সিসামারার পাড়ে, জলদাপাড়াকে চিনলাম অন্য ভাবে

শ্রয়ণ সেন

ডাইনিং হল তো না, এ তো ইতিহাসে পড়া সেই প্রস্তরযুগ! টেবিল, চেয়ারগুলো দেখে মনে হচ্ছে চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নানা আকারের শিলাখণ্ড। সেখানেই বসে খাওয়াদাওয়া। আদতে টেবিলগুলো শিরীষ গাছের কাণ্ড থেকে তৈরি, আর চেয়ারগুলো বনকাঁঠালের।  

খেতে বসে আরও এক চমক। সুপারির খোল দিয়ে তৈরি থালা-বাটিতে খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা। অদ্ভুত সুন্দর একটা পরিবেশের মধ্যে পেট ভরে খাওয়াদাওয়া সেরে নিলাম। টানা ছ’ ঘণ্টার সড়কযাত্রার শেষে পেটে ছুঁচোয় রীতিমতো ডন মারতে শুরু করেছিল। এখন সেই ছুঁচোগুলো শান্ত।

জলদাপাড়া রাইনো কটেজের ভেতরের পরিবেশটা অসাধারণ বললেও কম বলা হয়। বেশ বড়ো এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কটেজগুলো। নানা রকম গাছগাছালিতে ভরা এই রিসর্টের চত্বর।

আর তেমনই অসাধারণ এখানকার মানুষজন। সে ম্যানেজার প্রদীপবাবু হোন বা বছর পঁচিশের তরুণী টুসু। প্রথম আলাপেই মনে হচ্ছে এঁরা আমাদের কত দিনের পরিচিত।

আপশোশ একটাই। মাত্র দু’ সপ্তাহ আগে বুকিং করেছি বলে ওপরের ঘরগুলো পাওয়া যায়নি। এই রিসর্টের মূল সৌন্দর্যই হচ্ছে ওপরের ঘর।

আমাদের নীচের ঘরগুলোয় রাত্রিবাসের বন্দোবস্ত হয়েছে। এই ঘর থেকে কোনো ভিউ নেই। কারণ সামনেই বাঁধ। সেই বাঁধের ওপরে না উঠলে ও পারে কী আছে সেটা বোঝা যাবে না। তবে ঘরগুলোর অন্দরসজ্জা দেখলে মুগ্ধ হতেই হয়। অত্যন্ত সুন্দর এবং সৃজনশীল ভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছে ঘরগুলোকে। 

ভরপেট খেয়েদেয়ে ঘণ্টাখানেক বেশ ভালো ঘুম হল। দুপুরে সাধারণত ঘুম হয় না। কিন্তু আজ হল। পাহাড়ের ঠান্ডা থেকে সমতলের চূড়ান্ত গরমে নেমে আসার পর কিছুটা ক্লান্তও লাগছিল। সে কারণেই আরও বেশি গাঢ় হল ঘুমটা।

ঘুম থেকে উঠে, ক্লান্তি দূর করে বেরিয়ে পড়লাম এই অঞ্চলটাকে চিনতে। বাঁধের ওপরে উঠলাম। তিরতির করে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে সিসামারা নদী। নদীর ওপারেই জলদাপাড়ার জঙ্গল। 

এই সেই জলদাপাড়ার জঙ্গল, যাকে এর আগে দু’ বার একদম ভেতর থেকে দেখেছি। এর প্রধান বাসিন্দার বিচরণ, আচরণ সবই দেখেছি। এ বার একটু অন্য রকম ভাবে চিনছি।

এক শৃঙ্গ গন্ডারের বিচরণভূমি এই জলদাপাড়া অরণ্য, ১৯৪১ সালে অভয়ারণ্যের মর্যাদা পায়। ২০১২-তে জাতীয় উদ্যান হিসেবে খ্যাতি লাভ করে জলদাপাড়া। ভারতে একমাত্র জলদাপাড়া আর গরুমারা জাতীয় উদ্যানে দেখা যায় এই একশৃঙ্গ গন্ডার।

মনে পড়ে যায় আগের দু’ বার এই জলদাপাড়ায় আসার ঘটনাগুলো। প্রথম বার মাদারিহাট থেকে সাফারি করেছিলাম জলদাপাড়ার জঙ্গলে। চারটে গন্ডারের দর্শন পেয়েছিলাম।

ঠিক দেড় বছর বাদে, ভাগ্যক্রমে থাকার সুযোগ হয়েছিল জলদাপাড়ার জঙ্গলের ভেতরের হলং বাংলোয়। বাংলো থেকে তো সারা দিন গন্ডারের বিচরণই দেখে গেলাম।

এই যে বাঁধের ওপরে রয়েছি, এখান থেকেও কিন্তু জলদাপাড়ার এই প্রধান বাসিন্দাকে দেখা যায়। ঘন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে তারা যখন সিসামারা নদীর জল খেতে আসে, তখন।

ঠিক এখানেই রিসর্টের ওপরের ঘরগুলোর বাড়তি সৌন্দর্য। ওই ঘরগুলো থেকে জঙ্গল দর্শনে কোনো বাধা নেই। ঘরের বিছানায় শুয়ে শুয়েই গন্ডার দর্শন করা যায়। এ ছাড়া হাতি তো দেখা যায়ই। অবশ্য হাতি প্রায়শই রিসর্টের চৌহদ্দিতেও চলে আসে।

সে কারণে ওপরের ঘরগুলোর দক্ষিণা সামান্য বেশি। কিন্তু ভাগ্যক্রমে ওপরের ঘরগুলোয় বুকিং পেয়ে গেলে আর অন্য কোথাও যেতেও ইচ্ছে করবে না। কিন্তু ভরা পর্যটন মরশুমের সময় ওপরের ঘরগুলোয় থাকার স্বাদ নিতে হলে অন্তত তিন চার মাস আগে থেকে বুকিং করে ফেলতে হবে।

রিসর্টে ঘর কিন্তু বেশি নেই। ওপরের ঘর চারটে, নীচের ঘর গোটা তিনেক। এ ছাড়া অবশ্য সুন্দর একটি ৮ শয্যার ডর্মিটরি আছে, যেখানে ইচ্ছে করলে ১০-১২ জনের একটা বড়ো পরিবার আরাম করে ঢুকে যেতে পারে।

অনেক মহল থেকে দাবি করা হলেও রিসর্টে আর ঘর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেননি মিঠুনদা, অর্থাৎ এখানকার সহ-কর্ণধার মিঠুন সরকার। পেশায় স্কুলশিক্ষক। 

ভদ্রলোকের সঙ্গে এত দিন শুধুমাত্র ফোনে কথা হয়েছে। আজ যখন প্রথম সামনাসামনি দেখা হল, এমন প্রাণ খুলে একটা হাসি দিলেন, মনে হল কত দিনের পরিচিত আমরা।

সিসামারা নদীর দক্ষিণ পাড়ে আরও দু’ জনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ২০১৪ সালে এই রিসর্টটি গড়ে তোলেন মিঠুনদা। সবুজকে বাঁচিয়ে রেখেই ভ্রামণিকদের ভিন্ন স্বাদের ভ্রমণের উপহার দিতে চেয়েছিলেন তিনি। আজও সেই অবস্থান থেকে এক চুলও নড়েননি। তাই তো তিনি অবলীলায় বলে দেন-

— “চাইলে এখুনি আরও কয়েকটা কটেজ বানিয়ে ফেলতে পারি, কয়েকটা গাছ কেটে, কিন্তু তা করলে অন্যদের থেকে আমরা আলাদা হলাম কোথায়!”

অসাধারণ একটা কথা। আর আরও অসাধারণ ব্যাপার হল এই জলদাপাড়া অঞ্চল সম্পর্কে তার মুখে শোনা গল্পগুলো। 

যে জায়গায় এই রিসর্ট, তার নাম সিসামারা। এখান থেকে ১ কিলোমিটার দূরেই রয়েছে জলদাপাড়া। অর্থাৎ আদি জলদাপাড়া গ্রাম। যেখান থেকেই নাম হয়েছে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের।

বর্তমানে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের প্রাণকেন্দ্র হয়ে গিয়েছে মাদারিহাট, যা এখান থেকে গাড়িতে অন্তত ৪৫ মিনিটের পথ। বেশির ভাগ পর্যটকই মাদারিহাটকে গুলিয়ে ফেলেন জলদাপাড়া হিসেবে, কিন্তু আসল জলদাপাড়া গ্রামটা এখানে, কাছেই। 

এই স্থাননামের একটা মাহাত্ম্যও আছে। এই অঞ্চলেই ‘জলদা’ নামক একটি জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। তবে কালের নিয়ম এবং কলেরার প্রকোপে পুরো গোষ্ঠীটাই বিলুপ্ত হয়ে যায়। শুধু রয়ে যায় জলদাপাড়া নামটা।

তবে ওই গোষ্ঠী বিলুপ্ত হলেও জলদাপাড়া গ্রামের বাসিন্দারা তো ছিলেনই। তাঁদের একটা ক্ষোভ ছিল মাদারিহাটকে নিয়ে। জাতীয় উদ্যানের নাম যখন তাঁদের গ্রামের নামে, তখন উদ্যানের প্রাণকেন্দ্র কেন মাদারিহাট হয়ে গেল, এটাই বিশ্বাস করতে পারতেন না তাঁরা। জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের একটি গেট তাঁদের গ্রামের দিকে করার জন্য ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে আবেদন করেন এই গ্রামের বাসিন্দারা। সেটা মঞ্জুরও হয়ে যায়।

এখন জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানে সাফারি যাঁরা করেন, জানবেন শেষ পয়েন্টটা হল জলদাপাড়া নজরমিনার। ওখানে যাওয়ার পথেই ডান দিকে তাকালে জাতীয় উদ্যানের একটি গেট দেখা যায়। সেখানে কিছু রিসর্ট এবং হোমস্টে রয়েছে। ওই গেটটি জলদাপাড়া গ্রাম সংলগ্ন গেট। এটিই এই রিসর্ট থেকে সব থেকে কাছে, ৮ কিলোমিটার।

এখন এমনিতেই বর্ষাকাল, তায় করোনার প্রকোপ চলছে। তাই জঙ্গলে সাফারি বন্ধ। কিন্তু সাফারি চালু হওয়ার পর জলদাপাড়ায় এলে আর এই রাইনো কটেজে থাকলে সাফারির টিকিট কাটতে মাদারিহাটে যেতে হবে না। যাবতীয় ব্যবস্থা এখান থেকেই হয়ে যাবে। শুধু নিজের গাড়িটা নিয়ে জলপাদাড়ার গেটে যেতে হবে। সেখানে সাফারির গাড়ি অপেক্ষা করবে। শুরু হয়ে যাবে সাফারি।

মিঠুনদা মানুষটা জলদাপাড়া এবং তার সংলগ্ন অঞ্চলটাকে হাতের তালুর মতো চেনেন। তার প্রতিটি ইতিহাসে তাঁর নখদর্পণে।

— “জলদাপাড়ার প্রতিটা হাতির আলাদা আলাদা গল্প আছে জানেন!”

বছর খানেক আগে পর্যন্তও বাঁয়া গণেশের তাণ্ডবে ত্রস্ত থাকত জলদাপাড়া। গুণ্ডামিতে রীতিমতো নাম কুড়িয়েছিল সে। মাদি হাতিদের ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও কুখ্যাত হয়ে গিয়ছিল বাঁয়া। আর যদি কখনও কোনো মানুষ তার সামনে পড়ত, তাকে নিজের শুঁড়ে পেঁচিয়ে, পায় থেঁতলে, শরীরে দাঁত গেথে খুন করত সে।

এ হেন বাঁয়ার মৃত্যুও হয় নাটকীয় ভাবেই। চিলাপাতার জঙ্গলে তালবেতাল নামে আরও এক হাতির সঙ্গে লড়াই বাধে তার। সারা রাত ধরে সেই লড়াইয়ের পর মারা যায় বাঁয়া।

আবার অন্য দিকে যাত্রাপ্রসাদের এক অন্য গল্প। সে মানুষের ছিল বড্ড প্রিয়। বনকর্মীদের কথার খেলাপ কখনোই করত না সে। মারা গেলেও এখনও যাত্রাপ্রসাদের নাম ঘুরে বেড়ায় মানুষের মুখে মুখে।

ভাওয়াইয়া গানের মধ্যে দিয়ে জলদাপাড়া জঙ্গল এবং তার আশেপাশের এলাকার জীবনজীবিকার গল্প, হাতিদের গল্প শোনানোরও ব্যবস্থা করেন দেন মিঠুনবাবুরা। কিন্তু আজ এখানে জন্মদিনের উৎসব চলছে তাই সেই আসর বসানো গেল না বলে দুঃখপ্রকাশ করলেন তিনি। 

রাত গভীর হতে থাকে জলদাপাড়ায়। রুটি, আলুভাজার সঙ্গে টুসুর হাতের অপূর্ব চিকেন কারি খেয়ে পাড়ি জমাই ঘুমের দেশে।

সুন্দর একটা ভোর হল। দৌড়ে চলে গেলাম বাঁধের ওপরে। কালো মেঘের আনাগোনা আকাশে। বৃষ্টি পড়ছে ঝিরিঝিরি, বইছে ঝোড়ো হাওয়া। ও পারে জলদাপাড়ার জঙ্গল যেন আরও রহস্যময়। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছে কিছু যেন বেরোবে, এখুনি কেউ নদীর জল খেতে আসবে।

ওপারে আচমকা গাছের ডাল ভেঙে পড়ার শব্দ। সতর্ক হই। কেউ কী আছে? পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট এ ভাবেই পেরিয়ে যায়, তবে কেউই বেরোয় না।

ডাক পড়ে প্রাতরাশের। গরম গরম ফুলকো লুচি আর মনভোলানো স্বাদের ছোলার ডাল খেয়ে নিই। কক্ষনও চারটের বেশি লুচি না খাওয়া আমি, নিমেষের মধ্যে ৭টা লুচি পেটে পুরে ফেলি! এটা কি টুসুর রান্নার জাদু, না কি জলদাপাড়ার জাদু, ভাবতে থাকি।

মন খারাপ গ্রাস করতে থাকে ধীরে ধীরে। এ বার যে বেরিয়ে পড়তে হবে। দশ দিন পর ফের ডাকছে কলকাতা, ডাকছে নিজের বাড়ি।

কিন্তু মন যে কিছুতেই জলদাপাড়া রাইনো কটেজ ছেড়ে যেতে চায় না। মিঠুনদা-প্রদীপবাবু-টুসুদের সঙ্গে গড়ে ওঠা নতুন সম্পর্ক থাকবে। আবার আসব এখানে, হয়তো বছর শেষের আগেই।

***

জলদাপাড়া রাইনো কটেজে রাত্রিবাসের জন্য যাবতীয় আয়োজন করে দিতে পারে ট্র্যাভেলিজম (Travelism)। যোগাযোগ করুন: 8276008189 অথবা 9903763296 নম্বরে।

আরও পড়তে পারেন

Leave a Reply

Your email address will not be published.