Browsing Category:পাহাড়

photogallery-of-munsiyari-snowfall

ভ্রমণ অনলাইনডেস্ক: বাঙালিদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র মুন্সিয়ারি। কুমায়ুনের একটা রত্ন এই মুন্সিয়ারি শহর। স্থানীয়রা আদর করে শহরটাকে হিমনগরী বলে ডাকে। এই মুন্সিয়ারিই ঢেকেছে বরফের চাদরে। বুধবার রাত থেকে প্রবল তুষারপাত শুরু হয় মুন্সিয়ারি-তথা সমগ্র উত্তরাখণ্ড জুড়ে। 

তুষারশুভ্র এই মুন্সিয়ারির কিছু ছবি দেখে নিন। মুন্সিয়ারি নিবাসী সুরেশ কুমারের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে এই ছবিগুলি। 

এবার দেখে নিন এই তুষারপাতের কিছু ভিডিও। মুন্সিয়ারি নামক একটি ফেসবুক পেজে এই ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। 

0 Comments
Share
a-trip-to-sikkims-okhre-hilley-varsey
avijit chatterjee
অভিজিৎ চ্যাটার্জি

ছোট্টবেলা থেকে মা-বাবার সঙ্গে কোলে চেপে, হাত ধরে, প্রচুর ভ্ৰমণ করেছি। যাওয়ার আগে তোড়জোড়, প্যাকিং করা থেকেই মনটা ঘুরতে শুরু করে দেয়। অনিন্দ্যকাকুরা, মানসকাকুরা আর আমরা সাত জন য্খন একেএকে সকলে শিয়ালদহ স্টেশনে এসে পোঁছোলাম মনটা আমার এ বার ভাসতে শুরু করে দিল।

এ বারের বেড়ানোয় আমার একটা অন্য ভূমিকা আছে আর সেটা হল এ বার বেড়ানোর গল্পটা বাবা আমায় বলতে দিয়েছে। যে হেতু সামনের বছর আমি ভোট দেব তাই আমি আর এখন ছোটো নই, ফলে আমার গল্পতে একটু ‘অ্যাডাল্ট’ গন্ধ থাকতে পারে! সেটা আগেই বলে নেওয়া ভালো।

দাৰ্জিলিং মেলের পাশাপাশি দু’টি কূপের একটিতে আমরা চার জন মহিলা আর অন্যটাতে বাবা আর কাকুরা মিলে তিন জন থিতু হতেই খাওয়া আর গল্প শুরু। এর মধ্যে জানলার বাইরে তাকাতেই চোখ পড়ল গোল চাঁদের দিকে, পরশু দোলপূর্ণিমা! রূপ যেন ফেটে পড়ছে! কেমন যেন ঘোর লেগে গেল। তার পর ট্রেনের এক টানা ঝমঝম শব্দে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম কে জানে!

mt. kanchanjangha
ভার্সে থেকে সূর্যোদয়।

সকালে ফ্রেশ হয়ে সিকিমের বইটা খুললাম। একটা লাইনে চোখ আটকে গেলো “উদ্ধত যত শাখার শিখরে রডোডেনড্রনগুচ্ছ” আরে এ তো শেষের কবিতার লাইন! অমিত, লাবণ্য আর রডোডেনড্রন, ভাবতে ভাবতে দেখি এনজেপি পৌঁছে গেছি। এই স্টেশনটায় এলে প্রতি বারই কেমন যেন একটা পাহাড় পাহাড় গন্ধ পাই। এ বারেও তাই, কারণ গাড়িতে উঠে বাবা বলল এ বারে আমাদের গন্তব্য সিকিম পাহাড়ে প্রকৃতির কোলে “নিঃশব্দ সংগীতের আখড়া” ওখরে, সেখান থেকে  হিলে-ভার্সে।

কিছুক্ষণ পরেই থামলাম তিস্তার ধারে এক চায়ের দোকানে। গিয়ে দাঁড়ালাম আমার বহু পরিচিত তিস্তার পাড়ে। কিন্তু পাহাড়ের বাঁকে বয়ে চলা সেই একই তিস্তা দেখে এ বারে মনের মধ্যে কেন জানি না, শিরশির করে উঠল! বুঝতে পারলাম না! মনে হল, সে যেন সমবয়সি আমারই এক চপলা সখী। মানসকাকু গুনগুন করে উঠল, “মেঘ পিওনের ব্যাগের ভেতর মনখারাপের তিস্তা”! 

কিছুক্ষণের মধ্যেই গেট পেরিয়ে সিকিমে ঢুকে পড়লাম। এ বারে আমার মোবাইলে গুগুল ম্যাপ! তাই দেখেই আমি নেভিগেট করছি আমাদের দলকে। সেই দেখেই আমি বুঝলাম, যে শিলিগুড়ি থেকে অলরেডি ৮৪ কিলোমিটার দূরে চলে এসেছি, জোড়থাংএ। দেখা পেলাম রঙ্গীত নদীর।  ওখরে আরও ৫৪ কিলোমিটার!

অপরূপ সেই পাহাড়ি রাস্তা, বাঁকের পর বাঁক। শীত-ঘুমের পর পাহাড় সেজে উঠছে নানা রঙের ফুলে, ছোটো ছোটো বাড়িগুলোতেও নানা ফুলের সমারোহ। যেন “আজি বসন্ত এসেছে বনে বনে।”

এসে গেলাম সোমবাড়িয়া। এটা একটু জমজমাট জায়গা, দোকানপাট বেশ কিছু আছে। এখান থেকেই ডান দিকে গিয়েছে কালুক হয়ে রিনচেনপং যাওয়ার রাস্তা।

অবশেষে চলে এলাম আমাদের আজকের গন্তব্য ‘ওখরে’। ওখরের হোমস্টেতে দাঁড়িয়ে মনে হল যেন পৃথিবীর শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছি! অনেক চলার পরে এ যেন দু’ দণ্ড বিশ্রামের আর নিশ্চিন্ত ঘুমের এক আদর্শ জায়গা! জিনিসপত্র রেখে, লাঞ্চ সেরে বেরিয়ে পড়লাম, একটু আশপাশ ঘুরে দেখতে, ‘রেইকি’ করা যাকে বলে, আর কী! ঠান্ডাটা বেশ মালুম হচ্ছে। জনপ্রিয়তা যদি গুণমানের মাপকাঠি হয়, ওখরে কিন্তু আম-ভ্রামণিদের হতাশ করবে। সাইটসিয়িং সত্যি বলতে তেমন কিছুই নেই, তবে ঘন নীল আকাশ, কনকনে কড়া শীত, ঝলমলে নরম রোদ আর উত্তুরে হাওয়াকে, যদি সঠিক পরিমাণে মেশাতে পারেন, তবেই ওখরে-কে আন্দাজ করতে পারবেন! হরেক রকম পাখি আর যে দিকে তাকাও রক্তবর্ণ রডোডেনড্রন।

bunch of flowers
কত না রঙবাহারি ফুলের মেলা।

আমরা কয়েকটি প্রাণী ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছি, প্রাণ ভরে উপভোগ করছি প্রকৃতির এই মৌন মুখরতা। কে যেন গুনগুন করছে রবীন্দ্রসংগীতের কলি, শুনে শিরিশির করে উঠল শরীর, শীতের জন্যই বোধহয়, নাকি অন্য কিছু!

বাবারা, ক’জন চা খাবার ছুতো তুলল। সামনেই এক চায়ের ঠেক – একাধারে মুদি, স্টেশনারি, রেস্টুরেন্ট আবার হোমস্টে। আমরা সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠলাম, ওখানেই চা সার্ভ করা হবে। ধূমায়িত পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে হঠাৎ আমাদের চোখ আটকে গেল পশ্চিমাকাশে। সেখানে চলছে সূর্যাস্তের রঙের খেলা! কে যেন রং তুলি নিয়ে আকাশের ক্যানভাসে এঁকে দিচ্ছে এক অপার্থিব ছবি! আগামী কালের দোলের পূর্বাভাস হবে হয়তো! নিঃশব্দ প্রকৃতিতে, গম্ভীর পাহাড়ের উপস্থিতি এক অন্য মাত্রা যোগ করেছে, আমরা যাকে বলে ‘স্পেল বাউন্ড’!

পাহাড়ে সন্ধ্যা নামা দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। ছোট্ট বাটির মতো উপত্যকায় সূর্য ঢলে গেলেই ঝুপ করে নেমে আসে অন্ধকার। তার সঙ্গে জাঁকিয়ে বসে শীত। আমরা তাড়াতাড়ি পা চালালাম আমাদের ডেরার দিকে।

বাবার প্রস্তাবনায় আমাদের হোমস্টের মালকিন, আন্টি, লজের লনে এক ট্রাইবাল ডান্সের আয়োজন করে ফেললেন। আশেপাশের কয়েক জন কিশোর-কিশোরী সেজেগুজে হাজির। ঝলমলে আদিবাসী পোশাক। স্বচ্ছ পবিত্র, যেন দেবকন্যা! আগুন জ্বালানো হল। শুরু হল নাচ। ভাষা না জানা থাকায় গানের অন্তর্নিহিত অর্থ না বুঝলেও সুরে এক আশ্চর্য মাদকতা আছে! চলে এল বারবিকিউ চিকেন, পনির ইত্যাদি। আমরা চেয়ার নিয়ে গোল করে ঘিরে বসে আছি। আমি আর পারলাম না, যোগ দিলাম ওদের সঙ্গে! দেখি আরও কয়েক জন পা মেলাচ্ছে আমাদের সঙ্গে!

এর মধ্যে দেখি আস্তে আস্তে মেঘ-কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে চারি দিক, এ এক অদ্ভুত দৃশ্য। এসে গেল ডিনারের ডাক! খাওয়ার পর হি-হি ঠান্ডায় আশ্রয় নিলাম গোটা দুয়েক লেপের মধ্যে!

ভোরে ঘুম ভাঙল, বাবার চালানো রবীন্দ্রসংগীতের আওয়াজে। ঘুম ভেঙে যাওয়ার বিরক্তি নিয়ে বাইরে বের হতেই সব রাগ যে কোথায় চলে গেল। দেখি প্রকৃতির অঢেল সৌন্দর্য, অপেক্ষা করে আছে আমাকে আনন্দ দেওয়ার জন্য যেন শুধু আমারই জন্য! দেখি সকলেই উঠে পড়ে আস্বাদন করছে, ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামটার ভোরের রূপ। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম সামনের রাস্তা দিয়ে। রং বেরঙের ফুলের আসর, কত নাম না জানা পাখির কুজন আর তারই প্রেক্ষাপটে নতুন সূর্যের নরম আলো, আমাকে এক অন্য আবেশে ভরিয়ে দিল। ভারতবর্ষের এই পরিচয়, ক’জন বিদেশি জানেন! “ভারত আমার ভারতবর্ষ, স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো”!

on the way to school
স্কুলের পথে।

ইতিমধ্যেই হাতে গরম চায়ের কাপ এসে গিয়েছে। সামনেই একটা স্কুল। ছেলেমেয়েরা আস্তে শুরু করেছে। চা শেষ করেই আমি ওদের সঙ্গে পা মেলালাম, আমিও ঢুকে পড়লাম ভিতরে। ওদের প্রেয়ার, ক্লাসরুমে পড়াশোনা, এ সব দেখতে দেখতে ফিরে গেলাম নিজের ছোটোবেলার দিনগুলোতে।

আজ আমাদের যাওয়ার কথা ভার্সে। গরম আলুপরোটা আর আরেক প্রস্থ চা দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরেই উঠে পড়লুম গাড়িতে। ড্রাইভারকাকু বলল, ওখরে থেকে ১০ কিলোমিটার গেলে হিলে। ওখান থেকে ফরেস্ট পারমিট করিয়ে তবে যেতে হবে ৪ কিলোমিটার ট্রেক করে, ভার্সে। মায়ের কাছে জানতে পারলাম ভারতের একমাত্র রডোডেনড্রন অভয়ারণ্য সিকিমের এই ভার্সতেই। আরও জানলাম ভার্সে নামটা এসেছে লেপচা শব্দ ‘বার্সে’ থেকে। এর মানে ‘বর্ষা’।

colourful flowers on trek path
রডোডেনড্রনের বাহার।

হিলে যাওয়ার রাস্তাটা অনবদ্য, দু’ পাশে রোডোডেন্ড্রনের জঙ্গল – বিভিন্ন প্রজাতির নানা রঙের! যখন লাল তো, তখন যেন আবির ছড়ানো বা কখনো সাদা বা পিঙ্ক। হিলে পৌঁছে গেট পেরিয়ে ঢুকে পড়লুম স্যাংচুয়ারির মধ্যে, এই বনপথই চলে গেছে ভার্সে। ওক, পাইন, ফার, জুনিপার, ধুপি, বহু রংয়ের বাঁশ, ফার্ন ও নানা অজানা প্রজাতির গাছের সমারোহ এই জঙ্গল। কয়েকশো বছরের ওক গাছ গুলোকে দেখে মনে হয় যেন ভূত দাঁড়িয়ে আছে। নানা ধরনের রোডোডেন্ড্রন তো আছেই, তার সঙ্গে আছে বহু বর্ণের গোলাপ অর্কিডের ধ্রুপদ যুগলবন্দি। এ ছাড়া এঞ্জেলিয়া, ধুতরা, আমন্ড লিলি, কসমস, প্রিমুলা প্রচুর পরিমাণে ফুটে আছে। আর আছে পথের ধারে অযত্নে ফুটে থাকা কত নাম না জানা সুন্দর ফুল বোধহয় আমার পথচলাকে মনোরম করে তুলতে। অসম্ভব সুন্দর এই দৃশ্য। গাছ ভর্তি ফুটে থাকা লাল ম্যাংগোলিয়া আর লাল, সাদা গোলাপি রডোডেনড্রন এর সমারোহ। এ যেন এক নন্দনকানন! এই ফুলের জলসায়, নিজেকে মনে হচ্ছিল এক অনাহুত অতিথি। গাইড বলল, স্থানীয় ভাষায় রডোডেনড্রনকে বলে ‘গুরাস’। এই অভয়ারণ্য আবার বিলুপ্ত প্রায় রেড পান্ডার বাসভূমি। কালো ভালুকের দেখা মেলে কখনও সখনও।

resting place on trek path
ভার্সের ট্রেক পথে বসার জায়গা।

শুকনো পাতা মাড়িয়ে বা বুনো ফুলের ঝোপ সরিয়ে হেঁটে চললাম। মাঝে মাঝে কুয়াশা এসে পথ ঢেকে দিচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন মেঘের ওপর দিয়ে হাঁটছি। যত ভিতরে ঢুকছি গাছপালাগুলো যেন আরও আমায় জড়িয়ে ধরছে আর ফিসফিস করে বলছে, আরও গভীরে, আরও গভীরে যাও! পথের আকর্ষণে আর ফুলের গন্ধে নিজেকে শীঘ্রই হারিয়ে ফেললুম। পথে ১ কিলোমিটার বাদে বাদে বসার বেঞ্চ। একাকী বেঞ্চটাকে দেখে মনে হল, যেন আমায় বলছে “একটু বসে যাও, দু’টো কথা বলে যাও! সত্যি একাকিত্বের কী দুঃখ!

অবশেষে গিয়ে পৌঁছোলাম ওপরে। এখানের একমাত্র থাকার জায়গা গুরাস কুঞ্জ। কী দারুন লোকেশন! সামনে খোলা হিমালয়। কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মেলে এখান থেকে।

ফিরে এসে ঘোর কাটল। জীবনের প্রথম ট্রেক। মনে মনে এই ট্রেকটার নাম দিলাম “Hungry Eye Avenue”..যত হাঁটছিলাম চোখে দেখার খিদে তত বেড়ে যাচ্ছিল। লাল গুরাসের জঙ্গল আমাকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে পথের ক্লান্তির কথা বুঝতেই পারিনি।

ওখরে ফিরে আবার ইতস্তত ঘোরাফেরা। বাবা জানাল, সোমবাড়িয়ার কাছে ‘এন্ডেন’, যাওয়ার রাস্তাটা নাকি অসাধারণ। সবাই এক কথায় রাজি। চলো ওখানে – অসাধারণ শান্তির রাস্তা!  আমরা সবাই গাড়ি ছেড়ে, একটু হাঁটলাম! নিঃশব্দতা একেই বলে – নিঃশব্দতার মধ্যে কেবল পাখির ডাক আর আমাদের কলকলানি। দু’ দণ্ড দাঁড়ালাম! বসেও পড়লাম পথের ধারে! মনের মধ্যে কে যেন গেয়ে উঠল আমার প্রিয় এক গানের কলি “আমি তুমি আজ একাকার হয়ে মিশেছি আলোর বৃত্তে”!

মুগ্ধ নয়নে বসে থাকতে ইচ্ছা করছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা! আবার কেন, মনের কোণে উঁকি দিচ্ছে অমিত-লাবণ্যর কথা!

অনিন্দ্যকাকু টিপ্পনি কাটল, “কী! রে! Honeymoon Spot টা fixed করে ফেললি নাকি”!

‘যত অলিগলি আকুলি বিকুলি এই পথ চলা কতদুর..

আগুনের আঁচে, আনাচে কানাচে তুমি আর আমি রোদ্দুর,

তুমি আমি তিন সত্যি হয়ে, বাকি সব আজ মিথ্যে!

মম চিত্তে হৃতি নৃত্যে..

মেঘের পালক চাঁদের নোলক কাগজের খেয়া ভাসছে!

guras kunj
গুরাস কুঞ্জ।
প্রয়োজনীয় তথ্য

নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে ওখরে ১২৯ কিমি। আমরা ছিলাম ‘দাওলাকি হোমস্টে’তে (ফোন -০৯৭৩৩২০২৯১৫)। এ ছাড়াও আরও হোমস্টে আছে ওখরে’তে। ভার্সেতে থাকার জন্য আছে ‘গুরাস কুঞ্জ’, ওদের ওয়েবসাইট (http://guraskunj.weebly.com)। লগইন করুন পেয়ে যাবেন সব তথ্য।

ছবি: লেখক

0 Comments
Share
a-visit-to-tinchuley-a-combination-of-jungle-mountain-and-kanchanjungha
ankita datta অঙ্কিতা দত্ত
অঙ্কিতা দত্ত

“এ তো গভীর জঙ্গল! সূর্যের আলো প্রায় ঢুকছেই না” – গাড়ি থেকে নেমেই জেঠু বললেন। এইমাত্র তিনচুলে এসে পৌঁছোলাম। দু’দিকের চা বাগান আর তার মাঝের রাস্তা দিয়ে গাড়ি করে আসতে আসতে চা বাগানের রেশ এখনও কাটেনি। তার মধ্যে আরেক নতুন চমক। আচ্ছা, এই জঙ্গলে কোনো জন্তু আছে? কী জন্তু? লেপার্ড না ভাল্লুক? এই সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে দেখলাম বাবা ঘরে যাওয়ার জন্য ডাকছে। বাবার পেছন পেছন ঘরে গেলাম।

আরও পড়ুন কাঁকসা, দেউল ও কেঁদুলির জয়দেব

গেস্ট হাউসের নাম অবিরাজ। ঘরে ঢুকেই মন ভালো হয়ে গেল। বিরাট বড়ো ঘর আর সামনে খোলা বারান্দা। ঘর থেকেই কাচের জানালা দিয়ে সব দেখা যায়, তবু বারান্দায় গেলাম। সামনেই চা বাগান। দূরের পাহাড়ে অনেক বাড়ি দেখা যাচ্ছে। এক দিকে কালিম্পং আর আরেক দিকে সিকিমের কিছু অংশ। আকাশ আংশিক মেঘলা। হালকা মেঘ খেলে বেড়াচ্ছে গাছেদের সঙ্গে। মনে হচ্ছে কয়েক দিন বেশ ভালোই কাটবে।

ফুলের ঝাড়।

স্নান করে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। তবে ঘুমোতে ইচ্ছে করল না। বারান্দাটা বড্ড টানছে। আবার চলে গেলাম। এ বার চেয়ার নিয়ে বসে পড়লাম। ভালো করে আবার চার দিক দেখলাম। চা বাগানের নীচে কয়েকটি বাড়ি। হয়তো চা বাগানের শ্রমিকদের বাড়ি। বারান্দার ডান পাশে একটি অ্যাসেলিয়া ফুলগাছের ঝাড় আছে। হোটেলের নিজস্ব বাগানেও অনেক রকম ফুলগাছ, তাতে হরেক ফুল।

চা শ্রমিকদের বাড়ি?

আকাশ এ বার কালো করে এসেছে। দূরের পাহাড়গুলো আর দেখা যাচ্ছে না। তবে চা বাগানে এখনও কাজ করছেন কিছু শ্রমিক। নীচের দিকের একটা বাড়িতে দেখলাম একটি মেয়ে তার পোষা কুকুরের সঙ্গে খেলছে। ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা। আস্তে আস্তে চারিদিক ঢেকে গেল মেঘে। আর চা বাগানের শ্রমিক বা মেয়েটি, কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। এ বার আমার ঘরে ফেরা উচিত কিন্তু বৃষ্টি দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। দেখতে লাগলাম বৃষ্টির শোভা। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি গাছের পাতায় পড়ছে, আবার ঝরে যাচ্ছে। বৃষ্টি নামার পরে আবার নীচের মেঘ পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির তেজ ধীরে ধীরে বেড়েই চলেছে। তার সঙ্গে বিদ্যুতের ঝলক। খুব ইচ্ছে হল ওই জঙ্গলটা দেখার। বারান্দা দিয়ে জঙ্গলটা দেখা যায় না। ওখানে গাছের পাতায় বৃষ্টি পড়ে কেমন লাগছে কে জানে। না! আর থাকা যাবে না। বৃষ্টির সঙ্গে হাওয়ার তেজ বাড়তে শুরু করেছে। বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে যাচ্ছি। ঘরে চলে এলাম।

কালিম্পং-এর দিকের আলোগুলো যেন ভারতের মানচিত্র।

প্রায় সারা সন্ধ্যা বৃষ্টি হল। বিকেলে বেরোনো গেলো না। ঘরে বসেই মোমো আর স্যুপ নিয়ে গানের আসর বসল। পরে রাতে খেতে যাওয়ার সময় বুঝলাম বৃষ্টি আর হচ্ছে না। খেয়ে এসে আবার বারান্দায় গেলাম। একী! এ যে চমকের পর চমক! বৃষ্টি তো কমে গিয়েছেই, দূরের পাহাড়ের গায়ের সব বাড়ির আলো জ্বলে উঠেছে! পাহাড়ের গায়ে যেন মণিমানিক্য বসিয়ে দিয়েছে কেউ। আরে! কালিম্পং-এর দিকের আলোগুলো একসঙ্গে কেমন ভারতের মানচিত্রের আকার নিয়েছে না? হ্যাঁ, তাই তো। আকাশ জুড়ে তারা জ্বলজ্বল করছে। বৃষ্টির কোনো চিহ্নই আর নেই। এই কারণেই বোধহয় গুণীজনেরা বলে গিয়েছেন, পাহাড় বড়োই চঞ্চল, বড়োই খামখেয়ালি।

আরও পড়ুন চলুন ঘুরে আসি: পাখিপাহাড়

পরের দিন ঘুম ভাঙল মায়ের ডাকে। বারান্দা পুব দিকে বলে ভোরের সূর্যের আলোয় ঘর আলোকিত। কিন্তু বারান্দায় বাবা আর জেঠু ক্যামেরা উত্তর দিকে তাক করে দাঁড়িয়ে আছে কেন? তবে কি!! দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে দেখি আহা! ঠিক তাই! সূর্যের আলো পড়ে চিকচিক করছে…। হ্যাঁ, কাঞ্চনজঙ্ঘা! বারান্দা থেকে দেখে যেনো মন ভরল না। বাবা আর জেঠুর পেছন পেছন আমিও চলে গেলাম ছাদে। চোখ ভরে দেখলাম আমাদের কাঞ্চনকে। মুগ্ধ চোখে চেয়ে কতক্ষণ বসে ছিলাম জানি না, বাবার ডাকে সম্বিত ফিরল। হাঁটতে বেরোনো হবে। এ বার জঙ্গলটাও দেখা যাবে ভালো করে।

জঙ্গলের পথে।

আকাশে ঝলমলে রোদ থাকা সত্ত্বেও জঙ্গলে কিন্তু রোদ ঢুকছে না। জঙ্গলে প্রধানত পাইন গাছ। তবে পাহাড়ের গায়ে গায়ে অ্যাসেলিয়ার ঝাড়ও আছে। নানা রকম লিলি আর অর্কিডও চোখে পড়ল। এ দিকে রোদ পড়ে না বলে রাস্তায় জল জমে আছে খানাখন্দে। পেছনে তাকালে গাছের ফাঁকে ফাঁকে আবার দেখা যাচ্ছে কাঞ্চনকে। সে যেন উঁকি দিয়ে আমাদেরই দেখছে।

আরও পড়ুন সুন্দরবন ছাড়াও ঘরের কাছে রয়েছে আরও এক ম্যানগ্রোভ অরণ্য, এই সপ্তাহান্তে চলুন…

কিছু দূর গিয়ে জঙ্গল শেষ হয়ে গেল। একটা কুকুরও যাচ্ছে আমাদের সঙ্গে। আমরা দাঁড়াতেই দেখি, সে লেজ নেড়ে আমাদের দিকে এল। একটু আদর করতেই আবার লেজ নেড়ে জল খেতে চলে গেল। আমরা আবার এগিয়ে চললাম। দেখি সে-ও আবার চলল আমাদের সঙ্গে সঙ্গে। এ দিকে কয়েকটি হোম স্টে আছে। গুরুঙ্গ গেস্ট হাউস আছে। একটা চায়ের দোকান দেখা গেল। দেখলাম একজন বয়স্ক মহিলা চা শুকোতে দিয়েছেন। জিজ্ঞেস করে জানলাম এটা অরগ্যানিক চা। ওই দোকানেই চা খেলাম। এ বার এই দিকটা একটু ঘোরা যাক। কিছুটা যেতেই একটি খেলার মাঠ চোখে পড়ল। জানলাম এই রাস্তা দিয়েই তাকদা যাওয়া যায়। হঠাৎ দূরের গাছে একটি লাল পাখি চোখে পড়ল। পিঠের দিকটা কালো, নীচের দিকটা লাল। লেজটাও কালো আর লাল মেশানো। জেঠু বললেন পাখিটি হল স্কারলেট মিনিভেট, বাংলায় যাকে বলে আলতাপরী। কী সুন্দর দেখতে পাখিটি।

কাঞ্চনের উঁকি।

এ বার আবার ফেরার পালা। আবার সেই জঙ্গলের রাস্তায়। কুকুরটি কিন্তু এখনও আমাদের সঙ্গেই আছে। কত ছোটো বাচ্চা হেঁটে হেঁটে স্কুলে যাচ্ছে। খুব হিংসা হল। ওরা কী সুন্দর দূষণমুক্ত সুন্দর পরিবেশে থাকে। আমাদের তো আবার সেই শহরে ফিরতে হবে। যা-ই হোক আবার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে দেখতে ফিরে এলাম। আমাদের হোটেলে পৌঁছে দিয়ে কুকুরটি নিশ্চিন্তে ফিরে গেল। এখন একটু একটু করে মেঘ গ্রাস করছে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে। দূরের আকাশে এক টুকরো মেঘ আছে বটে তবে রোদ ঝলমল করছে। মনে হচ্ছে এই জায়গার যিনি নাম দিয়ে থাকুন না কেনো, নামটি একদম স্বার্থক। চা বাগান, জঙ্গল ও কাঞ্চনময় ‘তিন’চুলে। আহা যদি সারা জীবন থাকতে পারতাম এখানে। কতই না ভালো হত!

কী ভাবে যাবেন

ভারতের যেখানেই থাকুন, তিনচুলে যেতে গেলে আপনাকে প্রথমে পৌঁছোতে হবে নিউ জলপাইগুড়ি বা বাগডোগরা বিমানবন্দর। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে তিনচুলের দূরত্ব ৭৪ কিমি, বাগডোগরা থেকে ৭৭ কিমি। এই পথে বাস চলে না। শেয়ার জিপ অবশ্য পাওয়া যায়। তবে গাড়ি ভাড়া করে যাওয়াই সব থেকে ভালো। অবশ্য যে জায়গায় থাকবেন তাদের বলে রাখলে নিউ জলপাইগুড়ি বা বাগডোগরায় গাড়ি পাঠিয়ে নিয়ে যাবে।

কোথায় থাকবেন

তিনচুলেতে বেশ কিছু রিসর্ট-হোমস্টে রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অবিরাজ হোমস্টে (৯৭৪৯৩৭০৯৬৫, ০৭৬০২৮৫০৩২), গুরুং গেস্ট হাউস (৯৯৩৩০৩৬৩৩৬, ৯৪৩৪৫১৪৬১৪)।

ছবি: অনুপম দত্ত

5 Comments
Share
some-unknown-hill-stations-of-tamilnadu

ভ্রমণঅনলাইন ডেস্ক: মাঝেমাঝে মনে হয়, সমুদ্র না পাহাড়, কার জন্য বেশি বিখ্যাত তামিলনাড়ু। এক দিকে যখন কন্যাকুমারী, রামেশ্বরমের মতো জায়গা রয়েছে, তেমনই রয়েছে উটি, কোদাইকানালের মতো হিলস্টেশনও। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই উটি বা কোদাইকানাল ছাড়াও তামিলনাড়ুর অন্দরে রয়েছে আরও কিছু স্বল্প পরিচিত হিলস্টেশন। তার কয়েকটাই তুলে দেওয়া হল আপনাদের জন্য। 

১) ইয়েরকাদ

yercaud

উটি এবং কোদাইকানালের পরেই জনপ্রিয়তার নিরিখে সব থেকে ওপরে থাকবে ইয়েরকাদ। সমুদ্রতল থেকে পাঁচ হাজার ফুটের কিছু বেশি উচ্চতায় এই ইয়েরকাদ অবস্থিত শেভরয় পাহাড়ের কোলে। চারি দিকে সবুজে ঘেরা খুব সুন্দর, ছিমছাম এই পাহাড়ি শহরটি। সালেম থেকে ৩০ কিমি দূরে ইয়েরকাদের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে একটি সুন্দর হ্রদ। এখানে দু’টো দিন বেশ আরাম করেই কাটিয়ে দেওয়া যায়।

২) ইয়েলাগিরি

yelagiri

নিকটবর্তী রেল স্টেশন জলারপেট্টাই থেকে মাত্র ২৪ কিমি দূরে অবস্থিত ইয়েলাগিরি পরিচিত গরিবের উটি হিসেবে। সমুদ্রতল থেকে এই শহরের উচ্চতা চার হাজার ফুটের কিছু বেশি। ইয়েলাগিরি পৌঁছোনোর রাস্তাটা অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। মোট ১৪টা হেয়ারপিন বেন্ড অতিক্রম করে পৌঁছোতে হয় ইয়েলাগিরিতে। এখানে আদিবাসী মানুষেরই মূলত বাস।

৩) কোটাগিরি

kotagiri

উটির খুব কাছে (৩০ কিমি) হওয়া সত্ত্বেও কিছুটা যেন আড়ালেই রয়ে গিয়েছে কোটাগিরি। অথচ সমুদ্রতল থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার ফুটের কাছাকাছি উচ্চতার এই কোটাগিরিও কোনো অংশে কম যায় না। উটির জাঁকজমক এড়াতে এখানেই থাকতে পারেন এবং দেখে নিতে পারেন উটির দ্রষ্টব্য স্থানগুলি। সেই সঙ্গে দেখে নিন ডোডাবেট্টা, ক্যাথরিন ফলস, এক ফলস এবং রঙ্গস্বামী পিলার।

৪) ভেলিয়ানগিরি হিলস

valliyangiri hills

সমুদ্রতল থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার ফুট উচ্চতার এই ভেলিয়ানগিরিকে অনেকে দক্ষিণের কৈলাশও বলেন। কোয়েম্বত্তুর থেকে মাত্র ৪০ কিমি দূরে অবস্থিত এই হিলস্টেশন। একদিনে ঘুরে যাওয়ার পক্ষে আদর্শ জায়গা এই ভেলিয়ানগিরি।

৫) কোলি হিলস

kolli hills

সালেম থেকে ৫২ কিমি দূরের এই হিলস্টেশনের উচ্চতা চার হাজার ফুটের আশেপাশে। কিন্তু এখানে আসার রাস্তাটি এক কথায় অসাধারণ। ৭২টা হেয়ারপিন বেন্ড অতিক্রম করে পৌঁছোতে হয় কোলি হিলসে। এখানকার ইকো ক্যাম্পে থাকা এবং কাছের অগয়া গঙ্গাই জলপ্রপাতটি যথেষ্ট উপভোগ্য।  

৬) আনামালাই হিলস

annamalai hills

তামিলনাড়ুর পোলাচি শহর থেকে ১২ কিমি দূরে অবস্থিত আরও এক নির্জন পাহাড়ি জায়গা। এই অঞ্চলটি বিখ্যাত হাতি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের জন্য। এ ছাড়াও আলিয়ার এবং উপার নামক দু’টি নদীও বয়ে চলেছে এখান দিয়ে। এখানে দেখে নিতে পারেন আনামালাই ওয়াইল্ডলাইফ সাঙ্কচুয়ারি। 

৭) মেঘমালাই হিলস

meghamalai

মেঘমালাই হিলস কোনো নির্দিষ্ট একটি জায়গা নয়, বরং একটা বড়ো অঞ্চল যার উচ্চতা সমুদ্রতল থেকে চার হাজার ফুটের আশেপাশে। চা এবং এলাচের বাগানে ঘেরা এই অঞ্চলে এখনও পর্যটকদের খুব বেশি পা পড়েনি। পাখিপ্রেমীদের কাছে স্বর্গরাজ্য। কাছেই রয়েছে মেঘমালাই ওয়াইল্ডলাইফ সাঞ্চুয়ারি। 

 

0 Comments
Share
tour-to-misty-mountain-patnitop
avijit kumar chatterjee
অভিজিৎ কুমার চ্যাটার্জি

‘…আমার দিকে কেন তাকায়, তোমার চোখ,/লিখতে কেন বাধ্য করে এই অবেলায়,/দ্বিধান্বিত সুখ! সেও তো এক মনের অসুখ…’।

পাইনের বুক চিরে যখন সূর্য উঁকি দিল, তখন একদল মেঘ উড়ে গেল নির্জন রাস্তা দিয়ে। ৬৫০০ ফুট উঁচু এই হিল স্টেশনে মেঘ ঘুরে বেড়ায় আনমনে, এক সময়ে এই গ্রামের নাম ছিল ‘পাটান দা তালাও’, মানে রাজকুমারীর পুকুর। স্থানীয়রা মনে করেন এখানেই নাকি রাজকুমারী স্নান করতেন। ইংরেজদের ভুল উচ্চারণ ক্রমে এই জায়গার নাম হয় ‘পাটনিটপ’। আজ তালাওয়ের সেই রূপ অবশ্য আর নেই!

sunrise at patnitop
পাটনিটপে সূর্যোদয়।

এখানে সকালটা শুরু হয় মেঘের চাদর গায়ে দিয়ে আর বিকেলটা কাটে রঙিন মেঘেদের সঙ্গে গল্প করে। ভোরে সূর্য্যিমামা ওঠার আগেই পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা মেঘের দল প্রস্তুতি নিতে শুরু করে জেগে ওঠার। এক সময় আড়মোড়া ভেঙে তারা ছড়িয়ে পড়তে থাকে কুয়াশার মতো। তখন এক হাত দূরের জিনিসও ঝাপসা হয়ে ওঠে। মুখ তুলে উঁচু গাছটির দিকে তাকালে দেখা যায় পথ ভুলে আটকে গিয়েছে এক টুকরো সাদা মেঘ। সেই সাজানোগোছানো মেঘ-বিছানো রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে নিজেকে মনে হয় মেঘের রাজ্যের অতিথি।

ভোরবেলা জানলা খুলতেই স্নিগ্ধ বাতাস মনকে ছুঁয়ে গেল, আর কানে কানে বলে গেল ‘দূরে কোথায়..দূরে দূরে’। প্রকৃতি যেন আজ তার রং-রূপ, স্নিগ্ধতা সব উজাড় করে দিয়েছে। মন-ভালো-করা সকাল মুহূর্তে সতেজ করে দিল। আকাশের স্বচ্ছ নীল রং, পাখির ডাক, ফুলের গন্ধ – ভরে উঠল মন-ভালো-করা আজকের সকাল।

solitary patnitop
পাটনিটপের নির্জনতা।

চার দিকে পাইন দেবদারুর জঙ্গল, মাঝখানে রাস্তা, হারিয়ে যাওয়ার হাতছানি চিনে নিলে মেঘ পিওন পৌঁছে দেবে মেঘ মিনারে। চন্দ্রভাগার অববাহিকায় রূপসী পাটনিটপ আড়মোড়া ভাঙে মেঘেদের খামখেয়ালি দস্যিপনায়। শরীর জুড়ে ছড়িয়ে থাকে কাঁচা হলুদ রোদ।

শীতকালে পুরু বরফে ঢেকে যায় গোটা এলাকা। শীতের অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস নিয়ে জমে ওঠে পাটনিটপ। অন্য সময় পাটনিটপে চলে মেঘ-রোদ্দুরের ‘লুকোচুরি স্পোর্টস’!

পাহাড়ের মাথায় পাটনিটপ। একটু হেঁটে গেলে নাগদেবতার মন্দির, দেখার বলতে ওই মন্দিরটুকুই! আর বাকিটা হারিয়ে যাওয়া মেঘ পিওনের হাত ধরে, কিংবা স্মৃতির মেদুরতার আঁচলে মুখ ঢাকা। কথিত আছে, এখানে মানত করে দড়ি বেঁধে রেখে গেলে মানত পূর্ণ হবেই হবে। আর মানত পূর্ণ হলে আপনাকে এসে খুলে দিয়ে যেতে হবে আপনার বাঁধা দাগা! স্থানীয়দের কাছে বেশ জনপ্রিয় তীর্থস্থান এটি।

দুপুরে রিসর্ট একটু বিশ্রাম, বিকেলটা যে এখনও বাকি আছে!

gaddis of patnitop
পাটনিটপের গদ্দিরা।

বিকালের আলো রেণু রেণু উড়ে বেড়ায় গোটা পাটনিটপ জুড়ে। জলতরঙ্গের আওয়াজ তখন সারা আকাশ জুড়ে। বিবাগি মেঘেদের মতো আমি আর নির্জন পাইন দেবদারুরা আকাশের ভিতর থেকে বুকফাটা মল্লার শুনি সারেঙ্গীর ছড়ে!

জম্মু শ্রীনগর হাইওয়ে (জাতীয় সড়ক ১এ) ধরে এগোলে জম্মু থেকে মাত্র ১১৩ কিমি দূরে পাটনিটপ। জম্মু ছাড়ালেই পিরপাঞ্জালের পাহাড়ি রাস্তা ও গোটা চারেক সুড়ঙ্গ পেরিয়ে উধমপুর। উধমপুর পর্যন্ত রাস্তা চার লেনের। জম্মু ছাড়িয়ে এগোলেই আপনাকে তাওয়াই ও জগতি নদীর উপর দিয়ে এগোতে হবে।

বছরের প্রধান চারটি মরশুমে পাটনিটপ সেজে ওঠে এক এক রূপে – বসন্তে ফুলের রঙে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে গোটা পাহাড়, গ্রীষ্মে সবুজের ফাগুন আর শরতে ঘাসেদের গায়ে লাগে সোনা-হলুদের আগুন, শীতে পাটনিটপ হয়ে যায় পুরো সাদা, ঢেকে যায় বরফের চাদরে।

bugiyal
বুগিয়াল।

সকালে ব্রেকফাস্ট করে চলুন ‘নাথা টপ’, পাটনিটপ থেকে মাত্র ১৪ কিমি। শীতকালে সারা নাথা টপ ধরে চলে স্কি-উৎসব, প্যারাগ্লাইডিং, স্লেজে চড়া ও টাট্টু ঘোড়ার পিঠে করে ঘুরে বেড়ানো। আপনি এসে পৌঁছোলেই ঘিরে ধরবে সরল মানুষগুলো। গরম কফিতে চুমুক দিতে দিতে দেখে নিন আকাশজোড়া বরফাবৃত পাহাড়। বাতাসে বেশ ঠান্ডার আমেজ আর চোখের সামনে দিগন্ত বিস্তৃত উপত্যকা। মন-পেয়ালায় সেঁকে নিন একটু নিজেকে। জানেন তো, নৈঃশব্দ্যের মতো আর কোনো শব্দ নেই। পাহাড়ে এই ছম ছম করা নৈঃশব্দ্য সত্যিই মাইক্রোফোনের শব্দের চেয়েও বেশি ব্যাপ্ত। এই কথামালা কোনো সহজপাঠে লেখা নেই। এই নৈঃশব্দ্য হাওয়ায় উড়ে বেড়ায়। এদের যে ধরতে পারল সে পারল, আর যে পারল না, সে কোনো দিন ও পারবে না! আমি প্রজাপতি বিশেষজ্ঞ নই, হওয়ার বাসনাও নেই, অল্প জানাতেই আমি খুশি। সবুজের উপত্যকায় হলুদরঙা প্রজাপতিদের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে আমি সকালের কিশোর হয়ে যাই। এই তো দারুণ আনন্দ, পরম সুখ।

আরও পড়ুন: পাথরের স্বপ্ন .. হালেবিদু ও বেলুর

ড্রাইভার বলে ওঠে, “বাবুজি চলিয়ে, আগে ভি তো দেখনা হ্যায়।”

সম্বিৎ ফেরে আমার। গাড়িতে এসে বসি। ঠান্ডাটা বেশ মালুম হচ্ছে। গাড়ি এগিয়ে চলে ‘সানাসার’, নাথা টপ থেকে ১০ কিমি। উচ্চতা ৮৫০০ ফুট। গাড়ি থেকে নেমেই মুখ থেকে প্রথম যে শব্দটা বেরিয়ে এল তা হল, আ! সত্যি চোখ জুড়িয়ে গেল, সবুজের তৃণভূমি ও পাহাড়ের দল, মাথায় তাদের বরফের চাদর আর সামনে একটা ছোট্টো ‘সানাসার’ লেক।

আত্মহারা মন হঠাৎ বলে ওঠে..

‘..যদি চেনা টানে মন ছোটে,/তবে দাও গেঁথে, এ বেলায়, অদেখা বাঁধন,/ছুঁয়ে যাওয়ারই অনুরোধে, করো না বারন..’।

sanasar lake
সানাসর লেক।

সবুজ ঘাসে ভরা ভারী সুন্দর উপত্যকার মধ্যে লাল-হলুদ-নীল অ্যালপাইন ফুল। অনাঘ্রাতা ঘাসফুলের ঘ্রাণ নিলাম প্রাণ খুলে। মনে হল বিরতিহীন গান শুনি, একান্ত কারও কাঁধে মাথা রেখে। বর্ণালি ভ্রমণে ইয়ারফোনের দু’টো তার দুলতে থাকুক দু’টো মানুষের কানে। একটা দলছুট বিহঙ্গ যখন জীবনের সমস্ত সম্ভাবনাময় মুহূর্তগুলোকে অতিবাহিত করে পৌঁছেছে জীবন সায়াহ্নে, জীবনখাতার প্রতিটি পাতা উলটিয়ে দেখেছে, কোথাও তার জীবনের সামান্যতম পরিপূর্ণতা সে পায়নি! আজ যখন সবুজের হাওয়া এসে তার মনের পর্দাটাকে করছে উন্মোচিত, মনটাকে বার করে নিয়ে যাচ্ছে এক নিরালা নির্জন জগতে, যেখানে শুধু চোখের স্বপ্নে ভরা মেঘ, সারা আকাশটাকে আবৃত করে রাখছে। এমন দিনে সে দু’ ফোঁটা অশ্রুর মাঝে নিজেকে ভাসাতে চাইবেই। মনের আকাশের কালো মেঘ থেকে ঝরে পড়বে কিছু বারিবিন্দু!

আরও পড়ুন: এক টুকরো হাম্পি : দেখুন জেনানা এনক্লোজার

হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি জম্মু-কাশ্মীর ট্যুরিজম চত্বরে। পাইন গাছেদের শান্তির সুনিবিড় মিছিল যেন! বসার জন্য রয়েছে বেঞ্চ। একটু বসি, কানে আসে হাওয়ার শনশনানি শব্দ আর পাখিদের গান, বেপরোয়া মন আর অপলক দৃষ্টি, আকাশ যুগান্তরের হোলি খেলার প্রস্তুতি শুরু করছে, ফুলেরা নিজেদের অঙ্গীকার ভুলে অবয়বের ছবি আঁকায় শামিল তখন।

মনে পড়ে গেল, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ চলচিত্রে, ছবি বিশ্বাস মহাশয় বলেছিলেন, ‘.. I live because I exist,I cherish it and I am proud of it..’

বাউন্ডুলে মন জীবনমৃত্যুর দোদুল্যতায় বুঝে নিতে চায় জীবনের হিসাবনিকাশ। দূরাগত কুজনে ছিন্ন হয় মায়ার বাঁধন, মেলে দেয় নীল ডানা।

jktdc cottage at sanasar
সানাসরে জম্মু-কাশ্মীর পর্যটনের কটেজ।
কী ভাবে যাবেন

ভারতের প্রায় সব বড়ো শহরের সঙ্গে জম্মু তাওয়াই ট্রেনপথে যুক্ত। কলকাতা থেকে যাওয়ার জন্য রয়েছে জম্মু-তাওয়াই এক্সপ্রেস (কলকাতা স্টেশন, রোজ), হিমগিরি এক্সপ্রেস (হাওড়া থেকে সপ্তাহে তিন দিন) এবং সাপ্তাহিক সুবিধা এক্সপ্রেস (হাওড়া থেকে)। দিল্লিতে ট্রেন বদল করেও যাওয়া যায়। দিল্লি থেকে জম্মু যাওয়ার অনেক ট্রেন। দিল্লি থেকে ট্রেনে উধমপুরও চলে যেতে পারেন। ট্রেনের সময়ের জন্য দেখে নিন erail.in

বিমানে দিল্লি গিয়ে সেখান থেকে ট্রেনে বা বিমানে জম্মু যেতে পারেন।

জম্মু থেকে পাটনিটপ ১১৩ কিমি, বাসে বা গাড়িতে আসতে পারেন। উধমপুর থেকেও বাস বা গাড়িতে আসতে পারেন পাটনিটপ, দূরত্ব ৫০ কিমি

কোথায় থাকবেন

পাটনিটপে থাকার জন্য রয়েছে জম্মু-কাশ্মীর পর্যটনের কটেজ। অনলাইন বুকিং www.jktdc.co.in, যদিও তাঁদের ব্যবস্থাপনায় কোথায় যেন একটু খামতি রয়েছে। থাকার জন্য পাটনিটপে অনেকগুলি প্রাইভেট হোটেল রয়েছে, যাদের মধ্যে অবস্থানগত কারণে ‘হেটেল স্যামসন’, ‘পাটনিটপ হাইটস’, ‘হোটেল গ্রিন টপ’ ভালো। এদের প্রত্যেকের নিজস্ব ওয়েবসাইট আছে, অনলাইন বুকিং ব্যবস্থাও আছে।

আরও পড়ুন: চলুন মমতাজমহলের স্মৃতি বিজড়িত শাহি হাম্মামের শহরে

সানাসারে থাকার জন্য রয়েছে জম্মু-কাশ্মীর পর্যটনের কটেজ একদম লেকের ধারে। অনলাইন বুকিং www.jktdc.co.in । আর যাঁরা অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য রয়েছে প্রাইভেট মালিকাধীন তাঁবুর ব্যবস্থা (যোগাযোগ করুন: ‘শেরপা অ্যাডভেঞ্চার’, দলবিন্দর সিং, যোগাযোগ ৯৬২২৬৮৮৮৮, ৯৮৫৮১৯৯১৩০)

কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য

জম্মু থেকে পাটনিটপ যাওয়ার পথে পড়বে মানসর লেক। জম্মুর স্থানীয়দের কাছে প্রিয় একটি পিকনিক স্পট। চারি দিকে পাহাড় আর তার মাঝে নীল টলটলে জলের একটি লেক। ভারী মনোরম পরিবেশ। বাবা মানসর শেষনাগের এক অবতার। কথিত আছে উনি এখানেই ধ্যান করেন, রয়েছে তাঁর মন্দিরও। লেকের জলে রয়েছে প্রচুর মাছ, তাঁদেরও দেবতা হিসাবে মানা হয়। ইচ্ছে করলে লেকে বোটিংও করতে পারেন।

পাটনিটপ থেকে ৭ কিমি দূরে কুদ। এখানকার খাঁটি ঘিয়ে তৈরি শোনপাপড়ি অবশ্যই চেখে দেখবেন। জায়গাটি সারা জম্মুতে বিখ্যাত হয়ে রয়েছে শোনপাপড়ি, চকোলেট, কালাকাঁদের জন্য। স্থানীয়রা বলেন ‘পাটিসা চকলেট’। ‘প্রেম কাট্টি’ দোকানটি একটি ব্র্যান্ড হয়ে রয়েছে সারা জম্মুতে।

গাড়ি: বলবীর সিং ( যোগাযোগ ৯৭৯৭৫৯৮৪৭৪)

ছবি: লেখক ও সংগৃহীত

 

0 Comments
Share