Browsing Category:সপ্তাহান্তে

a-trip-yo-subhasgram-and-other-places-related-to-netaji
jahir raihan
জাহির রায়হান

সাবমেরিন। সংজ্ঞা-সহ সাবমেরিনের ব্যাখ্যা বুঝতে বুঝতেই টের পেয়েছিলাম দেশনায়কের কলজের জোর। কতই বা বয়স তখন, মেরে কেটে বারো-তেরো, ষষ্ঠ শ্রেণির হাফপ্যান্ট-পরা ছাত্র। ক্লাসে দুলালবাবু বলে চলেন, “সাবমেরিন একটি জলযান, জলে ডুবে ডুবে যায়, ওপর থেকে কিছুই বোঝা যায় না।” সেই সাবমেরিন চেপে ইংরেজদের চোখে ধুলো দিয়ে দেশান্তরী হন সুভাষ, মাতৃভূমি ভারতবর্ষকে ব্রিটিশ কবল থেকে মুক্ত করতে। মিঠুন-অমিতাভকে সরিয়ে সেই দিনই আমার বল্গা মনের নায়ক হয়ে বসেন সুভাষচন্দ্র। তার পর একটা একটা করে নতুন শ্রেণিতে উর্ত্তীর্ণ হই, আর একটু একটু করে হৃদয়াকাশে উদ্ভাসিত হতে থাকেন সুভাষচন্দ্র বোস। তাঁর ব্যাপকতা এবং দেশপ্রেম ছাড়িয়ে যায় বাকিদের। এর মধ্যেই একদিন শুনলাম, একবার বেলডাঙা এসেছিলেন তিনি। ঘটনা জানামাত্রই গর্বিত হলাম অতীতের সেই আগমনকে স্মরণ করে। শহরের নেতাজি পার্ক ও নেতাজি তরুণতীর্থের যৌথ উদ্যোগে জানুয়ারি মাসের সপ্তাহব্যাপী নেতাজি স্মরণোৎসবের তাৎপর্য ধরা দিল নব রূপে।

আরও পড়ুন পর্যটনের প্রসারে উত্তরবঙ্গে একাধিক প্রকল্পের শিলান্যাস মুখ্যমন্ত্রীর

গোটা শীত জুড়েই বঙ্গের এ-দিক ও-দিক চরকিপাকের সিদ্ধান্ত নিয়েছি গরমের গুঁতো থাকাকালীনই। তাই মিলনদা কোদালিয়া যাওয়ার কথা বললে রাজি হলাম তৎক্ষণাৎ। ২০১৭’র শেষ দিনে যখন সবাই নতুন বছরকে আবাহনের প্রস্তুতিতে মগ্ন, আমি ছুটলাম সুভাষচন্দ্রের পিতৃদেব জানকীনাথের পৈতৃকভিটে দর্শনে। প্রথমে যাব কোদালিয়া, তার পর এলগিন রোডে নেতাজিভবন। সেইমতো কাউকে কিছু না বলে একা একাই বেরোলাম অমৃতপুত্রের সন্ধানে। ভাগীরথী এক্সপ্রেস দেরি করায় সুভাষগ্রাম যাওয়ার ট্রেন পেতে দেরি হল, তবে মধ্যবর্তী সময়টুকুর সদ্ব্যবহার হল ‘জনআহার’-এর চিকেন বিরিয়ানিতে। ৭৮ টাকায় বছরের শেষ লাঞ্চ। সেই ছাত্রাবস্থা থেকেই শিয়ালদহে যাতায়াত আমার। হাতে সময় বা ট্রেনের দেরি থাকলে স্টেশনের ধাপিতে বসে বসে নানা কিসিমের লোকজন ও তাদের কাণ্ডকারখানা নাগাড়ে খেয়াল করা আমার খুব প্রিয় টাইমপাস। একটা করে ট্রেন ঢোকে আর মিছিলের মতো লোক গলগল করে বেরিয়ে হারিয়ে যায় মহানগরীর পথে পথে। এবং আশ্চর্য, নিজেরটা ছাড়া বাকিরা কোথায় কী কাজে যায় তা আমি একেবারেই জানি না।

kodalia house
কোদালিয়ার বাড়ি, সংস্কারের আগে।

গড়িয়ায় বছর তিনেক ছিলাম আমি, তখন নিউ গড়িয়া স্টেশনটাই ছিল না, ছিল না মেট্রো রেলের বাহাদুরিও। বাঘাযতীন ছাড়ালেই তখনও তেপান্তরের মাঠঘাট চোখে পড়ত, অট্টালিকার বাড়বাড়ন্ত ছিল না। আর একটা ব্যাপারে অবাক হতাম, গড়িয়ার দুই দিকের সিগন্যালই সর্বদা হলুদ হয়েই থাকত, ট্রেন এসেই যেত, এসেই যেত। এখনও আমার বিশ্বাস, সোনারপুর থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত ট্রেন ধরতে কেউই সময় দেখে না, জানে স্টেশনে গেলেই কোনো না কোনো লোকাল পেয়ে যাব ঠিক। ডায়মন্ড হারবার লোকাল গড়িয়া ঢুকতেই এ-দিক সে-দিক উঁকিঝুকি মারলাম, কিছুই ঠাহর হল না। মিলনদা বলে দিয়েছিল, সোনারপুরের পরই সুভাষগ্রাম। সেইমতো গুতোঁগুঁতি বাঁচিয়ে নিলাম নামার প্রস্তুতি। এত ভিড়ের মধ্যেও পল্টু ব্যাটার অস্থিরতা টের পাচ্ছি, সে বুঝি সেই সন্ধিক্ষণের নাগাল পেয়ে গিয়েছে, যার কারণে এখানে আসা। রাজপুর-সোনারপুর পৌরসভার অন্তর্গত সুভাষগ্রাম। রিকশায় উঠে দেখি, চালক পা তুলে হ্যান্ডেল পাকড়ে বসে রয়েছে আর রিকশা চলছে আপন গতিতে। সাধারণ রিকশার এই অসাধারণ আচরণ এর আগে দেখি নাই কখনও। হাঁটতেই চাইছিলাম, কিন্তু এক কাকাবাবুর খপ্পরে পড়েই এই রিকশাবিলাস, উনি লম্বা করে জানালেন চল্লিশ মিনিট হাঁটলে তবেই বোসবাড়ি, অগত্যা!

আরও পড়ুন চণ্ডীদাসের প্রেম ও নানুর

নেতাজি সুভাষের সম্মানেই যে চাংড়িপোতা হয়েছে সুভাষগ্রাম, সে কথা না জানালেও চলে। রিকশা চড়ে রবিবারের সুভাষগ্রামের মহল্লা নজরে রাখতে রাখতেই এগিয়ে চলি হরনাথ বসুর বাড়ির দিকে, যাঁর নাতিকে আজও খুঁজে ফেরে বাঙালি, বিশ্বাস করে দেশের এই দুর্দশায় তিনি নিশ্চিত ভাবেই ফিরে আসবেন, মৃ্ত্যু-বিজ্ঞান হেরে যায় বাঙালি আবেগের কাছে, বারবার। তরুণ সংঘের মাঠ পার করে বাবুদাকে পাওয়া গেল। সৌম্যদর্শন ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দিলেন সেই ভিটেটিকে যার মাটি সৃষ্টি করেছিল এক আপসহীন অগ্নিপুত্রের যিনি অত্যাচারীর চোখে চোখ রেখে কথা বলতে জানতেন। হলুদ রঙা দোতলা বাড়ি, বড়ো বারান্দা, বেশ কিছু ছাদের অংশ ভেঙে পড়েছে, ঘরগুলি তালাবন্ধ। খোলা জানলার ফাঁক দিয়ে কিছু আসবাবপত্রও চোখে পড়ে। বাড়ির সামনেও অনেকটা ফাঁকা জায়গা। ক্ষয়ে যাওয়া ইটগুলিকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়, কেমন ছিল বোসেদের ঘরকন্না? দাদুর বাড়ির ঘরময়, বারান্দা জুড়ে, বাগানে, হামাগুড়ি, দৌড়োদৌড়ি করেছে কি ছোট্ট সুভাষ? কটকে পড়াশোনার ফাঁকে, ছুটিছাটাতে বা বার্ষিক পরীক্ষার শেষে কখনও কি এসেছে দাদু-ঠাকুমার কাছে? কেমনধারা ছিল তার আবদার? কী ভাবে সে পেল এত সাহস? এত শৌর্য? এত তাপ? নিরুত্তর চুনসুরকি ধুলো হয়ে ঝরে পড়ে অবিরত, আমি বসে পড়ি বারান্দায়, ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করি সেই কালকে যা এখন মহাকালের কবলে।

netaji bhawan
এলগিন রোডে নেতাজিভবন।

শঙ্কর ঘোষ এ বাড়ির বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক। বংশপরম্পরায় তাঁরা এই কাজ করে আসছেন। তিনিই জানালেন, রাজ্য সরকারের পূর্ত দফতর বাড়িটি অধিগ্রহণ করেছে, সংস্কার ও সংরক্ষণের কাজও শুরু হবে শীঘ্র। এ তথ্যে নিশ্চিন্ত হয়ে বেরিয়ে এলাম। (এই দু’ বছরে সেই ভবনের সংস্কার হয়েছে।) বাবুদা তখনও ওখানে বসেছিলেন, বললেন এত দূর থেকে এসেছেন বোসেদের পারিবারিক নারায়ণ মন্দির দেখে যান। তাঁর কথামতো ঠাকুরদালান দেখে নিলাম, দুর্গাপুজোও হয় সেখানে, বোস পরিবারের বর্তমান সন্তানসন্ততিরা নাকি এখনও একত্রিত হন পুজোর ক’টা দিন। নির্জন দালানচত্বরটি আমার বেশ লাগল, অনেকক্ষণ বসে রইলাম চুপচাপ, একা একাই। কান পেতে শোনার চেষ্টা করলাম হরনাথ বোস, জানকীনাথ বোস ও তাঁদের পরিবারবর্গের পুজোকালীন হইচই, হাঁকডাক, কলরব যা কালের অভিঘাতে হয়েছে নিরুদ্দেশ। মন্দিরের গেটটিতে লিপিবদ্ধ রয়েছে হরনাথ লজ, পাশেই কোদালিয়া হরনাথ বীনাপাণি লাইব্রেরি, অগ্রদূত এবং কোদালিয়া ডাকঘর যার সামনে প্রশস্ত খেলার মাঠ। সম্পন্ন গৃহস্থ হরনাথ বোসই ছিলেন এ সবের মালিক। পাড়াটিও বেশ, ছিমছাম, কোলাহলমুক্ত, শরৎচন্দ্রের পল্লিসমাজের কথা মনে পড়ায়।

কবি সুভাষ থেকে নেতাজি ভবন মেট্রো স্টেশন। পুরো পথটিতেই কোদালিয়া আচ্ছন্ন করে রাখল আমায়। তবে শুধু নেতাজির দাদুর বাড়ি নয়, আরও এক বিখ্যাত বাঙালি সলিল চৌধুরীর মাতুতালয়ও নাকি কোদালিয়া। এ দিকে ট্রেনে উঠেই এক সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছি, যাব ‘নেতাজি ভবন’, টিকিট করেছি ‘নেতাজি’-এর। এই লাইনে প্রথম যাত্রা আমার, তাই ‘নেতাজি’ আর ‘নেতাজি ভবন’ গিয়েছে গুলিয়ে। ভাড়ায় পুরো পাঁচ টাকার ব্যবধান, বৈদ্যুতিক দরজা খুললে হয়! যা ভেবেছি তা-ই, যেখানে ভূতের ভয় সেখানেই সন্ধে হয়, দরজার কাছে নীল পোশাকের নিরাপত্তারক্ষী আর প্লাস্টিকের গোল চাকতিটিকে অবলীলায় অস্বীকার করল মেশিন বাবাজি, পর পর দু’ বার, চিচিং ফাঁকও হল না। ভয়ানক অপ্রস্তুত পরিস্থিতি, এমন সময় দেখা দিলেন স্বয়ং নারায়ণ, আমার পিছনের ভদ্রলোকটি চাকতিটি কুড়িয়ে মেশিনের ওপর রাখলেন, হাতে থাকা স্মার্ট কার্ডটি চেপে ধরতেই পাঁচ টাকার সীমান্ত খুলে গেল, উনি শুধু বললেন, চলুন চলুন। আপনাদের অনেক আগেই জানিয়েছি ভগবান আমার বখাটেপনা ভালোওবাসেন, প্রশ্রয়ও দেন, আজ আবার প্রমাণ হল।

নতুন নাম লালা লাজপৎ রায় সরণি হলেও আমার ভোট এলগিন রোডের তরে, কেননা এলগিন রোড উচ্চারিত হলেই সাথে সাথে সেই ইতিহাসও মনে এসে ভিড় করে যা নিয়ে বাঙালির গর্বের শেষ নেই। নেতাজিভবনের বিশালতা ও শৈলীতে গা ছম ছম শুরু হবে প্রবেশমাত্রই। প্রথমেই চোখ পড়বে সেই গাড়িটির দিকে যা দেশের স্বাধীনতায় দিকনির্ণয়ী ভূমিকা নিয়েছিল। ভাইপো শিশিরচন্দ্র বসু এই অডি করে কাকা সুভাষ বোসকে পৌঁছে দিয়েছিলেন গোমো। যা ইতিহাসের পাশাপাশি বাঙালিজীবনেও মহানিস্ক্রমণ বলে খ্যাত। এ ইতিহাস যদি আপনার জানা থাকে, তা হলে গাড়িটির সামনে গিয়ে দাঁড়ান, ষ্টিয়ারিং হাতে শিশিরচন্দ্র আর পেছনের সিটে হেলান দিয়ে বসে রয়েছেন স্বয়ং নেতাজি সুভাষ – শুধু এই দৃশ্যটুকু কল্পনা করতে পারলেই মেরুদণ্ডের বৈদ্যুতিক শিরশরানি টের পাবেন নিশ্চিত। এ এমন একটা ঘটনা যা ছাপোষা, সাধারণ, ভীরু বাঙালিকেও আস্পর্ধার পাঠ দেয়, তাকেও বিশ্বাস করতে শেখায় হ্যাঁ বাঙালিও পারে।

the car driven by sisir bose
এই গাড়িতে চাপিয়ে নেতাজিকে গোমো পৌঁছে দিয়েছিলেন ভাইপো শিশির।

নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর যত্নে জানকীনাথ, শরৎচন্দ্র ও সুভাষচন্দ্রের ব্যবহৃত ঘর, বিছানা-সহ আসবাবপত্র দেখানোর আন্তরিক ব্যবস্থাপনা আপনাকে মুগ্ধ করবে। এমন কিছু অনন্য অনুভূতি আপনার মনের দখল নেবে যার নাগাল কখনোই কোথাও বেড়াতে বেরিয়েই আপনি পাননি। মার্বেলপাথরে নির্মিত একজোড়া থালা ও বাটি যা দিয়ে এ বাড়িতে সুভাষের শেষ ডিনার সম্পন্ন হয়েছিল তা দেখে আপনার চোখ ভিজে যাওয়া স্বাভাবিক, যদি আপনি ভাবতে পারেন, এই থালায় খেয়েই ঘরের ছেলেটি দেশান্তরী হয়েছিল। জান্তে অজান্তে সুভাষকে তো আমরা ঘরের ছেলে বলেই মনে করি, তাই না? তাঁর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সংরক্ষিত পদচিহ্নে পা দেবেন না যেন, পারলে ওই মহামানবের পদচিহ্নেই প্রণাম করুন, পুণ্যি হবে। কংগ্রেস সভাপতি থাকাকালীন যে ঘরে বসে কাজকর্ম এবং আগত লোকজনের সঙ্গে উনি দেখা করতেন, তার দেওয়াল ছিল ত্রিবর্ণরঞ্জিত, আজও সে ভাবে রাখা রয়েছে। তিন তলায় সাজিয়ে রাখা তাঁর নিজ হস্তে লেখা চিঠিপত্র, বা জামাকাপড়ের সামনে দাঁড়ালেই আপনার লোম খাড়া হয়ে যাবে অজ্ঞাত মগ্নতায়।

একটা মানুষের কর্মকাণ্ডের ব্যাপ্তি কতখানি হলে তাঁকে ‘নেতাজি’ বলে মেনে নেন স্বয়ং রবিঠাকুর, একটিবার ভেবে দেখুন। কতটা আবেদন থাকলে দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত রাষ্ট্রনায়েকরা ছুটে আসেন তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে আজও, এখনও, সেটাও ভাবার বিষয়। আজ যখন সর্বত্রই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা তখন তাঁর উদাত্ত আহ্বান, তাঁর বলিষ্ঠ প্রত্যয় ভীষণই জরুরি ছিল। নেতাজিভবনের আনাচেকানাচে ইতস্তত পদচারণা করলে শ্রদ্ধায় আপন হতেই মাথা নত হয়ে আসে। মিউজিয়াম বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসি বাড়ি থেকে, রাস্তা হতে লাগাতার ছবি তুলতে থাকি, তবুও যেন আশ মেটে না। মহানিষ্ক্রমণের ৭৫ বছর পেরিয়ে গিয়েছে গত ২০১৬ সালে, তবুও যেন সব জীবন্ত। সব দেখেও মনের খিদে মেটে না, কিন্তু যেতে তো হবে। মেট্রো ধরে মহাত্মা গান্ধী রোড স্টেশন, ওপরে উঠলেই মহাজাতি সদন। যার নামফলকে লেখা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর পরিকল্পিত মহাজাতি সদনের শিলান্যাস করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পরবর্তীতে যার দ্বরোদঘটন হয় ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের হাত থরে। এটাও শেষ নয়, শিয়ালদহ যাব বলে মহাত্মা গান্ধী রোড-চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ ক্রসিংয়ে গিয়ে দেখি আরও একটা স্মৃতিফলক। সেখানেও জ্বলজ্বল করছে সুভাষচন্দ্রের নাম । সে ফলক জানান দিচ্ছে, Through this historical place Netaji Subhas Chandra Bose continued his ambitious and never ending journey to free our motherland-INDIA । সত্তর বছরেরও বেশি হয়ে গেল মাতৃভূমি স্বাধীন হয়েছে, নেতাজির পথচলা শেষ হয়নি, সুভাষ ঘরে ফেরে নাই, আজও।

ছবি: পিন্টু মণ্ডল ও লেখক

0 Comments
Share
a-visit-to-nanur-of-poet-chandidas
writwik das
ঋত্বিক দাস

বাংলা সাহিত্যে একাধিক চণ্ডীদাসের সন্ধান পাওয়া যায়। এই একাধিক চণ্ডীদাস নিয়ে আধুনিক পণ্ডিতরা দ্বিধাবিভক্ত। কেউ কেউ বলেন এক চণ্ডীদাস বৈষ্ণবপদাবলির রচয়িতা। আর অন্য চণ্ডীদাস শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রচয়িতা। এঁদের এক জন বাঁকুড়ার ছাতনার অধিবাসী ছিলেন, আরেক জন বীরভূমের নানুরের। অনেকে আবার বলেন, এই দুই চণ্ডীদাসই এক। বিতর্ক থাক, চণ্ডীদাস সম্পর্কে যে কাহিনি সব চেয়ে বেশি প্রচারিত, সেই কাহিনিই আজ শোনাই, সেই সঙ্গে তাঁর নানুরের কিছু কথা৷

১৩৭০ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন নানোর এবং অধুনা নানুরে চণ্ডীদাসের জন্ম৷ তাঁদের পদবি ছিল ‘বাড়ুজ্জে’ বা ‘বন্দোপাধ্যায়’৷ এই জন্য তাঁকে বড়ু চণ্ডীদাস বলেও ডাকা হয়৷ তাঁর পরিবার খুব দরিদ্র ছিল৷ দারিদ্রের ভারে এক সময় তাঁরা নানুরের ভিটেমাটি ছেড়ে দিয়ে অধুনা বাঁকুড়া জেলার ছাতনা গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন এবং সেখানে পণ্ডিতগিরি করে কিছু অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে দিন অতিবাহিত করতে লাগলেন৷ তাঁর প্রথম স্ত্রীর নাম ছিল পদ্মজা৷ অভাবের জ্বালায় একদিন পদ্মজা তাঁকে ছেড়ে চলে যান কীর্নাহারের বাপের বাড়িতে৷

basulidevi temple
বাসুলীদেবীর মন্দির।

নিঃসঙ্গ অবস্থায় চণ্ডীদাসও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন৷ ঘুরে বেড়িয়ে নিজে কবিতা লিখে সেগুলো বিদ্বজনদের শুনিয়ে বেড়াতে থাকেন৷ সারা দিনে যেটুকু হাতে আসে সেইটুকু দিয়ে রাতেরবেলায় একটি মাটির হাঁড়িতে অন্ন ফুটিয়ে আধাপেটা খেয়ে দিন কাটাতে থাকলেন৷ এ ভাবে ঘুরতে ঘুরতে তিনি একদিন চললেন রাজদরবারের পথে৷ রাজা তখন সভায় বসে মন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনায় ব্যাস্ত৷ তাঁর কানে এল সুন্দর কণ্ঠে ঝুমুর গানের আওয়াজ৷ রাজা আলোচনায় আর মন লাগাতে পারলেন না৷ কোথা দিয়ে আসছে এত সুরেলা কণ্ঠ, এত সুন্দর ঝুমুরগান কেই-বা গাইছে৷ ভাবতে ভাবতে এক ভিখারিকে তাঁর দরবারের দিকে এগিয়ে আসতে দেখলেন৷ রাজদরবার পাহারায় নিয়োজিত সৈন্যরা সেই ভিখারীকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দিলে স্বয়ং রাজা সৈন্যদের থামিয়ে ভিখারি চণ্ডীদাসকে ভেতরে আসার অনুমতি দিলেন এবং সেই সঙ্গে আবদার করলেন, আরও ঝুমুরগান শুনিয়ে তাঁর মন তৃপ্ত করতে হবে৷ এমন অবস্থায় চণ্ডীদাস ঝোলা থেকে তাঁর লেখা পদ্য ও ঝুমুরগানের একখানি সংকলন বার করে বেশ ক’টি গান রাজামশাইকে শোনালেন৷ রাজামশাই যারপরনাই তৃপ্ত চণ্ডীদাসের গানে৷ তাঁর অবস্থার খবর নিয়ে পুরস্কারস্বরূপ রাজা তাঁকে বাসুলীদেবীর মন্দিরের পুরোহিতপদে নিযুক্ত করলেন এবং মন্দিরসংলগ্ন একটি ঘরে থাকার অধিকার দিলেন৷ চণ্ডীদাস জীবনধারণের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণর পদ রচনায় ব্রতী হলেন এবং বাসুলীদেবীর পূজা করতে লাগলেন৷

দেবী বাসুলী বীণারঞ্জিত সরস্বতীদেবী, যদিও তাঁকে দুর্গাদেবী মনে করে শাক্ত রূপে পূজা করা হয়৷ এই দেবীর পূজা করতে করতে চণ্ডীদাস দেবীর ভক্তিপ্রেমে বাঁধা পড়লেন৷ বাসুলীদেবীর উপাসনাই তাঁর জীবনের মুল অঙ্গ হয়ে উঠল৷ দেবীর পূজা করার পাশাপাশি শ্রীকৃষ্ণের ভক্তিরস মাঝেমধ্যে সৃষ্টি করে মুখে আওড়াতে লাগলেন, সঙ্গে সঙ্গে সেই পদগুলি লিখে ফেলতে থাকলেন৷

এমন চলতে চলতে একদিন তাঁর মনে এক দোটানার উদ্ভব হল – যে অঙ্গ দিয়ে শাক্তের উপাসনা করে চলেছেন সেই অঙ্গ দিয়ে কী করে শ্রীকৃষ্ণের পদ রচনা করবেন৷ দিশেহারা তিনি৷ এমন অবস্থায় এক অমাবস্যার রাতে বাসুলীদেবী তাঁকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে পদ রচনার আদেশ দিলেন৷ দেবীর আদেশ পেয়ে চণ্ডীদাস প্রদীপের টিমটিমে আলোয় বসে মহানন্দে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের পদ রচনা করতে লাগলেন৷

teracotta work in nanur temples.
নানুরে মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার কাজ।

এমন ভাবে দিন কাটতে কাটতে চণ্ডীদাসের জীবনে আবার পরিবর্তন এল৷ বাসুলীদেবীর মন্দিরে একদিন আগমণ ঘটল এক পরমা সুন্দরী যুবতীর৷ অপূর্ব মুখশ্রী তাঁর৷ তিনি রজকিনি রামী৷ পিতৃমাতৃহারা রামী মন্দিরে দেবদাসীর কাজ করতে এলেন৷ মন্দিরের কাজ গুছিয়ে করেন রামী৷ ঠাকুরের কাপড় ধোয়া থেকে ঝাঁট দেওয়া, সবেতেই নিখুঁত৷ একদিন ভোগ বিতরণের সময় রামীর সঙ্গে চণ্ডীদাসের মুখোমুখি সাক্ষাৎ ঘটে৷ প্রথম দর্শনেই রামীর রূপে মুগ্ধ হয়ে যান চণ্ডীদাস, তাঁর মনের প্রেমসাগর যেন উত্তাল হয়ে ওঠে৷

স্ত্রী পদ্মজাকে হারিয়ে একাকী জীবন৷ পদ্মজাকে সে ভাবে সুখ দিতে পারেননি৷ অনেক দিন নারীর শরীরসুখ থেকেও বঞ্চিত৷ এমন অবস্থায় রামীর মুখ চণ্ডীদাসকে মাতোয়ারা করে তোলে৷ আহা্ কী সৌন্দর্য্য রামীর! হিরের দ্যুতির মতো মুখের ঔজ্জ্বল্য৷ বিদ্যুতের ঝলকানির মতো বাহুযুগল, তন্বী শরীর – সব মিলিয়ে চণ্ডীদাসের দু’ নয়নে শুধুই রামীর উপস্থিতি৷ কখনও বা বাসুলীদেবীর সঙ্গে রামীকে গুলিয়ে ফেলছেন আবার কখনও শ্রীরাধিকার সঙ্গে৷ “ইস্ একবার এসে যদি রামী তাঁর কাছে বসে বুকে তাঁর সুন্দর হাতখানি ছোঁয়াতেন”, “যদি কখনও রামীর শরীর স্পর্শ করার মতো সুখ কপালে জুটত”৷ রাতের একাকী বিছানায় শুধুই এমন ভাবনা তাঁর৷

“ব্রহ্মাণ্ড ব্যাপিয়া আছয়ে যে জন, কেহ না জানয়ে তারে।
প্রেমের আরতি যে জন জানয়ে সেই সে চিনিতে পারে।।”

basulidevi
বাসুলীদেবী।

এ ভাবে এক দিন উঠোন নিকোনোর সময় সুপুরুষ রামীর পথ আগলে দাঁড়ান চণ্ডীদাস এবং রামীকে প্রেম নিবেদন করেন৷ রামী কিঞ্চিৎ লজ্জিত। চণ্ডীদাস তাঁকে আলিঙ্গন করতে অগ্রসর হলেন৷ রামী তখন চণ্ডীদাসকে মনেমনে গ্রহণ করে প্রস্তাব দিলেন – ঠাকুর, তুমি তোমার সব কাম-বাসনা, সর্বশরীর এবং পুরো সম্মতিতে আমাকে গ্রহণ করো, তা হলেই আমি তোমার হতে পারব৷

চণ্ডীদাস এ বার খুশিতে পাগলপারা হয়ে বললেন, আজ থেকে আমার শরীর, এই বাসুলীদেবীর মন্দিরের দায়িত্ব সব তোমার৷ তুমি শুধু আমার৷ তুমি এই একাকী উত্তপ্ত মন ও শরীরকে শান্ত করো৷ চণ্ডীদাসের প্রেম গ্রহণ করলেন রামী৷ সঙ্গে ভয় পেলেন, যদি পাড়ার লোক তাঁদের প্রেমে বাধা দেয়৷ রামী বললেন, “না ঠাকুর, আমাকে ছাড়ো এতে তোমার বিপদ”৷ “আসুক বিপদ, শুধু তুমি আমাকে ভালোবাসো আমি সব সময় তোমার”- চণ্ডীদাসের জবাব৷ “তবে তা-ই হোক, আজ থেকে আর কোনো লোকলজ্জাকে ভয় নয়” – স্পষ্ট উক্তি রামীর৷

“মরম না জানে, মরম বাথানে, এমন আছয়ে যারা।
কাজ নাই সখি, তাদের কথায়, বাহিরে রহুন তারা।
আমার বাহির দুয়ারে কপাট লেগেছে – ভিতর দুয়ার খোলা।”

প্রেমের টানে পদাবলি রচনায় যাতে বাধার সৃষ্টি না হয় সে ব্যাপারে সংযত চণ্ডীদাস৷ রামী, বাসুলীদেবী ও কৃষ্ণের পদ – এই তিনটি বিষয় আবর্তিত হতে লাগল চণ্ডীদাসের জীবন৷

বাসুলীদেবীর প্রতি ভক্তি ও রামীর প্রতি প্রেমসুখ, দুয়ে মিলে পরমসুখে এ বার জোর কদমে শ্রীকৃষ্ণ পদাবলি লিখতে লাগলেন চণ্ডীদাস৷ কখনও ভাবের ঘোরে নিজেদের প্রেমকাহিনি স্থান পেল পদাবলির কাব্যে৷ এ ভাবে একদিন সৃষ্টি হল বাংলার প্রথম সাহিত্য শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের৷

আজ যেখানে মাটির ঢিবি অতীতে সেখানে সাঁঝের বেলায় চণ্ডীদাস  ও রামী কীর্তনের আসর বসাতেন যাতে গ্রামের মানুষ তাদের দু’জনের সম্পর্ককে গুরুশিষ্যার মতো করেই দেখেন৷ তাঁদের কীর্তন শুনতে জড়ো হতেন গ্রামের প্রায় সকলেই৷

চণ্ডীদাস ও রামীর মৃত্যু নিয়ে প্রচলিত কাহিনির কথায় আসি। সেই সময় বাংলার পাঠান সুলতান কিরগিজ খাঁ জোর করে বিয়ে করলেন এক হিন্দু কন্যাকে৷ সেই সুলতানের পত্নীও প্রায়ই আসতেন চণ্ডীদাসের কীর্তন শুনতে৷ ধীরে ধীরে সুলতানের সেই স্ত্রীও চণ্ডীদাসের প্রেমে পড়লেন৷ সুলতান তাঁর স্ত্রীর কাছে সব ব্যাপার জানতে চাইলেন৷ চণ্ডীদাসের প্রেমে পড়ার কথা সুলতানের স্ত্রী নিজমুখে স্বীকার করে নিলে কিরগিজ এক সন্ধেবেলা নিজ স্ত্রীকে বাসগৃহে আটকে রেখে চণ্ডীদাসের কীর্তনের আসরে আচমকা গোলাবর্ষণ করেন৷ ঘটনাস্থলেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যান চণ্ডীদাস, রামী-সহ বেশ ক’জন গ্রামবাসী৷ ধ্বংস হয় বাসুলীদেবীর মন্দির৷

that mound in nanur
সেই ঢিবি।

তবে চণ্ডীদাসের মৃত্যু নিয়ে আরেকটি মত প্রচলিত৷ চণ্ডীদাস ও রামির প্রেমকাহিনি গ্রামবাসীরা জানতে পেরে রেগে ফুঁসে ওঠে এক রাতে দু’জনকেই বেধড়ক পিটিয়ে মেরে ফেলে৷ পরে তাঁদের দুজনের মৃতদেহের ওপর মাটি জড়ো করে ঢিবি বানিয়ে দেয়৷

এই সব কাহিনি কতটা বিশ্বাসযোগ্য, সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। বিশেষ করে, চণ্ডীদাসের সময় গোলা, বিশ্বাস করা যায় না।

১৭-১৮ শতক নাগাদ এই অঞ্চলের তিলি সম্প্রদায়ের মানুষ মাটি খুঁড়ে বাসুলীদেবীর মূর্তি পুনরুদ্ধার করেন এবং মাটির ঢিবির পাশেই মন্দিরগুলি নির্মাণ করেন৷ পরবর্তীকালে ১৯৪৫ সাল নাগাদ সরকারি ভাবে খনন চালিয়ে অতীত পুনরুদ্ধার করা হয়৷ বর্তমানে বাসুলীদেবীর মন্দির-সহ আরও ১৪টি শিবমন্দির রয়েছে মন্দিরচত্বরে৷ সব ক’টাই চারচালাবিশিষ্ট৷ এর মধ্যে দু’টি শিবমন্দিরে টেরাকোটার সুন্দর কাজ লক্ষ করা যায়৷ মন্দিরদু’টির দেওয়ালে টেরাকোটার কাজে রাধাকৃষ্ণের লীলাকেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে৷

এ ছাড়া মন্দিরচত্বরের দু’ পাশে চারটি করে শিবমন্দিরে পঙ্খের অতি সুন্দর কারুকাজ দৃশ্যমান৷ বাকি শিবমন্দিরগুলি সাধারণ ইটে তৈরি এবং চারচালা চূড়াবিশিষ্ট৷

narayan mandir,nanur
নারায়ণ মন্দির।

বাসুলীদেবীর মন্দিরের ডান দিকে চারচালার সমতল ছাদবিশিষ্ট মন্দিরটিতে নারায়ণের পূজা হয়৷ আর সামনের ঘরটিতে বিভিন্ন মৃন্ময়ী দেবদেবীর পূজা হয়৷

বাসুলিদেবীর মন্দির সমতল চারচালাবিশিষ্ট, ইটের তৈরি, মন্দিরের মাথায় একটি চূড়া৷ মন্দিরের গর্ভগৃহে চণ্ডীদাস পূজিত দেবীমূর্তি৷ কালো কষ্টিপাথরের দেবীমূর্তি বীণারঞ্জিত হলেও মুলত শাক্তমতে তাঁর পূজা হয়৷ আশ্বিন মাসে শারদোৎসবের সময় পাঁচ দিন ধরে দেবীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়৷ সেই সময় মোষবলিও হয়৷

এই মন্দিরচত্বর থেকে সামান্য দূরে থানার পাশে যে পুকুরটি আছে সেখানেই রামী কাপড় কাচতে যেতেন৷ এখনও পুকুরধারে রক্ষাকালী মন্দিরের এক দিকে রামীর কাপড় কাচার পাটাটি সংরক্ষিত আছে৷

washing stone of Rami
রামীর কাপড় কাচার পাটা।

নানুরে বাসস্ট্যান্ডের মোড়ে রয়েছে চণ্ডীদাস ও রামীর বড়ো মূর্তি৷ এ ছাড়া নানুরের কাঁথার কাজের খ্যাতি উল্লেখযোগ্য৷ নানুর সফরে সেখানকার মিষ্টির স্বাদ নিতে ভুলবেন না৷

কী ভাবে যাবেন

রেলপথে হাওড়া/শিয়ালদা-রামপুরহাট লাইনে বোলপুর-শান্তিনিকেতন পৌছে সেখান থেকে বাসে বা গাড়ি ভাড়া করে যেতে পারেন নানুর, মাত্র ২১ কিলোমিটা৷ বোলপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে মুহুর্মুহু বাস যাচ্ছে নানুর গ্রাম হয়ে৷ কলকাতা থেকে সড়কপথ দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বর্ধমান, সেখান থেকে মঙ্গলকোট-নতুনহাট হয়ে নানুর।

কোথায় থাকবেন

নানুরে থাকার তেমন জায়গা নেই৷ শান্তিনিকেতন বেড়াতে গিয়ে ঘুরে নিন নানুর। শান্তিনিকেতনে নানা বাজেটের হোটেল আছে। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের রয়েছে শান্তিনিকেতন ট্যুরিস্ট লজ ও রাঙাবিতান ট্যুরিস্ট কমপ্লেক্স। দু’টোরই অনলাইন বুকিং www.wbtdcl.com। বেসরকারি হোটেলের সন্ধান পাওয়া যাবে goibibo, makemytrip, trivago, booking.com, tripadvisor, yatra.com, cleartrip প্রভৃতি ওয়েবসাইট থেকে।

ছবি: লেখক

 

 

 

 

 

 

0 Comments
Share
a-weekend-visit-to-acchipur
ঋত্বিক দাস

১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দের কোনো এক দিন৷ বজবজ থেকে কয়েক কিলোমিটার দক্ষিণে গঙ্গার ঘাটে নোঙর করল এক বিশাল বাণিজ্যতরী৷ সে দিন সেই আগন্তুক বাণিজ্যতরীটি দেখে তৎকালীন জমিদারমশাই তৎক্ষণাৎ তরীটি আটক করার নির্দেশ দিলেন৷ বাণিজ্যতরী থেকে নেমে এলেন ছোটো ছোটো চোখবিশিষ্ট এক ব্যক্তি। জমিদারের নায়েব তাঁর কাছে জানতে, তাঁদের জমিদারিতে এ ভাবে পা রাখার উদ্দেশ্য কী। প্রত্যুত্তরে মানুষটির কাছ থেকে জবাব এল, “আমি মি: টং আছিও, তোমাদের জন্য চা নিয়ে এসেছি।” জমিদারবাহিনী তো শুনে থ। এই ‘চা’ আবার কী বস্তু৷ তখন টং আছিও সেই মুহূর্তে জাহাজের কর্মীদের সাহায্যে সবাইকে চা বানিয়ে খাওয়ালেন৷ খেয়ে সবাই বুঝলেন কী অদ্ভুত পানীয়! খাওয়ামাত্র শরীর চাঙ্গা।

এমন অদ্ভুত বস্তুর মাধ্যমে টং আছিও সবার মন জিতে নিলেন আর ভারতের মাটিতে আরম্ভ হল চা-পানের অধ্যায়৷শুধু সে দিন ভারতীয় জমিদাররাই নন, তৎকালীন গভর্ণর লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংসের মুখেও এই চা নামক বস্তুটির স্বাদ পৌঁছে গেল৷ টং আছিওর সঙ্গে সাক্ষাৎ হল হেস্টিংস সাহেবের। আছিও সাহেব ভারতের মাটিতে চিনিকল বসানোর বাসনা ব্যক্ত করলেন তাঁর কাছে৷ আছিও সাহেবকে চিনিকল তৈরি করার জন্য বজবজের কাছে গঙ্গার ধারে বার্ষিক ৪৫ টাকার বিনিময়ে ৬৫০ একর জমি প্রদান করা হল৷ এর পর টং আছিও আবার দেশে ফিরে কয়েকশো চিনা কর্মচারী-সহ চা তৈরির মেসিন নিয়ে আসেন এবং গঙ্গার ধারের সেই জমিতে চিনিকল বসিয়ে চিনি উৎপাদন শুরু করেন৷ এ ভাবে শুরু হয়েছিল ভারতে প্রথম চিনি উৎপাদন। এর আগে ভারতীয়রা চিনি সম্পর্কে অবগত ছিল না৷ এ ছাড়া আছিও সাহেব ভারতীয় চাষিদের দিয়ে নীলচাষও করাতেন৷

grave of tong achhio
টং আছিও সাহেবের সমাধি, অছিপুর।

যখন এই সব ঘটনা ঘটছে তখন কলকাতার শহরে গাড়ি বলতে ছিল ইংরেজ সাহেব আর বিত্তবান বাবুদের ব্যবহার করার জন্য জুড়িগাড়ি, যাতে চড়া ছিল সাধারণ মানুষের স্বপ্নাতীত৷ টং আছিও সাধারণ মনুষের যাতায়াত অতি স্বল্প খরচে সুগম করতে আর্ কিছু মানুষের রুচিরোজগারের ব্যবস্থা করতে কলকাতার রাস্তায় প্রথম টানা-রিকশার প্রবর্তন করেন৷ আছিও সাহেবের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল কলকাতার রাস্তায় টানা-রিকশার পথচলা ৷

টং আছিও ভারতে দ্বিতীয় বারের জন্য এসে আর ফিরে যাননি৷ আছিও সাহেব সারা জীবন অবিবাহিত ছিলেন৷ তাঁর দেখাশোনা করতেন টেলিবিবি নামে এক মুসলিম মহিলা৷ শেষ জীবনেও তিনি আছিও সাহেবের সেবা করে গিয়েছেন৷ মৃত্যুর পর আছিও সাহেবকে গঙ্গার পারে তাঁর চিনিকলের কাছে সমাধিস্থ করা৷ কয়েক বছর বাদে টেলিবিবিও দেহ রাখেন৷ আছিও সাহেবের সঙ্গে দেশ থেকে এসে তাঁর কর্মচারী ও সঙ্গীরাও ভারতের মাটিতে পাকাপাকি ভাবে বসবাস শুরু করেন৷ তবে চিনা সাহেবের মৃত্যুর পর চিনিকল বন্ধ হয়ে যায়। কলের সব কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা রুচি রোজগরের টানে বজবজের ধারের সেই জায়গা ছেড়ে কলকাতার কিছু জায়গায় ছড়িয়ে পড়েন৷ এর মধ্যে নাম করতে হয় অধুনা ট্যাংরা অঞ্চলের চিনাপাড়া৷ এখানে চিনা সম্প্রদায়ের মূল রুজি রেস্তোরাঁ ব্যবসা৷

chinese god khodakhudi
চিনা দেবতা পাকুমপাহ তথা খোদাখুদি, অছিপুর।

চিনা সাহেব টং আছিওর পদার্পণের সূত্রে বজবজের কাছে গঙ্গার ধারের সেই জায়গা আজ অছিপুর নামে পরিচিত। সেই অছিপুরেই পা রাখলাম একদিন। প্রথমেই গেলাম চিনেম্যানতলায়। যে জায়গায় আছিও ও তাঁর সঙ্গীরা ভারতের মাটিতে প্রথম পা রাখেন বর্তমানে সেই স্থানটিই চিনেম্যানতলা নামে পরিচিত৷ কেউ কেউ আবার স্থানটিকে চিনেকুঠিতলা বলেও ডেকে থাকেন৷ নামে ‘চিনে’ থাকলেও বর্তমানে এখানে কোনো চিনার বাস নেই। তবে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারির ১২ থেকে ২৪ তারিখ চিনা নববর্ষ উপলক্ষ্যে এখানে জাঁকালো উৎসব হয়। সেই সময়ে দেশের নানা প্রান্ত, এমনকি বিদেশ থেকেও চিনারা এখানে আসেন৷ চিনেম্যানতলার প্রধান দ্রষ্টব্য ‘পাকুমপাহ’র মন্দির। সেই মন্দিরের বিগ্রহ দু’টিকে স্থানীয় মানুষ খোদা-খুদি নামে ডাকেন৷ এই মন্দিরটি আছিও সাহেব নির্মাণ করান৷

আছিও সাহেবের সময় এই জায়গা সুন্দরবন অঞ্চলের মধ্যেই ছিল। তাই স্বাভাবিক ভাবেই এখানে প্রচুর বাঘের উপদ্রব ছিল৷ বাঘদেবতাকে তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে আছিও সাহেব দক্ষিণ রায়ের মন্দির স্থাপন করেন৷ মন্দিরটি আকারে ছোটো চতুষ্কোণ-বিশিষ্ট। ভেতর কোনো মূর্তি নেই। ঘটকেই দেবতা মনে করে পুজো করা হয়৷ পরবর্তী কালে আছিও সাহেব দক্ষিণ রায়ের মন্দিরের সম্মুখ ভাগে চৈনিক দেবদেবী ‘পাকুমপাহ’ (খোদাখুদি)-র মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন৷ স্থানীয় মানুষজন বলেন, আগে এই দেবদেবীর মূর্তি সোনার ছিল। মৃত্যুর আগে আছিও সাহেব এক স্বপ্নাদেশ পান। সেই স্বপ্নাদেশ পেয়ে সোনার মূর্তি সমুদ্রে নিক্ষেপ করে চন্দন কাঠের মূর্তি মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন৷ মন্দিরের গর্ভগৃহ আয়তনে ছোটো হলেও খুব যত্নে সাজানো৷ মূল মন্দিরের সামনে প্রার্থনাকক্ষ। সেখানে লম্বা একটি টেবিলে সারি সারি মোমবাতি ও ধুপকাঠি জ্বালানোর ব্যাবস্থা, যেগুলি ফেব্রুয়ারি মাসে  চিনা নববর্ষের সময় সুশোভিত হয়ে ওঠে৷ মন্দিরের ডান দিকে বিশ্রামকক্ষ। সেখানে এক পাশের দেওয়ালে মন্দির সংস্কারে সাহায্যদাতাদের চিনা হরফে শ্বেতপাথরের ওপর লেখা৷ মন্দিরের বাঁ দিকের কোণে চিনাদের আরেক দেবতা কনফুসিয়াসের মন্দিরকক্ষ৷ এই কক্ষের সামনে আজও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে আছিও সাহেবের বাণিজ্যতরীর একটি অংশ৷ পুরো মন্দিরচত্বর পাঁচিল দিয়ে ঘেরা৷ মূল দরজাটি বেশ সুন্দর৷ সামনে বড়ো মাঠের মতো ফাঁকা জায়গা। মাঠের পাঁচিলের আরেক পাশে ছিল আছিও সাহেবের চিনির কল, যা আজ সম্পূর্ণ অবলুপ্ত৷ সেই জায়গায় গড়ে উঠেছে ঘনবসতি৷ আর মন্দিরের পেছনে যে পুকুরপাড়, সেখানেই ছিল আছিও সাহেবের নীলচাষের খেত৷ পুরো মন্দিরচত্বর গাছগাছালিতে ছাওয়া, সুন্দর পরিবেশ৷ স্নিগ্ধতা, শান্তি এখানে পরম প্রাপ্তি৷

confusious in temple
মন্দিরকক্ষে কনফুসিয়াস, অছিপুর।

মন্দিরের মুল গেট দিয়ে বেরিয়ে ডান হাতে কিছুটা পথ গিয়ে গঙ্গা৷ গঙ্গা এখানে বেশ চওড়া, অপর পারে উলুবেড়িয়া৷ এই গঙ্গার পাড় ধরে বাঁ দিকে কিছুটা গেলে রয়েছে আছিও সাহেবের সমাধি৷ সমাধিস্থলটি নির্জন। জোয়ারের সময়ে গঙ্গার জলের ছলাৎ ছলাত শব্দে মনটা ভরে ওঠে৷ জীবনের সমস্ত কষ্ট-বেদনা, না-পাওয়া, সব মিটিয়ে এক অনাবিল আনন্দে যেন পরিপূর্ণ পরিপুর্ন করে দেয় এই স্থান৷ সমাধিবেদিটি সুন্দর করে বাঁধানো, লাল রঙের। এখানে গঙ্গার সেই সুন্দর ধ্বনি শুনতে শুনতে চিরনিদ্রায় রয়েছেন আছিও সাহেব৷

আছিও সাহেবের সমাধি ছেড়ে দক্ষিণমুখী আরও পনেরো মিনিট হাঁটার পর বাঁ হাতে পড়ল নবাবি আমলে নির্মিত এবং বর্তমান আমলে ধ্বংসপ্রাপ্ত বারুদকল৷ না, না পারলে হাঁটবেন না। অছিপুর বেড়াতে এসে রিকশা চেপে ঘুরে যাবেন এই বারুদকলটি৷ তবে গঙ্গার পাড় বরাবর বেশ কিছুটা সময় ধরে হেঁটে মনকে তৃপ্ত করে নেওয়া যায়৷ এই হল আজকের অছিপুর৷

ফেরার পথে চড়িয়াল মোড় থেকে অটো বা ম্যজিক গাড়িতে করে বাওয়ালি ট্রেকার স্ট্যান্ডে নেমে বাঁ হাতি পথে মিনিট পাঁচেক পথ হেঁটে ঘুরে নিতে পারেন বাওয়ালি রাজবাড়ি৷

কী ভাবে যাবেন

শিয়ালদহ থেকে বজবজ লোকালে বজবজ স্টেশন। সেখান থেকে অছিপুরের অটোতে বড়োবটতলা নেমে বাঁহাতি রাস্তায় হেঁটে ১০ মিনিট বা রিকশায় ৫ মিনিটে পৌঁছে যান চিনেম্যানতলা৷ আর ধর্মতলা থেকে ৭৭ নং বাসে চড়ে সরাসরি পৌঁছে জেট পারেন অছিপুর বড়োবটতলা৷

ছবি: লেখক

0 Comments
Share
duarsini-can-be-an-ideal-destination-for-you-if-you-wish-to-enjoy-silence-during-puja

ভ্রমণঅনলাইন ডেস্ক: বছর দশেক আগের কথা। মাওবাদীদের হামলায় গুঁড়িয়ে গেল পুরুলিয়ার বান্দোয়ানে পঞ্চায়েত সমিতির নির্মীয়মাণ একটি অতিথি আবাদস। এর সরাসরি প্রভাব পড়ল কাছেই একটি টিলার ওপরে অবস্থিত রাজ্য বনোন্নয়ন নিগমের রিসর্টে। সাতগুড়ুম নদীর তীরে অবস্থিত রিসর্টে বন্ধ হয়ে গেল পর্যটকদের আনাগোনা। পর্যটকদের জন্য বন্ধ হয়ে গেল দুয়ারসিনির দরজা।

কিন্তু সে সব এখন অতীত। নতুন করে ফের দুয়ার খুলতে চলেছে দুয়ারসিনির। পুজোর আগেই সেখানে পর্যটকদের পা পড়বে বলে আশাবাদী বন দফতরের আধিকারিকরা।

আরও পড়ুন বেড়াতে চলুন ‘চলো বেড়াই’ এবং ‘সুহানা সফর’-এর সঙ্গে

রিসর্টটি পশ্চিমবঙ্গ বনোন্নয়ন নিগমের অধীন। দশ বছর আগে মাওবাদী হামলার পর থেকে ক্রমে নষ্ট হতে বসেছিল সেটি। কিন্তু ইদানীং এই অঞ্চলে আর মাওবাদীদের দাপট নেই। তাই সেই রিসর্টটি নতুন ভাবে সাজিয়ে তোলার জন্য গত বছর থেকে কাজে নামে বন দফতর। এখন নতুন রূপে সেজে উঠেছে এই রিসর্টের তিনতে কটেজ। পর্যটকদের জন্য রিসর্টটি এখনও খুলে দেওয়া না হলেও, পুজোর আগেই সেটি খুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বন দফতর। কিছু দিনের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ বনোন্নয়ন নিগমের (www.wbfdc.in) ওয়েবসাইটে রিসর্টটির অনলাইন বুকিং-ও শুরু হয়ে যাবে।

পুজোর সময়ে অনেকেই শহুরে কোলাহল এড়িয়ে চলতে ভালোবাসেন। তাঁদের জন্য আদর্শ জায়গা হতে পারে এই দুয়ারসিনি।  

 

0 Comments
Share
weekend-tour-to-vutaburi-and-ghagharburi
writwik das
ঋত্বিক দাস

প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের জয়জয়কার আজ সর্বত্র৷ তবুও আজও কোথাও যেন ধর্মীয় বিশ্বাসই মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম সহায়ক৷ এমনই এক প্রত্যন্ত গ্রাম আজও বেঁচে আছে এই লৌকিক বিশ্বাসকে আশ্রয় করে৷ আর যাকে ঘিরে এই বেঁচে থাকা তিনি হলেন লৌকিক দেবী ভূতাবুড়ি৷

আসানসোল শিল্পশহরের বার্নপুর থেকে বাসে হীরাপুর ধর্মতলা নেমে কিছু দক্ষিণে গেলে পড়বে শ্যামডিহ গ্রাম৷ প্রত্যন্ত এক গ্রাম৷ বলতে গেলে আধুনিক সুযোগসুবিধা থেকে প্রায় বঞ্চিত৷ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা সবই এই গ্রামের মা ভূতাবুড়িকে ঘিরেই আবর্তিত হয়৷ এই ভূতাবুড়ি চণ্ডীর রূপ হিসেবে পূজিত হলেও মুলত তিনি লোকদেবী৷ দামোদর নদীর তীরে পশ্চিম বর্ধমানের সীমান্তে দেবীর থান৷ অনাবিল সুন্দর প্রকৃতি, নিস্তব্ধ এলাকা, পাশেই দামোদর নদ, ও পারেই বাঁকুড়ার গ্রাম, আরও দক্ষিণে হাতছানি দিচ্ছে বাঁকুড়ার বিহারীনাথ পাহাড়৷ চারিপাশে শুধু প্রকৃতি আর প্রকৃতি৷

আরও পড়ুন সুন্দরবন ছাড়াও ঘরের কাছে রয়েছে আরও এক ম্যানগ্রোভ অরণ্য, এই সপ্তাহান্তে চলুন…

এমন নির্জন স্থানে দামোদরের তীরে লাল পাথরের এক বেদিতে ভূতাবুড়ি মাতার থান৷ কোনো মূর্তি নেই দেবীর৷ বেশ ক’টি পাথরের ঘোটকই দেবীর প্রতিভু৷ পাশেই বাঘরায়ের থান৷ ইনি মূলত ভূতাবুড়ির ভৈরব বলেই পরিচিত৷ মন্দিরের পাশে এক কূপে দামোদর থেকে জল এসে ভরে থাকে। এই জল পানও করা যায়৷

ভূতাবুড়ি মন্দিরের পাশে দামোদর। ও পারে আবছা বিহারীনাথ পাহাড়।

‘ভুত’ শব্দের অর্থ প্রেতাত্মা আর তারই স্ত্রীলিঙ্ঙ্গ ‘ভূতা’৷ অর্থাৎ ভূতাবুড়ি প্রকৃতপক্ষে জনসমাজে অপদেবী হিসেবেই পরিচিত৷ অতীতে এই আসানসোল অঞ্চলে যখন শিল্প গড়ে ওঠেনি, আজকের আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি, তখন এই অঞ্চলের মানুষের কৃষিকাজই ছিল মূল ভরসা৷ চিকিৎসা ও শিক্ষার উন্নতির ছোঁয়াও তখন এখানে পড়েনি৷ উপরন্তু দামোদরের অভিশাপে ফি বছর ভেসে যেত গ্রাম। তখনও দামোদরের বুকে বাঁধ তৈরি হয়নি৷ এমন অবস্থায় দুঃখকষ্ট, রোগশোকের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য জন্ম হয় দেবী ভূতাবুড়ির৷

ভূতাবুড়ি মন্দিরের প্রবেশফটক।

এই দেবী ভূতাবুড়িকে নিয়ে নানা কাহিনি প্রচলিত৷ এই দেবীরা সাত ভাইবোন – ছয় বোন ও এক ভাই৷ সব চেয়ে বড় বোন হল আসানসোলের কালীপাহাড়ির কাছে দেবী ঘাঘরবুড়ি। এই দেবীর কথা নিয়ে পরেই আলোচনা করছি৷ আর বাকি পাঁচ বোন হলেন দেবী নুনীবুড়ি, ঘোষবুড়ি, ধেনুয়াবুড়ি, কেন্দুয়াবুড়ি ও পিয়ালশালবুড়ি আর শান্তিনাথ হলেন এই সাত বোনের একমাত্র ভাই৷ দেবীর পূজার কোনো নির্দিষ্ট মন্ত্র নেই। শুধুই ভক্তি আর ভূতাবুড়ি ও বাকি ছয় ভাইবোনের নাম উচ্চারণ করেই পূজারি দেবীর পূজা সুসম্পন্ন করেন৷

মা ভূতাবুড়ি।

বর্তমানে গোবিন্দ রায় মন্দিরে পূজার দায়িত্বে আছেন৷ কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গেই। তিনিই আমাদের জানালেন আরও কথা৷ পয়লা মাঘ জাঁকজমক করে দেবীর পূজার্চনা হয়৷ তখন দামোদরের তীর লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে৷ পূজা উপলক্ষ করে গ্রামে মেলাও বসে৷ এ ছাড়াও প্রত্যেক শনিবার দেবীর জোরদার পুজো হয়৷ পুজো চলাকালীন অনেক সময়েই পূজারির ওপর ‘মায়ের ভর হয়’। তখন মানুষের বিভিন্ন সমস্যার উপায় তিনি বাতলে দেন। এর পর পুজায় নিবেদন করা কাঁচা দুধ খেয়ে পূজারির ভর কাটে৷ পূজার ভোগ উপকরণের মধ্যে ফল ও নানা মিষ্টি থাকলেও ভূতাবুড়ির পছন্দের খাবার হল মুড়ি ও বিভিন্ন কলাই, ছোলা, বাদাম ইত্যাদি মুচমুচে করে ভাজা৷ পূজার সময় বিভিন্ন বাড়ি থেকে দেবীকে গামলায় এই কলাইভাজা ও মুড়ি ভোগ দেওয়া হয়৷ গোবিন্দবাবু আরও জানান, আগে ফি বছর দেবীকে উৎসবের সময় খিচুড়িভোগ দিয়ে সেই ভোগ মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হত। কিন্তু পরবর্তীকালে মাতালের উৎপাত হেতু সেই রীতি বর্তমানে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে৷ লোককথা ও প্রকৃতি সব মিলিয়ে ভূতাবুড়ির থান চির আকর্ষণীয়৷

ঘাঘরবুড়ির বিগ্রহ।

ভূতাবুড়ির মতোই তাঁর বড়ো বোন দেবী ঘাঘরবুড়িও আসানসোল অঞ্চলের আরেক জনপ্রিয় দেবী৷ অতীতে কালিপা্হাড়ি অঞ্চলের নুনিয়া নদীর ধারে তিনটে শিলাকে দেবী চণ্ডীর প্রতিভূ মনে করে মানুষের পূজার্চনা চলতে থাকে৷ এই কাণ্ড দেখে গ্রামের জায়গিরদাররা সেই স্থানে একটি মন্দির বানানোর সিদ্ধান্ত নেন৷ গড়ে ওঠে মন্দির৷ অনেকে মনে করেন, দেবীকে ঘাঘরা পরানোর জন্য নাম হয় দেবী ঘাঘরবুড়ি৷ পয়লা মাঘ ও শ্যামাপুজার রাতে বড়ো করে উৎসব হয়৷ এ ছাড়াও প্রতি শনি ও মঙ্গলবার মন্দিরে ভক্তদের ভিড় হয়৷ মন্দিরচত্বর জমজমাট৷ পূজার উপকরণের দোকান, জলখাবারের দোকান, দুপুরের ভাত খাওয়ার হোটেল – সব মিলিয়ে মন্দিরচত্বরে সব সময়েই যেন চলছে ছোটো মেলা৷ এই মন্দিরচত্বরে সুকুমারের দোকানের খাঁটি দুধের গরমাগরম চা মুখে লেগে থাকবে৷ মাটির বড়ো মালসায় খাঁটি দুধ জাল দিয়ে অনবরত তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু চা৷

নুনিয়া নদী।

পাশেই নুনিয়া নদী৷ ছোটোনাগপুর মালভূমির পাথুরে নদীর পাড়ে বসে থাকতে ভালো লাগে৷ তবে নদীর জলে না নামাই ভালো৷ বেশ জমজমাট মন্দিরচত্বর৷ কল্যাণেশ্বরী, মাইথন ভ্রমণের সঙ্গে দেবী ঘাঘরবুড়ির মন্দির দর্শনও সেরে নিলে মন্দ হয় না৷

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে ট্রেনে আসানসোল। বা ট্রেনে আসানসোল হয়ে বার্নপুর। আসানসোল বা বার্নপুর থেকে বাসে হীরাপুরের ধর্মতলা। সেখান থেকে দক্ষিণমুখী পথ ধরে হাঁটলে পড়বে শ্যামডিহ গ্রাম। এই গ্রামের ভেতরেই দামোদরের ধারে মা ভূতাবুড়ির থান৷ তবে ভালো হয় আসানসোল বা বার্নপুর থেকে টোটো বা অটো ভাড়া করে যাওয়া। শ্যামডিহ গ্রামের পথে হেঁটে চলা মুশকিল৷

আর ঘাঘরবুড়ি যাওয়ার জন্য ট্রেনে আসানসোল বা কালীপাহাড়ি চলুন। সেখান থেকে বাসে ঘাঘরবুড়ি স্টপে নেমে সামান্য হাঁটা৷ এ ক্ষেত্রেও আসানসোল স্টেশন থেকে টোটো বা অটো বুক করে সরাসরি মন্দিরচত্বরে চলে আসা যায়৷

ট্রেনের সময়ের জন্য দেখে নিন erail.in

আর কলকাতা থেকে সরাসরি গাড়িতে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে আসানসোল হয়ে চলে যেতে পারেন ভূতাবুড়ি। দিল্লিগামী জাতীয় সড়কের ধারেই ঘাঘরবুড়ি।

কোথায় থাকবেন 

ভূতাবুড়ির আশেপাশে থাকার জায়গা বলতে মাইথন বা আসানসোলে কোনো। হোটেলের খোঁজ পাবেন makemytrip, goibibo, trivago, cleartrip, holidayiq  ইত্যাদি ওয়েবসাইট থেকে। আর ঘাঘরবুড়ি মন্দিরের সামনে একটি গেস্ট হাউস আছে৷ আগাম বুকিং-এর দরকার হয় না।

মনে রাখবেন

কল্যাণেশ্বরী-মাইথন ভ্রমণের সঙ্গে ঘুরে নিতে পারেন ভূতাবুড়ি ও ঘাঘরবুড়ি।

ছবি: লেখক

0 Comments
Share
this-weekend-you-can-travel-to-bichitrapur

ভ্রমণঅনলাইন ডেস্ক: দিঘা তো আমবাঙালির যাওয়া লেগেই থাকে। দিঘা থেকে ওড়িশায় ঢুঁ মেরেও আসেন অনেকেই। সে সীমান্তের সৈকত উদয়পুর হোক বা তালসারি। কিন্তু এর বাইরেও আরও একটি জায়গা আছে, দিঘা থেকে মাত্র ১৬ কিমি দূরে। ম্যানগ্রোভ অরণ্যে ঘেরা বিচিত্রপুর।

আরও পড়ুন কাঁকসা, দেউল ও কেঁদুলির জয়দেব

একেবারে নতুন পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে ওড়িশা সরকার গড়ে তুলছে বিচিত্রপুরকে। তালসারি নয়, এই বিচিত্রপুরেই বঙ্গোপসাগরে মিশেছে সুবর্ণরেখা। স্পিড বোটে করে সুবর্ণরেখা ধরে বঙ্গোপসাগরের মোহনা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। 

bichitrapur

স্পিড বোটে চড়ে যাওযার সময়ে অনেকটা সুন্দরবনের খাঁড়ির মধ্যে দিয়ে যাওয়ার মতো অভিজ্ঞতা এবং রোমাঞ্চ অনুভব করবেন। দু’দিকে ম্যানগ্রোভের জঙ্গল। তফাৎ বলতে শুধু বাঘটাই যা নেই। মোহনা থেকে আপনি এক দিকে দেখতে পারবেন বঙ্গোপসাগরকে, অন্য দিকে সুবর্ণরেখাকে। 

বর্ষাকাল এবং শীতকালের সৌন্দর্য অতুলনীয়। শীতে পরিযায়ী পাখিদের দেখা মেলে এখানে।

কী ভাবে যাবেন

ট্রেনে বা বাসে দিঘা চলুন। দিঘা থেকে বিচিত্রপুর ১৬ কিমি। গাড়ি ভাড়া করে চলে আসতে পারেন। কিংবা কলকাতা থেকে সরাসরি গাড়িতে চলুন, কোলাঘাট-মেচেদা-নন্দকুমার-দিঘা-চন্দনেশ্বর হয়ে।

কোথায় থাকবেন

bichitrapur

অনেকের কাছে দিঘা থেকে শুধু ঘণ্টা দুয়েকের সাইটসিয়িং হতে পারে এই বিচিত্রপুর। কিন্তু এখানে একটা দিন থাকলে খুব ভালো লাগবে। এখানে থাকার জন্য রয়েছে ওড়িশার বনোন্নয়ন নিগমের বিচিত্রপুর নেচার ক্যাম্প। থাকা এবং খাওয়া নিয়ে দ্বিশয্যা এসি কটেজের ভাড়া তিন হাজার টাকা। অনলাইনে বুক করার জন্য লগইন করুন www.ecotourodisha.com

0 Comments
Share
kaksa-deul-and-joydeb-of-kenduli
jahir raihan
জাহির রায়হান

নিজেকে নিয়ে চিন্তা হচ্ছে ইদানীং। ক্যালেন্ডারে লাল কালি দেখলেই, পল্টু উঠছে লাফিয়ে। চলো পালাই, কিছু করে দেখাই। আর পড়ে যাচ্ছি দোটানায়, না গেলে ছুটি নষ্ট, আর গেলে বউ রুষ্ট। আবার সর্বদা সে সঙ্গে যাবে, তা-ও না। যেতে বললে হাজারো টালবাহনা, আর নিয়ে না গেলে নীরবে গঞ্জনা।

শান্তিপুর থেকে ফেরার পরই দোলযাত্রার ছুটি। অনেকদিন আগেই ছেড়েছি রঙখেলা, তা বলে বাড়ি বসে কী করি, তাই আবার পালানো। সঙ্গে ভায়রাভাই স্বপন, সহযাত্রী তার গিন্নী মানে আমার শ্যালিকা এবং তাদের কন্যা। গন্তব্য ইলামবাজার ছাড়িয়ে কাঁকসা দেউল পার্ক। তখন অবশ্য জানতাম না জয়দেবের অপর পাড়ে এর অবস্থান। মূলত গাছগাছালি দেখা আর অবকাশ যাপনের উদ্দেশ্যেই এই দেউল-যাত্রা। দোলের আগের দিন সন্ধ্যাতেই সশরীরে হাজির শ্যালিকার ঘরে, পর দিন সকাল সকাল ভোকাট্টা হওয়ার হাতছানি যে!

শ্বশুরকূলের জ্ঞাতিগুষ্টিতে আমার খাতির ভালোই। কমবেশি সকলেই পছন্দ করে এক ‘তিনি’ ছাড়া। তাঁর কাছে এখনও প্রিয়পাত্র হয়ে উঠতে পারিনি, শত প্রচেষ্টাতেও। তবে শ্বশুরকূলে আমার সাম্রাজ্যে সে ফাটল ধরাতে ব্যর্থ, বরং আমার বিরুদ্ধে নালিশ করলেই অবধারিত বাক্যবাণ জোটে তার কপালে। আমি তখন মিটিমিটি হাসি আর সে জ্বলে বেগুনপোড়া।

bolpur-ilambazar road
বোলপুর-ইলামবাজার রোড।

যাক, বউয়ের গুণগান বন্ধ এখন। স্বপনের নিজের গাড়ি, ফুটিসাঁকো মোড় থেকে বাদশাহি সড়ক ধরে রতনপুর পীরতলায় এসে ডান দিক দিয়ে নানুরের পথ ধরল। চল্লিশ বছরের অকেজো জীবনে এ চত্বরে আসা এই প্রথম। মাঝে মাঝে তাই ভাবি, কত কী দেখা হল না এ জনমে। সেটা ভাবতে ভাবতেই দেখে চলি গ্রামবাংলার চলছবি – ধানের গোলা, খামারবাড়ি, পুকুরপাড় ও তেপান্তরের মাঠ, সারি সারি তালগাছ আর পথচলতি মানুষ। আমাদের প্রাত্যহিক চলাফেরাতেই যে কত সহস্র ছবি তৈরি হয় অজান্তে, তারও কি কোনো হিসেব থাকে? জীবননদী বয়ে চলে তার আপন খেয়ালে, জন্মমৃত্যু, সুখদুঃখ, হাসিকান্না নিয়ে বেঁচে থাকাটাও তো এক ধরনের অলৌকিক জলযান, সদা চলায়মান।

রঙের ভয়ে জানলার কাচ তুলে দিয়ে, যান্ত্রিক ঠান্ডার কবলে আমরা চার জন। নানুর বাজারে দাঁড়িয়ে রয়েছি অনেকক্ষণ, দোলের একটা শোভাযাত্রা আসব আসব করেও আসছে না এগিয়ে, তাই রাস্তা স্থির, গতিহীন। করিৎকর্মা স্বপন গাড়ি ঘুরিয়ে অন্য রাস্তা নিল, ফলে দেখা হয়ে গেল আরও বেশ কিছু নতুন জনপদ।

বোলপুরের রাস্তাঘাট প্রায় স্তব্ধ তখন। প্রভাতফেরির শোভাযাত্রা শেষ হয়েছে সদ্য, কাতারে কাতারে লোক রাস্তায় নেমে বসন্তের রঙে রাঙিয়ে তুলেছে নিজেদের। আন্তর্জাতিক পরিচিতপ্রাপ্ত বোলপুরের সামগ্রিক চিত্র কোনোদিনই আমার মন ভরাতে পারে না, আরও পরিষ্কার, আরও সুশৃঙ্খল, আরও সবুজ নিয়ে রবি ঠাকুরের বোলপুরকে আমি দেখতে চাই। কিন্তু কংক্রিট-সভ্যতার বাস্তবতায় সে সুযোগ ইহজীবনে যে আর আসবে না, তা-ও জানি।

in search of daily livelyhood
রুজি- রুটির সন্ধানে।

পুলোমাদি বলেছিলেন, জানো, শহুরে জীবনের জটিলতা থেকে মুক্তি পেতে, আমেরিকার বহু শহরের নাগরিক, নগরসভ্যতা ছেড়ে মফস্‌সল বা গ্রামে সাধারণ খামারবাড়িতে শুরু করেছে দিনযাপন। নিয়ন আলো ব্যর্থ তাদের প্রাণকে আলোকিত করতে। সাধারণ জীবনযাত্রার অতি সাধারণ উপকরণ নিয়ে, তারা এখন বেজায় খুশি। ভোগবিলাস ত্যাগ করে প্রথম বিশ্বের হাজারো হাজারো নরনারী কেমন ভাবে চলে এসেছে আমাদেরই মায়াপুরে, ভেবে দেখুন। এ সব খবরে আমি মনের জোর পাই, বুঝতে পারি আলেয়ার পিছনে ছুটে নরকযন্ত্রণা ভোগ করার চেয়ে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে নিশ্চিন্তের ঘুম ঘুমোনো অনেক ভালো।

বোলপুর-ইলামবাজার সড়কের এক পাশেই প্রস্তাবিত বিশ্ববাংলা বিশ্ববিদ্যালয়ের জমিখানি চোখে পড়ল, কাগজে অনেক লেখালেখি পড়েছি এ নিয়ে। আরও কিছুটা এগোনোর পর শুরু হল শাল পিয়ালের জঙ্গল, রাস্তার দু’ধারে। গাছের ডালপালার মধ্য দিয়ে চুঁইয়ে পড়ছে সূর্যের সোনালি আলো, ফাগুনের মাতাল বাতাসে ঝরে পড়ছে পর্ণমোচী বৃক্ষরাজির পুরালো পত্রপল্লব, আর দিনকয়েকের মধ্যেই নতুন সবুজে সেজে উঠবে এ বনাঞ্চল। সম্ভাব্য সে সাজের দৃশ্যকল্পে বিভোর হল মন। ইলামবাজার থেকে পানাগড়-মোরগ্রাম জাতীয় সড়ক ধরে কিছুটা এগিয়ে বাম দিকে ঘুরে গেল আমাদের বাহন গুগল বাবার নির্দেশনায়, যার বুদ্ধির ঝলকে মনে হচ্ছে যেন কেউ ওপর থেকে খেয়াল ও নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের নিয়ে চলেছে গন্তব্যের দিকে।

the river ajay
অজয়ের দশা।

চলে এলাম জয়দেব কেঁদুলি, জলশূন্য অজয়ের বুকে বালির বাঁধ, তার ওপর দিয়ে পার হয়ে দেউল পার্কের দরজায়। কাজলডিহি পার হতেই গাছগাছালির ফাঁকেই উঁকি দিল রাঙা পলাশ। ঝামেলা হল দেউল পার্কে, ঠাঁই নাই, আর ঠাঁই নাই। তবে? নিশিযাপন করব কী ভাবে? অবসর আমোদের বুঝি দফারফা। পার্কের একজন খবর দিল, সামনে ‘অবকাশ’ নামে আর একটি আস্তানা আছে, দেখুন পান কিনা। গাড়ি কিছুটা এগোতেই নজরে পড়ল ইছাই ঘোষের সুউচ্চ দেউল। তার পরেই জঙ্গল শুরু। জঙ্গলপথ ধরে এগোতে এগোতেই দেখি আগে আগে আরও দু’টি গাড়ি। আগেভাগে যাতে ওরা ঘর দখল করতে না পারে, সেই ভেবেই গাড়ি থেকে নেমে দুই ভাই ঊর্ধশ্বাসে দিলাম দৌড়। ওরে বাবা, গিয়ে শুনি, ওঁরা মালিকের আত্মীয়-পরিজন, আজ আর ঘর পাওয়া যাবে না। তবে এক বয়স্কা ভদ্রমহিলা বললেন, একটু দাঁড়িয়ে যান, জয় আসুক, বলে দেখবেন একবার। বুঝলাম এ ওপরওয়ালার স্পষ্ট ইঙ্গিত, বয়স্ক লোকজন আমি এমনিতে পছন্দ করি, তাঁরা যখন চাইছেন, তখন হয়ে যাবে নিশ্চয়।

ডাক্তার নবারুণ ভট্টাচার্য ওরফে জয় এলেন ইনোভা চেপে, সঙ্গে পরিবার। আর্জি পেশ হল, লহমায় হয়ে গেল মুঞ্জুর, এক ফাঁকে অন্যের নজর এড়িয়ে খোদাতালাকে ধন্যবাদ দিয়ে দিলাম। ডাক্তারবাবু জানালেন, স্বজন-পরিজন নিয়ে আসলে ওঁরা রঙ খেলতে এসেছেন। ফি বছরই আসেন, সন্ধে হলেই ফিরে যাবেন, আমরা বেলাটুকু যেন একটু মনিয়ে নিই। পরে আবার খাওয়ার ব্যবস্থাও করে দিলেন উনি। একটু দেরি হবে হয়তো, তবে তা মেনে নিলাম সাদরে।

অজয়ে জল নেই, তার শুকনো খাত পড়ে রয়েছে আগামী বর্ষার অপেক্ষায়। ডাক্তারবাবু জানালেন, বর্ষায় অজয় উঠে আসে দ্বারে। সে সময়ের সেই জলছবি চোখে নিয়ে, মনে এঁকে, আমরা সবুজের মাঝে গেলাম হারিয়ে। গৌরাঙ্গপুর মৌজার শিবপুর বিটের এই জঙ্গলটিতে রয়েছে একটি হরিণ পুনর্বাসন কেন্দ্র, সহজেই চোখে পড়ে হরিণের সমাবেশ। যদিও এই কেজো তথ্যের বাইরে শুধু জঙ্গলের নির্জনতাই আমায় হাতছানি দেয় বেশি। খুব বড়ো গাছ নয়, আকাশ দেখা যায় দিব্যি, কিন্তু কোলাহলমুক্ত, পথিকহীন লাল মোরামের পথ জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চলে গিয়েছে অজানার সন্ধানে। সে পথে হাঁটতে হাটঁতে চকিতে চোখ পড়ে কোনো ময়ূরের ওপর, পদচারণার শব্দে তারা সচকিত হয়ে ওঠে। নানা বৃক্ষ আর নাম-না-জানা নানান ফুল ও বাহারি পাতা আমার নজর এড়ায় না। আপাদমস্তক লাল পাতায় সজ্জিত এমনই একটি গাছ দেখে দাঁড়িয়ে পড়লাম সহসা ।

deul of ichhai ghosh
ইছাই ঘোষের দেউল।

বনকাটি গ্রাম পঞ্চায়েতের গৌরাঙ্গপুরে মেরেকেটে ১১০ জন লোকের বসবাস। রীতিমতো লোভনীয় পরিসংখ্যান। মনে মনেই বললাম, পাকাপাকি এখানে চলে এলেও বেশ হয়। এমনিতে নিজের চাহিদা খুব কম, দু’বেলা দু’মুঠো অন্নের ব্যবস্থা আমি করে নিতে পারব ঠিক প্রকৃতির সহযোগিতায়, এখানে। গোপরাজা ইছাই ঘোষের দেউল আবার অবাক করে। ইট নির্মিত বিগ্রহবিহীন এই মন্দিরটি মধ্য-অষ্টাদশ শতকে নির্মিত। অনুমান করা হয়, ইছাই ঘোষ সম্ভবত দেবী ভগবতীর জন্য নির্মাণ করেন এই মন্দির। সন্ধ্যা ঘনাচ্ছে জঙ্গলের মাথায়, শ্বেত শুভ্র আলো নিয়ে আকাশে জেগে উঠছে দোল পূর্ণিমার রুপোলি চাঁদ। একটু পরেই তার আলোয় ভেসে যাবে চরাচর। সারা দিনের নানান রঙের রেশ, স্নিগ্ধ সাদারজোছনায় হয়ে উঠবে মায়াময়।

ডাক্তারবাবুর কল্যাণেই খোলা আকাশের নীচে, শুষ্ক অজয়কে পাশে নিয়ে, চাঁদের আলোয় চৌকিতে বসে খাওয়ার সৌভাগ্য হয়ে গেল। কোথায় লাগে ডাইনিং টেবিলের সভ্যতা, খাওয়ার কেতা আর বাধ্যবাধকতার নৈশ আহার। মন ভরে গেল, ঘুম ভাঙল আদিম সত্তার, যেন আমি এই অরণ্যেরই লোক, বাড়ি-ঘর, মা-বাবা, সমাজ-সভ্যতার কোনো আকর্ষণ বিকর্ষণ নেই আর। এখানেই যেন আাসার কথা ছিল আমার। অনেক অনেক রাত পর্যন্ত সেই নির্জনতায় চুপচাপ একা একা বসে থেকে থেকে নাগাল পেলাম সেই আমিত্বের যা আত্মগোপন করেছিল নানান ঠিক ভুলের কুঠুরিতে, আমারই হৃদয়ের গহীন গহনে, বহু দিনের তরে।

পর দিন সকালে গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করলাম অরণ্যের অন্দরে। বন্যজন্তুর ভয় নয়, পাচ্ছিলাম মানুষেরই ভয়। অজ্ঞাত জায়গা, কেউ নেই, কোত্থাও নেই। শুধুই পাতা ঝরার নৈবর্ত, বহতা বাতাসের আলাপ আর জঙ্গলের অস্পষ্ট অথচ নিবিড় নির্জনতার আহ্বান। মাঝে মাঝে স্থানীয় কেউ কেউ চলে যায় নিজ কাজে মোরামপথ ধরে। প্রান্তিক খেটে খাওয়া মানুষগুলিকে দেখে মায়া হয়, হয় হিংসাও। হিংসা হয় প্রকৃতির সান্নিধ্যে তারা থাকতে পারে বলে। জঙ্গলেই তাদের সকাল, দুপুর, সাঁঝ ও রাত্রি ঘনায়, প্রকৃতিই থাকে তাদের দৈনন্দিন ভাব ভালোবাসার সাথী হয়ে, সম্বৎসর।

medhasashram sri sri garhchandidham
মেধসাশ্রম শ্রীশ্রী গড়চণ্ডীধাম।

জঙ্গলের অভ্যন্তরে আবিষ্কৃত হল মেধসাশ্রম শ্রীশ্রী গড়চণ্ডীধাম। মহাপুরাণ ও মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুসারে সুরথ রাজা নিজ রাজধানী বোলপুর-সুপুর হতে বিতাড়িত হয়ে এই অরণ্য শবর কিরাতভূমিতে অবস্থানকালে, মেধসমুনির আদেশে মৃণ্ময়ী দুর্গাদেবীর প্রতিমা নির্মাণ করে পূজা শুরু করেন। তাঁর হাত ধরেই বঙ্গপ্রদেশের রাঢ় বাংলায় মেধসাশ্রমে প্রথম দুর্গাপুজোর প্রচলন হয়। গড়ের মধ্যে রয়েছে আরও অনেক দেবদেবীর মন্দির ও বিগ্রহ।

মন্দির দর্শনের পর সটান যাওয়া হল অজয়ের কিনারায়। ধু-ধু বালি, আগাছা আর হেথা হোথা আবদ্ধ নোংরা জল অবলীলায় আপনার মন খারাপ করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি নিয়ে মানুষের নিরন্তর অপব্যবহারের মাশুল যে একদিন আপনার আমার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও আগত পৃথিবীকে গুণতে হবে তা মালুম হবে অজয়কে দেখে। মানুষের লোভ-লালসা আর অবিবেচনা যে ধরণীকে একটু একটু করে ধ্বংসের দিকে নিয়ে চলছে প্রতিনিয়ত, তা অনুধাবন করার জন্য কোনো বৈজ্ঞানিক হওয়ার প্রয়োজন নেই, আপনার সংবেদনশীল মনই আপনাকে ইঙ্গিত দিয়ে দেবে, সুস্পষ্ট ভাবে।

tilottoma smriti kirtan o baul mancha
তিলোত্তমা স্মৃতি কীর্তন ও বাউল মঞ্চ।

এক রকম বিষন্নতা নিয়েই ফিরলাম ‘অবকাশ’-এ। স্নান-খাওয়া সেরে পাওনাগণ্ডা মিটিয়ে এগোলাম সভ্যতার পথে। পিছিয়ে যেতে থাকল বনকাটি, দেউল পার্ক, কাজলডিহি। পথের বাঁকের পলাশ গাছটিকে বিদায় জানিয়ে গাড়ি থামল জয়দেবের রাধাবিনোদ মন্দিরের সম্মুখে। জায়গাটি কেন্দুবিল্ব, বর্তমান নাম কেঁদুলি। ইটনির্মিত ও চতুবর্গ এই মন্দিরগাত্রের নকশি ইটে রয়েছে বিষ্ণুর দশ অবতার ও রামায়ণী কাহিনিচিত্রের বর্ণনা। বর্ধমানের মহারাজা কীর্তিচাঁদ বাহাদুর এর নির্মাণ করেন, সেটা ১৮৬৩ সাল। কথিত আছে, ভোজদেব ও বামাদেবীর পুত্র, ‘গীতগোবিন্দ’ রচয়িতা বৈষ্ণব কবি জয়দেবের আবাসস্থলে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত। কবি জয়দেব যোগবলে দেহত্যাগ করেন। কেঁদুলিতে রয়েছে তাঁর সমাধিমন্দির। প্রতি পৌষ সংক্রান্তিতে এখানে বিরাট মেলা ও মহোৎসব হয়, সমবেত হয় দেশ-দেশান্তরের নানা বর্ণের, নানা ধর্মের মানুষ। রাধাবিনোদ মন্দিরের পাশেই রয়েছে তিলোত্তমা স্মৃতি কীর্তন ও বাউল মঞ্চ, সেটাও দেখা হল ইতিউতি।

ইলামবাজার-বোলপুর রাস্তায় ফেরার পথে নজরে পড়ল ‘উড ফসিল পার্ক’। গাড়ি ঘুরিয়ে পাকা রাস্তা থেকে চার কিমি জঙ্গলের ভিতরে হদিশ মিলল তার। গ্রামটির নাম আমখই, চারিদিকে জঙ্গল, মাঝে এই আদিবাসী মহল্লা আর সেখানেই গড়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম ও একমাত্র জীবাশ্ম পার্কটি। জীবাশ্ম পড়েছিলাম সেই ছোটোতে, ভূগোল বইয়ের পাতায়। আজ চোখের সামনে, হাত দিয়ে অনুভব করা যায় এতটাই নিকটে তার উপস্থিতি। কোটি কোটি বছর আগে ভূত্বকের নানান প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার দ্বারা এই কাঠ জীবাশ্মের সৃষ্টি যা সাধারণ ভাবে পাওয়া যায় পাললিক শিলায়। ২০০৬ সালে আমখই গ্রামে পুকুর খননের সময় পাওয়া গেছে প্রদর্শিত জীবাশ্মগুলি। আজ থেকে দেড় কোটি বছর আগে অন্ত মায়োসিন যুগের সাক্ষ্য বহন করছে সংগৃহীত ফসিল সমূহ। অতীতে এই অঞ্চলে যে সুবিশাল গভীর বনভূমির অস্ত্বিত্ব ছিল, তার প্রমাণ এই অমূল্য কাষ্ঠ জীবাশ্মের সমাহার।

wood fossil park, deul
উড ফসিল পার্ক।

বন্ধু সেবাব্রত বলে, ভোগবাদের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেলে, মাটির কাছাকাছি ফিরে আসা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না মানুষের। সহজ সরল নির্ভেজাল দিনাতিপাত তাই সর্বদা উপভোগ্য এবং অনুসরণীয়। খড়ের চাল, নিকানো উঠোন, মাটির দেওয়াল, সে দেওয়ালে মেঠো রঙের নানা আঁকিবুকি, কারুকাজ – আমখই আমার হৃদয় হরণ করে। গ্রামবাসীর প্রতি দিনের রোজনামচা, তাদের হাসি ভরা সরল মুখ, ন্যাংটা খুদের পুকুরে ঝাঁপ আর এই বিস্তৃত শাল পিয়ালের মিছিল আমায় সভ্যতায় ফিরতে বাধা দেয়। যেতে নাহি দিব বলে পথ আটকায় কখনও বনকাটি, কখনও আমখই, কখনও বা কাজলডিহি।

কী ভাবে যাবেন 

কলকাতা থেকে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে দুর্গাপুর হয়ে যাওয়া যায় আবার পানাগড়-মোরগ্রাম সড়ক ধরে ১১ মাইল এসে সেখান থেকে বাঁ দিকে রাস্তা ধরে পৌঁছে যাওয়া যায় দেউল পার্ক। অজয় পেরিয়ে জয়দেব কেঁদুলি। আবার কলকাতা থেকে বোলপুর- ইলামবাজার হয়ে জয়দেব কেঁদুলি। নিজস্ব গাড়ি থাকলে সুবিধা।

হাওড়া বা শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ট্রেনে পানাগড়, দুর্গাপুর বা বোলপুর গিয়ে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে দেউল পার্ক ও জয়দেব কেঁদুলি। ট্রেনের সময়ের জন্য দেখে নিন erail.in ।

কোথায় থাকবেন

থাকার জন্য রয়েছে দেউল পার্ক ইকো রিসর্ট (০৯৮৩১৫৫৫৫৯৪), অবকাশ।

0 Comments
Share
let-us-visit-to-pakhipahar
মৌ মুখোপাধ্যায়

‘পিন্দারে পলাশের বন….’ – গানটা শুনলেই পুরুলিয়ার কথা মনে পড়ে যায়। এই পলাশের টানেই গত মার্চ মাসে দু’দিনের জন্য বেরিয়ে পড়লাম পুরুলিয়া ভ্রমণে। গাড়ি নিয়ে পুরুলিয়ার আনাচে কানাচে ঘুরতে ঘুরতে হাজির হলাম ‘পাখি পাহাড়ে’। নামটি শুনে মনে হয়েছিল হয়তো বা অনেক পরিযায়ী পাখির দেখা মিলবে। কিন্তু গাড়ি থেকে নেমে দেখলাম একটি অনুচ্চ পাহাড়ের গায়ে অসংখ্য উড্ডীয়মান পাখির প্রতিচ্ছবি আঁকা। বেশির ভাগ পর্যটক পাহাড়টি দূর থেকে দেখে ফিরে যান। আমরা ব্যাপারটা আরও ভালো করে বোঝার জন্য এগোতেই স্থানীয় একজন অনু্রোধ করলেন পাহাড়টির কাছে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। শাল-সেগুনের পাতার মর্মরধবনি ভেঙে এগিয়ে যেতে পাথরের গায়ে খোদাই করা কিছু মূর্তি চোখে পড়ল। হঠাৎ পিছন থেকে গুরু গম্ভীর সম্ভাষণ –  “এ দিকে আসুন”। খানিকটা ভয় আর কৌতূহল নিয়ে ভদ্রলোকের কাছে পৌঁছোলাম। পরিচিত হলাম ভাস্কর্যশিল্পী চিত্ত দে মহাশয়ের সঙ্গে।

sculptor cjitta dey
শিল্পী চিত্ত দে।

বিগত ৩০ বছর ধরে শিল্পী এই পাহাড়ে ‘ইন-সিটু রক স্কাল্পচার’-এর কাজ করছেন। সাধারণত ভাস্কর্যশিল্পীরা বাছাই করা পাথর তুলে স্টুডিওতে নিয়ে এসে সেই পাথর কেটে মেলে ধরেন নিজের শিল্পকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে পাথরটিকে যথাস্থানে রেখেই তাতে কিছু খোদাই করা হয়, ঠিক যেমনটা আমরা অজন্তায় দেখতে পাই। ১৯৯১ সালে কলকাতার অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এর একটি প্রদর্শনীতে চিত্ত দে-র তৈরি ধাতব পাতের উপর খোদাই করা ২২ ফুটের ডানা মেলা একটি পাখির মূর্তি ঢুকতে বাধা পায়। বাধ্য হয়ে শিল্পী চিত্ত দে ডানাগুলি ক্লিপ দিয়ে পাখিটিকে ছোটো করে ঢোকানোর ব্যবস্থা করেন। তখন অনেকেই বলেছিলেন যে পাখিটি আরও ছোটো করা উচিত ছিল। কিন্তু শিল্পী তার প্রতিবাদে জানান, তিনি তাঁর কল্পনাকে বাস্তবে রূপান্তরিত করেছেন মাত্র। এই শহরের আর্ট গ্যালারিতে সেই কল্পনাকে জায়গা দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকলে তিনি অন্য জায়গা খুঁজে নেবেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি বাংলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা, মহারাষ্ট্রের পশ্চিমঘাট পর্বতের বিভিন্ন স্থানে, বিহার ও ওড়িশার নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান ও কোন পাথরে তিনি তাঁর শিল্পকে ফুটিয়ে তুলতে পারবেন সেটা বোঝার জন্য ওই সব অঞ্চল থেকে পাথরের কিছু নমুনা সংগ্রহ করে জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়াতে পরীক্ষার জন্য পাঠান।

sculpturing going on
চলছে খোদাইয়ের কাজ।

অবশেষে ১৯৯৬ সালে পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডিতে কাজ করার অনুমতি পেলেও ১৯৯৭ সালে মাত্র দু’ লক্ষ টাকার সরকারি আর্থিক অনুদানে কাজ শুরু করেন। সরকারি অনুদানের সঙ্গে তাঁকে অনুরোধ করা হয় কিছু শহুরে ভাস্কর্যশিল্পীকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার জন্য। শিল্পী চিত্ত দে তাতে রাজি না হয়ে স্থানীয় আদিবাসী লোকেদের সঙ্গে কাজ করার উপর জোর দেন। প্রথম চার বছর ধরে ৪০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করলেও অবশেষে ২৪ জনকে নিয়ে দলবদ্ধ ভাবে কাজ শুরু করেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের উপর থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় এনামেল রং ব্যবহার করে ছবিগুলো আঁকেন। রং-এর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে খোদাইয়ের গভীরতার সংকেত। ছেনি-হাতুড়ি সম্বল করে খোদাইয়ের কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে ৬৫টি ডানামেলা পাখির ভাস্কর্য খোদাই করেন। যার সব চেয়ে ছোটো ডানার দৈর্ঘ্য ৫৫ ফুট আর সব চেয়ে বড়ো ডানার দৈর্ঘ্য ১২০ ফুট। প্রথমে পাহাড়টির নাম ‘মুরা বুরু’(উচ্চতা ৮০০ ফুট) থাকলেও ধীরে ধীরে পাহাড়টি ‘পাখি পাহাড়’ নামে পরিচিতি পায়। যদিও ওঁর লক্ষ্য ১০০টি পাখির প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলা।

miniature bird
পাখির মিনিয়েচার।

প্রশ্ন করলাম – ‘পাখি কেন?’ উত্তরে তিনি জানালেন, তাঁর আদি বাড়ি টাকি। একদিন সন্ধ্যাবেলায় তিনি একশোর বেশি পাখিকে একসঙ্গে একই ছন্দে উড়ে যেতে দেখেন। একই তালে ও ছন্দে উড়ন্ত দলবদ্ধ পাখিরা ওঁকে বিশেষ ভাবে উদ্বুদ্ধ করে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পী আরও সরকারি অনুদান পেয়ে কাজটি এগিয়ে নিয়ে যান। হাতে পান আধুনিক কিছু যন্ত্রপাতি, ড্রিল মেশিন, সুরক্ষার জন্য হেলমেট। এই পাহাড়ে বছরের তিন–চার মাস কাজ করা সম্ভব হয়। তীব্র গরমে ও বর্ষায় তিনি কাজ বন্ধ রাখেন। সে সময় তিনি বাংলা ও আশেপাশের রাজ্যের জেলকয়েদিদের প্রশিক্ষণ দেন। এখনও পর্যন্ত তিনি ২০০-এর বেশি জেলকয়েদিকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এ ছাড়াও ২০১৫ সালে পাখিপাহাড়ের অনতিদূরে ‘আয়না’ নামক একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলেন। সেখানে বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজন করেন। এই ভাবে তিনি এ কাজে আদিবাসীদেরও প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।

বর্তমানে উনি পাথরের উপর কখনও হরিণের পরিবার, ফুল, সুনামির হাত থেকে রক্ষা পেতে তীরে উঠে আসা কচ্ছপের দল ইত্যাদি ফুটিয়ে তুলছেন। এ ছাড়াও ‘নৃত্যরত ময়ূরের’ ছবি শেষ করেছেন। জানলাম, খোদাইয়ের কাজ পরের দিন থেকে শুরু হবে। আমরা যেখানে প্রকৃতিকে ধবংস করার কাজে মাতি সেখানে এক শিল্পী ছেনি-হাতুড়ির সাহায্যে প্রকৃতি রক্ষায় ব্রতী। সপ্তাহান্তে অবশ্যই ঘুরে আসুন প্রকৃতির পাথুরে ক্যানভাসে গড়ে ওঠা এই সুন্দর ‘পাখি পাহাড়ে’।

pakhipahar
পাখিপাহাড়।
কী ভাবে যাবেন

সাঁতরাগাছি থেকে রূপসী বাংলা/হাওড়া থেকে লালমাটি এক্সপ্রেস, রাঁচি ইন্টার সিটি বা চক্রধরপুর এক্সপ্রেস ধরে চলে যান পুরুলিয়া স্টেশনে, সেখান থেকে একদিনের জন্য গাড়ি ভাড়া করে ঘুরে আসুন পাখি পাহাড়।

কোথায় থাকবেন

পুরুলিয়ায় থাকার অনেক বেসরকারি হোটেল আছে। উল্লেখযোগ্য হোটেল আকাশ সরোবর (০৩২৫২-২২৪৪৮৮/২২৩৩৭৭/২২৩৩৮৫, ওয়েবসাইট www.akashsarovar.com), পুষ্পক হোটেল (০৩২৫২-২২২০৮০), হোটেল পুরুলিয়া ইন (০৯৭৩৫৪৯৫৭৫৪, ওয়েবসাইট https://hotelpuruliainn.com)।

0 Comments
Share
a-visit-to-burdwan-town
জাহির রায়হান

সে এক সময় ছিল বটে! বেড়াতে যাওয়া ঠিক হলে উৎসব এবং উদ্বেগ দু’টোই একসঙ্গে শুরু হত, বিশেষ করে উদ্বেগ। ভোরে উঠতে না পারার উদ্বেগ। অনেক রাত পর্যন্ত ব্যাগ গুছিয়ে, ভোর থাকতে থাকতে ওঠাটাও ছিল কষ্টকর, বিশেষ করে শীতের সময়। কিন্তু সে সময় মামাবাড়ির সামনের রাস্তা দিয়েই যেত বাস, হাত দেখালেই দাঁড়িয়ে যেত। আবছা আবছা মনে পড়ে, আমরা ছোটোরা হুটোপুটি করে উঠে পড়তাম দিনের প্রথম বাসে। নামতাম সালার ষ্টেশনে, সেখান থেকে কু ঝিক্ ঝিক্ চেপে অজয় নদী পেরিয়ে ট্রেন পৌঁছোত ধাত্রীগ্রাম। সেখানে আবার বাস। বাগনাপাড়ায় নামতে পারলেই শান্তি, বাশারমামা হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে থাকতেন, সঙ্গে গরুগাড়ি আর গাড়োয়ান। বাশারমামা বড়োমামার শ্যালক। আমরা যাচ্ছি বড়োমামার শ্বশুরবাড়ি, ডাঙ্গাপাড়া।

আরও পড়ুন: উইকএন্ডে গন্তব্য হোক বর্ধমান, প্রস্তুতি নিচ্ছে জেলা প্রশাসন

প্রায়ই যেতাম তখন, ছুটি পড়লেই ভোকাট্টা আর-কি! না, বিশেষ কিছু দেখার ছিল না সেখানে, তবুও যেতাম, যেতাম নানা-নানি, মামা-মামির আন্তরিকতার টানে। বড়ো, খোলামেলা বাড়ি, গৃহস্থ পরিবার। বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে কামারশালা, তার পাশে বড়ো খামার। পুকুরে ঝাঁপ, কামরাঙা ও জলপাইয়ের ডালে ডালে লুকোচুরি। ঢিল মেরে পাড়া কাঁচা আমের গন্ধ সোঁকা। অদূরে ছিল একটি সাঁওতাল পাড়া। সেখানে যাওয়া আমাদের নিষেধ ছিল অবশ্য। বাশারমামা যে ঘরে থাকতেন, বেশ সাজানো গোছানো। বড়ো একটা রেডিও ছিল বোধহয়। আরও কত কী যে ছিল আমার আকর্ষণের, তার ইয়াত্তা নেই। তেজপাতা গাছ ছিল। ছিল তালের শুকনো আঁটি কেটে মিষ্টি শাঁস খাওয়ার লোভ। একটা বড়ো বাঁশে প্রচুর কড়ি লাগানো ছিল। পাশের বড়োলোক বাড়ির পেয়ারাগুলোও ছিল বড়োসড়ো আর মিষ্টি। তাদের নিজেদের ব্যবহারের জন্য আবার গোবর গ্যাসের ব্যবস্থাও ছিল। রাস্তার এক পাশে তাদের বাড়ি আর অন্য পাশেই ছিল সেই গোবরের কাণ্ডকারখানা। একটা বড়ো চেম্বারে গোবর জমা করে, উৎপন্ন গ্যাস পাইপ করে চলে যেত বাড়িতে। একটা ইঁদারাও ছিল বোধহয়।

mihidana of burdwan
বর্ধমানের মিহিদানা।

বহু বার গেছি, এত বার গেছি যে ডাঙ্গাপাড়া’র লোক চিনে গিয়েছিল যে আমরা গাঁয়ের জামাই মুকুলের ভাগনা। ওই রকম একবার যেতে যেতেই জেনেছিলাম যে কলারও বীজ হয়, সিঙ্গাপুরি কলা। হলুদ কলার কালো কালো বীজ যা খেতে হয় না, খেলেই পেটে কলাগাছ হয়ে যাবে — বড়ো মামা বলেছিল, বিশ্বাসও করেছিলাম অবলীলায়। তাই খুব সাবধানে ভয়ে ভয়ে খেতাম সেই কলা। বাগনাপাড়াতেই দেখেছিলাম প্রথম তাকে, যাকে দেখলেই বর্ধমানের কথা মনে পড়ে বা বর্ধমানের কথা মনে এলেই যার কথা মনে আসে, মিহিদানা। বড়ো কাঁসার থালায় পিরামিড গড়েছে মিহিদানা, হলুদ ও রসালো। কিছু মাছি তারই ওপর পাক খাচ্ছে। বড়ো হয়ে বুঝেছি, ওগুলো আসলে মাছি নয়, ওরা মনমাছি। আমরা যারা মিহিদানা দেখি দোকানে, তাদের মনটাই মনমাছি হয়ে পাক খায় মিহিদানায়।

আরও পড়ুন: কৃত্তিবাস ও গোঁসাইবাড়ির শান্তিপুর : প্রথম পর্ব

আজ যখন বড়ো হয়ে গেলাম, সে দিনের সেই সোনাঝরা দিনগুলি মনে দোলা দেয় হঠাৎ হঠাৎ। কেমন আছে বাশারমামা? কামারশালটা কি এখন ডিজিটাল হয়ে গেছে? সাঁওতাল পাড়াটাও কি রয়েছে ওখানে? ছোটোবেলায় বড়োদের কথা শুনে ওদের দেখতে যেতে পারিনি, এখন তো আমি বড়ো হয়েছি, এখন কি একবার যাওয়া যাবে ওদের ঘরকন্না দেখতে? ছোটোবেলার ধুলোমাটিতে পা ছোঁয়ানোর সুযোগ কি আর দেবে আমাদের জীবন নামক যাপন, কি জানি!

আরও পড়ুন: কৃত্তিবাস ও গোঁসাইবাড়ির শান্তিপুর : শেষ পর্ব

ভূগোলে পড়ে জানলাম বঙ্গের শস্যগোলা বর্ধমান জেলা। ঘটনাচক্রে সেই জেলাতেই হল আমারও শ্বশুরঘর। এখন বুঝি আমার পায়ে সরষে নেই, আছে জলবিছুটি আর মনে রয়েছে গোবরে পোকা। যা পেয়েছি ছোটোবেলার ওই কারণে অকারণে মামাবাড়ি যাওয়ারই উপহারস্বরূপ। তাই পায়ের চুলকানি আর মনের কুড়কুড়ানি চলতেই থাকে হরদম। এক সপ্তাহ, দশ দিনেই একঘেয়েমি পেয়ে বসে নিরন্তর। হঠাৎ হঠাৎ বেঘর হওয়ার সাধ জাগে। কিছু না পেলে তাই, আনখা কোনো শহরে চলে যাই, চায়ের দোকানে, স্টেশনে, বাসস্ট্যান্ডে বসে থাকি খামোখা। লোক দেখি। কখনও বা সাইকেল নিয়ে মেঠো পথ ধরেই অনেকটা চলে যাই উদ্দেশ্যহীন ভাবে। চাষিরা মাঠে কাজ করে, হাই টেনশন বিদ্যুৎ লাইনের পটপট্ আওয়াজ শোনা যায়। নাম-না-জানা নানা ঘাসফুল ফুটে থাকে। কোথাও বা শ্যালো পাম্প চলে যান্ত্রিক খেয়ালে। ঘণ্টা দুই তিনেক এ-দিক সে-দিক কাটিয়ে বাড়ি ফিরি, খাওয়ার সময় পার হয়ে গেছে বহুক্ষণ। কেউ জানতে চায় না কোথায় ছিলাম, বারণও করে না কোনো কিছুতে। বুঝি আমি বড়ো হয়ে গেছি, যত বুঝি ততই মনটা আকুলিবিকুলি করে ছোটো হওয়ার জন্য। সেই সময়টার জন্য কান্না পায়, যখন আমরা প্রায়শই মামাবাড়ি, নানাবাড়ি, ফুপুবাড়ি চলে যেতাম নানা অছিলায়। আশ্চর্য, তখন কখনোই আমাদের সময়ের অভাব হত না!

জানি পাঠক আমায় গাল পাড়ছেন, বর্ধমানের গল্প শোনাতে বসে, শোনাচ্ছি মন খারাপের পাঁচালি। কিন্তু না আর নয়, এই নিন কার্জন গেট। শহরের প্রায় কেন্দ্রস্থলে এই ‘বিজয় তোরণ’টি ১৯০৩ সালে বর্ধমানরাজ বিজয়চাঁদ মহতাবের আদেশক্রমে নির্মিত হয় বোম্বে অধুনা মুম্বইয়ের ‘গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া’র আদলে। ‘স্টার অফ ইন্ডিয়া’ নামে পূর্বপরিচিত এই তোরণটি ভাইসরয় লর্ড কার্জনের বর্ধমান আগমনের হেতু হিসেবে ভাইসরয়কে সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়। বর্ধমান পৌঁছে ঘাড় উঁচু করে দিব্যি দেখে নিতে পারেন। পাশেই দেখবেন রামপ্রসাদের লস্যি, এক গ্লাস খেয়ে বাকিদেরও খাওয়ান। দু’টিই খুব বিখ্যাত, এখন রামপ্রসাদের লস্যির কারণে কার্জন গেট না কার্জন গেটের কারণে রামপ্রসাদের লস্যি বিখ্যাত, তা বিচারের ভার পর্যটকের।

golapbag, burdwan
গোলাপবাগ, বর্ধমান।

গেট থেকেই বি সি রোড শুরু। দু’পাশে হরেক মালের পসরা, দোকানদার, খরিদ্দার সকলের ধাক্কা খেতে খেতেই এক সময় পৌঁছে যেতে পারেন গোলাপবাগ; রাজবাটি, এক সময় বর্ধমান রাজাদের রাজবাড়ি, এখন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়। তার আগে ডান দিকের দোতলাগুলি খেয়াল করতে থাকবেন অবশ্যই। ‘উত্তরায়ণ’ চোখে পড়লে দাঁড়িয়ে যান। খাওয়া-দাওয়া করুন এখানেই, তবে মনে রাখুন রান্নাবান্না সম্পূর্ণ না হওয়া অবধি ওদের সদর দরজা খোলে না। এবং নিশ্চিত থাকুন ওই দামে ওই মানের খাবার আপনি কলকাতাতে পাবেন না কখনোই। পাবেন না শক্তিগড়ের ল্যাংচার স্বাদও। দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে এলে যখনই বাতাসে ল্যাংচার সুবাস পাবেন, জানবেন বর্ধমান আগতপ্রায়। ওই ল্যাংচার কথা ভাবতে ভাবতেই শক্তিগড়, তার পরই শহর বর্ধমান।I

peer berham, burdwan
পীর বেহরাম, বর্ধমান।

রাজবাটির কাছাকাছিই পেয়ে যাবেন বর্ধমানের শেষ আফগান জাগিরদার শের আফগানকে, যিনি মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গিরের কুনজর থেকে নিজ স্ত্রী মেহেরুন্নিসাকে বাঁচাতে প্রবল পরাক্রমী মোঘলদের সঙ্গে দুশমনিতে জড়ান এবং সম্রাটের পাঠানো কুতুবুদ্দিনের সঙ্গে যুদ্ধে নামেন। সেই যুদ্ধস্থল ছিল আজকের বর্ধমান রেল স্টেশনের কাছে। ১৬১০-এর ওই যুদ্ধে দু’জনেরই মৃত্যু হয়। দু’জনেই শুয়ে রয়েছেন এখন পীর বেহরামে। ও দিকে মেহেরুন্নিসা দিল্লি গিয়ে সম্রাট জাহাঙ্গিরের ঘরণী হন ১৬১১ সালে, নতুন নামে হন পরিচিত, নূর-এ-জাহান বা জগতের আলো, আর শের আফগান শুয়ে থাকেন কবরের অন্ধকারে!

108 shiva temple, burdwan
নবাবহাটে ১০৮ শিবমন্দির।

দু’বছরের রায়ার কৌতূহল অসীম। যা দেখে তা-ই জানতে চায়, এটা কী, ওটা কী। যতটা সম্ভব তার কৌতূহলের নিরসন করি আমরা সকলেই। এ পর্যন্ত তা-ও সব ঠিক ছিল। গোল বাঁধল নবাবহাটের ১০৮ শিবমন্দিরে গিয়ে। শিবলিঙ্গ দেখিয়ে রায়া যথারীতি জানতে চাইল, পাপা এটা কী? শিবঠাকুরের মন্দির বলেও রেহাই নেই, পরেরটা দেখেও তার একই প্রশ্ন। এ দিকে আমি নিজেই জানি না মন্দিরের সংখ্যা ১০৮ কেন? একই শিব, একই লিঙ্গ, তবে? ১০৯ বা ১০৭ নয় কেন? কালনাতেও একই সংখ্যার আরও একটা শিবমন্দির রয়েছে। তা হলে ১০৮-এর কী মাহাত্ম্য? মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকল এই রহস্যের কৌতূহল। শ্যালিকাকে জিজ্ঞেস করলাম, সে জানে না। ল্যারি পেজ, ‘গুগল্’ ব্যবসার আইডিয়াটা আমার সহধর্মিনীর কাছেই পেয়েছিল, তাই তাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস করলাম না। প্রতি শিবরাত্রিতেই এখানে সাত দিন ধরে আরাধনা চলে প্রতিষ্ঠা কালহতেই। রানি বিষ্ণুকুমারী এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন ১৭৮৮ সালে। ১০৮-এর ঘনঘটায় তাঁকে স্মরণ করে হলাম আত্মমগ্ন, থুড়ি শিবমগ্ন!

burdwan stationকী ভাবে যাবেন

কলকাতা থেকে প্রচুর বাস বর্ধমান ও বর্ধমানের ওপর দিয়ে চলাচল করে। ট্রেনও রয়েছে অনেক লোকাল ও এক্সপ্রেস মিলে। তা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব জায়গার সঙ্গে ট্রেনে বা বাসে বর্ধমানের সঙ্গে যোগাযোগ। সড়কপথে কলকাতা থেকে বর্ধমানের দূরত্ব ১০২ কিমি, সোজা চলে আসুন দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে।

থাকা-খাওয়া

বর্ধমানে খাওয়ার আসল জায়গা উত্তরায়ণ। এ ছাড়াও নানা বাজেটের খাওয়ার জায়গা রয়েছে। থাকতে পারেন পৌরসভা পরিচালিত অতিথি নিবাসে, ফোন- ০৩৪২-২৬৬ ৪১২১

এ ছাড়াও শহরজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নানান হোটেল ও গেস্ট হাউস ।

 

0 Comments
Share
let-us-visit-to-jamgram-rajbari
writwik das
ঋত্বিক দাস

ভ্রমণের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই৷ পাহাড়, নদী, স্থাপত্য – এ সবের টানেই হাজার জীবনযুদ্ধের মাঝে পাওয়া ক্ষণিকের ছুটিগুলোতে এ-দিক সে-দিক বেরিয়ে পড়ার মধ্যে এক অনাবিল আনন্দ৷

এমনই আনন্দ পাওয়ার লোভে এক রবিবারের সকালে আমরা তিন বন্ধু চেপে বসলাম বর্ধমান মেন লাইনের লোকাল ট্রেনে৷ গন্তব্য ছিল পান্ডুয়া স্টেশন নেমে সেখান থেকে জামগ্রাম রাজবাড়ি৷ জামগ্রাম রাজবাড়ি আদপে নন্দী বংশের জমিদারবাড়ি৷

আরও পড়ুন: বনজ্যোৎস্নায় সবুজ অন্ধকারে : বেথুয়াডহরী

পান্ডুয়া স্টেশনের টিকিট কাউন্টার লাগোয়া অটোস্ট্যান্ড থেকে জামগ্রাম যাওয়ার অটোতে আমরা তিন বন্ধু চড়ে বসলাম৷ রবিবারের ভিড় বাজার ছাড়িয়ে অটো গ্রাম্যপথ ধরল৷ আহাঃ কী শোভা সেই পথের৷ পথের দু’ধারে শুধুই দিগন্তবিস্তৃত খেত, সদ্য লাগানো ধানের চারা সবুজ ভেলভেটের মতো দিগন্তভূমি জুড়ে রয়েছে৷ তার মাঝ দিয়ে কালো পিচের রাস্তা, সে কী অপরূপ দৃশ্য! সেই নয়নমুগ্ধকর দৃশ্য পেরিয়ে আমরা পৌঁছোলাম নন্দী জমিদারবাড়ির সামনে৷ প্রথমেই চোখে পড়ল সুবিশাল কৃষ্ণ মন্দির৷ তার ডানপাশেই রাজবাড়ি প্রবেশের দরজা৷

krishna temple, nandibari
কৃষ্ণ মন্দির।

বাইরে থেকে রাজবাড়ির বিশালত্ব সহজে অনুমান করা যায় না৷ প্রায় ১৩ বিঘা জমির ওপর দাঁড়িয়ে জামগ্রামের নন্দীবাড়ি৷ রাজবাড়ির সামনে পরিচয় হল নন্দী বংশের প্রবীণ সদস্য সতিপতী নন্দী মহাশয়ের সঙ্গে৷ বর্তমানে ৮১ বছর পার করেছেন৷ তাঁর মুখ থেকেই জানা গেল, অতীতে ব্রিটিশ শাসনকালে অধুনা হালিশহরের কেওটা গ্রামে নন্দীবংশের আদিবাস ছিল৷ ব্রিটিশদের অত্যাচারে তাঁরা কেওটাগ্রাম ছেড়ে চলে এসে পান্ডুয়ার জামগ্রামে বসতি গড়েন৷পরে তাঁদেরই একটা অংশ অধুনা কালনা মহকুমার বৈদ্যপুর অঞ্চলে বসতি গড়েন৷সুপুরি, বিভিন্ন প্রকার মশলা ও নুনের ব্যবসা, এই ছিল নন্দীদের প্রধান জীবিকা৷ বর্ধমানের কালনা, কলকাতার বড়বাজার অঞ্চলের পোস্তা, বেলেঘাটার খালপোল অঞ্চলে নন্দীদের ব্যবসার গদি ছিল৷

শোনা যায় এক বার বড়লার্ট ওয়ারেন হেস্টিংসের অনেক টাকার দরকার হয়৷ তখন বড়লার্ট তৎকালীন নন্দীদের কাছে অনেক টাকা দাবি করেন৷ আবার সেই সময় বাংলার রানি ভবানীর সঙ্গে বৃটিশদের অশান্তি লাগে৷ এর শোধ নিতে বড়লার্ট হেস্টিংস মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রানি ভবাণীর তিনটি মহল (কালনা, বৈদ্যপুর ও জামগ্রাম) নন্দীদের দিতে চান। নন্দীরা প্রথমে অসম্মত হলেও পরে ব্রিটিশদের শর্ত মানতে বাধ্য হন৷ তখনকার দিনে ব্রিটিশদের কোনো অনুষ্ঠান হলে বাংলার মধ্যে একমাত্র বর্ধমান রাজা ও নন্দীরা নিমন্ত্রিত হতেন ৷

a part of jamgram rajbari
রাজবাড়ির একাংশ।

জামগ্রামের নন্দীপাড়ার গোটা অঞ্চলটিতেই নন্দীদের বাস৷ কোনো অচেনা মানুষ একা একা রাজবাড়িতে ঢুকে পড়লে আর দরজা চিনে বাইরে বেরোতে পারবে না যতক্ষণ না তাঁকে বাড়ির কেউ এসে বেরোনোর পথ দেখিয়ে দিচ্ছেন৷ বাড়ির ভেতর বিভিন্ন মহল৷ এক একটা মহলে অতীত থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের আসবাবপত্র, বাসন, মূল্যবান কাগজপত্র সংরক্ষিত৷

thakurdalan, rajbari
ঠাকুরদালান।

জামগ্রাম নন্দীবাড়ি দুর্গাপুজো দেখার মতো। আজও দুর্গাপুজোর সব রকম ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন এই নন্দী পরিবার। দুর্গাপুজো শুরু হয় রথের সময় কাঠামোপুজো করে, খড়ের ওপর মাটি লেপে৷ পুজোর দিনগুলোতে বাইরে থেকে সব আত্মীয়স্বজন এসে মিলিত হন৷ তার মধ্যে প্রায় সবাই নন্দী৷ এই সময়ে বাইরের কোনো মানুষের সঙ্গে নন্দী বংশের ছেলেমেয়েদের বন্ধুত্ব করার দরকার হয় না৷ জ্ঞাতি ভাইবোনেরাই সবাই বন্ধুর মতো মজা করে গোটা অঞ্চল মাতিয়ে রাখে৷ বাংলা তথা ভারতের আর কোথাও এত বড়ো যৌথ পরিবার ক’টা আছে হাত গুনে বলা যায়৷ বিদেশিদের চোখেও তাই জামগ্রাম রাজবাড়ির আলাদা কদর রয়েছে৷

artworks on the piller
পিলারের কারুকাজ।

পুজোর চার দিন এই গ্রামে কোনো মাইক বাজে না৷ তখন শুধুই ঢাকের বোল শোনা যায়৷ সব মিলিয়ে আজও নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে অক্ষুন্ন রেখেছে এই পরিবার৷

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে বর্ধমান মেন লাইনের লোকালে চড়ে পান্ডুয়া স্টেশনে নেমে, সেখান থেকে জামগ্রাম যাওয়ার অটোতে উঠে রাজবাড়ির সামনে নামতে হবে৷

কলকাতা থেকে গাড়ি নিয়েও যাওয়া যায়। দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সিঙ্গুর গিয়ে ডান দিক ঘুরে দিল্লি রোড- জিটি রোড ধরে পান্ডুয়া পৌঁছে জামগ্রাম চলুন। কিংবা দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে গুড়াপ গিয়ে ডান দিক ঘুরে পান্ডুয়া পৌঁছে জামগ্রাম চলুন।

 

0 Comments
Share
12