ভ্রমণ অনলাইন ডেস্ক: গরম পড়তেই মনটা যেন পাহাড় পাহাড় করে। তবে দার্জিলিং বা কার্শিয়াঙের ভিড়ভাট্টা অনেকেরই না-পসন্দ। যদি একটু নির্জন, শান্ত কোনও পাহাড়ি গ্রামে কয়েকটা দিন কাটাতে চান, তা হলে উত্তরবঙ্গেই রয়েছে এমন কিছু ঠিকানা, যেগুলো এখনও অনেকটাই অচেনা। তাই তুলনায় ভিড়ও কম হয়। মেঘ, পাহাড়, পাইন বন আর কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্যে ঘেরা এই জায়গাগুলি কম খরচে ছুটি কাটানোর জন্য একেবারে আদর্শ। রইল তেমনই কয়েকটি অফবিট পাহাড়ি গ্রামের খোঁজ। কী ভাবে পৌঁছোবেন? রইল সেই হদিসও।
অহলদাড়া: মেঘের ভিতর হারিয়ে যাওয়া এক ভিউপয়েন্ট
কার্শিয়াঙ মহকুমায় সেলপু পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত অহলদাড়া এখনও অনেকটাই পর্যটকদের চোখের আড়ালে। জায়গাটার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর নির্জনতা। এখানে দাঁড়ালে মনে হবে যেন পাহাড় আর আকাশ এক হয়ে গিয়েছে। ভোরবেলা কুয়াশার চাদর সরতেই ধীরে ধীরে উঁকি দেয় কাঞ্চনজঙ্ঘা। সূর্যের প্রথম আলো পড়লে পাহাড়ের রং বদলাতে থাকে মুহূর্তে মুহূর্তে। অহলদাড়ার চারপাশ জুড়ে রয়েছে ঘন পাইন বন। সকালবেলায় হালকা ঠান্ডা হাওয়া আর পাখির ডাক মিলিয়ে পরিবেশটা হয়ে ওঠে একেবারে পোস্টকার্ডের মতো। সন্ধ্যার পরে এখানকার নিস্তব্ধতা আলাদা করে অনুভব করার মতো। পরিষ্কার রাতে আকাশভরা তারাও দেখা যায় স্পষ্ট। এখানে গেলে স্থানীয় নেপালি খাবারের স্বাদ নিতে ভুলবেন না। বেশির ভাগ হোমস্টেতেই গরম গরম মোমো, থুকপা, সেল রুটি কিংবা দেশি মুরগির ঝোল পরিবেশন করা হয়।
কী ভাবে যাবেন
নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন বা বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে শেয়ার গাড়িতে চলে আসুন ৩২ কিলোমিটার দূরে কালীঝোরা। শিলিগুড়ি থেকে বাসও পাবেন। কালীঝোরা থেকে গাড়ি ভাড়া করে আসতে হবে অহলদাড়া। লাটপাঞ্চার হয়ে দূরত্ব ২০ কিমি। শেয়ার গাড়িতে কার্শিয়ং হয়েও আসতে পারেন। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে ৪০ কিমি। তার পর কার্শিয়ং থেকে গাড়ি ভাড়া করে আসুন অহলদাড়া। দূরত্ব ২৮ কিমি।

তাবাকোশি: নদীর শব্দে ঘুম ভাঙার ঠিকানা
মিরিকের কাছে রাংভাং নদীর ধারে ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম তাবাকোশি এখন ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তবে এখনও জায়গাটা অতিরিক্ত বাণিজ্যিক হয়ে ওঠেনি। এখানকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নদী আর চা-বাগানের মেলবন্ধন। সকালের দিকে নদীর উপর হালকা কুয়াশা ভেসে বেড়ায়, পুরো পরিবেশকে আরও রহস্যময় করে তোলে।
তাবাকোশিতে গেলে নদীর ধারে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া যায়। অনেক হোমস্টেতে ছোট্ট কাঠের ব্রিজ বা নদীর ধারে বসার জায়গাও থাকে। বর্ষাকালে এখানকার সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়। পাহাড়ের ঢালে সারি সারি চা-বাগান দেখতে দেখতে মনে হবে যেন জলরঙে আঁকা ছবি। অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্যও জায়গাটা বেশ ভাল। নদীর ধারে ছোটখাটো ট্রেকিং, ক্যাম্পফায়ার কিংবা স্থানীয় গ্রাম ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে। এখানকার মানুষও অত্যন্ত আন্তরিক।
কী ভাবে যাবেন:
নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন বা বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে শেয়ার গাড়িতে মিরিক। এনজেপি স্টেশন থেকে দূরত্ব ৫৩ কিমি। শিলিগুড়ি থেকে বাসও পাবেন। মিরিক থেকে তাবাকোশির দূরত্ব প্রায় ৮-১০ কিলোমিটার। ছোটো গাড়ি বা স্থানীয় গাড়িতেই পৌঁছে যাওয়া যায় সহজে।
পাবং: শান্ত পাহাড়ি বিকেলের নাম
কালিম্পঙের কাছে ছোট্ট গ্রাম পাবং যেন ধীর গতির জীবনের প্রতীক। এখানে সময় যেন একটু ধীরে চলে। পর্যটকের সংখ্যা কম হওয়ায় জায়গাটা এখনও শান্ত ও পরিষ্কার। পাবঙের হোমস্টেগুলি সাধারণ হলেও অত্যন্ত আরামদায়ক। বারান্দায় বসে দূরের পাহাড় দেখতে দেখতে সহজেই কেটে যায় বিকেল। সন্ধ্যার পরে চারপাশে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ আর ঠান্ডা বাতাস। শহরের ব্যস্ততা থেকে যাঁরা কিছু দিনের মুক্তি চান, তাঁদের জন্য এই জায়গা একদম উপযুক্ত। পাবং থেকে নেওরা ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক খুব কাছেই। ভাগ্য ভাল থাকলে নানা রকম পাহাড়ি পাখি কিংবা বিরল প্রজাতির প্রজাপতিও দেখতে পারেন। শীতকালে এখানকার আবহাওয়া আরও সুন্দর হয়ে ওঠে। এখানে স্থানীয় অর্গানিক চাষও চোখে পড়বে। অনেক হোমস্টেতে নিজেদের বাগানের সবজি দিয়েই রান্না করা হয়।
কী ভাবে যাবেন:
নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন বা বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে শেয়ার গাড়িতে কালিম্পং আসা যায়। দূরত্ব ৭০ কিমি। শিলিগুড়ি থেকে বাসেও আসতে পারেন। কালিম্পং থেকে আবার স্থানীয় গাড়িতে চলে আসুন পাবং। দূরত্ব ৪-৫ কিমি।

বাগোড়া: পাখি আর পাইন গাছেদের গ্রাম
কার্শিয়াঙের কাছে ছোট্ট গ্রাম বাগোড়া প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে যেন লুকোনো রত্ন। জায়গাটা বিশেষ করে পরিচিত পাখি দেখার জন্য। ভোরবেলায় জানলার বাইরে তাকালেই নানা রঙের পাহাড়ি পাখির দেখা মেলে। এখানকার আবহাওয়া প্রায় সারা বছরই মনোরম। মেঘ কখনও এসে ঢেকে দেয় পুরো গ্রাম, আবার কিছু ক্ষণের মধ্যেই রোদ ঝলমলে আকাশ। বাগোড়ার চারপাশে ঘন পাইন বন রয়েছে। চাইলে হেঁটে জঙ্গলের ভিতরেও ঘুরে আসতে পারেন। এখান থেকে কাছের ডাওহিল, চিমনি কিংবা ফরেস্ট মিউজ়িয়াম সহজেই ঘুরে নেওয়া যায়। ডাওহিলের রহস্যময় পরিবেশ আর পুরনো ব্রিটিশ আমলের স্কুলও পর্যটকদের টানে। রাতে ঠান্ডা একটু বেশি থাকে। তাই গরম পোশাক সঙ্গে রাখাই ভাল।
কী ভাবে যাবেন:
নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন বা বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে শেয়ার গাড়িতে চলে আসুন ৪০ কিলোমিটার দূরের কার্শিয়াঙে। শিলিগুড়ি থেকে বাসও পাবেন। কার্শিয়াঙ থেকে বাগোড়া ১২ কিমি, গাড়িতে প্রায় ৩০-৪০ মিনিট সময় লাগে।

ঋষিহাট: চা-বাগান আর কাঞ্চনজঙ্ঘার নৈসর্গিক সৌন্দর্য
দার্জিলিং জেলার ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম ঋষিহাট এখনও অনেকটাই অচেনা। এখানে বড় হোটেল নেই, নেই পর্যটকদের ভিড়ও। রয়েছে ছোট ছোট কাঠের বাড়ি আর কয়েকটি হোমস্টে। এই গ্রামের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এখানকার শান্ত পরিবেশ। সকালে জানলা খুললেই দূরে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘা। চারপাশে চা-বাগানের সবুজ আর পাহাড়ি ফুলের গন্ধে মন ভাল হয়ে যায় সহজেই।
ঋষিহাটে গেলে স্থানীয় গ্রাম্যজীবন খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাবেন। এখানকার মানুষ মূলত চা-বাগান ও কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। চাইলে সকালে গ্রাম
ঘুরে দেখতে পারেন বা ছোট ট্রেকেও বেরিয়ে পড়তে পারেন। শীতকালে এখানে প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়ে, তবে সেই সময় কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য সবচেয়ে পরিষ্কার দেখা যায়।
কী ভাবে যাবেন:
নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন বা বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে শেয়ার গাড়িতে চলে আসুন ঘুম। দূরত্ব ৬৪ কিমি। শিলিগুড়ি থেকে বাসেও আসতে পারেন। ঘুম থেকে থেকে গাড়ি ভাড়া করে ঋষিহাট পৌঁছোনো যায়। দূরত্ব ১০ কিমি।

প্রয়োজনীয় তথ্য
(১) সব জায়গাতেই থাকার জন্য হোমস্টে, রিসর্ট আছে। গুগুল সার্চ করলে সন্ধান পেয়ে যাবেন।
(২) ইচ্ছা করলে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন বা বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে গাড়ি ভাড়া করে পৌঁছে যেতে পারেন।
চেনা পাহাড়ের ভিড় এড়িয়ে যদি এ বার একটু অন্য রকম ছুটি কাটাতে চান, তা হলে উত্তরবঙ্গের এই অফবিট




