে এল। বিরতি শেষে আবার আমাদের যাত্রা শুরু হল।

রংলি থেকে রাস্তা চড়াই হচ্ছে পরিষ্কার বুঝতে পারছি। কিছুটা যাওয়ার পর ভূপাল গাড়িটা রাস্তার এক ধারে দাঁড় করিয়ে দিল। আমরাও গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। জায়গাটার নাম শিস্নে। আমাদের ডান দিকে সুগভীর খাদ থাকলেও অনেকটা নীচে একটা সেতু সামনের পাহাড়ের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করছে। আর কংক্রিটের সেতুর পাশেই একটা মনোরম ঝরনা পাশের পাহাড় থেকে দৌড়ে এসে সোজা খাদে ঝাঁপ দিয়েছে। ঝরনার নাম ভুতখোলা ফলস। আমরা যেখানে আছি সেখান থেকে ঝরনার কাছে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। যেতে হলে আমাদের পিছনে ফিরে যেতে হবে এবং অনেকটা ঘুরে ঘুরে যেতে হবে। কাছে গেলে ঝরনাটা সামনে থেকে দেখতে পাব ঠিকই, কিন্তু বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সবুজ পটভূমিতে আমরা সাদা ঝরনার যে রূপ এখান থেকে দেখতে পাচ্ছি সেটা কোনো মতেই পেতাম না।

bhootkhola falls
ওই দেখা যায় ভুতখোলা ফল্‌স।

রংলিতে যেমন একটা গরম ভাব ছিল এখানে সেটা নেই। কিন্তু ঠান্ডাও নেই। বেশ মনোরম একটা তাপমাত্রা। আমাদের সামনে সবুজ গাছে মোড়া উঁচু উঁচু পাহাড় পরিষ্কার বুঝিয়ে দিচ্ছে আমরা আরও অনেক উপরে উঠব অর্থাৎ আমাদের জন্য আরও অনেক সৌন্দর্য নিয়ে প্রকৃতি অপেক্ষা করছে। পাহাড়ের গা বেয়ে আমরা যত যাচ্ছি ততই উচ্চতা বাড়ছে একটু একটু করে, তার কারণে তাপমাত্রাও ক্রমশ কমছে। গাছপালার ধরনও বদলে যাচ্ছে। প্রকৃতির রূপ আরও খুলছে।এক সময় গাড়ির জানলার কাচ তুলে দিতে হল। গাড়ি এসে থামল লিংতামে।

lingtam
পুলিশ চৌকিতে পরীক্ষা হোল অনুমতিপত্র। লিংতাম।

লিংতাম একটা ট্যুরিস্ট স্পট। সিল্করুটগামী অনেক ট্যুরিস্টই এখানে একটা রাত কাটিয়ে যান। রাস্তার ধারে বাড়ি, হোটেল, হোমস্টের ছড়াছড়ি। আমরা এখানে থাকব না বা ঘুরে দেখবও না। পুলিশ চেকপোস্টে অনুমতিপত্র দেখিয়ে এগিয়ে যাব। ভূপাল গাড়ি থেকে নেমে অনুমতিপত্র দেখিয়ে আবার ফিরে এল। মিনিট পাঁচেকের বিরতি শেষে আবার যাত্রা।

আরও পড়ুন: রহস্যময় রেশম পথ / পর্ব ৫ : রিশিখোলার আলোছায়া

লিংতাম থেকে যত সামনে এগোচ্ছি পাহাড়গুলো ততই বিশালাকৃতি হয়ে উঠছে। আমাদের ফেলে আসা পথ পাশের পাহাড়ের গায়ে আলপনা এঁকে এগিয়ে গিয়েছে দেখতে পাচ্ছি। নীচের দিকে তাকালে মাথা ঘুরে যাওয়ার উপক্রম। ভূপাল একটা উঁচু পাহাড়ের মাথার দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, “ওই পাহাড়ের মাথায় আমরা যাব। ওই যে সাদা বাড়িটা দেখা যাচ্ছে বিন্দুর মতো, ওখানেই যাব।“

after lingtam
লিংতাম ছাড়িয়ে ফেলে আসা পথ।

যাব তো বুঝলাম কিন্তু এর উচ্চতা এখান থেকে অনেক। এমন এক জায়গায় আছি যেখান থেকে নীচের দিকে তাকালে মনে ভীতির সঞ্চার হয়, আবার উপর দিকে গন্তব্যের দিকে তাকালেও প্রাণে ভীতির সঞ্চার হয়। আমাদের বুক ঢিপ ঢিপ করলেও ভূপাল কিন্তু ভীষণ স্বাভাবিক। সে হাসছে, গল্প করছে। তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। উচ্চতায় আমার একটু ভয় আছে যার কারণে ছাদের চওড়া রেলিং পেলেও সেখানে বসতে পারি না বা উঁচু দোলনায় চাপতে পারি না। মনে হয় মাথা ঘুরে পড়ে যাব। আমার কথা বাদ দিলাম, দলের বাকিদের মুখেও তেমন সাড়াশব্দ পাচ্ছি না। সব নির্বাক হয়ে আছে।

সব কিছুরই শেষ আছে। এই পথেরও শেষ হল এক সময়। সেই পাহাড়ের মাথায় এলাম অবশেষে। জায়গাটার নাম নিমাচেন। উচ্চতা ৩৬০০ ফুট। রংলির উচ্চতা ২৭০০ ফুট। এত উঁচু উঁচু পাহাড় পেরিয়ে মাত্র ৯০০ ফুট উচ্চতা বাড়ল! এখন যে উচ্চতায় আছি আজই এর প্রায় তিন গুণ উচ্চতায় পৌঁছোব আমরা। আমাদের আজকের গন্তব্য জুলুক, উচ্চতা ৯৫০০ ফুট। (চলবে)

ছবি লেখক

 

0 Comments
Share
the-mysterious-silk-route-part-5-the-light-and-shade-of-rishikhola
sudip paul
সুদীপ পাল

কথা চলছে, উনিও রঙের ব্রাশ চালিয়ে যাচ্ছেন। জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার নাম তো সেবাস্টিয়ান প্রধান। আপনি কোন ধর্মের মানুষ?

মৃদু হেসে বললেন, আমি হিন্দু, আমি বৌদ্ধ আবার আমি খ্রিস্টান

– মানে?

– আমি ছিলাম খ্রিস্টান। পরে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করি, বহু দিন এই ধর্মে থেকেও মনের শান্তি পাইনি। অবশেষে হিন্দুধর্মের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করি। বুঝতে পারি এখানেই আমার শিব লাভ হবে। এখানেই পাব শান্তি। তাই আবার ধর্ম পরিবর্তন করে হিন্দু হলাম।

– শান্তি পেয়েছেন? পেয়েছেন ঈশ্বর?

– হ্যাঁ, আমি ঈশ্বর লাভ করেছি। আমি তাঁর দর্শনও পেয়েছি।

কথাটা শুনে চমকে উঠলাম। ঈশ্বর পাওয়া কি এত সোজা? বছরের পর বছর সাধনা করেও সাধু-সন্তরা ঈশ্বরের দেখা পান না। ইনি তো গৃহী মানুষ। কিন্তু তাঁকে অবিশ্বাস করতেও ইচ্ছা হচ্ছে না। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝে দাঁড়িয়ে আছি। মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন ঘুরছে। জিজ্ঞাসা করব, কিন্তু অরূপদা আমার নাম ধরে হাঁকডাক জুড়ে দিয়েছে। “আবার পরে কথা বলবো” বলে চলে এলাম।

আরও পড়ুন রহস্যময় রেশম পথ / পর্ব ৪ : রিশিখোলায় জলকেলি

অরূপদার হাওয়াই চপ্পলও ওই ফেলে আসা ব্যাগে রয়ে গিয়েছে। একটা চপ্পল কেনার জন্য সে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। খবর নিয়ে জানলাম সামনে বাজার বলতে হেঁটে ২ কিমি যেতে হবে পাকা রাস্তায়। হেঁটে গিয়ে চপ্পল কিনে ফিরে আসতে আসতে আজকের দিনটার বারোটা বেজে যাবে। রিসর্টের কেউ বাজার যাবে কিনা খবর নিলাম। জানলাম ওরা আজ সকালেই বাজার করে এনেছে। আবার কাল।

অরূপদার সঙ্গে কথা বলে বিকেলের প্রোগ্রাম, সন্ধের ক্যাম্পফায়ার ইত্যাদির ব্যবস্থা করে ফেললাম। ক্যাম্পফায়ার হবে, হবে মাংসের বার্বিকিউ। রিসর্ট সব ব্যবস্থা করে দেবে।

wooden bridge over rishi river
রিশি নদীতে সাঁকো।

এ বার সবাই মিলে একটু পদচারণা করতে বেরোলাম। অরূপদাকে আমার হাওয়াই চটিটা দিয়ে আমি খালি পায়ে চললাম। রিশিখোলা নদীর ধার ধরে পাথরের উপর দিয়ে হাঁটছি। নির্জন পরিবেশে নদীর ছলাত ছলাত শব্দ একটা অন্য রকম আবহ সৃষ্টি করেছে। মাঝেমাঝে ছোটো ছোটো দু’-একটা পাখি ইতিউতি উড়ে যাচ্ছে। নদীর দু’ পাশে জঙ্গল। মাথার উপর নীল আকাশ। নদীর বুকে নীল-সবুজের প্রতিফলনের মাঝে ছিটকে-ওঠা জলের আলপনা দেখতে দেখতে কখন যেন হারিয়ে গিয়েছি। পিছন ফিরে দেখি আমার সঙ্গে শুধু রূপ, এই জঙ্গুলে পরিবেশে হরিণশিশুর মতোই লাফাতে লাফাতে চলেছে। বাকিরা পাথরের উপর হাঁটতে না পেরে রণে ভঙ্গ দিয়ে একটা বড়ো পাথরে বসে পড়েছে।

আমরা বাপ-বেটা প্রকৃতিকে গায়ে মেখে তার না-বলা কথা শুনতে শুনতে আরও এগিয়ে চললাম। মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন পাথরের গায়ে রঙের আলপনা দেখছি। আজ যেখানে হিমালয় পর্বত এক সময় এখানেই ছিল টেথিস সাগর। সমুদ্রগর্ভে একের পর পলি জমে জমে এ পাথরের সৃষ্টি। পাথরগুলি ভালো করে দেখলে পলির স্তরগুলো পরিষ্কার বোঝা যায়।

road being built along rishi river
রিশি নদীর ধার দিয়ে তৈরি হচ্ছে রাস্তা।

অনেকটাই চলে এসেছি। আলো কমতে শুরু করেছে। এ বার ফেরা যে পথে এসেছিলাম। ২০০০ ফুট উচ্চতায় এই রিশিখোলা আর কিছু দিন পর আর এত শান্ত থাকবে না। নদীর ধার দিয়ে রাস্তা তৈরি হচ্ছে। বছর খানেক পরেই রিশিখোলার গায়ে লাগবে কৃত্রিমতার ছোঁয়া।

নদীর ধার থেকে একটা রাস্তা উপর দিকে উঠে গিয়েছে। সেই রাস্তায় এ বার পাড়ি জমালাম। জংলা পথ। খালি পায়ে হাঁটতে একটু ভয় লাগলেও এগিয়ে চললাম সাবধানে। কিছুটা গিয়েই একটা হোমস্টে। পুরো জঙ্গলের মধ্যেই বলা যায়। আরও একটু এগিয়ে গেলাম। খচমচ আওয়াজ শুনে পিছন ঘুরে দেখি একটা ১২/১৩ বছরের ছেলে আসছে। এখানে তো সর্বমোট ৩টে হোমস্টে দেখলাম। তার মধ্যে একটায় আমরা আছি। এই জঙ্গলে স্থানীয় মানুষের বসতিও নেই। তা হলে ছেলেটা কোথা থেকে এলো?

কিছু বলার আগেই ছেলেটি আমায় হিন্দিতে প্রশ্ন করল – এ দিকে কোথায় যাচ্ছেন?

– এই একটু ঘুরে দেখছি। আচ্ছা এই রাস্তা কোথায় গেছে?

– মেন রোডে।

– এখান থেকে কত দূর?

– আমার যেতে ১৫/২০ মিনিট লাগবে। আপনাদের অভ্যাস নেই, আধ ঘণ্টা লেগে যাবে।

jungle path
জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পথ।

এইটুকু ছেলে এত হিসাব জানে! ছেলেটা আমায় ছেড়ে হন হন করে এগিয়ে গেল। জঙ্গলের মেঠোপথে গাছপালার আড়ালে চলে গেল। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়া দেখলাম। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে আলোআঁধারি ফুঁড়ে ছেলেটা কতটা পথ পাড়ি দেবে কী জানি! ছেলেটা কোথা থেকে এল, সেটাও তো জানা হল না।

ফিরে এলাম হোমস্টের সামনে। সুর্যদেব সামনের পাহাড়ের আড়ালে গা ঢাকা দিয়েছেন অনেকক্ষণ। চার পাশে এখনও বেশ আলো, তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকারে ডুব দেবে রিশিখোলা। হোমস্টে থেকে ৫০ টাকা দিয়ে ছিপ ভাড়া করে কয়েক জন নদী থেকে বরোলি মাছ ধরছেন। মৌরলা মাছের মতো ছোটো ছোটো মাছ।

একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, “মাছ উঠছে?”

তিনি হাসিমুখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওই উঠছে আর কী।”

– কতগুলো ধরলেন?

fishing in rishi river
রিশি নদীতে মাছ ধরা।

ভদ্রলোক একটা ছোটো বালতি তুলে দেখালেন। তাতে ১০/১২টা মাছ আছে। বুঝলাম ৫০ টাকা খরচ করে এঁরা আনন্দ কিনছেন। যাঁদের ছিপ ফেলার নেশা আছে তাঁরা লাভ-ক্ষতির হিসাব জানেন না। এই আনন্দ সবাই বোঝে না, বোঝানোও সম্ভব নয়। মনে আছে ছোটোবেলায় পাড়ার একজনের পুকুরে ছিপ ফেলতে গিয়েছিলাম। সেটাই ছিল জীবনে প্রথম বার ছিপ ফেলা। অপটু হাতে দু’টো তেলাপিয়াও ধরেছিলাম। কিন্তু বাড়িতে আমার এই সাফল্যের কেউ মূল্য দিল না। বাবা এমন মার মারল যে সে দিনই জীবনের শেষ ছিপ ফেলা হয়ে গেল আমার।

ঘরের সামনে বারান্দার মতো কিছুটা জায়গা। সেটা আসলে চলাচলের রাস্তা। সেখানে চেয়ার পেতে মৌসুমী, অরূপদা, বৌদি বসে আছে। এখান থেকে নদী-সহ সামনের নিসর্গ বড়ো সুন্দর লাগে। এমন নিসর্গ দেখতে দেখতে চা খাওয়ার সুযোগ কদাচিৎ পাওয়া যায়।

আঁধার নেমেছে। হালকা মেঘলা আকাশ। কোনো তারা দেখা না গেলেও হালকা একটা আলো-আলো ভাব। ক্যাম্পফায়ারের আগুন জ্বলা শুরু হয়েছে এ-দিকে ও-দিকে। আমাদের এখনও শুরু হয়নি। মিস্টার প্রধানের ছোটো মেয়ের কাছে খোঁজখবর নিতে গেলাম। ক্যাম্পফায়ারের ব্যাপারটা সে-ই দেখে। সে জানাল, কাঠ সাজানো আছে। আমাদের যথাস্থানে বসতে বলল।

ঠিক সাড়ে ৮টা। আমাদের ক্যাম্পফায়ারের আগুন জ্বলে উঠল। গান-বাজনার ব্যবস্থা নেই। নিজেরাই হুল্লোড় করছি। আমাদের পাশে কয়েকটি ছেলেমেয়ে ক্যাম্পফায়ারে মদের ঝরনাধারা বইয়ে দিয়েছে। আমরা হাঁ করে ওদের বিচিত্র কাণ্ডকারখানা দেখছি। এমন সময় দেখি, মিস্টার প্রধানের ছোটো মেয়ে আসছে, সঙ্গে হুঁকো টানতে টানতে আসছে ১২/১৩ বছরের এক কিশোর। অর্থাৎ হুঁকোর আগুনটা ভালো করে ধরানোর জন্য বাচ্চাটাকে দিয়ে টানানো হচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে থাকতে না পেরে তীব্র প্রতিবাদ করলাম। কিন্তু আমার কথার কোনো জবাব না দিয়ে তারা চলে গেল।

এখানে এসে অব্দি দেখতে পাচ্ছি শৈশবকে জাঁতায় পেশা হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। এ সব দেখে মিস্টার প্রধানের প্রতি শ্রদ্ধা ও অশ্রদ্ধা দু’দিকের পাল্লাই সমান হয়ে উঠেছে আমার মনে। এ সব এখানে দেখার প্রত্যাশা আমি করিনি।

৫০০ গ্রাম মুরগির মাংসের বার্বিকিউ করা হয়েছিল। দু-এক পিস করে খেয়ে ক্যাম্পফায়ারে ইতি টানলাম টেনে দিলাম। সাড়ে ৯টা বাজে। আমাদের পাশের ছেলেমেয়েগুলো তখনও জঠরে তরল ঢেলে চলেছে। কথা জড়িয়ে গিয়েছে কিন্তু হাত সাবলীল। মদবিহীন আমাদের ক্যাম্পফায়ার নেহাত মন্দ হয়নি। আজকের এই সন্ধ্যা আমাদের বহু দিন মনে থাকবে।

কাল সকালে এখান থেকে চলে যাব। কিন্তু এই একটা দিন আমাদের যেন অনেক কিছু দিয়ে গেল। জীবনে আর কখনও এখানে আসব কিনা জানি না তবে ভবিষ্যতে রিশিখোলার কী হাল হতে চলেছে সেটা অনুমান করে আজ আমরা গর্ব করতেই পারি। কারণ আমরা যা দেখলাম আগামী দিনে রিশিখোলার এই রূপ আর কেউ দেখবে না। (চলবে)

ছবি লেখক

0 Comments
Share
the-mysterious-silk-route-part-4-playing-with-rishikhola
sudip paul
সুদীপ পাল

আমাদের গাড়ির আগে আগে একটা ট্রেকার যাচ্ছিল। ট্রেকারে স্কুলের ছাত্রছাত্রী। বাড়ি ফিরছে। আমরা ওদের দেখছি, ওরাও আমাদের দেখছে। এই ভাবে বেশ কিছুটা যাওয়ার পর ট্রেকারটা থেমে গেল। গাড়ি থেকে কয়েক জন নেমে হাত নেড়ে আমাদের বিদায় জানাল। আমাদের গাড়িটাও এগিয়ে চলল রিশিখোলার দিকে। পথের নিসর্গের কোনো তুলনা নেই।

নেপালি ভাষায় খোলা শব্দের অর্থ ছোটো নদী। রিশিখোলার অর্থ রিশি নদী। রিশি নদীকে কেন্দ্র করে রিশিখোলায় গড়ে উঠেছে পর্যটনকেন্দ্র। রিশি নদীর এক পারে পশ্চিমবঙ্গ এবং অন্য পারে সিকিম। মাঝে সেতু। সেতুর এ প্রান্তে পশ্চিমবঙ্গ, অপর প্রান্তে সিকিম। পর্যটকরা যে কোনো দিকেই থাকতে পারেন। দু’দিকেই হোম স্টে আছে।

on the way to rishikhola
রিশিখোলার পথে সেই ট্রেকার।

আমরা পশ্চিমবঙ্গের দিক থেকে আসছি তাই আমাদের গাড়ি সেতুর উপর দাঁড়িয়ে গেল। ও পারেই সিকিম পুলিশের চৌকি। সেখানে আমাদের পরিচয়পত্র জমা দিতে হবে। সিকিম ছাড়া ভারতের যে সব রাজ্যে আমি গিয়েছি, সে সব রাজ্যে প্রবেশের জন্য কোথাও পরিচয়পত্র দেখাতে হয়নি বা তার কপি জমা দিতে হয়নি। এমনকি কাশ্মীরেও না।

ব্রিজের নীচে দিয়ে রিশি নদী বয়ে চলেছে কুলকুল করে। ব্রিজের ঠিক পরেই নদী দু’ ভাগ হয়ে দু’ দিকে বয়ে গিয়েছে সরু ধারায়। সুরজ কাগজপত্র জমা দিতে গিয়েছে, আমরা ফোটো তুলতে লেগে গিয়েছি হইহই করে। কিছুক্ষণ পর সুরজ ফিরল, আমরা আবার রওনা হলাম। গাড়ি এ বার কাঁচা পাকদণ্ডী ধরে নীচে নামা শুরু করল। মাটি কেটে রাস্তা চওড়া করা হয়েছে। পথের ধারে যন্ত্রপাতি, খোয়া প্রভৃতি দেখে বুঝলাম এ রাস্তা পাকা করার তোড়জোড় চলছে। অর্থাৎ শান্ত, নিরিবিলি রিশিখোলাকে আমরা হারাতে চলেছি।

rishi river
রিশি নদী।

গাড়ি এক সময় নদীর পাশে চলে এল। নদীর বাঁ দিক দিয়ে কিছুটা চলার পর আমাদের অবাক করে দিয়ে গাড়িটা ঝপাং করে জলে নেমে পড়ল। শুধু তা-ই নয়, নদী পেরিয়ে সোজা ও পারেও চলে এল! অর্থাৎ আমরা আবার পশ্চিমবঙ্গে।

গাড়ি এসে থামল রিশি ইকোট্যুরিজম রিসর্টে, যার মালিক সেবাস্টিয়ান প্রধান। এখানেই আমরা থাকব। এটা নামেই হোমস্টে। আসলে এটা লজই বলা যায়। ৬/৭ জন কর্মচারী এখানে কাজ করেন। গাড়ি থেকে নামতেই দু’জন এগিয়ে এসে আমাদের মালপত্র তুলে নিল। দু’টো ঘর বুক করা ছিল। তাঁরা ঘর দেখিয়ে দিয়ে গেলেন। ইতিমধ্যে আবিষ্কার হল মৌমিতা বৌদি তাঁর ভিজে পোশাক ভর্তি প্লাস্টিকের ব্যাগটা রামধুরায় ফেলে এসেছেন।

আরও পড়ুন রহস্যময় রেশম পথ / পর্ব ৩ : ইচ্ছে গাঁও ছুঁয়ে সিলারি গাঁওয়ে এক ঝলক

মনটা আনচান করছে নদীতে নামার জন্য। ব্যাগকাণ্ডে বৌদির মন খারাপ, অরূপদার সাথে একপ্রস্থ কথা কাটাকাটিও হয়েছে। অরূপদা বা বৌদি নদীতে যেতে চাইল না। অগত্যা আমরাই নদীতে নামলাম। কোথাও গোড়ালি ডোবা জল আবার কোথাও একটু বেশি। হাঁটু পর্যন্ত জল কোথাও নেই। এক জায়গায় পাথর সরিয়ে কোমরসমান গভীরতা তৈরি করে রাখা হয়েছে স্নানের জন্য।

rishikhola 2
রিশিখোলা।

ছোটো ছোটো পাথরবিছানো বিছানার উপর দিয়ে কুলকুল করে রিশি নদী বয়ে চলেছে। জল খুব ঠান্ডা না হলেও প্রথম স্পর্শে বেশ ঠান্ডা লাগল। নদীর এ-পার ও-পার করার জন্য খুব সরু একটা বাঁশের সাঁকো আছে।  জলে নেমে কিছুটা হেঁটে এগিয়ে গিয়ে সটান শুয়ে পড়লাম জলের মধ্যে। পাথরগুলো একটু পিছল হয়ে আছে। অসাবধান হলে পা পিছলে দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

সারা রাস্তা ধুলো মেখে আসা গাড়িগুলোকে ড্রাইভাররা সোজা নদীতে নামিয়ে দিয়ে নদীর জলে ধুয়ে নিচ্ছে। গাড়ি ধোয়ার এমন ভালো সুযোগ আর কোথায় পাবে? স্নান সেরে উঠে পোশাক বদলে খাবার টেবিলে গিয়ে বসলাম। পেটে যে ছুঁচোয় কীর্তন করছে সেটা বোঝা গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে গেল ডাল, ভাত, তরকারি, আলুভাজা, ডিমের ঝোল, পাঁপড় আর আচার। কিন্তু যেটা খারাপ লাগল সেটা হল একটা ১২/১৩ বছরের ছেলে এখানে খাবার সার্ভ করছে। শুধুমাত্র সস্তায় কাজ করানো যাবে বলে নির্বিচারে শিশুশ্রমের মতো একটা জঘন্য কাজ করিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

খাওয়া শেষ করে সেবাস্টিয়ান প্রধানের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। মানুষটাকে দেখার, আলাপ করার ইচ্ছা আমার অনেক দিন ধরেই ছিল। আজ সুযোগ পেয়েছি। আজ সিল্ক রুটে ট্যুরিস্টরা যে ভ্রমণ করছেন তা অনেকটাই সম্ভব হয়েছে এই মানুষটির জন্য। আজ পত্রপত্রিকার পাতায় রেশম পথে ভ্রমণের  প্রচুর বিজ্ঞাপন দেখতে পাই। অলিতে-গলিতে “চলুন বেড়িয়ে আসি সিল্ক রুট” মার্কা বোর্ড দেখা যায়। রেশম পথকে কেন্দ্র করে চলে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা। এ সবের মূলে আছেন সেবাস্টাইন প্রধান।

sebastian pradhan
কাজে ব্যস্ত সেবাস্টিয়ান প্রধান।

মোটা মোটা কাঠের পায়ার উপর দাঁড়িয়ে আছে কর্টেজ। সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলাম। সামনেই সেবাস্টিয়ান প্রধান আন্ডারপ্যান্ট ও স্যান্ডো গেঞ্জি পরে নিজের হাতে নতুন ঘরের কাঠের দেওয়ালে নীল রং করছেন। তাঁকে দেখে মনে হয় তাঁর বয়স ৫০ থেকে ৫৫, কিন্তু বাস্তবে এখন ৭৪ বছর বয়স। এই বয়সে তাঁর কর্মতৎপরতা দেখলে চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে। আলাপ-পরিচয় হওয়ার পর তাঁর কাছে শুনলাম কী ভাবে তিনি সিল্ক রুটে ট্যুরিজমের সূচনা করলেন।

আগে ওই পথ শুধু সেনাবাহিনী আর সরকারি কাজে সরকারি কর্মীরাই ব্যবহার করতেন। রাস্তার কাজ ও সেনাবাহিনীতে কুলির কাজ করেন, জুলুক, নাথাং ভ্যালি প্রভৃতি জায়গার এমন কিছু মানুষ, ওই পথে যাওয়া-আসা করতে পারতেন। এই পথে পর্যটনের প্রবল সম্ভবনা দেখেছিলেন সেবাস্টিয়ান প্রধান। সিকিম সরকারের সঙ্গে চিঠিপত্র বিনিময় শুরু করলেন, মন্ত্রীদের কাছে দরবার করা শুরু করলেন। সিকিমের অধিকাংশ পর্যটকই বাঙালি। “বাঙালিরা ও পথের প্রবল ঠান্ডা সহ্য করতে পারবে না, মারা যাবে”, এই কারণ দেখিয়ে সরকার কিছুতেই অনুমতি দিতে রাজি হল না।

flower at rishikhola
ফুলের বাহার, রিশিখোলা।

অনেক দড়ি টানাটানির পর অবশেষে ২০০৭ সালে সাফল্য আসে, সরকার অনুমতি দেয়। তবে এই অনুমতির পিছনেও শর্ত আরোপ করা হয়। এ পথে কেউ রাত্রি যাপন করতে পারবে না। রংলি বা পদমচেন থেকে যাত্রা শুরু করে সে দিনই গ্যাংটকে যেতে হবে অথবা কিছুটা ঘুরে আবার রংলি বা পদমচেনে ফিরে রাত্রি যাপন করতে হবে। এ ভাবে বেশ কিছু দিন চলার পর সেবাস্টিয়ান প্রধান বুঝতে পারলেন এক দিনে ১২০/১৩০ কিমি পথ পাড়ি দিলে বেড়ানো আর সে অর্থে কিছু হবে না, শুধু গাড়ি চাপাই হবে। ট্যুরিস্ট এ পথে তেমন হবে না।

এ বার তিনি নিজেই একদিন জুলুকে ইচ্ছাকৃত ভাবে গাড়ি খারাপ হয়ে যাওয়ার বাহানা দিয়ে (যদিও গাড়ি ঠিক ছিল) সেখানে এক রাত কাটান। এ খবর সেনাবাহিনীর মাধ্যমে রাজ্য প্রশাসনের কাছে পৌঁছে যায় খুব দ্রুত। এটা নিয়ে হইহই কাণ্ড বেঁধে যায়। প্রশাসনিক কর্তারা এসে তাঁকে জুলুকে দেখে যান। এ বার পর্যটনমন্ত্রীর কাছে ডাক পড়ে তাঁর। তাঁকে তিনি এ বার বোঝাতে সমর্থ হন কেন মাঝে রাত্রিযাপনের  প্রয়োজন। গাড়ি খারাপ হতে পারে, কেউ অসুস্থ হতে পারে। এত লম্বা পথ পাড়ি দিলে উচ্চতাজনিত কারণে অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা অতি প্রবল।

অবশেষে সরকার প্রথমে জুলুকে এবং পরে নাথাং ভ্যালিতে ট্যুরিস্টদের রাত্রিযাপনের অনুমতি দেয়। এর পর সিল্ক রুট-এর পর্যটনকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। (চলবে)

ছবি: লেখক

0 Comments
Share
the-mysterious-silk-route-part-3-from-ichhe-gaon-to-sillery-gaon
sudip paul
সুদীপ পাল

ফুলের গ্রাম ইচ্ছেগাঁও

পিচ রাস্তা ধরে কিছুটা যাওয়ার পরেই গাড়ি ডান দিকের কাঁচা রাস্তা ধরে উপরে উঠতে শুরু করল। এই পথই আমাদের নিয়ে যাবে ইচ্ছেগাঁও। পাকদণ্ডি পথের দু’পাশে সিঙ্কোনা গাছের চাষ। গুল্ম শ্রেণির গাছ, লালচে সবুজ পাতা। পাতার আকার অনেকটা জাম পাতার মতো। আশেপাশের সমগ্র অঞ্চলই ইচ্ছা ফরেস্টের অন্তর্গত। এই জঙ্গলে বিভিন্ন পাখি ছাড়াও ভাল্লুক, পাহাড়ি ছাগল, চিতা প্রভৃতি আছে। তবে এখানকার বন্য জন্তুরা মানুষের থেকে অনেক দূরে থাকে।

আরও পড়ুন রহস্যময় রেশম পথ / পর্ব ২: স্নিগ্ধতায় ভরা রামধুরাকে বিদায়

কাঁচা রাস্তা হওয়ার কারণে মাঝেমাঝেই গাড়ি দুলছে বা ঝাঁকুনি খাচ্ছে। জঙ্গলের মধ্য দিয়ে গিয়েছে বলে এ রাস্তা পাকা করা হয় না। বন দফতর অনুমোদন দেয় না। খুব চওড়া রাস্তা না হওয়ায় সামনে থেকে কোনো গাড়ি এলে এক ধারে সরে দাঁড়িয়ে সামনের গাড়িকে পাশ দিতে হয়।

way to ichhe gaon
ইচ্ছে গাঁও যাওয়ার পথ।

৩ কিমি রাস্তা পেরিয়ে ইচ্ছেগাঁও পৌঁছে দেখি ৪/৫ টা ট্যুরিস্ট গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। কিছু ট্যুরিস্ট বেরিয়ে যাওয়ারও তোড়জোড় করছে। ওঁরা হয়তো রাতে এখানেই ছিল। আমরা গাড়ি থেকে নেমেই ফোটোসেশন শুরু করে দিলাম। আকাশ মেঘলা। গায়ে দু-এক ফোঁটা বৃষ্টিও পড়ল। স্বাভাবিক ভাবেইই কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা নেই।

এ বার গ্রাম পরিদর্শনের পালা। রাস্তা একটুও সমতল নয়। রাস্তার ঢাল বেয়ে বা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হবে। গ্রামের মধ্যে হয় বড়ো এলাচের চাষ, মা হয় ফুলের বাগান। সব বাড়িই একতলা। আর প্রায় সব বাড়িতেই হোমস্টে।

দু’পাশে ফুলের বাগানের মাঝ দিয়ে পথ। দেখে মনে হচ্ছে, বাড়িগুলোই বাগানের। ঘুরতে ঘুরতে মনে হয় এ বুঝি কোনো এক ইচ্ছে-পরীর রাজ্য। ইচ্ছে-পরীর জাদুকাঠির স্পর্শে সমগ্র গ্রাম ফুলবাগানে পরিণত হয়েছে। যে দিকে তাকাই, সে দিকেই গোলাপ, চেরি গোল্ড, পপি প্রভৃতি ফুল ফুটে আছে।

botterfly on flower
মৌমাছির বিচরণ।

মৌমাছিরা এক ফুল থেকে আর এক ফুলে মধু খেয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের দু-একজন আমার ক্যামেরায় ধরা পড়ে গিয়েছে বুঝতে পেরেই লজ্জ্বায় উড়ে পালিয়ে গেল।

ঘুরতে ঘুরতে কখন যে দলছুট হয়ে পড়েছি খেয়াল নেই। যখন খেয়াল হল ততক্ষণে গ্রামের সব থেকে উঁচুতে যে বাড়ি সেখানে পৌঁছে গিয়েছি। মহিলারা গৃহকর্মে ব্যস্ত। কেউ কেউ নির্লিপ্ত ভাবে আমার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে দেখল, কেউ বা সেটাও করল না। আমি কেমন একটা ঘোরের মধ্যে আছি। কোন রাস্তা দিয়ে উঠে এসেছি ঠাহর করতে পারছি না। একবার একটা রাস্তা দিয়ে নামতে গেলাম, কিছুটা গিয়ে মনে হল, নাঃ এ রাস্তা দিয়ে তো আসিনি। আবার ফিরে এলাম আগের রাস্তায়। বেশ হয়েছে হারিয়ে গেছি। মেঘ, মৌমাছি, ফুলেদের সঙ্গে আমার অভিসার না হয় আরও কিছুক্ষণ চলবে।

highest place in ichhe gaon
চলে এসেছি সব চেয়ে উঁচু জায়গায়।

ঘুরপাক খেতে খেতে এক সময় নীচে নেমেও এলাম। হঠাৎ নজরে এল কিছু চড়ুই গাছের ডাল, বাড়ির চালে উড়ে বেড়াচ্ছে। এখানেও চড়ুই আছে দেখে অবাক হলাম, কিন্তু বেশ ভালো লাগলো। আমাদের ওখানে তো এখন আর চড়ুই দেখাই যায় না বলতে গেলে।

একজন গ্রামবাসীর কাছে বড়ো এলাচের খোঁজ করলাম। সে জানাল তার কাছে তো নেই-ই, গ্রামেও কারও কাছেই নেই। কয়েক মাস আগে এলাচের দাম উঠেছিল ৫০০ টাকা কেজি। তখনই যার কাছে যা এলাচ ছিল সব বিক্রি করে দিয়েছে।

আমরা ইচ্ছেগাঁও ভ্রমণের ইচ্ছা পূরণ করে যে পথে এসেছিলাম, সেই পথে ফিরে চললাম। পথে পড়ল সেই রামধুরা, যেখানে আমরা রাতে ছিলাম। রামধুরা ছাড়িয়ে এ বার বেশ কিছুক্ষণ চলতে হবে। পৌঁছোব আর এক গ্রামে যার নাম সিলেরি গাঁও।

সিলেরি গাঁও

ছোটো ছোটো বেশ কয়েকটা পাহাড়ি জনপদ পেরিয়ে এক সময় আমরা একটা মিলিটারি ক্যাম্পের সামনে এসে পৌঁছোলাম। পাইন গাছের সারি। তার পিছনে ক্যাম্প। সুরজকে গাড়ি থামাতে বললাম। গাড়ি থেকে নেমে ফটো তুলতে যাব তখন সামনের চৌকি থেকে একজন জওয়ান এসে বারণ করল। তার সঙ্গে কিছু কথা বলে উলটো দিকের উপত্যকায় গেলাম। আহা, কী সুন্দর! সবুজ ঘাসে মোড়া ছোট্ট উপত্যকা। দূরের পাহাড়গুলো নীলাভ হয়ে রয়েছে। হালকা হাওয়া দিচ্ছে। মন চাইছে এখানে কিছুক্ষণ বসে যাই। কিন্তু বসার উপায় নেই। ফিরে এলাম গাড়িতে।

military camp
পাইনে ঢাকা মিলিটারি ক্যাম্প।

আরও কিছুক্ষণ চলার পর গাড়ি বাঁ দিকে কাঁচা রাস্তা ধরে চলা শুরু করল। এবড়োখেবড়ো পাথুরে রাস্তা। সিলারি গাঁওয়ে যাওয়ার এই রাস্তা পর্যটকমহলে বড়ই কুখ্যাত। গাড়ি লাফাতে লাফাতে যায় বলে অনেকে মজা করে এই রাস্তাকে ড্যান্সিং রোডও বলে থাকেন। আসলে এটাও একটা বনাঞ্চল, তাই বন দফতর সড়ক পাকা করার অনুমতি দেয়নি।

বাঁ দিকে পাহাড়ের ঢাল উপরে উঠেছে আর ডান দিকে ঢাল নীচে নেমেছে। দু’দিকে পাইন ও অন্যান্য গাছের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আমাদের গাড়ি নাচতে নাচতে চলেছে। ভিতরে আমরাও গাড়ির সঙ্গে লাফাচ্ছি। অরূপদার একটু চোখ লেগে গেছিল, কিন্তু ঘুম চটকে গেল। আমি ক্যামেরায় তাক করে ছবি তোলার ব্যর্থ চেষ্টা করে চলেছি অনেকক্ষণ ধরে। গাড়ির ভিতর ঘোল ঘাঁটার মতো ব্যাপারটা বেশ মসৃণ ভাবেই হচ্ছিল। এমন সময় চোখে পড়ল ‘কোবরা লিলি’, এক ধরনের উদ্ভিদ। ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ ‘গাড়ি থামাও’।

cobra lily
কোবরা লিলি।

‘কি হল রে বাবা!’ – ড্রাইভার-সহ সঙ্গীদের সবার মনে এই প্রশ্ন। আমার দিকে সবাই তাকিয়ে। সে সবে ভ্রূক্ষেপ না করে সোজা গাড়ি থেকে নেমে এলাম। ‘কোবরা লিলি’র ছবি দেখেছি আগে, নিজের চোখে এই প্রথম দেখলাম। একদম ওল গাছের মতো একটা গাছ, তার গোড়া থেকে চকলেট রঙের অবিকল একটা সাপের ফনার মতো অংশ বেরিয়ে আছে। হঠাৎ করে গোখরো বা কেউটে জাতীয় সাপ বলে ভ্রম হতে পারে। ক্যামোফ্লেজ ধরতে শুধু প্রাণীরাই নয়, উদ্ভিদরাও যে কম যায় না এটা তার প্রমাণ।

ফোটো তুলে ফিরে এলাম গাড়িতে। সঙ্গীদের কৌতূহল নিরসন হল। ততক্ষণে আবার নাচ শুরু হয়ে গিয়েছে। তবে সব কিছুরই তো শেষ আছে। আমাদের ৪৫ মিনিটের নাচও এক সময় শেষ হল। সিলেরি গাঁওতে পৌঁছে দেখি নাচতে নাচতে আমার ছেলে কখন তার মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে।

sillery gaon
সিলেরি গাঁও।

রূপকে নিয়ে মৌসুমী গাড়িতেই বসে রইল। আমরা নামলাম। মেঘলা আকাশ। হালকা একটা ঠান্ডা ভাব। গ্রামের পিছন দিকটা পাঁচিলের মতো ঘিরে আছে একটা পাহাড়। পাহাড়ের উপরে ঝাউ জাতীয় এক ধরনের গাছ। শুনেছিলাম সিলেরি নামক এক ধরনের গাছের আধিক্যের জন্যই গ্রামের নাম সিলারি গাঁও। ওই ঝাউ জাতীয় গাছগুলোই কি তবে সিলেরি গাছ? জানি না।

কম-বেশি ১৫টা বাড়ি নিয়ে এই গ্রাম। প্রায় সব বাড়িই হোমস্টে। সামনে একটা বড়ো খেলার মাঠ। ৩/৪টে ছেলে এখানে ক্রিকেট খেলছে। মাঠের পাশেই অরুম লিলির ঝাড়। কিছু ফোটো তোলা হল।

সিলেরি গাঁওয়ে সে ভাবে দেখার কিছু নেই। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও আহামরি কিছু নয়। তবে এখান থেকে ৩ কিমি হেঁটে রামেতি ভিউপয়েন্ট। সেখান থেকে তিস্তার অনেকগুলো বাঁক দেখা যায়। রামধুরা থেকে এ দৃশ্য আগেই দেখেছি তাই রামেতি যাওয়ার কোনো আগ্রহ নেই। ইচ্ছে গাঁওতেও সে ভাবে কিছু স্পট নেই, তবে ফুলের মেলা আছে, সিলেরিতে তা-ও নেই।  শুনেছিলাম নতুন স্পটের টোপ দেওয়ার জন্য ট্যুর অপারেটরদের সৃষ্টি এই সিলেরি গাঁও। কথাটা যে কতটা সত্য এখানে এসে হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। এক বার সিলেরি দেখার পর দ্বিতীয় বার কোনো ট্যুরিস্ট আর এখানে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করবেন বলে মনে হয় না।

“মনটা একটু কফি কফি করছে বুঝলে সুদীপ” – অরূপদা বলে উঠল।

child of sillery
সিলেরির সেই শিশু।

সামনেই একটা দোকান। ভাগ্য সুপ্রসন্ন। কফি পাওয়া যাবে। দোকানি আমাদের দোকানে বসিয়ে রেখে লাগোয়া বাড়িতে কফি বানাতে গেল। দোকানির বছর দুয়েকের শিশু সন্তানকে নিয়ে আমরা কফি আসা পর্যন্ত সময় কাটিয়ে দিলাম।

কফি খেলাম। বেশ ঝরঝরে লাগছে শরীর ও মন। এটারই বোধহয় অভাব ছিল। তাই এতক্ষণ কেমন যেন নেতানো মুড়ির মতো লাগছিল নিজেকে। সুরজ গাড়ি স্টার্ট দিল, আবার সেই ড্যান্সিং রোড ধরে নাচতে নাচতে এগিয়ে চললাম। (চলবে)

ছবি: লেখক
0 Comments
Share
1236