Browsing Category:ভ্রমণকথা

mysterious-silk-route-part-1-first-halt-at-ramdhura
sudip paul
সুদীপ পাল

২৬ এপ্রিল ২০১৮। রাত প্রায় সাড়ে ৮টা। শিয়ালদা স্টেশনে ডানকুনি লোকাল যখন থামল তখন আকাশ যেন ভেঙে পড়ার অবস্থা। দমদম থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়েছে, শিয়ালদা পৌঁছোতে পৌঁছোতে একেবারে লাগামছাড়া। প্রচণ্ড বাজ, সেই সঙ্গে ঝড়। মনে হচ্ছে স্টেশনের শেডগুলো এখনই ভেঙে পড়বে। ঝাপটা খেতে খেতে কোনো রকমে লাগেজগুলো ট্রেন থেকে নামিয়ে মৌসুমী আর রূপকে নিয়ে এগোলাম ৯ নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে। দার্জিলিং মেলের ঘোষণা এখনও হয়নি। প্ল্যাটফর্ম জলে থই থই।

আমাদের এই ট্যুরে আমাদের সঙ্গে সপরিবার চলেছে আমার সহকর্মী অরূপ গুহ। ৫ বছরের দু’টি শিশু-সহ আমাদের ৬ জন এর দল। সিল্ক রুটে যাওয়ার ইচ্ছা অনেক দিন ধরেই ছিল কিন্তু হয়ে উঠছিল না। শেষ পর্যন্ত সিল্ক রুটের সব থেকে সুন্দর রূপটা দেখার জন্য এপ্রিল মাসই বেছে নিলাম। এই সময় ওখানে বরফ আর রডোডেনড্রন, দু’টোই পাব। আবহাওয়াও অনুকূল থাকবে।

আরও পড়ুন ওখরে-হিলে-ভার্সে, যেন মেঘ-বালিকার গল্প

অরূপদাকে ফোন করে জানলাম, ওরাও স্টেশনে এসে গিয়েছে। জানাল, প্ল্যাটফর্মে যেখানে আমাদের বগিটা পড়বে সেখানে ওরা রয়েছে। ট্রেন দিয়ে দিয়েছে প্ল্যাটফর্মে। দু’পাশ থেকে বৃষ্টির ঝাপটায় ভিজতে ভিজতে চলে এলাম কামরার সামনে। অরূপদারাও ভিজে জবুথবু।

ট্রেন সময়মতোই ছাড়ল। কিন্তু নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছোল পাক্কা এক ঘন্টা লেটে। গাড়ির সারথি সুরজ বার তিনেক ফোন করে ফেলেছে ইতিমধ্যে। আমাদের এই ট্যুরে গাড়ি ও হোম স্টে ব্যবস্থা করার দায়িত্ব দেওয়া ছিল আমার পূর্বপরিচিত রংলিনিবাসী দিলীপরাজ প্রধানকে। সে-ই গাড়ি পাঠিয়েছে।

mahananda wildlife sanctuary
চলেছি মহানন্দা অভয়ারণ্যের মধ্য দিয়ে।

শিলিগুড়িতে অরূপদার পরিচিত একজনের বাড়ি আছে যা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার হয়। সেখানে দু’খানা গেস্টরুমও আছে। আমরা সেখানেই গেলাম প্রথমে। স্নান সেরে, প্রাতরাশ শেষ করে চার ঘণ্টা লেটের বোঝা মাথায় নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হল। পথে জল পরিশোধনের কারখানা থেকে ছ’টা পাঁচ লিটারের খাবার জলের জার তুলে নিলাম। শিলিগুড়িতে এমনিতেই জ্যাম থাকে। মহানন্দা ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি পেরোনোর পরেও দেখি জ্যাম। রাস্তার কাজ হচ্ছে। বার বার থেমে থেমে যাওয়া, গরম – এ সব কারণে সবাই একটু খিটখিটে হয়ে পড়েছে। তবে এটাও জানি, পাহাড়ে কিছুটা যাওয়ার পরেই মেজাজ পালটে যাবে সবার।

tistabajar
তিস্তাবাজার।

তিস্তাবাজার পৌঁছোতে পৌঁছোতে আরও এক ঘণ্টা লেটের বোঝা চেপেছে। তবে সবার মেজাজ একদম ফুরফুরে। পাহাড়ে ওঠার পর থেকেই তিস্তা আমাদের সঙ্গী। তিস্তাবাজারে তিস্তার রূপ যেন আরও বিকশিত। গাড়ি থেকে নেমে দু-চারটে ফটো তুলে, পাহাড়ি শশা খেয়ে ফের যাত্রা।

এখান থেকে রাস্তা দু’ ভাগ। একটা রাস্তা নীচের দিকে নেমে গিয়েছে দার্জিলিং-এর উদ্দেশে। আর একটা রাস্তা সামান্য কয়েক মিটার এগিয়ে ব্রিজ পেরিয়ে তিস্তার ধার ধরে এগিয়েছে। খানিকটা গিয়ে রাস্তা ফের দু’ ভাগ। ডান দিকের পথ উঠে গিয়েছে কালিম্পং-এ। সোজা রাস্তা গ্যাংটকের। আমাদের আজকের গন্তব্য রামধুরা। এনজেপি থেকে ৮২ কিমি।

river tista
যে পথে তিস্তা সঙ্গী।

এ পথে তিস্তা আবার সঙ্গী, রাস্তার বাঁ দিকে। তিস্তার অপার সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হবে না এমন কোনো বেরসিক মানুষ পৃথিবীতে নেই, এটা হলপ করে বলতে পারি। পথে মেল্লিতে দেখলাম তিস্তার বুকে রিভার র‍্যাফটিং হচ্ছে। আমাদের মনও তিস্তার স্রোতে বহমান। তিস্তার তুঁতে রঙের জলে যেন কোনো জাদু আছে। যে দেখে সে-ই তিস্তার প্রেমে পড়ে যায়।

সব কিছুরই শেষ আছে। তিস্তার সঙ্গে আমাদের সাহচর্যও এক সময় শেষ হল। গাড়ি ডান দিকে বেঁকে গিয়ে ন্যাশনাল হাইওয়েকে ছেড়ে দিল। পাহাড়ে সৌন্দর্যর কোনো অভাব নেই। দু’পাশের ঘন সবুজ বনানী। তার মধ্যে দিয়ে আলপনার মতো রাস্তা ক্রমশ উপরের দিকে উঠছে। উচ্চতার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা। এ ঠান্ডা অবশ্য আরামদায়ক, সোয়েটার পরতে হয় না, অনুভব করতে হয়।

তন্ময় হয়ে দেখছিলাম গাড়ির জানলা দিয়ে। সুরজ এক সময় গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিল। ঝপাঝপ নেমে পড়লাম। ওরে বাবা! বাইরে বেশ ঠান্ডা, গাড়িতে বসে বুঝতে পারিনি। যা-ই হোক, একটু পরেই ঠান্ডা সয়ে গেল। বদ্ধ গাড়িতে বসে কখনোই প্রকৃতির সৌন্দর্য সম্পূর্ণ উপভোগ করা যায় না এবং সেটা সম্ভব নয়। তার জন্য প্রকৃতির কোলে নিজেকে সঁপে দিতে হয়।

আরও পড়ুন জঙ্গল, পাহাড় ও কাঞ্চনময় তিনচুলে

সামনে অনেক দূরে পাহাড়ের সারি। সামনের পাহাড়েই কালিম্পং, যদিও হালকা কুয়াশায় কালিম্পংকে দেখা যাচ্ছে না। পাহাড়ের নীচে দিয়ে তিস্তা এঁকে বেঁকে বয়ে যাচ্ছে। এখান থেকে বেশ কয়েক কিমি তিস্তার গতিপথ দেখা যায়। হালকা কুয়াশায় কিছুটা অস্পষ্টতা থাকলেও শেষ বিকেলের সূর্যালোকে তা যেন রুপোর নদীতে পরিণত হয়েছে। চারিদিকে উজ্জ্বল সবুজের রাজত্ব। এখান থেকে যেতেই ইচ্ছা করছে না।

সুরজ বলল, “আমরা রামধুরা প্রায় এসে গিয়েছি। এটা একটা ভিউপয়েন্ট বুঝলেন তো।”

সুরজের কাছে এটা একটা ভিউপয়েন্ট হলেও আমার কাছে পুরো যাত্রা পথটাই হাজার হাজার ভিউ পয়েন্টের সমাহার। কিছুটা ছাড়া ছাড়াই মনে হয়েছে একটু দাঁড়িয়ে দেখি। মিনিট কুড়ি ধরে প্রকৃতির রসাস্বাদন করে আবার গাড়িতে উঠলাম। ভীষণ খাড়া রাস্তা। কিছুটা এগিয়ে রাস্তার ধারে বাঁ দিকে পড়ল বড়ো বড়ো গাছপালার মাঝে ব্রিটিশ আমলে তৈরি জলসা বাংলো। গেটে তালা ঝুলছে দেখে আর গাড়ি থেকে নামলাম না। দেখারও তেমন কিছু নেই মনে হল। জায়গাটা রামধুরাতেই পড়ে। আরও মিনিট দশেক চলার পর গাড়ি এসে থামল চামলিং হোম স্টে-র সামনে। এটাই আমাদের আজকের আস্তানা। (চলবে)

ছবি: লেখক 

0 Comments
Share
a-visit-to-maccluskieganj
writwick das
ঋত্বিক দাস

ইংরেজ সরকারের হাতে ভারত তখন বন্দি৷ শুধু শাসন করাই নয়, এই দেশের সম্পত্তি বিদেশে রফতানি করে কী ভাবে ফুলেফেঁপে উঠতে হয় তা ব্রিটিশকর্তারা তখন ভালোই জেনে গিয়েছেন৷ ব্রিটিশ সরকার খোঁজ পেল ছোটোনাগপুর অঞ্চলের খনিজ সম্পদ আর দামোদরের উপত্যকায় ছড়িয়ে থাকা কয়লা-সহ বিভিন্ন খনিজ দ্রব্যের ভাণ্ডার৷ সেই সম্পদ বিদেশের মাটিতে পৌঁছে দিতে পারলেই পকেট আরও ফুলেফেঁপে উঠবে৷

আরও পড়ুন ‘লাল কাঁকড়ার দেশ’- তাজপুর

কিন্তু বাধ সাধল ছোটোনাগপুরের গভীর জঙ্গল৷ এত সম্পদ এই জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পরিবহণ করে কলকাতা বন্দরে আনা কী ভাবে সম্ভব? পরিকল্পনা হল, জঙ্গল কেটে রেলপথ তৈরি করার৷ কলকাতা-দিল্লি রেলপথের গোমো স্টেশন৷ সেখান থেকে ডালটনগঞ্জ দিয়ে লাইন নিয়ে যাওয়ার কাজ শুরু হল৷ রেললাইনের স্লিপার করতে বহু গাছ কাটা পড়ল৷ স্লিপার তৈরির বরাত দেওয়া হল কলকাতার কিছু ঠিকাদারকে৷

evening coming in maccluskieganj
শেষ বিকেলে ম্যাকলুস্কিগঞ্জ।

এক বার এমনই রেলের কাজের দায়িত্ব নিয়ে এলেন আর্নেস্ট টিমোথি ম্যাকলুস্কি নামে এক কলকাতাবাসী এক ব্রিটিশ ব্যবসায়ী৷ ম্যাকলুস্কি সাহেবের জায়গাটা বেশ ভালো লেগে গেল৷ তখন ওই অঞ্চলে লাপড়া, কঙ্কা ও হেসাল, এই তিনটি জঙ্গলময় বসতি ছিল৷ পরিবেশটা পুরো বিলেতের মতো৷ সারা বছরই ঠান্ডা আবহাওয়া৷ পাহাড়ে ঘেরা, অরণ্যে মোড়া এক মনোরম জায়গা, গোটা পরিবেশটাই যেন বিলেতের একটা ছোটো সংস্করণ৷

ম্যাকলুস্কি সাহেব জায়গাটির প্রেমে পড়ে গেলেন এবং এখানেই স্থায়ী ভাবে বসতি গড়লেন৷ পাশাপাশি বন্ধু আত্মীয়পরিজনকে এখানে এসে থাকার আহ্বান জানালেন৷ সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বেশ কিছু পরিবার এখানে এসে বসতি স্থাপন করলেন৷

আরও পড়ুন কুমারী সৈকত চাঁদপুরে একটা দিন

ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ইংল্যান্ডকে কোণঠাসা করে ফেলল। ইংল্যান্ডের অর্থনীতি ক্রমশ ভেঙে পড়তে লাগল। তার প্রভাব এসে পড়ল এ দেশে অ্যাংলো সাহেবদের ওপর৷ ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো এ দেশে একের পর এক অ্যাংলো সাহেবকে কর্মচ্যুত করতে লাগল তুচ্ছ অজুহাতে৷ এই সময় বহু অ্যাংলো কাজ হারালেন৷ তাঁরা ঠিক করলেন এই ঘটনা তাঁরা ব্রিটেনে গিয়ে মহারানিকে সরাসরি জানাবেন৷ এতে ঘোরতর বিপদ বুঝে ব্রিটিশ সরকার অ্যাংলোদের ব্রিটেনে যাওয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করল৷

another view from watchtower
ওয়াচটাওয়ার থেকে আরও দৃশ্য।

এমনিতেই অ্যাংলোদের কোনো স্থায়ী জায়গা ছিল না ভারতে, তার ওপর কর্মচ্যুত হওয়ার পর তাদের প্রতিবাদ ভাবিত করে তুলল ব্রিটিশ সরকারকে৷ সরকার প্রমাদ গনল। অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে সমঝোতা করতে রাজি হল৷ ডেকে পাঠানো হল  ম্যাকলুস্কি সাহেবকে৷ তিনি এসে এই জায়গার (আজকের ম্যাকলুস্কিগঞ্জ) কথা সবাইকে বলেন৷ তিনি অ্যাংলোদের বোঝালেন, “চলো, কাছেই আমাদের বিলেতের মতো একটি গ্রাম আছে। সেখানে আমরা সবাই মিলে বসতি স্থাপন করে তাকে ইংল্যান্ডের রূপের পরিপূর্ণতা দিই।”

১৯৩৩-এ তৈরি হল কলোনাইজেশন সোসাইটি অব ইন্ডিয়া। ঠিক হল, এই সমবায়ে অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা শেয়ার কিনলে তাদের এক টুকরো করে জমি দেওয়া হবে। ভারতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় দু’ লক্ষ অ্যাংলো ইন্ডিয়ানকে এই অঞ্চলে বসতি গড়ার জন্য আহ্বান জানালেন ম্যাকলুস্কি।

আরও পড়ুন বিশ্বনাথের বারাণসী, বারাণসীর বিসমিল্লাহ

ম্যাকলুস্কি সাহেবের ডাকে সাড়া দিয়ে প্রায় ৪০০ অ্যাংলো পরিবার এই স্থানে পাকাপাকি ভাবে বসতি স্থাপন করে৷ ১৯৩৪ সাল নাগাদ রাতু মহারাজের কাছ থেকে লাপড়া, কঙ্কা ও হেসাল, এই তিনটি অঞ্চল দান হিসেবে চেয়ে নিলেন ম্যাকলুস্কি সাহেব৷ রাতু মহারাজ সেই আবদারে রাজি হয়ে অঞ্চল তিনটি ম্যাকলুস্কি সাহেবকে দান করলেন৷ ম্যাকলুস্কি সাহেবের নামে নাম হল ম্যাকলুস্কিগঞ্জ৷ অনেক অ্যাংলো স্কুল এখানে গড়ে উঠল৷ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অ্যাংলো ছেলেমেয়েরা এই সব স্কুলে পড়তে এল৷ তাদের থাকার জন্য অনেক হোস্টেল তৈরি হল৷ ব্রিটিশরা ম্যাকলুস্কিগঞ্জকে ঝাড়খণ্ডের স্কটল্যান্ড বলেও ডাকত৷ আজও অনেকে এই স্থানটিকে ‘স্কটল্যান্ড অব ঝাড়খণ্ড’ বলে ডেকে থাকেন৷

dugadagi
ডুগাডগি।

তবে অ্যাংলোদের বসতি স্থাপন সুখের হয়নি৷ তাদের সঙ্গে স্থানীয় আদিবাসীদের সম্পর্ক ক্রমশ খারাপের দিকে এগোতে থাকে৷ আদিবাসীরা নিজেদের পুরোনো জায়গায় কেমন যেন পর হয়ে গেল৷ অ্যাংলোদের কাছে তারা চাকরের মতো হয়ে গেল৷ গাছের ফলে হাত দিলে জুটত অপমান, এমনকি কখনও মারও৷ একই জায়গায় থেকেও নিজেদের মধ্যে মেলামেশা করতে পারত না আদিবাসীরা৷ সব সময় সাহেবরা বন্দুক নিয়ে ঘুরত আর তাদের ওপর নজর রাখত৷ এমন অবস্থায় আদিবাসীরা ক্রমশ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে৷ যার ফলস্বরূপ স্বাধীনতা লাভের পর বহু অ্যাংলো পরিবারকে ম্যাকলুস্কিগঞ্জ ছাড়তে হল।

এর পরও বেশ কিছু অ্যাংলো পরিবার এখানে থেকে গেল নিজেদের জমি আঁকড়ে। পরবর্তীকালে তাদের উত্তরসূরিরাও একে একে পাড়ি জমাল বিদেশে রোজগারের সূত্রে৷ ক্রমশ সাহেবদের বাড়িগুলো পরিত্যক্ত হতে শুরু করল৷ সেগুলো পরে স্থানীয় ক্ষমতাশালী মানুষজন ও ব্যবসায়ীরা নেন৷ কিছু অ্যাংলো পরিবার অবশ্য এই অঞ্চলেই নিজেদের বাড়িতে থেকে গেল৷

আরও পড়ুন তারাপীঠকে ‘বুড়ি’ করে

সত্যি কথা বলতে কি বাঙালির কাছে ম্যাকলুস্কিগঞ্জকে পরিচিত করেছেন সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ৷ যথারীতি আমারও এই জায়গাটার প্রতি আকর্ষণ ছিল। আমার সেই আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিল আমার এক ছোটো ভাই সৌম্যদীপ মণ্ডল। শেষ পর্যন্ত নভেম্বর মাসের ২৩ তারিখে উঠে পড়লাম ট্রেনে৷

প্রথম বার গিয়েই প্রেমে পড়ে গেলাম ম্যাকলুস্কিগঞ্জের৷ তবে এখানে ‘এলাম দেখলাম আর জয় করলাম’, এমন মনোভাব নিয়ে এলে নিরাশই হতে হবে৷ এখানে দু’টো দিন হাতে নিয়ে আসতে হবে৷ আর প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার ইচ্ছা থাকলেই এখানে আসা সার্থক৷ এখানে সে ভাবে কোনো ট্যুরিস্ট স্পট নেই৷ শুধু ভোরের সুর্য ওঠা থেকে শুরু করে বিকেলের সুর্যাস্ত পর্যন্ত রেললাইনের পাশ দিয়ে কিংবা মেঠো রাস্তা দিয়ে প্রকৃতিকে আপন করে ঘুরে বেড়ানো৷

আসলে সত্যিকারের প্রকৃতিপ্রেমিকদের কাছে আদর্শ জায়গা এই ম্যাকলুস্কিগঞ্জ। লাল কাঁকুড়ে পথঘাট, আশেপাশে সাহেবদের কটেজ৷ দূরে অরণ্য ও পাহাড়ের হাতছানি৷ পূর্ণিমার রাতে মায়াবী রূপ ধরে প্রকৃতি৷ বসন্তে পলাশ, শিমুলের সঙ্গে জাকারান্ডায় ছেয়ে যায় চারি দিক৷ সেই রূপ আরও মোহময়ী৷ এক অপার্থিব নিস্তব্ধতায় হিমেল হাওয়ার স্পর্শ৷ দিনের বেলায় শুধুই পাখির কুজন।

view from watchtower
ওয়াচটাওয়ার থেকে।

ম্যাকলুস্কিগঞ্জের আশেপাশে কিছু জায়গা আছে যেগুলোকে যুক্ত করে একটা সুন্দর ট্রিপ হতে পারে৷ এই প্রসঙ্গে প্রথমেই আসি ওয়াচটাওয়ারের কথায়৷ স্টেশন থেকে প্রায় আড়াই কিমি দূরে ছোটো একটি টিলার টঙে এই ওয়াচ টাওয়ার। সেখান থেকে গোটা অঞ্চলটিকে ছবির মতো দেখায়৷ ১৮০ ডিগ্রি বৃত্তাকারে পাহাড়শ্রেণি ম্যাকলুস্কিগঞ্জকে ঘিরে রেখেছে৷

ডুলি
ডুলি উপাসনাস্থল।

চলুন, এ বার যাওয়া যাক ডুলি উপসনাস্থলে৷ স্টেশন থেকে প্রায় ন’ কিমি। হিন্দু, ইসলাম, শিখ আর খ্রিস্টান, এই চার ধর্মের এক সঙ্গে পাশাপাশি উপাসনার বেদি৷ জায়গাটি সর্বধর্ম সমন্বয়ের বার্তা বহন করে৷

duli forest
ডুলি ফরেস্ট।

ডুলির পাশেই একটি ছোটো দিঘি, নাম তার সীতাকুণ্ড৷ স্থানীয়রা এই কুণ্ডকে খুব মান্যি করে৷ রাস্তার দু’ধারে ডুলি ফরেস্ট। মাঝেমধ্যে হাতি অভিসারে আসে এই অরণ্যে৷

এখান থেকে সামান্য দুরে জাগৃতিবিহার৷ আদিবাসীদের হস্তশিল্পের সমবায়৷

Chatti river
চাট্টি নদী।

জাগৃতি বিহার থেকে কিছুটা দূরে চাট্টিনদীর পাড়৷ জায়গাটির নাম ডুগাডগি বা ডিগাডগি৷ চাট্টি ম্যাকলুস্কিগঞ্জের নিজস্ব নদী৷ দামোদর থেকে এর উৎপত্তি৷ টিলাময় এই জায়গা৷ জায়গাটায় দু’ দণ্ড বসে চার পাশের দৃশ্য বেশ সুখকর লাগে৷

রেলগেটের বাঁহাতি পথে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে দামোদর নদীর ব্রিজ৷ ব্রিজের ওপর থেকে দামোদর নদী আর চাট্টি নদীর মিলনস্থল দেখা যায়৷ এখান থেকে সূর্যাস্ত বা সুর্যোদয়ের দৃশ্যও মনোরম৷ এখান থেকে প্রায় ৫০ কিমি দূরে একটি পাহাড়ের ঝোরা থেকে দামোদরের উৎপত্তি৷

আর একটি জায়গা হল ম্যাকলুস্কি সাহেবের কবরখানা৷

এ ছাড়া চলতে ফিরতে অসংখ্য হোস্টেল রয়েছে জায়গাটিকে ঘিরে৷ এক সঙ্গে এত হোস্টেল খুব কম জায়গায়ই দেখা যায়।

দুপুরের খাওয়াদাওয়া করে বেরিয়ে পড়ুন। ৮০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে রফা করে গাড়ি বা অটো নিয়ে ঘুরে আসুন। সন্ধে নামার আগেই হোটেলে ফিরে আসা যায়৷ তবে সব সময় সন্ধের অন্ধকার নামার আগে গেস্টহাউসে ফিরে আসা ভালো৷

এ ছাড়াও ম্যাকলুস্কিগঞ্জকে কেন্দ্র করে ঘুরে আসতে পারেন ৫০ কিমি দুরের লাতেহারের জঙ্গল থেকে৷

পাহাড়, জঙ্গল, স্থাপত্য, নদী সব মিলিয়ে ম্যাকলুস্কিগঞ্জ এক স্বয়ংসম্পূর্ণ জায়গা৷ সপ্তাহান্তে দু’-তিন দিন হাতে নিয়ে এখানে ঘুরে আসতে পারলে সেটা জীবনের একটা স্মৃতি হয়েই থাকবে৷

যাওয়া 

হাওড়া থেকে রাঁচিগামী ট্রেনে রাঁচি পৌঁছে সেখান থেকে গাড়িতে প্রায় ৬৪ কিলোমিটার দুরে ম্যাকলুস্কিগঞ্জ৷ এ ছাড়া হাওড়া থেকে সরাসরি শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেস ম্যাকলুস্কিগঞ্জ পৌঁছে দেয় রাত পৌনে ১১টায়৷ হোটেল/গেস্টহাউসে বলে রাখলে তারা স্টেশনে গাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করে৷ তবে হাওড়া থেকে রাতের ট্রেন ধরে সকালে রাঁচি পৌঁছে সেখান থেকে ম্যাকলুস্কিগঞ্জ যাওয়াই ভালো।

maccluskieganj station
ম্যাকলুস্কিগঞ্জ স্টেশন।

থাকা 

ম্যাকলুস্কিগঞ্জ গিয়ে দিন দুয়েক থাকতেই হবে৷ থাকার জন্য সব চেয়ে উপযুক্ত হল গর্ডন গেস্টহাউস৷ ফোন নম্বর: ০৯৮৩৫৭৭০৬৭৯/৯৪৭০৯৩০২৩০৷ এ ছাড়া আছে মাউন্টেন হলিডে রিসর্ট৷ ফোন নম্বর: ২৭৬৩৫৭/৭৭৩৯০৮৯০৫২

Gordon guest house
গর্ডন গেস্ট হাউস।

খাওয়া

যে গেস্টহাউসে থাকবেন সেই গেস্টহাউসে বলে রাখলে তারা দুপুর বা রাতের খাবারের ব্যবস্থা করে দেয়৷ এ ছাড়া বাইরে অনেক খাবারের হোটেল আছে৷ তাদের বলে রাখলে আপনার পছন্দসই খাবারের ব্যবস্থা করে, এমনকি গেস্টহাউসে পৌঁছেও দেয়৷ স্টেশনের সামনে সুরেশের শিঙাড়ার স্বাদ নিন৷ আর স্টেশনের বাইরেই এক জন চাউমিন বানান, স্বাদ খুব ভালো৷ এ ছাড়া ম্যাকলুস্কিগঞ্জের তেলেভাজা, কচুরি, জিলিপি ও চাল দিয়ে তৈরি ধোস্কার স্বাদ নিতে ভুলবেন না৷

ঘোরাফেরা

auto available in station
স্টেশনেই মিলবে অটো।

স্টেশন থেকেই অটো পেয়ে যাবেন৷ গেস্টহাউস থেকেও অটো বা গাড়ির ব্যাবস্থা করা হয়৷ অটোর জন্য যোগাযোগ করতে পারেন সুখেন্দ্র মুন্ডার সঙ্গে, ফোন নম্বর: ৮৫২১৪৫৩৫৪০

ছবি লেখক
0 Comments
Share
a-visit-to-garhwal-last-part-the-end-of-a-dream-travel
tanmoy bhattacharya
তন্ময় ভট্টাচার্য

সকালের প্রথম আলোয় ঝলমলে যমুনোত্রী হিমাবাহ চোখধাঁধানো রূপ নিয়ে সামনে হাজির। কাল রাতে পাহাড়ের চুড়ায় বরফ পড়েছে। আরও সুন্দর, আরও মসৃণ। কিন্তু আমরা একটু জলদি বেরিয়ে পড়ছি প্রতি দিন। আজও ব্যতিক্রম নয়। আজ আমাদের দুই সহযাত্রী দেবেশ-মণিকা আমাদের ছেড়ে পাড়ি দিচ্ছেন কেদারনাথের পথে। তাঁদের বারকোটে নামিয়ে দিয়ে যাব। সেখান থেকে বাসে উত্তরকাশী যাবেন তাঁরা। তাঁর পর সেখান থেকে শ্রীনগর হয়ে গুপ্তকাশীর পথে চলে যাবেন। আমরা এগিয়ে যাব মসুরীর (সাহেবরা যে শহরকে বলতেন মুসৌরি) পথে।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / প্রথম পর্ব : ধনৌলটি ছুঁয়ে নিউ টিহরী

পরিকল্পনা মাফিক যাত্রা শুরু। ঘণ্টা দুই চলার পর বারকোট বেন্ডে পৌঁছে ধরাসুর রাস্তায় না গিয়ে দেহরাদুনের দিকে গাড়ি চলতে লাগল। পৌঁছোলাম বারকোট শহরে, বারকোট বেন্ড থেকে ৮ কিমি। এখানে খাবারদাবারের ভালোই ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু অপরিচ্ছন্ন, দামও বড়ো বেশি। এ দিকে জানকীচট্টির জিএমভিএন রেস্ট হাউসে স্নান করার সময় পড়ে গিয়ে আমাদের সহযাত্রী রুদ্রাণীমামি (দত্ত) হাতে চোট পেয়েছেন। তাঁরা অন্য গাড়িতে আমাদের পেছনে আসছেন। আমরা একটু খোঁজাখুঁজি করে এক্সরের দোকান পেয়ে গেলাম ঠিকই, কিন্তু খুলতে দেরি। তাই মসুরীর হোটেলে ফোন করে সেখানে এক্সরে করার ব্যবস্থা করা হল। প্রাতরাশ সেরে নিলাম। দেবেশদাদের বাসে তুলে দেওয়া হল। ইতিমধ্যে রুদ্রাণীমামিরা এসে পড়লেন।  আমাদের দু’টি গাড়ি চলল মসুরীর পথে। ঘণ্টা চারেজের জার্নি। ঘণ্টা তিনে চলার পর আমাদের সামনে দিগন্তবিস্তৃত পর্বতমালা উন্মুক্ত হল। গাড়োয়াল হিমালয়ের প্রায় সব ক’টি পর্বতশৃঙ্গ এখান থেকে দেখা যায়। তবে আজ একটু বেলা হয়ে যাওয়ায় সে সব মেঘে ঢাকা। একটু দমে গেলাম। এল কেম্পটি ফলস। আপাতত নামলাম না। এগিয়ে চললাম শহরের দিকে। আরও প্রায় ৪৫ মিনিট গাড়ি চলার পর ম্যাল রোডের সামনে এসে গেলাম। আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে হোটেল দীপে, ক্যামেলস ক্যামেল ব্যাক রোডে। সেটি ম্যালের শেষ প্রান্তে। গাড়ি ঘুরিয়ে পৌঁছোলাম সেখানে। এখান থেকে প্রায় ৭০০ মিটার হেঁটে যেতে হবে। প্রায় সমতল রাস্তা, তাই হেঁটে যাওয়া সমস্যার নয়। পাঁচ জন মালবাহকের পিঠে মাল চাপিয়ে দললাম হোটেলে।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / দ্বিতীয় পর্ব : টিহরী থেকে উত্তরকাশী হয়ে হরসিল

ভালোই লাগল হোটেল দীপ। আমাদের ঘর ছিল চারতলায়। লিফট আছে। সামনে খোলা বারান্দা। সেখান থেকে কেদার পর্বত দেখা যায়। তবে এখন সবই মেঘে ঢাকা।

view from Mussoorie
মসুরী থেকে।

দুপুরের খাবার খেতে বিকেল হয়ে গেল। পড়ন্ত সূর্যের আলোয়, বারান্দায় বসে হালকা শীতের আমেজে আমাদের ‘অপরাহ্নভোজ’ শেষ হল। সন্ধের আগেই সন্দীপমামারা চলে গেলেন দেহরাদুন। সেখান থেকে দিল্লি পৌঁছে, মামির হাত দেখিয়ে, কলকাতার বিমান ধরবেন। আমাদের মহিলাকুল ও তাঁদের স্বামীরা গেলেন বাজার করতে। এই ভ্রমণের শেষ দিন কাল। তাই যার যা টাকাপয়সা বেঁচেছে, তা দিকে কেনাকাটি করা বোধহয় খুব জরুরি! আমি ভাগ্যক্রমে সঙ্গে যাওয়ার হাত থেকে রেহাই পেলাম। রেহাই পেলেন গ্রুপের নেতা সুগত বসুও। কিন্তু দু’জনে মিলে পরশু ফেরার পরিবর্তিত পরিকল্পনা নিয়ে সারথির সঙ্গে কথা বলে নিলাম। ঠিক ছিল হরিদ্বারে নামব। কুম্ভ এক্সপ্রেসে টিকিট না মেলায় আমাদের সাহারানপুর হয়ে ফিরতে হবে। সেখান থেকে ধরব গুরুমুখী এক্সপ্রেস। উত্তরপ্রদেশে ঢুকতে হবে। ফলে লাগবে রোড ট্যাক্স। তাই গাড়ির ভাড়া কিছু বেশি পড়বে। সে সব নিয়েই সারথির সঙ্গে কথাবার্তা।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / তৃতীয় পর্ব : গঙ্গোত্রীতে এক রাত

পরের দিন সকাল হতেই ঝলমলে কেদার শৃঙ্গ আমাদের সামনে। তবে মসুরী শহরও দূষণে আক্রান্ত। ফলে একটা কুয়াশা-ধোঁয়াশা ভাব রয়েছে। এক দিকে ঘড়িঘর, সে দিকেই সূর্য উঠল। সকালের খাবার বাইরেই খাব। তাই সূর্যোদয়ের একটু পরেই বেরিয়ে পড়লাম। আজ মসুরী ঘুরে দেখব। শেষে ম্যাল হয়ে কেনাকাটা করে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি। এক স্বপ্নের সমাপ্তি ঘটবে।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / চতুর্থ পর্ব : বারসুতে রাত কাটিয়ে বারকোটের পথে

ইংরেজ জেনারেল ফেড্রিক ইয়ং-এর শখ হয়েছিল শুটিং গেম খেলতে। এখানে এসে তিনি হাওড়া-কলকাতার মতো জমজ শহরের পত্তন করেন – মসুরী আর ও ল্যান্ডর, প্রায় সাড়ে ছ’ হাজার ফুট উচ্চতায়। এখানকার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে এখানেই থেকে যান। প্রথম গোর্খা বাহিনী তৈরি করেন ও আলুর চাষ করেন। আমরা যে ক্যামেলস ব্যাক রোডে আছি, সেখানেই উনি একটি শুটিং স্পট তৈরি করেন। সাহেবি শখ। পরে এখানে ক্যান্টনমেন্ট তৈরি হয়। তৈরি হয় ঘড়িঘর। মানে ইতিহাসের পুরো এক প্যকেজ। কাছেই ঘড়িঘর। সরু রাস্তায় একটু এগিয়ে ঘড়িঘর দেখে কেম্পটি ফলস-এর দিকে এগোনোর পথে দেখে নিলাম মসুরীর সর্বোচ্চ পয়েন্ট লাল টিব্বা। এখান থেকে হিমালয়ের দৃশ্য অতুলনীয়। তবে হালকা কুয়াশা আছেই। ক্যামেলস ব্যাক রোড এখান থেকে দেখতে অনেকটা উঠের পিঠের মতোই।

kempty falls
কেম্পটি ফলস্‌।

কেম্পটি পৌঁছোতে ৪৫ মিনিট লাগল। সেখানে খানিক নামার পর কেবলকারে চেপে বসলাম। ঝরনা যেখানে পড়ছে সেখানে পৌঁছে দেবে এই কেবলকার। এই কেবলকারে নামা ও ওঠা জনপ্রতি ১৫০ টাকা। শুধু উঠতে লাগে ১০০ টাকা। আমরা নামা-ওঠার টিকিট কেটে চেপে বসলাম। মিনিট খানেকের যাত্রায় পৌঁছে দেয় একদম নীচে। তবে স্নান করার মূল জায়গাটি একটু ওপরে। তাই আবার উঠতে হয়। আছে ব্রিজে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার সুযোগও। যেখানে কেবলকার থেকে নামলাম, সেখানে রয়েছে টি স্টল, রয়েছে গাড়োয়ালি পোশাকে সজ্জিত হয়ে ছবি তোলার সুযোগ। আমরা ঘণ্টা খানেকে সব করলাম। তার পর উপরে উঠে এসে একটি হোটেলে দুপুরের খাওয়া। বিশ্রামের সময় নেই, আবার ছুট। গাড়ি ফিরে এসে নামিয়ে দিল ম্যাল রোডের মুখে। এখান থেকে হেঁটে বা রিকশায় হোটেল ফিরতে হবে। আমরা কেনাকাটা করতে করতে পদব্রজে এগিয়ে চললাম। খানিক বিশ্রাম, একটু কফি পান, আবার হন্টন। এ বার পৌঁছোলাম ‘গান হিল’ যাওয়ার কেবলকার স্টেশনে। আমাদের কেউ কেউ চেপে বসল। ‘গান হিল’ থেকে সমগ্র মসুরী ও দেহরাদুন শহর দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু বিকেলের দিকে কুয়াশার দাপট বেশি থাকায় মসুরী ও দেহরাদুন যে দৃশ্যমান হবে না, তা বলাই বাহুল্য। তাই অতিরিক্ত খরচের পথ আর মাড়াইনি। এর পর হেঁটে হোটেল ফিরে আসা আর রাত কাটিয়ে পরের দিন ট্রেন ধরার প্রস্তুতি। সাহারানপুর থেকে আমাদের ট্রেন বেলা সাড়ে এগারোটায়। বেরিয়ে পড়তে হবে ৬টাতেই।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / পঞ্চম পর্ব: বারকোটে রাত কাটিয়ে জানকীচট্টি

আজ আর দেহরাদুন শহর ঘোরার বা সহস্রধারা জলপ্রপাত দেখার সময় হল না। পরিবর্তে যা পেলাম, তা-ই বা কম কি! দেহরাদুন শহর পেরিয়ে সাহারানপুরের রাস্তা ধরতেই চড়াই-উৎরাই। এবং ঢুকে গেলাম রাজাজি জাতীয় উদ্যানে। এটি ঠিক জানা ছিল না। জানতাম একটা জঙ্গল পেরোতে হবে। সেটা যে রাজাজি জাতীয় উদ্যান তা বোর্ড দেখে জানতে পারলাম। বেশ উৎসাহিত হলাম। তবে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে রাস্তা হলেও সে ভাবে কিছু নজরে এল না, হনুমানের দল ছাড়া। জঙ্গলের গন্ধ নিয়েই সমতলে নামতে হল। অবশেষে সাহারানপুর থেকে গুরুমুখী এক্সপ্রেস ধরা এবং এক স্বপ্নময় ভ্রমণের সমাপ্তি। (শেষ)

আমাদের যাত্রাপথ আর একবার: কলকাতা-দিল্লি-হরিদ্বার-ধনৌলটি-টিহরী-উত্তরকাশী-হরসিল-গঙ্গোত্রী-বারসু-উত্তরকাশী-ধরাসু বেন্ড-বারকোট বেন্ড-যমুনোত্রী-বারকোট শহর-মসুরী-দেহরাদুন-সাহারানপুর-কলকাতা।

ছবি লেখক

গাড়োয়াল ভ্রমণ সম্পর্কে খুঁটিনাটি তথ্য জানতে চান –

পড়ুন : পুজোয় চলুন / ভ্রমণ অনলাইনের বাছাই : গাড়োয়াল

 

0 Comments
Share
a-visit-to-garhwal-part-5-to-jankichatti-via-barkot
tanmoy bhattacharya
তন্ময় ভট্টাচার্য

উত্তরকাশী থেকে বেরিয়ে একটু দ্রুত এগোতে লাগলাম। কিন্তু ধরাসু বেন্ডে এসে আবার দাঁড়িয়ে পড়তে হল। সামনে গাড়ির লাইন জানান দিল ধস নেমেছে। তবে খুব বড়োসড়ো নয়। ঘন্টা খানেকের অপেক্ষা। ধস পরিষ্কার হতে আবার যাত্রা। গাড়ি ধরাসু বেন্ড পেরিয়ে এ বার নতুন রাস্তা নিল। ফেলে আসা টিহরীর দিকে না গিয়ে ডান দিকে ঘুরে চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে গাড়ি চলতে লাগল। সাধারণ পার্বত্য পথ। বিশেষ কিছু দেখার নেই। পথে শিবের মন্দির, গুম্ফা পেলাম। ব্যাস, আর কিছু বলার নেই। ঘণ্টা দুয়েক চলার পর পেয়ে গেলাম বারকোট বেন্ড। বারকোট শহর আমাদের সামনে আসবে যখন আমরা মুসৌরির দিকে যাব। কিন্তু আমাদের যাত্রা ডান দিকের পথে, গন্তব্য যমুনোত্রী। তাই ফেরার পথে বারকোট শহরকে পাব।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / প্রথম পর্ব : ধনৌলটি ছুঁয়ে নিউ টিহরী

এই বেন্ডে আমাদের আজকের ঠিকানা হোটেল আদিত্য প্যালেস। প্যালেস শুনে চমকে যাবেন না। ভাড়া মাত্র ৭০০ টাকা। দোতলা আবাস। তবে ওপরের ঘরগুলো বেশ সুন্দর। নীচের গুলো একটু ছোটো। দরাদরি করে ৫০০ করা হল। দূর থেকে আসা তীর্থযাত্রীরা বারকোটে এক রাত থেকে পরের দিন ভোরে উঠে জানকীচট্টি যান। সেখান থেকে ট্রেক করে যমুনোত্রী মন্দিরে পূজা দিয়ে আবার রাতের আগেই বারকোটে ফিরে আসেন। এর ফলে জানকীচট্টির হিমশীতল পরিবেশ থেকে বাঁচা যায়।  এখানে এই বারকোটে একটু দূরে যমুনার পারে তাঁবুতে থাকাই যেত। সেখান থেকে যমুনোত্রী হিমবাহের পাহাড়ের দেখা মেলে। কিন্তু পকেট অনুমতি দেয়নি।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / দ্বিতীয় পর্ব : টিহরী থেকে উত্তরকাশী হয়ে হরসিল

এই বারকোটেই আমাদের আধার কার্ড দেখিয়ে নাম নথিভুক্ত করতে হল। তবে দুপুরের খাওয়ার পরে। ছবিও তুলে রেখে দিল। একটি অনুমতিপত্র জাতীয় কাগজ প্রত্যেকের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হল। যদিও সেই কাগজ কোথাও কাজে লাগেনি। তবে দেখানোর দরকার পড়লে বা বিপদে কাজে লাগে। এখানে ঠান্ডা অনেক কম। উচ্চতাও অনেক কমে গিয়েছে। কাল প্রায় ৩০০০ ফুট গাড়িতে উঠব, তার পর হাঁটা। তবে দুপুরের বৃষ্টি আমাদের পিছু ছাড়েননি। বৃষ্টি হয়ে একটু ঠান্ডা বাড়িয়ে দিল। না হলে গায়ে গরমজামা ছাড়াই চলছিল।

shani tample
শনি মন্দির, জানকীচটি।

পরের দিন ভোর ৫টাতেই বেরিয়ে পড়লাম। একটু এগিয়ে দু’টো বাঁক নিতেই চমক। যমুনোত্রী হিমবাহের সঙ্গে আরও নাম-না-জানা দু-এক জন হাজির রূপের ডালি নিয়ে। এ যেন শেষ না হওয়া রূপকথা। ঘণ্টা তিন গাড়িতে থাকার পর আবার ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে পৌঁছে গেলাম হনুমানচট্টি। এখানেও অনেকে থাকেন। এখান থেকেই হেঁটে যান। জিএমভিএনের টুরিস্ট বাংলো এখানেও আছে। তবে আমরা শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যাব। একটু চা খেয়ে পুলিশের তল্লাশি পেরিয়ে আমরা এসে গেলাম জানকীচট্টি। এটা যমুনোত্রীর বেস ক্যাম্প। এখানেও আমাদের জিএমভিএন টুরিস্ট বাংলোয় বুকিং। ম্যানেজার নেই। একজন কেয়ারটেকার। একটু বয়স্ক। আমাদের ন’টা ঘর দেখাতে দেখাতে হাঁপিয়ে উঠলেন। তায় আমাদের দু’টো ঘর পছন্দ না হওয়ায় ইকো থেকে ডিলাক্স রুমে পরিবর্তন করে নিলাম। বাকি ঘরগুলি ১২টার মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে বলে আশ্বাস ছিল। কিন্তু ঠিক হতে হতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল।

manasa temple
মনসা মন্দির।

এই প্রথম আমাদের ঘর থেকেই দেখা দিলেন যমুনোত্রী হিমবাহ, একধারে কুলকুল করে বয়ে চলেছে যমুনা নদী। স্বর্গীয় অনুভুতি, কিন্তু ঘর অপরিচ্ছন্ন। তবে খাবারদাবার ভালোই। যাঁদের যমুনোত্রী যাওয়ার, তাঁরা চটপট আলুর পরোটা খেয়ে ঘোড়ার দরদস্তুর করে বেরিয়ে পড়ল। তাঁরা সংখ্যায় সাত। ঘোড়াপ্রতি যাওয়া-আসা নিয়ে ১০০০ টাকা। ডুলি চেপে যাওয়ার ইচ্ছা হয়েছিল আমার স্ত্রীর। কিন্তু তারা ৮০০০ টাকা চেয়ে বসায় তিনি রণে ভঙ্গ দেন। স্বাভাবিক ভাবেই মনটা খারাপ। আমরা জনা ছয়েক টিফিন করে বেরিয়ে পড়লাম জানকীচট্টি ঘুরে দেখতে। মন্দিরের দূরত্ব ৫ কিমি। কিন্তু রাস্তা খাড়াই। তাই ও দিকে না গিয়ে টুরিস্ট বাংলোর দায়িত্বে থাকা ভদ্রলোকের কথামতো চললাম সরস্বতী ও শিবমন্দির দেখতে। চড়াই এড়িয়ে যেতে গেলে অনেকটা ঘুরে যেতে হয়। তাই চড়াই পথই ধরলাম। আর কষ্ট করলাম বলে কেষ্টও মিলল, পথের সৌন্দর্য। প্রায় দু’ কিমি হেঁটে মন্দিরে পৌঁছোলাম। মা যমুনা কার্তিক পূর্ণিমার পরেই নেমে আসেন এই মন্দিরে। মন্দিরে একটি উষ্ণ প্রস্রবণ আছে। অনেকেই সেখানে প্রসাদ ফেলে ফুটিয়ে নেন। বোতলে করে জল নিয়ে আসেনয়। তার পর মন্দিরে পূজা দেন। মায়ের শীতকালীন আবাসে আমরা অবশ্য সাধারণ ভাবেই সরস্বতী মায়ের ও শিবের পূজা দিলাম। যমুনার ঠান্ডা জলের ছিটে আর গুরুগম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণ পরিবেশটা বেশ প্রাণময় করে তুলল। এই মন্দিরের ঠিক মাথায় যমুনোত্রী হিমবাহ। আর পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে যমুনা নদী। হু হু করে বইছে ঠান্ডা হাওয়া।

snow covered mountain from janakichati
তুষারাবৃত পর্বত, জানকীচটি থেকে।

এর পর আমরা চললাম গাড়োয়ালী গ্রাম দেখতে। গ্রামের ভেতর দিয়ে রাস্তা। অনেকটা হেঁটে পৌঁছে গেলাম শনি-নাগদেবতা মন্দিরে। মূল মন্দিরটি চারশো বছরের পুরনো। পাথর ও কাঠ দিয়ে তৈরি। সংকীর্ণ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। ভেতরে আলো খুব কম। মন্দিরের নীচে রামলীলার আয়োজন হচ্ছে। একটু দূরেই নতুন মন্দির তৈরি হয়েছে। ভেতরে ঢোকার জায়গা দেখতে পেলাম না। বাইরে থেকে প্রণাম সারলাম। শুনলাম শনিদেবতা এখন বদরী মহারাজের ওখানে গেছেন। নাগদেবতা আছেন। মন্দিরের পেছনেই তুষারশুভ্র পর্বতের উপস্থিতি। দর্শন শেষে ফিরে এলাম। কষ্ট কম হল, রাস্তা উৎরাই বলে। নীচে একটা ঝুলন্ত সেতু, যমুনা পেরোনোর ব্যবস্থা। এখান থেকেই শুর যমুনা-দূষণের।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / তৃতীয় পর্ব : গঙ্গোত্রীতে এক রাত

ক্লান্ত পদযুগলকে টেনে নিয়ে বাংলোয় ফিরে দেখি ঘর বসবাসযোগ্য হতে দেরি আছে। অগত্যা সামনের উঠোনে বসেই হিমবাহ দর্শন। এত কাছ থেকে হিমবাহ অনেকেই দেখেননি। এখন একটু ঠান্ডা কম, তাই পাহাড়ের গায়ের বরফ গলে যাচ্ছে। যাঁরা যমুনোত্রী মন্দির দর্শনে গিয়েছিলেন তাঁরাও ধীরে ধীরে ঘোড়ায় চেপে ফিরে এলেন। ততক্ষণে আমাদের দুপুরের খাওয়া সারা।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / চতুর্থ পর্ব : বারসুতে রাত কাটিয়ে বারকোটের পথে

সব ঘর পরিষ্কার হতে হতে বিকেল হয়ে গেল। বিকেলে সবাই যে যার ঘরে ব্যাগ রেখে একটি ঘরে মেয়েরা ও একটি ঘরে ছেলেরা জমায়েত হল। গল্প, তাস সঙ্গে চুটিয়ে আড্ডা। আমি এক বার ওই ঠান্ডায় বাইরে এসেছিলাম। চাঁদের আলোয় হিমবাহের অপার সৌন্দর্যের রূপ আমার সামনে ধরা দিয়েছিল। যমুনার কুলকুল শব্দ এখন যেন গর্জন। শুনলাম কয়েক মাস আগে মেঘফাটা বৃষ্টি ও সঙ্গে হড়কা বানের কবলে পড়েছিল এই অঞ্চল। এই বাংলো বরাতজোরে বেঁচে গিয়েছে। হারিয়ে গিয়েছে সামনের একটি হোটেল। আজও পারদ শূন্যের নীচে। তাই বেশি দেরি না করে শুয়ে পড়াই মঙ্গল। কাল ফিরব মুসৌরি। অনেক পথ। (চলবে)

ছবি লেখক

0 Comments
Share
a-visit-to-garhwal-part-4-on-the-way-to-barkot
tanmoy bhattacharya
তন্ময় ভট্টাচার্য

ইচ্ছা ছিল বা বলা যায় প্রায় নিশ্চিত ছিলাম বরফ পড়বে, কিন্তু বিধি বাম। গঙ্গোত্রীতেও তুষারপাত হল না। তবে সুগতদা চিন্তিত ছিলেন যে বরফ পড়লে ঠান্ডায় আমাদের আরও কষ্ট হবে। সঙ্গে প্রাকৃতিক যে দৃশ্য আমরা দু’ চোখ ভরে গিলছি, কিছুই পাওয়া যাবে না। কিন্তু আমার খুব ইচ্ছা ছিল অন্তত তুষারপাতের অভিজ্ঞতাটা হয়ে যাক। কিন্তু হল না। ব্যাজার মুখে গাড়িতে চড়লাম। একই রাস্তায় নেমে আসতে হবে ভাটোয়ারি পেরিয়ে গাংনানি অবধি। গানানির একটু আগে ডান দিকে রাস্তা উঠে যাবে। সেখান থেকে ১০ কিলোমিটার মতো গেলেই বারসু গ্রাম। বারসু গ্রাম হল দায়রা বা দরিয়া বুগিয়ালের বেস ক্যাম্প। এখানে সবাই ট্রেক করতেই আসে। কিন্তু আমাদের দলে সেই লোক হাতে গোনা চার-পাঁচ। তাই ট্রেক নয়, আমরা যাচ্ছি সৌন্দর্য আস্বাদন করতে।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / প্রথম পর্ব : ধনৌলটি ছুঁয়ে নিউ টিহরী

গাংনানির পর বারসুর রাস্তা ধরতেই চোখের সামনে হই হই করে চলে এল একের পর এক সাদা শৃঙ্গ। কেউ কেউ নাম করা যেমন কেদার, কেউ বা অনামী। সদ্য গতকাল রাতে বরফ পড়ে সাদা হয়ে সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলেছে। আমাদের গাড়ির গতিও তাই রুদ্ধ হয়ে গেল। আজ মোট যাওয়ার ছিল ৪০ কিমি মতো। তার শেষ ১০ কিমি পথে চলল আমাদের ছবি তোলার ধুম। তাই সেই পথ পাড়ি দিতে সময় লেগে গেল প্রায় এক ঘণ্টা। লাগবেই না কেন। এক এক বাঁকে এক এক শুভ্র হিমশীতল চূড়া আমাদের অভ্যর্থনা করছে যে। না নেমে উপায় কী? আমাদের গাড়ি হিমাচল থেকে আনানো হয়েছিল। স্থানীয় নন। তবে চালক আমাদের খুবই পরিচিত – যোগরাজ ভাই। গাড়ি দাঁড় করিয়ে ছবি তোলাতে তিনি তো অখুশি ননই, বরং যেখানে যেমন খুশি দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে আমাদের সাহায্য করেছেন। হয়তো দ্রষ্টব্য স্থান আমাদের খুঁজে নিতে হয়েছে, কিন্তু কোনও সময় তাড়াহুড়ো করেননি। ফলে ক্যামেরা ভরে ভরে ছবি এসেছে বাড়িতে।

barsu
বারসু।

আমরা পৌঁছোলাম জিএমভিএন-এর টুরিস্ট বাংলোয়। এই প্রথম গাড়ি একদম বাংলোর সামনে আমাদের পৌঁছে দিতে পারল। অন্যগুলির মতো এরও ঘর থেকে কোনো প্রাকৃতিক দৃশ্য সে ভাবে নেই। তবে ঘর পরিষ্কার যতই পুরোনো হোক। রান্নাও ভালো। বিপদ হতে পারত। অন্য সব টুরিস্ট বাংলোর মতো এখানে আমাদের আগমনের অগ্রিম খবর কর্তৃপক্ষ এঁদের পাঠায়নি। ফলে আমাদের আগে কোনো ট্রেকার দল এসে গেলে আমাদের ঘর তাদের হয়ে যেত। এখানে মূল আবাসে ৭টি ঘর ও সুন্দর তাঁবুসদৃশ দু’টি ঘর নেওয়া হয়েছে। তাঁবুগুলি থেকে সরাসরি বরফচূড়া দেখা যায়।

আসার পথে ভাটোয়ারির আগে পেটভরে প্রাতরাশ সেরে নিয়েছিলাম। আমাদের লক্ষ্য দু’টো – যেখানে যা খাবার পাওয়া যাবে, পেট ভরে খেয়ে নাও, আর যেখানে প্রথম তুষারশৃঙ্গ দেখা যাবে, ছবি তুলে চোখ ভরে দেখে নাও। দু’ ক্ষেত্রেই পরে আর নাও পেতে পারো। আজ সেই মন্ত্র কাজে দিল। এদের দুপুরের খাবার পরিবেশনে একটু দেরি হল। ১৯ জনের দল যে এখানে আসবে তার জন্য তারা প্রস্তুত ছিল না। তবে মানুষজন খুব ভালো। যথাসাধ্য সাহায্য করা এদের ধর্ম। সুন্দর প্রকৃতির মানুষ সুন্দর।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / দ্বিতীয় পর্ব : টিহরী থেকে উত্তরকাশী হয়ে হরসিল

আশেপাশে জঙ্গল আছে। একটু দূরে উঁচুতে ভোলানাথের মন্দির। দলের কয়েক জন সেখান থেকে ঘুরেও এলেন। আমরা দোতলার ছাদে দাঁড়িয়ে দূরের পাহাড় দেখতে লাগলাম আর রোদ গায়ে লাগাতে লাগলাম। এখানে তাপমাত্রা দশের আশেপাশে থাকলেও গঙ্গোত্রী হরসিলের পরে এখানে সে ভাবে আর ঠান্ডা লাগছিল না। ফলে লেপের তলায় ঢুকতে সবার আপত্তি। বিকেলে চায়ের আসরে শুনলাম এখানে অনেক ছায়াছবির শুটিং হয়েছে। তবে বেশির ভাগ নেপালি ছবি। নেপালি ছবিতে জায়গাটা নেপাল বলে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্যান্টিনের ইনচার্জ আমাদের এ সব গল্প শোনাচ্ছিলেন। এখন অবধি যেখানে যেখানে গিয়েছি, মনে হয় সর্বত্রই শুটিং করা যায়। কেন এখনও হলিউড এখানে পদার্পণ করেনি সেটাই বিস্ময়ের।

বিকেলে আকাশ মেঘাছন্ন হয়ে পড়ল। ঠান্ডাও শূন্যের দিকে যেতে লাগল রাত বাড়তেই। তবে কি বরফ পরবে? এর মধ্যে শুনতে পেলাম সব থেকে দুঃখের খবর। আমাদের দলের এক সদস্যের পরিচিত কয়েক জন আজ গঙ্গোত্রী গিয়েছেন। গিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু থাকতে পারেননি। কারণ? তুষারপাত। আমরা গঙ্গোত্রী থেকে বেরোনোর কয়েক ঘণ্টা পরেই শুরু হয়েছে তুষারপাত। সেনাবাহিনী সব গাড়ি কম করে দশ কিমি নীচে নামিয়ে দিয়েছেন। হায় কপাল। কয়েক ঘণ্টার তফাতে আমি জীবনের প্রথম তুষারপাত মিস করলাম। ভাগ্যে ছিল না, বা অন্য ভাবে ভাগ্য ভালো ছিল। কারণ বরফে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের নামা মুশকিল হয়ে যেত, থাকা মুশকিল হত। এর পর দুঃখী মন নিয়েই রাতের নিদ্রা।

another view frombarsu
বারসু থেকে আরও।

সকালে মন ভালো হয়ে গেল। কালকের বরফঢাকা পাহাড়গুলোর মাথায় চেপেছে আরও বরফ, আর ন্যাড়া পাহাড়গুলো রাতের বরফপাতে একদম সাদা। যেন আইসক্রিম। খুশির শেষ নেই। ক্যামেরা বার করে ছবি তুলতে তুলতে বুঝতে পারলাম এদের দূরত্ব খুব বেশি নয়। এমনকি বরফ শেষ যেখানে পড়েছে তার থেকে এই বাড়ির দূরত্ব সামান্যই। অর্থাৎ সেই হরসিলের মতো আবার কাছে এসেও এল না।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / তৃতীয় পর্ব : গঙ্গোত্রীতে এক রাত

আমরা বেড়িয়ে পড়লাম সকাল সকাল। আজ উত্তরকাশী হয়ে বারকোট যাব। উত্তরকাশীতে খানিকক্ষণ কাটাব, তা ছাড়া আজকের রাস্তাও অনেকটা। তাই ৭টায় বেরিয়ে পড়া ছাড়া উপায় ছিল না। তখন সবে পাহাড়ের মাথায় ধীরে ধীরে সূর্যের আলো এসে পৌঁছেছে। বরফঢাকা পাহাড়গুলি যেন ঝলসে উঠছে। ঘোড়ায় চড়ে দিনের কাজে বেরিয়ে পড়েছেন গ্রামবাসীরা। কালকে রাতে পরিচিত হওয়া এক বাঙালি ভদ্রলোক তাঁর গাইড নিয়ে দরিয়া বুগিয়াল চলে গেলেন। আমরা গাংনানি হয়ে উত্তরকাশী নেমে আসতে লাগলাম।

উত্তরকাশীতে আবার

একই রাস্তায় ফিরতে হবে বলে উত্তরকাশীর বিশ্বনাথ দর্শন আমরা ফেরার পথে করব বলে ঠিক করে রেখেছিলাম। সেইমতো ৯টা নাগাদ এখানে পৌঁছে মন্দির দর্শনে গেলাম। মন্দিরে শিব ও শক্তি। আগে শক্তির পূজা করে চলে গেলাম শিবের মন্দিরে, পাশাপাশি। বলা হয় গঙ্গার ধারা যেখানে উত্তরবাহিনী, অর্থাৎ সাধারণ নদীর তুলনায় একটু অন্যমুখী, সেই সব পীঠস্থান কাশী নামে পরিচিত। যেমন বারাণসী, উত্তরকাশী, গুপ্তকাশী প্রভৃতি। প্রচুর সন্ন্যাসী এই উত্তরকাশীতে তপশ্চর্যা করেন। এখানে ভাগীরথী তেজি কিন্তু জলের ধারা এখন সরু। মন্দিরে আমাদের পূজা ভালো ভাবেই সম্পন্ন হল। মনে শান্তি এল। শিবের দর্শন না পাওয়া পর্যন্ত আমার মন খুঁতখুঁত করছিল। এখানে এসে যেন প্রায় সম্পূর্ণ। এর পর বাকি শুধু যমুনোত্রী। এখানে প্রাতরাশ সেরে শহর ঘুরে দেখতে লাগলাম। সব রকম আধুনিক সুবিধাযুক্ত এই পাহাড়ি শহর।গাড়ি এক প্রস্থ সারাই হয়ে এল। আমরা উঠে বসলাম, ধারাসু বেন্ড হয়ে চললাম বারকোটের পথে। (চলবে)

ছবি লেখক

 

0 Comments
Share
a-visit-to-garhwal-part-3-one-night-in-gangotri
tanmoy bhattacharya
তন্ময় ভট্টাচার্য

হরসিলে আমরা তুষারপাত পেলাম না। এই ভ্রমণকাহিনি লেখার সময় হরসিলে ভালো তুষারপাত হয়েছে বলে শুনেছি। বিধি বাম। তবে তুষারপাত হলে পরিষ্কার সকাল উপভোগ করা যেত না। আজও সকাল ৭টা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম গঙ্গোত্রীর পথে। বেশি রাস্তা নয়, ঘণ্টা খানেকের। কিন্তু আমরা থেমে থেমে যাব বলে একটু তাড়াতাড়ি বেরোচ্ছি প্রতি দিন। আর থামব নাই-বা কেন? এক একটা মোড় ঘুরতেই বরফসাদা পাহাড়চূড়া এসে আমাদের দৃষ্টি সার্থক করে দিচ্ছে। আজও ব্যাতিক্রম নয়। একটু এগোতেই মাউন্ট শিবলিঙ্গ, সুদর্শন দেখা দিতে লাগলেন। যেন ডেকে নিয়ে যেতে চান। কালকে রাতে  ঠান্ডার ধাক্কা এখনও সহযাত্রীরা সামলাতে পারেননি। তাই গাড়ি থেকে নেমে ছবি তোলার লোক আজ সামান্যই, ২-৩ জন। বাকিরা গরম গাড়ির ভেতরেই। কাল রাতের পারদ শূন্যের নীচেই ছিল বলে শুনেছি। বেরোনোর সময় দেখেছি, জমে থাকা জল জেলি বা সাদা সাদা হয়ে গিয়েছে। যাকে গ্রাউন্ড ফ্রস্টিং বলে। আজকে সকালেও সেই ঠান্ডা কমার কোনো লক্ষণ নেই। উলটে আজ রাতে আরও বেশি ঠান্ডা পড়বে। তবে কি বরফ পাব?

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / দ্বিতীয় পর্ব : টিহরী থেকে উত্তরকাশী হয়ে হরসিল

অচিরেই আমরা গঙ্গোত্রী মন্দির থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরের গেটে এসে পৌঁছোলাম। এখানেই গাড়ির যাত্রা শেষ। আর এগোনোর অনুমতি নেই। আবার মালবাহক লাগবে, মালপত্র বয়ে নিয়ে যেতে হবে। এক এক বার এক এক মালবাহককে দিতে হবে ১১০ টাকা। এখানেও আমাদের থাকার জায়গা জিএমভিএন-এর ট্যুরিস্ট বাংলো। পাঠক, মনে রাখবেন এখানে জিএমভিএন-এর দু’টি বাংলো আছে –  একটি ছোটো, গঙ্গোত্রী মায়ের মন্দির লাগোয়া আর অন্যটি বড়ো, মন্দির থেকে ৫০০ মিটার দূরে, নদীর অন্য প্রান্তে। আমাদের বুকিং ছিল বড়োটিতে। খুঁজে পেতে অসুবিধা হবে না। তবে একটু দূরে, এই যা। নদীর ওপরে তৈরি ব্রিজ পেরোতে হবে এবং একটু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বাংলোয় পৌঁছোতে হবে। বয়স্কদের একটু অসুবিধা হতে পারে।

mount sudarshan
মাউন্ট সুদর্শন।

আমাদের দু’টি পরিবারের জন্য একটি রুমের ব্যবস্থা হয়েছে, যাকে বলা হয় ফ্যামিলি রুম। ভাড়া ১৬০০-এর মতো। বাকি প্রতিটি পরিবারের জন্য একটি করে ডিলাক্স রুম। ডিলাক্স রুমে প্রাতরাশ বিনা পয়সায়। ঘর থেকে কোনো পর্বত দেখতে পাওয়া যায় না, কিন্তু সামনের লনে এলেই কেদার ও সুদর্শন হাজির রূপের পসরা নিয়ে। বাংলোটি এত সুন্দর জায়গায় যে ডান দিকে কয়েক পা এগোলেই সূর্যকুণ্ড নামের ঝরনা। প্রবল বেগে নেমে আসছে ভাগীরথী।আর এক প্রান্তে সীতাকুণ্ড।

পুরাণ অনুসারে সগর রাজার ষাট হাজার সন্তান কপিলমুনির অভিশাপে ভস্ম হয়ে গেলে তাদের উত্তরপুরুষ ভগীরথ তপস্যাবলে মা গঙ্গার আগমন ঘটান মর্ত্যে। সেই পুণ্য গঙ্গার স্রোতে মুক্তিলাভ ঘটে সগররাজার সন্তানদের। এই গঙ্গোত্রীতেই মা গঙ্গার মর্ত্যে আগমন। ভগীরথের নামে এখানে তিনি ভাগীরথী। দেবপ্রয়াগে আলকানন্দার সঙ্গে মিশে গঙ্গা নামে প্রবাহিত। কিন্তু মা গঙ্গার স্রোতধারা মহাদেবের জটায় ধারণ ছাড়া মর্ত্যের বিনাশ আটকানো সম্ভব ছিল না। তাই মনে করা হয় এই সূর্যকুণ্ডে মহাদেব গঙ্গামা-কে জটায় ধারণ করেন। বিজ্ঞান বলছে, অনেক আগে গঙ্গোত্রী হিমবাহ গঙ্গোত্রী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ধীরে ধীরে গোমুখ পর্যন্ত পিছিয়ে যায়। এখন আরও পিছিয়ে গিয়েছে, যার নাম গোমুখ ২। গঙ্গোত্রী থেকে গোমুখ, গোমুখ ২ ট্রেক করে যাওয়া যায় বা ঘোড়ায় চড়ে।

suryakund
সূর্যকুণ্ড।

মালপত্র রেখে কুলিভাড়া মিটিয়ে আমরা চললাম গঙ্গামায়ের মন্দির দর্শনে। সূর্যকুণ্ডে রামধনু দেখা যায়। কিন্তু আজ অদৃশ্য। সূর্যকুণ্ড থেকে মাউন্ট সুদর্শন দেখে ছবি তুলে এগিয়ে চললাম। ভাগীরথীর একটি ধারা পেরিয়ে, প্রধান ধারার ওপরে ব্রিজে পৌঁছোনোর আগে ভাগীরথী শিলা। মনে করা হয় এখানেই ভগীরথ শিবের তপস্যা করেছিলেন। তার পর ব্রিজ পেরিয়ে মন্দির। মন্দিরে প্রধান বিগ্রহ মা গঙ্গা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ এসে এখানে পূজা দেন। আমিও ব্যতিক্রম নই। জল মাথায় দিলাম। ভালো ঠান্ডা, কিন্তু কেমন যেন সহ্য হয়ে গেল। ছোটো ছোটো ১০০ মিলিলিটারের বোতল বিক্রি হচ্ছে। ১০ টাকায় কিনে জল ভরে নিলাম। পুজোর প্রসাদ খই ও নকুলদানা। ভক্তিভরে খেয়ে নিলাম। ইতিহাস মতে, মন্দির তৈরি করেন নেপালি জেনারেল অমর সিং থাপা। নদীর এঁকে বেঁকে হারিয়ে যাওয়ার আগেই এক পাশে মন্দির। মন্দিরের উঠোনে দাঁড়ালে উলটো দিকে মাউন্ট সুদর্শন, সঙ্গী কেদার। যেন মা গঙ্গাকে পাহারা দিচ্ছেন। অপরূপ দৃশ্য। একটু থেকে বেরিয়ে এলাম।

এ বার ফেরার পালা। ফেরার পথে খেয়াল করলাম বন বিভাগের রেস্টহাউস এখানেই আছে। দুপুরের খাওয়া এখনও একটু দেরি আছে। তাই চললাম দেড় কিলোমিটার দূরের পাণ্ডব গুহা দেখতে। প্রথম দিকে ভালো চড়াই-উৎরাই থাকলেও শেষের দিকে প্রায় সমতল রাস্তা। দেড় কিমি থেকে একটু বেশিই হবে। হেঁটে যেতে বেশ লাগে। জঙ্গলের ভেতরে গাছের ফাঁকে ফাঁকে পাখির ডাক শুনে এগিয়ে চলা। নীচে দিয়ে বয়ে চলা ভাগীরথীর গর্জন। অবশেষে পৌঁছে গেলাম। একটা বড়ো পাথরের ভেতরে ছোটো গুহায় কয়েক জন সাধুর বসবাস। রান্নার ধোঁয়ায় ভেতরে থাকা বড্ড কষ্টকর। রাস্তার সৌন্দর্যের সঙ্গে এই জায়গাটার কোনো তুলনাই চলে না। তাই একটু হতোদ্যম হয়েই ফিরে চললাম।

pandav guha
পাণ্ডব গুহা।

সর্বত্র ফেরার সময় কম লাগে। এ বারেও তাই। তার মধ্যে বাংলো থেকে সহযাত্রীদের ফোন, আমার চলার গতি বাড়াতে আরও সাহায্য করল। দুপুরের গরম গরম নিরামিষ খাবার ডাকছে। ২০ মিনিটে ফিরে এলাম। পেটে চনমনে খিদে, গোগ্রাসে গিলে নিলাম সব। কিন্তু খাওয়ার পর থেকেই ঠান্ডা লাগতে লাগল বেমক্কা। হাঁটাচলার জন্য যে গা গরম হয়েছিল তা কিছুক্ষণের মধ্যেই উধাও। বেজায় ঠান্ডায়ে শরীরের হাড়গুলো যেন ঠোকাঠুকি করতে লাগল। সূর্য ডুবতেই উষ্ণতা একদম নিশ্চিত শূন্যের নীচে। ওদের অফিসরুমের বাইরে লাগানো থার্মোমিটার জানা দিচ্ছে -২ ডিগ্রি এখনই। রুমহিটারের খোঁজ নিয়ে পাওয়া গেল না। পেলেও লাভ হত না। সারা দিন বিদ্যুতের দেখা নেই। সন্ধের পর থেকেই চলছে জেনারেটর। ১১টা অবধি আলো জ্বালিয়ে রাখা, তার পরেই অন্ধকার। এরই মধ্যেই রাতের খাওয়া শেষ করে শুয়ে পড়া ছাড়া আর কোনো কাজ নেই।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / প্রথম পর্ব : ধনৌলটি ছুঁয়ে নিউ টিহরী

চলছে কনকনে হাওয়া। বরফের পাহাড়গুলো খুব কাছে হওয়ায় ঠান্ডা মাত্রাতিরিক্ত। পরের দিন সকাল সকাল ছবি তুলেই পালিয়ে আসার পথ ধরলাম। সকাল ৬টা নাগাদ সব গুছিয়ে বেরিয়ে আসার সময় উষ্ণতা দেখা গেলো -২। আজ যাব বারসু।

প্রসঙ্গত বলে রাখি গঙ্গোত্রীর উচ্চতা ১০ হাজার ফুটের একটু বেশি। সাধারণত শ্বাস নিতে অসুবিধা না হলেও, উত্তেজনা, ক্রোধ ইত্যাদিতে শ্বাসকষ্ট শুরু হতেই পারে। দরকারে পুলিশ বা সেনাবাহিনীর সাহায্য নিতে হবে। অতিরিক্ত ঠান্ডা থেকে বাঁচতে চকোলেট বা গা গরম রাখার খাবার খাওয়া প্রয়োজন। তবে নিরামিষ একমাত্র ভরসা, কারণ মাংস নৈব নৈব চ। ওতেই মানিয়ে নিতে হবে। (চলবে)

ছবি: লেখক

 

0 Comments
Share
a-visit-to-garhwal-part-2-from-new-tehri-to-harsil-via-uttarkashi
tanmoy bhattacharya
তন্ময় ভট্টাচার্য
এ কঁহা আ গয়ে হম

ভোর ভোর বেরিয়ে পড়লাম। চিনিয়ালসর, ধরাসু বেন্ড হয়ে উত্তরকাশীর ‘হোটেল গঙ্গাশ্রয়’ আজ আমাদের গন্তব্য। কিন্তু গাড়ি গতি তুলবে কী করে? চিনিয়ালসরের রাস্তা ধরতেই তো স্বর্গে প্রবেশ। ধীরে ধীরে সূর্যদেবতার উদয়, ডান দিকে নীচে দিগন্তবিস্তৃত জলরাশি, দূরে গাড়োয়াল মণ্ডলের ভাসমান কটেজ। পাহাড়েঘেরা ভাগীরথীর পাখির চোখে দৃশ্যায়ন। পুব আকাশ রক্তিম। বাঁকে বাঁকে শিহরন। বার বার গাড়ি থামিয়ে ছবি তোলা আর চোখের আরাম। এ দিকে দেরি হয়ে গেলে উত্তরকাশীতে আমাদের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিতে সমস্যা হতে পারে। তাই একটা তাড়া ছিলই। না হলে এখানেই তো থেকে যাওয়া যায়। এ ভাবেই ধীরে ধীরে পৌঁছে গেলাম ধরাসু বেন্ড। এখানে রাস্তা দু’ ভাগ – একটা গিয়েছে বারকোট হয়ে যমুনেত্রী বা দেহরাদুন আর অন্যটি উত্তরকাশী হয়ে হরসিল এবং গঙ্গোত্রী। আমরা দ্বিতীয়টি তথা ডান দিকে উত্তরকাশীর রাস্তা ধরলাম। তার আগে সেরে নিলাম প্রাতরাশ।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / প্রথম পর্ব : ধনৌলটি ছুঁয়ে নিউ টিহরী

bandarpuch from dharasu bend
ধরাসু বেন্ড থেকে বান্দরপুঁছ।

গাড়ি চলতে শুরু করতেই আবার থামাতে হল। ধরা দিলেন মাউন্ট বান্দরপুঁছ। একটা বাঁক পেরোতেই। বাঁদরের লেজের মতো বলে এঁর নাম বান্দরপুঁছ। তিনটি শিখর নিয়ে দাঁড়িয়ে। ইলেকট্রিক তারের বাধা টপকে মনের মতো ছবি হয়ত তোলা গেল না, কিন্তু চোখের আরাম ষোলো আনা। আবার গাড়ি এগিয়ে চলল। ঘণ্টা চারেক পরে উত্তরকাশী শহরে প্রবেশ। প্রথম এলাম কৈলাস আশ্রমে। এখানে পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠান ছিল আমাদের। সাধুসন্তদের ‘ভাণ্ডারা’ প্রদান। কয়েক ঘণ্টার অনুষ্ঠান সমাধা করে অনেকে আশ্রমেই মধ্যাহ্নভোজ সেরে নিলেন। আশ্রমের পাশেই বয়ে চলেছে ভাগীরথী। গঙ্গাদর্শন করে পৌঁছে গেলাম প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে আমাদের আজকের আস্তানা ‘হোটেল গঙ্গাশ্রয়’-এ। ঘরপ্রতি ভাড়া ১২০০। হোটেলটি একদম নদীর ধারেই। নদী কিছুটা নিচু দিয়ে প্রবাহিত। ঘরের পাশে লনে দাঁড়ালেই দেখা যায় এঁকে বেঁকে নদী এসেই আবার পাহাড়ের বাঁকে মিলিয়ে গেল। কয়েক ধরনের মাছরাঙার দেখা পেলাম।

khedi falls
খেড়ি ঝরনা।

একটু বিশ্রাম নিয়েই চলে গেলাম কাছেই মনুষ্যসৃষ্ট খেড়ি ফলস দেখতে। এটা একটি উপ-জলধারা, যা ভাগীরথীতে এসে মিশেছে। জলপ্রপাতের পাশে তৈরি হয়েছে রামধনু। শেষ বিকেলে এখানে পৌঁছোনোর মজাই আলাদা। ফিরে এসে নামলাম নদীর বুকে। জল ভালো ঠান্ডা। একে তো বরফগলা, তায় এখানে তাপমাত্রা নামতে শুরু করেছে। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই ঠান্ডার দাপট। তাড়াতাড়ি রাতের আহার শেষ করেই সারা দিনের ক্লান্তি দূরে করতে বিছানায় আশ্রয় নিলাম। তবে তার আগে এক প্রস্থ গানের লড়াই খেলে নিতে অসুবিধা হল না। এই স্বর্গীয় ভুমিতে মন আনন্দে গুন গুন করে উঠবেই “এ কঁহা আ গয়ে হম, তেরে সাথ…।” কাল আমাদের স্বপ্নের গন্তব্য হরসিল।

river bhagirathi from uttarkashi hotel
উত্তরকাশী হোটেল থেকে ভাগীরথী।

উত্তরকাশীর ‘হোটেল গঙ্গাশ্রয়’ নিঃসন্দেহে ভালো। শহর থেকে একটু দূরে, কিন্তু নিরিবিলি। তবে খাবারের দাম নিয়ে দরাদরি আবশ্যক। না হলে বেশি দামে কম খাবার। এ ছাড়া এখানে একটা অঙ্কগত সমস্যা দেখছি – সরকারি বেসরকারি সর্বত্রই। হিসেবে ভুল করা – মোট ক’টা রুটি খেলাম, খাবারের বিল কম-বেশি করে ফেলা ইত্যাদি। তাই নজর রাখতে হচ্ছে।

হরসিলের পথে

কনকনে ঠান্ডা উপেক্ষা করেই সক্কাল সক্কাল শয্যা ছাড়তে হল।৬টাতেই রওনা দিলাম হরসিলের পথে – রাজ কাপুরের স্বপ্নের হরসিল। উচ্চতা প্রায় ৮০০০ ফিট। এখানে আমাদের থাকার জায়গা জিএমভিএন-এর লজে।

গাড়ি চলছে, পাশে পাশে ভাগীরথীও। আগের দিন দেখা খেড়ি ফলসের একটু আগে উত্তরাখণ্ড পুলিশ প্রতিটি গাড়ির তথ্য সংরক্ষণ করে রাখে। খেড়ি ফলস ছাড়িয়ে মানেরি বাঁধ পেরিয়ে চলতে লাগলাম। মানেরি বাঁধও সুন্দর, প্রায় টিহরীর দোসর। সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। তবে আমাদের গ্রুপ ক্যাপ্টেনের ম্যানেজ করার একটা ‘স্কিলে’ আছে। তাতেই ভেতরে ঢোকার অনুমতি পেলাম, তবে ছবি তোলা নৈব নৈব চ। ভাটোয়ারিতে গাড়ির চাকা ঠিক করানো হল। এর পরে আর গাড়ির সারাই বা তেল ভরার আর কোনো দোকান পাওয়া যাবে না।

on way to harsil
হরসিলের পথে।

এই পথ যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ডালি নিয়ে অপেক্ষা করে আছে। তাই প্রায়ই বাঁকে বাঁকে গাড়ি থামিয়ে ছবি তোলা আর সেই সৌন্দর্যের স্বাদ নেওয়া চলছে। তার ওপর বড়ো গাড়ি, গতি তুলনায় কম। তাই মাত্র ৬৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে হরসিল পৌঁছোতেও কম করে চার ঘণ্টা লেগে গেল।

‘পাহাড়ি’ উইলসনের রাজ্যে

ভাগীরথী একটু ডান দিকে মোচড় নিয়ে এগিয়ে গিয়ে এই ভাবে একটা সুন্দর উপত্যকা বানিয়ে ফেলবে তা কল্পনা করতে পারিনি। সেনাবাহিনীর ক্যাম্প পেরিয়ে, ছোটো একটা নদীর ওপর দিয়ে এগিয়ে হরসিল গ্রামে প্রবেশ করা পর্যন্ত চারিদিকে বরফপড়া পাহাড়ের চূড়া দেখা যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু ভাগীরথী দেখতে আমাদের হরসিল জিএমভিএন-এর লজ অবধি যেতেই হত। মালপত্র বয়ে আনার জন্য কুলির ব্যবস্থা করে, ঘরের দাবি পেশ করে, আমাদের ঘরে মালপত্র ঢুকিয়ে ছুটলাম লজের লনে। সেখানে চমক। ঘরে বসে সব পাওয়া যাবে না। সামনের দিকের ঘরগুলি বা ওপরের ঘরগুলি থেকে কিছু দৃশ্য পাওয়া গেলেও বেশির ভাগ ঘরেই দৃশ্য নেই। তবে লনে কাচ দিয়ে ঘেরা কয়েকটি ঘর। সেখানে বসে আড্ডা ও ভাগীরথী দর্শন। সাথী হিমালয়ের কিছু বরফাবৃত চূড়া – বান্দরপুঞ্চ, শিবলিং, সুদর্শন – আরও কত! সব নাম কি ছাই জানি?

চূড়াগুলোতে একটু যেন কম কম বরফ। গলে গিয়েছে হয় তো। কিন্তু প্রকৃতিদেবী একটু বেলা বাড়তেই মেঘ এনে সেই খামতি মিটিয়ে দিতে লাগলেন। আমরা দূর থেকে সেই হোয়াইট ওয়াশ দেখতে লাগলাম। অনেকখানি জায়গা জুড়ে ভাগীরথী এঁকে বেঁকে, লজের সীমা চুম্বন করে, দূরের পাহাড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। স্রোত ভয়ানক বেশি, তবে জল কম। নদীর ধারে অসংখ্য নুড়িপাথর আর অগুনতি পাখির সমাহার। লালঝুঁটি থেকে সাধারণ বুনো পায়রা, উপস্থিত সবাই। কারণ? নদীর ধারে ভেসে আসা আপেল। এখানে আপেলের চাষ হয়। আর এ বছর আপেলের ফলন বেশ ভালো। লজের নিজস্ব গাছে আপেল পেড়ে খেতে আপত্তি নেই, কিন্তু গ্রামের মানুষের ফল পাড়া যায় না। বাজারে আপেলের দাম ২০ টাকা প্রতি কেজি। কল্পনা করা যায়?

bhagirathi at harsil
হরসিলে ভাগীরথী।

হরসিল বলিউডখ্যাত। গল্প শুনেছি রাজ কাপুর সাহেব হরসিলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বানিয়েছিলেন ‘রাম তেরি গঙ্গা মইলি’র মতো সিনেমা। এর বেশির ভাগ শুটিং এখানেই। মন্দাকিনীর নামে একটা ঝরনাও আছে, কিন্তু খুঁজে পেতে একটু কষ্ট। রাজ কাপুর কেন মুগ্ধ হয়েছিলেন তা এসেই বুঝতে পারছি। চারিদিকে বরফসাদা পাহাড়ের মাঝে এঁকে বেঁকে চলে যাওয়া ভাগীরথী তৈরি করেছে এক মনোরম উপত্যকা, এই এত্ত উঁচুতে। আর সেই উপত্যকায় সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আপেলগাছ।

এই হরসিলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘পাহাড়ি’ উইলসনের নাম। পুরো নাম, ফ্রেডরিক ই উইলসন। অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় উইলসন ১৮৫৭-এর সিপাহী বিদ্রোহের সময় ব্রিটিশ আর্মি ছেড়ে পালিয়ে এসে টিহরী মহারাজের আশ্রয় চান। কিন্তু ব্রিটিশবন্ধু মহারাজ তাঁকে আশ্রয় না দেওয়ায় তিনি পালিয়ে আসেন হিমালয়ের এই দুর্গম জায়গায়, লুকিয়ে থাকেন এই হরসিলে। বিয়ে করেন গুলাবি নামে এক পাহাড়ি-দুহিতাকে। তার পর পাহাড়ি মানুষদের আপেলের চাষের উপায় বাতলে ও গাছের গুঁড়ির ব্যবসা করে ধীরে ধীরে নিজেই হয়ে যান ‘রাজা’। লোকমুখে আজও তাঁর কাহিনি ঘোরে।

নদীতে নামা যেত। তবে সাহস হল না, একে নদী খরস্রোতা, তার ওপর আমার ‘ব্যালেন্স’ খুব একটা ভালো না। তবে চোখ ভরে দেখলাম প্রকৃতি। বেলা বাড়তেই হু হু করে হাওয়ার দাপট। মেঘে ভরে গেল আকাশ। মাঝারি বৃষ্টি শুরু হল। আশা জাগল যদি বরফ পড়ে। এখানে প্রকৃতি এখন এ রকমই। সকালে পরিষ্কার, বেলা বাড়তে থাকলে মেঘ এসে হাজির হবে। তার পর বৃষ্টি হয়ে আবার রাতের দিকে পরিষ্কার। স্থানীয়রা বললেন, আজ একটু বেশি সময় বৃষ্টি হল। আশেপাশের সবুজ পাহাড় স্নান করে আরও সুন্দর হল।

a view from harsil
হরসিল থেকে।

আর চোখের সামনে দেখতে পেলাম সামনের উচ্চ শৃঙ্গগুলি আরও সাদা। অনেক নীচে পর্যন্ত বরফ পড়েছে। চাঁদ উঠল। তবে মাথার ওপরে। লজের আলোয় আলাদা করে খুব বেশি না হলেও সামান্য সামান্য দেখা যেতে লাগল। কলকাতার সংস্থা ওয়েদার আল্টিমা আসার আগে আমাকে বলে দিয়েছিল যে এই সময় পশ্চিমী ঝঞ্জার কারণে হরসিল বা গঙ্গোত্রীর মতো উঁচু জায়গায় বৃষ্টি তো পড়বেই, বরফও পড়তে পারে। তাই আশায় বুক বাঁধলেও শেষমেশ হতাশই হলাম। রাতের ঠান্ডা ভয়ংকর। শূন্যের কাছাকাছি। বাঁচোয়া যে রুমহিটার চলছিল, বিদ্যুতেরও সমস্যা হয়নি।

আমার হরসিলে দু’ রাত থাকার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু আমাদের পরিকল্পনায় এক রাত। ঠান্ডায় কষ্ট করে এক রাত কাটিয়ে দেওয়া যায় শুধুমাত্র প্রাকৃতিক দৃশ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করে। এখানে প্রকৃতি যেন একটু বেশি সুন্দর সাজে। বৃষ্টি না হলে হয়তো গ্রাম ঘুরে দেখতাম। তবে পরের দিন সকালে উঠে বেরিয়ে পড়ার তাড়ার মধ্যেও সকালের পরিষ্কার আকাশে আরও কয়েক বার উপত্যকার সৌন্দর্য অবলোকন করতে ভুলিনি। আবার কবে আসব কে জানে আমার এই স্বপ্নপুরীতে। (চলবে)

ছবি: লেখক

0 Comments
Share
a-visit-to-garhwal-from-haridwar-to-tehri-via-dhanaulti
tanmoy bhattacharya
তন্ময় ভট্টাচার্য
গাড়োয়ালের প্রবেশদ্বারে

গাড়োয়াল শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আকাশপারে গাড়োয়াল হিমালয়ের বরফাবৃত শৃঙ্গরাজি, আর নীচে দিয়ে বয়ে চলা গঙ্গার বা যমুনার বিভিন্ন উপনদী। স্বপ্নের কাছাকাছি এই অঞ্চলে যাওয়ার জন্য আমাদের পরিকল্পনা প্রায় এক বছরের। ঠিক হল, সুগত বসুর নেতৃত্বে আমাদের ১৯ জনের দল ১৭ অক্টোবর মহাষ্টমীর দিন হরিদ্বারে মিলিত হবে। হরিদ্বারকে গাড়োয়ালের প্রবেশদ্বার বলা যায়। এখান থেকেই শুরু করা যায় গাড়োয়াল হিমালয় ভ্রমণ। সেইমতো বিমানে দমদম থেকে দিল্লি, সেখানে রাত কাটিয়ে পরের দিন ভোরে দেরাদুন শতাব্দী ধরে সাড়ে এগারোটা নাগাদ হরিদ্বারে পৌঁছে গেলাম।

আরও পড়ুন ‘লাল কাঁকড়ার দেশ’- তাজপুর

হরিদ্বার বা হরদুয়ার, হরির দ্বার আর হরেরও দ্বার। হর-কি-পউড়ি ঘাট এর প্রাণকেন্দ্র। আমাদের হোটেলের নামও হোটেল হর কি পউড়ি। একদম ঘাটের পাশে। আরও অনেক হোটেলই ঘাটের আশেপাশে আছে। তবে গঙ্গা লাগোয়া হোটেলগুলির রেট খুব চড়া। স্টেশন থেকে এই সব হোটেলে পৌঁছোতে অটো বা টোটো ভরসা। নো এন্ট্রির ভয় দেখিয়ে প্রথমেই অনেক ভাড়া চাইবে, দরাদরিতে কমবে। নিরমিষ খাবার। তবে হৃষীকেশের দিকে রাস্তায় কিছু আমিষ খাবার পাওয়া যায়। খাবারের মান খারাপ নয়, তবে দাম বেশি। জনপ্রতি ১০০-১২০ টাকা লাগবেই এক এক বেলা খেতে।

har ki pauri
হর-কি-পৌড়ি।

আমরা হরিদ্বার পৌঁছে একটু বিশ্রাম নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম ঘাট দেখতে। ঘাটে পৌঁছোনোর জন্য ব্রিজ আছে, ব্রিজ থেকে ঘড়িঘর দেখা যায়। ঘাটে পৌঁছে মাথায় গঙ্গাজল নিলাম। এখানে মূল গঙ্গা নয়, রয়েছে গঙ্গার একটি ধারা, কৃত্রিম চ্যানেল দিয়ে দ্রুত বয়ে চলেছে। দূরে মহাদেবের সুউচ্চ মন্দির। এখানেই বিকেলে আরতি ও পূজাপাঠ হবে।

ইচ্ছা হল কঙ্খল যাওয়ার। ২৫০ টাকায় অটো ভাড়া করে আমরা ৫ জন চলে গেলাম সেখানে। কঙ্খল শহরের দক্ষিণে। এখানকার দ্রষ্টব্য দক্ষেশ্বর মহাদেব মন্দির, সতীকুণ্ড, মা মনসা মন্দির, আনন্দময়ী মায়ের মন্দির ইত্যাদি। আমাদের প্রথম গন্তব্য দক্ষেশ্বর মহাদেব। মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে গঙ্গা। দক্ষযজ্ঞের স্মরণে নিবেদিত এই মন্দির। পাশেই সতীকুণ্ড (বলা হয় এখানেই সতী জীবন ত্যাগ করেন) ও মা মনসা মন্দির। সেখান থেকে একটু এগিয়ে আনন্দময়ী মায়ের আশ্রম। বাঙালি অধ্যুষিত এই আশ্রমে ঢুকলে মন শান্তিতে ভরে যায়।

dakkha temple
দক্ষ মন্দির।

কঙ্খল থেকে ফিরে এলাম হর-কি-পউড়িতে। সিগাল জাতীয় কিছু পাখির খানিক আনাগোনা দেখে আসন গ্রহণ করতে হল ঘাটের ঠিক উলটো দিকে। ভালো ভিড় এর মধ্যেই। পূজার সময় গোনা শুরু। উলটো দিকের ঘাটের সিঁড়িতে বসে গঙ্গাপূজা দেখতে লাগলাম। সাড়ে পাঁচটা থেকে আধ ঘণ্টা মতো পূজাপাঠ হওয়ার পর শুরু হল আরতি। এর মধ্যে অনেকেই পাতার ভেলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে নদীতে ভাসিয়ে দিচ্ছেন। এ যেন এক স্বর্গীয় অনুভুতি। কম করে ১০ জন পুরোহিত ১৫ মিনিট ধরে গঙ্গামায়ের আরতি করলেন। সঙ্গে ঘণ্টাবাদন ও স্তোত্রপাঠ পরিবেশকে ভাবগম্ভীর করে তুলল। ‘জয় গঙ্গা মাইয়া’ ধ্বনি দিয়ে আরতি শেষ হওয়ার পর আর বিশেষ কিছু করার ছিল না, হোটেলে ফিরে পরের দিনের প্রস্তুতি নেওয়া ছাড়া। দুঃখ একটাই, আমাদের এই ভ্রমণসূচিতে হৃষীকেশ নেই, তাই রামঝুলা, লক্ষণঝুলা পরের বারের জন্য তোলা থাকল। তবে হরিদ্বার বা দেরাদুনে দু’ দিন থাকলে হৃষীকেশ দেখে আসা সম্ভব।

গাড়োয়াল-সুন্দরী ধনৌলটি

পরের দিন সকাল ৮ টায় হরিদ্বার থেকে টেম্পো ট্রাভেলারে চেপে দেরাদুন হয়ে চললাম ধনৌলটি। দেরাদুন পেরোতেই চড়াই শুরু। তার আগে রাস্তায় প্রাতরাশ সেরে নিলাম। ধনৌলটির খ্যাতি লালিগুরাস বা রডোডেন্ড্রন-সহ বিভিন্ন ফুল ও দিগন্তবিস্তৃত বরফাবৃত পর্বতমালা দর্শনের জন্য। প্রায় চার ঘণ্টা সড়কযাত্রায় আমাদের উন্মাদনা তুঙ্গে, সঙ্গে চলছে নতুন স্বপ্ন বোনা। পথিমধ্যে হনুমানকুলকে বাই বাই করে, অজস্র বার ছবি তুলে আমরা পৌঁছোলাম ধনৌলটি ইকোপার্ক সংলগ্ন ‘আওয়ারা ক্যাম্পে’। এই ‘আওয়ারা ক্যাম্প’ আজ আমাদের ঠিকানা। রাস্তা থেকে প্রায় ৫০০-৬০০ ফুট নীচে পর পর তাঁবু খাটানো। কিন্তু নামা-ওঠার পথটি বিপদসঙ্কুল। পথটি বেশ খাড়া, সাবধানে না নামলে স্লিপ করে পড়ে চোট লাগার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে অনেকখানি জায়গা জুড়ে ছড়ানোছেটানো তাঁবুর সারিতে পৌঁছে যাওয়ার পর মজাই আলাদা। কনকনে ঠান্ডা। চারিদিক খোলা, তাই ঠান্ডা হাওয়ার দাপট খুব। ১৮০ ডিগ্রি খোলা অঞ্চলে হিমালয়ের তুষারাবৃত শৃঙ্গরাজি দর্শন দেবে আমাদের।

আরও পড়ুন কুমারী সৈকত চাঁদপুরে একটা দিন

এক ধাপ উঁচুতে এদের রান্নঘর। বুকিং-এর সময়েই জনপ্রতি থাকা-খাওয়া খরচ এক সঙ্গে দেওয়া আছে। সুন্দর পানীয়র মাধ্যমে স্বাগত জানানো হল। অনেকটা নামার কষ্ট এক নিমিষে উধাও। দুপুরের খাওয়া ভালোই ছিল। খাওয়া শেষে যে যার তাঁবুতে গিয়ে হালকা বিশ্রাম নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম। মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে কেউ কেউ দর্শন দিলেন আমাদের। শ্রীকান্ত, গঙ্গোত্রীর তিনটি চূড়া ও থলয়সাগর আমাদের দর্শন দিলেন। সোনালি আবিরের খেলায় মেতে উঠল দিগন্ত। অবগুণ্ঠন খুলে ধীরে ধীরে স্বপ্নপুরী বানিয়ে ফেললেন হিমালয়। দোলনা খাটানো ছিল। সেখানে বসে দোল খেতে খেতে সূর্যাস্তের পর্বতমালা দর্শন যেন শুরুতেই জানিয়ে দিল কী হতে চলেছে এই ভ্রমণ। এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু ‘আওয়ারা ক্যাম্প’ আমাদের জন্য ক্যাম্পফায়ার, নাচগানের আয়োজন করে ওই ঠান্ডার রাতকে আরও মায়াবী করে তুলল।

রাতে ঠান্ডা ভালোই ছিল। কিন্তু রাত কাটতেই যে দৃশ্য চোখের সামনে এল তা ভুলিয়ে দিল সমস্ত কষ্ট। হিমালয়ের দিগন্তবিস্তৃত শৃঙ্গরাজি খানিকক্ষণের জন্য সবার সামনে আবার উন্মুক্ত হল। কিন্তু বিধি বাম। বেশিক্ষণ থাকলেন না তাঁরা। চলে গেলেন মেঘের আড়ালে। যেন লুকোচুরি খেলা। আমরাও আর তাঁদের জন্য অপেক্ষা করতে পারলাম না। একটু পরেই বেরিয়ে পড়তে হবে টিহরির উদ্দেশে। প্রাতরাশ সেরেই শুরু হল পরের গন্তব্যে যাওয়ার প্রস্তুতি।

more view from dhanaulti
ধনৌলটি থেকে আরও দৃশ্য।

৫০০-৬০০ ফুট খাড়া পথ ভেঙে ফের ওপরে উঠে আসা সহজ ছিল না, বিশেষ করে বয়স্কদের। তার ওপর খাড়াই পথে পা হড়কে যাওয়ার ভয় থাকে। ভালো গ্রিপের জুতো পরে আসা আবশ্যক। আমার স্ত্রী-কন্যা দ্রুত উঠে গেল। মালপত্র নিয়ে চলে গেল ক্যাম্পের লোকজন। আমি মিনিট ১৫ সময় নিয়ে ওপরে উঠে এলাম। রাস্থার পাশেই গাড়ি রাখা ছিল। শুরু হল আবার সড়কযাত্রা। একটু এগোতেই রাস্তার ধারে পাইনের সারি জানান দিল এটাই ধনৌলটি ইকোপার্ক। এখানেই পাইনের সারির ফাঁক দিয়ে সূর্যের রশ্মি ঝলমলিয়ে ওঠে। ব্যাকগ্রাউন্ডে পর্বতরাজি। যেন এক স্বপ্নপুরী।

মোহময়ী টিহরী

প্রায় ঘণ্টা তিনেক চলার পর চাম্বা পেরোতেই এক দিকে এঁকেবেঁকে ভাগীরথী। এখানে ভাগীরথীর ওপর বাঁধ হয়েছে। এই বাঁধ নিয়ে তো অনেক সংগ্রামের কাহিনি, সে সব শুনলাম স্থানীয়দের কাছে। পুরাতন টিহরী এখন বসবাসের অযোগ্য। বাঁধ তৈরির ফলে যাঁরা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, তাঁদের নিয়েই একটু ওপরে তৈরি হয়েছে নতুন টিহরী। এখানে ছোটো একটি জলধারা ভাগীরথীতে মিশেছে। এবং জলাধারকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক সুন্দর লেক। জলের গতি বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় এখানে ভাগীরথী ধীরস্থির। কিন্তু চারিদিকে সুউচ্চ পর্বতমালা লেকের সৌন্দর্য কয়েক গুণ বাড়িয়ে তুলেছে। আমাদের দলের বেশির ভাগেরই জায়গা হোটেল মনার-এ। ১২০০ টাকা ঘরভাড়ায় এখানে প্রায় সবাই থাকলেও দু’টি পরিবারের জন্য অন্যত্র ব্যবস্থা করতে হবে। গাড়োয়াল মণ্ডল বিকাশ নিগমের সুন্দর কটেজ আছে। তৈরি হয়েছে ভাসমান কটেজও। সেগুলি লেকের ওপরে ভেলায় ভাসমান। পারে যাতায়াতের জন্য নৌকা আছে। কিন্তু সবেরই দাম আকাশছোঁয়া। গেলাম টিহরী হাইড্রো ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন কিমিটেডের অতিথিনিবাসে। এখানে থাকার ঘর পাওয়া মুশকিল, কিন্তু ফাঁকা থাকলে দিয়ে দেয়। ভাগ্যক্রমে দু’টি ঘর পাওয়া গেল। ভাড়া ২৫০ টাকা করে। সব চেয়ে সস্তা, কিন্তু সুন্দর। ঘরগুলি সাজানো, একেবারে নদীর পাশেই। সামনে বিস্তৃত খোলা অঞ্চল, পেছনের ফুলের বাগানের পাশেই ভাগীরথীর বহমান ধারা এবং একটু দূরে বাঁধ। যেন এক স্বর্গীয় অনুভুতি। সকলের খাওয়া কিন্তু হোটেল মানাআরে। হোটেল মানাআর থেকে দৃশ্য একটু আলাদা। অনেকটা পাখির চোখের দৃশ্য। কিন্তু দু’ জায়গা থেকেই সুন্দর দৃশ্য দেখা যায়।

বিকেলে গেলাম জলক্রীড়ায়। এখানে বোটে করে ভাগীরথীর এ-পার ও-পার করায়, আধ ঘণ্টা জনপ্রতি ৪০০ টাকায়। এ ছাড়া রয়েছে ওয়াটার স্কুটারও। দাম একটু চড়া। ছাউনিদেওয়া সাধারণ মোটরবোটে লেকতুল্য নদীতে এ-পার ও-পার করে পড়ন্ত সূর্যালোকে টিহরীকে অবলোকন করলাম।  মোহময়ী টিহরী যেন মায়ালোকে পরিণত। সূর্য ডোবার সাথে সাথে ঠান্ডা বাড়তে লাগল। তাই অন্ধকার হতেই সবাই ঘরবন্দি হয়ে গেলাম। কালকের গন্তব্য উত্তরকাশী। (চলবে)

ছবি লেখক 

1 Comments
Share
a-visit-to-the-land-of-red-crabs-tajpur
avijit chatterjee
অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়

‘পায়ের তলায় সরষে’ – আমি বাধ্য হয়েই ভ্রমণকারী, ভ্রমণ আমার জীবনযাপনেরই অঙ্গ। কিছু দিন এক জায়গায় থিতু হয়ে থাকলেই মন উচাটন হয়, মাথার মধ্যে একটা ক্যারা নড়াচড়া করে।

প্রতি দিন একই মানুষের সঙ্গ, খুব ঘনিষ্ট হলেও, আর উত্তাপ দেয় না! একই রকম মুখ দেখতে দেখতে চোখ খরখরে হয়ে যায়, তখন ইচ্ছে করে কিছু দিনের জন্য অন্য নদীতে ডুব দিয়ে আসি, অন্য হাওয়ায় আচমন করি। মনে হয়, অরণ্যের দিনরাত্রির চরিত্রগুলো বোধহয় আমিই! আচ্ছা ভাবুন তো, নিরিবিলি জঙ্গলে বসে থাকা বা গড়ানো কিংবা পাহাড়, সমুদ্র, নদীতে মিশে যাওয়া – এর আকর্ষণ আপনি অস্বীকার করতে পারেন।

আরও পড়ুন কুমারী সৈকত চাঁদপুরে একটা দিন

পরিচিত পরিবেশ ছাড়িয়ে, দূরে কোথাও নির্জন জায়গায় থাকলে, নিজের সঙ্গে দেখা হয়। মাঝে মাঝে নিজের সাহচর্য্ও তো দরকার! জঙ্গলে, পাহাড়ে, উপরে পরিষ্কার তারাভরা আকাশ, মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে বাতাসে পাতার শব্দ… আর কোনো মানুষ নেই… নিজের সঙ্গে কথা বলেছেন কখনো! দেখবেন, নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করবেন! অনুভব করবেন, রূপসী বসুন্ধরা, মানুষের বসবাসের পক্ষে চমৎকার এক জায়গা! এ রকম নিস্তব্ধতার মধ্যেই তো টের পাওয়া যায় – মানুষের কণ্ঠস্বরঃ… একটা দু’টো পাখির ডাক, কিংবা বাতাসে, গাছের পাতার শব্দ, কত মধুর।

the lone boat at tajpur
আমিও একাকী।

প্রতি দিন আমরা অনেক স্বপ্ন দেখি, অধিকাংশ স্বপ্নই আর মনে থাকে না। ধূপের গন্ধের মতো মিলিয়ে যায়, কোনো কোনোটি সকালে জেগে ওঠার পরেও কিছুক্ষণ মনে থাকে, আর কিছু স্বপ্ন বেশ স্থায়ী দাগ রেখে যায় স্মৃতিতে। তাজপুর যেন অনেকটা, সে রকমই। তাজপুর আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে আপনার স্বপ্নে – সমুদ্রের ঢেউয়ের দোলা আর ফেনার আস্তরণ সঙ্গে সবুজ ঝাউগাছের গা- ঘেঁষাঘেঁষি বাস, যেন পথিকের ‘দিগন্ত-পথ’, কোথায় শেষ হবে, কেউ জানে না। জানতে চায়-ও না। ভ্রমর যেমন ফুলের সৌন্দর্যের তোয়াক্কা করে না, শুধু মধুর সন্ধানে ফুলের গভীরে ঢুকে যায়, তেমনই আমি এই প্রকৃতির সৌন্দর্যের তোয়াক্কা না করে, প্রকৃতির সৌন্দর্যের অনুভূতির মধ্যে ঢুকে পড়লাম। প্রকৃতি এখানে উদার আর উন্মত্ত। নরম সকাল, পড়ন্ত বিকেল, সাঁঝবেলা কি রাতের বেলায়… সব কিছুই তো আপনার!

এখানে আছে শুধু অন্তহীন ঢেউ ভাঙার শব্দ আর ঢেউ গোনার অবসর, নীলচে সুমুদ্রে কখনো আলো কখনো ছায়া, সফেদ ঢেউয়ের আছড়ে পড়া, সবুজ ঝাউগাছে, আলতো ছোঁয়ায় সেই ঢেউ পা-দুখানি ভিজিয়ে দিয়ে যাবে, বিন্দু বিন্দু জলকণা, স্নেহধারার মতো ঝরে পড়বে আপনার চোখে-মুখে।

sunrise at tajpur
নতুন সূর্য।

ঘুম থেকে উঠে এসে দাঁড়ালাম সমুদ্রের ধারে। শনশন হাওয়ায় ঝাউগাছগুলো পাগলের মতো দুলছে, চোখের সামনে সূর্য পৃথিবীকে চুমু খাচ্ছে, চমৎকার একটি আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে, সেই আলোয় মাখামাখি হয়ে, আকাশ খিলখিল করে হেসে উঠছে। হঠাৎ করে আমার মাথায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের চরিত্রহীন উপনাস্যের ‘কিরণময়ী ও দিবাকরের’ কথা মনে পড়ে গেল… কিরণময়ী দিবাকরকে চুম্বন করেছিলেন, তার পর খিলখিল করে হেসে উঠেছিলেন। মনে হল আমার চরিত্রহীন আর হয়ে ওঠা হল না। হালকা লালচে সোনালি রং-মাখা আকাশ, যেন পৃথিবীর সেরা সুন্দরী! খিলখিল করে হেসে উঠছে।

নতুন এক ফুসফুস পেলাম, তাজপুরে এসে, মনটা ভরে গেল। বয়সটা বেড়ে গিয়েছে, তা না হলে সারা দিন, নতুন প্রেম করলে যেমন হয়… শুধু কথা বলতাম আর ফটো তুলতাম।

শহর থেকে অল্প দূরে কোলাহলমুক্ত এক নির্জন জায়গা, ‘শব্দের অঙ্গীকার’ না-রাখা এক সমুদ্রতট – এই তাজপুর।

কচি আলো গায়ে মেখে জেগে ওঠা – পৃথিবীটাকে কী মায়াময় মনে হচ্ছে। ঘুম ভাঙা পাখিরা একটু হকচকিয়ে উঠেই, পৃথিবীটাকে দেখতে পেয়ে আনন্দে চিৎকার শুরু করেছে, কোমল ও বিনীত ভাবে সূর্য উঠছে!

casurina jungle, tajpur
ঝাউবনে পাতায় পাতায়।

তাজপুরের ঝাউবনে হাঁটতে হাঁটতে মনে হল এ যেন অভাগীর বুকে সবুজ ভালোবাসার গল্প, এক প্রান্তিক মানুষের আপনজন হয়ে ওঠার কথা, একই আকাশের নীচে, প্রান্তিক মানুষেরা অনেক বড়ো মনের মালিক বলে মনে হয়। প্রান্ত্যজনের বাঁচার হাতিয়ার…ঝাউগাছের ভিতর হাঁটা, আর সমুদ্রের ওপর আদিগন্ত নীল শামিয়ানা। এ যেন ‘অসময়ের পায়ে পায়ে হাঁটা’, শহুরে খোলস ছেড়ে দিয়ে মানবিক মন নিয়ে মিশে যান মানুষের সঙ্গে, দয়িত্বশীল ভবঘুরে ভাব নিয়ে – অনুভবটা অনেকটা এ রকম… ‘একেলা এসেছি এই ভবে, একেলাই চলে যেতে হবে…’।

সমুদ্রের ধারে এলে চোখে পড়ে  আকাশলীনা – কবি জীবনানন্দ দাস বলেছিলেন, ‘সমুদ্র আর আকাশ যেখানে মিশেছে, সেই হল ‘আকাশলীনা’, ইংরেজিতে যাকে বলে স্কাইলাইন’।

কবি সুবোধ সরকারের একটি লেখা পড়েছিলাম,”এখন কলকাতায় আকাশ কিনে নিচ্ছে, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো, পঞ্চাশ-ষাট তলা হাইরাইস বানিয়ে, ভেঙে চুরচুর করে দিচ্ছে আকাশরেখা, আসলে মানুষ ইন্ডাস্ট্রি চায়, চাকরি চায়, দু’বেলা দু’মুঠো পেটে দিতে চায়, আকাশ দিয়ে কি পেট ভরে! তাতে যদি আকাশ হারিয়ে যায়, কোনো ক্ষতি নেই। আমরা যেমন বছরে এক বার দু’ বার পিকনিক করতে জঙ্গলে যাই, কিন্তু জঙ্গল সঙ্গে করে নিয়ে আসি না, তেমনি আমরা আকাশ দেখতে যাব” – তাই পরের প্রজন্মকে আকাশলীনা দেখাতে তাজপুরের সমুদ্রের ধারে ছুটে ছুটে আসতে হবে।

beauty of tajpur beach
সুদূরের ডাক।

খাওয়ার কতগুলি অস্থায়ী আস্তানা সমুদ্রের ধারেই – চলুন না, দিনযাপনের একঘেয়েমি কাটাতে, এক কাপ কফি নিয়ে – না, মত বিনিময় নয়, হৃদয় বিনিময় করি, সেই হৃদয় যা আমরা খইয়ে ফেলতে ফেলতে এখনও দু’ হাতে আঁকড়ে ধরে রেখেছি। জীবন মানে তো হিরের খনি! মনে পড়ে গেল কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখা দু’টি লাইন, “অবান্তর স্মৃতির ভেতরে আছে, তোমার মুখ..অশ্রু ঝলোমলো..”।

‘২২শে শ্রাবণ’ – প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় অভিনীত একটি বাংলা সিনেমা দেখেছিলাম। ওঁর মুখে একটি সংলাপ ছিল, “জীবনে ভাত ডাল আর বিরিয়ানির ডিফারেন্সটা বোঝা দরকার, প্রথমটা নেসেসিটি,আর পরেরটা লাক্সারি”। ছোটো ছোটো এই বেড়ানোর মুহূর্তগুলোই, সেই নেসেসিটি, তাজপুরের সমুদ্রতট আর লাল কাঁকড়াদের লুকোচুরি, কিংবা মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের অনলস জীবনসংগ্রাম, আপনাকে সেই কথাই মনে করিয়ে দেবে, এটা নেসেসিটি। যদি কেউ অন্যের জিনিস আঁকড়ে থাকে, তা হলে সে একা হয়ে যাবে, কিন্তু যেগুলো নিজের, নিজের ভালোবাসা, নিজের কামনা, নিজের সৃষ্টি আঁকড়ে রাখলে, কোনোদিন একা হতে হবে না।

আরও পড়ুন বিশ্বনাথের বারাণসী, বারাণসীর বিসমিল্লাহ

আকাশ কালো, সাপের ফনার মতো মেঘগুলো সুমুদ্র থেকে উঠে আসছে। সুমিতা চেঁচিয়ে উঠল খানিকটা ভয়েই, সুনামি আসছে! সুনামি আসছে! আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম প্রকৃতির এই উন্মত্ত রূপ – সুমুদ্র ফুঁসছে, সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকানি, আর বাজের চমক। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যাওয়া এই রূপ – এ কি মুহূর্তের উপলব্ধি না অনুভূতি? চিমটি কাটলাম। সম্বিত ফিরল ভাস্করের ডাকে – “অভিজিৎ দৌড়াও, বৃষ্টি নেমে গেছে যে”।

cloud on tajpur
ছায়া ঘনাইছে।

জানেন, ‘আপেক্ষিকতার তত্ত্ব’ খুব সহজ করে বোঝাতে আইনস্টাইন নাকি কাউকে বলেছিলেন, “মনে করো, কোনো লোকের একটি পা ফায়ার প্লেসের আগুনে ঠুসে দেওয়া হয়েছে, তা হলে সেই লোকটির কাছে পাঁচ মিনিটই মনে হবে এক ঘণ্টা। আবার কেউ যদি প্রেমিকার পাশে ঘনিষ্ট হয়ে বসে থাকে তা হলে তার এক ঘণ্টাকেই মনে হবে পাঁচ মিনিট” – প্রকৃতির এই রূপ দেখতে দেখতে আমার অনুভুতিটা অনেকটাই প্রেমিকার পাশে বসে থাকার মতো।

মনে হচ্ছিল, এত তাড়াতাড়ি, এত অল্প সময়ে, আমি স্নান করব কী করে, প্রকৃতির এই মুগ্ধতার সাথে।

আচ্ছা, কি মুশকিল! পাঁচ মিনিটে কি মহাভারত শেষ করা যায়?

শহরের কংক্রিটের তৈরি আস্তানাগুলো থেকে বেরিয়ে এসে রোজকার শহুরে মধ্যবিত্ত জীবন থেকে চুরি করে নেওয়া একটা ছোটো ছুটি, মনে থাকবে চিরকাল।

কোথায় থাকবেন 

তাজপুরে থাকার জন্য বহু হোটেল আছে, ঘরে বসে সুমুদ্র দেখা কোনো হোটেল থেকেই সম্ভব নয়, হোটেল ও সুমুদ্রের মধ্যে আপনার বাধা ঝাউগাছের সারি। এদের সন্ধান পেয়ে যাবেন makemytrip, holidayiq, tripadvisor, yatra.com, travelguru প্রভৃতি ওয়েবসাইট থেকে। আমরা ছিলাম মল্লিকা রিসর্টে (৯০০৭৪০১৮৬৮, ০৯৪৩৩০৭৫৪৬৪)।

কী ভাবে যাবেন

কলকাতা থেকে তাজপুর ১৭৩ কিমি, দিঘা যাওয়ার পথে বালিসাই, সেখান থেকে বাঁ দিকের রাস্তা ধরে ৫ কিমি গেলেই তাজপুর। চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা সময় লাগে। কলকাতা-দিঘা বাসের কন্ডাক্টরকে বলে রাখলে বালিসাইয়ে নামিয়ে দেবেন। সেখান থেকে মিলবে টোটো।

কাছাকাছি রেলস্টেশন রামনগর। হোটেলে আগে থেকে বলে রাখলে ওঁরা স্টেশন বা বালিসাই থেকে পিক আপের ব্যবস্থা রাখেন। অন্যথায় স্টেশন থেকে টোটো বা ট্রেকারে করেও চলে আসতে পারেন তাজপুর।

ছবি : লেখক

 

0 Comments
Share
chandpur-beach-in-a-short-weekend-tour
শ্রয়ণ সেন

সে দিন চাঁদের আলো…

কী জানতে চেয়েছিল? সম্ভবত তার আলোর ছটায় সমুদ্রকে কেমন লাগছে সেটাই জানতে চেয়েছিল। বলতে দ্বিধা নেই, সমুদ্রকে এ রকম মায়াবী রূপে আগে কখনও দেখিনি। যে জায়গার নামেই রয়েছে চাঁদ, সেখানে চাঁদ যে এ রকম মায়াবী রাত তৈরি করবে সেটা আন্দাজই করা যায়।

জায়গাটার নাম চাঁদপুর। বছর তিনেক হল পশ্চিমবঙ্গের ভ্রমণ-মানচিত্রে স্থান পেয়েছে নতুন উপকূলীয় এই গন্তব্যটি। দিঘা, তাজপুর, মন্দারমণির তুলনায় এখনও সে ভাবে এর পরিচিতি বাড়েনি। এখানে থাকার জায়গাও মাত্র একটি, ‘হোটেল মুন’।

পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের সেই আপাত কুমারী সৈকতকে দেখতে সকালেই একটা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি। হোটেলের ম্যানেজার আগে থেকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে সরাসরি গাড়িতে এলে তাজপুরের রাস্তা ধরতে। তাজপুর পেরিয়ে গেলে সমুদ্রের ধার দিয়ে পিচ রাস্তা ধরে কিলোমিটার তিনেক গেলেই পড়বে চাঁদপুর।

“হাত-পা ধুয়ে আগে আমাদের ছাদটা দেখে আসুন।”

হোটেলে ঢুকতেই এ কথাটি বললেন ম্যানেজার সাহেব। বলা ভালো আগে কখনও কোনো হোটেলে এ রকম শুনিনি, যে ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই পর্যটককে কেউ ছাদে পাঠায়। অবশ্য ছাদে না উঠলে বোঝা যেত না এই চাঁদপুরের আসল সৌন্দর্য। হোটেলের ঘরগুলি সি-ফেসিং নয়। ছাদই এই হোটেলের ইউএসপি। হোটেলের সামনে পিচ রাস্তা, তার ঠিক পরেই সমুদ্র।

সমুদ্রে এখন ভরা জোয়ার। বোঝা গেল এখানে সৈকত বলতে কিছুই নেই। বরং বলা ভালো, ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে সমুদ্র-ভাঙন। সেই ভাঙনকে আটকাতে তিন চারটে স্তরে শালবল্লা আর পাথর দিয়ে বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতিকে রোখে কার সাধ্যি। তিনটে স্তরের বাঁধ টপকে জল চলে আসছে একদম প্রথম স্তরে। সেখানে রয়েছে একটি ছিটেবেড়ার ছোটো দোকান। কার্যত সেই দোকানের পেছনেই ধাক্কা মারছে জল।

আরও পড়ুন তারাপীঠকে ‘বুড়ি’ করে

চাঁদপুর সৈকত। ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

সমুদ্রের এই ভয়ংকর রূপ দেখতে দেখতে কিছুটা সময় কেটে গেল। মধ্যাহ্নভোজনের ডাক এল নীচে থেকে।

এখানকার খাবারের আলাদা ভাবে তারিফ করতেই হয়। কাঁসার থালা-বাসনে কোনো হোটেলে খাওয়াতে পারে এটা ভাবা যায় না। ঘি সহযোগে ভাত, ডাল, আলুভাজা, আলুপটলের তরকারি, বেগুনভাজা এবং তার সঙ্গে ইয়া বড়ো বড়ো পমফ্রেট। পেট এবং মন দু’টোই ভরে গেল। এ রকম পেট ভরে খাওয়ার পর একটা ভালো ভাতঘুম চাইছিল শরীর।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে। রোদটা একটু কমতেই বেরিয়ে পড়লাম। ভাটার ফলে সমুদ্র এখন বেশ কিছুটা পিছিয়ে গিয়েছে। দেখা যাচ্ছে বালি। কিন্তু নামার কোনো উপায়ই নেই। সারি সারি শালবল্লা এবং পাথর পেরিয়ে সমুদ্রে নামতে গেলে চোট পেতে বাধ্য। কিন্তু সমুদ্রের ধারে এসে সমুদ্রে নামতে না পারা, এ কখনও হয়! উপায় বলে দিলেন স্থানীয় দোকানি। শংকরপুরে যাওয়ার কথা বললেন আমাদের। এখান থেকে সৈকত সরণি ধরে গেলে মাত্র ২ কিমি।

সমুদ্র-ভাঙন গ্রাস করেছে শংকরপুরকেও। সে এগিয়ে এসে গিলে খেয়েছে ঝাউবনের সারিকে। এখানেও তাকে আটকানোর জন্য তৎপর প্রসাশন। তৈরি করা হয়েছে ওল্ড দিঘার মতো বাঁধ। তবে ভাটা থাকায়, সেই বাঁধ পেরিয়ে সহজেই চলে গেলাম সমুদ্রের সামনে।

এ ভাবেই খেতে দেওয়া হয় হোটেল মুনে। ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

উফ কী আরাম! অনেক দিন পর সমুদ্রের জলে পা ভিজিয়ে একটা অনাবিল আনন্দ গ্রাস করল। কিন্তু দিনের আলো যে কমে আসছে, তাই উঠে পড়তে হল।

লোডশেডিং যে এত ভালো লাগতে পারে সে দিন সন্ধ্যায় বুঝলাম। আসলে এখানে সন্ধ্যাটা ঘরে বসে কাটানোর জন্য নয়। যার ছাদ থেকে এত ভালো সমুদ্র দেখা যায়, সেখানে সন্ধ্যাটা ঘরে বসে কাটাব, এ হতেই পারে না। উঠে পড়লাম ছাদে। আর দু-তিন দিন পরেই পূর্ণিমা, তাই আকাশে বেশ বড়ো চাঁদ উঠেছে। একটু পরেই লোডশেডিং, ঝুপ করে অন্ধকার হয়ে গেল চার দিক। জেনারেটরের সৌজন্যে হোটেলের ঘরে আলো জ্বলেছে কিন্তু ছাদ বা আশেপাশের ঘরবাড়ি তো অন্ধকার। এই অন্ধকারকে কাজে লাগিয়েই আরও মায়াবী হয়ে উঠেছে সন্ধ্যাটা।

আরও পড়ুন জলসাঘরের করুণ সুরে নিমতিতা রাজবাড়ি

ফসফরাস থাকার জন্য অন্ধকারেও সমুদ্রের ঢেউ ভালো বোঝা যায়। চাঁদের আলোয় আরও ভালো করে উপভোগ করছি তাকে। জোয়ার আসছে, তাই ক্রমশ এগিয়ে আসছে জল।

হিসেব করতে পারলাম না যে কত দিন পর এ রকম ভাবে আকাশ দেখছি। আসলে বাড়ি-অফিস, অফিস-বাড়ি করতে করতে তো খোলা আকাশটাই আর দেখা হয়ে ওঠে না। সেই সঙ্গে দেখছি তারার সম্ভার। কোনটা সপ্তর্ষি মণ্ডল, কোনটা কালপুরুষ, বোঝার চেষ্টা করছিলাম এবং ছোটোবেলার পড়াশোনা ঝালিয়ে নিচ্ছিলাম।

সমুদ্র এবং মুক্ত আকাশ দেখতে দেখতে কখন যে রাত এগারোটা বেজে গিয়েছে খেয়ালই করিনি। রেস্টুরেন্ট থেকে নৈশভোজের ডাক এসেছে। তাই এই সুন্দর রাতের মায়া কাটিয়ে নেমে পড়লাম।

তাজপুর থেকে চাঁদপুর হয়ে শংকরপুরগামী এই রাস্তা। ছবি: লেখক

পরের দিন সক্কালে ঘুম ভাঙতেই বুঝলাম বাইরে অঝোরে বৃষ্টি।  ছাতা নিয়েই চলে গেলাম ছাদে। তবে ছাতা মাথায় দিতে হল না। ছাদেই, জলের ট্যাঙ্কের নীচে বেশ ভালো বসার জায়গা রয়েছে। সেখানেই বসে রইলাম। বৃষ্টি অবিরাম, কখনও কমছে কখনও বাড়ছে, কখনও পুরো সমুদ্র থেকে ধেয়ে আসছে কালো মেঘ আবার কখনও সেই কালো মেঘকে সরিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করছে এক চিলতে রোদ্দুর।

আরও পড়ুন এক টুকরো ইতিহাস – বাণগড়

তবে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারলাম না। বাড়ি ফেরার তোড়জোড় শুরু করতে হবে যে। আসলে হাতে সময় অল্প। কোনো রকমে একদিনের ছুটি ম্যানেজ করে চলে এসেছি। বাড়ি ফিরেই আবার কর্মব্যস্ত জীবনে ঢুকে যেতে হবে।

সুযোগ পেলেই আবার চাঁদপুর চলে আসব, হোটেলের কর্মচারীদের এই আশ্বাস দিয়ে কলকাতার উদ্দেশে স্টার্ট দিল আমাদের গাড়ি। দিঘা তো কত বার গিয়েছি। কিন্তু চাঁদপুরের ওই মায়াবী রাত আমার স্মৃতিতে গেঁথে থাকবে অনেক দিন।

কী ভাবে যাবেন?

ট্রেনে গেলে হাওড়া থেকে তাম্রলিপ্ত বা কান্ডারি এক্সপ্রেসে চড়ে নামুন দিঘার আগে রামনগর স্টেশনে। স্টেশন থেকে গাড়ি বা টোটো পাওয়া যায়। আগে থেকে হোটেলকে বলে রাখলে পিকআপের ব্যবস্থাও হয়ে যাবে। রামনগর থেকে চাঁদপুর ৮ কিমি। বাসে গেলে নামুন বালিসাই বাসস্টপে। সেখানে থেকে তাজপুরের রাস্তা দিয়ে তাজপুর হয়ে পৌঁছে যান চাঁদপুর। দূরত্ব ৬ কিমি।

কোথায় থাকবেন?

হোটেল মুন। ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

চাঁদপুর থাকার জন্য হোটেল মুন বেশ ভালো। সমুদ্রের ধারে অবস্থিত হলেও হোটেলের ঘর থেকে সমুদ্র দেখা যায় না। তবে ছাদ থেকে সমুদ্র দেখায় কোনো বাধা নেই। সারা দিন কাটিয়ে দিতে পারেন হোটেলের ছাদে। যোগাযোগ ৯৮৩০৪০১৪৬০। এ ছাড়াও চাঁদপুরে থাকার জন্য রয়েছে চাঁদপুর ভিলেজ ইকো রিসর্ট যোগাযোগ ০৮৪২০২৪৩৪৩৩।

0 Comments
Share
1235