বঙ্গের মন্দির-পরিক্রমা: বোড়ালের ত্রিপুরসুন্দরী মন্দির

শুভদীপ রায় চৌধুরী

প্রায় ৭০ বছর পরে এখন আর হয়তো মেলানো যাবে না সেই গ্রামকে, যে গ্রাম হয়ে উঠেছিল সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’র নিশ্চিন্দিপুর। এখন সেখানে পুরোপুরিই শহরের ছোঁয়া। আর হবে নাই বা কেন। এই বোড়াল গ্রাম তো দক্ষিণ কলকাতার শহরতলি, গড়িয়ার খুব কাছে। আগে ছিল গ্রাম পঞ্চায়েত, এখন পুরসভা। 

এই বোড়াল দশমহাবিদ্যার তৃতীয় মহাবিদ্যা ষোড়শীর (শ্রীত্রিপুরসুন্দরী) অতি প্রাচীন পীঠস্থান। রামমোহন ও বিদ্যাসাগরের ভাবশিষ্য মনীষী রাজনারায়ণ বসুর জন্মস্থান। যদিও তাঁর জন্মভিটার কোনো চিহ্ন নেই এই গ্রামে।   

বোড়াল গ্রামের অধিষ্ঠাত্রী দেবী শ্রীত্রিপুরসুন্দরী। দেবীর ভৈরব শ্রীশ্রীপঞ্চানন্দদেব।  দেবীর বর্তমান মন্দিরটি বয়সে নবীন হলেও, বোড়ালে শ্রীত্রিপুরসুন্দরী যে প্রাচীন কাল থেকেই প্রতিষ্ঠিতা, তার একাধিক প্রমাণ আবিষ্কৃত হয়েছে। সম্ভবত শ্রীত্রিপুরসুন্দরী মন্দিরের প্রথম প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ত্রয়োদশ শতকে। সেন বংশের কোনো রাজা এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ সংগ্রহালয়ের পক্ষ থেকে ১৯৪০ সালে ত্রিপুরসুন্দরী মন্দিরের প্রাচীন ধ্বংসস্তূপ খনন করা হয়। খনন করে মন্দিরের ভিত্তির কয়েকটি স্তর পাওয়া যায়। বিভিন্ন স্তরের গঠনশৈলী ও কারুকার্যের মধ্যে পার্থক্য লক্ষ করে ঐতিহাসিকরা বলেন, এই মন্দিরের গঠনভঙ্গিতে বিভিন্ন যুগের ছাপ রয়েছে। অর্থাৎ বিভিন্ন যুগে যাঁরা এই মন্দিরের সংস্কার করেছিলেন তাঁরা তাঁদের রুচি ও স্থাপত্যশিল্পের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সেই কাজ করেছিলেন।  

মন্দিরের প্রবেশফটক।

মন্দিরের স্তূপ এবং পার্শ্ববর্তী স্থান খনন করে নানা পুরাতাত্ত্বিক উপাদান পাওয়া যায়। এই উপাদানগুলির সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে শুরু করে খ্রিস্টাব্দ সপ্তম-অষ্টম শতক পর্যন্ত। প্রাপ্ত উপাদানগুলির মধ্যে রয়েছে দু’টি অপূর্ব সুন্দর বিষ্ণুমূর্তি, পাথরে খোদাই অঙ্কুশ চিহ্নিত বিষ্ণুর পাদপদ্ম, বিভিন্ন আকৃতির চিত্রিত ইট, পোড়ামাটির ফলক, পোড়ামাটির অপ্সরামূর্তি, রাক্ষসের মুখ, নারী-পুরুষের মিথুনমূর্তি, ফলকে উৎকীর্ণ জাতক-কাহিনি, মহিষ ও হরিণের শিলীভূত শিং, মাটির মাল্যদান, বেলেপাথরের একটি অপূর্ব তারামূর্তি, বড়ো বড়ো পাথরের জালার অংশ, বিভিন্ন প্রকারের মৃৎপাত্র ও প্রস্তরপাত্রের ভগ্নাংশ। চিত্রিত ইটগুলির উপর খচিত রয়েছে দেবদেবীর মূর্তি, মঙ্গলঘট, আঙুরের স্তবক, পদ্মফুল প্রভৃতি কারুকার্য। ওই তারামূর্তিটি ত্রিপুরসুন্দরী মঠে রক্ষিত আছে।  

এক সময়ে বোড়ালের মন্দির-সীমানার পূর্ব দিকে আদিগঙ্গা প্রবাহিত ছিল। দেশ-দেশান্তর থেকে বহু তীর্থযাত্রী নৌকাযোগে আসতেন তীর্থস্থান দর্শন করতে। সওদাগররা নৌকাযোগে আদিগঙ্গার এই প্রবাহপথ ধরে গড়িয়া, বোড়াল প্রভৃতি অঞ্চল অতিক্রম করে তমলুকের প্রধান বন্দরে যেতেন। সেই সময় তাঁরা এই ত্রিপুরসুন্দরী মন্দিরে পুজো দিতেন ও রাত্রিবাস করতেন। তাঁরাই মন্দিরের সংস্কার করেছিলেন এবং এই দেবীপীঠের উন্নতি সাধন করেছিলেন।

ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে পূর্ববঙ্গের ধনাঢ্য জমিদার জগদীশ ঘোষ নৌকাযোগে তীর্থভ্রমণ বেরিয়ে এই পীঠস্থানে আসেন এবং দেবীর নির্দেশেই তিনি মন্দির সংস্কার করে বোড়াল গ্রামে বসবাস শুরু করেন। তিনি দিল্লির সম্রাটের অধীন সুবেদারের কাছ থেকে বোড়াল গ্রামের পত্তনি নিয়ে ব্রাহ্মণ, কুলীন কায়স্থ, ধোপা, নাপিত, কুম্ভকার, মালাকার প্রভৃতিদের বসতি বসান। জঙ্গলাকীর্ণ ইটের স্তূপ খনন করে ধ্বংসপ্রাপ্ত ত্রিপুরসুন্দরী মন্দিরটির সংস্কার করেন এবং সেখানে পূজাপাঠের ব্যবস্থা করেন।

পরবর্তী কালে ঘোষ বংশীয় জমিদার হীরালাল ঘোষ বিদেশ থেকে বোড়ালে ফিরে দেবীর মন্দিরের সংস্কার করেন। তিনি গ্রামের কয়েক জন ব্যক্তিকে নিয়ে সেবায়েতমণ্ডলী তৈরি করেন। সেবায়েতগণের মধ্যে সত্যনারায়ণ ভট্টাচার্য, ভূতনাথ মুখোপাধ্যায়, বসন্ত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, চন্দ্রকুমার মিত্র প্রমুখ ছিলেন।

পরে ১৩৪১ বঙ্গাব্দে আইন মোতাবেক এক সাধারণ সভায় ৭ জন ব্যক্তিকে নিয়ে ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়। এই কমিটি মন্দিরের বহু উন্নতিমূলক কাজ করে। বিশেষ করে প্রায় চার হাজার টাকা খরচ করে দেবীর অষ্টধাতুর মূর্তি তৈরি করা হয়। এই মূর্তি নির্মাণে সাহায্য করেছিলেন কলকাতার বিখ্যাত ছাতুবাবু লাটুবাবুর সুযোগ্য বংশধর নীরজেন্দ্র নাথ দেব। নবনির্মিত বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা হয় ২৩ মাঘ ১৩৪১ বঙ্গাব্দ (৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ) শুক্লা তৃতীয়ার দিন। 

সন্ধ্যায় মন্দিরচত্বর।

১৯৪৯ সালে কলকাতা হাইকোর্টের অ্যাডভোকেটদের পরামর্শে ট্রাস্টি বোর্ডের পরিবর্তে প্রতি বছর পরিবর্তন সাপেক্ষে কমিটি নিয়োগ করার প্রথা চালু হয়। দেবীর নতুন নবরত্ন মন্দির নির্মাণ করা হয়। নয় চূড়াবিশিষ্ট মন্দিরের উচ্চতা প্রায় ৫২ ফুট। মন্দিরের সম্পূর্ণ নকশা করেন মার্টিন অ্যান্ড বার্ন কোং-এর ইঞ্জিনিয়ার ঢাকুরিয়া নিবাসী সরোজ কুমার চট্টোপাধ্যায়। 

এখন দেবীপীঠের চার দিকে দেওয়াল দেওয়া হয়েছে এবং একটি তীর্থযাত্রী নিবাস তৈরি করা হয়েছে। মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলে একটি সংগ্রহশালা তৈরি করা হয়েছে। বোড়াল গ্রামে পাওয়া বিভিন্ন প্রত্নতত্ত্বের নিদর্শন এখানে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

বোড়াল গ্রামে রয়েছে বেশ কিছু দিঘি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সেনদিঘি। এই সেনদিঘিরই পশ্চিম দিকে ত্রিপুরসুন্দরীর ভৈরব নামে খ্যাত লৌকিক দেবতা পঞ্চানন্দের মন্দির।

ত্রিপুরসুন্দরী বিগ্রহ।

মন্দির খোলার সময়

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মন্দির খোলা থাকে সকাল ৬টা থেকে দুপুরে ভোগ নিবেদনের আগে পর্যন্ত। বিকাল ৫টায় মন্দির আবার খোলে, আরতির পর ৭টায় বন্ধ হয়ে যায়।

তবে কোভিড পরিস্থিতিতে শারীরিক দূরত্ববিধি মেনে মন্দিরে ভক্তদের পুজো নেওয়া হচ্ছে। ভক্তরা মূল মন্দিরের বাইরে থেকে পুজো দিচ্ছেন। স্যনিটাইজারের ব্যবস্থাও রয়েছে। পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। প্রয়োজনে আরও কড়া বিধিনিষেধ চালু হতে পারে।

কী ভাবে যাবেন

দক্ষিণেশ্বর–দমদম থেকে কবি সুভাষগামী মেট্রো ধরলে নামতে হবে কবি নজরুল-এ। সেখান থেকে অটোয় বোড়াল। কিংবা কলকাতা শহরের যে কোনো প্রান্ত থেকে বাসে গড়িয়া মোড় পৌঁছে সেখান থেকে অটোয় বোড়াল। অথবা শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার ট্রেন ধরে গড়িয়া স্টেশন। স্টেশনের কাছ থেকে অটোয় গড়িয়া শীতলামন্দির, সেখান থেকে অটোয় বোড়াল।

আর কী দেখবেন

আগেই বলেছি, সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’র নিশ্চিন্দিপুর ছিল এই বোড়াল। সুতরাং একটু যাওয়া যেতেই পারে ‘হরিহর-সর্বজয়া’র বাড়িতে। না, হতাশ হবেন। কোনো কিছুই আর মেলাতে পারবেন না। মুখুজ্জেদের যে বাড়িতে শ্যুটিং হয়েছিল, সেই বাড়ি আর চেনা যায় না। কাছেই সত্যজিৎ রায়ের একটি আবক্ষ মূর্তি বুঝিয়ে দেবে আপনি শ্যুটিং লোকেশনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। জায়গাটার নাম এখনও বকুলতলাই আছে, তবে সেই বকুল গাছটা আর নেই যে গাছের নীচে প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে অপু-দুর্গা আশ্রয় নিয়েছিল। তবে রয়ে গেছে সেই জোড়া শিবমন্দির, গ্রাম ছাড়ার আগে যেখানে হরিহর প্রার্থনা করেছিল আর যার সামনের মাঠেই বায়স্কোপ দেখেছিল অপু-দুর্গা। এখানে দু’ দণ্ড দাঁড়িয়ে মনে মনে ফিরে যেতে ইচ্ছে করবে প্রায় সাত দশক আগের সময়ে।

(সূত্র: খবরঅনলাইন)   

আরও পড়ুন: বঙ্গের মন্দির-পরিক্রমা: ব্যারাকপুর অন্নপূর্ণা মন্দির

আরও পড়তে পারেন

Leave a Reply

Your email address will not be published.