Browsing Category:ভ্রমণকথা

a-trip-to-cooch-behar-part-2-love-at-first-sight-with-madanmohan-temple
jahir raihan
জাহির রায়হান

হাঁ করা অবস্থাতেই অনুধাবন করলাম অরুণাভবাবুর পর্যবেক্ষণের সত্যতা – রাজা, মহারাজা, সম্রাট, নবাব মায় জমিদারি শাসনব্যবস্থা ছাড়া কোনো কালজয়ী স্থাপত্য নির্মাণ সম্ভব হত কিনা সন্দেহ। এ যুগে তো সম্ভবই নয়, এখন নির্মীয়মান উড়ালপুল হঠাৎ করে ভেঙে পড়ে আর ট্রেনগাড়ি নেমে আসে লাইন থেকে মাটিতে, প্রায় প্রতিদিন। গেট থেকে যতটা অংশ হেঁটে এলাম, এ রকম প্রশস্ত জায়গা থাকলে এখন আমরা বিএইচকে ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরি করি আর স্কোয়ার ফুটে বিক্রি করি, পাকা কলা কেজি দরে বেচার মতো। আর হ্যাঁ, সিটি সেন্টার আর মাল্টিপ্লেক্স করি গুচ্ছের, যাতে নিজেরা খাই পালটি আর টাকাকড়ি দেয় হামাগুড়ি, সারাক্ষণ। তা-ও ভালো এটা তাজমহল নয়, নইলে হয়ত শুরু হত কলরব, ওখানে ছিল দেবীর ঘর, ফিরিয়ে মন্দির, লহ বর! এখানে কী ছিল তা জানিনে, তবে যা আছে তা দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। ইঁট দিয়ে তৈরি ধ্রুপদী পশ্চিমী স্থাপত্যে গড়ে ওঠা দ্বিতল এক আশ্চর্য গড়ন যা উচ্চতায় ১২৪ ফুট, লম্বায় ৩৯৫ এবং ২৯৬ ফুট চওড়া। শৈলী নবজাগরণ, দরবারহল, তোষাখানা, পাঠাগার, মহিলামহল ইত্যাদি নিয়ে সে এক এলাহি কাণ্ডকারখানা। বেশ কিছু আসবাবপত্র ইতিমধ্যেই খোয়া গেছে তবুও ঘুরে ঘুরে দেখলে অনেক কিছুই দেখা যাবে। আর যদি নিজেকে টাইম মেশিনে চড়িয়ে ফেরাতে পারেন অতীতে, তা হলে তো সোনায় সোহাগা, রোম খাড়া হয়ে যাবে, গলা যাবে শুকিয়ে, মনটাও হবে উদাসী।                                 

আরও পড়ুন চলো করি বিহার কোচবিহার – পর্ব ১/ হাঁ করে দাঁড়িয়ে প্যালেসের সামনে

সমগ্র প্যালেসের অভ্যন্তর ঘুরে দেখা নিষেধ, নিষিদ্ধ ছবি তোলাও, মোবাইল ফোনটাও বন্ধ রাখা জরুরি। মন দিয়ে রাজারানিদের ব্যাপারস্যাপার আত্মস্থ করতে করতেই আপনার সময় কেটে যাওয়া নিশ্চিত, যদি না নব্য তরুণ-তরুণীদের মহলের আনাচে কানাচে, বড়ো বড়ো থামের আড়ালে-আবডালে প্রেমালাপ থুড়ি প্রেমাচার আপনার দৃশ্যদূষণ না ঘটায়। আর সেটা অসহ্য মনে হলে, বাইরে আসুন, গোটা প্যালেস চত্বরই সবুজে ছয়লাপ। দিঘিও আছে, তাতে আছে বড়ো বড়ো মাছ। অবশ্য গোটা শহর জুড়েই অনেকগুলি দিঘি খনন করা হয়েছিল সে সময়, শহরের মধ্যবর্তী সাগরদিঘি যার অন্যতম। এ দিকে সুয্যিমামা পাটে যেতে বসেছে, আলো কমে আসছে ক্রমশ। নরম আবছায়া আলোয়, কোচবিহার রাজবাড়ি বিষণ্ণতার মেঘে ক্রমশ ঢেকে ফেলছে নিজেকে। শুরু হচ্ছে আপাত রূপকের এক খেলা, যে খেলায় খেলার কুশীলবেরা কবেই অস্ত গেছে, রয়ে গেছে তাদের কায়াহীন অস্তিত্ব।                                                                      

কোচবিহার থেকে রসিকবিল যাওয়ার পরিকল্পনাটা বানচাল হয়ে গেল – রসিকবিল বন্ধ, খোলেনি এখনও। ভাবলাম তবে নেওড়া জঙ্গল ক্যাম্প যাই, রায়া রাজি হল না, পাকা পাকা গলায় বলল, পাপা জঙ্গলে যেও না, হাতি আছে, বাঘ আছে, কামড়ে দেবে। বয়স সবে চার ছাড়িয়েছে, এখনই এত বদ বুদ্ধি, নিশ্চয় ওর মায়ের কাছ থেকে পাওয়া! অগত্যা পায়ে হেঁটে শহর দেখে, বিকালে জলপাইগুড়ি ফেরাটাই স্থির হল। সাগরদিঘি এলাকাটা বেশ জমজমাট, নানান সরকারি অফিস এই অঞ্চলেই। চারিদিক বাঁধানো ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই চোখে পড়ল ‘রাজবংশী ভাষা আকাদেমি’। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি জানতাম, কলকাতায় রয়েছে, এখানে তার মানে রাজবংশী ভাষা শুধু বড়ো নয়, দড় ব্যাপার। প্রসঙ্গত জানাই, এখানকার বাংলা উচ্চারণ ঠিক কলকাতা বা বাকি বাংলার মতো নয়, এখানকার উচ্চারণ পূর্ববঙ্গীয়, অসমীয়া ও রাজবংশী মিশ্রিত। সাগরদিঘির যে পাড়ে পৌর অফিস, তার সামনে থেকে ওপর দিকে তাকালে কোচবিহার প্যালেসের চূড়োটা দি্ব্যি দেখা যায়।

যে সরলরেখায় এগোচ্ছি, সেই পথেই যে মদনমোহন মন্দির তা আমি প্রায় নিশ্চিত, তবুও পথচলতি একজনের সাহায্য নেওয়া হল, জানলাম আমি ঠিকই জানি। পথপাশে একটি যুদ্ধ ট্যাঙ্ক সাজানো রয়েছে, কাছে যেতেই আস্ত এক ইতিহাসের মুখোমুখি। আমেরিকায় নির্মিত এই প্যাটন ট্যাঙ্কটি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক সেনারা ব্যবহার করেছিল। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পাক সেনানায়ক জেনারেল নিয়াজি-সহ ৯০ হাজার পাকিস্তানি সেনা ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। জন্ম নেয় নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ আর সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধজয়ের স্মারক হিসেবে প্যাটন ট্যাঙ্কটি কোচবিহারে নিয়ে আসা হয়। এটা আজকের পরম প্রাপ্তি, আগে কখনও পড়িনি এ ব্যাপারে।

রাস্তার এক দিকে বৈরাগী দিঘি ঠিক তার অপর দিকে শ্বেতশুভ্র মদনমোহন মন্দির, চোখে পড়ামাত্রই আপনার ভালো লেগে যাওয়া উচিত। গাছগাছালি ঘেরা মদনমোহন বাড়িতে মদনমোহন ছাড়াও পূজিতা হন মা কালী, মা তারা ও মা ভবানী। মেয়েকে নিয়ে মেয়ের মা দিব্যি বসে পড়ল মন্দিরের প্রশস্ত দালানে, সেখানে তখন পুজোর জোগাড় চলছিল। আর আমি একটু প্রাচীনত্বের সন্ধানে সন্ধানী চাতক, যার তৃষ্ণার সাময়িক নিবৃত্তি হল মদনমোহনের কল্যাণে। মহারাজা নরনারায়ণ ছিলেন শিবের উপাসক, শৈব। অসমের এক বৈষ্ণব ধর্মপ্রচারক শংকরদেবের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ভগবান মদনমোহনের মূর্তি গড়ে এক পবিত্র পূর্ণিমায় তার প্রতিষ্ঠা করেন। রাধা বিনা মদনমোহনের উপস্থিতি ওই শংকরদেবের অনুপ্রেরণার ফসল। এর পর ১৮৮৭ সালে কোচ সিংহাসনে আরোহণের পর, ব্রাহ্মমতে দীক্ষিত মহারানি সুনীতি দেবীর উৎসাহদানে মহারাজ নৃপেন্দ্রনারায়ণ মন্দিরের অবস্থান পরিবর্তনে সচেষ্ট হন। তারই ফলশ্রুতিতে ২১ মার্চ ১৮৯০ সালে সাড়ম্বর ও জাঁকজমকপৃর্ণ শোভাযাত্রা-সহ রাজমাতা নিশিময়ী দেবী বর্তমান মদনমোহন মন্দিরের উদ্বোধন করেন। আগত ভক্তবৃন্দের রাত্রিবাসের সুবিধার্থে আনন্দময়ী ধর্মশালার পত্তন করেন মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ। যেখানে আপনিও রাত্রিযাপন করতে পারেন সামান্য খরচের বিনিময়ে, আজও।

মন্দিরের মূল গৃহে ব্রোঞ্জনির্মিত চৌদলাতে রয়েছে দু’টি বিগ্রহ – বড়ো মদনমোহন ও ছোটো মদনমোহন। যদিও আগত দর্শনার্থীরা শুধু বড়ো মদনমোহনেরই দর্শন পান, ছোটো মদনমোহন পর্দার আড়ালেই থাকেন, বছরে তিন দিন তাঁর দেখা মেলে। মন্দির চত্বরের পূর্ব দিকে মা ভবানীর আলাদা মন্দির অবস্থিত, সেখানে মা ভবানীর অপরূপ রূপ আামায় অনাবিল ভাবে আকর্ষণ করল, এত নিখুঁত বিগ্রহ ইতিপূর্বে আমি দেখিনি কখনও। পূর্বে শহরের ভবানী মার্কেটে মা ভবানী থাকতেন, মদনমোহন বাড়ি নির্মাণের পর এখানেই তাঁকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়। কোচবিহারের মদনমোহন মন্দির-সহ মোট ২৯টি মন্দিরের দেখাশোনা করে এখানকার দেবত্র ট্রাস্ট বোর্ড। এ ছাড়াও উত্তরপ্রদেশের বারাণসীতে দু’টি এবং বৃন্দাবনে আরও একটি রাজসম্পত্তির ভার বোর্ডের ওপর। (চলবে)

ছবি: লেখক                                                         

0 Comments
Share
a-trip-to-cooch-behar-part-1-standing-in-front-of-the-palace
জাহির রায়হান

‘আঁকা বাঁকা পথে যদি, মন হয়ে যায় নদী, তীর ছুঁয়ে বসে থাকি না…আমাকে ধরে রাখি না’ – আরতি মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠসুধা ‘বিলম্বিত লয়’ সিনেমায়। আমার পাঠককুলকে জানিয়ে রাখি, মানুষটা আমি একটু সেকেলে ধরনের যাকে বলে ব্যাক ডেটেড, অর্থাৎ বাবাকে বাবা আর মাকে মাম্মি নয়, মা-ই ডাকি। মেঝেতে বসে ভাত খাই, পুকুরে স্নান করি আর মাথায় মাখি সরষের তেল। আরও আছে, উত্তমকুমারের সিনেমা দেখি সেই ডানপিটে বয়স থেকেই, মান্না দে শুনি এবং চণ্ডীমণ্ডপের দুগ্গাঠাকুর দেখতে বড্ড ভালোবাসি। জাতে ভেতো বাঙালি, বাংলা ও বাঙালির চর্চা পুঁই-চচ্চড়ির মতোই প্রিয় আমার। এত দিন নজরুলের ‘দেখব এবার জগৎটাকে’ আঁকড়ে ছিলাম, কিন্তু প্রথমে ট্রাম্প আর পরে জিএসটি এসে ‘জগত’ তালাবন্ধ আপাতত। ইত্যবসরে আরতি দেবীই শেষমেশ বাঁচালেন, আঁকাবাঁকা পথে যদি…..দিয়ে। আরতি দেবীর বাড়ি এক বার গিয়েছিলাম বয়সকালে, ইউনিভার্সিটির সোশ্যালে আমন্ত্রণ জানাতে। তৃষ্ণার্ত আমাদের উনি সবুজ শরবত খাইয়েছিলেন সে দিন, আর আজ দিলেন দিশা, নতুন করে, বেড়ানোর।

আরও পড়ুন চেনা পথের অচিনপুর: প্রথম পর্ব/ মেঘাচ্ছন্ন টুমলিং-এ

পল্টুকে মনে আছে তো আপনাদের? সেই যে ঘরের আর পরের খেয়ে যে বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়? সে আমার অন্ত্যজ, দু’জনে মিলে নানা প্যাঁচপঁয়জার ভাজি আর মাঝেসাঝেই হই ভোকাট্টা। তা তাকে জিজ্ঞেস করলাম, একান্ন সতীপীঠের পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গের তেইশটা জেলার তেইশটা জেলা সদর চক্কর দিলে কেমন হয়? উত্তর পেলাম, ভালোই হয়। শ্বশুরের মেজো আপদ, যে দুর্ঘটনাচক্রে আমার সঙ্গেই থাকে আগাগোড়া বিরোধী দলনেত্রীর ভূমিকায়, তাকে জিগালাম, হ্যাঁ গো, পরীক্ষা দিতে জলপাইগুড়ি তো যাবে, তা ওই সাথে কোচবিহারটা দেখে এলে কেমন হয়? ম্যাজিক হয়ে গেল বুঝলেন, সে-ও বলল, ভালোই হয়, কিন্তু কী আছে ওখানে? বললাম, কী আছে সেটা দেখতেই তো সেখানে যাওয়া। সুতরাং জলপাইগুড়ির পাশাপাশি কোচবিহার, পল্টু ব্যাটা খুশিতে ডগমগ।

জলপাইগুড়ি থেকে অহরহ বাস কোচবিহারের পথে। উত্তরবঙ্গ পরিবহণের নীল রঙের একটা বড়ো বাসে চেপে বসলুম। প্রথম পরীক্ষা ভালো হওয়ায় গিন্নির মেজাজ সপ্তম থেকে নেমে দ্বিতীয়ার ঘরে ঘোরাঘুরি করছে। বাপের মতো বাইরে বেরোলেই আমার বেটির দিল হয়ে যায় খুশ, সে বকর বকর করে গোটা বাসময় ছড়াচ্ছে ভালোলাগা। বাস ছাড়ল, জলপাইগুড়ি শহর ছেড়ে তিস্তা সেতু পার হয়ে কোচবিহারের উদ্দেশে।  পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্র খেয়াল করলে বুঝবেন, মানচিত্রের মগডালে কোচবিহার যার নীচের অংশটা আবার পশ্চিমবঙ্গই নয়, সেটা পড়শি দেশ, বাংলাদেশ। মানচিত্র অনুযায়ী মুর্শিদাবাদ থেকে ক্রমশ অবরোহণের কথা ভেবেই আমার চিত্ত চঞ্চল। অচেনা কোনো জায়গা দেখার সুবিধে হল, আপনি যা-ই দেখবেন, সবই লাগবে নতুন নতুন। ময়নাগুড়ি, ফালাকাটা, ধুপগুড়ি – সব একে একে পেরিয়ে যায় আর আমি গোগ্রাসে দু’চোখ দিয়ে গিলে চলি। জায়গাগুলো যে একেবারেই আমার কাছে অজানা তা কিন্তু নয়, ট্রেনে আলিপুরদুয়ার যাওয়ার সময় এগুলো চিনেছি, কিন্তু বাস-রাস্তায় এই প্রথম। ট্রেন সাধারণত লোকালয়ের বাইরে দিয়ে দৌড়োয়, তাই মাঠঘাট, খালবিলই বেশির ভাগ চোখে পড়ে। কিন্তু বাসের রকমসকম আলাদা, গ্রাম শহর এবং মহল্লার মধ্য দিয়ে তার চালচলনে পুরো রাস্তাতেই আপনার নানান অভিজ্ঞতা হতে থাকে, পথে যেতে যেতে।                                                                

আরও পড়ুন চেনা পথের অচিনপুর: দ্বিতীয় পর্ব/রোদ পোহাচ্ছে কালিপোখরি

ঘোকসাডাঙা ছাড়াল, আমার এক ক্লাসমেটের শ্বশুরবাড়ি হেথায়, সে ব্যাটা এত দূরের বেলতলা কেন পছন্দ করেছিল কে জানে! রাস্তার ধারে দু’একটা মন্দির-মসজিদও চোখে পড়ছে হঠাৎ হঠাৎ। শরৎচন্দ্রের লালু বন্ধুদের জিগাইছিল, মরার কি জাত আছে? আমি আবার বিশ্বাস করি পর্যটকেরও জাত থাকতে নেই, সে হবে ‘না ঘরকা, না ঘাটকা’ টাইপ, মানে যস্মিন দেশে যদাচার। ভগবানের সকল রূপ দর্শনই হবে তার মোক্ষ। মন্দির, মসজিদ, গির্জায় তার টান থাকবে সমান, না ধর্মীয় কারণে থাকতেই হবে তা নয়, তবে জানার ইচ্ছেটা থাকা আবশ্যক। অনেক ছোটোতেই পড়েছিলাম ধর্মের অর্থ ধারণ করা আর নিজ অভিজ্ঞতায় বুঝেছি যে কোনো প্রার্থনার মধ্যেই মনোসংযোগ, ইংরেজরা যাকে বলে ‘কনসেন্ট্রেশন’, মূল কথা। তাই দ্বিধাহীন ভাবে যত্রতত্র চলে যেতে পারি অবলীলায়, মাথায় রুমাল বেঁধে স্বর্ণমন্দিরের ডাল চাপাটি, মায়াপুর, বেলুড় মঠের প্রসাদ অথবা জগদ্ধাত্রী পূজোর নরনারায়ণ সেবার খিচুড়ি বা মসজিদের সিন্নি, পায়েস সবই চাখা আছে আমার, অবশ্য মারটা এখনও পড়েনি, মার খেলে কী হবে তা এখনই বলতে পারিনে।

বাসস্ট্যান্ড থেকে জেলা পরিষদের অতিথিনিবাসে রিকশা করে যাওয়ার পথেই কোচবিহার প্যালেস নজরে পড়ল, এটাই শহরের মূল মনচোরা। প্রাথমিক দৃষ্টিতে তার সৌন্দর্য ও বিশালতা দেখে বুঝলুম পুরো বিকেলটাও না কম পড়ে। ফোনালাপ করাই ছিল, তাই ঘর পেতে অসুবিধা হল না। অতিথিনিবাসের বাহ্যিক রূপে খুব খুশি, কিন্তু বিছানায় কারও মধুচন্দ্রিমার ‘লাগা চাদর মে দাগ’ দেখে খানিকটা কেমন জানি ‘ফিল’ হল, সেটা হর্ষের না বিষাদের সেটা নিজেরই বোধগম্য হল না কিয়ৎক্ষণ, তবে এ সব নিয়ে কোনো কালেই আমার পেটখারাপ ছিল না, তাই সহজেই হজমের হজমোলা। একেবারে চৌমাথা মোড়ের কাছে অতিথিনিবাসের অবস্থান এবং দর্শনীয় স্থানগুলি পায়ে হাঁটা দূরত্বে, এটাই বিরাট পাওয়া, কেননা সঙ্গে আমার একজোড়া অশান্তি রয়েছে, আল্লাহতালা যাদের হাঁটতে বারণ করেছেন, কেন বারণ করেছেন তা অবশ্য এখনও অনাবিষ্কৃত।

হোটেলের নাম ‘মাছে ভাতে বাঙালি’। এমনিতে সর্বভুক হলেও খাওয়া নিয়ে আমার একটু ঝকমারি রয়েছে, ভাত গরম না হলে আমার কান্না পায়, ঠান্ডা ভাতে হাত দিলে মরে যাওয়ার ইচ্ছে জাগে। তা দেখলুম, মাছের সাথে ভাতটাও গরম এবং বাঙালি মালিক রান্নাটাও করেছেন জমিয়ে। কথায় কথায় জানা গেল, বাঙালি এবং তার বাঙালিনি মিলেই এই হোটেলটি চালান আর জনগণকে কাঙালি ভোজন করান নাগালযোগ্য রেস্তোর বিনিময়ে, তবে বেলা ১টার আগে যে হোটেলের দরজা চিচিংফাঁক হয় না সেটা পই পই করে জানিয়ে রাখলেন। মৌরি চিবোতে চিবোতে আমরা রওনা হলাম কোচবিহার প্যালেসের পানে। এমনিতে কোচবিহার উত্তরবঙ্গের একমাত্র পরিকল্পিত শহর যার আবার রয়েছে হেরিটেজ তকমা। আমার চোখে শহর জলপাইগুড়ির তুলনায় অপরিচ্ছন্ন ঠেকছে, তবে সদ্য বন্যার কবল থেকে মুক্ত হওয়ার কারণেও নোংরাটা হয়ে থাকতে পারে। আর একটা জিনিস খুব জ্বালাচ্ছে, মাইকিং – দুর্গাপূজোর প্রাক্কালে শহরে এসেছি, জামাপ্যান্ট কোম্পানির ক্যাম্পেনে কান ঝালাপালা।

জয়পুরের রানি গায়ত্রী দেবীর বাবার বাড়ি কোচবিহার। কুচ বা রাজবংশী এ অঞ্চলের বহু প্রাচীন জনজাতি, আর বিহার এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘বিহারা’ থেকে। যত দূর জানা গেল, অসমের কামরূপ রাজ্যপাটের অংশ নিয়ে গঠিত হয় কোচবিহার যা পরে কামতা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে কামতাপুর থেকে শাসিত হত। কোচ রাজবংশের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ  রাজা ছিলেন বিশ্বসিংহ। তাঁর পুত্র নরনারায়ণের আমলে কামতা সাম্রাজ্য খ্যাতির চূঁড়োয় পৌঁছোয়। যদিও পরবর্তীতে কামতা দু’ভাগে ভাগ হয়, এক দিকে কোচ হাজো যা বর্তমানে অসমের অংশ, আর অন্যটা কোচবিহার, পশ্চিমবঙ্গের। তার আগে ১৬৬১ অব্দে মহারাজা প্রাণনারায়ণ মন দিলেন কোচবিহার রাজ্যের বিস্তারে। তবে হঠাৎই মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের অধীনস্থ বাংলার সুবেদার মীর জুমলা কোচবিহার আক্রমণ ও দখল করেন, নাম দেন আলমগীর নগর। যদিও দিন কয়েকের মধ্যেই প্রাণনারায়ণ নিজ রাজ্য পুনরূদ্ধারে সমর্থ হন। আরও জানা যায়, পূর্বে কোচ রাজ্যের রাজধানী এ শহর ছিল না। কোনো এক অজ্ঞাত সাধুর পরামর্শে, মহারাজা রূপনারায়ণ আঠারোকোঠা থেকে তোর্সা তীরবর্তী গুরিয়াহাটি যা বর্তমানে কোচবিহার টাউন, স্থানান্তরিত করেন রাজধানী। তার পর এই নতুন রাজধানী থেকেই পরিচালিত হয় রাজকার্য।                                                                                                 

আরও পড়ুন চেনা পথের অচিনপুর: শেষ পর্ব/রেখে গেলাম পদচিহ্ন, নিয়ে গেলাম স্মৃতি

ব্রিটিশ শাসনমুক্ত ভারতবর্ষের সঙ্গে কোচবিহারের তৎকালীন শাসক মহারাজ জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণের চুক্তি মোতাবেক, কোচবিহার ভারত সরকারের শাসনাধীনে আসে ১৯৪৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। পরে ১৯৫০ এর ১৯ জানুয়ারি, অসম হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পশ্চিমবঙ্গের অংশ রূপে গণ্য হয় কোচবিহার যার সদর হয় শহর কোচবিহার। এ দিকে স্বাধীনতার প্রায় ৭০ বছর পূর্বে ব্রাহ্মধর্মের প্রচারক কেশবচন্দ্র সেনের কন্যার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন কোচ রাজ নৃপেন্দ্রনারায়ণ। কোচবিহার রাজ্যে পৌঁছোয় নবজাগরণের ঢেউ। আধুনিক কোচবিহার শহরের রূপকার হিসেবে উঠে আসে মহারাজ নৃপেন্দ্রনারায়ণের নাম। ইংল্যান্ডের বাকিংহাম প্যালেসের আদলে গড়ে ওঠে ভিক্টর জুবিলি প্যালেস বা অধুনা কোচবিহার প্যালেস, যার সামনে এই মূহূর্তে আমরা সপরিবার দাঁড়ায়ে রয়েছি, হাঁ করে। (চলবে)

0 Comments
Share
trek-to-sandakphu-last-part-take-nothing-but-memory
shounak gupta
শৌনক গুপ্ত

খুব আস্তে আস্তে অনেকক্ষণ ধরে হাঁটব, এই মানসিকতা নিয়ে কিছুটা চলতেই দেখি বিকেভঞ্জন অনেক নীচে চলে গেছে। আরও কিছুক্ষণ পর পথও সমতল হয়ে এল। ভাবলাম পৌঁছোতে বোধহয় আর দেরি নেই। কিন্তু আরও আধ ঘণ্টা পর আবার চড়াই শুরু হতে বুঝলাম পাহাড়ের পথ সম্পর্কে হালকা ভাবে ধারণা করে নেওয়া কত বড়ো ভুল।

আরও পড়ুন চেনা পথের অচিনপুর: দ্বিতীয় পর্ব/রোদ পোহাচ্ছে কালিপোখরি

একটা মাইলস্টোন কিছুটা আশ্বাস দিয়ে জানিয়ে দিল, আর দু’ কিলোমিটার। আর পরের বাঁকেই রডোডেনড্রন গাছের ফাঁকে লুকিয়ে থাকা রুপোলি কাঞ্চনজঙ্ঘা ঝিলিক দিয়ে উঠল। কিছুটাই অংশ, তবু সেই ঝলমলে তুষারখণ্ড রোমাঞ্চ জাগায়। প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় ব্যাগে রাখা ক্যামেরা হাতে চলে আসে।

আমাদের গতি বাড়ল। প্রতি বাঁকে কাঞ্চনজঙ্ঘার আরও কিছুটা করে অংশ খুলে যাচ্ছে। সুনীল প্রেক্ষাপটে তার শুভ্রতা চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। অবশেষে এল সেই মাইলস্টোন, যার গায়ে লেখা ‘সান্দাকফু ০ কিলোমিটার’। সেখানেই ছবি তোলার হিড়িক। আসলে এখান থেকে সান্দাকফু গ্রামের শুরু। আমাদের চেনা ‘সান্দাকফু’ পৌঁছোতে তখনও প্রায় দেড় কিলোমিটার চড়াই বাকি।

সেই পথও অবশ্য এক সময় শেষ হল। বন দফতরের অফিস আর সোলার বাতির সারি দেখতে পেয়ে বুক ভরে শ্বাস নিলাম। রাস্তার দু’ ধারে দু’ দেশের জাতীয় পতাকা উড়ছে। দু’ দেশেই কিছু কিছু ঘরবাড়ি। নেপালের দিকের একটা ঘরে আমাদের আশ্রয় জুটল।

মেঘ এসে পাহাড়ের রঙ্গমঞ্চে পর্দা টাঙিয়ে দিয়েছে। আমরাও তাই এই সুযোগে সাফসুতরো হওয়ার তোড়জোড় শুরু করেছি। এ দিকে গরম জলের বালতি তো দূরের কথা, খাওয়ার জল চাইলেই হোটেলের কর্মীরা আঁতকে উঠছেন। অগত্যা নিজেরাই অস্থায়ী রসুইঘরটায় গিয়ে দেখি একটা মাঝারি কড়াইয়ে জল গরম হচ্ছে আর তার সামনে চাতকের মতো সবাই বোতল হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। জানা গেল, কলের জলও মিলবে দিনে মাত্র চার বার, প্রতি বার আধ ঘণ্টা করে। এত পরিবর্তনের মধ্যেও এটুকু যেন সান্দাকফুর সেই পুরোনো দুর্গমতার স্বাদ দিল।

বেলা পড়ে আসতেই শুরু হল প্রবল ঠান্ডা হাওয়ার দাপট। হোটেলের মূল দরজাও খুলে রাখা দায়। সেই হাওয়ার ঝাপটায় কখনও কখনও মেঘের পর্দা সরে যাচ্ছে। কিছু পরে ফালুটগামী রাস্তার দিকে সূর্যাস্ত হল। গোধূলির নরম আলোয় দিনের মতো শেষ বার দেখা গেল কাঞ্চনজঙ্ঘাকে। ‘ঘুমন্ত বুদ্ধ’ তাঁর মেঘ-শয্যায় শুয়ে। তাঁকে শুভ রাত্রি জানিয়ে বলে রাখলাম, কাল ভোর পাঁচটায় দেখা হচ্ছে।

হাওয়ার তাণ্ডব চলল সারাটা রাত। তার শোঁ শোঁ আওয়াজ মাঝে মাঝে বিভীষিকা তৈরি করে। এই বুঝি ঘরের চাল উড়ে যাবে। তবে অ্যালার্মের শব্দ যখন ঘুম ভাঙাল, হাওয়ার শব্দ ততক্ষণে হারিয়ে গেছে। ভোর হতে তখনও বাকি। এখানে কেবল সন্ধে ছটা থেকে রাত দশটা অবধিই বিজলিবাতি মেলে। তাই অন্ধকারেই তৈরি হয়ে নিয়ে হোটেলের ছাদে চলে এলাম।

পুব আকাশে একটা লম্বা লাল রেখা আমাদের অল্প অল্প দেখতে সাহায্য করছে। আরও যাঁরা এসেছেন, তাঁদের অনেকের সঙ্গেই হয়তো কাল আলাপ হয়েছে, কিন্তু এখন চেনার উপায় নেই। প্রত্যেকেই আপাদমস্তক শীতবস্ত্রে মোড়া। আমাদের ঠিক সোজাসুজি সেই বিখ্যাত দৈত্যাকার শৃঙ্গসমাহার শায়িত। আধো-অন্ধকারেও তখন তার শরীর জুড়ে শীত খেলা করছে। মাঝে মাঝে সেই চোরা বাতাসে ভেসে এসে আমাদেরও ছুঁয়ে যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর সেই লাল রেখা চিরে নতুন সূর্য হীরের মতো ঝলসে উঠল। তার আলোয় দেখলাম সমস্ত মেঘ ঘনীভূত হয়ে পাহাড়ের নীচে জমা হয়েছে। যেন এক বিশাল সমুদ্র। কিছু ছোটো মেঘ তাতে ঢেউয়ের আকার নিয়েছে। সেই সমুদ্রতীরে পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ-শীর্ষ তখন লাল হয়ে জ্বলছে। সে যেন ক্ষণিকের লাইট হাউস। ক্রমে ক্রমে কুম্ভকর্ণ থেকে পান্ডিম অবধি কাঞ্চনজঙ্ঘা রেঞ্জের সব ক’টা চূড়োয় সোনালি রঙ ধরল।

পশ্চিমে নেপাল থেকে পূর্বে অরুণাচল হিমালয় পর্যন্ত ব্যাপ্তি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ভূটানের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ চোমলহরী উঁকি দিচ্ছে। কাঞ্চনজঙ্ঘার শরীর জুড়ে রঙের খেলা দেখতে দেখতেই আরও পশ্চিমে চোখ চলে যায়। প্রবল শীতে একটু উষ্ণতার খোঁজেই যেন অনেকগুলো রক্তিমাভ তুষারশৃঙ্গ গায়ে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে। তাদের মধ্যে তিন জনের বন্ধুত্ব দৃশ্যতই একটু বেশি। মাঝের জন মাউন্ট এভারেস্ট। তার পরিচয় আলাদা করে দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। সে স্বয়ং বিস্ময় আর রোমাঞ্চের মূর্ত প্রতীক। তার দু’পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে চতুর্থ উচ্চতম লোৎসে ও পঞ্চম উচ্চতম মাকালু। পারিষদ হিসেবে রয়েছে চামলাং, বরুণৎসে, নুপৎসে ও চোমলোনজো।

এমন আবহাওয়ার জন্য নিজের ভাগ্যকে তারিফ করি। এর সবটুকু আজ হৃদয় আর ক্যামেরায় ভরে নিতে হবে। তুষারশ্রেণি সোনালি থেকে ক্রমে রুপোলি হল। পাখির কলরবে চার দিক ভরে উঠেছে। ঘড়িতে সকাল ছটা। কলে জল এসেছে, কেবল আধটি ঘণ্টার জন্য। ঘরে ফিরে আসতেই হল।

অবশেষে বিদায়ের মুহূর্ত। টানা উৎরাই পেরিয়ে শ্রীখোলা নেমে যেতে হবে। বাইরে এসে দেখি ‘ঈশ্বর’ তখনও ‘নিদ্রিত’। প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট করতে করতে আমরা তার এই শয়নকক্ষও আবর্জনায় ভরে দিয়েছি। তবু তাঁর ঘুম ভাঙেনি। তবে কি তিনি মৃত? নাকি সেই অন্ধকার রাতে সবাই যখন গভীর ঘুমে, বাতাস যখন পাগলের মতো মাথা কুটে মরে, তিনি হয়তো বন বিভাগের চাতালটায় এসে বসেন – ওই রডোডেনড্রন গাছটার তলায়।

আস্তে আস্তে নামতে শুরু করি। বন বিভাগের একটা বোর্ডের ওপর দিয়ে শেষ বারের মতো দেখি তাঁকে। বোর্ডে যেন সেই শীতের রাতে তিনিই দু’ কথায় লিখে রেখে গেছেন নিজের মনের কথা – “লিভ নাথিং বাট ফুটপ্রিন্টস, টেক নাথিং বাট মেমোরি”। (শেষ)

ছবি: লেখক

0 Comments
Share
trek-to-sandakphu-part-2-kalipokhri-is-bathing-in-sun
shounak gupta
শৌনক গুপ্ত

একটা ম্যাগপাইয়ের ডাকে পরদিন ঘুম ভাঙল। জানলার পর্দা সরিয়ে দেখি রাত তখনও শেষ হয়নি। তবে দিগন্তে ক্ষীণ রক্তিমাভাস। আকাশের ট্রেকাররা প্রায় কেউই আর নেই। শুধু কাস্তে চাঁদ আর কয়েকটা তারা যেন পিছিয়ে পড়ে ক্লান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ক্রমে ওরাও একে একে মিলিয়ে গেল। বাইরে এসে প্রথম দেখলাম কাঞ্চনজঙ্ঘাকে। তার গায়ে ভোরের আলোর খেলা। যে সিনেমা দেখতে আমরা সান্দাকফুর পথে, টুমলিং-এ রইল তারই ট্রেলার।

আরও পড়ুন চেনা পথের অচিনপুর: প্রথম পর্ব/ মেঘাচ্ছন্ন টুমলিং-এ

আজকের চলার শুরুতেই সিঙ্গলিলা জাতীয় উদ্যানে প্রবেশ। সিঙ্গলিলা বিলুপ্তপ্রায় রেড পান্ডার বাড়ি। যদিও নিজের বাড়িতেই তার দেখা পাওয়া দায়। তবে তার ঘাটতি পূরণ করে দিল হিমালয়ান মার্টেনের দৌড়ে রাস্তা পার হওয়া আর গাছের ডালে ডালে পাখিদের কর্মব্যস্ততা। টানা উতরাই পথে আলোছায়ার খেলা, কাঞ্চনজঙ্ঘার ইতিউতি উঁকি আর পায়ের তলায় শুকনো পাতার শব্দ আমাদের চলার অক্সিজেন জোগাতে থাকে। পাতা ঝরার সময় এখনও আসেনি, তবে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। তাই বনে তখন রঙের বাহার। সিঙ্গলিলা উদ্যানে সেই রঙিন কার্নিভাল দেখতে দেখতে আমরা নেমে এলাম গৈরিবাস।

গৈরিবাস থেকে টুমলিং-এর দিকে তাকালে গাড়ির রাস্তা ছাড়া আরও একটা রাস্তা চোখে পড়ে। অনেক ট্রেকার সে দিক দিয়েও নেমে আসছেন। সেই কাঁচা পথ টুমলিং থেকে নেপালের জাউবাড়ি হয়ে গৈরিবাসে এসে মূল রাস্তায় মিশেছে। এখানে অবশ্য কেউই বেশিক্ষণ কালক্ষেপ করছে না। কারণ এর পরের পথ পার হতে সময় বেশি লাগবে। এখান থেকেই প্রথম বড়ো চড়াইয়ের শুরু। উচ্চতার বদলের সঙ্গে আবহাওয়ার বদলও তাই স্পষ্ট বোঝা যায়। মিঠে রোদের মনোরম গৈরিবাস থেকে শুরু করে আমরা যখন দু’ কিলোমাটার উঠে কায়াকাট্টা পৌঁছোলাম, মনে হল যেন বেলা পড়ে এসেছে। আধো অন্ধকার, চঞ্চল মেঘলা বাতাসে শীতের কঠিন কামড়। অথচ ঘড়ির কাঁটায় মাত্র দুপুর একটা।

বৃষ্টির আশঙ্কায় দ্রুত দুপুরের খাবার খেয়ে আজকের শেষ ল্যাপের পথে এগোলাম। এই পথ সমতল, তাই চলার কষ্ট কম। তবে দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্য। পরের পর মেঘের পর্দা সরিয়ে এগোতে থাকি। জনহীন পথে তখন সঙ্গী শুধুই নিজের চলার শব্দ। মাঝে মাঝে এক গুরুগম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণ ভেসে আসছে। মন বলছে গন্তব্য হয়তো বেশি দূর নয়। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ চলেও যখন পথ শেষ হয় না তখন সেই মন্ত্রকে যেন আরও রহস্যময় লাগে। চার কিলোমিটার পথ যে কত দীর্ঘ তা বোধহয় এই রাস্তাই শেখায়। এই ভাবে পথ শেষ হওয়ার শেষ আশাটুকু যখন ট্রেকার হারিয়ে ফেলে, তখনই সিমবীজের মতো আকৃতির কালো এক পুকুর হঠাৎ দেখা দিয়ে যাত্রার ইতি ঘোষণা করে। প্রেয়ার ফ্ল্যাগে ঘেরা এই পবিত্র পুকুরই কালিপোখরি।

কালিপোখরিকে ঘিরে ধোঁয়ার মতো মেঘ। মণি-দেওয়ালের পাশের অস্থায়ী প্রার্থনাস্থল থেকে মন্ত্রের স্পষ্ট শব্দ ভেসে আসতেই রহস্যভেদ হল। এই শব্দই আমরা শুনেছি উলটো দিকের পাহাড় থেকে। পাহাড়ে আকাশপথের দূরত্ব আর চলার পথের দূরত্বে যে জমিন-আসমান ফারাক, তা ভুলেই গিয়েছিলাম। ট্রেকার্স হাটের জানলার পাশে একটা চেয়ার টেনে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিই। অন্ধকার বিকেল ক্রমে আরও অন্ধকার হয়। প্রায় সন্ধ্যার মুখ পর্যন্ত সেই অন্ধকার ফুঁড়ে একে একে শ্রান্ত ট্রেকাররা কালিপোখরি পৌঁছোতে থাকে। সবাই ঘরে ঢুকে যাওয়ার পর রাতের দিকে মেঘ কাটল। ডিনার শেষে ঘরের আলো নিভিয়ে জানালায় দাঁড়িয়ে দেখি গত রাতের সেই অগুণতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ট্রেকারেরা নিকষ কালো আকাশে আবারও অনন্তের পথে পাড়ি দিয়েছে।

অভ্যাসমতো ভোর ভোর ঘুম ভাঙলেও একটু দেরি করে লেপ ছাড়লাম। তার কারণ দু’টো। প্রথমত গত দু’দিন যতটা করে হেঁটেছি, আজ হাঁটা তার অর্ধেক। তা ছাড়া কালিপোখরি থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার কোনো সুযোগ নেই। তাই সূর্যোদয়ের কোনো তাড়া ছিল না। বাইরে এসে দেখি ঝকঝকে নীল আকাশ আনন্দে রোদ পোহাচ্ছে। পোহাবে না-ই বা কেন, এমন আবহাওয়া কালিপোখরির ভাগ্যে আর ক’দিন জোটে। কাল দুপুরে যখন এখানে পৌঁছেছি, কত কী যে মেঘের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এখন বুঝতে পারছি। দিগন্ত জুড়ে পাঁচিলের মতো দাঁড়িয়ে হিমালয়। বাঁ দিকে দেখা যাচ্ছে নেপালের নতুন ট্রেকিং-স্পট চিন্তাফু। বাঁ থেকে ডানে হিমালয় কখন নেপাল থেকে ভারতে ঢুকে গেছে সাধারণ ভাবে তা বোঝার জো নেই। তবে মানুষেরই তৈরি এক ট্রেকার্স হাট সেই সীমা চিনিয়ে দিচ্ছে। পাহাড়ের সব চেয়ে উঁচু অংশটার একেবারে মাথায় দাঁড়িয়ে সে, এখান থেকে অবশ্য তাকে খুব ছোটো দেখাচ্ছে। তার নীচে পাহাড়ের গায়ে আঁকাবাঁকা পথের আভাস। শুনেছিলাম আবহাওয়া ভালো থাকলে কালিপোখরি থেকেই সান্দাকফু আর সেই পথের অনেকটা অংশ দেখা যায়। দেখলাম, যা শুনেছি তা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি।                        

হাঁটা শুরু করতে শরীর গরম হয়ে এল ঠিকই, কিন্তু প্রকৃতি সর্বক্ষণ শীতের মাত্রা জানান দিচ্ছিল। পথের দু’ধার সাদা হয়ে রয়েছে। সহযাত্রীরা অনেকেই বলছিলেন বটে যে রাতে হয়তো তুষারপাত হয়েছে, কিন্তু এগুলি আসলে ভোরের শিশির হিম হয়ে গিয়ে তৈরি। এখানে পাহাড়ের গায়ে লাইকেনের ওপরেও এমন তুষারকণা জড়ো হয়েছে। রাস্তায় একটা গর্তে জল এমন ভাবে জমে রয়েছে হঠাৎ দেখলে মনে হয় যেন ভাঙা কাচ। এক ঘণ্টা চলে কয়েক ঘর ছোটো দোকান দেখতে পেয়েই ভেবেছিলাম বিকেভঞ্জন পৌঁছে গেছি। পরে জানলাম জায়গাটার নাম চৌরিচক।

বিকেভঞ্জনের দেখা মিলল আরও আধ কিলোমিটার চলার পর। একটা ওয়াচ টাওয়ার আর গুম্ফার লম্বা সিঁড়ি বিকেভঞ্জনকে চিনিয়ে দেয়। এই গোটা ট্রেকরুটে বিকেভঞ্জনের একটা আশ্চর্য উত্তেজনা রয়েছে। এখানে পৌঁছে একজন ট্রেকার যুগপৎ দু’টি অনুভূতির শিকার হয়। সান্দাকফুর ট্রেকার্স হাট এখন যেন আরও স্পষ্ট। কিন্তু সেখানে পৌঁছোতে এ বার পেরোতে হবে এই গোটা পথের সব চেয়ে কঠিন চড়াই। ক্লান্ত শরীরে আবার যেন একটু ভয় চেপে বসে। কিন্তু সেই ভয় অচিরেই কেটে যায় যখন গাইড জানায় আবহাওয়া পরিষ্কার থাকায় আর কিছুক্ষণের মধ্যে চলার সঙ্গী হবে স্বয়ং কাঞ্চনজঙ্ঘা। চায়ের গ্লাসে দ্রুত চুমুক দিতে থাকি। (চলবে)

ছবি: লেখক

0 Comments
Share
trek-to-sandakphu-part-1-night-stay-at-tumling

shounak gupta
শৌনক গুপ্ত

এক একজন দশ থেকে পনেরো বারও গেছে এই পথে। কেউ কেউ তো কোথায় ক’টা বাঁক, তা-ও গুনে বলে দিতে পারে। চড়াই ভেঙে উঠতে উঠতে যখন ক্লান্তিতে গতিরোধ হয়, পাশ দিয়ে হুশ করে চলে যায় ঝরঝরে ল্যান্ডরোভার। গাড়ির থেকে বাদামি সানগ্লাস আর নিখুঁত লিপস্টিক-শোভিত ঝকঝকে মুখ অবহেলাভরে তাকায়। স্টিক আঁকড়ে কোমর বেঁকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা উশকোখুশকো চুলের ট্রেকারকে যেন তার বেমানান ঠেকে। গাড়িটা পথের বাঁকে অদৃশ্য হতেই ট্রেকারও মুষড়ে পড়ে। সুন্দরী অন্তর্হিতা হলেন বলে আদৌ নয়। যে রাস্তা ওই ল্যান্ডরোভার তিনটি ঘণ্টায় চলে যাবে, সেই পথ যেতে তার তিন তিনটি দিন লাগবে, এই ভেবে।

Sunlight peeping through the forest.
মানেভঞ্জন থেকে চিত্রের পথে রোদের উঁকিঝুঁকি।

গাড়ির শব্দ ততক্ষণে মিলিয়ে গিয়ে আবার সব নিস্তব্ধ। কিছুক্ষণ নুব্জ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর তার সম্বিত ফেরে। ভেসে আসছে পাখির শিস, বইছে মিষ্টি বাতাস। ঝাউ গাছের ফাঁক দিয়ে রোদ্দুর ঝিলিক দিচ্ছে। ট্রেকার স্পষ্ট অনুভব করে, ক্লান্তি দূর হচ্ছে। প্রকৃতি তার সঙ্গে কথা বলছে। যে কথা গাড়ি কোনো দিন শোনেনি। পায়ের ছন্দ আবার জেগে ওঠে। স্টিকে খুট খুট শব্দ তুলে সে আবার সামনের মেঘের ভিতর হারিয়ে যায়।

এত পরিচিত, এত ব্যবহৃত হয়েও ঠিক এই কারণেই সান্দাকফুর পথ কখনও পুরোনো হয় না। তাই মানেভঞ্জন থেকে সকাল সকাল চলা শুরু করে এ ভাবেই প্রকৃতির সঙ্গে কথা বলতে বলতে উঠে এসেছি চিত্রে-তে। তিন কিলোমিটার টানা চড়াই ভেঙে এখানে পৌঁছেছি। চিত্রে মনেস্টারির কিছু ওপরে গাড়ির রাস্তাটা দু’টো বড়ো পাক খেয়ে দূরে হারিয়ে গেছে। জমজমাট মানেভঞ্জনের পরে খান কয়েক ঘরের এই চিত্রে-কে বড় নিঃসঙ্গ বলে মনে হয়। তাই তাকে ছেড়ে যেতেও মায়া হয়। তার এক কাপ চায়ের নেমন্তন্ন রক্ষা করে উঠে পড়ি।

on the wat to Meghma
মেঘমার পথে।

বাঁধানো রাস্তা ছেড়ে এ বার পাহাড়ি ঢালের পথ। মূলত রডোডেনড্রনের বন, তবে এই মরসুমে ফুল নেই। কেউ যেন পাখার বাতাস করতে করতে সেই বনপথে মেঘ উড়িয়ে নিয়ে চলেছে। আগে পিছে সব মেঘে ঢেকে গিয়ে হঠাৎ পথ হারানোর ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে। ফেলে আসা ধোঁয়াটে রাস্তায় শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। কিছুক্ষণ পর সঙ্গীর অবয়ব ফুটে উঠলে ধড়ে প্রাণ ফিরে পাই। কোনো কোনো জায়গায় পথ বড়োই এবড়োখেবড়ো। উঠতে নামতে বেশ কষ্ট। চলতে চলতে এক সময় আবছা কয়েকটা বাড়ি চোখে পড়ে। আরও দু’ কিলোমিটার পথ চলে এসেছি। লামেধুরা যেন শীতঘুমে জবুথবু। তাকে বিরক্ত না করে আমরা চুপিসারে মেঠো পথ ছেড়ে আবার গাড়ির রাস্তা ধরি।

আরও পড়ুন এক টুকরো ইতিহাস – বাণগড়

কংক্রিটের পথে চলার গতি বাড়ে। কখনও হালকা পাকদণ্ডি, আবার কখনও সোজা এগিয়ে চলা। পথের পাশে মাঝেমধ্যেই শঙ্কুবৎ বেঁটে খাম্বা মনে করিয়ে দেয়, আমরা ভারত-নেপাল সীমান্তরেখা ধরে ট্রেকিং-পোল ঠুকছি। পেশিগুলো ততক্ষণে অল্পবিস্তর বিদ্রোহ শুরু করেছে। এমনি করে আরও দু’ কিলোমিটার পার হয়ে আমরা তখন পরবর্তী স্টপের অপেক্ষায়। সামনে ঘন ধূসর মেঘের পথ-অবরোধ। মেঘের মধ্যে ঢুকে পড়তেই একটা গুম্ফা চোখে পড়ল। বুঝলাম মেঘমা পৌঁছে গেছি।

আরও পড়ুন দোলের সপ্তাহান্তে চলুন বিচিত্রপুর

কী সার্থক নাম এই জায়গাটার! গুম্ফাটা নেপালে, রাস্তার বাঁ দিকে। ডান দিকে ভারতের হোটেলে আমাদের জিরিয়ে নেওয়ার পালা। আমাদের গাইড এই পথের নিত্যযাত্রী। সে-ও জানাল, মেঘমাকে শেষ কবে মেঘমুক্ত দেখেছে, তারও মনে পড়ে না। মেঘমায় লাঞ্চ সেরে এ বার দিনের শেষ স্পেল শুরু। এখান থেকে রাস্তা দু’ভাগ হয়েছে। ডাইনের ভারতীয় কংক্রিট পথ দু’ কিলোমিটার ওপরে উঠে পৌঁছে গেছে টংলু। তার পর আবার দু’ কিলোমিটার নেমে এসে টুমলিং-এ ঢুকছে। বাঁয়ের কাঁচা পথ নেপালের গুরাসে গ্রাম হয়ে হালকা চড়াইয়ের ঢেউ তুলে সেই টুমলিং-এই এসে মিশছে। এ ভাবেই কাঁচা মেঠো গন্ধ আর কংক্রিটের ‘আধুনিকতা’ যেন বারবার নিজেদের বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েও পারেনি।

colourful leaves at Tumling.
পাতার বাহার, টুমলিং।

গুরাসের পথে মেঘাচ্ছন্ন টুমলিং-এ যখন পৌঁছোলাম, জাঁকিয়ে বসা শীত আর তার সঙ্গে প্রবল হাওয়া সবাইকে বার্তা দিল – ‘ঘরে চলো’। অগত্যা ট্রেকার্স হাটের রসুইঘরে গোল করে বসে আগুন পোহানো আর দেদার আড্ডা। সময় কাটানো যেন জলভাত। রাতের খাওয়া শেষে এক বার সাহস করে বাইরে গিয়ে দেখি মেঘেরা সব হারিয়ে গেছে। আকাশে একটা ধোঁয়াটে সাদা পথ কোন এক অজানা গন্তব্যের দিক নির্দেশ করছে। সেই পথে তখন লাখ লাখ তারার দলবদ্ধ ট্রেকিং। (চলবে)

ছবি: লেখক

0 Comments
Share
a-trip-to-garhwal-last-part-from-kartik-swami-to-dhari-devi-via-baniyakund

ashok ghosh
অশোক কুমার ঘোষ

গাড়ি এগিয়ে চলল কনকচৌরির দিকে। ভিরি, বাসওয়ারা, ভানাজ হয়ে চন্দ্রনগর। বেশ বড়ো নগর। কিছু জায়গায় ধাপচাষ। তার পরেই বেশ ঘন জঙ্গল। এল মোহনখাল। এখান থেকে রাস্তা দু’ ভাগ – একটি গিয়েছে পোখরি, আমরা ধরলাম কনকচৌরির পথ। কনকচৌরিতে আগের বারের কটেজেই থাকা হল। সামনে বাগান, তার পর ঢাল নেমে গিয়েছে নীচের গ্রামের দিকে। আগের বারের তোলা ছবি দিতেই বাচ্চাদের এবং তাদের মায়েদের কী আনন্দ। কিছুটা পাহাড়ে উঠে চৌখাম্বা শিখর এবং তার প্রতিবেশীদের উপর অস্ত রবির আভা মন ভরিয়ে দিল। সন্ধ্যাটা গানের মজলিসেই কাটল।

on the way to kartikswami
কার্তিকস্বামীর পথে শেষ চড়াই।

পর দিন সকাল সকাল উঠে রওনা কার্তিকস্বামীর উদ্দেশে। হালকা চড়াই, মুখ্যত রোডোডেনড্রন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে। পাখিরা জেগে উঠেছে, ডাকছে, ব্ল্যাক বার্ড, রামদাঙরা (সিনেরিয়াস টিট) আছে, হোয়াইট চিক্‌ড বুলবুলিও আছে। গাছের ফাঁক দিয়ে চৌখাম্বারা সব সময়ে  দেখা দিচ্ছে। অল্প ফাঁকা জায়গায় একটা বার্কিং ডিয়ার দাঁড়িয়েছিল, আওয়াজ পেয়েই গাঁক গাঁক ডাক ডেকে এক ছুটে জঙ্গলের ভিতর। স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে দেখা গেল অন্তিম রিজটি, যার শেষ বিন্দুতে আছে কার্তিকস্বামী মন্দির। তবে এখন‌ও দূর, রাস্তাটা পুরো হেয়ারপিন বাঁক নিলে তবে আসবে ওই রিজটি। এ ভাবেই চড়াই উঠতে উঠতে বাম দিকের রিজ ছেড়ে ডান দিকের রিজে চড়া। কিছু পরেই পুরোহিত মশাইদের থাকার জায়গা, তার পর থেকেই সিঁড়ি শুরু। আগের বার যখন এসেছিলাম তখন সিঁড়ি শুরু হয়েছিল আরো অনেক পর থেকে। রাস্তা বাঁধানাও হয়েছে। মহাদেবের মন্দিরের পর সিঁড়ি আরও খাড়া হল। গাছের সংখ্যা কমে গিয়েছে, তবে সারা রাস্তায় প্রচুর প্রজাপতি এখনও আছে।

 kartikswami temple
কার্তিকস্বামী মন্দির।

অবশেষে কার্তিকস্বামী মন্দির। উত্তর ভারতে একমাত্র কার্তিকের মন্দির। কথিত, গণেশ মাতাপিতাকে প্রদক্ষিণ করেই পৃথিবী পরিক্রমা সেরে ফেলেন। বর‌ও পান, যে কোনো  পুজোয় প্রথম পুজো পাওয়ার অধিকার। কার্তিকের অভিমান হল। কঠোর ধ্যানের মাধ্যমে শরীরের মাংস ত্যাগ করলেন, তার পর এখানে এসে হাড় ত্যাগ করলেন। তাই এই মন্দিরের পূজিত মূর্তিতে হাড়ের অবয়ব। মন্দিরের বাইরে কার্তিকের একটি মাটির মূর্তি দেখলাম, আগের বার ছিল না। মন্দিরের পিছনেই ১৮০ ডিগ্রি তুষারশিখরের প্যানোরামা। বাঁ দিক থেকে জাঁওলি, বন্দরপুঞ্ছ, গঙ্গোত্রী ১, ৩, ২, যোগীন ২, ১, থ্যালাইসাগর, ভাতৄকুন্ঠা, কেদারনাথ, কেদারডোম, সুমেরু, খরচাকুণ্ড, ইয়ানবক, ভাগীরথী, সতোপন্থ, মান্দানী, জানুকোট, চৌখাম্বা ৪,৩,২,১ এবং নীলকন্ঠ।  ঘণ্টা বাজিয়ে ফিরে চলা। চার পাশ খোলা থাকায় এই ঘন্টাধ্বনি বহু দূর থেকে শোনা যায়।   কনকচৌরিতে ফিরে মধ্যাহ্ণভোজ সেরে রওনা বানিয়াকুণ্ডের পথে।

বানিয়াকুণ্ডে  সূর্যোদয়

সাময়িক চা পানের বিরতি চোপতায়। হিমালয়ের কোনো জায়গা  প্রথম দেখার যে মুগ্ধতা থাকে, পরবর্তী দর্শনে ততটা থাকে না বিভিন্ন কারণে।  হোটেলের সংখ্যা বৃদ্ধি দৃষ্টিদূষণ ঘটাচ্ছে। মঙ্গল সিং-এর চটির পাশেই  তাঁর পুত্রের তৈরি বিলাসবহুল হোটেল কেমন যেন বেমানান।  আমাদের রাত্রিকালীন বিশ্রামস্থল বানিয়াকুণ্ড এখান থেকে তিন কিমি।

পাহাড়ি পথে এ-ধারে ও-ধারে বাঁক ঘুরতে ঘুরতে কিছুক্ষণের মধ্যেই বানিয়াকুণ্ড। উত্তর দিক ধু ধু খোলা। পাহাড়ি ঢাল নেমে গিয়েছে, ফলে উন্মুক্ত তুষারশ্রেণি। পড়ন্ত সূর্যের আলোয় মায়াবী আভা চার পাশে। দক্ষিণ দিকে পাহাড়ের অপর দিক উপরে উঠে গিয়েছে গাছের কম্বল গায়ে দিয়ে। পাখির ডাক কানে আসছে। আলো পড়ে আসছে। সঙ্গের মালপত্র রিসর্টের ঘরে তোলা হয়ে গিয়েছে।  গা সির সির করছে, তবু ঘরে ঢুকতে ইচ্ছা করছে না। নিস্তব্ধতা নামছে। সোলার আলোর ছটা ঘরের ভিতর থেকে চুঁইয়ে বাইরে আসায় আধিভৌতিক পরিমণ্ডল তৈরি হয়েছে। টর্চের আলোয় মূল রাস্তা থেকে নেমে, ছোটো একটি শৌখিন সাঁকো পার হয়ে, ঘাসের জমি মাড়িয়ে কটেজের ঘরে প্রবেশ। হাত-মুখ ধুতে হবে। কটেজের দেওয়াল ভালো রকম ইনসুলেটেড, বেশ আরাম লাগছে। এ বার চা পান পর্ব শুরু হবে, চলবে সান্ধ্য আড্ডা। 

আরও পড়ুন গাড়োয়ালে ইতিউতি ১ / তুষারাবৃত বদরীনাথকে প্রণাম

২০১৩ সালে তুঙ্গনাথ থেকে ফেরার পথে এখানে শকুন দেখে গাড়ি থেকে নেমেছিলাম ছবি তুলব বলে। তখন জায়গাটা একেবারে ফাঁকা ছিল। শকুনদের জমায়েতের কাছে হাড়গোড় পড়েছিল। আমরা ভেবেছিলাম, শকুনরা চিতাবাঘের মারা জন্তুর অবশিষ্ট অংশ‌ই ভক্ষণরত। ভাবার কারণ হল এ অঞ্চলে চিতাবাঘ প্রায়শ‌ই দেখা যায়। ২০১৩ সালে আমরা চোপতা পৌঁছোনোর পাঁচ মিনিট পরে যে গাড়িটি আসে, তারা সাড়ে চার ফুটিয়া চিতাবাঘের দর্শন পেয়েছিল। দেখা যাক এ বারে আমাদের দর্শন দেন কি না।

baniyakund
বানিয়াকুণ্ড।

আরামদায়ক পরিবেশে ঘুম ভালোই হল, শুধু মাঝে বেশ কয়েক বার কুকুরের ডাক শোনা গিয়েছিল। জানা ছিল, বন্যজন্তু বিশেষ করে চিতাবাঘ এলে কুকুর চেঁচিয়ে সবাইকে সাবধান করে। তা হলে কি তিনি এসেছেন? সাহস হয়নি, বাইরে বেরিয়ে সত্যতা যাচাই করার। গাড়ির ভিতর থেকে দেখাই ভালো, অথবা দরজার ফাঁক দিয়ে, যেমনটা ঘটেছিল রুদ্রনাথ যাওয়ার পথে পানার বুগিয়ালে, তবে সে অন্য পর্ব।         

ভোর ভোর ওঠা, সূর্যোদয় দেখতে হবে। গরম জামাকাপড় চাপিয়ে বাইরে এলাম, আধো আলোয় মনোরম পরিবেশ। ধীরে ধীরে রং ধরতে লাগল তুষারশৃঙ্গের গায়ে। বানিয়াকুণ্ডের যে ঢাল নেমে গিয়েছে উত্তর দিকে, তার পরেই তুষারপ্রাচীর সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ডান দিক থেকে বাঁ দিকে বয়ে গিয়েছে। ঢেউয়ের মাথাগুলি কেদারনাথ, চৌখাম্বা, জানুকোট নাম ধারণ করে নিজেদের উপস্থিতি জানাচ্ছে। ‘আহা কী দেখিলাম, জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না’। এই তুষারশ্রেণি শ্রেণী আরও কাছ থেকে দেখেছি চন্দ্রশিলা  ও চন্দ্রবদনী থেকে। এখান থেকে যা দর্শন করছি তা কেমন ধীরে ধীরে সামনের সবুজ অঞ্চল অপসৃয়মান হতে হতে নীচের জীবকুলকে রক্ষা করার জন্য নিজেকে খাড়া দেওয়ালে রূপান্তরিত করল। পাখির ডাক শুনছি। তিনটি রেড বিল্‌ড ব্লু ম্যাগপাই উড়ে গেল। ঘন গাছের মধ্যে লাফিং থ্রাশ ওড়াউড়ি করছে। বুলবুলি আছেই, আর আছে শালিক এবং দাঁড় কাক। কুকুর দেখা যাচ্ছে না, হয়তো গত রাতে ডিউটি দেওয়ার পর বিশ্রাম নিচ্ছে।       

 baniyakund in early morning
বানিয়াকুণ্ডে ভোর।

বলা হয়ে থাকে যে ব্যবসায়ীরা অর্থাৎ বানিয়ারা কোনো এক সময়ে এখানে শিবির স্থাপন করতেন ব্যবসার উদ্দেশ্যে যাত্রার সময়, তাই এই নাম। কুণ্ডের কোনো হদিস পা‌ইনি, কেবলমাত্র একটি ঝরনা দক্ষিণ দিকের পাহাড়ি ঢাল দিয়ে একাধিক ধারায় নেমে এসেছে। কোনো  কোনো ধারায় নল লাগিয়ে প্লাসটিকের ড্রামে জল ভরা হচ্ছে। এই জলধারার উৎসমুখে যাবার উদ্দেশ্যে দক্ষিণ দিকের চড়াই ভাঙতে শুরু করেছি, দেখি একটি কুকুর ডাকতে ডাকতে একটি বানরকে তাড়া করছে। বানরটি গাছে উঠে রক্ষা পেল, এবং তার পর‌ই বানরটা মুখ ভেংচাতে লাগল কুকুরটার দিকে। ঠিক যেন ‘কুমির জলকে নেমেছি’ খেলা।  মাথার ওপর দিয়ে সাদা কালো ডানা ছড়িয়ে উড়ে গেল কয়েকটি শকুন। বেশ কয়েক জায়গায় হাড়গোড় পড়ে আছে, আয়তন দেখে গবাদি পশু বলেই মনে হল। অর্থাৎ, প্রথমে আমরা যেটাকে চিতাবাঘ মারি বলে ভেবেছিলাম, সেটা নয়। এ স্থানকে হয়ত ভাগাড় হিসাবেই ব্যবহার করা হত।               

পায়চারি করে প্রকৃতি উপভোগ করে এবং পাখি দেখে সকাল কাটল। এ বার বানিয়াকুণ্ডের পরিবেশ ছেড়ে যাওয়ার সময়। মধ্যাহ্নভোজ সেরে রওনা দে‌ওয়া হল ধারি দেবীর উদ্দেশে।

ধারি দেবী দর্শন

গাড়োয়ালে বিভিন্ন যাত্রাপথে বহু স্থানের উপর দিয়ে যাওয়া হয়, থাকা আর হয় না। এ বারে ঠিক হল ধারি দেবীতে রাত্রিবাস করা হবে। স্থানটির আসল নাম কালিয়াসৌর। একেবারে অলকানন্দার তীরে। এখানে অলকানন্দা অনেক বদলে গিয়েছে গত কয়েক বছরে। ড্যাম তৈরির কারণে, নদী তার স্বাভাবিক বহমান ছন্দ হারিয়েছে, এখন আর সে নৄত্যরতা কিশোরী নয়। এখন ধীরস্থির সরোবর সম। সবজে নীল বসনে সমাহিত। জলস্তর বৃদ্ধির ফলে তীরবর্তী গাছ প্লাবিত হয়ে মনে হত নদীর মধ্য থেকে মাথা তুলে আছে। ‘বন্যরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’। তাই মাঝ-নদী ডাঙার গাছের মাতৃক্রোড় নয়, গাছগুলি ধীরে ধীরে শুকিয়ে গেল।  এবারে দেখলাম তাদের কঙ্কাল। ধারী দেবীতে থাকার জায়গা ভারত সেবাশ্রম সংঘ। দু’ তলা, আরও ঘর তৈরি হচ্ছে, সামনে ছোটো বাগান, পিছনে অলকানন্দার পান্না জল।                       

dhari devi
ধারী দেবী।

পর দিন ভোরে কুয়াশাছন্ন আবহাওয়ায় রাস্তার অপর পারের পাহাড়ি ঢালের গাছগুলিকে জলছবি বোধ হচ্ছিল। সামনের ছোটো বাগানের এক জায়গায় জমা জলে এক জোড়া বুলবুল স্নান পর্ব  সারছে, হয়তো আমাদের মতো পুজো দিতে যাবে। আমরাও বার হলাম ধারীদেবী মন্দিরেরর পথে। অল্প কিছু হেঁটে মন্দিরের প্রবেশ দ্বার, বাঁধানো রাস্তা দিয়ে এঁকেবেঁকে নামা। পাশের ঝোপে পাহাড়ি চড়াই, সিলবার বিল আর বুলবুলির দাপাদাপি। সাঁকোর উপর দিয়ে গিয়ে মন্দিরচত্বর। ধারী দেবী মূর্তি, দেবীর ঊর্ধ্বাংশ। কালো পাথরে গড়া। কথিত যে দেবীর নিম্নাংশ কালীমঠে পূজিতা হন। সর্ববিধ প্রথা মেনে পূজাপাঠ চলছে, নারকেল ভেঙে প্রসাদ হিসাবে বিতরণ হচ্ছে। বেশ সংগঠিত এবং সুষ্ঠ ব্যবস্থা, কোনো হুড়োহুড়ি তাড়াহুড়ো নেই। শান্ত পরিবেশ। ড্যাম তৈরির প্রাক্কালে, দেবীমূর্তি স্থানান্তরিত করা হয়। তার কিছু দিনের মধ্যেই প্রলয় কাণ্ড ঘটে কেদারখন্ডে, মেঘফাটা জলে তাণ্ডব ঘটে যায়। দেবীর রোষ থেকে বাঁচতে নদীর বুকে থাম গেঁথে পূর্ব স্থানেই দেবীর পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। 

আরও পড়ুন গাড়োয়ালে ইতিউতি ২ / তিন বদরী, কল্পেশ্বর ছুঁয়ে মক্কুমঠে

মধ্যাহ্ণভোজ সারা। এ বার হরিদ্বারের উদ্দেশে র‌ওনা। গাড়োয়ালের পাহাড় ছেড়ে যেতে হবে এ বারের মতো। পাশের ঝোপ থেকে পুটুস ফুল (ল্যান্টানা কামারা) এনে গাড়ির চালক বাপিকে দিলাম। এক বছর বয়সি মেয়েকে আদর করে পুটুস বলে ডাকে। এই নামকরণের কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। ওই নামের যে কোনো ফুল আছে তা-ই জানত না। বাপির মুখে হাসি, খুব খুশি। গাড়ীর চাকা গড়াল, রাস্তার পাশের গাছ থেকে বিদায় জানাল কোকিলের কুহু কুহু। (শেষ)

ছবি: লেখক

2 Comments
Share
a-trip-to-garhwal-part-2-visit-to-three-badris-kalpeswar-and-makkumath

ashok ghosh
অশোক কুমার ঘোষ

বদরীনাথ থেকে ফিরতিপথে জমাট তুষার ছিল পথের দু’ পাশে, যেন টুথপেস্ট লাগানো। যাওয়ার সময় যে গাছগুলোকে দেখে মনে হয়েছিল কেউ যেন  তাদের গায়ে ওপর থেকে আটা ঢেলে দিয়েছে, তারা এখন সেটা ঝেড়ে ফেলেছে। এই ভাবে নামতে নামতে অলকানন্দা পার হলাম বলরাম মেমোরিয়াল ব্রিজের উপর দিয়ে। সাঁকো তৈরি করতে গিয়ে যাঁর প্রয়াণ হয়েছিল, তাঁর নামেই নামকরণ।

চলে এলাম পাণ্ডুকেশ্বর (১৯২০ মি)। কথিত যে এখানেই পাণ্ডু এবং কুন্তীর বিয়ে হয়েছিল। আর আছে যোগধ্যান বদরী মন্দির। সিঁড়ি দিয়ে বেশ কিছুটা নেমে মন্দিরচত্বর। রাস্তার দু’ পাশের বাড়িগুলিতে ঝলমল করছে এনিমোন গাঁদার ঝাড়। দু’টি মন্দির পাশাপাশি, একটি যোগ বদরীর, অপরটি বাসুদেবের। বড়োই সুন্দর মূর্তি। গ্রামটি বর্ধিষ্ণু।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালে ইতিউতি ১ / তুষারাবৃত বদরীনাথকে প্রণাম

yog dhyan badri temple
যোগধ্যান বদরীনাথ মন্দির, পাণ্ডুকেশ্বর।

আবার চলা। একটু থেমে দর্শন হল বিষ্ণুপ্রয়াগ (১৪৫৮ মি), ধৌলিগঙ্গা এবং অলকানন্দার মিলনস্থল। চড়াইপথে উঠে চলা। দেওয়ালির ভিড়ের জন্য যোশীমঠে ঢোকার মূল রাস্তা বন্ধ, তাই বাইপাস ধরে এগিয়ে যাওয়া। রাস্তার দু’ পাশে পয়েনসেটিয়া ফুটতে শুরু করেছে। বাড়ির গামলায় বিভিন্ন রঙের জেরেনিয়াম জ্বলজ্বল করছে।

এ বার থামা হল উনিমঠ গ্রামে, এখানেই আছে বৃদ্ধ বদরীনাথের মন্দির (১৪৮৫ মি)। সিঁড়ি দিয়ে নামা গ্রামের মধ্য দিয়ে। মন্দিরচত্বর পরিছন্ন, শান্ত, মনোরম। ছোটো ফুলবাগান আছে। মধ্যাহ্ণভোজের বিরতি হল হেলাং-এর কাছেই।

A local child
বৄদ্ধ বদরীনাথ মন্দিরের কাছে এক স্থানীয় শিশু।

এর পরের পথ বেশ খারাপ। কাঁচা রাস্তা এবং অসমান। জায়গায় জায়গায় জল জমে কর্দমময়। কিছু জায়গায় কাজ চলছে রাস্তা মেরামতের।  অল্প পরেই পথের দু’ পাশে অরণ্য। চোখে পড়ল বাঁদর (রেসাস) এবং কিছু পাখি, হোয়াইট চিক্‌ড বুলবুল এবং ব্ল্যাক বার্ড। এ ভাবেই উরগম পার হয়ে হাজির দেবগ্রামে। গ্রামে গাড়ি ঢুকবে না, মালপত্র নিয়ে পায়ে চলার পথ ধরে উপস্থিত পথিক লজে। আজকের বিশ্রামস্থল।

শেষ বার এখানে থেকেছিলাম ২০১৪ সালে, রুদ্রনাথ থেকে ডুমক হয়ে ফেরার পথে। খুব একটা বদল হয়নি গ্রাম। দূরে দেখা যাচ্ছে নন্দাদেবীর তুষারশৃঙ্গ। কিছুক্ষণ বাদেই সূর্যাস্তের অস্তরাগে রাঙা হবে। সামনের একটা গাছে কাঠঠোকরা ঠকঠক করছে। আলো পড়ে আসছে, তাই প্রজাতি চিনতে পারলাম না। পরে ছবি দেখে যদি প্রজাতি চেনা যায়! চা পান করে লটবহর নিয়ে ঘরে প্রবেশ। আরামদায়ক শীতলতা। হালকা কম্বলেই হয়ে যাবে। এখানে রাতের খাবার সাড়ে সাতটার মধ্যেই সারতে হবে, জানালেন লজের মালিক রাজেন্দ্র নেগি। এদের দিন শুরু হয় রাতের অন্ধকার পরিষ্কার হওয়ার আগেই।

কল্পেশ্বর কেদারনাথ

nandadevi peak from devagram
অস্তরাগে নন্দদেবী শিখর, দেবগ্রাম।

পরের দিন সকাল সকাল যাত্রা শুরু কল্পেশ্বর মহাদেবের মন্দিরের উদ্দেশে। একটি ছোটো নালা পার হলাম সাঁকোর ওপর দিয়ে। দু’ পাশে ঘরসংলগ্ন জায়গায় লাগানো হয়েছে বাঁধাকপি, লঙ্কা, রাইশাক ইত্যাদি। ডালিয়া এবং ছোটো এনিমোন গাঁদাও ফুটে আছে। গত বারে একটি বেশ বড়ো ন্যাসটারসিয়ামের ঝাড় দেখেছিলাম, এ বার সেটা নেই। গ্রামের পথে চলতে চলতে অনেক মহিলাকে দেখলাম, যাঁরা ঘাড়ে বিশাল ঘাসপাতার বোঝা নিয়ে আসছেন। গবাদিপশুর খাদ্য। অন্ধকার থাকতেই ওঁরা র‌ওনা হয়েছেন পাহাড়ের উঁচুতে ঘাসভূমিতে। পরিশ্রমে কপালে ঘাম, একটু জিরিয়ে নিচ্ছেন মাঝেমাঝে। দলে দলে যান এবং এক‌ই ভাবে ফেরেন, বন্যজন্তুর ভয় রয়েছে তো।

on the way to kalpeshwar
কল্পেশ্বরের পথে।

পথরেখা দু’ ভাগে ভাগ হল। বাঁ দিকেরটি গিয়েছে গ্রামের ওপর দিকে, যে পথ ধরে আমরা গত বার ফিরেছিলাম ডুমক গ্রাম থেকে। আমরা ধরলাম ডান দিকের পথ। আমাদের পথের ডান দিকের খেত খালি, রামদানা কেটে নেওয়া হয়েছে, গোলাপি ডালগুলো দাঁড়িয়ে আছে। এ-ডাল থেকে ও-ডালে উড়ে যাচ্ছে লেজ ঝোলা রেড বিল্‌ড ব্লু ম্যাগপাই। বুলবুলি এবং চড়াই আছেই। আর আছে পাতার গভীরে ওয়ার্বলার, দেখা দিয়েই ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। আমাদের পরমপরিচিত ছাতারের ক্যাঁচর ম্যাচর শোনা যাচ্ছেই।

পথ জায়গায় জায়গায় বাঁধানো। মৃদু চড়াই। গ্রাম ছেড়ে মাটির পথ হালকা গাছালির মধ্য দিয়ে। একটা ফাঁকা জায়গায় যাযাবরেরা আস্তানা গেড়েছে। বাচ্চাদের বেলুন ফুলিয়ে দিতে কী আনন্দ! ডান দিকে একটি সুন্দর ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড।

একটু পরেই কল্পগঙ্গা পার হলাম মজবুত সাঁকোর ওপর দিয়ে। গত বার এটা ছিল না। কয়েকটি সিঁড়ি উঠে তীর্থস্থানের গেট। ঘণ্টা বাজিয়ে প্রবেশ। ডান দিকে পাহাড়ি ঢালে খান দুয়েক ঘর, ভ্রাম্যমাণ সাধুরা থাকেন। রঙিন পতাকাশোভিত ত্রিশুল গাঁথা আছে পর পর। জুতো খুলে প্রবেশ গুহামন্দিরে। গুহা্র ওপরে মন্দিরের চূড়া বানানো আছে। গুহার ভিতরে পাথরের উঁচু চাতালে কল্পনাথ লিঙ্গ। মালা, ফুল দেওয়া আছে। আমরা, নিজেদের সঙ্গে আনা বেলপাতা, ধুতরো ফুল আর গঙ্গাজল সহযোগে নিজেদের মতো করে পুজো করলাম। ধূপ জ্বালিয়ে আরতিও করা হল। পূজারি পরে আসবেন নিত্যপূজার জন্য।

এই ফাঁকে কল্পেশ্বরের কাহিনিটা বলে নেওয়া যাক। স্বজনহত্যার পাপস্খালনের জন্য পাণ্ডবরা মহাদেবকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। তিনিও ধরা দেবেন না। অবশেষে তিনি মহিষরূপ ধারণ করলেন ছদ্মবেশ হিসাবে। তবুও ধরা পড়ে গেলেন। এড়াতে না পেরে পাতালে প্রবেশ করতে লাগলেন, শেষ সময়ে পাণ্ডবরা যাতে তাঁকে ধরতে না পারেন। সেই অবস্থায় মহিষের যে যে অংশ মাটির উপর ছিল সেগুলি এক একটি কেদারতীর্থ। কল্পেশ্বরনাথ সেই হিসাবে মহাদেবের জটা। পরিপূর্ণ হৃদয়ে ফিরে চললাম। যাযাবর পরিবার হাত নেড়ে বিদায় জানাল। প্রাতরাশ সেরে এ বার আমাদের দেবগ্রাম ছেড়ে যাওয়ার পালা।

আরও এক বদরীনাথ এবং তুঙ্গনাথদেবের শীতকালীন আবাস

প্রাতরাশের পর নেগি পরিবারকে সম্ভাষণ জানিয়ে বিদায় নিলাম। দেবগ্রাম ছাড়ার কিছু পরেই ধ্যান বদরীনাথের মন্দির। ২০১৪ সালে যখন এসেছিলাম তখন দরজা খুলেছিলেন এক বৄদ্ধা, মুখে সব সময় ‘পরমাত্মা’ শব্দ।। খোঁজ করে ওঁর বাড়ি গেলাম – অথর্ব, কথাও বলতে পারেন না, বুঝতেও পারেন না। ওঁর ছবি দিতে উনি হাতে নিলেন কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। বয়সকালের ডিমেনসিয়া, যেটা আমরা দেখছি বাইরে থেকে। ওঁর মনের ভিতরের অবস্থান জানার জাদুকর আমরা নই। বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠার ছবি পেয়ে সকলে খুশি। কয়েক জন সঙ্গেও এলেন মন্দির অবধি। মন্দিরপ্রাঙ্গণ বেশ প্রশস্ত, পাথর দিয়ে বাঁধানো।

woman with bundle of grass
ঘাস পিঠে মহিলা, দেবগ্রাম।

এর পরের পাহাড়ি রাস্তার পাশে কখন‌ও বসতি, কখন‌ও জঙ্গল। টান টান হয়ে চোখ খোলা রাখছি। মাঝে মাঝে লেপার্ড বাবাজীবন দেখা দেন এ অঞ্চলে। এ যাত্রায় দেখা দিলেন না, হয়তো তিনি অথবা তেনারা পাতার চিকের আড়াল থেকে আমাদের দর্শন করেছেন। একটি বসতি, জগপুরা, চোখে পড়ল একটি হোম স্টে, ব্রহ্মকমল কলোনি। কিছুটা যাওয়ার পর গাড়ি নীচে নামতে লাগল। পৌঁছোলাম মক্কুমঠ। সিঁড়ির ধাপ উঠে গিয়েছে বসতবাড়ির পাশ দিয়ে। কৌতূহলী বাসিন্দারা দেখছেন। স্থানটির চার পাশ পাহাড় দিয়ে ঘেরা থাকায় তুষারশৃঙ্গ দেখা যায় না।

local old lady
ভক্তিমতী বৄদ্ধা।

মন্দিরচত্বরটি বাঁধানো। মুখোমুখি তুঙ্গনাথদেবের শীতকালীন আবাসস্থল (মন্দির) এবং গঙ্গাদেবীর মন্দির। গঙ্গাদেবী মন্দিরের ভিতরে একটি মুখ দিয়ে ঝর্ণাধারা অবিরাম বয়ে চলেছে। দর্শনার্থীরা সেই জলে আচমন করে তুঙ্গনাথদেবকে দর্শন করছেন। প্রচলিত বিশ্বাস, তুঙ্গনাথদেব মহাদেবের বাহু। মন্দিরএলাকা লোহার বেড়া দিয়ে ঘেরা। এক দিকে পূজারির থাকার ঘর। আমাদের দেখে কয়েক জন বাসিন্দা এগিয়ে এলেন। আলাপচারিতায় জানা গেল, পড়াশোনার চল আছে। ওদের মধ্যে একটি মেয়ে গোপেশ্বরে পলিটিক্যাল সায়েন্স বিষয়ে এমএ পড়ছেন।

এই অঞ্চলের এক অশীতিপর ব্যাক্তি প্রতি বছর মন্দির বন্ধের সময় তুঙ্গনাথ যেতেন। তুঙ্গনাথদেবকে সঙ্গ দিয়ে মক্কুমঠে ফিরিয়ে আনতেন। ২০১৩ সালে ওঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তুঙ্গনাথে। ওঁরও ছবি আনা হয়েছে ওঁর হাতে দেওয়ার জন্য। কিন্তু জানা গেল, দু’ বছর আগে উনি প্রয়াত হয়েছেন। ভারাক্রান্ত মনে অনুপম ছবিটি একজনকে দিল, ওঁর বাড়ির কাউকে দেওয়ার জন্য। ফিরতিপথে চোখে পড়ল নির্মীয়মাণ কিছু অত্যাধুনিক রিসর্ট। এই স্থানটি পক্ষীপ্রেমীদের স্বর্গ বলে পরিচিত। (চলবে)

ছবি: লেখক

0 Comments
Share
a-trip-to-garhwal-part-1-snow-covered-badrinayh

ashok ghosh
অশোক কুমার ঘোষ

গিন্নির বড়ো দুঃখ, কেদার-বদরী দর্শন হল না। অতীতে তিনি অমরনাথ এবং হর-কি-দুন গিয়েছেন ট্রেকিং করেই, কিন্তু এখন হাঁটু সহযোগিতা করবে না কেদারনাথের চড়াইয়ের সঙ্গে। সহধর্মিনীর দুঃখ লাঘবের জন্য ঘোলের প্রস্তাব দে‌ওয়া হল দুধের বদলে। সিদ্ধান্ত গৃহীত হল বদরীনাথের পাশাপাশি প‍‌ঞ্চম কেদার কল্পেশ্বর, তৎসহ কার্তিকস্বামী ইত্যাদি দর্শনের। আমরা দু’ জন এবং অনুজ বন্ধু অনুপমদের তিন জন, এই পঞ্চপাণ্ডবের দল রওনা হলাম। হরিদ্বার থেকে গাড়িতে জোশীমঠ, বদরীনাথদেবের শীতকালীন আবাস।

৩ নভেম্বর। চলছে টিপটিপ বৃষ্টি। তারই মধ্যে সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ রওনা জোশীমঠ থেকে। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টির মুষলধার রূপ। অলকানন্দা পার হয়ে কিছুটা যাওয়ার পর চোখে পড়ল বদরীনাথ থেকে নামা গাড়ির ছাদে এবং উইন্ডশিল্ডে বরফ, অতএব প্রমাণিত বদরীনাথে বরফ। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের যাত্রাপথে তুষারপাত শুরু। আমাদের আনন্দ দেখে কে! জানলার কাচ নামিয়ে ছবি তোলার হুড়োহুড়ি।

আরও পড়ুন কুমারী সৈকত চাঁদপুরে একটা দিন

তুষারপাতের মধ্য দিয়ে চলেছি আমরা, পথের পাশে গাছে গাছে বরফের আস্তরণ। রাস্তার ওপরের বরফ শক্ত হতে শুরু করায় গাড়ির চাকা স্কিড করতে লাগল। গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। ওপর থেকে একটা বড়ো ট্রাক নীচে নামার ফলে যে চওড়া চাকার দাগ তৈরি হল, সেই দাগে চাকা ফেলে আমাদের গাড়ি চলল এগিয়ে।

অবশেষে বদরীনাথ। বরফ ঠেলে ভারত সেবাশ্রম সংঘ বিনোদ ভিউ। সেখানকার বারান্দাও তুষারাবৃত। কিছুক্ষণ পরে তুষারপাতের মধ্যেই ছাতা আর পঞ্চু চাপিয়ে প্রায় এক ফুট নরম বরফ ঠেলে মধ্যাহ্নভোজ সেরে আসা হল। তুষারপাতের বিরাম নেই। চারপাশ ঘোলাটে। বরফের ভারে গাছের ডালপালা নুয়ে পড়েছে। আমরা বাধ্য হয়ে ঘরবন্দি। বিকেলে বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন। অন্ধকারের মধ্যেই ভক্তি মহারাজের বৈরাগ্যআলেখ্য শোনা হল। রসিক ব্যক্তি, নিজেকে নিয়ে মজা করতে পারেন।

তুষারপাত বেড়েছে, তারই সঙ্গে বেড়েছে হাওয়ার দাপট‌ও। চার পাশের অন্ধকার, তাই তুষারের ধারাপাত স্পষ্ট। জেনারেটারের কারণে শুধুমাত্র বদরীনাথ মন্দির আলোকসজ্জায় সুসজ্জিত। সকালের আনন্দভাবের ওপর ধীরে ধীরে চিন্তার প্রলেপ পড়তে শুরু করেছে। একে অন্ধকার, তায় অবিরাম বরফবৃষ্টি। তাই বাইরে খেতে যাওয়া নাকচ হল। নৈশভোজ সারা হল সঙ্গের চিঁড়ে ভাজা আর খেজুর দিয়ে। আমাদের থার্মোমিটারে -৬ সেলসিয়াস। গরম জামাকাপড় গায়ে চাপিয়ে লেপ কম্বলের নীচে। কানে আসছে একটা ঝরনার আওয়াজ, সঙ্গে অলকানন্দার প্রবাহের শব্দ।                           

badrinath temple
বদরীনাথ।

ভোররাত্রে ধুপধাপ আওয়াজ। হয়তো বরফের চাঙড় খসে পড়ছে। তাড়াতাড়ি উঠেই বা কী হবে? থাকতে তো হবে ঘরবন্দি। দরজার নীচে দিয়ে ঢোকা আলো দেখে বাইরে এসে তাজ্জব। হাই ফোকস্! ইট্‌স আ ব্রাইট ডে। সবাই বাইরে। ছবি তোলার ধুম। ঝকঝক করছে চার পাশ। রোদ এসে পড়েছে পাহাড়ের এক দিকে। বদরীনাথ মন্দির পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। এক জন বাড়ির ছাদে উঠে থালায় করে বরফ পরিষ্কার করছেন। মন্দিরচত্বরে লোকজনের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে এখানকার বারান্দা থেকেই। আমরাও র‌ওনা দিলাম।

কিছু কিছু বরফ গলে পথ পিচ্ছিল। অতি সাবধানে পদচারণা করতে হচ্ছে। বেলচা দিয়ে বরফ সরানো হচ্ছে। অলকানন্দার ওপর যে ব্রিজ, তাতেও বরফ। অবশেষে বদরীনাথ দর্শন। মন্দির প্রায় খালি। বদরীনাথজি ভালো দর্শন দিলেন। মাথায় রত্নখচিত মুকুট অথচ দেখতে কী মায়াময়। মায়াবী, সংবেদনশীল দৃষ্টিতে দেখছেন। মনের থলি ভরে নিয়ে মন্দির প্রদক্ষিণ ক‍রে বাইরে আসতেই দেখি, দর্শনার্থী সমাগম বেশ হয়েছে, তার সঙ্গে হাজির পেশাদার আলোকচিত্রীর দল। ঝকঝকে রোদে চার পাশ ঝলমল করছে। হলুদ ঠোঁট চাও ওড়াউড়ি করছে। আমরাও মন্দির থেকে ফেরার পথ ধরলাম।

আরও পড়ুন বিশ্বনাথের বারাণসী, বারাণসীর বিসমিল্লাহ

একটি গাড়িও র‌ওনা দিল, কিন্তু যেতে পারল না বিশেষ। বদরীনাথ ঢোকা-বেরোনোর চৌকিতে আটকে দেওয়া হল, রাস্তা চলাচলের উপযুক্ত না হ‌ওয়ায়। ষোলো ঘণ্টার অবিরাম তুষারপাতের ফলে জায়গায় জায়গায় দু’ ফুট তুষারের আস্তরণ।

ঘরবন্দি হয়ে থাকতে আর ভালো লাগছে না, বিকেলে পায়চারি করতে বেরোলাম। মাথার ওপর হেলিকপ্টারের চক্কর। অনুপম বলল, “রিপোর্টার”। সেটা যে ভুল তা বুঝেছিলাম পরের দিন। যা-ই হোক বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে একেবারে মন্দিরচত্বরে, দর্শনার্থীদের লম্বা লাইন। সকালের মতো আর ফাঁকা নেই। মন্দিরের বাঁহাতি রাস্তা ধরে চলতে লাগলাম চরণপাদুকার দিকে। দু’ পাশের দোকানগুলোর ছাদ থেকে বরফগলা জল টপ টপ করে পড়ছে। রাস্তায় বরফকুচি আর জলের কাদা। সাবধানে চলতে হচ্ছে। চরণপাদুকার দিকে ওঠার সিঁড়ি বরফে ভর্তি। স্থানীয় একজন উঠতে বারণ করলেন। উঠতে পারলে‌ও নামা কঠিন হবে। অগত্যা ফিরতি-পথ। অলকানন্দার ওপর সাঁকো পার হতেই চোখে পড়ল এক সাধু তাঁর ক্রাচ দিয়ে বসার বেঞ্চ থেকে বরফ সরাচ্ছেন। একটা জলুস আসছে বাজনা বাজিয়ে। এক আঞ্চলিক গ্রাম্য দেবতাকে আনা হচ্ছে বদরীনাথ দর্শনের জন্য। ছবি তুলতে গিয়ে দেখি চার্জ শেষ। গতকাল থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই পাওয়ার ফল্টের কারণে।

first sunrays on neelkantha peak
নীলকণ্ঠ শিখরে প্রথম সূর্যকিরণ।

পরের দিন সকালে ঠিক হল ফিরতি পথে র‌ওনা হ‌ওয়ার আগে চেষ্টা হবে মানা গ্রামে যাওয়ার। জানা গেল রাস্তা খোলা। গাড়ির সামনের বরফ পরিষ্কার করতে হাত লাগাল অনুপম। বরফ পরিষ্কার করে মানা যাওয়ার রাস্তা গাড়ি চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। ফৌজি চৌকি থাকায় এই রাস্তার গুরুত্ব অপরিসীম। এই অঞ্চলে ভালো আলুচাষ হয়। এখন জমি ফাঁকা। জানা গেল, ইন্টারনেটের দৌলতে আগাম আবহা‌ওয়ার পূর্বাভাস পেয়ে চাষিরা আলু তুলে বিক্রি করে দিয়েছেন। সামরিক বাহিনীর ক্যাম্প পর্যন্ত‌ই রাস্তা পরিষ্কার। এর পর গাড়ি আর বেশি দূর এগোতে পারল না।

ফিরে আসার জন্য গাড়ি ব্যাক করতে লাগল। কিন্তু জমাট বরফে চাকা স্কিড করে একেবারে খাদের ধারে। সারথি বাপি চরম দক্ষতায় ব্রেক কষল। এর পর? গাড়ি চালু করলে চাকা বরফের উপর ঘুরে ঘুরে আর‌ও হড়কে যাবে। সারথি জানালেন, অন্তত পাঁচ জন যদি গাড়ি ঠেলতে পারে তবেই গাড়ি সোজা করা যাবে।  আমরা চললাম সামরিক ক্যাম্পের উদ্দেশে, ওঁদের সাহায্য যদি পাওয়া যায়, সেই আশায়। দেখা হয়ে গেল যমুনোত্রী থেকে আসা কয়েক জনের সঙ্গে। ওঁরাও চলেছেন মানাগ্রাম। ওঁরা রাজি হলেন। দলে আমরা সাত জন। প্রথমে গাড়ির সামনে থেকে ঠেলা, পরে পিছন থেকে ঠেলা। পা হড়কে যাচ্ছে, তবুও পরিশ্রম কাজে এল।             

আরও পড়ুন ওখরে-হিলে-ভার্সে, যেন মেঘ-বালিকার গল্প

বদরীনাথ ঢোকার চৌকিতে আটকে দেওয়া হল। নীচের রাস্তায় গলা জল রাত্রে জমে গিয়ে বিপজ্জনক অবস্থা। অ্যাক্সিডেন্টের আশঙ্কা প্রবল। রোদে বরফ গলে গেলে গাড়ি ছাড়া হবে। অগত্যা অপেক্ষা। নেমে পায়চারি করা ছাড়া উপায় নেই। হঠাৎ কিছু ব্যস্ততা চোখে পড়ল। একটা গাড়ি ছেড়ে দে‌ওয়া হল। যাত্রী মুকেশ আম্বানি। কিছুক্ষণ পর ওঁকে নিয়ে হেলিকপ্টার উড়ে গেল। গতকালের হেলিকপ্টার-রহস্যের সমাধান।

আবার অপেক্ষা। সকাল দশটা নাগাদ নীচে থেকে গাড়ি আসতে শুরু করল। স্থানীয় প্রশাসনের গাড়ি এসে সবুজ সংকেত দেওয়ার পর আমাদের যাত্রা শুরু হল। তুষারাবৃত বদরীনাথকে প্রণাম জানিয়ে এগিয়ে চললাম পরবর্তী গন্তব্যের দিকে। (চলবে)

ছবি: লেখক 

 

1 Comments
Share
the-mysterious-silk-route-last-part-returning-home-from-gangtok

sudip paul
সুদীপ পাল

গ্যাংটকের হোটেলে ঘরগুলো খুব সুন্দর পজিশনে ছিল। বড়ো বড়ো জানলা দিয়ে দূরের পাহাড় দেখা যায়। পরে জেনেছিলাম ওই পাহাড়েই বোনঝাকরি ফলস-সহ কিছু ট্যুরিস্ট স্পট আছে। যদিও জানলা দিয়ে বিশাল সবুজ পাহাড় ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। এমনকি পাহাড়ের গায়ে কোনো বাড়িঘরও দেখা যাচ্ছে না।

ঝটপট ব্যাগপত্র রেখে ঘরে তালা মেরে ডাইনিং হলে চলে এলাম। এখন ৩টে বাজে। খিদেয় পেট জ্বলছে। এই ট্যুরে এই প্রথম মাছ খেলাম। হোটেলের মালিক ও ম্যানেজার দু’জনেই বাঙালি, তাই বেশ একটা স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করছি।  খাওয়াপর্ব মিটে যাওয়ার পর ভূপালকে বিদায় জানানোর পালা। সত্যি এই ট্যুরে ও না থাকলে হয়তো ওই পথ পুরো কভার করে আসতে পারতাম না।

আরও পড়ুন রহস্যময় রেশম পথ / পর্ব ১০ : কুপুপ থেকে গ্যাংটক

ক্যালেন্ডারে দেখেছিলাম আজ বুদ্ধপূর্ণিমা। তাই ভেবেছিলাম, পুজোপাঠ ও উৎসব দেখার জন্য রুমটেক মনাস্টেরি যাব। কিন্তু হোটেল-মালিক কোথাও ফোন করার পর জানালেন, পূর্ণিমা আজ সকালেই ছেড়ে গিয়েছে। প্রোগ্রাম সব কাল ছিল, আজ কোনো প্রোগ্রাম নেই। মনটা দমে গেল।

MG marg in the evening
বৃষ্টিভেজা সন্ধের এম জি মার্গ।

হতচ্ছাড়া বৃষ্টি যেন পিছু ছাড়ে না। টিপ টিপ করে পড়ছে। বৃষ্টির মধ্যেই ছাতা চলে এলাম এমজি মার্গে। আলো ঝলমলে এমজি মার্গ, গ্যাংটকের ম্যাল। বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট, বসার জায়গা সব ভিজে গিয়েছে। রাস্তার দু’দিকে হরেক রকম সম্ভার নিয়ে সাজানোগোছানো প্রচুর দোকান। বৃষ্টির মধ্যেই রাস্তায় মানুষের ঢল। অধিকাংশই বাঙালি ট্যুরিস্ট। আমরাও সেই দলে মিশে গেলাম। দু’ ঘণ্টা হাঁটাহাঁটি করে পায়ের অবস্থা খারাপ। তাই ১০০ টাকা দিয়ে ট্যাক্সি ভাড়া করে হোটেলে ফিরে এলাম।

আমাদের কাররওই এটা প্রথম বার গ্যাংটকভ্রমণ নয়, জনপ্রিয় স্পটগুলো সবারই ঘোরা। অথচ কালকের পুরো দিনটা আমাদের হাতে। হোটেলবন্দি হয়ে থাকার কোনো মানেই হয় না। তাই অনেক মাথা ঘামিয়ে কালকের ভ্রমণসূচি বানালাম –  ইঞ্চে মনাস্ট্রি, দো দ্রুল চোর্তেন, গ্যাংটক ফ্লাওয়ার একজিবিশন সেন্টার আর ইনস্টিটিউট অফ টিবেটোলজি। রাতের খেতে যাওয়ার আগে ম্যানেজারকে দিয়ে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করলাম।

enchey monastery
ইঞ্চে মনাস্টেরি।

পরের দিন ৯টার মধ্যে স্নান সেরে প্রাতরাশ সারা। গাড়ি সময়মতো চলে এসেছে। আমাদের প্রথম গন্তব্য আপার গ্যাংটকে, ইঞ্চে মনাস্টেরিতে।

আপার গ্যাংটক অভিজাত এলাকা। মন্ত্রী থেকে শুরু করে বড়ো বড়ো সরকারি পদাধিকারীরা এখানে থাকেন। জায়গাটাও বেশ সুন্দর। রাস্তার ধারে পাইন গাছের সারি। এ সব দেখতে দেখতে চলে এলাম ইঞ্চে মনাস্টেরি। নানা রঙের তিব্বতি কলকা ফটকে। গাছপালায় ঢাকা পথ ধরে অনেকটা হেঁটে যেতে হয়। হেঁটে যাওয়ার পথে বাঁ দিকের মনোমুগ্ধকর নিসর্গ দেখা যায়। তবে যে হারে ঘরবাড়ি তৈরি হচ্ছে, এ দৃশ্য আর কত দিন দেখা যাবে জানি না।

view from enchey monastery
ইঞ্চে মনাস্টেরি থেকে।

১৮৪০ সালে তিব্বতি লামা দ্রুপথ্রব কার্পো এই গুম্ফাটি নির্মাণ করেন। শোনা যায় তিনি দৈবক্ষমতা বলে উড়তে পারতেন। এর পর ১৯০৮ সালে তখনকার ১০ম রাজা সিকিয়ং টুলকু এই গুম্ফার পুনর্নির্মাণ করেন। সিকিয়ং টুলকু গুম্ফার যে রূপ দান করেন আমরা এখন সেটাই দেখতে পাই। পথের দু’ পাশেই রঙিন প্রার্থনাপতাকা ও প্রার্থনাচক্র সারিবদ্ধ ভাবে লাগানো আছে। ডান দিকের চক্র ঘোরাতে ঘোরাতে মনাস্টেরিতে  যেতে হয় এবং বিপরীত দিকের চক্রগুলো ঘোরাতে ঘোরাতে ফিরতে হয়।

বেশ বড়ো গুম্ফা। জুতো খুলে সাত ধাপ সিঁড়ি বেয়ে ভিতরে ঢুকলাম। বিশাল বুদ্ধমূর্তি মুর্তি। ভিতরে চলার পথের দু’ পাশে পাঁচ জন করে মোট দশ জন সন্ন্যাসী মুখোমুখি বসে মন্ত্রপাঠ করছেন। তাঁদের মন্ত্রোচ্চারণের সুর মুগ্ধ হয়ে বসে শুনতে হয়। এত সুন্দর ছন্দ আমি কখনও শুনেছি বলে মনে পড়ে না। তন্ময় হয়ে ধীর পায়ে তাঁদের সামনে দিয়ে মূর্তির কাছে এলাম। তিব্বতি কারুকার্য করা বেদিতে অনেক বাতি জ্বলছে। প্রচুর ফুল দিয়ে সাজানো। ভিতরের দেওয়ালেও তিব্বতি কারুকার্য। মন্ত্রোচ্চারণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনলাম। তার পর বেরিয়ে এলাম। কানে তখনও বাজছে সেই সুর। কয়েকটা মিনিট মনের আবহই পালটে দিল।

 flower exhibition centre
ফ্লাওয়ার একজিবিশন সেন্টার।

এ বারের গন্তব্য গ্যাংটক ফ্লাওয়ার একজিবিশন সেন্টার। টিকিট কেটে প্রবেশ। ভিতরে ঢুকেই চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। কত রকমের কত ফুল রে ভাই! কলকাতায় শীতকালে কিছু পুষ্পপ্রদর্শনী দেখেছি, কিন্তু এত ফুলের সমাহার দেখিনি। চতুর্দিক আলো করে আছে বিভিন্ন রঙের ফুল। আমরা যেন ফুল বাগিচার মৌমাছি । কোন দিকে কোন ফুলের কাছে যাব তা যেন ঠিক করতে পারছি না।

 flower exhibition centre 2
ফুলের জলসা।

ঘন্টা খানেক ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়িয়ে বেরিয়ে এলাম। কিন্তু গাড়ি কথায় গেল? সারথিকে ফোন করে জানলাম গাড়ি যেখানে আছে সেখানে যেতে আমাদের হাফ কিমি হাঁটতে হবে। গ্যাংটকের ট্র্যাফিক পুলিশ বেশ কড়া। রাস্তার ধারে ফাঁকা জায়গা রয়েছে। তা সত্ত্বেও পার্কিং-এ গাড়ি রাখা বাধ্যতামূলক। হাঁটতে হাঁটতে গাড়ির কাছে এলাম। সুন্দর সাজানো গোছানো শহর, গাছে ঢাকা অথচ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তা। 

near flower exhibition centre
ফ্লাওয়ার একজিবিশন সেন্টারের কাছে।

সারথি জানালেন, এ বারের গন্তব্য দো দ্রুল চোর্তেন। চোর্তেনের কাছে পৌঁছে গাড়ি থেকে নেমে কিছুটা হাঁটতে হয়। হাঁটতে হাঁটতে এই স্তুপ সম্পর্কে যেটুকু জানি সেটা বলি। দ্রোদুল চোর্তেন ১৯৪৫ সালে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের নিংমা সম্প্রদায়ের প্রধান ত্রুলসিক রিনপোচে নির্মাণ করেছিলেন। তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মের চারটি প্রধান সম্প্রদায় হল নিংমা, কাগিউ, শাক্য ও গেলুগ। নিংমা শব্দের অর্থ হল প্রাচীন। এখানে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের অনেক দুষ্প্রাপ্য পুথি রাখা আছে। 

dro dul chorten
দ্রো দুল চোর্তেন।

ভিতরে ঢুকে স্তূপগুলোর ছবি তুললাম। দু’জন সন্ন্যাসীকে দেখে এগিয়ে গেলাম। নমস্কার জানিয়ে এই চোর্তেন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলাম। এই চোর্তেনের প্রধানের সঙ্গে দেখা করার পরামর্শ দিয়ে তাঁরা চলে গেলেন। আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁদের চলে যাওয়া দেখলাম। 

মৌসুমীকে সঙ্গে নিয়ে চোর্তেনের অফিসে প্রধান আধিকারিকের কাছে এলাম। তাঁর অনুমতি নিয়ে অফিসের ভিতরে ঢুকলাম। সাজানো-গোছানো ঘর। দামি চেয়ার-টেবিলে বসে আধিকারিক একজন সন্ন্যাসীর সঙ্গে কথা বলছিলেন। আমরা যাওয়ার পর উঠে দাঁড়ালেন, তবে তা আমাদের প্রতি সৌজন্যতা প্রকাশ করার জন্য নয়, বাইরে বেরোনোর জন্য।  আমাদের আসার কারণ জানালাম। সব শুনে তিনি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকলেন। তার পর যা বললেন তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। ওঁর মোদ্দা কথা, উনি এখানে নতুন এসেছেন। এখানকার চোর্তেন সম্পর্কে কিছু জানেন না। এ সম্পর্কে কোনো বুকলেটও নেই। কিছু জানতে হলে গুগুল সার্চ করতে হবে। 

ব্যথিত হলাম। বৌদ্ধধর্মকে আমি শ্রদ্ধা করি। এই ধর্মে শিক্ষার একটা আলাদা গুরুত্ব আছে। বৌদ্ধ সংস্কৃতি আমাদের অনেক কিছু শেখায় কিন্তু আজ যা অভিজ্ঞতা হল তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। 

 institute of tibetology
ইনস্টিটিউট অব টিবেটোলজি।

চোর্তেন থেকে বেরিয়ে এলাম। কিছুটা হেঁটেই ইনস্টিটিউট অফ টিবেটোলাজি। চোর্তেন যাওয়ার সময় এর পাশ দিয়েই যেতে হয়। আগে চোর্তেন দেখে এখন ফেরার পথে ঢুকছি। সত্যজিৎ রায়ের ‘গ্যাংটকে গণ্ডগোল’-এ এই জায়গার নাম পাই। গল্পে ‘যমন্তক’ নামে এক বুদ্ধমূর্তির উল্লেখ আছে যার  ৯টা মাথা ও ৩৪টা হাত। এখানে কি সেই মূর্তির দেখা পাব? নাকি সবটাই নিছক গল্প! 

মাথাপিছু ৪০ টাকা করে টিকিট কেটে ঢুকলাম। ভিতরে ফটো তোলা নিষেধ। মাঝারি সাইজের হলঘরে বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য জিনিস রাখা আছে।  প্রাচীন বই, পুথি, চিত্র, অস্ত্র, মুদ্রা, কার্পেট/কাঁথা, মূর্তি, বাসন ইত্যাদি। ইংরাজিতে তার বিবরণ ও লেখা আছে।

 on the way to institute of tibetology
ইনস্টিটিউট অব টিবেটোলজির পথে।

কিন্তু কোথায় যমন্তক? গল্পের বইয়ে সবটাই কি গল্প? এই সব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে যাচ্ছি, হঠাৎ সামনের দেওয়ালে একটা মূর্তি চোখে পড়ল। এটা কী? হ্যাঁ, এই তো সেই যমন্তক! নাহ্‌, সব গল্প ছিল না। গুনে দেখলাম ফুট খানেক বা তার সামান্য কিছু বড়ো মূর্তিটার ৫ ধাপে মোট ১১টা মাথা এবং গোল করে সাজানো মোট ৪২টা হাত।

ইনস্টিটিউট অফ টিবেটোলাজি থেকে বেরিয়ে এলাম। রাস্তার ও পারে একটা স্মারকের দোকান। সেখানে ঢুকলাম। সবই প্রায় বৌদ্ধ বা তিব্বতি সংস্কৃতির দ্রব্য।  এটা ওটা দেখলাম, দাম করলাম। দাম শুনেই পকেটে আগুন লেগে যাচ্ছে। তবুও সাধ্যমতো দু’টো জিনিস কিনলাম। একটা ড্রাগন আর একটা বুদ্ধমূর্তি। এখনকার মতো ঘোরা শেষ করে ফিরে চললাম হোটেলে। 

একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার পথে। আকাশের অবস্থা খুব একটা ভালো না। পাহাড়ে ওঠা ইস্তক ভালো আবহাওয়া পাইনি বললেই চলে। সব সময় আকাশের মুখ ব্যাজার। কোনো জায়গা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার টিকিটাও দেখতে দিল না!

লাল মার্কেটে চক্কর মেরে এলাম মূল ম্যালে। এ-দোকান ও-দোকান ঘুরছি। অল্পবিস্তর কেনাকাটি হয়েছে। গ্যাংটকে এসে  অব্দি মোমো খাওয়া হয়নি। মোমো আমার খুব পছন্দের খাবার। আমি আজ মোমো খাবই পণ করেছি। ও দিকে অরূপদাও চা চা করছে। অতএব মোমো তো খাওয়া হলই, সঙ্গে শিঙাড়া, মিষ্টি, কফি – কিছুই বাদ গেল না।

বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে। এ বৃষ্টি আরও বাড়বে। ছাতাও আনিনি, ঘোরাঘুরি মাথায় উঠল। হাঁটার তো প্রশ্নই নেই, ট্যাক্সি খুঁজতে খুঁজতেই জোর বৃষ্টি এল।  বেশি টাকা কবুল করে একটা ট্যাক্সি ঠিক করলাম। ততক্ষণে ভিজে গিয়ে আমার অবস্থা  লর্ড চমচমের মতো।

view from of hotel
ততক্ষণে কাঞ্চনজঙ্ঘা আবার মুখ লুকিয়েছে।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই জানলার পর্দা সরিয়ে রোজকার মতোই বাইরের দিকে তাকালাম। বাইরে তাকিয়েই চক্ষু স্থির! এ কী দেখছি আমি! অবশেষে কাঞ্চনজঙ্ঘা! সামনের পাহাড়ের পিছনে লুকিয়ে থেকে কেবল মাথাটা বাড়িয়ে উঁকি মেরে আমাদের দেখছে কাঞ্চন। সমগ্র ট্যুরের মাঝে তাকে খুঁজে পাইনি, আজ ফেরার দিন তাকে ধরে ফেলেছি। না না, ভুল হল। আমরা তাকে ধরিনি, শেষ দিন বলে সেই-ই আমাদের কাছে ধরা দিল। 

আনন্দে সবাইকে ডেকে দেখালাম। না-ই বা দেখা গেল পুরো কাঞ্চনকে, কিছুটা তো দেখা যাচ্ছে। সবাই সম্মোহিতের মতো সে দিকে তাকিয়ে রইলাম। অনেকক্ষণ ধরে দেখেও সাধ মেটে না, কিন্তু উপায় নেই। এখনও কিছু গোছগাছ বাকি। একটু পরেই তো রওনা হতে হবে বাড়ির পথে। (শেষ)

ট্যুর প্ল্যান-

দিন ১ – এনজেপি থেকে রামধুরা। রাত্রিবাস।

দিন ২ – সকালে বেরিয়ে ইচ্ছেগাঁও, সিলারিগাঁও ঘুরে রিশিখোলায় রাত্রিবাস।

দিন ৩ – সকালে বেরিয়ে অরিটার লেক ঘুরে রংলি থেকে পারমিশন করে জুলুক। রাত্রিবাস।

দিন ৪ – সকালেই বেরিয়ে জুলুক ভিউ পয়েন্ট, থাম্বি ভিউ পয়েন্ট, নাথাং ভ্যালি, বাবা মন্দির, কুপুপ লেক, ছাঙ্গু লেক হয়ে সোজা গ্যাংটক। রাত্রিবাস।

দিন ৫ – গ্যাংটকে বিশ্রাম।

দিন ৬- এনজেপি থেকে ফেরার ট্রেন ধরা।

ছবি লেখক

0 Comments
Share
the-mysterious-silk-route-part-10-from-kupup-to-gangtok

sudip paul
সুদীপ পাল

পুরোনো বাবা মন্দির থেকে মাত্র কয়েক কিমি রাস্তা, আধ ঘণ্টায় চলে এলাম কুপুপ লেক। বরফ গলতে শুরু করেছে। রাস্তায় কাদা-কাদা ভাব। অত্যন্ত স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়া। হালকা কুয়াশায় চারিদিকে একটা বিবর্ণতার প্রলেপ। এটাই এই পথের সর্বোচ্চ স্থান, ১৪০০০ ফুট।

আরও পড়ুন রহস্যময় রেশম পথ / পর্ব ৯ : বরফের রাজ্যে

গাড়ি থেকে নেমে এলাম। জুতো অনেক আগেই ভিজে গিয়ে রসবড়া হয়ে গিয়েছে, সুতরাং আর জুতো ভেজার ভয় নেই। অরূপদাও নামল। বাকিরা গাড়ির বন্ধ জানলার ভিতর থেকে কুপুপ লেক দর্শন করেই সন্তুষ্ট। আমাদের পিছনে পিছনে মহিলাদের গাড়িটাও চলে এসেছে। ওঁরাও নেমে পড়লেন। এ-দিক ও-দিক কিছু ফোটো তোলার পর আমার ক্যামেরাটা ওঁদেরই একজনের শ্রীহস্তে সমর্পণ করলাম আমাদের দু’জনের চাঁদবদনের ছবি তোলার জন্য। 

kupup lake
কুপুপ লেক।

জায়গাটার নাম কুপুপ, সেখান থেকেই কুপুপ লেক নামে পরিচিতি। আসল নাম এলিফ্যান্ট লেক। উপর থেকে লেকের আকার হাতির মতো দেখতে লাগে। লেকের বাম তীর বরাবর জেলেপ-লা যাওয়ার রাস্তা সরু ফিতের মতো দেখা যাচ্ছে। এ পথ এখন সেনাবাহিনীর দখলে, সাধারণ মানুষের যাওয়া নিষিদ্ধ। ভারত, চিন ও ভুটানের সংযোগস্থলে ডোকলা সীমান্ত। এই ডোকলা নিয়ে বছরখানেক ধরে ভারত ও চিনের মধ্যে উত্তপ্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আর এই পথ হল ডোকলা যাওয়ার।

চারিদিক কুয়াশাচ্ছন্ন ও বরফাবৃত হয়ে থাকার কারণে লেকের জল কাকচক্ষুর মতো কালো দেখাচ্ছে।  এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে মিলিটারি ক্যাম্প ও বিশ্বের সর্বোচ্চ ইয়াক গলফ কোর্স।

আমরা ফিরতেই ভূপাল গাড়ি ছেড়ে দিল। সেই সঙ্গে জানিয়ে দিল, আমরা এ বার মিলিটারি ক্যাম্প এরিয়ার ভিতর দিয়ে যাব। কেউ যেন কোনো ফোটো না তুলি। ধরা পড়লে ক্যামেরা বাজেয়াপ্ত হওয়া, জেল প্রভৃতি অনেক কিছুই সাজা হতে পারে। ক্যামেরা অফ করে রেখে দিলাম। 

yak golf course and ice hockey ground
ইয়াক গলফ কোর্স ও আইস হকির মাঠ।

সেনাশিবির পেরিয়ে আসার পরেই ডান দিকে বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তর পেলাম। এটাই ইয়াক গলফ কোর্স। ইয়াক গলফ কোর্সের এক ধারে আইস হকি ফিল্ড। আইস হকি ফিল্ডের পিছনে একটা গ্রাম দেখা যাচ্ছে । ২০/২৫ টা বাড়ি নিয়ে এই গ্রাম। এই গ্রামে বাইরের লোক বা ট্যুরিস্টদের থাকার অনুমতি দেওয়া হয় না। এখানে থাকার জন্য গ্রামবাসীদের প্রতি মাসেই অনুমতি নবীকরণ করাতে হয়। 

বরফ গলা শুরু হয়ে গিয়েছে। চারিদিক থেকে জল বয়ে যাচ্ছে ফলে একটা কেমন একঘেয়ে ঝিম ধরা আওয়াজ। এক সময় ইয়াক গলফ কোর্স আড়ালে চলে গেল। আমাদের বাঁ পাশে বিশাল এক খাদ রাস্তা বরাবর চলেছে। খাদে ও পাহাড়ের গায়ে হাজার হাজার পাইন গাছ। ভূপাল জানাল, ওই খাদেই কোনো এক জায়গায় রয়েছে মেমেঞ্চ লেক। মেমেঞ্চ লেকে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল কিন্তু এখন সম্ভব নয়। কারণ, ২/৩ কিমি ট্রেক করে লেকে পৌঁছোতে হয়।

new baba mandir
নতুন বাবা মন্দির।

চলে এলাম নতুন বাবা মন্দিরে। আমরা পুরোনো বাবা মন্দির দেখে আসছি, যা আসল বাবা মন্দির। দীর্ঘ জার্নিতে শরীরের সঙ্গে মনেও একটা ক্লান্তি এসেছে। তাই কেউ নামতে রাজি হল না। মন্দিরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ি থেকেই দেখে নিলাম। ভিতরে সিংহাসনে হরভজন সিং-এর ছবি। পুরোনো বাবা মন্দির অনেক উঁচুতে আর অনেকটাই দূরে। সবাই সেখানে যেতে পারেন না। তাই অনেকটা নীচে এখানে এই নতুন বাবামন্দির তৈরি হয়েছে।

বরফঢাকা পরিবেশের মধ্যে চলেছি। এ দিকে রূপের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। ওর জ্বর এসেছিল লক্ষ্মণচকে। নাথাং ভ্যালি পৌঁছোনোর আগেই ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। এখন ক্লান্তির কারণে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে সম্ভবত। ওকে কোকা ৩০ খাইয়ে হাতে কর্পূরের শিশি ধরিয়ে দেওয়া হল শোঁকার জন্য। এই দু’টো জিনিসই শ্বাসকষ্টে খুব কাজের।

hangu lake with welcome gate
হাঙ্গু লেক ও ওয়েলকাম গেট।

আমাদের গাড়ি হাঙ্গু লেকের (ছাঙ্গু নয়) সামনে চলে এল। এটাই হল পৃথিবীর উচ্চতম লেক যেখানে বোটিং হয়। একটা ওয়েলকাম গেট রয়েছে। গেটে লেখা অ্যালপাইন পার্ক। কোত্থাও কেউ নেই। লেকে যাওয়ার জন্য প্রবেশমূল্য লাগে কিনা জানি না। একটাও বোট চোখে পড়ল না। বরফে চাপা পড়ে থাকতে পারে। 

ganju lama war museum
গঞ্জু লামা ওঅর মিউজিয়াম।

হাঙ্গু লেকের পাড় বরাবর রাস্তা। লেক পেরিয়ে কিছুটা আসার পর বাঁ দিকে পড়ল গঞ্জু লামা ওঅর মিউজিয়াম। ভারত-চিন যুদ্ধের স্মৃতিতে এই মিউজিয়াম। মিউজিয়াম সম্ভবত খোলা আছে কিন্তু কোনো জনপ্রাণীও নেই। তবে এখন মিউজিয়াম দেখতে যাওয়ার মতো ধৈর্যও আমাদের নেই।

কিছু পরে রাস্তার ডান দিকে নাথুলা যাওয়ার রাস্তা উপর দিকে উঠে গিয়েছে দেখলাম। রাস্তার শুরুতেই একটা ওয়েলকাম গেট। নাথুলা যাওয়ার জন্য আলাদা অনুমতি নিতে হয় গ্যাংটক থেকে। আমাদের সেই অনুমতি নেই, তাই যাওয়ার প্রশ্নই নেই। 

sherthang
শেরথাং।

রাস্তার বাঁ দিকে আবার এক লেকের দেখা পেলাম, নাম মঞ্জু লেক, হাঙ্গু বা ছাঙ্গুর তুলনায় অনেক ছোটো। লেকের জল পুরো হোয়াইট ওয়াশ হয়ে গিয়েছে। রাস্তার ধারে ৬ ইঞ্চি পুরু বরফ। এখানেও গাড়ি না থামিয়া চলে এলাম শেরথাং। নাথুলা বর্ডার দিয়ে যে সব ট্যুরিস্ট কৈলাস-মানস সরবোর যান তাঁদের জন্য সুন্দর সুন্দর কিছু ঘর করা আছে এখানে। অর্থাৎ তাঁদের আক্লাইমেটাইজ করার জন্য ব্যবস্থা। দুধ-সাদা বাড়িগুলির সবুজ ছাদ এখন বরফে সাদা।

গাড়ি চলছে থেগুর উপর দিয়ে। ছাঙ্গু এখনও ৪ কিমি দূরে। হঠাৎ ‘মোনাল’,  ‘মোনাল’, বলে ভূপাল সজোরে গাড়ি ব্রেক কষল। খ্যাসসসস করে আওয়াজ তুলে বরফে ফুট খানেক হড়কে গিয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। চেয়ে দেখি সামনে ডান দিকে সিকিমের রাজ্য পাখি মোনাল। হাঁসের মতোই আকার। দেহের গঠন ময়ুরের মতো। সবুজ মাথায় ময়ুরের মতোই একটা ঝুঁটি। সামান্য লম্বা গলায় উজ্জ্বল লাল ও হলুদ রঙ থেকে যেন দ্যুতি বেরোচ্ছে। উজ্জ্বল ঘন নীল রঙের দেহ। পানকৌড়ির লেজের মতো লেজ। লেজের শেষ দিকটা কমলা রঙ। মোনালের সারা শরীরের সমস্ত রঙই মেটালিক। অপুর্ব তার রূপ। যারা মোনাল চেনে না তারা ময়ূর বলে ভুল করতে পারে।

monal
মোনালের ছবি তোলার ব্যর্থ চেষ্টা।

জীবনে প্রথম মোনাল দেখলাম। পাখিটা ব্রেকের শব্দে ও আকস্মিক গাড়ি থামার কারণে ভয় পেয়ে ডান দিকের পাহাড় বেয়ে দ্রুত উঠতে শুরু করেছে। আমি বিহ্বল হয়ে তাকে দেখছি। গলায় ক্যামেরা ঝুলছে কিন্তু ফোটো তোলার কথা ভুলে গিয়েছি।

ক্যামেরা বার করুন – ভূপালের কথায় সংবিৎ ফিরল। ক্যামেরার ব্যাগ থেকে দ্রুত ক্যামেরা বার করে অন করতে করতে সে আরও খানিকটা উপরে। মোটামুটি ক্যামেরার রেঞ্জের বাইরে। তার উপর উজ্জ্বল সাদা আকাশের ব্যাকগ্রাউন্ড। ছবি কালো আসছে, তবুও শট নিলাম। মনের মধ্যে মিশ্র অনুভুতি। এক দিকে মোনাল দেখার আনন্দ অপর দিকে তাকে ঠিকমতো ক্যামেরাবন্দি করতে না পারার দুঃখ।  

মোনাল চোখের আড়ালে যেতেই আবার যাত্রা শুরু। রাস্তার বাম দিকে গভীর খাদ। খাদের অপারে উত্তুঙ্গ পর্বতশ্রেণি মাথায় বরফের মুকুট পরে দাঁড়িয়ে আছে। ওই পাহাড়শ্রেণির যে রাস্তা লেপটে আছে সেই রাস্তায় কিছুক্ষণ পরেই চলে এলাম। ছাঙ্গু লেক আর দু’ কিলোমিটার।

way to tsomgo lake
ছাঙ্গু যাওয়ার পথ।

রাস্তায় জওয়ানদের আনাগোনা দেখতে পাচ্ছি। আমরা হাত নাড়লে তাঁরাও হাত নেড়ে অভিনন্দন জানাচ্ছে। এক সময় অনেক উপর থেকে লম্বালম্বি ভাবে ছাঙ্গু লেককে দেখতে পেলাম। লেকের দু’ দিক পাহাড় দিয়ে ঘেরা। আমরা যে দিকে এখন আছি সে দিক ধরলে তিন দিক হয়। মনে হল বিশাল দৈত্যাকার সাদা রঙের এক নৌকার খোলে খানিকটা জল জমে আছে। খানিকক্ষণ বাদে বাদে ইউ টার্ন নিয়ে গাড়ি ক্রমশ নীচের দিকে নামতে থাকল। যত এগোচ্ছি লেকের আকার ততোই বড়ো হচ্ছে আমাদের চোখে।  এর আগে ২০১৫-য় গ্যাংটক থেকে ছাঙ্গু লেক পর্যন্ত আসতে পেরেছিলাম। বরফের কারণে রাস্তা বন্ধ থাকায় আমরা আর যেতে পারিনি। এ বারেও যাঁরা নাথুলা বা বাবা মন্দির যাওয়ার জন্য গ্যাংটক থেকে আসছেন তাঁদের ছাঙ্গু লেকের পরে আর যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।  আমরা বিপরীত দিক থেকে আসছি, তাই আমাদের এ পথে যাওয়ার সৌভাগ্য হল। 

tsomgo lake
রাস্তার পাশেই ছাঙ্গু লেক।

লেকের পাশে রাস্তার এক ধারে গাড়ি দাঁড়াল। সবাই নেমে পড়লাম। লেকের জলে পাশের পাহাড়শ্রেণির প্রতিবিম্ব।  ২০১৫ সালে ছাঙ্গু এত ঘিঞ্জি ছিল না। প্রচুর ঘরবাড়ি হয়েছে, রোপওয়ে চালু হয়েছে। সেবার লেকের ধার ধরে হেঁটে হেঁটে ও পারে গেছিলাম। এ বার আর সেই এনার্জি আর নেই। তা ছাড়া চারিদিকে মোটা বরফের স্তর। বরফগলা জলে ইয়াকের বিষ্ঠা মিশে যাচ্ছেতাই নোংরা হয়ে আছে।

রোপওয়ে স্টেশনে যাওয়ার সিঁড়ির কাছেই লেক থেকে একটা জলধারা বেরিয়ে এসেছে। এটাই রোরো নদী। এই নদী তিস্তার সাথে মিশেছে। মেঘলা স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায় লেকের ধারে আধ ঘণ্টা ঘোরাঘুরি করে ফটোসেশন করে গাড়িতে উঠলাম। 

market area neas tsomgo lake
ছাঙ্গু পেরিয়ে এসে বাজার এলাকা।

কয়েকটা হেয়ারপিন বেন্ড দিয়ে দু’ কিমি রাস্তা পেরিয়ে একটা বাজার এলাকা পেলাম। বাজার বলতে মূলত রেস্টুরেন্ট, শীতবস্ত্রের আর  মেমেন্টোর দোকান। একটা দোকানে মোমোর অর্ডার দিলাম। চা-ও খেতে হবে। ভেজ মোমো আমার ভীষণ পছন্দের খাবার। ভূপাল দেখি থুকপার বাটি নিয়ে বসেছে। খাওয়ার পর গরম চা-এর কাপে চুমুক। কী আরাম যে লাগল। সব ক্লান্তি যেন নিমেষে গায়েব। খাওয়ার পর্ব শেষ, আবার যাত্রা।  

 way to gangtok
গ্যাংটকের পথে ক্রমশই নেমে যাওয়া।

এই রাস্তাটাও বড়ো সুন্দর। চারিদিকে সবুজ ঘাসে মোড়া পাহাড়ের গায়ে পাইন গাছের ছড়াছড়ি। পাইন গাছের ফাঁক দিয়ে মেঘের লুকোচুরি। চলতে চলতে একটা ঝরনার সামনে থামলাম। এই ঝরনার নাম কংনসলা ওয়াটার ফল্‌স। এই জায়গা বোধহয় সারা বছরই কুয়াশাঢাকা থাকে। গাড়ি থেকে কেউ নামল না। আমি একা নেমে ঝরনার ক’টা ঝাপসা ছবি তুলে আনলাম।

temporary falls
হঠাৎ ঝরনা।

খানিকক্ষণের মধ্যেই শুরু হল ঝিমঝিম বৃষ্টিল। এই আবহাওয়ায় পাহাড়ে চলার মজা হল, রাস্তার ধারে ধারে হঠাৎ তৈরি হওয়া ঝরনা দেখতে পাওয়া যায়। আমরাও পথের ধারে তেমন কিছু ঝরনা পেলাম। ক্রমশ নীচের দিকে নামছি। গাছপালারও পরিবর্তন হচ্ছে। পাইন গাছের পাশাপাশি ঝোপঝাড় ও অন্য বড়ো গাছও চোখে পড়ছে।

ঝিমঝিমে বৃষ্টিতেই ঢুকে পড়লাম গ্যাংটকে। কিছুক্ষণ আগেও যে পরিবেশে ছিলাম তার সঙ্গে কিছুতেই যেন মেলাতে পারছি না। কংক্রিটের জঙ্গল, গাড়ির ভিড়, মানুষের কোলাহল। অসহ্য। এম জি মার্গের নীচের দিকেই আমাদের লজ। পৌঁছে গেলাম সেখানে। (চলবে)

ছবি লেখক

0 Comments
Share
1237