রূপসী বাংলার পথে ৩/ রোমান্টিক ঝিলিমিলির আশেপাশে

শ্রয়ণ সেন

‘কোঁ কোঁর কোঁ’

মোরগের ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। ভোর সাড়ে পাঁচটা। কলকাতায় থাকতে এই ডাকটা তো শুনতেই পাওয়া যায় না। তাই আজকের সকালটা সত্যিই একটা বিশেষ তাৎপর্যের।

ঘর থেকে বেরিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়াতেই অদ্ভুত একটা উপলব্ধি হল। ধীরে ধীরে আলো ফুটছে। অদ্ভুত একটা রোমান্টিকতা ছড়িয়ে রয়েছে চার দিকে। সবুজের সমুদ্র।

মালভূমি অঞ্চলের ছোঁয়া। চারিদিকে জঙ্গল আর ছোটোখাটো পাহাড়। ভৌগোলিক কারণেই এই নভেম্বরের শুরুতেই বেশ ঠান্ডা ঝিলিমিলিতে। কাল রাতে পাখা তো চালাতেই হয়নি, বরং কম্বল গায়ে দিতে হয়েছে। এখনও গায়ের ওপরে হালকা চাদর। বলা যায়, এই ঝিলিমিলিতেই শীতের নতুন মরশুমকে স্বাগত জানালাম।

এই রিমিল লজটাই কিন্তু ঝিলিমিলির প্রধান আকর্ষণ। শাল-পিয়াল-পলাশ-মহুয়া গাছে ভরে রয়েছে লজের চত্বর। এ ছাড়া কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, আম, জাম, কাঁঠাল গাছ তো রয়েছেই। 

নেমে এলাম লজ চত্বরে। পরিবেশটা প্রাতর্ভ্রমণের জন্য আদর্শ। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুব আকাশ রাঙিয়ে সূর্যদেব উঠলেন। লম্বা লম্বা গাছের আড়াল ভেদ করে ধীরে ধীরে লজ চত্বরে তাঁর আশীর্বাদ পড়তে থাকল।

অন্য কোথাও না গিয়ে, অবলীলায় একটা গোটা দিন স্রেফ বিশ্রাম নিয়ে কাটিয়ে দেওয়া যায় রিমিলে। যদিও আমরা টুকটাক কিছু সাইটসিয়িংয়ের সিদ্ধান্ত নিলাম।

সত্যি কথা বলতে কী! ঝিলিমিলির আশেপাশে এত কিছু দেখার আছে, যে সব কিছু দেখতে হলে অন্তত চারটে দিন থাকতেই হবে এখানে। কিন্তু আমাদের হাতে তো অত সময় নেই।

দুয়ারসিনির নাম কত শুনেছি। সেই দুয়ারসিনি ঝিলিমিলির এত কাছে, সেটা আগে জানতাম না। আগে মাওবাদীদের সমস্যা থাকলেও এখন অবলীলায় যাওয়া যায় সেখানে। লজকর্মীদের কাছে এমন আশ্বাস পেয়েই প্রাতরাশ করে বেরিয়ে পড়লাম।

ঝিলিমিলি থেকে বেরিয়ে কুইলাপালের কিছু আগেই ঢুকে গেলাম পুরুলিয়ায়। এর পর এল বান্দোয়ান। সড়ক যোগাযোগের প্রেক্ষিতে বান্দোয়ানের গুরুত্ব অপরিসীম।

কুইলাপাল থেকে বান্দোয়ানের পথে।

বান্দোয়ান থেকে ঘুরলাম বাঁ দিকে। পথের প্রথম অংশটা ধানখেতের মধ্যে দিয়ে হলেও কিছুক্ষণের মধ্যে এগিয়ে এল জঙ্গল। আমাদের চারিদিকে ঘিরে ধরল পাহাড়। শুরু হয়ে গেল ঘাট রাস্তা। রাস্তাটা খুবই সরু কিন্তু পিচের।

বান্দোয়ান থেকে ঘণ্টাখানেক পথ চলার পর এসে পৌঁছোলাম দুয়ারসিনি। এখান থেকে মাত্র দু’ কিলোমিটার দূরে আসানপানি, সেটাই বাংলা-ঝাড়খণ্ড সীমান্ত। কিছু দূরেই ঘাটশিলা।

দুয়ারসিনি ঢোকার একটু আগেই পড়ল ভালোপাহাড়। আদতে গ্রামটার নাম ডঙ্গোরজুরি। কিন্তু এই নাম ওখানকার লোক প্রায় ভুলেই গেছে, সবার কাছে এখন এটা ‘ভালোপাহাড়’।

‘সভ্যতা’র গ্রাস থেকে প্রকৃতিকে বাঁচানোর তাগিদে এগিয়ে এসেছিলেন কয়েক জন সাহসী মানুষ। নেতৃত্বে সাহিত্যিক কমল চক্রবর্তী। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও ‘ভালোপাহাড়’-এর কাজ থেমে থাকেনি।

দক্ষিণবঙ্গের ‘ডুয়ার্স’ হিসেবে খ্যাতি দুয়ারসিনির, যে শব্দটির অর্থ ‘দ্বাররক্ষক ঠাকুর’। পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী এখানে যে খাড়া পাহাড় রয়েছে, তার ওপর দিয়েই লঙ্কার রাজা রাবণ স্বর্গে যাওয়ার সিঁড়ি তৈরি করতে চেয়েছিলেন।

২৯৪ হেক্টরের প্রাকৃতিক জঙ্গলে ঘেরা দুয়ারসিনি। গভীর অরণ্যের মাঝেমাঝে ছোটো ছোটো টিলা। পাহাড় আর পাহাড়ের মাঝ দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে বয়ে চলা সাতগুরুম নদী।

তবে দুয়ারসিনিকে বুঝতে এখানে একটা রাত থাকতেই হবে। তা হলেই পাহাড়, জঙ্গল, নদীর সঙ্গে এখানকার নির্জনতাকেও উপভোগ করা যাবে।

এক যুগ আগেও দুয়ারসিনিতে টিলার ওপরে অবস্থিত বনোন্নয়ন নিগমের তিনটি কটেজে ভিড় লেগে থাকত পর্যটকদের জন্য। কিন্তু আশেপাশে মাওবাদীদের ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণের পর বন্ধ হয়ে যায় পর্যটকদের আনাগোনা।

অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে থাকতে ধ্বংস হয়ে যায় নিগমের কটেজগুলি। দীর্ঘদিন পর আবার এখানে পর্যটনক্ষেত্র গড়ে তোলার জন্য নতুন করে কটেজ তৈরি ব্যাপারে উদ্যোগী হয় নিগম। বর্তমানে কটেজগুলি পুরো তৈরি হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কবে থেকে অনলাইন বুকিং শুরু হবে, বা কবে থেকে পর্যটকরা এখানে রাত কাটাতে পারবেন, সে ব্যাপারে কারও কাছেই কোনো তথ্য নেই। 

সুতান।

ঠিক যেমন কেউ জানে না যে সুতানের নবনির্মিত বন বিশ্রামাগারে কবে মানুষজন রাত কাটাবেন।

দুয়ারসিনির মতোই পর্যটকদের পা বিশেষ পড়ে না দক্ষিণবঙ্গের গভীরতম জঙ্গল সুতানে। ঝিলিমিলির ‘বারোমাইল’ জঙ্গলের একটা অংশ এই সুতানের জঙ্গল।

এই ‘বারোমাইল’ জঙ্গলের বুক চিরে বেরিয়ে যাচ্ছে ঝিলিমিলি-রানিবাঁধ রোড। রাস্তা আঁকাবাঁকা, পাহাড়ি।

মসৃণ রাস্তার লোভে পড়ে গাড়ি যদি বেশি স্পিড তুলে ফেলে তা হলে সুতানের জন্য নির্দিষ্ট ডান দিকটা মিস করার প্রবল সম্ভাবনা। মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ করে না, তাই গুগল ম্যাচ কোনো ভরসা দেবে না।

যা-ই হোক, আমাদের গাড়ি সেই ভুল করেনি। ডান দিকের সরু রাস্তায় ঘুরতেই সম্পূর্ণ অন্য একটা জগতে প্রবেশ করলাম যেন।

পাথুরে রাস্তা যাচ্ছে ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, একধারে খাদ, প‍্যাঁচানো রাস্তা, প্রাচীন গাছপালা। আমাদের সাধারণ প্রবণতা, কোথাও যাওয়া মানে একটা গন্তব‍্য বা স্পট থাকতে হবে। রাস্তা উপভোগ করতে আমরা ভুলে যাই। কিন্তু সুতানের রাস্তাই যেন এর প্রধান আকর্ষণ।

বিরাট বিস্তীর্ণ প্রান্তর জুড়ে ছড়ানো বিশুদ্ধ বনভূমি দিয়ে যেতে যেতে মাঝে মধ্যে দু-একটা পাথুরে পথ ডান দিকে বা বাম দিকে চলে যায় কোনো একটা জঙ্গলঘেরা গ্রামের দিকে।

এই যে ৬.১৪৩ কিলোমিটার পথ চলে আমরা সুতানের বন বিশ্রামাবাসের কাছে পৌঁছোলাম, তার অভিজ্ঞতাটা কিন্তু এক কথায় দুর্দান্ত। এই পথে যেতে যেতে ময়ূরের সঙ্গে দেখা হওয়াটা আশ্চর্যের কিছু নয়। হাতিরও দর্শন পেয়ে যেতে পারেন। 

বিশ্রামাবাস তৈরি হয়েছে। অতীতের সাক্ষ্য বহন করে এখানেই দাঁড়িয়ে আছে এই সিআরপিএফের একটি ক্যাম্প, যেটা এখন ধ্বংসাবশেষে পরিণত। পাশেই নতুন একটি ওয়াচটাওয়ার। তবে সেই ওয়াচটাওয়ার বেশি উঁচু নয়।

বিশ্রামাবাসটা বাইরে থেকে দেখতে বেশ সুন্দর। রঙের নতুন প্রলেপ পড়েছে। স্থানীয় এক গ্রামবাসী বললেন, বন দফতরের আধিকারিকরা এখানে এলেও কেউ রাতে থাকেন না। তার অবশ্য একটা কারণ রয়েছে। গহন এই অরণ্যে কোনো নেটওয়ার্ক নেই। রাতবিরেতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে কারও সাহায্য চাওয়ার কোনো উপায় নেই।

বিশ্রামাবাসের ঠিক পেছনেই রয়েছে একটি বিল। শীতে হয়তো এখানে টুকটাক পরিযায়ী পাখি আসে।

সুতানের পালা মিটিয়ে এ বার আমাদের গন্তব্য তালবেড়িয়া জলাধার। বাংলার পর্যটন মানচিত্রে এই লেক এখনও সে ভাবে স্থান পায়নি। কিন্তু বাংলার অন্যতম সেরা হ্রদ হওয়ার যাবতীয় রসদ রয়েছে এই তালবেড়িয়ার মধ্যে।

সবুজ জঙ্গল ও অনুচ্চ পাহাড়ে ঘেরা এই হ্রদ। টলটলে নীল জল। পানকৌড়ি আর বকের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে।

তালবেড়িয়া ড্যাম।

জলাধারের কিছুটা ভেতরে একটা দাঁড়ানোর জায়গা তৈরি হয়েছে। সেখানে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি রয়েছে। লেকটাকে প্রকৃত ভাবে উপভোগ করা যায় এখানে দাঁড়িয়ে। উত্তর দিক থেকে শিরশিরানি ধরানো একটা হাওয়া আসছে। ছায়ায় থাকার ফলে নভেম্বরের দুপুরেও ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে।

তালবেড়িয়ার মতো সুন্দরী না হলেও রিমিলের ঠিক কাছে কল্যাণ সায়রটাকেও বিকেলে বেশ উপভোগ করা গেল। সায়রের বুকে ফুটে রয়েছে অসংখ্য পদ্ম। জলের মধ্যে মাছেদের খেলে বেড়ানো দেখতে দেখতেই সময়টা কখন কেটে গেল বুঝতে পারলাম না।

সূর্য অস্ত গেল। ঝিলিমিলিতে আমাদের থাকার সময়ও ধীরে ধীরে ফুরিয়ে এল। (চলবে)

আরও পড়ুন: রূপসী বাংলার পথে ১/ ‘অচেনা’ তাজপুর

আরও পড়ুন: রূপসী বাংলার পথে ২/ সাগর থেকে জঙ্গলমহলে

মন্তব্য করুন