Browsing Category:হেরিটেজ

a-few-places-in-west-bengal-to-spend-a-few-days-in-royal-style

ভ্রমণ অনলাইন ডেস্ক: মাঝেমধ্যে মনে হয় না দু’-তিনটে দিন কোথাও একটু বিলাসিতায় কাটিয়ে আসি? এই পশ্চিমবঙ্গেই রয়েছে এমন কিছু জায়গা। তারই সন্ধান দিল ভ্রমণ অনলাইন।

ঝাড়গ্রাম রাজ প্যালেস

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শৈলীর মেলবন্ধনে কী সুন্দর স্থাপত্যের সৃষ্টি হতে পারে তা ঝাড়গ্রাম রাজ প্যালেস না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। মল্লদেব রাজাদের তৈরি এই রাজবাড়ির কিছুটা হেরিটেজ হোটেল। বেশির ভাগটায় রাজপরিবারের লোকজন থাকেন।   

থাকা

এখানে থাকার নানা ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে – রয়্যাল স্যুট, রয়্যাল গেস্ট হাউস, প্রিমিয়াম ডিলাক্স, একজিকিউটিভ স্যুট, ফ্যামিলি ডিলাক্স, ক্ল্যাসিক ডিলাক্স। /

কী দেখবেন

১। সাবিত্রী মাতা মন্দির – রাজবাড়ির অদূরেই, ঝাড়গ্রাম মল্ল রাজাদের আরাধ্যা দেবী।

২। ডিয়ার পার্ক – ৩ কিমি।

৪। ইকো ট্যুরিজম সেন্টার ও ট্রাইবাল মিউজিয়াম – ২ কিমি।

৫। ভেষজ উদ্যান – ৯ কিমি দূরে গড় শালবনিতে।

৩। চিলকিগড় ও কনকদুর্গা মন্দির – ডুলুং নদীর ধারে, ১৫ কিমি।

৬। গুড়গুড়িপল ইকো পার্ক – ২৭ কিমি।

৬। কোদোপল অ্যাগ্রো ট্যুরিজম – ৪৫ কিম দূরে সুবর্ণরেখা ও ডুলুং নদীর সঙ্গমে ২০০ একর জায়গা জুড়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অ্যাগ্রো ট্যুরিজম প্রকল্প।

৭। রামেশ্বর মন্দির – ৪২ কিমি দূরে, গোপীবল্লভপুরের কাছে।

৮। শ্রীরাধাগোবিন্দ মন্দির অথবা গুপ্ত বৃন্দাবন – ১৫ শতকের মন্দির, ৩৫ কিমি দূরে গোপীবল্লভপুরে।

৯। বেলপাহাড়ি – ৩৭ কিমি দূরে আদিবাসী গ্রাম, আরও ৯ কিমি গিয়ে পাহাড়ে ঘেরা ঘাঘরা ঝরনা, কাছেই তারাফেনি ব্যারাজ।

১০। কাঁকড়াঝোড় ফরেস্ট ও ময়ূরঝরনা এলিফ্যান্ট রিজার্ভ – ৬২ কিমি দূরে কাঁকড়াঝোড় হয়ে আরও ৮ কিমি।

১১। গোপগড় হেরিটেজ অ্যান্ড নেচার ইকো-ট্যুরিজম সেন্টার – ৩৬ কিমি।  

প্যাকেজ ট্যুর

হোটেলের উদ্যোগেই ৪ রাত্রি/৫ দিনের প্যাকেজ ট্যুরের ব্যবস্থা আছে। এই প্যাকেজ ট্যুরগুলিতে ঝাড়গ্রামের পাশাপাশি মুকুটমণিপুর, সিমলিপাল বা টাটানগর দেখে নেওয়া যায়।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে ঝাড়গ্রাম ট্রেনে আড়াই থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টার ভ্রমণ। সকাল থেকেই নানা ট্রেন। বিশদে জানতে দেখে নিন erail.in । সড়কপথে কলকাতা থেকে জাতীয় সড়ক ১৬ ও ৪৯ (পুরোনো নম্বর ৬, মুম্বই রোড) ধরে খড়গপুর-লোধাশুলি হয়ে ঝাড়গ্রাম ১৭৩ কিমি। বাসে বা গাড়িতে যেতে পারেন। বাসের সময়ের জন্য দেখুন http://sbstc.co.in/

যোগাযোগ

০৩২২১ ২৫৫৪০১, ৬২৯৪০ ২৪৩১৯, ৯৬৩৫২ ৬৯৪১৬; ই মেল [email protected] ওয়েবসাইট http://www.jhargrampalace.com/    

ইটাচুনা রাজবাড়ি

ইটাচুনা রাজবাড়ির আরেক নাম ‘বর্গি ডাঙা’। বাংলার নবাবের দেয় এক চতুর্থাংশ কর (চৌথ) আদায়ের জন্য মরাঠারা বাংলা সুবা আক্রমণ করেছিল। সেই মরাঠা যোদ্ধাদের বলা হত ‘বর্গি’। যুদ্ধবিগ্রহ থেমে যাওয়ার পর ‘বর্গি’দের একটা বড়ো অংশ এখানেই থেকে গেয়েছিল এবং ব্যবসাপাতি করে প্রচুর সম্পদ সৃষ্টি করেছিল। এই মরাঠা ‘বর্গি’দের একাংশ ছিল ‘কুন্দন’ উপাধিধারী। এঁরাও এই বঙ্গেই থেকে যান। এই ‘কুন্দন’রা কালক্রমে ‘কুণ্ডু’ হন। এ রকম এক ‘কুণ্ডু’ হলেন সাফল্য নারায়ণ কুণ্ডু। এঁরই পূর্বসূরিরা ১৭৬৬ সালে ইটাচুনা রাজবাড়ি তৈরি করেন।

কলকাতা থেকে ঘণ্টা দুয়েকের জার্নি। চলে আসা যায় ইটাচুনায়। সবুজ প্রকৃতির সান্নিধ্য উপভোগ করা, ভিজে মাটির গন্ধ শোঁকা, তারাভরা আকাশ দেখা, হুইসল বাজিয়ে শেষ ট্রেন চলে যাওয়ার সাক্ষী থাকা, ছাদ থেকে ঘুড়ি ওড়ানো, কবাডি খেলা, বাঁশির সুরে ভেসে যাওয়া, স্থানীয় মানুষজনের দৈনন্দিন জীবনের স্বাদ নেওয়া – নিজেদের রোজকার রুটিন থেকে একটু ব্রেক নিতে চলে আসুন ইটাচুনা।   

থাকা ও ভাড়া

হরেক রকমের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে রাজবাড়িতে – ‘এ’ ক্যাটেগরিতে ‘বড়ো বউদি’, ‘ছোটো বউদি’, ‘ঠাকুমা’ আর ‘বড়ো পিসি’; ‘মা’ ক্যাটেগরিতে ‘গিন্নি মা’, ‘বড়ো মা’, ‘মেজো মা’; এ ছাড়া ঘর রয়েছে ‘বিলাস’, ‘মঞ্জরী’, ‘কাকাবাবু’, ‘পিসেমশাই’, ‘ছোটো পিসি’, ‘বড়দি’, ‘জ্যাঠামশাই’ ও ‘বড়দা’ নামে – এক একটি ঘরে ২/৩/৪ জনের থাকার ব্যবস্থা, আছে এসি, নন এসি ব্যবস্থা – ভাড়ার হার ২৭০০ টাকা থেকে ৪৫০০ টাকা, জিএসটি আলাদা। এ ছাড়াও ‘হাট’ (মাটির ঘর) আছে – ‘অপরাজিতা’ ও ‘মাধবীলতা’ (২ জনের ১৫০০ টাকা) এবং ‘কনকলতা’ ও ঝুমকোলতা (২ জনের ২৪০০ টাকা), জিএসটি আলাদা।

সারা দিনের সফরেও আসা যায় ইটাচুনায়। ১৫ থেকে ২০ জনের দল নিয়ে এলে বিশ্রাম করা যায় ‘আনন্দ’ সভাঘরে।

কী দেখবেন

১। মহানাদ ব্রহ্মময়ী কালীবাড়ি – ২০০ বছরের কালীবাড়ি, ৮ কিমি।

২। জটেশ্বর শিব মন্দির – মহানাদ কালীবাড়ি থেকে ২ কিমি।

৩। দেবীপুর লক্ষ্মী জনার্দন মন্দির – ২৪ কিমি দূরে টেরাকোটার মন্দির।

৪। পান্ডুয়া মিনার – ১৩ শতকের ১২৫ ফুট উঁচু মিনার, ৮ কিমি।

৫। বাঁশবেড়িয়া –  হংসেশ্বরী ও অনন্ত বাসুদেব মন্দির, ২০ কিমি।

৬। দেবানন্দপুর – কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের জন্মস্থান, ১৮ কিমি।

৭। ব্যান্ডেল চার্চ – ২২ কিমি।

৮। ইমামবাড়া, চুঁচুড়া – ২৫ কিমি।

৯। চন্দননগর – এক সময়ের ফরাসি কলোনি, ৩০ কিমি।

১০। কালনা – সিদ্ধেশ্বরী কালী, ১০৮ শিব মন্দির, লালজি মন্দির, প্রতাপেশ্বর মন্দির, ২৫ চুড়োর কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির, ৩০ কিমি।

১১। গুপ্তিপাড়া – চার টেরাকোটার চার বৈষ্ণব মন্দির, ২৭ কিমি।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে বর্ধমান মেন লাইনে খন্ন্যান লোকাল ট্রেনে দেড় ঘণ্টার পথ। স্টেশন থেকে টোটো, অটো আর ম্যাজিকে ৭ থেকে ১০ মিনিটের পথ ইটাচুনা রাজবাড়ি। কলকাতা থেকে গাড়িতে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বাঁ দিকে আজাদ হিন্দ ধাবা ও হিন্দুস্থান হোটেল পেরোনোর পর বাঁ দিকের ‘একজিট’ ধরুন। ডান দিকে ঘুরে ব্রিজের তোলা দিয়ে আসুন বসিপুর। এখান থেকে সোজা হালুসাই, ১৯ কিমি। খন্ন্যান রেলস্টেশনের দিকে বাঁ দিক ঘুরুন। হালুসাই থেকে ১০ মিনিটের ড্রাইভে পৌঁছে যান ইটাচুনা রাজবাড়ি। রাস্তার বাঁ দিকে।                        

যোগাযোগ

ফোন ৭০০৩১২১৮১১, ৯৬৭৪৫৩৭৯৪০, ৯৭৪৮৭০০৮২০। ওয়েবসাইট http://www.itachunarajbari.com/

মহেশগঞ্জ এস্টেট, বলাখানা

কৃষ্ণনগর থেকে ১২ কিমি দূরে নবদ্বীপ ঘাট রোডে অবস্থিত এই রাজবাড়ি স্থানীয় জমিদার পালচৌধুরীদের এস্টেট, আদতে অষ্টাদশ শতকের এক নীলকুঠি। কৃষক বিদ্রোহের পর নীলচাষ অলাভজনক হয়ে গেলে নীলকুঠির তখনকার মালিক হেনরি নেসবিট স্যাভি ওই অঞ্চলের ক্ষমতাশালী জমিদার পালচৌধুরীদের কাছে ওই এস্টেট বিক্রি করে দেন।   

থাকা ও ভাড়া

৩টি এসি ঘর, ২টি নন এসি গেস্টরুম। ২ জনের থাকা খরচ ৪০০০ টাকা (সোম থেকে বৃহস্পতি) থেকে ৫০০০ টাকা (শুক্র থেকে রবি)। এসি ব্যবহার করলে প্রতি রাতে ১০০০ টাকা। এই খরচের মধ্যে বেড টি, ব্রেকফাস্ট ও ইভিনিং টি ধরা আছে। লাঞ্চ ও ডিনারের খরচ জনপ্রতি ৪০০ টাকা (নিরামিষ) এবং ৫০০ টাকা (আমিষ)। ১০ বছর পর্যন্ত বয়সি শিশুর থাকার জন্য কোনো খরচ লাগে না। তার বেশি বয়স হলে ১০০০ টাকা অতিরিক্ত। ৫ থেকে ১০ বছর বয়সি শিশুর মিল চার্জ ২৫০ টাকা।

১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত বলাখানা বন্ধ থাকে। বর্ষায় বিশেষ ছাড়ের বন্দোবস্ত আছে।

কী দেখবেন

১। মায়াপুর – ৪ কিমি।

২। বল্লাল ঢিপি – ৪ কিমি।

৩। জগন্নাথ মন্দির – ৪ কিমি।

৪। কৃষ্ণনগর – ১২ কিমি।

৫। শান্তিপুর, ফুলিয়া – ৩০ কিমি।

৬। কালনা – ৩৫ কিমি।

৭। নবদ্বীপ – ১২ কিমি।

কী ভাবে যাবেন

ট্রেনে শিয়ালদা/কলকাতা স্টেশন থেকে কৃষ্ণনগর মোটামুটি আড়াই ঘণ্টার পথ। সেখান থেকে অটো বা গাড়িতে ১২ কিমি দূরে মহেশগঞ্জ। কলকাতা থেকে গাড়িতে তিন ভাবে যাওয়া যায়-

(১) ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে রানাঘাট-ফুলিয়া হয়ে শান্তিপুর বাইপাস ধরুন।  কৃষ্ণনগরের আগে রেলওয়ে ক্রসিং পেরিয়ে বাঁ দিকে নবদ্বীপ ঘাট রোড ধরুন। ৮ কিমি গেলে মহেশগঞ্জ।

(২) দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে হিন্দুস্থান হোটেল, তার পর বাঁ দিক ধরে ডান দিকে ফ্লাইওভারের নীচে দিয়ে বাঁ দিকে ঘুরে বৈঁচির পথে। জিটি রোড পেরিয়ে, রেলওয়ে ক্রসিং পেরিয়ে বাঁ দিকে কালনার পথে। সেখান থেকে ধাত্রীগ্রাম-সমুদ্রগড় ছাড়িয়ে গৌরাঙ্গ সেতু পেরিয়ে মহেশগঞ্জ।

(৩) ডানকুনি মোড়ের আগেই ডান দিকে দিল্লি রোড ধরুন। মগরা রেলওয়ে ক্রসিং-এ ডান দিক ঘুরে ফ্লাইওভারের নীচে দিয়ে এসে বাঁ দিকে হেয়ারপিন বাঁক নিয়ে সোজা কালনা। তার পর সমুদ্রগড় ছাড়িয়ে গৌরাঙ্গ সেতু পেরিয়ে মহেশগঞ্জ।

যোগাযোগ

ফোন ০৩৩২৩৯৯৪৯৯৪, ৯৮৩১৩২৮৪৮৬, ৯৮৩১২৭০৮০৭; ই-মেল [email protected]। ওয়েবসাইট http://www.balakhana.com

বাওয়ালি রাজবাড়ি

কলকাতা শহরের উপকণ্ঠে বাওয়ালির মণ্ডল জমিদারদের এই প্রাসাদ আড়াইশো বছরের পুরোনো।

থাকা

এখানে থাকার হরেক ব্যবস্থা – ক্ল্যাসিক হেরিটেজ, জমিন্দারি জুনিয়র স্যুট, রয়্যাল স্যুটস, ডাকবাংলো।

কোথায় ঘুরবেন

কাছেপিঠে ঘোরার জায়গা অনেক রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অছিপুরে চিনা মন্দির, বজবজে কোমাগাতা মারু স্মারক, বড়ো কাছারি। চলে যেতে পারেন ৩০ কিমি দূরে গঙ্গাতীরে ডায়মন্ড হারবার বা রায়চক কিংবা ২০ কিমি দূরে গঙ্গাতীরে ফলতা।

কী ভাবে যাবেন

কলকাতা থেকে ৩৫ কিমি। ডায়মন্ড হারবার রোডে জোকা থেকে ডান দিকের রাস্তা, বিবিরহাট হয়ে। গাড়িতে যাওয়াই সুবিধা। অন্যথায় বাসে জোকা গিয়ে সেখান থেকে স্থানীয় যানে ১৭ কিমি।

যোগাযোগ

ফোন ৯০৭৩৩ ১২০০০। রয়েছে অনলাইন বুকিং-এর সুবিধা http://www.therajbari.com/

কাশিমবাজার রাজবাড়ি

মুর্শিদাবাদের বহরমপুর থেকে তিন কিমি এগোলেই কাশিমবাজার রোডে পড়বে ‘কাশিমবাজার প্যালেস অব দ্য রয়ে’স তথা কাশিমবাজার রাজবাড়ি। এখানে রাজকীয় আতিথেয়তায় দু’টো দিন কাটিয়ে ঘুরে নিন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের রাজধানী। বিশদ তথ্যের জন্য যোগাযোগ করুন ৯৮৩১০৩১১০৮। ওয়েবসাইট https://cossimbazarpalaceroys.business.site/

0 Comments
Share
a-visit-to-nanur-of-poet-chandidas

writwik das
ঋত্বিক দাস

বাংলা সাহিত্যে একাধিক চণ্ডীদাসের সন্ধান পাওয়া যায়। এই একাধিক চণ্ডীদাস নিয়ে আধুনিক পণ্ডিতরা দ্বিধাবিভক্ত। কেউ কেউ বলেন এক চণ্ডীদাস বৈষ্ণবপদাবলির রচয়িতা। আর অন্য চণ্ডীদাস শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রচয়িতা। এঁদের এক জন বাঁকুড়ার ছাতনার অধিবাসী ছিলেন, আরেক জন বীরভূমের নানুরের। অনেকে আবার বলেন, এই দুই চণ্ডীদাসই এক। বিতর্ক থাক, চণ্ডীদাস সম্পর্কে যে কাহিনি সব চেয়ে বেশি প্রচারিত, সেই কাহিনিই আজ শোনাই, সেই সঙ্গে তাঁর নানুরের কিছু কথা৷

১৩৭০ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন নানোর এবং অধুনা নানুরে চণ্ডীদাসের জন্ম৷ তাঁদের পদবি ছিল ‘বাড়ুজ্জে’ বা ‘বন্দোপাধ্যায়’৷ এই জন্য তাঁকে বড়ু চণ্ডীদাস বলেও ডাকা হয়৷ তাঁর পরিবার খুব দরিদ্র ছিল৷ দারিদ্রের ভারে এক সময় তাঁরা নানুরের ভিটেমাটি ছেড়ে দিয়ে অধুনা বাঁকুড়া জেলার ছাতনা গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন এবং সেখানে পণ্ডিতগিরি করে কিছু অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে দিন অতিবাহিত করতে লাগলেন৷ তাঁর প্রথম স্ত্রীর নাম ছিল পদ্মজা৷ অভাবের জ্বালায় একদিন পদ্মজা তাঁকে ছেড়ে চলে যান কীর্নাহারের বাপের বাড়িতে৷

basulidevi temple
বাসুলীদেবীর মন্দির।

নিঃসঙ্গ অবস্থায় চণ্ডীদাসও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন৷ ঘুরে বেড়িয়ে নিজে কবিতা লিখে সেগুলো বিদ্বজনদের শুনিয়ে বেড়াতে থাকেন৷ সারা দিনে যেটুকু হাতে আসে সেইটুকু দিয়ে রাতেরবেলায় একটি মাটির হাঁড়িতে অন্ন ফুটিয়ে আধাপেটা খেয়ে দিন কাটাতে থাকলেন৷ এ ভাবে ঘুরতে ঘুরতে তিনি একদিন চললেন রাজদরবারের পথে৷ রাজা তখন সভায় বসে মন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনায় ব্যাস্ত৷ তাঁর কানে এল সুন্দর কণ্ঠে ঝুমুর গানের আওয়াজ৷ রাজা আলোচনায় আর মন লাগাতে পারলেন না৷ কোথা দিয়ে আসছে এত সুরেলা কণ্ঠ, এত সুন্দর ঝুমুরগান কেই-বা গাইছে৷ ভাবতে ভাবতে এক ভিখারিকে তাঁর দরবারের দিকে এগিয়ে আসতে দেখলেন৷ রাজদরবার পাহারায় নিয়োজিত সৈন্যরা সেই ভিখারীকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দিলে স্বয়ং রাজা সৈন্যদের থামিয়ে ভিখারি চণ্ডীদাসকে ভেতরে আসার অনুমতি দিলেন এবং সেই সঙ্গে আবদার করলেন, আরও ঝুমুরগান শুনিয়ে তাঁর মন তৃপ্ত করতে হবে৷ এমন অবস্থায় চণ্ডীদাস ঝোলা থেকে তাঁর লেখা পদ্য ও ঝুমুরগানের একখানি সংকলন বার করে বেশ ক’টি গান রাজামশাইকে শোনালেন৷ রাজামশাই যারপরনাই তৃপ্ত চণ্ডীদাসের গানে৷ তাঁর অবস্থার খবর নিয়ে পুরস্কারস্বরূপ রাজা তাঁকে বাসুলীদেবীর মন্দিরের পুরোহিতপদে নিযুক্ত করলেন এবং মন্দিরসংলগ্ন একটি ঘরে থাকার অধিকার দিলেন৷ চণ্ডীদাস জীবনধারণের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণর পদ রচনায় ব্রতী হলেন এবং বাসুলীদেবীর পূজা করতে লাগলেন৷

দেবী বাসুলী বীণারঞ্জিত সরস্বতীদেবী, যদিও তাঁকে দুর্গাদেবী মনে করে শাক্ত রূপে পূজা করা হয়৷ এই দেবীর পূজা করতে করতে চণ্ডীদাস দেবীর ভক্তিপ্রেমে বাঁধা পড়লেন৷ বাসুলীদেবীর উপাসনাই তাঁর জীবনের মুল অঙ্গ হয়ে উঠল৷ দেবীর পূজা করার পাশাপাশি শ্রীকৃষ্ণের ভক্তিরস মাঝেমধ্যে সৃষ্টি করে মুখে আওড়াতে লাগলেন, সঙ্গে সঙ্গে সেই পদগুলি লিখে ফেলতে থাকলেন৷

এমন চলতে চলতে একদিন তাঁর মনে এক দোটানার উদ্ভব হল – যে অঙ্গ দিয়ে শাক্তের উপাসনা করে চলেছেন সেই অঙ্গ দিয়ে কী করে শ্রীকৃষ্ণের পদ রচনা করবেন৷ দিশেহারা তিনি৷ এমন অবস্থায় এক অমাবস্যার রাতে বাসুলীদেবী তাঁকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে পদ রচনার আদেশ দিলেন৷ দেবীর আদেশ পেয়ে চণ্ডীদাস প্রদীপের টিমটিমে আলোয় বসে মহানন্দে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের পদ রচনা করতে লাগলেন৷

teracotta work in nanur temples.
নানুরে মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার কাজ।

এমন ভাবে দিন কাটতে কাটতে চণ্ডীদাসের জীবনে আবার পরিবর্তন এল৷ বাসুলীদেবীর মন্দিরে একদিন আগমণ ঘটল এক পরমা সুন্দরী যুবতীর৷ অপূর্ব মুখশ্রী তাঁর৷ তিনি রজকিনি রামী৷ পিতৃমাতৃহারা রামী মন্দিরে দেবদাসীর কাজ করতে এলেন৷ মন্দিরের কাজ গুছিয়ে করেন রামী৷ ঠাকুরের কাপড় ধোয়া থেকে ঝাঁট দেওয়া, সবেতেই নিখুঁত৷ একদিন ভোগ বিতরণের সময় রামীর সঙ্গে চণ্ডীদাসের মুখোমুখি সাক্ষাৎ ঘটে৷ প্রথম দর্শনেই রামীর রূপে মুগ্ধ হয়ে যান চণ্ডীদাস, তাঁর মনের প্রেমসাগর যেন উত্তাল হয়ে ওঠে৷

স্ত্রী পদ্মজাকে হারিয়ে একাকী জীবন৷ পদ্মজাকে সে ভাবে সুখ দিতে পারেননি৷ অনেক দিন নারীর শরীরসুখ থেকেও বঞ্চিত৷ এমন অবস্থায় রামীর মুখ চণ্ডীদাসকে মাতোয়ারা করে তোলে৷ আহা্ কী সৌন্দর্য্য রামীর! হিরের দ্যুতির মতো মুখের ঔজ্জ্বল্য৷ বিদ্যুতের ঝলকানির মতো বাহুযুগল, তন্বী শরীর – সব মিলিয়ে চণ্ডীদাসের দু’ নয়নে শুধুই রামীর উপস্থিতি৷ কখনও বা বাসুলীদেবীর সঙ্গে রামীকে গুলিয়ে ফেলছেন আবার কখনও শ্রীরাধিকার সঙ্গে৷ “ইস্ একবার এসে যদি রামী তাঁর কাছে বসে বুকে তাঁর সুন্দর হাতখানি ছোঁয়াতেন”, “যদি কখনও রামীর শরীর স্পর্শ করার মতো সুখ কপালে জুটত”৷ রাতের একাকী বিছানায় শুধুই এমন ভাবনা তাঁর৷

“ব্রহ্মাণ্ড ব্যাপিয়া আছয়ে যে জন, কেহ না জানয়ে তারে।
প্রেমের আরতি যে জন জানয়ে সেই সে চিনিতে পারে।।”

basulidevi
বাসুলীদেবী।

এ ভাবে এক দিন উঠোন নিকোনোর সময় সুপুরুষ রামীর পথ আগলে দাঁড়ান চণ্ডীদাস এবং রামীকে প্রেম নিবেদন করেন৷ রামী কিঞ্চিৎ লজ্জিত। চণ্ডীদাস তাঁকে আলিঙ্গন করতে অগ্রসর হলেন৷ রামী তখন চণ্ডীদাসকে মনেমনে গ্রহণ করে প্রস্তাব দিলেন – ঠাকুর, তুমি তোমার সব কাম-বাসনা, সর্বশরীর এবং পুরো সম্মতিতে আমাকে গ্রহণ করো, তা হলেই আমি তোমার হতে পারব৷

চণ্ডীদাস এ বার খুশিতে পাগলপারা হয়ে বললেন, আজ থেকে আমার শরীর, এই বাসুলীদেবীর মন্দিরের দায়িত্ব সব তোমার৷ তুমি শুধু আমার৷ তুমি এই একাকী উত্তপ্ত মন ও শরীরকে শান্ত করো৷ চণ্ডীদাসের প্রেম গ্রহণ করলেন রামী৷ সঙ্গে ভয় পেলেন, যদি পাড়ার লোক তাঁদের প্রেমে বাধা দেয়৷ রামী বললেন, “না ঠাকুর, আমাকে ছাড়ো এতে তোমার বিপদ”৷ “আসুক বিপদ, শুধু তুমি আমাকে ভালোবাসো আমি সব সময় তোমার”- চণ্ডীদাসের জবাব৷ “তবে তা-ই হোক, আজ থেকে আর কোনো লোকলজ্জাকে ভয় নয়” – স্পষ্ট উক্তি রামীর৷

“মরম না জানে, মরম বাথানে, এমন আছয়ে যারা।
কাজ নাই সখি, তাদের কথায়, বাহিরে রহুন তারা।
আমার বাহির দুয়ারে কপাট লেগেছে – ভিতর দুয়ার খোলা।”

প্রেমের টানে পদাবলি রচনায় যাতে বাধার সৃষ্টি না হয় সে ব্যাপারে সংযত চণ্ডীদাস৷ রামী, বাসুলীদেবী ও কৃষ্ণের পদ – এই তিনটি বিষয় আবর্তিত হতে লাগল চণ্ডীদাসের জীবন৷

বাসুলীদেবীর প্রতি ভক্তি ও রামীর প্রতি প্রেমসুখ, দুয়ে মিলে পরমসুখে এ বার জোর কদমে শ্রীকৃষ্ণ পদাবলি লিখতে লাগলেন চণ্ডীদাস৷ কখনও ভাবের ঘোরে নিজেদের প্রেমকাহিনি স্থান পেল পদাবলির কাব্যে৷ এ ভাবে একদিন সৃষ্টি হল বাংলার প্রথম সাহিত্য শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের৷

আজ যেখানে মাটির ঢিবি অতীতে সেখানে সাঁঝের বেলায় চণ্ডীদাস  ও রামী কীর্তনের আসর বসাতেন যাতে গ্রামের মানুষ তাদের দু’জনের সম্পর্ককে গুরুশিষ্যার মতো করেই দেখেন৷ তাঁদের কীর্তন শুনতে জড়ো হতেন গ্রামের প্রায় সকলেই৷

চণ্ডীদাস ও রামীর মৃত্যু নিয়ে প্রচলিত কাহিনির কথায় আসি। সেই সময় বাংলার পাঠান সুলতান কিরগিজ খাঁ জোর করে বিয়ে করলেন এক হিন্দু কন্যাকে৷ সেই সুলতানের পত্নীও প্রায়ই আসতেন চণ্ডীদাসের কীর্তন শুনতে৷ ধীরে ধীরে সুলতানের সেই স্ত্রীও চণ্ডীদাসের প্রেমে পড়লেন৷ সুলতান তাঁর স্ত্রীর কাছে সব ব্যাপার জানতে চাইলেন৷ চণ্ডীদাসের প্রেমে পড়ার কথা সুলতানের স্ত্রী নিজমুখে স্বীকার করে নিলে কিরগিজ এক সন্ধেবেলা নিজ স্ত্রীকে বাসগৃহে আটকে রেখে চণ্ডীদাসের কীর্তনের আসরে আচমকা গোলাবর্ষণ করেন৷ ঘটনাস্থলেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যান চণ্ডীদাস, রামী-সহ বেশ ক’জন গ্রামবাসী৷ ধ্বংস হয় বাসুলীদেবীর মন্দির৷

that mound in nanur
সেই ঢিবি।

তবে চণ্ডীদাসের মৃত্যু নিয়ে আরেকটি মত প্রচলিত৷ চণ্ডীদাস ও রামির প্রেমকাহিনি গ্রামবাসীরা জানতে পেরে রেগে ফুঁসে ওঠে এক রাতে দু’জনকেই বেধড়ক পিটিয়ে মেরে ফেলে৷ পরে তাঁদের দুজনের মৃতদেহের ওপর মাটি জড়ো করে ঢিবি বানিয়ে দেয়৷

এই সব কাহিনি কতটা বিশ্বাসযোগ্য, সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। বিশেষ করে, চণ্ডীদাসের সময় গোলা, বিশ্বাস করা যায় না।

১৭-১৮ শতক নাগাদ এই অঞ্চলের তিলি সম্প্রদায়ের মানুষ মাটি খুঁড়ে বাসুলীদেবীর মূর্তি পুনরুদ্ধার করেন এবং মাটির ঢিবির পাশেই মন্দিরগুলি নির্মাণ করেন৷ পরবর্তীকালে ১৯৪৫ সাল নাগাদ সরকারি ভাবে খনন চালিয়ে অতীত পুনরুদ্ধার করা হয়৷ বর্তমানে বাসুলীদেবীর মন্দির-সহ আরও ১৪টি শিবমন্দির রয়েছে মন্দিরচত্বরে৷ সব ক’টাই চারচালাবিশিষ্ট৷ এর মধ্যে দু’টি শিবমন্দিরে টেরাকোটার সুন্দর কাজ লক্ষ করা যায়৷ মন্দিরদু’টির দেওয়ালে টেরাকোটার কাজে রাধাকৃষ্ণের লীলাকেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে৷

এ ছাড়া মন্দিরচত্বরের দু’ পাশে চারটি করে শিবমন্দিরে পঙ্খের অতি সুন্দর কারুকাজ দৃশ্যমান৷ বাকি শিবমন্দিরগুলি সাধারণ ইটে তৈরি এবং চারচালা চূড়াবিশিষ্ট৷

narayan mandir,nanur
নারায়ণ মন্দির।

বাসুলীদেবীর মন্দিরের ডান দিকে চারচালার সমতল ছাদবিশিষ্ট মন্দিরটিতে নারায়ণের পূজা হয়৷ আর সামনের ঘরটিতে বিভিন্ন মৃন্ময়ী দেবদেবীর পূজা হয়৷

বাসুলিদেবীর মন্দির সমতল চারচালাবিশিষ্ট, ইটের তৈরি, মন্দিরের মাথায় একটি চূড়া৷ মন্দিরের গর্ভগৃহে চণ্ডীদাস পূজিত দেবীমূর্তি৷ কালো কষ্টিপাথরের দেবীমূর্তি বীণারঞ্জিত হলেও মুলত শাক্তমতে তাঁর পূজা হয়৷ আশ্বিন মাসে শারদোৎসবের সময় পাঁচ দিন ধরে দেবীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়৷ সেই সময় মোষবলিও হয়৷

এই মন্দিরচত্বর থেকে সামান্য দূরে থানার পাশে যে পুকুরটি আছে সেখানেই রামী কাপড় কাচতে যেতেন৷ এখনও পুকুরধারে রক্ষাকালী মন্দিরের এক দিকে রামীর কাপড় কাচার পাটাটি সংরক্ষিত আছে৷

washing stone of Rami
রামীর কাপড় কাচার পাটা।

নানুরে বাসস্ট্যান্ডের মোড়ে রয়েছে চণ্ডীদাস ও রামীর বড়ো মূর্তি৷ এ ছাড়া নানুরের কাঁথার কাজের খ্যাতি উল্লেখযোগ্য৷ নানুর সফরে সেখানকার মিষ্টির স্বাদ নিতে ভুলবেন না৷

কী ভাবে যাবেন

রেলপথে হাওড়া/শিয়ালদা-রামপুরহাট লাইনে বোলপুর-শান্তিনিকেতন পৌছে সেখান থেকে বাসে বা গাড়ি ভাড়া করে যেতে পারেন নানুর, মাত্র ২১ কিলোমিটা৷ বোলপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে মুহুর্মুহু বাস যাচ্ছে নানুর গ্রাম হয়ে৷ কলকাতা থেকে সড়কপথ দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বর্ধমান, সেখান থেকে মঙ্গলকোট-নতুনহাট হয়ে নানুর।

কোথায় থাকবেন

নানুরে থাকার তেমন জায়গা নেই৷ শান্তিনিকেতন বেড়াতে গিয়ে ঘুরে নিন নানুর। শান্তিনিকেতনে নানা বাজেটের হোটেল আছে। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের রয়েছে শান্তিনিকেতন ট্যুরিস্ট লজ ও রাঙাবিতান ট্যুরিস্ট কমপ্লেক্স। দু’টোরই অনলাইন বুকিং www.wbtdcl.com। বেসরকারি হোটেলের সন্ধান পাওয়া যাবে goibibo, makemytrip, trivago, booking.com, tripadvisor, yatra.com, cleartrip প্রভৃতি ওয়েবসাইট থেকে।

ছবি: লেখক

 

 

 

 

 

 

0 Comments
Share
memories-of-tagore-with-chitrabhanu-in-kalimpong
সুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়

চার পাশে আগাছা জন্মেছে। ২০১১ সালের ভূমিকম্পের পরে দেওয়ালে বড়ো বড়ো ফাটল। বহুকাল শরীরে মাখেনি রঙের আদর। সুন্দর প্রকৃতির বুকে অবহেলায় অসুন্দর ভাবে উপেক্ষিত হয়ে পড়ে আছে রবির প্রিয় চিত্রভানু।

বাংলাদেশের ময়মনসিংহের জমিদার রায়চৌধুরী পরিবারের শৈলাবাস ছিল – ‘গৌরীপুর হাউস’। পরবর্তী কালে যা রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রভানু’ নামে পরিচিত হয়। ত্রিশের দশকে বার বার দীর্ঘ সময় কবি গ্রীষ্ম যাপন করেছেন এই বাড়িতে। সেই সময় বাড়িটি হয়ে উঠেছে নিসর্গের বুকে কবির সৃজনভূমি। কালিম্পং শহরে ‘চিত্রভানু’তে বাস করার সময় ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৪০-এ ‘জন্মদিনে’ শীর্ষক কবিতাগুচ্ছের য় তিনি লিখেছেন –

“পাহাড়ের নীলে আর দিগন্তের নীলে

শূন্যে আর ধরা তলে মন্ত্র বাঁধে ছন্দে আর মিলে।

বনেরে করায় স্নান শরতের রৌদ্রের সোনালি।

হলদে ফুলের গুচ্ছে মধু খোঁজে বেগুনি মৌমাছি।

মাঝখানে আমি আছি,

চৌদিকে আকাশ তাই দিতেছে নিঃশব্দ করতালি।

আমার আনন্দে আজ একাকার ধ্বনি আর রঙ,

জানে তা কি এ কালিম্পং।…

chitrabhanu

হিমালয়ের বুকে বসবাস করা বিশেষ করে গ্রীষ্মের দিনগুলিতে কবির কাছে ছিল আনন্দের। উদযাপনের। তাই শিলং থেকে দার্জিলিং, আলমোড়া থেকে কালিম্পং বার বার ছুটে গিয়েছেন কবি। জীবনের শেষের দিকে কবিকে সঙ্গ দিয়েছেন পুত্রবধূ প্রতিমাদেবী। প্রতিমাদেবীর উদ্যোগেই পরবর্তী সময়ে কালিম্পং-এর বাড়িতে গড়ে উঠেছিল পাহাড়ের মেয়েদের হস্তশিল্প শিক্ষাদান কেন্দ্র। কবির ৭৮তম জন্মদিন উদযাপন হয় চিত্রভানুতেই। সেই সূত্রে কালিম্পং শহরে প্রথম এল টেলিফোন। যার মাধ্যমে ‘জন্মদিন’ কবিতাটি পৌঁছে গেল আকাশবাণীতে সম্প্রচারিত হল দেশ জুড়ে। কালিম্পং-এ জন্মদিনের উদযাপনে জন্মদিন কবিতায় কবির কলমে উঠে এসেছিল আসন্ন মৃত্যুর পূর্বাভাস –

বৃথা বাক্য যাক। তব দেহলিতে শুনি ঘণ্টা বাজে

শেষ প্রহরের ঘণ্টা; সেই সঙ্গে ক্লান্ত বক্ষোমাঝে

শুনি বিদায়ের দ্বার খুলিবার শব্দ সে অদূরে

ধ্বনিতেছে সূর্যাস্তের রঙে রাঙা পূরবীর সুরে।…

২০১১ সালের ভূমিকম্পে ‘চিত্রভানু’র ভাঙন-পরবর্তী ঐতিহ্যবাহী স্থান সংরক্ষণের অপরিহার্য পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে, শুধু এমনটা জানা গিয়েছে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা কোন দফতরে লাল ফিতের ফাঁসে বন্দি এখনও তা জানা যায়নি। তাই ‘চিত্রভানু’তে বেশিক্ষণ থাকলে অবাঙালি ড্রাইভার বিরক্ত হয়ে বলে – ‘ক্যায়া হ্যায় ইধার বাবু? কুছ নেহি’। প্রত্যুত্তরে কিছু বলার থাকে না। কারণ বাঙালির রবীন্দ্র-প্রেম ট্র্যাফিক সিগন্যালের গানে আটকে এখনও পাহাড়ের উচ্চতায় উঠতে পারেনি।

0 Comments
Share
kolkatas-gandhi-bhavan-to-get-heritage-tag

কলকাতা: স্বাধীনতার প্রাক্কালে এই বাড়িতেই ছিলেন মহাত্মা গান্ধী। আগামী ২ অক্টোবর, মহাত্মা গান্ধীর জন্ম সার্ধশতবর্ষে হেরিটেজের তকমা পেতে চলেছে এই বাড়িটি।

দীর্ঘদিন ধরে বাড়িটি অবহেলায় থাকার পর অবশেষে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শুরু হয়েছে। এই বাড়িটি দেখভাল করেন পূর্ব কলকাতা গান্ধী স্মারক সমিতি (পিকেজিএসএস)। সমিতির যুগ্ম সচিব পাপড়ি সরকার বলেন, “২ অক্টোবর এই বাড়িটিতে হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।”

গান্ধী যখন এই বাড়িতে আসেন তখন এর নাম ছিল হায়দরি মঞ্জিল। এই বাড়িটি দাউদি বোহরা সম্প্রদায়ের ছিল বলে জানা গিয়েছে,। ২০-এর দশকে গুজরাতের সুরাত থেকে কলকাতায় চলে এসেছিলেন এই সম্প্রদায়ের অসংখ্য মানুষ। মূলত কাজের সন্ধানেই এসেছিলেন তাঁরা। ১৯২৩ সালে এই বাড়িটি কিনে নেয় দাউদিরা।

জানা যায়, ১৯৪৬-এর ভয়াবহ দাঙ্গার পরে এই বাড়ির বাসিন্দারা পালিয়ে অন্যত্র চলে যান। স্বাধীনতা ঠিক আগে আগে এই দাঙ্গার পরিস্থিতি দেখতে কলকাতায় পা রাখেন গান্ধী। পিকেজিএসএসের সভাপতি শঙ্কর সান্যাল বলেন, “৯ আগস্ট ১৯৪৭-এ কলকাতায় পা রাখার পরে তিনি প্রফুল্ল ঘোষের বাড়িতে যান। তত দিন পর্যন্ত কলকাতায় এলে ওই বাড়িতেই উঠতেন তিনি। কিন্তু এর পরে তাঁকে হায়দরি মঞ্জিলে থাকার অনুরোধ করেন সুহরাওয়ার্দি। এই অঞ্চলে দাঙ্গার ছবি ভয়াবহ ছিল। তাই ভাবা হয়েছিল গান্ধীর প্রভাবে সংঘর্ষ থামাবে দাঙ্গাবাজরা।” ১২ আগস্ট থেকে এই বাড়িতে থাকতে শুরু করেন গান্ধী।

তিনি বলেন, “প্রথম প্রথম দাঙ্গা অনেকটা কমলেও, থামেনি। এর পরে ১ সেপ্টেম্বর থেকে আমরণ অনশনে বসলেন গান্ধী। এর ফলে হিন্দু এবং মুসলিম দাঙ্গাবাজরা তাঁর সামনে আত্মসমর্পণ করলেন। থামল দাঙ্গা।”

এই বাড়িটিকে সংরক্ষণ করার চেষ্টা অনেক দিন আগে থেকেই হচ্ছিল। কিন্তু বেসরকারি মালিকানাধীন থাকায় তা সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। ২০০৭-এ এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয় পূর্ত দফতর।

তবে বাড়িটিকে হেরিটেজ তকমা দিয়ে দিলে রাজ্য সরকারই এখন থেকে এটির দেখভাল করবে। ফলে রক্ষণাবেক্ষণের দুশ্চিন্তা থেকে এখন তাঁরা মুক্ত বলে জানিয়েছে পিকেজিএসএস।

0 Comments
Share
five-narrow-gauge-railway-ines-to-be-preserved-for-tourism-in-gujarat

ওয়েবডেস্ক: অনেকেই হয়তো জানেন না, গুজরাতে বরোদা এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে পাঁচটি ন্যারো গেজ রেল লাইন রয়েছে। এই রেল লাইনগুলিকে পর্যটনের জন্য সংরক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় রেল মন্ত্রক।

মোট ২০৪ কিমি দীর্ঘ এই পাঁচটি রেল লাইন এক কালে ‘গায়কোয়াড় বরোদা স্টেট রেলওয়ের’ (জিবিএসআর) অধীনে ছিল। তবে এখন সেটি পশ্চিম রেলের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। এই পাঁচটি রেল লাইনকে শুধুমাত্র পর্যটনের কাজে ব্যবহার করা হবে বলে পশ্চিম রেলকে চিঠিতে জানিয়েছে রেল বোর্ড।

রেল বোর্ডের একজিকিউটিভ ডিরেক্টর সুব্রত নাথ বলেন, “এই লাইনগুলি ১৯ শতক থেকে রয়েছে। এর মধ্যে দাভোয়-মিয়াগাম সংযোগকারী ৩৩ কিমি দীর্ঘ লাইনটি, দেশের প্রথম ন্যারো গেজ রেল লাইন হিসেবে পরিচিত। ১৮৬২-তে যখন এই লাইনে প্রথম ট্রেন চলা শুরু হয়, তখন তাদের টানত ষাঁড়। তার পরের বছর থেকে স্টিম ইঞ্জিন চালু হয়।”

দাভোয়-মিয়াগাম লাইনটি ছাড়াও বাকি চারটে লাইন হল মিয়াগাম-মালসার লাইন, চারোন্দা-মোতি করল লাইন, প্রতাপনগর-জম্বুসর লাইন এবং বিলমোরা-ওয়াঘি লাইন।

0 Comments
Share