Browsing Category:ভ্রমণ-ছক

weekend-trip-to-bichitrapur

ভ্রমণ অনলাইন ডেস্ক: দোল-হোলি এ বার সপ্তাহের শেষে। সব মিলিয়ে চার দিন ছুটি – ২১ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ (বৃহস্পতিবার থেকে রবিবার)। হঠাৎ মনে হয়েছে কোথাও গেলে হয়? কিন্তু হাতে তো আরও মাত্র একটা সপ্তাহ। এখন কোন ট্রেনেই বা আসন পাবেন? কাছেপিঠে এমন একটা জায়গা বেছে নিলে হয় না, যেখানে যাওয়ার জন্য ট্রেনে আগাম সংরক্ষণের দরকার নেই? এমনই একটা জায়গা ওড়িশার বিচিত্রপুর। বৃহস্পতিবার ভোরেই বেরিয়ে পড়ুন, রবিবার রাতে ফিরে আসুন। তিনটে দিন উপভোগ করে আসুন বিচিত্রপুরের প্রকৃতি।  

Boating at Bichitrapur
বিচিত্রপুরে নৌকাবিহার।

কেন যাবেন বিচিত্রপুর

প্রকৃতির উপহার বিচিত্রপুর। বঙ্গোপসাগরের উপকূলে, যেখানে সুবর্ণরেখা নদী পড়েছে সাগরে, সেখানেই বিচিত্রপুর – ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের জন্য এর খ্যাতি। তা ছাড়া সমুদ্রসৈকত, ক্যাজুরিনার জঙ্গল, লাল কাঁকড়ার অভিসার তো আছেই। নৌকা চড়ে ঘুরুন ম্যানগ্রোভের জঙ্গলে। নৌকা চলে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত, ওড়িশা ইকোট্যুরিজমের ব্যবস্থাপনায়। নৌকার টিকিট পাওয়া যায় বিচিত্রপুরেই। নিরালা, নিরিবিলি বিচিত্রপুরে প্রকৃতির মাঝে থেকে উপভোগ করুন পূর্ণিমার রাত। কাছেপিঠে বেশ কিছু ঘোরার জায়গাও আছে। খড়িবিলে ওই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য বোঝার জন্য রয়েছে ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার।     

আশেপাশের আরও দ্রষ্টব্য

১। তালসারি সৈকত – ১০ কিমি

২। চন্দনেশ্বর মন্দির – ৭ কিমি, তালসারির পথেই।

udaipur beach
উদয়পুর সৈকত।

৩। উদয়পুর সৈকত – ওড়িশা-পশ্চিমবঙ্গ সীমানায়।

৪। ভূষণ্ডেশ্বর মন্দির – উপমহাদেশের সব চেয়ে বড়ো শিবলিঙ্গ, ১২ কিমি।

এ ছাড়া দিঘা, শংকরপুর, তাজপুর, মন্দারমণি তো আছেই। বিচিত্রপুর থেকে সব চেয়ে দূরের জায়গা মন্দারমণি, ৪২ কিমি।

কোথায় থাকবেন

ওড়িশা ফরেস্ট ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের ইকোট্যুরিজমের এসি কটেজ। দু’ জনের থাকার খরচ ৩৮৯৪ টাকা (কর-সহ সব কিছু নিয়ে। এর মধ্যে দু’জনের প্রাতরাশ, মধ্যাহ্নভোজ এবং রাতের খাবারের খরচ ধরা আছে। মোহনায় এক বার নৌকাবিহারের খরচও ধরা আছে।) অনলাইন বুকিং https://www.ecotourodisha.com/

কী ভাবে যাবেন

১। হাওড়া থেকে সকাল ৬টায় ধৌলি এক্সপ্রেস ধরুন, জলেশ্বর পৌঁছে দেবে সকাল ৮টা ৪৭ মিনিটে। সেখান থেকে বিচিত্রপুর ৪০ কিমি, গাড়িতে।

২। কলকাতা/হাওড়া থেকে বাসে বা ট্রেনে দিঘা চলুন। সেখান থেকে ভ্যান রিকশা, অটো বা গাড়িতে চলুন বিচিত্রপুর, ১৫ কিমি।

ecotourism cottage
ইকোট্যুরিজমের কটেজ।

কী ভাবে ফিরবেন

১। জলেশ্বরে ডাউন ধৌলি এক্সপ্রেস আসে বিকেল ৪.৫৭ মিনিটে, হাওড়া পৌঁছে দেয় রাত ৮.১৫ মিনিটে।

২। দিঘা হয়ে বাসে বা ট্রেনেও ফিরতে পারেন।

কী ভাবে ঘুরবেন

কাছেপিঠের জায়গাগুলো ভ্যানরিকশায় ঘুরে নিতে পারেন। শংকরপুর, তাজপুর, মন্দারমণি এলে গাড়ি ভাড়া করে নেবেন।      

মনে রাখবেন

১। দোলের দিন সকালের দিকে বাস চলাচল বন্ধ থাকলেও ভাড়া গাড়ি বা ট্যাক্সি পেতে অসুবিধা হয় না।

২। তবু যদি মনে করেন দোলের দিন নিজের জায়গায় কাটিয়ে পরের দিন যাবেন, সে ক্ষেত্রে বিচিত্রপুরে থাকার মেয়াদ ৩ রাত থেকে কমিয়ে ২ রাত করে নিতে পারেন।

0 Comments
Share
a-trip-yo-subhasgram-and-other-places-related-to-netaji
jahir raihan
জাহির রায়হান

সাবমেরিন। সংজ্ঞা-সহ সাবমেরিনের ব্যাখ্যা বুঝতে বুঝতেই টের পেয়েছিলাম দেশনায়কের কলজের জোর। কতই বা বয়স তখন, মেরে কেটে বারো-তেরো, ষষ্ঠ শ্রেণির হাফপ্যান্ট-পরা ছাত্র। ক্লাসে দুলালবাবু বলে চলেন, “সাবমেরিন একটি জলযান, জলে ডুবে ডুবে যায়, ওপর থেকে কিছুই বোঝা যায় না।” সেই সাবমেরিন চেপে ইংরেজদের চোখে ধুলো দিয়ে দেশান্তরী হন সুভাষ, মাতৃভূমি ভারতবর্ষকে ব্রিটিশ কবল থেকে মুক্ত করতে। মিঠুন-অমিতাভকে সরিয়ে সেই দিনই আমার বল্গা মনের নায়ক হয়ে বসেন সুভাষচন্দ্র। তার পর একটা একটা করে নতুন শ্রেণিতে উর্ত্তীর্ণ হই, আর একটু একটু করে হৃদয়াকাশে উদ্ভাসিত হতে থাকেন সুভাষচন্দ্র বোস। তাঁর ব্যাপকতা এবং দেশপ্রেম ছাড়িয়ে যায় বাকিদের। এর মধ্যেই একদিন শুনলাম, একবার বেলডাঙা এসেছিলেন তিনি। ঘটনা জানামাত্রই গর্বিত হলাম অতীতের সেই আগমনকে স্মরণ করে। শহরের নেতাজি পার্ক ও নেতাজি তরুণতীর্থের যৌথ উদ্যোগে জানুয়ারি মাসের সপ্তাহব্যাপী নেতাজি স্মরণোৎসবের তাৎপর্য ধরা দিল নব রূপে।

আরও পড়ুন পর্যটনের প্রসারে উত্তরবঙ্গে একাধিক প্রকল্পের শিলান্যাস মুখ্যমন্ত্রীর

গোটা শীত জুড়েই বঙ্গের এ-দিক ও-দিক চরকিপাকের সিদ্ধান্ত নিয়েছি গরমের গুঁতো থাকাকালীনই। তাই মিলনদা কোদালিয়া যাওয়ার কথা বললে রাজি হলাম তৎক্ষণাৎ। ২০১৭’র শেষ দিনে যখন সবাই নতুন বছরকে আবাহনের প্রস্তুতিতে মগ্ন, আমি ছুটলাম সুভাষচন্দ্রের পিতৃদেব জানকীনাথের পৈতৃকভিটে দর্শনে। প্রথমে যাব কোদালিয়া, তার পর এলগিন রোডে নেতাজিভবন। সেইমতো কাউকে কিছু না বলে একা একাই বেরোলাম অমৃতপুত্রের সন্ধানে। ভাগীরথী এক্সপ্রেস দেরি করায় সুভাষগ্রাম যাওয়ার ট্রেন পেতে দেরি হল, তবে মধ্যবর্তী সময়টুকুর সদ্ব্যবহার হল ‘জনআহার’-এর চিকেন বিরিয়ানিতে। ৭৮ টাকায় বছরের শেষ লাঞ্চ। সেই ছাত্রাবস্থা থেকেই শিয়ালদহে যাতায়াত আমার। হাতে সময় বা ট্রেনের দেরি থাকলে স্টেশনের ধাপিতে বসে বসে নানা কিসিমের লোকজন ও তাদের কাণ্ডকারখানা নাগাড়ে খেয়াল করা আমার খুব প্রিয় টাইমপাস। একটা করে ট্রেন ঢোকে আর মিছিলের মতো লোক গলগল করে বেরিয়ে হারিয়ে যায় মহানগরীর পথে পথে। এবং আশ্চর্য, নিজেরটা ছাড়া বাকিরা কোথায় কী কাজে যায় তা আমি একেবারেই জানি না।

kodalia house
কোদালিয়ার বাড়ি, সংস্কারের আগে।

গড়িয়ায় বছর তিনেক ছিলাম আমি, তখন নিউ গড়িয়া স্টেশনটাই ছিল না, ছিল না মেট্রো রেলের বাহাদুরিও। বাঘাযতীন ছাড়ালেই তখনও তেপান্তরের মাঠঘাট চোখে পড়ত, অট্টালিকার বাড়বাড়ন্ত ছিল না। আর একটা ব্যাপারে অবাক হতাম, গড়িয়ার দুই দিকের সিগন্যালই সর্বদা হলুদ হয়েই থাকত, ট্রেন এসেই যেত, এসেই যেত। এখনও আমার বিশ্বাস, সোনারপুর থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত ট্রেন ধরতে কেউই সময় দেখে না, জানে স্টেশনে গেলেই কোনো না কোনো লোকাল পেয়ে যাব ঠিক। ডায়মন্ড হারবার লোকাল গড়িয়া ঢুকতেই এ-দিক সে-দিক উঁকিঝুকি মারলাম, কিছুই ঠাহর হল না। মিলনদা বলে দিয়েছিল, সোনারপুরের পরই সুভাষগ্রাম। সেইমতো গুতোঁগুঁতি বাঁচিয়ে নিলাম নামার প্রস্তুতি। এত ভিড়ের মধ্যেও পল্টু ব্যাটার অস্থিরতা টের পাচ্ছি, সে বুঝি সেই সন্ধিক্ষণের নাগাল পেয়ে গিয়েছে, যার কারণে এখানে আসা। রাজপুর-সোনারপুর পৌরসভার অন্তর্গত সুভাষগ্রাম। রিকশায় উঠে দেখি, চালক পা তুলে হ্যান্ডেল পাকড়ে বসে রয়েছে আর রিকশা চলছে আপন গতিতে। সাধারণ রিকশার এই অসাধারণ আচরণ এর আগে দেখি নাই কখনও। হাঁটতেই চাইছিলাম, কিন্তু এক কাকাবাবুর খপ্পরে পড়েই এই রিকশাবিলাস, উনি লম্বা করে জানালেন চল্লিশ মিনিট হাঁটলে তবেই বোসবাড়ি, অগত্যা!

আরও পড়ুন চণ্ডীদাসের প্রেম ও নানুর

নেতাজি সুভাষের সম্মানেই যে চাংড়িপোতা হয়েছে সুভাষগ্রাম, সে কথা না জানালেও চলে। রিকশা চড়ে রবিবারের সুভাষগ্রামের মহল্লা নজরে রাখতে রাখতেই এগিয়ে চলি হরনাথ বসুর বাড়ির দিকে, যাঁর নাতিকে আজও খুঁজে ফেরে বাঙালি, বিশ্বাস করে দেশের এই দুর্দশায় তিনি নিশ্চিত ভাবেই ফিরে আসবেন, মৃ্ত্যু-বিজ্ঞান হেরে যায় বাঙালি আবেগের কাছে, বারবার। তরুণ সংঘের মাঠ পার করে বাবুদাকে পাওয়া গেল। সৌম্যদর্শন ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দিলেন সেই ভিটেটিকে যার মাটি সৃষ্টি করেছিল এক আপসহীন অগ্নিপুত্রের যিনি অত্যাচারীর চোখে চোখ রেখে কথা বলতে জানতেন। হলুদ রঙা দোতলা বাড়ি, বড়ো বারান্দা, বেশ কিছু ছাদের অংশ ভেঙে পড়েছে, ঘরগুলি তালাবন্ধ। খোলা জানলার ফাঁক দিয়ে কিছু আসবাবপত্রও চোখে পড়ে। বাড়ির সামনেও অনেকটা ফাঁকা জায়গা। ক্ষয়ে যাওয়া ইটগুলিকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়, কেমন ছিল বোসেদের ঘরকন্না? দাদুর বাড়ির ঘরময়, বারান্দা জুড়ে, বাগানে, হামাগুড়ি, দৌড়োদৌড়ি করেছে কি ছোট্ট সুভাষ? কটকে পড়াশোনার ফাঁকে, ছুটিছাটাতে বা বার্ষিক পরীক্ষার শেষে কখনও কি এসেছে দাদু-ঠাকুমার কাছে? কেমনধারা ছিল তার আবদার? কী ভাবে সে পেল এত সাহস? এত শৌর্য? এত তাপ? নিরুত্তর চুনসুরকি ধুলো হয়ে ঝরে পড়ে অবিরত, আমি বসে পড়ি বারান্দায়, ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করি সেই কালকে যা এখন মহাকালের কবলে।

netaji bhawan
এলগিন রোডে নেতাজিভবন।

শঙ্কর ঘোষ এ বাড়ির বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক। বংশপরম্পরায় তাঁরা এই কাজ করে আসছেন। তিনিই জানালেন, রাজ্য সরকারের পূর্ত দফতর বাড়িটি অধিগ্রহণ করেছে, সংস্কার ও সংরক্ষণের কাজও শুরু হবে শীঘ্র। এ তথ্যে নিশ্চিন্ত হয়ে বেরিয়ে এলাম। (এই দু’ বছরে সেই ভবনের সংস্কার হয়েছে।) বাবুদা তখনও ওখানে বসেছিলেন, বললেন এত দূর থেকে এসেছেন বোসেদের পারিবারিক নারায়ণ মন্দির দেখে যান। তাঁর কথামতো ঠাকুরদালান দেখে নিলাম, দুর্গাপুজোও হয় সেখানে, বোস পরিবারের বর্তমান সন্তানসন্ততিরা নাকি এখনও একত্রিত হন পুজোর ক’টা দিন। নির্জন দালানচত্বরটি আমার বেশ লাগল, অনেকক্ষণ বসে রইলাম চুপচাপ, একা একাই। কান পেতে শোনার চেষ্টা করলাম হরনাথ বোস, জানকীনাথ বোস ও তাঁদের পরিবারবর্গের পুজোকালীন হইচই, হাঁকডাক, কলরব যা কালের অভিঘাতে হয়েছে নিরুদ্দেশ। মন্দিরের গেটটিতে লিপিবদ্ধ রয়েছে হরনাথ লজ, পাশেই কোদালিয়া হরনাথ বীনাপাণি লাইব্রেরি, অগ্রদূত এবং কোদালিয়া ডাকঘর যার সামনে প্রশস্ত খেলার মাঠ। সম্পন্ন গৃহস্থ হরনাথ বোসই ছিলেন এ সবের মালিক। পাড়াটিও বেশ, ছিমছাম, কোলাহলমুক্ত, শরৎচন্দ্রের পল্লিসমাজের কথা মনে পড়ায়।

কবি সুভাষ থেকে নেতাজি ভবন মেট্রো স্টেশন। পুরো পথটিতেই কোদালিয়া আচ্ছন্ন করে রাখল আমায়। তবে শুধু নেতাজির দাদুর বাড়ি নয়, আরও এক বিখ্যাত বাঙালি সলিল চৌধুরীর মাতুতালয়ও নাকি কোদালিয়া। এ দিকে ট্রেনে উঠেই এক সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছি, যাব ‘নেতাজি ভবন’, টিকিট করেছি ‘নেতাজি’-এর। এই লাইনে প্রথম যাত্রা আমার, তাই ‘নেতাজি’ আর ‘নেতাজি ভবন’ গিয়েছে গুলিয়ে। ভাড়ায় পুরো পাঁচ টাকার ব্যবধান, বৈদ্যুতিক দরজা খুললে হয়! যা ভেবেছি তা-ই, যেখানে ভূতের ভয় সেখানেই সন্ধে হয়, দরজার কাছে নীল পোশাকের নিরাপত্তারক্ষী আর প্লাস্টিকের গোল চাকতিটিকে অবলীলায় অস্বীকার করল মেশিন বাবাজি, পর পর দু’ বার, চিচিং ফাঁকও হল না। ভয়ানক অপ্রস্তুত পরিস্থিতি, এমন সময় দেখা দিলেন স্বয়ং নারায়ণ, আমার পিছনের ভদ্রলোকটি চাকতিটি কুড়িয়ে মেশিনের ওপর রাখলেন, হাতে থাকা স্মার্ট কার্ডটি চেপে ধরতেই পাঁচ টাকার সীমান্ত খুলে গেল, উনি শুধু বললেন, চলুন চলুন। আপনাদের অনেক আগেই জানিয়েছি ভগবান আমার বখাটেপনা ভালোওবাসেন, প্রশ্রয়ও দেন, আজ আবার প্রমাণ হল।

নতুন নাম লালা লাজপৎ রায় সরণি হলেও আমার ভোট এলগিন রোডের তরে, কেননা এলগিন রোড উচ্চারিত হলেই সাথে সাথে সেই ইতিহাসও মনে এসে ভিড় করে যা নিয়ে বাঙালির গর্বের শেষ নেই। নেতাজিভবনের বিশালতা ও শৈলীতে গা ছম ছম শুরু হবে প্রবেশমাত্রই। প্রথমেই চোখ পড়বে সেই গাড়িটির দিকে যা দেশের স্বাধীনতায় দিকনির্ণয়ী ভূমিকা নিয়েছিল। ভাইপো শিশিরচন্দ্র বসু এই অডি করে কাকা সুভাষ বোসকে পৌঁছে দিয়েছিলেন গোমো। যা ইতিহাসের পাশাপাশি বাঙালিজীবনেও মহানিস্ক্রমণ বলে খ্যাত। এ ইতিহাস যদি আপনার জানা থাকে, তা হলে গাড়িটির সামনে গিয়ে দাঁড়ান, ষ্টিয়ারিং হাতে শিশিরচন্দ্র আর পেছনের সিটে হেলান দিয়ে বসে রয়েছেন স্বয়ং নেতাজি সুভাষ – শুধু এই দৃশ্যটুকু কল্পনা করতে পারলেই মেরুদণ্ডের বৈদ্যুতিক শিরশরানি টের পাবেন নিশ্চিত। এ এমন একটা ঘটনা যা ছাপোষা, সাধারণ, ভীরু বাঙালিকেও আস্পর্ধার পাঠ দেয়, তাকেও বিশ্বাস করতে শেখায় হ্যাঁ বাঙালিও পারে।

the car driven by sisir bose
এই গাড়িতে চাপিয়ে নেতাজিকে গোমো পৌঁছে দিয়েছিলেন ভাইপো শিশির।

নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর যত্নে জানকীনাথ, শরৎচন্দ্র ও সুভাষচন্দ্রের ব্যবহৃত ঘর, বিছানা-সহ আসবাবপত্র দেখানোর আন্তরিক ব্যবস্থাপনা আপনাকে মুগ্ধ করবে। এমন কিছু অনন্য অনুভূতি আপনার মনের দখল নেবে যার নাগাল কখনোই কোথাও বেড়াতে বেরিয়েই আপনি পাননি। মার্বেলপাথরে নির্মিত একজোড়া থালা ও বাটি যা দিয়ে এ বাড়িতে সুভাষের শেষ ডিনার সম্পন্ন হয়েছিল তা দেখে আপনার চোখ ভিজে যাওয়া স্বাভাবিক, যদি আপনি ভাবতে পারেন, এই থালায় খেয়েই ঘরের ছেলেটি দেশান্তরী হয়েছিল। জান্তে অজান্তে সুভাষকে তো আমরা ঘরের ছেলে বলেই মনে করি, তাই না? তাঁর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সংরক্ষিত পদচিহ্নে পা দেবেন না যেন, পারলে ওই মহামানবের পদচিহ্নেই প্রণাম করুন, পুণ্যি হবে। কংগ্রেস সভাপতি থাকাকালীন যে ঘরে বসে কাজকর্ম এবং আগত লোকজনের সঙ্গে উনি দেখা করতেন, তার দেওয়াল ছিল ত্রিবর্ণরঞ্জিত, আজও সে ভাবে রাখা রয়েছে। তিন তলায় সাজিয়ে রাখা তাঁর নিজ হস্তে লেখা চিঠিপত্র, বা জামাকাপড়ের সামনে দাঁড়ালেই আপনার লোম খাড়া হয়ে যাবে অজ্ঞাত মগ্নতায়।

একটা মানুষের কর্মকাণ্ডের ব্যাপ্তি কতখানি হলে তাঁকে ‘নেতাজি’ বলে মেনে নেন স্বয়ং রবিঠাকুর, একটিবার ভেবে দেখুন। কতটা আবেদন থাকলে দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত রাষ্ট্রনায়েকরা ছুটে আসেন তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে আজও, এখনও, সেটাও ভাবার বিষয়। আজ যখন সর্বত্রই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা তখন তাঁর উদাত্ত আহ্বান, তাঁর বলিষ্ঠ প্রত্যয় ভীষণই জরুরি ছিল। নেতাজিভবনের আনাচেকানাচে ইতস্তত পদচারণা করলে শ্রদ্ধায় আপন হতেই মাথা নত হয়ে আসে। মিউজিয়াম বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসি বাড়ি থেকে, রাস্তা হতে লাগাতার ছবি তুলতে থাকি, তবুও যেন আশ মেটে না। মহানিষ্ক্রমণের ৭৫ বছর পেরিয়ে গিয়েছে গত ২০১৬ সালে, তবুও যেন সব জীবন্ত। সব দেখেও মনের খিদে মেটে না, কিন্তু যেতে তো হবে। মেট্রো ধরে মহাত্মা গান্ধী রোড স্টেশন, ওপরে উঠলেই মহাজাতি সদন। যার নামফলকে লেখা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর পরিকল্পিত মহাজাতি সদনের শিলান্যাস করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পরবর্তীতে যার দ্বরোদঘটন হয় ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের হাত থরে। এটাও শেষ নয়, শিয়ালদহ যাব বলে মহাত্মা গান্ধী রোড-চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ ক্রসিংয়ে গিয়ে দেখি আরও একটা স্মৃতিফলক। সেখানেও জ্বলজ্বল করছে সুভাষচন্দ্রের নাম । সে ফলক জানান দিচ্ছে, Through this historical place Netaji Subhas Chandra Bose continued his ambitious and never ending journey to free our motherland-INDIA । সত্তর বছরেরও বেশি হয়ে গেল মাতৃভূমি স্বাধীন হয়েছে, নেতাজির পথচলা শেষ হয়নি, সুভাষ ঘরে ফেরে নাই, আজও।

ছবি: পিন্টু মণ্ডল ও লেখক

0 Comments
Share
a-visit-to-nanur-of-poet-chandidas
writwik das
ঋত্বিক দাস

বাংলা সাহিত্যে একাধিক চণ্ডীদাসের সন্ধান পাওয়া যায়। এই একাধিক চণ্ডীদাস নিয়ে আধুনিক পণ্ডিতরা দ্বিধাবিভক্ত। কেউ কেউ বলেন এক চণ্ডীদাস বৈষ্ণবপদাবলির রচয়িতা। আর অন্য চণ্ডীদাস শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রচয়িতা। এঁদের এক জন বাঁকুড়ার ছাতনার অধিবাসী ছিলেন, আরেক জন বীরভূমের নানুরের। অনেকে আবার বলেন, এই দুই চণ্ডীদাসই এক। বিতর্ক থাক, চণ্ডীদাস সম্পর্কে যে কাহিনি সব চেয়ে বেশি প্রচারিত, সেই কাহিনিই আজ শোনাই, সেই সঙ্গে তাঁর নানুরের কিছু কথা৷

১৩৭০ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন নানোর এবং অধুনা নানুরে চণ্ডীদাসের জন্ম৷ তাঁদের পদবি ছিল ‘বাড়ুজ্জে’ বা ‘বন্দোপাধ্যায়’৷ এই জন্য তাঁকে বড়ু চণ্ডীদাস বলেও ডাকা হয়৷ তাঁর পরিবার খুব দরিদ্র ছিল৷ দারিদ্রের ভারে এক সময় তাঁরা নানুরের ভিটেমাটি ছেড়ে দিয়ে অধুনা বাঁকুড়া জেলার ছাতনা গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন এবং সেখানে পণ্ডিতগিরি করে কিছু অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে দিন অতিবাহিত করতে লাগলেন৷ তাঁর প্রথম স্ত্রীর নাম ছিল পদ্মজা৷ অভাবের জ্বালায় একদিন পদ্মজা তাঁকে ছেড়ে চলে যান কীর্নাহারের বাপের বাড়িতে৷

basulidevi temple
বাসুলীদেবীর মন্দির।

নিঃসঙ্গ অবস্থায় চণ্ডীদাসও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন৷ ঘুরে বেড়িয়ে নিজে কবিতা লিখে সেগুলো বিদ্বজনদের শুনিয়ে বেড়াতে থাকেন৷ সারা দিনে যেটুকু হাতে আসে সেইটুকু দিয়ে রাতেরবেলায় একটি মাটির হাঁড়িতে অন্ন ফুটিয়ে আধাপেটা খেয়ে দিন কাটাতে থাকলেন৷ এ ভাবে ঘুরতে ঘুরতে তিনি একদিন চললেন রাজদরবারের পথে৷ রাজা তখন সভায় বসে মন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনায় ব্যাস্ত৷ তাঁর কানে এল সুন্দর কণ্ঠে ঝুমুর গানের আওয়াজ৷ রাজা আলোচনায় আর মন লাগাতে পারলেন না৷ কোথা দিয়ে আসছে এত সুরেলা কণ্ঠ, এত সুন্দর ঝুমুরগান কেই-বা গাইছে৷ ভাবতে ভাবতে এক ভিখারিকে তাঁর দরবারের দিকে এগিয়ে আসতে দেখলেন৷ রাজদরবার পাহারায় নিয়োজিত সৈন্যরা সেই ভিখারীকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দিলে স্বয়ং রাজা সৈন্যদের থামিয়ে ভিখারি চণ্ডীদাসকে ভেতরে আসার অনুমতি দিলেন এবং সেই সঙ্গে আবদার করলেন, আরও ঝুমুরগান শুনিয়ে তাঁর মন তৃপ্ত করতে হবে৷ এমন অবস্থায় চণ্ডীদাস ঝোলা থেকে তাঁর লেখা পদ্য ও ঝুমুরগানের একখানি সংকলন বার করে বেশ ক’টি গান রাজামশাইকে শোনালেন৷ রাজামশাই যারপরনাই তৃপ্ত চণ্ডীদাসের গানে৷ তাঁর অবস্থার খবর নিয়ে পুরস্কারস্বরূপ রাজা তাঁকে বাসুলীদেবীর মন্দিরের পুরোহিতপদে নিযুক্ত করলেন এবং মন্দিরসংলগ্ন একটি ঘরে থাকার অধিকার দিলেন৷ চণ্ডীদাস জীবনধারণের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণর পদ রচনায় ব্রতী হলেন এবং বাসুলীদেবীর পূজা করতে লাগলেন৷

দেবী বাসুলী বীণারঞ্জিত সরস্বতীদেবী, যদিও তাঁকে দুর্গাদেবী মনে করে শাক্ত রূপে পূজা করা হয়৷ এই দেবীর পূজা করতে করতে চণ্ডীদাস দেবীর ভক্তিপ্রেমে বাঁধা পড়লেন৷ বাসুলীদেবীর উপাসনাই তাঁর জীবনের মুল অঙ্গ হয়ে উঠল৷ দেবীর পূজা করার পাশাপাশি শ্রীকৃষ্ণের ভক্তিরস মাঝেমধ্যে সৃষ্টি করে মুখে আওড়াতে লাগলেন, সঙ্গে সঙ্গে সেই পদগুলি লিখে ফেলতে থাকলেন৷

এমন চলতে চলতে একদিন তাঁর মনে এক দোটানার উদ্ভব হল – যে অঙ্গ দিয়ে শাক্তের উপাসনা করে চলেছেন সেই অঙ্গ দিয়ে কী করে শ্রীকৃষ্ণের পদ রচনা করবেন৷ দিশেহারা তিনি৷ এমন অবস্থায় এক অমাবস্যার রাতে বাসুলীদেবী তাঁকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে পদ রচনার আদেশ দিলেন৷ দেবীর আদেশ পেয়ে চণ্ডীদাস প্রদীপের টিমটিমে আলোয় বসে মহানন্দে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের পদ রচনা করতে লাগলেন৷

teracotta work in nanur temples.
নানুরে মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার কাজ।

এমন ভাবে দিন কাটতে কাটতে চণ্ডীদাসের জীবনে আবার পরিবর্তন এল৷ বাসুলীদেবীর মন্দিরে একদিন আগমণ ঘটল এক পরমা সুন্দরী যুবতীর৷ অপূর্ব মুখশ্রী তাঁর৷ তিনি রজকিনি রামী৷ পিতৃমাতৃহারা রামী মন্দিরে দেবদাসীর কাজ করতে এলেন৷ মন্দিরের কাজ গুছিয়ে করেন রামী৷ ঠাকুরের কাপড় ধোয়া থেকে ঝাঁট দেওয়া, সবেতেই নিখুঁত৷ একদিন ভোগ বিতরণের সময় রামীর সঙ্গে চণ্ডীদাসের মুখোমুখি সাক্ষাৎ ঘটে৷ প্রথম দর্শনেই রামীর রূপে মুগ্ধ হয়ে যান চণ্ডীদাস, তাঁর মনের প্রেমসাগর যেন উত্তাল হয়ে ওঠে৷

স্ত্রী পদ্মজাকে হারিয়ে একাকী জীবন৷ পদ্মজাকে সে ভাবে সুখ দিতে পারেননি৷ অনেক দিন নারীর শরীরসুখ থেকেও বঞ্চিত৷ এমন অবস্থায় রামীর মুখ চণ্ডীদাসকে মাতোয়ারা করে তোলে৷ আহা্ কী সৌন্দর্য্য রামীর! হিরের দ্যুতির মতো মুখের ঔজ্জ্বল্য৷ বিদ্যুতের ঝলকানির মতো বাহুযুগল, তন্বী শরীর – সব মিলিয়ে চণ্ডীদাসের দু’ নয়নে শুধুই রামীর উপস্থিতি৷ কখনও বা বাসুলীদেবীর সঙ্গে রামীকে গুলিয়ে ফেলছেন আবার কখনও শ্রীরাধিকার সঙ্গে৷ “ইস্ একবার এসে যদি রামী তাঁর কাছে বসে বুকে তাঁর সুন্দর হাতখানি ছোঁয়াতেন”, “যদি কখনও রামীর শরীর স্পর্শ করার মতো সুখ কপালে জুটত”৷ রাতের একাকী বিছানায় শুধুই এমন ভাবনা তাঁর৷

“ব্রহ্মাণ্ড ব্যাপিয়া আছয়ে যে জন, কেহ না জানয়ে তারে।
প্রেমের আরতি যে জন জানয়ে সেই সে চিনিতে পারে।।”

basulidevi
বাসুলীদেবী।

এ ভাবে এক দিন উঠোন নিকোনোর সময় সুপুরুষ রামীর পথ আগলে দাঁড়ান চণ্ডীদাস এবং রামীকে প্রেম নিবেদন করেন৷ রামী কিঞ্চিৎ লজ্জিত। চণ্ডীদাস তাঁকে আলিঙ্গন করতে অগ্রসর হলেন৷ রামী তখন চণ্ডীদাসকে মনেমনে গ্রহণ করে প্রস্তাব দিলেন – ঠাকুর, তুমি তোমার সব কাম-বাসনা, সর্বশরীর এবং পুরো সম্মতিতে আমাকে গ্রহণ করো, তা হলেই আমি তোমার হতে পারব৷

চণ্ডীদাস এ বার খুশিতে পাগলপারা হয়ে বললেন, আজ থেকে আমার শরীর, এই বাসুলীদেবীর মন্দিরের দায়িত্ব সব তোমার৷ তুমি শুধু আমার৷ তুমি এই একাকী উত্তপ্ত মন ও শরীরকে শান্ত করো৷ চণ্ডীদাসের প্রেম গ্রহণ করলেন রামী৷ সঙ্গে ভয় পেলেন, যদি পাড়ার লোক তাঁদের প্রেমে বাধা দেয়৷ রামী বললেন, “না ঠাকুর, আমাকে ছাড়ো এতে তোমার বিপদ”৷ “আসুক বিপদ, শুধু তুমি আমাকে ভালোবাসো আমি সব সময় তোমার”- চণ্ডীদাসের জবাব৷ “তবে তা-ই হোক, আজ থেকে আর কোনো লোকলজ্জাকে ভয় নয়” – স্পষ্ট উক্তি রামীর৷

“মরম না জানে, মরম বাথানে, এমন আছয়ে যারা।
কাজ নাই সখি, তাদের কথায়, বাহিরে রহুন তারা।
আমার বাহির দুয়ারে কপাট লেগেছে – ভিতর দুয়ার খোলা।”

প্রেমের টানে পদাবলি রচনায় যাতে বাধার সৃষ্টি না হয় সে ব্যাপারে সংযত চণ্ডীদাস৷ রামী, বাসুলীদেবী ও কৃষ্ণের পদ – এই তিনটি বিষয় আবর্তিত হতে লাগল চণ্ডীদাসের জীবন৷

বাসুলীদেবীর প্রতি ভক্তি ও রামীর প্রতি প্রেমসুখ, দুয়ে মিলে পরমসুখে এ বার জোর কদমে শ্রীকৃষ্ণ পদাবলি লিখতে লাগলেন চণ্ডীদাস৷ কখনও ভাবের ঘোরে নিজেদের প্রেমকাহিনি স্থান পেল পদাবলির কাব্যে৷ এ ভাবে একদিন সৃষ্টি হল বাংলার প্রথম সাহিত্য শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের৷

আজ যেখানে মাটির ঢিবি অতীতে সেখানে সাঁঝের বেলায় চণ্ডীদাস  ও রামী কীর্তনের আসর বসাতেন যাতে গ্রামের মানুষ তাদের দু’জনের সম্পর্ককে গুরুশিষ্যার মতো করেই দেখেন৷ তাঁদের কীর্তন শুনতে জড়ো হতেন গ্রামের প্রায় সকলেই৷

চণ্ডীদাস ও রামীর মৃত্যু নিয়ে প্রচলিত কাহিনির কথায় আসি। সেই সময় বাংলার পাঠান সুলতান কিরগিজ খাঁ জোর করে বিয়ে করলেন এক হিন্দু কন্যাকে৷ সেই সুলতানের পত্নীও প্রায়ই আসতেন চণ্ডীদাসের কীর্তন শুনতে৷ ধীরে ধীরে সুলতানের সেই স্ত্রীও চণ্ডীদাসের প্রেমে পড়লেন৷ সুলতান তাঁর স্ত্রীর কাছে সব ব্যাপার জানতে চাইলেন৷ চণ্ডীদাসের প্রেমে পড়ার কথা সুলতানের স্ত্রী নিজমুখে স্বীকার করে নিলে কিরগিজ এক সন্ধেবেলা নিজ স্ত্রীকে বাসগৃহে আটকে রেখে চণ্ডীদাসের কীর্তনের আসরে আচমকা গোলাবর্ষণ করেন৷ ঘটনাস্থলেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যান চণ্ডীদাস, রামী-সহ বেশ ক’জন গ্রামবাসী৷ ধ্বংস হয় বাসুলীদেবীর মন্দির৷

that mound in nanur
সেই ঢিবি।

তবে চণ্ডীদাসের মৃত্যু নিয়ে আরেকটি মত প্রচলিত৷ চণ্ডীদাস ও রামির প্রেমকাহিনি গ্রামবাসীরা জানতে পেরে রেগে ফুঁসে ওঠে এক রাতে দু’জনকেই বেধড়ক পিটিয়ে মেরে ফেলে৷ পরে তাঁদের দুজনের মৃতদেহের ওপর মাটি জড়ো করে ঢিবি বানিয়ে দেয়৷

এই সব কাহিনি কতটা বিশ্বাসযোগ্য, সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। বিশেষ করে, চণ্ডীদাসের সময় গোলা, বিশ্বাস করা যায় না।

১৭-১৮ শতক নাগাদ এই অঞ্চলের তিলি সম্প্রদায়ের মানুষ মাটি খুঁড়ে বাসুলীদেবীর মূর্তি পুনরুদ্ধার করেন এবং মাটির ঢিবির পাশেই মন্দিরগুলি নির্মাণ করেন৷ পরবর্তীকালে ১৯৪৫ সাল নাগাদ সরকারি ভাবে খনন চালিয়ে অতীত পুনরুদ্ধার করা হয়৷ বর্তমানে বাসুলীদেবীর মন্দির-সহ আরও ১৪টি শিবমন্দির রয়েছে মন্দিরচত্বরে৷ সব ক’টাই চারচালাবিশিষ্ট৷ এর মধ্যে দু’টি শিবমন্দিরে টেরাকোটার সুন্দর কাজ লক্ষ করা যায়৷ মন্দিরদু’টির দেওয়ালে টেরাকোটার কাজে রাধাকৃষ্ণের লীলাকেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে৷

এ ছাড়া মন্দিরচত্বরের দু’ পাশে চারটি করে শিবমন্দিরে পঙ্খের অতি সুন্দর কারুকাজ দৃশ্যমান৷ বাকি শিবমন্দিরগুলি সাধারণ ইটে তৈরি এবং চারচালা চূড়াবিশিষ্ট৷

narayan mandir,nanur
নারায়ণ মন্দির।

বাসুলীদেবীর মন্দিরের ডান দিকে চারচালার সমতল ছাদবিশিষ্ট মন্দিরটিতে নারায়ণের পূজা হয়৷ আর সামনের ঘরটিতে বিভিন্ন মৃন্ময়ী দেবদেবীর পূজা হয়৷

বাসুলিদেবীর মন্দির সমতল চারচালাবিশিষ্ট, ইটের তৈরি, মন্দিরের মাথায় একটি চূড়া৷ মন্দিরের গর্ভগৃহে চণ্ডীদাস পূজিত দেবীমূর্তি৷ কালো কষ্টিপাথরের দেবীমূর্তি বীণারঞ্জিত হলেও মুলত শাক্তমতে তাঁর পূজা হয়৷ আশ্বিন মাসে শারদোৎসবের সময় পাঁচ দিন ধরে দেবীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়৷ সেই সময় মোষবলিও হয়৷

এই মন্দিরচত্বর থেকে সামান্য দূরে থানার পাশে যে পুকুরটি আছে সেখানেই রামী কাপড় কাচতে যেতেন৷ এখনও পুকুরধারে রক্ষাকালী মন্দিরের এক দিকে রামীর কাপড় কাচার পাটাটি সংরক্ষিত আছে৷

washing stone of Rami
রামীর কাপড় কাচার পাটা।

নানুরে বাসস্ট্যান্ডের মোড়ে রয়েছে চণ্ডীদাস ও রামীর বড়ো মূর্তি৷ এ ছাড়া নানুরের কাঁথার কাজের খ্যাতি উল্লেখযোগ্য৷ নানুর সফরে সেখানকার মিষ্টির স্বাদ নিতে ভুলবেন না৷

কী ভাবে যাবেন

রেলপথে হাওড়া/শিয়ালদা-রামপুরহাট লাইনে বোলপুর-শান্তিনিকেতন পৌছে সেখান থেকে বাসে বা গাড়ি ভাড়া করে যেতে পারেন নানুর, মাত্র ২১ কিলোমিটা৷ বোলপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে মুহুর্মুহু বাস যাচ্ছে নানুর গ্রাম হয়ে৷ কলকাতা থেকে সড়কপথ দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বর্ধমান, সেখান থেকে মঙ্গলকোট-নতুনহাট হয়ে নানুর।

কোথায় থাকবেন

নানুরে থাকার তেমন জায়গা নেই৷ শান্তিনিকেতন বেড়াতে গিয়ে ঘুরে নিন নানুর। শান্তিনিকেতনে নানা বাজেটের হোটেল আছে। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের রয়েছে শান্তিনিকেতন ট্যুরিস্ট লজ ও রাঙাবিতান ট্যুরিস্ট কমপ্লেক্স। দু’টোরই অনলাইন বুকিং www.wbtdcl.com। বেসরকারি হোটেলের সন্ধান পাওয়া যাবে goibibo, makemytrip, trivago, booking.com, tripadvisor, yatra.com, cleartrip প্রভৃতি ওয়েবসাইট থেকে।

ছবি: লেখক

 

 

 

 

 

 

0 Comments
Share
winter-destinations-part-four-from-rann-of-kutch-to-coastal-gujarat

তের ভ্রমণ ৩-এ ভ্রমণ অনলাইন গুজরাত ভ্রমণের একটি ছক দিয়েছিল। এই কিস্তিতে পাঠকদের জন্য রইল আরও দু’টি ভ্রমণ পরিকল্পনা।

১) কচ্ছভূমি

প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন – রাত্রিবাস অমদাবাদ।

ভ্রমণ শুরু করুন অমদাবাদ থেকে। হাওড়া-অমদাবাদ এক্সপ্রেস প্রতি দিন রাত ১১:৫৫-য় হাওড়া ছেড়ে অমদাবাদ পৌঁছোয় তৃতীয় দিন দুপুর ১.২৫-এ। হাওড়া-ওখা এক্সপ্রেস প্রতি মঙ্গল, শুক্র এবং শনিবার হাওড়া থেকে রাত ১০:৫০-এ ছেড়ে অমদাবাদ পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল ৯টায়। শালিমার-ভুজ এক্সপ্রেস প্রতি শনিবার রাত ৮:২০-এ ছেড়ে অমদাবাদ পৌঁছোয় সোমবার সকাল ৯.২০ মিনিটে। সাঁতরাগাছি-পোরবন্দর কবিগুরু এক্সপ্রেস প্রতি রবিবার রাত ৯:২৫-এ ছেড়ে অমদাবাদ পৌঁছোয় মঙ্গলবার সকাল ১০.৫০-এ। হাওড়া-গান্ধীধাম গর্ভ এক্সপ্রেস প্রতি সোমবার রাত ১১টায় ছেড়ে অমদাবাদ পৌঁছোয় বুধবার সকাল ১০.৫০-এ।

ahmedabad, world heritage city
বিশ্ব ঐতিহ্যের তকমা পাওয়া অমদাবাদ শহর।

দিল্লি থেকে সব চেয়ে ভালো ট্রেন অমদাবাদ রাজধানী। প্রতি দিন নিউদিল্লি স্টেশন থেকে রাত ৭.৫৫-য় ছেড়ে অমদাবাদ পৌঁছোয় পরের দিন সকাল ৯.৪০-এ। আশ্রম এক্সপ্রেস প্রতি দিন দিল্লি থেকে বিকেল ৩.২০-তে ছেড়ে অমদাবাদ পৌঁছোয় পরের দিন সকাল ৭.৪০-এ। এ ছাড়াও ত্রিসাপ্তাহিক, সাপ্তাহিক ট্রেন আছে দিল্লি থেকে অমদাবাদ যাওয়ার জন্য।

মুম্বই থেকে ছ’ থেকে ন’ ঘণ্টার মধ্যে অমদাবাদ পৌঁছোনোর জন্য দিনেরাতে অনেক ট্রেন আছে। এমন ট্রেন বাছুন যাতে সকালে অমদাবাদ পৌঁছে যেতে পারেন। তা হলে সেই দিনটা অমদাবাদ ঘোরাঘুরির জন্য রাখতে পারেন।

ট্রেনের সময় বিস্তারিত জানার জন্য দেখে নিন erail.in         

ভারতের যে কোনো জায়গা থেকে বিমানে পৌঁছোতে পারেন অমদাবাদ।

অমদাবাদে কী দেখবেন – পড়ুন শীতে চলুন/৩: হেরিটেজ গুজরাত

চতুর্থ দিন – রাত্রিবাস ধ্রানগাধরা।

wild ass at little rann
ক্ষুদ্র রনে বন্য গাধা। ছবি সৌজন্যে ট্রিপস্যাভি।

ক্ষুদ্র রনের জন্য বিখ্যাত ধ্রানগাধরা। রাত্রিবাস করুন দেবজিভাই ধামেচার ইকো ক্যাম্পে। দেবজিভাইয়ের উদ্যোগে বিকেলে একটা সাফারি করুন বন্য গাধার অরণ্যে।

অমদাবাদ থেকে ধ্রানগাধরা ১২৪ কিমি। আমদাবাদ থেকে ধ্রানগাধরা যেতে পারেন ট্রেনে, বাসে বা গাড়িতে। তবে ট্রেনের সময়ের সঙ্গে আপনার সময় মিলতে নাও পারে।

পঞ্চম দিনসকালেও একটা সাফারি করুন দেবজিভাইয়ের উদ্যোগে। দুপুরে রওনা হন ভাচাউয়ের উদ্দেশে। দূরত্ব ১৩৫ কিমি। রাত্রিবাস ভাচাউ।

ধ্রানগাধরা থেকে ভাচাউ  ট্রেনে, বাসে বা গাড়িতে আসতে পারেন। তবে ট্রেনের সময় দেখে নেবেন আপনার ভ্রমণসূচির সঙ্গে খাপ খায় কিনা।

ষষ্ঠ দিন – রাত্রিবাস ভাচাউ।

castle wall, dholavira
প্রাসাদ প্রাচীর, ধোলাভিরা। ছবি সৌজন্যে টপইয়াপ্স।

ভাচাউ থেকে ঘুরে আসুন হরপ্পা সভ্যতার নিদর্শন ধোলাভিরা। যাতায়াত ৩০০ কিমি।

সপ্তম দিন – রাত্রিবাস মাণ্ডবী।

mandvi beach
মান্ডবী সৈকত। ছবি সৌজন্যে ট্রোভার।

ভাচাউ থেকে মাণ্ডবী দূরত্ব ১৩০ কিমি। কচ্ছ উপসাগরের তটে মাণ্ডবী। সৈকতশহর মাণ্ডবীতে দেখুন বিজয়বিলাস প্যালেস, নয়নাভিরাম সূর্যাস্ত।

অষ্টম দিন – রাত্রিবাস ভুজ।  

মাণ্ডবী থেকে আসুন ভুজ। কিন্তু ঘুরপথে। প্রথমে যান ভারতের শেষ প্রান্ত কোটেশ্বর, (কোটিলিঙ্গেশ্বরের মন্দির) নারায়ণ সরোবরদূরত্ব ১৪১ কিমি। নারায়ণ সরোবরে কিছুক্ষণ কাটিয়ে চলুন লাখপত (দুর্গনগরী, গুরু নানকের স্মৃতিধন্য)। দুরত্ব ৩৩ কিমি। লাখপাত থেকে আসুন মাতা নো মাঢ়। দূরত্ব ৪১ কিমি। দর্শন করুন মা আশাপুরাকে। এখান থেকে চলে আসুন ভুজ। মাণ্ডবী থেকে মোট দূরত্ব ৩১২ কিমি।

koteshvar
কোটেশ্বর।

নবম দিন – রাত্রিবাস ভুজ।

ভুজে দেখে নিন আলামপন্না দুর্গে রাও লাক্ষা প্রাসাদ, মহারাও প্রাসাদ আয়না মহল, হামিরসর লেকের পুবে শারদ বাগ প্যালেস, প্রাগ মহল প্রাসাদ, লেকের দক্ষিণ পুবে কচ্ছ মিউজিয়াম ইত্যাদি

kala dungar
কালা দুঙ্গার। ছবি সৌজন্যে হিল টেম্পলস।

দশম দিনভুজ থেকে চলুন সাদা রন দেখতে। জায়গার নাম ধোরদোদূরত্ব ৮০ কিমি। ধোরধো থেকে যেতে পারেন কচ্ছের সর্বোচ্চ পর্বত কালো দুঙ্গার দেখতে। দূরত্ব ৪৮ কিমি। উচ্চতা ৪৬২ মিটার। সন্ধ্যায় ফিরে আসুন ভুজ। মোট দূরত্ব হবে ২১৭ কিমি। রাত্রিবাস ভুজ।

একাদশ দিন – ঘরে ফেরা।

ভুজ থেকে সরাসরি কলকাতা ফিরতে পারেন। ভুজ-শালিমার এক্সপ্রেস প্রতি মঙ্গলবার দুপুর ২.২০ মিনিটে ভুজ থেকে ছেড়ে শালিমার পৌঁছোয় বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায়। গান্ধীধাম থেকেও ফেরার ট্রেন ধরতে পারেন। গর্ভ এক্সপ্রেস প্রতি শনিবার বিকেল ৫:৪০-এ ছেড়ে হাওড়া পৌঁছোয় সোমবার দুপুর ১:০৫-এ। ভুজ থেকে গান্ধীধাম ৫৯ কিমি।

ভুজ থেকে আমদাবাদ ফিরে সেখান থেকেও হাওড়ার ট্রেন ধরতে পারেন। দূরত্ব ৩৩৩ কিমি। সে ক্ষেত্রে এক রাত আমদাবাদে থেকে পরের দিন ট্রেন ধরুন।

ভুজ থেকে সরাসরি মুম্বই ফেরার দৈনিক ট্রেন আছে। ভুজ থেকে দিল্লি ফেরার ট্রেন বরেলি এক্সপ্রেস, সপ্তাহে চার দিন। না হলে অমদাবাদ হয়ে দিল্লি ফিরুন।

বিমানেও অমদাবাদ থেকে দেশের যে কোনো জায়গায় ফিরতে পারেন।

কী ভাবে ঘুরবেন

(১) অমদাবাদের স্থানীয় দ্রষ্টব্য এবং লোথাল ও নল সরোবর (যদি সময় করে উঠতে পারেন) গাড়ি ভাড়া করে নিন। রাজ্য পর্যটন সারা দিনের ট্যুরে অমদাবাদ ঘোরায় কিনা খোঁজ করে নিন  ০৭৯-২৬৫৭৮০৪৪/২৬৫৭৮০৪৬/২৬৫৮৯১৭২।

(২) ভাচাউ থেকে ধোলাভিরা চলুন গাড়ি ভাড়া করে।

road to dholavira
ধোলাভিরার রাস্তা। ছবি সৌজন্যে মিডিয়াম.কম।

৩) ভাচাউ থেকে দু’ দিনের জন্য গাড়ি নিয়ে মাণ্ডবীতে রাত কাটিয়ে পরের দিন কোটেশ্বর-লাখপত-মাতা নো মাঢ় ঘুরে ভুজে এসে গাড়ি ছেড়ে দিন।

(৪) ভুজে ঘুরুন স্থানীয় যানবাহনে। ধোরদো, কালো দুঙ্গার যাওয়ার জন্য গাড়ি ভাড়া করে নিন।

কোথায় থাকবেন

একমাত্র অমদাবাদ ছাড়া কোথাওই গুজরাত পর্যটনের কোনো হোটেল নেই। অমদাবাদে গান্ধী আশ্রমের উলটো দিকে রয়েছে গুজরাত পর্যটনের হোটেল তোরণ গান্ধী আশ্রম। অনলাইনে বুক করার জন্য লগইন করুন www.gujarattourism.com । এ ছাড়া সব জায়গাতেই রয়েছে বেসরকারি হোটেল এবং রিসোর্ট। হোটেল বুকিং-এর একাধিক ওয়েবসাইট থেকে তা বুক করতে পারেন। শুধু ধ্রানগাধরায় থাকার চেষ্টা করবেন দেবজিভাই ধামেচার ইকো ক্যাম্পে। বিভিন্ন রকম কটেজ আছে এখানে। ধ্রানগাধরায় সাফারির ব্যবস্থা করে দেবেন দেবজিভাই নিজে। যোগাযোগ ৯৮২৫৫৪৮০৯০। ওয়েবসাইট www.littlerann.com

২) উপকূল গুজরাত

এই ভ্রমণটি রাজকোট থেকে শুরু করুন।

কলকাতা থেকে রাজকোটের জন্য রয়েছে সাঁতরাগাছি-পোরবন্দর সাপ্তাহিক কবিগুরু এক্সপ্রেস, প্রতি রবিবার রাত ৯:২৫-এ ছেড়ে রাজকোট পৌঁছোয় মঙ্গলবার বিকেল ৩:২৮-এ। রয়েছে হাওড়া-ওখা এক্সপ্রেস। প্রতি মঙ্গল, শুক্র এবং শনিবার হাওড়া থেকে রাত ১০:৫০-এ ছেড়ে রাজকোট পৌঁছোয় তৃতীয় দিন দুপুর ১.২৬ মিনিটে।

দিল্লি থেকেও দৈনিক ট্রেন নেই। সাপ্তাহিক, দ্বি-সাপ্তাহিক ট্রেন, ২৪ ঘণ্টা মতো সময় লাগে। দুপুরের মধ্যে রাজকোটে পৌঁছোনো যায়, এমন ট্রেন বেছে নিন।

মুম্বই থেকে আসার দু’টি ভালো ট্রেন। সাউ জনতা এক্সপ্রেস মুম্বই সেন্ট্রাল থেকে রোজ বিকেল ৫.১০-এ ছেড়ে পরের দিন সকাল ৬.৪৫-এ রাজকোটে পৌঁছোয়। সৌরাষ্ট্র মেল ছাড়ে মুম্বই সেন্ট্রাল থেকে রোজ রাত ৯.৩৫-এ, রাজকোটে পৌঁছোয় সকাল ১০.১০-এ।

ramkrishna mission ashram, rajkot
রাজকোটে রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম। ছবি সৌজন্যে আরকেএমরাজকোট.অর্গ।

প্রথম দিন – রাত্রিবাস রাজকোট।

জাদেজা রাজপুতদের গড়া রাজকোটে দেখে নিন জুবিলি গার্ডেন, ওয়াটসন মিউজিয়াম, গান্ধীজির বাড়ি (ছেলেবেলা কেটেছিল), রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম (বেলুড় মঠের রেপ্লিকা), লালপরী লেক, আজি বাঁধ (ভাবনগরের পথে ৮ কিমি) ইত্যাদি।

দ্বিতীয় দিন – সকালের দিকটা রাজকোটে কাটিয়ে বিকেল ৩.১০-এর অমদাবাদ-সোমনাথ এক্সপ্রেস ধরে ৫.৩৬ মিনিটে পৌঁছে যান জুনাগড়। রাজকোট থেকে বাস আধ ঘণ্টা অন্তর, ১০২ কিমি রাস্তা, ঘণ্টা তিনেক লাগে। গাড়ি ভাড়া করেও আসতে পারেন। রাত্রিবাস জুনাগড়

তৃতীয় দিন – রাত্রিবাস জুনাগড়

জুনাগড়ে দেখে নিন

উপারকোট পাহাড়ে জুনাগড় ফোর্ট। দুর্গে দেখুন বেশ কিছু বৌদ্ধ গুম্ফা, নওগড় ভাভ ও আধি চাধি ভাভ (স্টেপ ওয়েল), বিশাল কামান নিলাম তোপ, জামি মসজিদ, অশোকের সময়ের গুহা

girnar hills
গিরনার পাহাড়। ছবি সৌজন্যে গোসাহিন.কম।

গিরনার পাহাড়ে ওঠার পথে দেখুন অশোকের শিলালিপি

তা ছাড়া দেখে নিন বাজেশ্বরী মন্দির, দামোদর কুণ্ড, উনিশ শতকের নবাবি প্রাসাদ রংমহল, জুনাগড় নবাবদের রাজপ্রাসাদ মহাবত মকবরা, নবাবদের গড়া মনোরম উদ্যান শখের বাগ ও চিড়িয়াখানা (রাজকোট রোডে সাড়ে তিন কিমি দূরে) ইত্যাদি।

চতুর্থ দিন – রাত্রিবাস সাসন গির।

জুনাগড় থেকে প্রায় ৬০ কিমি দূরের গির আসার জন্য বাস রয়েছে। গাড়ি ভাড়া করে আসতে পারেন। শেয়ার ট্যাক্সিও মেলে।

gir forest
গিরে সিংহ দর্শন। ছবি সৌজন্যে দ্যআর্থসাফারি.কম।

গিরে বন দফতরের ব্যবস্থাপনায় সাফারি করুন। ঘুরে আসুন ১৩ কিমি দূরের দেবালিয়া সাফারি পার্কও।

পঞ্চম দিন – সকালে আর একটা সাফারি করে চলুন দিউ। রাত্রিবাস দিউ

ষষ্ঠ দিন – রাত্রিবাস দিউ

সাসন গির থেকে সকাল ১০.৪৭-এর প্যাসেঞ্জার ট্রেন বিকেল ৩টেয় পৌঁছে দেয় দিউ থেকে আট কিমি দূরে দেলওয়াদা। স্টেশন থেকে দিউ যাওয়ার হরেক ব্যবস্থা। বাস বা গাড়ি ভাড়া করেও দিউ আসতে পারেন, দূরত্ব ৯০ কিমির মতো।

nagoa each, diu
নাগোয়া সৈকত, দিউ। ছবি সৌজন্যে কম্পাসটুরিজম.কম।

তিন দিকে আরব সাগর আর উত্তর দিকে ব্যাকওয়াটারে ঘেরা দ্বীপভূমি দিউ। দিউয়ের মূল আকর্ষণ এর প্রকৃতি। দেখে নিন পরিখা ঘেরা দুর্গ ও তার ভিতরের কারাগার ও মিউজিয়াম। দুর্গের উপর থেকে সাগর ও দিউ শহরকে দেখুন। মোটরবোটে চলুন পানিকোটা সমুদ্রদুর্গ। ঘুরে আসুন নাগোয়া বিচ, জলন্ধর বিচ (লাগোয়া পাহাড় চুড়োয় মন্দির), চক্রতীর্থ বিচ, আমেদপুর মান্ডভি বিচ। দেখে নিন শহিদস্মারক মারওয়ার, সেন্ট টমাস, সেন্ট পলস এবং সেন্ট ফ্রান্সিস চার্চ। শহর থেকে ৪ কিমি দূরে গঙ্গেশ্বর শিব। জোয়ারের জল পা ধুয়ে দিয়ে যায় শিবের।

সপ্তম দিন – রাত্রিবাস সোমনাথ।

সক্কালেই বেরিয়ে পড়ুন দিউ থেকে। বাস চলে, তবে বেশ ভিড় হয়। গাড়ি ভাড়া করে সোমনাথ পৌঁছে যান প্রাতঃরাশের আগে। দূরত্ব ৮৫ কিমি। 

somnath temple
সোমনাথ মন্দির। ছবি সৌজন্যে টেম্পলডায়েরি.কম।

সোমনাথে দেখে নিন-

সোমেশ্বর মহাদেব মন্দির, জ্যোতির্লিঙ্গ। রাত ৮টায় মন্দির প্রাঙ্গণে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শোবল্লভঘাট থেকে সূর্যাস্ত। অহল্যাবাঈয়ের গড়া পুরোনো সোমনাথ মন্দির। প্রভাস পাটন মিউজিয়াম (বুধ ও ছুটির দিন বন্ধ)। পরশুরামের তপোভূমি। সরস্বতী, কপিলা ও হিরণ্য নদীর ত্রিবেণী সঙ্গম বা প্রভাস তীর্থ ভালুকা তীর্থ, কথিত যেখানে ব্যাধের তীরে বিদ্ধ হয়েছিলেন কৃষ্ণ।

kirti mandir, porbandar
কীর্তি মন্দির, পোরবন্দর। ছবি সৌজন্যে ইউটিউব।

অষ্টম দিন – গাড়ি ভাড়া করে নিয়ে সোমনাথ থেকে পোরবন্দর হয়ে চলুন দ্বারকা। দূরত্ব ২৩০ কিমি। রাত্রিবাস দ্বারকা

পথে দেখে নিন পোরবন্দরে গান্ধীজির জন্মভিটে ‘কীর্তিমন্দির’, সুদামা প্রাসাদ, চোরবাদ সাগরবেলা

নবম দিন  – রাত্রিবাস দ্বারকা।

দ্বারকায় দেখে নিন – 

dwarkadheesh temple, dwarka
দ্বারকাধীশ মন্দির, দ্বারকা। ছবি সৌজন্যে গুজরাটএক্সপার্ট.কম।

দ্বারকার মূল আকর্ষণ গোমতী তটে দ্বারকাধীশ রণছোড়জির মন্দির, গোমতী নদীতে ঘেরা দ্বীপে কৃষ্ণ মন্দির, রণছোড়জির মন্দিরের দক্ষিণ দ্বার দিয়ে বেরিয়ে ৫৬ ধাপ নেমে গোমতী দেবীর মন্দির, গোমতী-নারায়ণ সঙ্গমে সঙ্গমনারায়ণ মন্দির, লাইট হাউস, পঞ্চপাণ্ডবের নামে মিষ্টি জলের পাঁচটি কুয়া তথা পঞ্চনদ তীর্থ, সামান্য দক্ষিণে লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির, ভদ্রকালী মন্দির, মীরাবাঈ মন্দির, তারকেশ্বর সাগরবেলা ও শংকরাচার্যের সারদা মঠ।

দশম দিন – সক্কালেই চলুন বেট দ্বারকা। গাড়ি ভাড়া করে বেরিয়ে পড়ুন। পথে দেখে নিন দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম নাগেশ্বর, গোপী তালাও, রুক্মিণীদেবীর মন্দির। দেখে পৌঁছে যান ৩২ কিমি দূরে ওখা, সেখান থেকে নৌযাত্রায় বেট দ্বারকা। ওখা শহরে ঢোকার মুখে বেট দ্বারকার ফেরিঘাট।  

ferry to bet dwarka
বেট দ্বারকার পথে। ছবি সৌজন্যে ইন্ডিয়ামাইক.কম।

বেট দ্বারকা ঘুরে এসে ওখা থেকে পৌনে ৩টের ভাবনগর প্যাসেঞ্জার ধরে ৬.২৬-এ পৌঁছে যান জামনগর। ওই ট্রেন ধরতে না পারলে রাত্রি ৮.০৫-এর ওখা-সোমনাথ এক্সপ্রেস ধরে রাত্রি ১০.৩২-এ পৌঁছে যান জামনগর। ওখা থেকে বাস ও গাড়ি ভাড়া করেও আসতে পারেন জামনগর, দূরত্ব ১৫০ কিমি। রাত্রিবাস জামনগর।

একাদশ দিন ও দ্বাদশ দিন – রাত্রিবাস জামনগর।

শীতকালে জামনগরের প্রশস্তি তার পরিযায়ী পাখির জন্য। তাই দু’টো পুরো দিন রাখা হয়েছে জামনগরের জন্য।

জামনগরে প্রথম দিন দেখে নিন – 

লাখোটা লেকের মাঝে লাখোটা প্রাসাদ ও মিউজিয়াম। পাথরের সেতুতে পারাপার। লেকের এক পাশে মাছভবন প্রাসাদ, লেক লাগোয়া ড. অম্বেডকর উদ্যান। চণ্ডীবাজারে আদিনাথ ও শান্তিনাথের মন্দির। স্বামীনারায়ণ মন্দির

১৫ কিমি দূরে খিজারিয়া বার্ড স্যাংচুয়ারি ও ২৮ কিমি দূরের বালাছড়ি সমুদ্র সৈকত

দ্বিতীয় দিনে চলুন – 

narara marine national park
নারারা মেরিন ন্যাশনাল পার্ক। ছবি সৌজন্যে ইউটিউব।

৫৫ কিমি দূরে দ্বারকার পথে নারারা মেরিন ন্যাশনাল পার্ক।

ত্রয়োদশ দিন – ঘরে ফেরা

জামনগর থেকে সরাসরি হাওড়া আসার ট্রেন প্রতি বুধ, বৃহস্পতি ও রবিবার সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ। দিল্লি আসার ট্রেন মঙ্গল ও শনিবার। মুম্বই আসার গোটা তিনেক দৈনিক ট্রেন আছে।

মনে রাখবেন

(১) হাওড়া বা দিল্লি থেকে রাজকোট বা রাজকোট থেকে হাওড়া/দিল্লি রোজ ট্রেন নেই। সুতরাং ট্রেনের দিন অনুযায়ী যাওয়া-আসার দিন ঠিক করে নিলে ভ্রমণের মেয়াদ কমতে-বাড়তে পারে। সেই ভাবে বিভিন্ন জায়গায় থাকার মেয়াদ একটু এ-দিক ও-দিক করে নিতে হতে পারে। ট্রেনের সময় জানার জন্য দেখে নিন erail.in ।

(২) গিরে পৌঁছে যদি সে দিন বিকেলেই সাফারি করেন, তা হলে পরের দিন সকালে চলুন দেবালিয়া সাফারি পার্ক। সুনিশ্চিত ভাবে সিংহ দেখানোর ব্যবস্থা। গির অরণ্যে সাফারির সময় সকাল ৬টা থেকে ৯টা, সকাল ৯টা থেকে বেলা ১২টা এবং বিকেল ৩টে থেকে সন্ধে ৬টা। দেবালিয়া সাফারি পার্ক খোলা সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা, বিকেল ৩টে থেকে ৫টা। বুধবার বন্ধ। অনলাইনে সাফারি বুক করুন www,girlion.in। সাফারি শুরু হওয়ার আধ ঘণ্টা আগে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে যেতে হয়।

আরও পড়ুন শীতে চলুন /২ : থর ঘুরে আরাবল্লি হয়ে জঙ্গলের রাজস্থানে

(৩) গিরনার পাহাড়ে ৯৯০০ সিঁড়ি ভেঙে বা পালকি করে বা ঘোড়ায় চেপে যদি উঠতে চান তা হলে আরও একটা দিন জুনাগড়ে থাকতে হবে। জৈনদের তীর্থস্থান গিরনারের মাথায় রয়েছে নেমিনাথ ও মল্লিনাথের মন্দির। তা ছাড়া আরও নানা মন্দির।

(৪) বিভিন্ন জায়গায় মন্দির, মিউজিয়াম, প্রাসাদ ইত্যাদি খোলার সময় আগাম জেনে নিন। তবে সোমনাথে মন্দির সকাল ৬টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত খোলা।

(৫) সোমনাথে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো অবশ্যই দেখবেন।

(৬) দ্বারকায় রণছোড়জির মন্দির খোলা সকাল সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা। মাঝে দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বন্ধ।

আরও পড়ুন শীতে চলুন/১: গড়-জঙ্গল-হাভেলির রাজস্থান

(৭) নারারা মেরিন ন্যাশনাল পার্ক দেখার জন্য অনুমতিপত্র সংগ্রহ করতে হবে Conservator of Forest, Marine National Park, Ganjiwada Nagar, Nagnath Gate, Van Shankul, Jamnagar থেকে। যোগাযোগ ০২৮৮-২৬৭৯৩৫৫/২৬৭৯৩৫৭। পার্কের গেটেই পার্ক অনুমোদিত গাইড পাওয়া যায়। অবশ্যই সঙ্গে নেবেন। যে হোটেলে থাকবেন সেখানে জেনে নেবেন ভাটা কখন শুরু হবে। ভাটা শুরু হওয়ার দু’ থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে অবশ্যই পার্কে পৌঁছোনো চাই।

কী ভাবে ভ্রমণ করবেন

(১) এই সূচি যে হেতু রাজকোটে শুরু হয়ে জামনগরে শেষ, তাই রাজকোট থেকে একটা গাড়ি ভাড়া করে জামনগরে ছেড়ে দিতে পারেন। তবে পয়েন্ট টু পয়েন্ট গাড়িও করতে পারেন। গুজরাতে বাস পরিষেবা ভালো। বাসে বা পয়েন্ট টু পয়েন্ট গাড়িতে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গেলে স্থানীয় দ্রষ্টব্য স্থানীয় যান ভাড়া করে দেখে নিন।

(২) গিরে সকালে সাফারি করলে সাসন গির স্টেশন থেকে সকালের ট্রেন ধরা মুশকিল। সে ক্ষেত্রে বাস বা গাড়ি ভাড়া করে আসুন দিউ।

কোথায় থাকবেন

(১) গুজরাতের অধিকাংশ জায়গাতেই রাজ্য পর্যটন উন্নয়ন নিগমের হোটেল নেই। এই ভ্রমণসূচিতে শুধুমাত্র দ্বারকা এবং জুনাগড়েই যথাক্রমে পর্যটন উন্নয়ন নিগমের টুরিস্ট বাংলো এবং হোটেল গিরনার রয়েছে। অনলাইনের বুক করার জন্য লগইন করুন  www.gujarattourism.com তবে বাকি সব শহরেই বেসরকারি হোটেল এবং বিচ রিসোর্ট আছে। হোটেল বুকিং-এর বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে এই সব হোটেলের সন্ধান পেয়ে যাবেন।

sinh sadan forest lodge
সিংহ সদন ফরেস্ট লজ। ছবি সৌজন্যে সিমপ্লিঅফবিট.কম।

(২) গিরে যদি সরকারি ব্যবস্থাপনায় সিংহসদন ফরেস্ট লজে থাকতে চান তা হলে যোগাযোগ — Deputy Conservator of Forest, Wild Life Section, Sasangir, Dist – Junagadh 362135. ph 02877-285541/285540 । গিরে অনেক বেসরকারি হোটেলও আছে।

(৩) দিউয়ের হোটেল ও তার বুকিং সম্পর্কে বিশদে জানার জন্য দেখুন www.diutourism.com

sagar darshan guesthouse
সাগর দর্শন অতিথিগৃহ, সমনাতজ। ছবি সৌজন্যে সোমনাথ.ওর্গ।

(৪) সোমনাথে শ্রী সোমনাথ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় লীলাবতী অতিথি ভবন, মাহেশ্বরী অতিথি ভবন, সাগর দর্শন গেস্ট হাউস এবং তন্না অতিথিগ্রুহতে থাকার সুবন্দোবস্ত আছে। অনলাইন বুকিং www.somnath.org

0 Comments
Share
a-weekend-visit-to-acchipur
ঋত্বিক দাস

১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দের কোনো এক দিন৷ বজবজ থেকে কয়েক কিলোমিটার দক্ষিণে গঙ্গার ঘাটে নোঙর করল এক বিশাল বাণিজ্যতরী৷ সে দিন সেই আগন্তুক বাণিজ্যতরীটি দেখে তৎকালীন জমিদারমশাই তৎক্ষণাৎ তরীটি আটক করার নির্দেশ দিলেন৷ বাণিজ্যতরী থেকে নেমে এলেন ছোটো ছোটো চোখবিশিষ্ট এক ব্যক্তি। জমিদারের নায়েব তাঁর কাছে জানতে, তাঁদের জমিদারিতে এ ভাবে পা রাখার উদ্দেশ্য কী। প্রত্যুত্তরে মানুষটির কাছ থেকে জবাব এল, “আমি মি: টং আছিও, তোমাদের জন্য চা নিয়ে এসেছি।” জমিদারবাহিনী তো শুনে থ। এই ‘চা’ আবার কী বস্তু৷ তখন টং আছিও সেই মুহূর্তে জাহাজের কর্মীদের সাহায্যে সবাইকে চা বানিয়ে খাওয়ালেন৷ খেয়ে সবাই বুঝলেন কী অদ্ভুত পানীয়! খাওয়ামাত্র শরীর চাঙ্গা।

এমন অদ্ভুত বস্তুর মাধ্যমে টং আছিও সবার মন জিতে নিলেন আর ভারতের মাটিতে আরম্ভ হল চা-পানের অধ্যায়৷শুধু সে দিন ভারতীয় জমিদাররাই নন, তৎকালীন গভর্ণর লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংসের মুখেও এই চা নামক বস্তুটির স্বাদ পৌঁছে গেল৷ টং আছিওর সঙ্গে সাক্ষাৎ হল হেস্টিংস সাহেবের। আছিও সাহেব ভারতের মাটিতে চিনিকল বসানোর বাসনা ব্যক্ত করলেন তাঁর কাছে৷ আছিও সাহেবকে চিনিকল তৈরি করার জন্য বজবজের কাছে গঙ্গার ধারে বার্ষিক ৪৫ টাকার বিনিময়ে ৬৫০ একর জমি প্রদান করা হল৷ এর পর টং আছিও আবার দেশে ফিরে কয়েকশো চিনা কর্মচারী-সহ চা তৈরির মেসিন নিয়ে আসেন এবং গঙ্গার ধারের সেই জমিতে চিনিকল বসিয়ে চিনি উৎপাদন শুরু করেন৷ এ ভাবে শুরু হয়েছিল ভারতে প্রথম চিনি উৎপাদন। এর আগে ভারতীয়রা চিনি সম্পর্কে অবগত ছিল না৷ এ ছাড়া আছিও সাহেব ভারতীয় চাষিদের দিয়ে নীলচাষও করাতেন৷

grave of tong achhio
টং আছিও সাহেবের সমাধি, অছিপুর।

যখন এই সব ঘটনা ঘটছে তখন কলকাতার শহরে গাড়ি বলতে ছিল ইংরেজ সাহেব আর বিত্তবান বাবুদের ব্যবহার করার জন্য জুড়িগাড়ি, যাতে চড়া ছিল সাধারণ মানুষের স্বপ্নাতীত৷ টং আছিও সাধারণ মনুষের যাতায়াত অতি স্বল্প খরচে সুগম করতে আর্ কিছু মানুষের রুচিরোজগারের ব্যবস্থা করতে কলকাতার রাস্তায় প্রথম টানা-রিকশার প্রবর্তন করেন৷ আছিও সাহেবের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল কলকাতার রাস্তায় টানা-রিকশার পথচলা ৷

টং আছিও ভারতে দ্বিতীয় বারের জন্য এসে আর ফিরে যাননি৷ আছিও সাহেব সারা জীবন অবিবাহিত ছিলেন৷ তাঁর দেখাশোনা করতেন টেলিবিবি নামে এক মুসলিম মহিলা৷ শেষ জীবনেও তিনি আছিও সাহেবের সেবা করে গিয়েছেন৷ মৃত্যুর পর আছিও সাহেবকে গঙ্গার পারে তাঁর চিনিকলের কাছে সমাধিস্থ করা৷ কয়েক বছর বাদে টেলিবিবিও দেহ রাখেন৷ আছিও সাহেবের সঙ্গে দেশ থেকে এসে তাঁর কর্মচারী ও সঙ্গীরাও ভারতের মাটিতে পাকাপাকি ভাবে বসবাস শুরু করেন৷ তবে চিনা সাহেবের মৃত্যুর পর চিনিকল বন্ধ হয়ে যায়। কলের সব কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা রুচি রোজগরের টানে বজবজের ধারের সেই জায়গা ছেড়ে কলকাতার কিছু জায়গায় ছড়িয়ে পড়েন৷ এর মধ্যে নাম করতে হয় অধুনা ট্যাংরা অঞ্চলের চিনাপাড়া৷ এখানে চিনা সম্প্রদায়ের মূল রুজি রেস্তোরাঁ ব্যবসা৷

chinese god khodakhudi
চিনা দেবতা পাকুমপাহ তথা খোদাখুদি, অছিপুর।

চিনা সাহেব টং আছিওর পদার্পণের সূত্রে বজবজের কাছে গঙ্গার ধারের সেই জায়গা আজ অছিপুর নামে পরিচিত। সেই অছিপুরেই পা রাখলাম একদিন। প্রথমেই গেলাম চিনেম্যানতলায়। যে জায়গায় আছিও ও তাঁর সঙ্গীরা ভারতের মাটিতে প্রথম পা রাখেন বর্তমানে সেই স্থানটিই চিনেম্যানতলা নামে পরিচিত৷ কেউ কেউ আবার স্থানটিকে চিনেকুঠিতলা বলেও ডেকে থাকেন৷ নামে ‘চিনে’ থাকলেও বর্তমানে এখানে কোনো চিনার বাস নেই। তবে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারির ১২ থেকে ২৪ তারিখ চিনা নববর্ষ উপলক্ষ্যে এখানে জাঁকালো উৎসব হয়। সেই সময়ে দেশের নানা প্রান্ত, এমনকি বিদেশ থেকেও চিনারা এখানে আসেন৷ চিনেম্যানতলার প্রধান দ্রষ্টব্য ‘পাকুমপাহ’র মন্দির। সেই মন্দিরের বিগ্রহ দু’টিকে স্থানীয় মানুষ খোদা-খুদি নামে ডাকেন৷ এই মন্দিরটি আছিও সাহেব নির্মাণ করান৷

আছিও সাহেবের সময় এই জায়গা সুন্দরবন অঞ্চলের মধ্যেই ছিল। তাই স্বাভাবিক ভাবেই এখানে প্রচুর বাঘের উপদ্রব ছিল৷ বাঘদেবতাকে তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে আছিও সাহেব দক্ষিণ রায়ের মন্দির স্থাপন করেন৷ মন্দিরটি আকারে ছোটো চতুষ্কোণ-বিশিষ্ট। ভেতর কোনো মূর্তি নেই। ঘটকেই দেবতা মনে করে পুজো করা হয়৷ পরবর্তী কালে আছিও সাহেব দক্ষিণ রায়ের মন্দিরের সম্মুখ ভাগে চৈনিক দেবদেবী ‘পাকুমপাহ’ (খোদাখুদি)-র মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন৷ স্থানীয় মানুষজন বলেন, আগে এই দেবদেবীর মূর্তি সোনার ছিল। মৃত্যুর আগে আছিও সাহেব এক স্বপ্নাদেশ পান। সেই স্বপ্নাদেশ পেয়ে সোনার মূর্তি সমুদ্রে নিক্ষেপ করে চন্দন কাঠের মূর্তি মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন৷ মন্দিরের গর্ভগৃহ আয়তনে ছোটো হলেও খুব যত্নে সাজানো৷ মূল মন্দিরের সামনে প্রার্থনাকক্ষ। সেখানে লম্বা একটি টেবিলে সারি সারি মোমবাতি ও ধুপকাঠি জ্বালানোর ব্যাবস্থা, যেগুলি ফেব্রুয়ারি মাসে  চিনা নববর্ষের সময় সুশোভিত হয়ে ওঠে৷ মন্দিরের ডান দিকে বিশ্রামকক্ষ। সেখানে এক পাশের দেওয়ালে মন্দির সংস্কারে সাহায্যদাতাদের চিনা হরফে শ্বেতপাথরের ওপর লেখা৷ মন্দিরের বাঁ দিকের কোণে চিনাদের আরেক দেবতা কনফুসিয়াসের মন্দিরকক্ষ৷ এই কক্ষের সামনে আজও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে আছিও সাহেবের বাণিজ্যতরীর একটি অংশ৷ পুরো মন্দিরচত্বর পাঁচিল দিয়ে ঘেরা৷ মূল দরজাটি বেশ সুন্দর৷ সামনে বড়ো মাঠের মতো ফাঁকা জায়গা। মাঠের পাঁচিলের আরেক পাশে ছিল আছিও সাহেবের চিনির কল, যা আজ সম্পূর্ণ অবলুপ্ত৷ সেই জায়গায় গড়ে উঠেছে ঘনবসতি৷ আর মন্দিরের পেছনে যে পুকুরপাড়, সেখানেই ছিল আছিও সাহেবের নীলচাষের খেত৷ পুরো মন্দিরচত্বর গাছগাছালিতে ছাওয়া, সুন্দর পরিবেশ৷ স্নিগ্ধতা, শান্তি এখানে পরম প্রাপ্তি৷

confusious in temple
মন্দিরকক্ষে কনফুসিয়াস, অছিপুর।

মন্দিরের মুল গেট দিয়ে বেরিয়ে ডান হাতে কিছুটা পথ গিয়ে গঙ্গা৷ গঙ্গা এখানে বেশ চওড়া, অপর পারে উলুবেড়িয়া৷ এই গঙ্গার পাড় ধরে বাঁ দিকে কিছুটা গেলে রয়েছে আছিও সাহেবের সমাধি৷ সমাধিস্থলটি নির্জন। জোয়ারের সময়ে গঙ্গার জলের ছলাৎ ছলাত শব্দে মনটা ভরে ওঠে৷ জীবনের সমস্ত কষ্ট-বেদনা, না-পাওয়া, সব মিটিয়ে এক অনাবিল আনন্দে যেন পরিপূর্ণ পরিপুর্ন করে দেয় এই স্থান৷ সমাধিবেদিটি সুন্দর করে বাঁধানো, লাল রঙের। এখানে গঙ্গার সেই সুন্দর ধ্বনি শুনতে শুনতে চিরনিদ্রায় রয়েছেন আছিও সাহেব৷

আছিও সাহেবের সমাধি ছেড়ে দক্ষিণমুখী আরও পনেরো মিনিট হাঁটার পর বাঁ হাতে পড়ল নবাবি আমলে নির্মিত এবং বর্তমান আমলে ধ্বংসপ্রাপ্ত বারুদকল৷ না, না পারলে হাঁটবেন না। অছিপুর বেড়াতে এসে রিকশা চেপে ঘুরে যাবেন এই বারুদকলটি৷ তবে গঙ্গার পাড় বরাবর বেশ কিছুটা সময় ধরে হেঁটে মনকে তৃপ্ত করে নেওয়া যায়৷ এই হল আজকের অছিপুর৷

ফেরার পথে চড়িয়াল মোড় থেকে অটো বা ম্যজিক গাড়িতে করে বাওয়ালি ট্রেকার স্ট্যান্ডে নেমে বাঁ হাতি পথে মিনিট পাঁচেক পথ হেঁটে ঘুরে নিতে পারেন বাওয়ালি রাজবাড়ি৷

কী ভাবে যাবেন

শিয়ালদহ থেকে বজবজ লোকালে বজবজ স্টেশন। সেখান থেকে অছিপুরের অটোতে বড়োবটতলা নেমে বাঁহাতি রাস্তায় হেঁটে ১০ মিনিট বা রিকশায় ৫ মিনিটে পৌঁছে যান চিনেম্যানতলা৷ আর ধর্মতলা থেকে ৭৭ নং বাসে চড়ে সরাসরি পৌঁছে জেট পারেন অছিপুর বড়োবটতলা৷

ছবি: লেখক

0 Comments
Share
winter-destinations-part-3-heritage-gujarat

গুজরাত বেড়ানোর আদর্শ সময় শীতকাল – নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত। গুজরাতের জন্য তিনটি ভ্রমণ পরিকল্পনা তৈরি করেছে  ভ্রমণ অনলাইন। আজ প্রথমটি, হেরিটেজ গুজরাত। 

বডোদরা (বরোদা)-অমদাবাদ-মহেসানা-মাউন্ট আবু

প্রথম ও দ্বিতীয় দিন – রাত্রিবাস বডোদরা।

sursagar lake, vadodara
সুরসাগর লেক, বডোদরা।

হাওড়া-অমদাবাদ এক্সপ্রেস হাওড়া ছাড়ে রাত ১১.৫৫-য় বডোদরা পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল ১০.৫৬ মিনিটে। এ ছাড়া রয়েছে হাওড়া-পোরবন্দর-ওখা ত্রিসাপ্তাহিক এক্সপ্রেস। হাওড়া ছাড়ে মঙ্গল, শুক্র ও শনিবার রাত ১০.৫০-এ, বডোদরা পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল ৬.৫৩ মিনিটে। সাপ্তাহিক শালিমার-ভুজ এক্সপ্রেস। প্রতি শনিবার রাত ৮.২০-এ শালিমার ছেড়ে বডোদরা পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল ৬.৫০ মিনিটে। সাপ্তাহিক পোরবন্দর কবিগুরু এক্সপ্রেস প্রতি রবিবার রাত ৯.২৫-এ সাঁতরাগাছি ছেড়ে বডোদরা পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল ৮.২৫-এ। সাপ্তাহিক গর্ভ এক্সপ্রেস প্রতি সোমবার রাত ১১টায় হাওড়া ছেড়ে বডোদরা পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল ৮.৪০-এ।

দিল্লি থেকে বডোদরা আসার অনেক ট্রেন আছে। তারই মধ্যে হজরত নিজামুদ্দিন থেকে বিকেল ৪.৫০-এর আগস্ট ক্রান্তি রাজধানী, নিউদিল্লি থেকে বিকেল ৪.২৫-এর মুম্বই রাজধানী এবং ৪.৪৫-এর পশ্চিম এক্সপ্রেস বডোদরা পৌঁছে দেয় সকালের মধ্যে।

আরও পড়ুন শীতে চলুন/১: গড়-জঙ্গল-হাভেলির রাজস্থান

মুম্বই থেকে বডোদরা পাঁচ-ছ’ ঘণ্টার ট্রেন জার্নি। সব চেয়ে ভালো ট্রেন মুম্বই সেন্ট্রাল থেকে সকাল ৬.২৫-এর শতাব্দী এক্সপ্রেস। বডোদরা পৌঁছোয় সকাল ১১টায়। ভারতের অন্য জায়গা থেকে এলে মুম্বই বা দিল্লি হয়ে বডোদরা আসা ভালো।

 ভারতের প্রায় সব বড়ো শহরের সঙ্গে বডোদরা বিমানপথে যুক্ত। 

shri aurovanda niwas, vadodara
শ্রীঅরবিন্দ নিবাস, বডোদরা।

শ্রীঅরবিন্দের স্মৃতি বিজড়িত বডোদরা পৌঁছে প্রথম দিন দেখে নিন সুরসাগর লেক, লেকের পাড়ে ন্যায় মন্দির, তিলক রোডে সওয়াজি বাগ, শ্রীঅরবিন্দ নিবাস, স্টেশন থেকে তিন কিমি দূরে ই এম ই স্টিল টেম্পল, নন্দলাল বসুর দেওয়াল-অঙ্কন সমৃদ্ধ কীর্তি মন্দির, বরোদা মিউজিয়াম অ্যান্ড আর্ট গ্যালারি, শ্রী সওয়াজি সরোবর ইত্যাদি।

দ্বিতীয় দিন চলুন চম্পানের-পাওয়াগড়-জম্বুঘোড়া।

jama masjid, champaner
জামা মসজিদ, চম্পানের।

ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত চম্পানের-পাওয়াগড় প্রত্নতাত্ত্বিক পার্ক ১৫২৩-এ সুলতান বাগেড়ার তৈরি জামা মসজিদ শৈল্পিক উৎকর্ষে অনবদ্য। দেখে নিন কেভাদা মসজিদ, লীলা গুম্বজ কি মসজিদ, নাগিনা মসজিদ ও সেনোট্যাফ। পাহাড়ের নীচে রাজপুত-কীর্তি সাত মাইল প্রাসাদ। মাচি থেকে দেড় কিমি হেঁটে বা ৭০০ মিটার দীর্ঘ রোপওয়ে চড়ে পৌঁছে যান ৮২০ মিটার উঁচু পাওয়াগড়ের পাহাড়চুড়োয়। সোলাঙ্কিদের দুর্গ ও প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ দেখুন। ২২৫ সিঁড়ি উঠে পাওয়াগড় শিখরে দেখুন মহাকালিকা মন্দির। আছে লাকুলিসা মন্দির, এক গুচ্ছ জৈন মন্দির, দুধিয়া তালাও, ছাঁছিয়া তালাও, ত্রিতলিকা চম্পাবতী মহলচম্পানের-পাওয়াগড় দেখে চলুন ২০ কিমি দূরের জম্বুঘোড়া অভয়ারণ্য। সবুজ জঙ্গল-পাহাড়-জলাশয়ে মোড়া প্রকৃতিবীক্ষণ কেন্দ্র।

তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম দিন ও ষষ্ঠ দিন – রাত্রিবাস অমদাবাদ

বডোদরা  থেকে অমদাবাদ  আসার জন্য সারা দিন অনেক ট্রেন রয়েছে। সকালের দিকে যে কোনো ট্রেন ধরে ঘণ্টা দুয়েকে চলে আসুন অমদাবাদ। বাসও চলে মুহুর্মুহু। আর যদি গাড়ি ভাড়া করে আসেন তা হলে বডোদরা থেকে ৮৯ কিমি দূরের ডাকোর দেখে সেখান থেকে ৯২ কিমি দূরের অমদাবাদ পৌঁছোন। ডাকোরে দেখুন রণছোড়জি তথা শ্রীকৃষ্ণের মন্দির

kankaria lake, ahmedabad
কাঁকারিয়া লেক, অমদাবাদ।

সবরমতীর ধারে অমদাবাদ। এখানে দ্রষ্টব্য অনেক। প্রায় তিনটে দিন লেগে যায় অমদাবাদ দেখতে। শুরু করুন রিভার ফ্রন্ট দিয়ে। চলুন লাল দরোজার কাছে সিদি সৈয়দ জালি মসজিদ। এর পর ভদ্রা ফোর্ট ও ভদ্রকালী মন্দির দেখুন। তার পর চলুন সরখেজ রোজায় সুলতান মামুদ বেগারার সমাধি দেখতে। দেখুন রানি সিপ্রির মসজিদ, স্বামীনারায়ণ মন্দির, জামা মসজিদ, তিন দরওয়াজা। দেখুন এক গুচ্ছ মিউজিয়াম — ক্যালিকো মিউজিয়াম অব টেক্সটাইলস, বেচার ইউটেনসিল মিউজিয়াম, কাইট মিউজিয়াম দেখে নিন সর্দার পটেল মিউজিয়াম। বিনোদনের হরেক ব্যবস্থা সহ কাঁকারিয়া হ্রদ। হ্রদের পাড়ে বাল বাটিকা।

দেখুন গান্ধীজির গড়া সবরমতী আশ্রম। এলিস ব্রিজে সবরমতী পেরিয়ে শহর থেকে ৭ কিমি উত্তরে সবরমতীর ধারে আশ্রম। এলিস ব্রিজে সবরমতী পেরোনোর আগে দেখুন ভিক্টোরিয়া গার্ডেন

adalaj vav
আদালজ ভাভ।

রয়েছে আরও দ্রষ্টব্য — শাহ আলমের রৌজা (শহর থেকে ৩ কিমি দক্ষিণ পুবে), রানি রূপমতী মসজিদ (মির্জাপুরে), মসজিদ-ই-নাগিরা (মানেকচকে), দরিয়া খাঁয়ের সমাধি (গুজরাতের সর্বোচ্চ গম্বুজ), আদালজ ভাভ তথা স্টেপওয়েল (১৯ কিমি), অক্ষরধাম মন্দির (২৩ কিমি দূরে গান্ধীনগরে) ইত্যাদি।

অমদাবাদ অবস্থানকালে এক দিন ঘুরে আসুন লোথাল ও নল সরোবর – অমদাবাদ থেকে ৭৫ কিমি, ট্রেনে তিন ঘণ্টার পথ লোথাল। বাসও চলে। তবে সময় বাঁচাতে গাড়ি ভাড়া করে নেওয়াই ভালো। সিন্ধু সভ্যতার সমসাময়িক সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে লোথালে। বলা হয়, হরপ্পা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ৫০০ বছরে পরেও লোথাল সভ্যতা টিকে ছিল। পরবর্তী কালে বন্যায় ধ্বংস হয় এই সভ্যতা। লোথাল দেখে চলুন ৪০ কিমি দূরের নল সরোবর পাখিরালয়। দেশ-বিদেশ থেকে আসা পাখিরা শীতে আস্তানা গাড়ে নল সরোবরের বেট থেকে বেটে। বেট অর্থে দ্বীপ। নল সরোবর দেখে ফিরে আসুন ৬৬ কিমি দূরের অমদাবাদে।

nal sarovar
নল সরোবর

সপ্তম দিন – রাত্রিবাস মহেসানা

অমদাবাদ থেকে সকালের ট্রেন বা বাস ধরে ৭০ কিমি দূরের মহেসানা আসুন। ঘণ্টা দুয়েক সময় লাগবে। মহেসানা থেকে গাড়ি ভাড়া করে প্রথমে চলুন বহুচরাজি৩৯ কিমি দূরে বহুচরাজিতে দেখে নিন দেবী বহুচরাজি তথা সাত বাহনে মা দুর্গাকে। এখান থেকে চলুন ১৬ কিমি দূরে মধেরা। দেখুন আট শতকে তৈরি শিল্পসুষমা মণ্ডিত ভাস্কর্যে অনবদ্য সূর্য মন্দির। এখান থেকে চলুন ৩৩ কিমি দূরের সোলাঙ্কি রাজাদের রাজধানী পাটন। দেখে নিন ১০৫০ সালে তৈরি গুজরাতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্টেপওয়েল রানি কি ভাভ। ফিরে আসুন মহেসানায়।

ambaji temple
অম্বাজি মন্দির।

অষ্টম দিন ও নবম দিন – রাত্রিবাস মাউন্ট আবু

অষ্টম দিন একটা গাড়ি ভাড়া করে সক্কালেই বেরিয়ে পড়ুন মহেসানা থেকে। চলুন ১২৩ কিমি দূরে অম্বাজি। অম্বাজি দর্শন এগিয়ে চলুন ৫২ কিমি দূরে রাজস্থানের মাউন্ট আবু। মহেসানা থেকে অম্বাজি যাওয়ার পথে দেখে নিতে পারেন তরঙ্গ পাহাড়ে ৫টি দিগম্বর ও ৫টি শ্বেতাম্বর জৈন মন্দির

(মাউন্ট আবু কী ভাবে ঘুরবেন, দেখে নিন শীতে চলুন /২ : থর ঘুরে আরাবল্লি হয়ে জঙ্গলের রাজস্থানে)

দশম দিন – ঘরে ফেরা।

আবু রোড কলকাতা ফেরার একমাত্র ট্রেন সাপ্তাহিক কলকাতা এক্সপ্রেস। তাই জয়পুর বা দিল্লি হয়ে ফেরাই সুবিধাজনক। মুম্বই বা অমদাবাদের সঙ্গেও সরাসরি দৈনিক ট্রেন সংযোগ রয়েছে।

কোথায় থাকবেন

একমাত্র অমদাবাদ ও মাউন্ট আবু ছাড়া কোথাওই গুজরাত পর্যটনের কোনো হোটেল নেই। অমদাবাদে গান্ধী আশ্রমের উলটো দিকে রয়েছে গুজরাত পর্যটনের হোটেল তোরণ গান্ধী আশ্রম। অনলাইনে বুক করার জন্য লগইন করুন booking.gujarattourism.com। এ ছাড়া সব জায়গাতেই রয়েছে বেসরকারি হোটেল এবং রিসোর্ট। হোটেল বুকিং-এর একাধিক ওয়েবসাইট থেকে তা বুক করতে পারেন। মাউন্ট আবুতে রাজস্থান পর্যটনের হোটেল আছে। অনলাইন বুকিং https://rtdc.tourism.rajasthan.gov.in/

sabarmati gandhi ashram
সবরমতী গান্ধী আশ্রম।
কী ভাবে ঘুরবেন

(১) বডোদরা  থেকে ৪৫ কিমি দূরে চম্পানের, আরও ৪ কিমি দূরে পাওয়াগড়। বডোদরা থেকে নিয়মিত বাস পাওয়া যায় চম্পানের-পাওয়াগড় পথে হিল স্টেশন মাচি পর্যন্ত। গাড়ি ভাড়া করেও আসতে পারেন। গাড়ি ভাড়া করে এলে জম্বুঘোড়া অভয়ারণ্য ঘুরে নেওয়া সুবিধার।

(২) অমদাবাদে স্থানীয় গাড়ি ভাড়া করে ঘুরুন।

মনে রাখবেন

(১) নল সরোবর দেখার জন্য অনুমতি সংগ্রহ করবেন conservator of forests, sector 16, gandhinagar, ph. 02715-245037

(২) লোথালে প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের সংগ্রহশালা খোলা থাকে ছুটির দিন ছাড়া সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।

(৩) যদি মাউন্ট আবু আগে দেখা থাকে তা হলে সরাসরি আবু রোড থেকে ঘরে ফেরার ট্রেন ধরুন।

(৪) ট্রেনের বিস্তারিত সময়ের জন্য দেখে নিন erail.in 

(৫) বেসরকারি হোটেল বুকিং-এর বিভিন্ন ওয়েবসাইট www.goibibo.com , www.makemytrip.com , www.trivago.in ,  www.yatra.com , www.hotelscombined.com ,  www.tripadvisor.in , www.holidayiq.com ইত্যাদি। 

 

 

0 Comments
Share
winter-destinations-part-two-after-visiting-thar-a-trip-to-rajasthans-jungle-via-aravalli

শীতে চলুন /১-এ রাজস্থানের দু’টি ভ্রমণ পরিকল্পনা  দেওয়া হয়েছিল। এ বার আরও দু’টি। ঘুরে আসুন থর মরুভূমি সংলগ্ন দর্শনীয় স্থান অথবা আরাব্বলির কোল থেকে সিটি অব ডন ছুঁয়ে ইতিহাসখ্যাত চিতৌর।তার পর বুঁদির কেল্লা হয়ে বাঘ দেখতে জঙ্গলে। 

ভ্রমণ ছক ১:  বিকানের-জৈসলমের-বাড়মের-জোধপুর

প্রথম দিন – রাত্রিবাস বিকানের

হাওড়া থেকে সরাসরি বা দিল্লি হয়ে এলে সকালেই বিকানের পৌঁছে যাবেন। দিল্লি থেকে ইন্টারসিটি ধরে এলে বিকেলে বিকানের। মুম্বই থেকে বিকানের এলে, সেটিও বিকেলে বিকানের পৌঁছোয়।

কলকাতা থেকে বিকানের যাওয়ার সরাসরি দৈনিক ট্রেন জোধপুর এক্সপ্রেস। হাওড়া থেকে রাত ১১.৩৫-এ ছেড়ে বিকানের পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল পৌনে ৯টায়। এ ছাড়াও দু’টি সাপ্তাহিক ট্রেন আছে – হাওড়া থেকে জৈসলমের এক্সপ্রেস (পৌঁছোয় সন্ধ্যায়) এবং কলকাতা স্টেশন থেকে প্রতাপ এক্সপ্রেস (পৌঁছোয় ভোরে)। মুম্বই বা চেন্নাই থেকে ট্রেনও এলে বিকেলে বিকানের পৌঁছোয়। দেশের যে কোনো জায়গা থেকে দিল্লি এসে সেখান থেকেও ট্রেনে বিকানের আসা যায়। দিল্লি-বিকানের সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস দিল্লি সরাই রোহিলা থেকে রাত ১১.৩৫-এ ছেড়ে বিকানের পৌঁছোয় সকাল ৭.২০ মিনিটে এবং ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস সকাল ৮.৪০-এ সরাই রোহিলা থেকে ছেড়ে  বিকানের পৌঁছোয় বিকেল ৪.৩৫-এ।  

দেশের যে কোনো বড়ো শহর থেকে বিমানে জয়পুর এসে সেখান থেকে ট্রেনে বিকানের আসা যায়। সময় লাগে ট্রেন বিশেষে সাড়ে ৬ ঘণ্টা থেকে সাড়ে ৯ ঘণ্টা। ট্রেনে দিনের যে কোনো সময়ে বিকানের পৌঁছোনো যায়।  সড়কপথে বাস বা গাড়ি ভাড়া করেও আসা যায়, দূরত্ব ৩৪২ কিমি।   

junagarh fort
জুনাগড় ফোর্ট। ছবি সৌজন্যে ফেমাস প্লেসেস ইন ইন্ডিয়া।

দ্বিতীয় দিন – সারা দিন বিকানের ঘুরে রাতে বাস ধরুন জৈসলমের যাওয়ার জন্য।

বিকানেরে দেখে নিন জুনাগড় দুর্গ, গঙ্গা গোল্ডেন জুবিলি মিউজিয়াম, লালগড় প্রাসাদ, ভাণ্ডেশ্বর ও ষণ্ডেশ্বর জৈন মন্দির কমপ্লেক্স (৫ কিমি), দেবী কুণ্ড সাগর (৮ কিমি), ক্যামেল ব্রিডিং ফার্ম (৮ কিমি), গজনের স্যাংচুয়ারি ও প্রাসাদ (বিকানের-জৈসলমের পথে ৩১ কিমি) এবং দেশনোকে করণীমাতা মন্দির (বিকানের-অজমের পথে ৩২ কিমি)

তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম দিন –  রাত্রিবাস জৈসলমের

বিকানের থেকে জৈসলমের ৩৩০ কিমি। বাসে ঘণ্টা আটেক সময় লাগে। ভোরেই পৌঁছে যান জৈসলমের।

জৈসলমের অবস্থানকালে গাড়ি ভাড়া করে নিন। প্রথম দিন দেখে নিন সোনার কেল্লা, রাজ কা মহল, নাথমলজি কি হাভেলি, পাটোয়া কি হাভেলি, সেলিম সিংজি কি হাভেলি আর গদিসর লেক

jaisalmer fort
সোনার কেল্লা। ছবি সৌজন্যে ট্রান্স ইন্ডিয়া ট্রাভেলস।

দ্বিতীয় দিন সকালে দেখে নিন ভাটি রাজাদের ছত্তীশ বড়াবাগ, ভাটি রাজাদের পূর্বতন রাজধানী লোধুর্বা ও মরুভূমির বুকে মরুদ্যান অমরসাগর। জৈসলমেরে ফিরে দুপুরের খাওয়া সেরে চলুন রাজকীয় বাগিচা মূলসাগর, মিউজিয়াম নগরী কুলধ্রা হয়ে স্যাম স্যান্ড ডিউনস (জৈসলমের থেকে ৪২ কিমি পশ্চিমে)। মরুভূমির বুকে রমণীয় সূর্যাস্ত দেখুন।

ভ্রমণের পঞ্চম দিনে অর্থাৎ জৈসলমের থাকার তৃতীয় দিনে ডের্জার্ট ন্যাশনাল পার্কে উটের গাড়িতে সাফারি করুন। বিকেলে খুরিতে (জৈসলমের থেকে ৪০ কিমি দক্ষিণে) সূর্যাস্ত দেখে রাজস্থানের সংগীত-নৃত্য উপভোগ করে জৈসলমের ফিরুন।

ষষ্ঠ দিন – রাত্রিবাস বাড়মের

জৈসলমের থেকে ১৩৫ কিমি দূরের বাড়মের বাসে ঘণ্টা চারেকের পথ। গাড়িতে এলে পথে ১৮ কোটি বছরের ১৮টি জুরাসিক বৃক্ষের ফসিল দেখে নেওয়া যায় উড ফসিল পার্কে। তবে জৈসলমের থেকে ১৭ কিমি দূরের এই দ্রষ্টব্যটি জৈসলমের অবস্থানকালে তৃতীয় দিন সকালে দেখে নেওয়া যায়।

kiradu temple
কিরাডুর মন্দিরগাত্রে কারুকাজ। ছবি সৌজন্যে রহস্যময়।

বাড়মেরে দেখুন পাহাড়ের শিরে শ্বেতপাথরের অষ্টভুজা দুর্গা, ৩৮ কিমি দূরে পাকিস্তান সীমান্তের পথে হাজার বছরের মন্দির স্থাপত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কিরাডু এবং শহর থেকে সাত কিমি দূরে মহাবাড় বালিয়াড়ি থেকে অপরূপ সূর্যাস্ত

সপ্তম, অষ্টম ও নবম দিনজোধপুর

সপ্তম দিন সকালেই রওনা হন জোধপুর, দূরত্ব ২০০ কিমি। বাসে চলে আসুন। ট্রেনও পাবেন। ভোর সাড়ে চারটে থেকে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত গোটা ছয়েক ট্রেন পাবেন। ট্রেন বিশেষে সময় লাগে সাড়ে ৩ ঘণ্টা থেকে ৫ ঘণ্টা।

প্রথম দিন পৌঁছে দেখে নিন মেহরনগড় ফোর্ট ও দুর্গের পাদদেশে জশবন্ত সিংহের স্মারকসৌধ তথা ছত্তিশ জশবন্ত থাডা

জোধপুর অবস্থানকালে দ্বিতীয় দিন সকালে দেখে নিন উমেদ ভবন প্যালেস, কাছেই মহারাজার রেলওয়ে ক্যারেজ, সদর গভর্নমেন্ট মিউজিয়াম। দুপুরে চলুন শহর থেকে ৮ কিমি উত্তরে ৬-১৪ শতকের পরিহারদের রাজধানী মান্ডোর। দেখে নিন মান্ডোরের এক কিমি আগে বালসমন্দ হ্রদ

mehrangarh fort
মেহরনগড় ফোর্ট ও জশবন্ত থাডা। ছবি সৌজন্যে জার্নি প্ল্যানার।

তৃতীয় দিন চলুন সকালে চলুন ৬৬ কিমি উত্তরে থর মরুভূমির বুকে ওশিয়া৮-১১ শতকে পরিহারদের তৈরি হিন্দু ও জৈন মন্দিরগুলির ভাস্কর্য দেখার মতো। জোধপুর থেকে ট্রেনে দেড় ঘণ্টার পথ ওশিয়া। বাসে বা গাড়ি ভাড়া করেও আসা যায়। ওশিয়া থেকে ফিরে বিকেলে চলুন ১০ কিমি পশ্চিমে কৈলানা হ্রদ। দেখুন সূর্যাস্ত। মন ভরে যাবে।

দশম দিন – ঘরের পথে রওনা।

জোধপুর থেকে সরাসরি ট্রেন আছে হাওড়া, দিল্লি ও মুম্বইয়ের। কলকাতার যাত্রীরা দিল্লি হয়েও ফিরতে পাত্রেন।

ভ্রমণ ছক ২: মাউন্ট আবু-উদয়পুর-চিতৌড়গড়-বুন্দি-রনথম্ভৌর-আগরা

প্রথম ও দ্বিতীয় দিনমাউন্ট আবু

nakki lake
নক্কি লেক। ছবি সৌজন্যে ইউটিউব।

১২১৯ মিটার উঁচু মাউন্ট আবুর কাছের রেলস্টেশন আবু রোড, দূরত্ব ২৯ কিমি। হাওড়া থেকে সরাসরি ট্রেন সাপ্তাহিক অমদাবাদ এক্সপ্রেস। তবে দিল্লি বা জয়পুর হয়ে আসাই সুবিধার। মুম্বই বা অমদাবাদ থেকেও সরাসরি আবু রোড পৌঁছোনো যায়। যেখান থেকেই আসুন আবু রোড স্টেশন থেকে বাস বা গাড়ি ভাড়া করে মাউন্ট আবু পৌঁছে প্রথম দিন দেখে নিন সানসেট পয়েন্ট থেকে আরাবল্লির কোলে মনোরম সূর্যাস্ত। হনিমুন পয়েন্ট থেকেও সূর্যাস্ত দেখতে পারেন। কাছেই নক্কি লেক

দ্বিতীয় দিন প্রথমে চলুন শহর থেকে ১৫ কিমি উত্তর-পূর্বে আরাবল্লির সর্বোচ্চ শিখর গুরুশিখর (১৭৭২ মিটার), রয়েছে ব্রহ্মা-বিষ্ণু–মহেশ্বরের মন্দির, পাহাড়ের মাথায় দত্তাত্রেয় মুনির পায়ের ছাপ। এর পর দেখে নিন চৌহান রাজাদের তৈরি অচলগড়, গড় থেকে নীচে অচলেশ্বর শিবের মন্দির। এর পর চলে আসুন শ্বেতপাথরের জৈন মন্দিররাজি দিলওয়ারা, কারুকার্য, অলংকরণ ও ভাস্কর্যে অনন্য। শহরের কাছাকাছি এসে দেখে নিন অর্বুদাদেবী তথা অধরাদেবী তথা দুর্গার মন্দির। দেখে নিন নক্কি লেকের কাছে টোড রকআগের দিন হনিমুন পয়েন্ট না যাওয়া হয়ে থাকলে চলুন সেখানে।

Dilwara temple
দিলওয়ারা মন্দির। ছবি সৌজন্যে ইউটিউব।

তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম দিন ও ষষ্ঠ দিনউদয়পুর

আবু রোড থেকে ৫-৬ ঘণ্টায় বাসে চলে আসুন উদয়পুর। সকালের বাস ধরে এলে দুপুরের মধ্যে পৌঁছে যাবেন উদয়পুর। ট্রেনেও আসা যায়, তবে বাসে আসাই সুবিধার।

প্রথম দিন দেখে নিন সিটি প্যালেস

উদয়পুর অবস্থানকালে দ্বিতীয় দিন উদয়পুর দেখে নিন। দেখে নিন ক্রিস্টাল গ্যালারি, মহারানাদের ভিন্টেজ গাড়ির প্রদর্শনী, সিটি প্যালেসের উত্তরে জগদীশ মন্দির, পিছলি গ্রামে লেক পিছোলা ও লেকের মাঝে জগনিবাস প্রাসাদ, লেকের দক্ষিণ পাহাড়ে জগমন্দির, লেকের পিছনে সজ্জননিবাস বাগ, লেকের উত্তরে ফতেহ সাগর, ফতেহ সাগরের পূবে বাঁধের নীচে সহেলিয়োঁ–কি-বাড়ি, ফতেহ সাগরে রমণীয় দ্বীপ-উদ্যান নেহরু পার্ক, বিপরীতে মোতি মাগরি পাহাড়ে প্রতাপ স্মারক, শহর থেকে ৫ কিমি পশ্চিমে সজ্জনগড় তথা মনসুন প্যালেস, ৬ কিমি উত্তর-পশ্চিমে উদয়পুরের নবতম আকর্ষণ শিল্পীগ্রাম এবং শহর থেকে ৩ কিমি পুবে শিশোদিয়া রাজাদের অতীতের রাজধানী পাহাড়ে ঘেরা আহার

udaipur city palace
উদয়পুর সিটি প্যালেস। ছবি সৌজন্যে উইকিপিডিয়া।

তৃতীয় দিন তথা ভ্রমণের পঞ্চম দিন একটা গাড়ি ভাড়া করে সারা দিনের জন্য বেরিয়ে পড়ুন শহর থেকে উত্তরে। চলুন রাজসমন্দ-কাঁকরোলি-নাথদ্বার-দেবীগড়-একলিঙ্গজি-নাগদা। প্রথমে চলুন ৬৬ কিমি দূরে রাজসমন্দ লেক এবং কাঁকরোলি। দেখুন মহারানা রাজ সিংহের তৈরি ৭.৭ বর্গ কিমি আয়তন বিশিষ্ট লেক, লেকের পাড়ে শিলালিপি, শ্বেতপাথরের ন’টি মণ্ডপ তথা নওচৌকি, বাগিচা, শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকাধীশ মন্দির ইত্যাদি। এ বার উদয়পুরের দিকে ১৬ কিমি এসে বৈষ্ণবতীর্থ নাথদ্বার, দেখুন শ্রীকৃষ্ণের মন্দির। নাথদ্বার থেকে উদয়পুরের দিকে প্রায় ১৬-১৭ কিমি এগিয়ে এলে দেবীগড়, ১৮ শতকের ফোর্ট প্যালেস। আরও ৭-৮ কিমি এসে একলিঙ্গজি, ৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে তৈরি পিরামিড ধাঁচের মন্দির কমপ্লেক্স। উদয়পুরের দিকে একলিঙ্গজির একেবারে গায়েই নাগদা, রাওয়াল নাগাদিত্যের ১১ শতকের রাজধানী, প্রাচীন নগরী। ফিরে আসুন উদয়পুরে।

kumbhalgarh fort
কুম্ভলগড় ফোর্ট। ছবি সৌজন্যে ট্রাভেল ট্র্যাঙ্গেল।

উদয়পুরে অবস্থানকালে শেষ দিন চলুন রনকপুর-কুম্ভলগড়-হলদিঘাটি। সক্কালেই গাড়ি ভাড়া করে বেরিয়ে পড়ুন। প্রথম গন্তব্য ৯০ কিমি দূরের রনকপুর২৯টি জৈন মন্দিরের কমপ্লেক্স, দিলওয়ারাতুল্য। এখান থেকে চলুন ৫০ কিমি দূরে আরাবল্লি পাহাড়ের ঢালে ১০৮৭ মিটার উঁচুতে কুম্ভলগড় দুর্গ। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাচীরে ঘেরা দুর্গ, রানা কুম্ভের তৈরি। দুর্গের নানা মহলে ফ্রেস্কো চিত্র। বহু মন্দির। র‍্যামপার্ট থেকে মাড়োয়ারের সমতল ও আরাবল্লির জঙ্গল-পাহাড় সুন্দর দৃশ্যমান। চার কিমি দূরে কুম্ভলগড় স্যাংচুয়ারি। এ বার উদয়পুর ফেরার পথে চলুন হলদিঘাটি, আকবরের বাহিনীর সঙ্গে রানা প্রতাপের সেই যুদ্ধস্থল, যেখানে প্রাণ দিয়েছিল প্রতাপের প্রিয় ঘোড়া চেতক, কুম্ভলগড় থেকে ৫০ কিমি। হলদিঘাটি দর্শন শেষে ফিরে আসুন ৪০ কিমি দূরের উদয়পুর।

সপ্তম দিন – রাত্রিবাস চিতৌড়গড়

উদয়পুর থেকে ট্রেনে সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ, বাসেও একই সময় লাগে। উদয়পুর-চিতৌড়গড় বাস চলে মুহুর্মুহু। এক দিন থেকে দেখে নিন রানি পদ্মিনী, জহরব্রত, মীরাবাঈ, রানা কুম্ভের স্মৃতিবিজড়িত চিতৌড়গড়

অষ্টম ও নবম দিন – রাত্রিবাস কোটা

ট্রেন আছে বটে, তবে চিতৌড়গড় থেকে কোটা বাসে আসাই ভালো। ভোর থেকেই বাস রয়েছে। বাসের সময় লাগে সাড়ে চার ঘণ্টা থেকে ছ’ ঘণ্টা।

কোটায় দেখে নিন চম্বল নদীর পাড়ে রাও মাধো সিংজির গড়া দুর্গ। দেখে নিন বিভিন্ন মহল। দুর্গের ডাইনে রাও মাধো সিং মিউজিয়াম। দেখুন ১৮ শতকের ভীম মহল, শহরের উত্তরে উমেদ ভ্রমণ প্রাসাদ, দুর্গের পিছনে চম্বলের ওপর কোটা ব্যারেজ, কিশোর সাগর, দ্বীপ মহল, ব্রিজরাজ ভবন প্রাসাদজওহর বিলাস গার্ডেন। সন্ধ্যায় চম্বল উদ্যান অবশ্য দ্রষ্টব্য।

taragarh fort
তারাগড় ফোর্ট। ছবি সৌজন্যে রাজস্থান ট্রিপ।

বুঁদির কেল্লার কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। চিতোরের রানা সেই যে পণ করেছিলেন। সেই বুঁদির কেল্লা কোটা থেকে সাড়ে ৩৮ কিমি। আধ ঘণ্টা অন্তর বাস আছে। গাড়ি ভাড়া করেও যেতে পারেন বুঁদি। দ্বিতীয় দিনে চলুন বুঁদি। বাসে করে এলে অটো বা টাঙা ভাড়া করে দেখে নিন ১৩৫৪-য় রাজস্থান শৈলীতে তৈরি বুঁদির কেল্লা তথা তারাগড় ফোর্ট, শহরের প্রান্তে রানিজি কি বাউড়ি, কেল্লা থেকে ৫ কিমি উত্তর-পশ্চিমে ফুল সাগর প্রাসাদ, চোগান গেটে নগর সাগর কুণ্ড, ক্ষার বাগে রাজ পরিবারের ছত্তিশ, জৈৎ সাগর লেক, লেকের উত্তর পাড়ে সুখ নিবাস। বুঁদি থেকে ফিরুন কোটায়। 

দশম দিন –  রাত্রিবাস রনথম্ভৌর

একাদশ দিন – রনথম্ভৌর ঘুরে রাত ১১টার (রনথম্ভৌর থেকে) হলদিঘাটি প্যাসেঞ্জার ট্রেন ধরে দ্বাদশ দিন সকাল ৬টায় পৌঁছে যান আগরা ফোর্ট স্টেশনে।  

কোটা থেকে রনথম্ভৌর ১৪৪ কিমি, বাসে তিন থেকে চার ঘণ্টার পথ। কিংবা বাসে বা ট্রেনে সোয়াই মাধোপুর এসে মিনিবাস বা গাড়িতে ১৪ কিমি দূরের রনথম্ভৌরে আসা যায়। সব চেয়ে ভালো হয় ট্রেনে এলে। প্রচুর ট্রেন আছে। তবে সব চেয়ে সুবিধাজনক ভোর ৫.২০-এর আগস্ট ক্রান্তি এক্সপ্রেস, ৫.৫৫-এর নিজামুদ্দিন শতাব্দী, ৭.১৫-এর যমুনা ব্রিজ আগরা প্যাসেঞ্জার অথবা  কিংবা ৭.৪০-এর দাওদাই এক্সপ্রেস। খুব বেশি হলে ঘণ্টা দুয়েক লাগে ট্রেনে। তবে সোয়া ৭টার প্যাসেঞ্জার ট্রেনটি একেবারে রনথম্ভৌর পৌঁছে দেয় কিছু কম তিন ঘণ্টা সময়ে।

ranathambore national park
রনথম্ভৌর ন্যাশনাল পার্ক। ছবি সৌজন্যে নেচার সাফারি ইন্ডিয়া।

দু’টো সাফারি করার চেষ্টা করুন। প্রথমটা যে দিন পৌঁছোবেন সে দিন বিকেলে, দ্বিতীয়টি পরের দিন সকালে। সাফারি করা ছাড়া আর দেখুন পাহাড়ের ওপর কেল্লা। পরের দিন সকালে সাফারি করে এসে কেল্লা দেখুন।  রাতের ট্রেন ধরে রওনা হয়ে যান আগরা।

দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ দিন – রাত্রিবাস আগরা

(আগরা কী ভাবে ঘুরবেনপড়ুন: শীতে চলুন/১: গড়-জঙ্গল-হাভেলির রাজস্থান)

চতুর্দশ দিন – ঘরের পথে রওনা।

দেশের যে কোনো শহরের সঙ্গে ট্রেন পথে আগরার যোগাযোগ রয়েছে। না হলে দিল্লি হয়ে ঘরে ফিরুন।

কোথায় থাকবেন

সব জায়গাতেই রয়েছে বেসরকারি হোটেল। হোটেল বুকিং-এর বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে তাদের সন্ধান পেয়ে যাবেন। সব জায়গায় পাবেন রাজস্থান পর্যটনের হোটেল। আগরায় বেসরকারি হোটেল ছাড়াও পাবেন উত্তরপ্রদেশ পর্যটনের হোটেল।

প্রয়োজনীয় তথ্য

(১) ভ্রমণ ছক ১-এ বাড়মের থেকে রাত ১২টার ট্রেন ধরলে ভোর সোয়া ৫টায় জোধপুর পৌঁছোনো যায়। সে ক্ষেত্রে সকালে মেহরনগড় ফোর্ট, জশবন্ত থাডাউমেদ ভবন প্যালেস, মহারাজার রেলওয়ে ক্যারেজ, সদর গভর্নমেন্ট মিউজিয়াম দেখে নিন। দুপুরে চলুন মান্ডোর। জোধপুর অবস্থানে দ্বিতীয় দিন চলুন ওশিয়া। সেখান থেকে ফিরে বিকেলে চলুন কৈলানা হ্রদ।

এই প্রোগ্র্যাম করলে ভ্রমণ এক দিন কমে যাবে।

(২) জৈসলমেরে সোনার কেল্লা দেখার জন্য গাইডের সাহায্য নিন।

(৩) ডের্জার্ট ন্যাশনাল পার্কে সাফারি করার জন্য প্রয়োজনীয় ফি দিয়ে অনুমতিপত্র সংগ্রহ করতে হবে। জৈসলমেরে যে হোটেলে উঠবেন তারা বলে দেবে কোথায় এই অনুমতিপত্র মেলে।

(৪) মাউন্ট আবুতে রাজ্য পরিবহণের সারা দিনের কন্ডাক্টেড ট্যুরে দ্রষ্টব্যগুলো দেখে নিতে পারেন। সরকারি বাসস্ট্যান্ড থেকেই বাস মেলে।

(৫) উদয়পুরের সিটি প্যালেস দেখার জন্য গাইডের সাহায্য নেওয়া ভালো। ঘণ্টা তিনেক সময় লাগে।

(৬) রাজ্য পর্যটনের ব্যবস্থাপনায় কন্ডাক্টেড ট্যুরে চিতৌড়গড় দেখানোর ব্যবস্থা আছে। তবে মাঝে মাঝে এটি বন্ধ হয়ে যায়। চিতৌড়গড়ে যে হোটেলে উঠবেন সেখানে খোঁজ করে নেবেন। অন্যথায় গাড়ি ভাড়া করে নিন।

padmini palace, chittoregarh
রানি পদ্মিনী ভবন, চিতৌড়গড়। ছবি সৌজন্যে চিতৌড়গড় ডট কম।

(৭) চিতৌড়গড় থেকে রাত্রি ১২.০৫-এর কোটা প্যাসেঞ্জার ধরলে ভোর ৫টায় কোটা পৌঁছোনো যায়। সে ক্ষেত্রে সপ্তম দিন উদয়পুর থেকে চিতৌড়গড় এসে চিতৌড়গড় ঘুরে সে দিনই রাতে কোটা প্যাসেঞ্জার ধরা যায়। অষ্টম দিনে কোটা-বুঁদি দেখে নবম দিন সকালেই সোয়াই মাধোপুর গেলে ভ্রমণ এক দিন কমিয়ে দেওয়া যায়।

(৮) রনথম্ভৌরে যে হোটেলে থাকবেন, সেখানে সাফারির ব্যাপারে খোঁজখবর করে নিন।

(৯) আগরা আগে ঘোরা থাকলে রনথম্ভৌর থেকে আগরা হয়ে সরাসরি ঘরে ফিরে যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ভ্রমণ দু’টো দিন কমে যেতে পারে।

(১০) অনলাইন হোটেল বুকিং করার জন্য রাজস্থান পর্যটনের ওয়েবসাইট https://rtdc.tourism.rajasthan.gov.in/

(১১) অনলাইনে বাস বুকিং করার জন্য রাজস্থান পরিবহণ নিগমের ওয়েবসাইট https://rsrtconline.rajasthan.gov.in

(১২) রাজস্থান পর্যটনের কলকাতা অফিস – কমার্স হাউস, ২ গণেশচন্দ্র অ্যাভিনিউ, কলকাতা ৭০০০১৩, যোগাযোগ – ০৩৩ ২২১৩ ২৭৪০

(১৩) অনলাইনে বুকিং-এর জন্য উত্তরপ্রদেশ পর্যটনের ওয়েবসাইট https://uptourism.gov.in/

(১৪) ট্রেনের সময়ের জন্য দেখে নিন erail.in  

0 Comments
Share
winter-destinations-part-1-rajasthan-of-fort-jungle-and-haveli

আর দু’ মাসও নেই পুজোর। তাই পুজোয় ভ্রমণের পরিকল্পনা তো সারা বটেই, ট্রেনের টিকিট কাটা, হোটেল বুকিং, এ সব কাজও সাঙ্গ। যাঁরা পুজোয় বেড়াতে বেরোবেন না, তাঁরা নিশ্চয়ই শীতে বেড়ানোর প্ল্যান করছেন। আর শীতের শুরু যদি ধরে নিই বড়োদিনের ছুটি থেকে তা হলে আর সপ্তাহখানেক পরেই শুরু হয়ে যাবে ট্রেনে আসন সংরক্ষণ। তাই ভ্রমণ অনলাইন সাজিয়ে দিচ্ছে শীতে বেড়ানোর ছক। কোথায় যাবেন? তারই সুলুকসন্ধান। আজ প্রথম কিস্তি।

সত্যি কথা বলতে কি, শীতে বেড়ানোর আদর্শ জায়গা রাজস্থাননভেম্বর থেকে মার্চ, এই ক’ মাস রাজস্থান বেড়ানোর উৎকৃষ্ট সময়। তাই শীতের ভ্রমণের প্রথম কিস্তিতে রাজস্থানের দু’টি ভ্রমণছক সাজিয়ে দিচ্ছে।  

deeg fort
দীগ ফোর্ট। ছবি সৌজন্যে রেডিট।

ভ্রমণ ছক ১:  আগরা-ভরতপুর-দৌসা-জয়পুর-সরিস্কা-অলওয়র

প্রথম ও দ্বিতীয় দিন –  যেখান থেকেই যান আগরায় দু’টো দিন পুরো থাকুন।  

প্রথম দিন  দেখুন তাজমহল, আগরা ফোর্ট, ইতমাদ-উদ-দৌল্লা, সিকান্দ্রা, রাম বাগ, চিনি কা রৌজা,  দয়ালবাগ।দ্বিতীয় দিন সকালেই চলুন ফতেপুর সিকরি (৩৫ কিমি), সেখান থেকে ফিরে দেখে নিন সিকান্দ্রা

কলকাতা থেকে আগরা যাওয়ার ভালো ট্রেন দু’টো — হাওড়া থেকে জোধপুর এক্সপ্রেস ও শিয়ালদহ থেকে অজমের এক্সপ্রেস। জোধপুর এক্সপ্রেস হাওড়া থেকে রাত ১১.৩৫-এ ছেড়ে আগরা ফোর্ট পৌঁছোয় পরের দিন রাত পৌনে ৮টায়। অজমের এক্সপ্রেস  শিয়ালদহ থেকে রাত ১০.৫৫-য় ছেড়ে আগরা ফোর্ট পৌঁছোয় পরের দিন সন্ধে ৬.৩৫ মিনিটে। এ ছাড়া বেশ কিছু সাপ্তাহিক ট্রেন আছে। এগুলির বেশির ভাগই সন্ধে থেকে রাতের দিকে পৌঁছোয়। ট্রেনে বা বিমানে দিল্লি হয়েও আসতে পারেন। দিল্লি থেকে ট্রেন বিশেষে ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টার জার্নি আগরা। সক্কালেই দিল্লি থেকে আগরা পৌঁছোনোর বেশ কিছু ট্রেন আছে। দেশের সব বড়ো শহরের সঙ্গেই আগরা ট্রেনপথে যুক্ত।    

তৃতীয় দিন ও চতুর্থ দিন – রাত্রিবাস ভরতপুর। প্রথম দিন দেখে নিন লোহাগড় দুর্গ ও কেওলাদেও ঘানা জাতীয় উদ্যান। দ্বিতীয় দিন চলুন ৩৪ কিমি দূরের দীগ। দেখে নিন দীগ দুর্গ, সুরজমল প্রাসাদ বা গোপাল ভবন, সূর্য ভবন, গার্ডেন প্যাভিলিয়ন কেশব ভবন, রূপসাগরের শিশ মহল, পুরানা মহল, শ্বেতপাথরের হিন্দোলা প্রাসাদ ইত্যাদি। নিয়মিত বাস চলে, গাড়িও পাবেন।

আগরা থেকে ভরতপুর  ট্রেনে যাওয়াই সুবিধাজনক। ভোর থেকে ট্রেন। বেশির ভাগ ট্রেন মেলে আগরা ফোর্ট থেকে। ঈদগা আর ক্যান্টনমেন্ট থেকেও ট্রেন পাওয়া যায়। ঘণ্টা খানেক সময় লাগে। সড়কপথে আগরা থেকে ভরতপুর ৫৫ কিমি, বাস চলে নিয়মিত। গাড়ি ভাড়া করেও আসতে পারেন।

ভানগড় ফোর্ট। ছবি সৌজন্যে পোস্টোস্ট।

পঞ্চম দিন – রাত্রিবাস দৌসা। দৌসা থেকে সকালে চলে যান ১৩ কিমি দূরের ভান্ডারেজ। দেখে নিন প্রাসাদ আর রাজস্থানের সব চেয়ে আকর্ষণীয় স্টেপ-ওয়েল ভান্ডারেজ বাউড়ি। দৌসা ফিরে দুপুরের আহার সেরে চলুন ৩০ কিমি দূরে ভানগড় দুর্গ। ‘হানাবাড়ি’ বলে খ্যাত ভানগড় দুর্গে সন্ধে নামলে থাকা যায় না।

ভরতপুর থেকে সকাল ৬.০৮-এ আগরা ফোর্ট-অজমের ইন্টারসিটি ধরে দু’ ঘন্টায় চলে আসুন দৌসা।

ষষ্ঠ ও সপ্তম দিন – রাত্রিবাস জয়পুর। জয়পুরে দেখে নিন হাওয়া মহল, বিড়লা মন্দির, মোতি ডুংরি, অ্যালবার্ট হল মিউজিয়াম, নাহাড়গড় দুর্গ, জল মহল, জয়গড় দুর্গ, সিসোদিয়া রানি কি বাগ, বিদ্যাধরজি কি বাগ, যন্তর মন্তর, সিটি প্যালেস, অম্বর দুর্গ ও প্রাসাদ (১১ কিমি), গলতা ও সূর্য মন্দির (১০ কিমি পুবে, হেঁটে পাহাড়ে চড়া) ও সঙ্গানের (১৬ কিমি দক্ষিণ পশ্চিমে ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের জৈন মন্দির ও প্রাসাদ)।

দৌসা থেকে জয়পুর ট্রেনে আসাই সুবিধাজনক। সক্কাল থেকে ট্রেন আছে, ঘণ্টা দেড়েক সময় লাগে। বাসে বা গাড়িতেও আসা যায়। আগরা-জয়পুর জাতীয় সড়কের ওপর অবস্থিত দৌসা। দৌসা থেকে জয়পুর সড়কপথে ৫৮ কিমি।  

sariska tiger reserve
সরিস্কা টাইগার রিজার্ভ। ছবি সৌজন্যে রাজস্থান ট্যুর প্ল্যানার।

অষ্টম দিন – রাত্রিবাস সরিস্কা

সক্কাল সক্কাল জয়পুর থেকে বেরিয়ে বাসে বা গাড়িতে চলুন সরিস্কা, দূরত্ব ১১৩ কিমি। বিকেলে ও পরের দিন সকালে দু’টো সাফারি করার চেষ্টা করুন।

নবম দিন ও দশম দিন – রাত্রিবাস অলওয়র

নবম দিন সকালে সরিস্কায় একটা সাফারি করে রওনা হয়ে যান অলওয়র। বাসে বা গাড়িতে চলে আসুন ৩৭ কিমি পথ। গাড়িতে এলে পথে দেখে নিন শিলিশেড় লেক ও প্রাসাদ

অলওয়রে দেখে নিন সিটি প্যালেস তথা মিউজিয়াম, বালা কিলা বা অলওয়র দুর্গ, মুসি মহারানি কি ছত্রি, করণীমাতা মন্দির, পুরজন বিহার, বিনয় বিলাস প্রাসাদ (১০ কিমি, বিজয়সাগরের পাড়ে), জয়সমন্দ লেক (৬ কিমি) এবং শিলিশেড় লেক ও প্রাসাদ (যদি সরিস্কা থেকে আসার পথে দেখা না হয়ে থাকে)।

একাদশ দিন – দিল্লি হয়ে ফিরুন ঘরপানে। অলওয়র থেকে দিল্লি ১৬০ কিমি, মুহুর্মুহু বাস আছে। সকাল থেকে পরপর ট্রেন রয়েছে আলোয়ার-দিল্লি, সাড়ে তিন ঘণ্টা মতো সময় লাগে।

view from amer fort
অম্বর ফোর্ট থেকে। ছবি সৌজন্যে ইউটিউব।

ভ্রমণ ছক ২:  জয়পুর-ফতেপুর-বিকানের-অজমের

প্রথম ও দ্বিতীয় দিন – যেখান থেকেই যান জয়পুরে অন্তত পুরো দু’টো দিন থাকুন। জয়পুরে কী দেখবেন তা জানতে আগের ভ্রমণসূচির ষষ্ঠ ও সপ্তম দিন দেখে দিন।

ভারতের সব বড়ো শহরের সঙ্গে জয়পুর ট্রেন ও বিমানপথে সংযুক্ত। কলকাতা থেকে জয়পুর যাওয়ার ভালো ট্রেন দু’টো — হাওড়া থেকে জোধপুর এক্সপ্রেস ও শিয়ালদহ থেকে অজমের এক্সপ্রেস। জোধপুর এক্সপ্রেস হাওড়া থেকে রাত ১১.৩৫-এ ছেড়ে জয়পুর পৌঁছোয় পরের দিন রাত ১২.৩৫-এ। অজমের এক্সপ্রেস  শিয়ালদহ থেকে রাত ১০.৫৫-য় ছেড়ে জয়পুর পৌঁছোয় পরের দিন রাত ১১.৫৫-য়। এ ছাড়া দু’টি সাপ্তাহিক ট্রেন আছে। দিল্লি থেকে জয়পুর সাড়ে ৪ ঘণ্টা থেকে ৬ ঘণ্টার জার্নি, অসংখ্য ট্রেন।  

তৃতীয়, চতুর্থ দিন ও পঞ্চম দিন – রাত্রিবাস ফতেপুর। জয়পুর থেকে ফতেপুর আসুন বাসে, ১৬৬ কিমি, ঘনঘন বাস আছে। গাড়িতেও আসতে পারেন।

শেখাবতী অঞ্চলের মধ্যমণি ফতেপুর। রাও শেখা থেকে নাম শেখাবতী। শেখা তথা মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের বাস এই অঞ্চলে। তাদেরই অর্থে এখানকার ৩৬০টি গ্রাম জুড়ে গড়ে উঠেছে ফ্রেস্কো চিত্রে নানা আখ্যানে সুশোভিত নানা বাড়ি বা হাভেলি।

যে দিন জয়পুর থেকে পৌঁছোবেন সে দিন ফতেপুরে দেখে নিন গোয়েঙ্কা, ডেবরা, সিংহানিয়া, সারাওগি, পোদ্দার, জালান ইত্যাদিদের হাভেলি

freso painting on shekhawati haveli
শেখাবতীর হাভেলিতে ফ্রেসকো পেন্টিং। ছবি সৌজন্যে ইউটিউব।

পরের দিন একটা গাড়ি ভাড়া করে চলুন লছমনগড় (২২ কিমি), সেখান থেকে শিকার (৩৩ কিমি), সেখান থেকে নওয়লগড় (৩৪ কিমি), নওয়লগড় থেকে ঝুনঝুনু (৪০ কিমি), ঝুনঝুনু থেকে মান্ডোয়া (৩২ কিমি) ও মান্ডোয়া থেকে ফিরুন ফতেপুর (২১ কিমি)। দেখে নিন নানা হাভেলি, মন্দির ও গড়

পঞ্চম দিন গাড়ি ভাড়া করে চলুন স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতিধন্য খেতড়ি (১০৪ কিমি)। সক্কাল সক্কাল বেরিয়ে পড়ুন। সারা দিন ঘুরে দেখে নিন আরাবল্লি পাহাড়ের কোলে খেতড়ির রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম, রঘুনাথ মন্দির, ভোপালগড় দুর্গ, অজিত সাগর, বাগোর দুর্গ, সুখ মহল। রাতে ফিরে আসুন ফতেপুর।

gajner palace
গজনের প্রাসাদ। ছবি সৌজন্যে মাই গাইড রাজস্থান।

ষষ্ঠ ও সপ্তম দিন – রাত্রিবাস বিকানের। ফতেপুর থেকে বাসে বা গাড়িতে চলুন, ১৭২ কিমি রাস্তা।

বিকানেরে দেখে নিন জুনাগড় দুর্গ, গঙ্গা গোল্ডেন জুবিলি মিউজিয়াম, লালগড় প্রাসাদ, ভাণ্ডেশ্বর ও ষণ্ডেশ্বর জৈন মন্দির কমপ্লেক্স (৫ কিমি), দেবী কুণ্ড সাগর (৮ কিমি), ক্যামেল ব্রিডিং ফার্ম (৮ কিমি), গজনের স্যাংচুয়ারি ও প্রাসাদ (বিকানের-জৈসলমের পথে ৩১ কিমি) এবং দেশনোকে করণীমাতা মন্দির (বিকানের-অজমের পথে ৩২ কিমি)

অষ্টম ও নবম ও দশম দিন – রাত্রিবাস অজমের

বিকানের থেকে ২৫০ কিমি অজমের। বাসেই আসা প্রশস্ত। গাড়িতেও আসা যায়। গাড়িতে এলে পথে দেশনোকে করণীমাতা মন্দির দেখে নিতে পারেন। অজমের পৌঁছে প্রথম দিন দরগা শরিফ দেখে নিন।

পরের দিন দেখে নিন আড়াই-দিন-কা-ঝোপড়া, তারাগড় পাহাড়ে আকবর কা দৌলতখানা, দিগম্বর জৈন মন্দির সোনিজি কা নাসিয়া, আকবরের প্রাসাদে সরকারি মিউজিয়াম, দু’টি কৃত্রিম হ্রদ আনা সাগর ও ফয় সাগর  এবং আনা সাগরের পাড়ে জাহাঙ্গিরের গড়া দৌলত বাগ বাগিচা। 

pushkar lake
পুষ্কর হ্রদ।

তৃতীয় দিন চলে যান ১৫ কিমি দূরে পুষ্করতীর্থে। হ্রদ ও অসংখ্য মন্দির নিয়ে মরুভূমির বুকে এক টুকরো পুষ্কর।

একাদশ দিন – ঘরপানে ফেরা। কলকাতায় ফিরলে দুপুর ১২.৫০-এ শিয়ালদহ এক্সপ্রেস ধরুন। দিল্লি হয়েও ফিরতে পারেন। বহু ট্রেন আছে। সময় লাগে ট্রেন বিশেষে সাড়ে ৬ ঘণ্টা থেকে ৯ ঘণ্টা।   

কোথায় থাকবেন

সব জায়গাতেই রয়েছে বেসরকারি হোটেল। হোটেল বুকিং-এর বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে তাদের সন্ধান পেয়ে যাবেন। ভরতপুর, জয়পুর, সরিস্কা, আলোয়ার, ফতেপুর, বিকানের এবং অজমেরে পাবেন রাজস্থান পর্যটনের হোটেল। শিলিশেড়েও রাজস্থান পর্যটনের হোটেল আছে। আলোয়ারে না থেকে, এখানেও থাকতে পারেন। আগরায় বেসরকারি হোটেল ছাড়াও পাবেন উত্তরপ্রদেশ পর্যটনের হোটেল।

কী ভাবে ঘুরবেন

রাজস্থানের শহরগুলিতে স্থানীয় গাড়ি বুক করে দ্রষ্টব্য দেখে নেবেন। তবে জয়পুর শহরের দ্রষ্টব্যস্থানগুলি রাজস্থান পর্যটনের বাসে দেখতে পারেন। আগাম সিট পর্যটনের ওয়েবসাইট থেকে বুক করে নিতে পারেন।

প্রয়োজনীয় তথ্য

(১) ট্রেনের সময়ের জন্য দেখে নিন erail.in

(২) অনলাইন হোটেল বুকিং করার জন্য রাজস্থান পর্যটনের ওয়েবসাইট https://rtdc.tourism.rajasthan.gov.in/

(৩) অনলাইনে বাস বুকিং করার জন্য রাজস্থান পরিবহণ নিগমের ওয়েবসাইট https://rsrtconline.rajasthan.gov.in

(৪) রাজস্থান পর্যটনের কলকাতা অফিস – কমার্স হাউস, ২ গণেশচন্দ্র অ্যাভিনিউ, কলকাতা ৭০০০১৩, যোগাযোগ – ০৩৩ ২২১৩ ২৭৪০

(৫) অনলাইনে বুকিং-এর জন্য উত্তরপ্রদেশ পর্যটনের ওয়েবসাইট https://uptourism.gov.in/

0 Comments
Share
duarsini-can-be-an-ideal-destination-for-you-if-you-wish-to-enjoy-silence-during-puja

ভ্রমণঅনলাইন ডেস্ক: বছর দশেক আগের কথা। মাওবাদীদের হামলায় গুঁড়িয়ে গেল পুরুলিয়ার বান্দোয়ানে পঞ্চায়েত সমিতির নির্মীয়মাণ একটি অতিথি আবাদস। এর সরাসরি প্রভাব পড়ল কাছেই একটি টিলার ওপরে অবস্থিত রাজ্য বনোন্নয়ন নিগমের রিসর্টে। সাতগুড়ুম নদীর তীরে অবস্থিত রিসর্টে বন্ধ হয়ে গেল পর্যটকদের আনাগোনা। পর্যটকদের জন্য বন্ধ হয়ে গেল দুয়ারসিনির দরজা।

কিন্তু সে সব এখন অতীত। নতুন করে ফের দুয়ার খুলতে চলেছে দুয়ারসিনির। পুজোর আগেই সেখানে পর্যটকদের পা পড়বে বলে আশাবাদী বন দফতরের আধিকারিকরা।

আরও পড়ুন বেড়াতে চলুন ‘চলো বেড়াই’ এবং ‘সুহানা সফর’-এর সঙ্গে

রিসর্টটি পশ্চিমবঙ্গ বনোন্নয়ন নিগমের অধীন। দশ বছর আগে মাওবাদী হামলার পর থেকে ক্রমে নষ্ট হতে বসেছিল সেটি। কিন্তু ইদানীং এই অঞ্চলে আর মাওবাদীদের দাপট নেই। তাই সেই রিসর্টটি নতুন ভাবে সাজিয়ে তোলার জন্য গত বছর থেকে কাজে নামে বন দফতর। এখন নতুন রূপে সেজে উঠেছে এই রিসর্টের তিনতে কটেজ। পর্যটকদের জন্য রিসর্টটি এখনও খুলে দেওয়া না হলেও, পুজোর আগেই সেটি খুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বন দফতর। কিছু দিনের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ বনোন্নয়ন নিগমের (www.wbfdc.in) ওয়েবসাইটে রিসর্টটির অনলাইন বুকিং-ও শুরু হয়ে যাবে।

পুজোর সময়ে অনেকেই শহুরে কোলাহল এড়িয়ে চলতে ভালোবাসেন। তাঁদের জন্য আদর্শ জায়গা হতে পারে এই দুয়ারসিনি।  

 

0 Comments
Share
weekend-tour-to-vutaburi-and-ghagharburi
writwik das
ঋত্বিক দাস

প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের জয়জয়কার আজ সর্বত্র৷ তবুও আজও কোথাও যেন ধর্মীয় বিশ্বাসই মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম সহায়ক৷ এমনই এক প্রত্যন্ত গ্রাম আজও বেঁচে আছে এই লৌকিক বিশ্বাসকে আশ্রয় করে৷ আর যাকে ঘিরে এই বেঁচে থাকা তিনি হলেন লৌকিক দেবী ভূতাবুড়ি৷

আসানসোল শিল্পশহরের বার্নপুর থেকে বাসে হীরাপুর ধর্মতলা নেমে কিছু দক্ষিণে গেলে পড়বে শ্যামডিহ গ্রাম৷ প্রত্যন্ত এক গ্রাম৷ বলতে গেলে আধুনিক সুযোগসুবিধা থেকে প্রায় বঞ্চিত৷ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা সবই এই গ্রামের মা ভূতাবুড়িকে ঘিরেই আবর্তিত হয়৷ এই ভূতাবুড়ি চণ্ডীর রূপ হিসেবে পূজিত হলেও মুলত তিনি লোকদেবী৷ দামোদর নদীর তীরে পশ্চিম বর্ধমানের সীমান্তে দেবীর থান৷ অনাবিল সুন্দর প্রকৃতি, নিস্তব্ধ এলাকা, পাশেই দামোদর নদ, ও পারেই বাঁকুড়ার গ্রাম, আরও দক্ষিণে হাতছানি দিচ্ছে বাঁকুড়ার বিহারীনাথ পাহাড়৷ চারিপাশে শুধু প্রকৃতি আর প্রকৃতি৷

আরও পড়ুন সুন্দরবন ছাড়াও ঘরের কাছে রয়েছে আরও এক ম্যানগ্রোভ অরণ্য, এই সপ্তাহান্তে চলুন…

এমন নির্জন স্থানে দামোদরের তীরে লাল পাথরের এক বেদিতে ভূতাবুড়ি মাতার থান৷ কোনো মূর্তি নেই দেবীর৷ বেশ ক’টি পাথরের ঘোটকই দেবীর প্রতিভু৷ পাশেই বাঘরায়ের থান৷ ইনি মূলত ভূতাবুড়ির ভৈরব বলেই পরিচিত৷ মন্দিরের পাশে এক কূপে দামোদর থেকে জল এসে ভরে থাকে। এই জল পানও করা যায়৷

ভূতাবুড়ি মন্দিরের পাশে দামোদর। ও পারে আবছা বিহারীনাথ পাহাড়।

‘ভুত’ শব্দের অর্থ প্রেতাত্মা আর তারই স্ত্রীলিঙ্ঙ্গ ‘ভূতা’৷ অর্থাৎ ভূতাবুড়ি প্রকৃতপক্ষে জনসমাজে অপদেবী হিসেবেই পরিচিত৷ অতীতে এই আসানসোল অঞ্চলে যখন শিল্প গড়ে ওঠেনি, আজকের আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি, তখন এই অঞ্চলের মানুষের কৃষিকাজই ছিল মূল ভরসা৷ চিকিৎসা ও শিক্ষার উন্নতির ছোঁয়াও তখন এখানে পড়েনি৷ উপরন্তু দামোদরের অভিশাপে ফি বছর ভেসে যেত গ্রাম। তখনও দামোদরের বুকে বাঁধ তৈরি হয়নি৷ এমন অবস্থায় দুঃখকষ্ট, রোগশোকের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য জন্ম হয় দেবী ভূতাবুড়ির৷

ভূতাবুড়ি মন্দিরের প্রবেশফটক।

এই দেবী ভূতাবুড়িকে নিয়ে নানা কাহিনি প্রচলিত৷ এই দেবীরা সাত ভাইবোন – ছয় বোন ও এক ভাই৷ সব চেয়ে বড় বোন হল আসানসোলের কালীপাহাড়ির কাছে দেবী ঘাঘরবুড়ি। এই দেবীর কথা নিয়ে পরেই আলোচনা করছি৷ আর বাকি পাঁচ বোন হলেন দেবী নুনীবুড়ি, ঘোষবুড়ি, ধেনুয়াবুড়ি, কেন্দুয়াবুড়ি ও পিয়ালশালবুড়ি আর শান্তিনাথ হলেন এই সাত বোনের একমাত্র ভাই৷ দেবীর পূজার কোনো নির্দিষ্ট মন্ত্র নেই। শুধুই ভক্তি আর ভূতাবুড়ি ও বাকি ছয় ভাইবোনের নাম উচ্চারণ করেই পূজারি দেবীর পূজা সুসম্পন্ন করেন৷

মা ভূতাবুড়ি।

বর্তমানে গোবিন্দ রায় মন্দিরে পূজার দায়িত্বে আছেন৷ কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গেই। তিনিই আমাদের জানালেন আরও কথা৷ পয়লা মাঘ জাঁকজমক করে দেবীর পূজার্চনা হয়৷ তখন দামোদরের তীর লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে৷ পূজা উপলক্ষ করে গ্রামে মেলাও বসে৷ এ ছাড়াও প্রত্যেক শনিবার দেবীর জোরদার পুজো হয়৷ পুজো চলাকালীন অনেক সময়েই পূজারির ওপর ‘মায়ের ভর হয়’। তখন মানুষের বিভিন্ন সমস্যার উপায় তিনি বাতলে দেন। এর পর পুজায় নিবেদন করা কাঁচা দুধ খেয়ে পূজারির ভর কাটে৷ পূজার ভোগ উপকরণের মধ্যে ফল ও নানা মিষ্টি থাকলেও ভূতাবুড়ির পছন্দের খাবার হল মুড়ি ও বিভিন্ন কলাই, ছোলা, বাদাম ইত্যাদি মুচমুচে করে ভাজা৷ পূজার সময় বিভিন্ন বাড়ি থেকে দেবীকে গামলায় এই কলাইভাজা ও মুড়ি ভোগ দেওয়া হয়৷ গোবিন্দবাবু আরও জানান, আগে ফি বছর দেবীকে উৎসবের সময় খিচুড়িভোগ দিয়ে সেই ভোগ মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হত। কিন্তু পরবর্তীকালে মাতালের উৎপাত হেতু সেই রীতি বর্তমানে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে৷ লোককথা ও প্রকৃতি সব মিলিয়ে ভূতাবুড়ির থান চির আকর্ষণীয়৷

ঘাঘরবুড়ির বিগ্রহ।

ভূতাবুড়ির মতোই তাঁর বড়ো বোন দেবী ঘাঘরবুড়িও আসানসোল অঞ্চলের আরেক জনপ্রিয় দেবী৷ অতীতে কালিপা্হাড়ি অঞ্চলের নুনিয়া নদীর ধারে তিনটে শিলাকে দেবী চণ্ডীর প্রতিভূ মনে করে মানুষের পূজার্চনা চলতে থাকে৷ এই কাণ্ড দেখে গ্রামের জায়গিরদাররা সেই স্থানে একটি মন্দির বানানোর সিদ্ধান্ত নেন৷ গড়ে ওঠে মন্দির৷ অনেকে মনে করেন, দেবীকে ঘাঘরা পরানোর জন্য নাম হয় দেবী ঘাঘরবুড়ি৷ পয়লা মাঘ ও শ্যামাপুজার রাতে বড়ো করে উৎসব হয়৷ এ ছাড়াও প্রতি শনি ও মঙ্গলবার মন্দিরে ভক্তদের ভিড় হয়৷ মন্দিরচত্বর জমজমাট৷ পূজার উপকরণের দোকান, জলখাবারের দোকান, দুপুরের ভাত খাওয়ার হোটেল – সব মিলিয়ে মন্দিরচত্বরে সব সময়েই যেন চলছে ছোটো মেলা৷ এই মন্দিরচত্বরে সুকুমারের দোকানের খাঁটি দুধের গরমাগরম চা মুখে লেগে থাকবে৷ মাটির বড়ো মালসায় খাঁটি দুধ জাল দিয়ে অনবরত তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু চা৷

নুনিয়া নদী।

পাশেই নুনিয়া নদী৷ ছোটোনাগপুর মালভূমির পাথুরে নদীর পাড়ে বসে থাকতে ভালো লাগে৷ তবে নদীর জলে না নামাই ভালো৷ বেশ জমজমাট মন্দিরচত্বর৷ কল্যাণেশ্বরী, মাইথন ভ্রমণের সঙ্গে দেবী ঘাঘরবুড়ির মন্দির দর্শনও সেরে নিলে মন্দ হয় না৷

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে ট্রেনে আসানসোল। বা ট্রেনে আসানসোল হয়ে বার্নপুর। আসানসোল বা বার্নপুর থেকে বাসে হীরাপুরের ধর্মতলা। সেখান থেকে দক্ষিণমুখী পথ ধরে হাঁটলে পড়বে শ্যামডিহ গ্রাম। এই গ্রামের ভেতরেই দামোদরের ধারে মা ভূতাবুড়ির থান৷ তবে ভালো হয় আসানসোল বা বার্নপুর থেকে টোটো বা অটো ভাড়া করে যাওয়া। শ্যামডিহ গ্রামের পথে হেঁটে চলা মুশকিল৷

আর ঘাঘরবুড়ি যাওয়ার জন্য ট্রেনে আসানসোল বা কালীপাহাড়ি চলুন। সেখান থেকে বাসে ঘাঘরবুড়ি স্টপে নেমে সামান্য হাঁটা৷ এ ক্ষেত্রেও আসানসোল স্টেশন থেকে টোটো বা অটো বুক করে সরাসরি মন্দিরচত্বরে চলে আসা যায়৷

ট্রেনের সময়ের জন্য দেখে নিন erail.in

আর কলকাতা থেকে সরাসরি গাড়িতে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে আসানসোল হয়ে চলে যেতে পারেন ভূতাবুড়ি। দিল্লিগামী জাতীয় সড়কের ধারেই ঘাঘরবুড়ি।

কোথায় থাকবেন 

ভূতাবুড়ির আশেপাশে থাকার জায়গা বলতে মাইথন বা আসানসোলে কোনো। হোটেলের খোঁজ পাবেন makemytrip, goibibo, trivago, cleartrip, holidayiq  ইত্যাদি ওয়েবসাইট থেকে। আর ঘাঘরবুড়ি মন্দিরের সামনে একটি গেস্ট হাউস আছে৷ আগাম বুকিং-এর দরকার হয় না।

মনে রাখবেন

কল্যাণেশ্বরী-মাইথন ভ্রমণের সঙ্গে ঘুরে নিতে পারেন ভূতাবুড়ি ও ঘাঘরবুড়ি।

ছবি: লেখক

0 Comments
Share