বঙ্গের মন্দির-পরিক্রমা: ব্যারাকপুর অন্নপূর্ণা মন্দির

শুভদীপ রায় চৌধুরী

অন্য দেবদেবীর তুলনায় এই বঙ্গে অন্নপূর্ণা মন্দিরের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তারই মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যারাকপুর তালপুকুর অঞ্চলের অন্নপূর্ণা মন্দির। ব্যারাকপুর- টিটাগড় অঞ্চলের প্রাচীন নাম চানক। তাই এই মন্দির চানক মন্দির নামেও পরিচিত।

ব্যারাকপুরের এই মন্দির দেখতে অবিকল দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দিরের মতো। মন্দির-স্থাপত্যে সাদৃশ্য থাকার একটা বড়ো কারণ হল, এই দুই মন্দিরের স্রষ্টা একই পরিবার। ব্যারাকপুরের অন্নপূর্ণা মন্দির নির্মাণ করেছিলেন রানি রাসমণির কনিষ্ঠা কন্যা তথা মথুরমোহন বিশ্বাসের পত্নী জগদম্বা দেবী। দিনটা ছিল ১২ এপ্রিল ১৮৭৫ সাল।

ব্যারাকপুরের এই শিবশক্তি অন্নপূর্ণা মন্দির নির্মিত হয়েছিল দক্ষিণেশ্বরের মন্দির নির্মাণের ঠিক কুড়ি বছর পরে। মথুরমোহন বিশ্বাসের ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করতেই জগদম্বা তৈরি করেছিলেন এই মন্দির। এই মন্দির নির্মাণের পেছনে একটা কাহিনি আছে।

১৮৪৭-এ রানি রাসমণি তাঁর জামাই মথুরমোহন বিশ্বাস, আত্মীয়স্বজন ও দাসদাসীদের নিয়ে বজরায় কাশীযাত্রা করেছিলেন। যাত্রা শুরুর দিন রাতেই তিনি স্বপ্নাদেশ পান – কাশী না গিয়ে গঙ্গার পাড়েই মন্দির প্রতিষ্ঠা করে নিত্যপুজোর ব্যবস্থা করা হোক। রানি কাশীযাত্রা স্থগিত করে ফিরে আসেন। পরে ১৮৫৫ সালে দক্ষিণেশ্বরে ভবতারিণীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। শোনা যায়, অন্নপূর্ণা-দর্শন না হওয়ায় মথুরমোহনের মনে মনে ইচ্ছে ছিল দেবী অন্নপূর্ণার মন্দির প্রতিষ্ঠা করার। কিন্তু তাঁর জীবদ্দশায় তা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ করেন তাঁর স্ত্রী, রানি রাসমণির ছোটো মেয়ে জগদম্বাদেবী। মন্দির প্রতিষ্ঠার যাবতীয় দায়িত্ব পালন করেছিলেন তাঁদের পুত্র দ্বারিকানাথ বিশ্বাস।  

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই মন্দিরটি তৈরি করতে প্রায় তিন লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল। মন্দিরের মূল প্রবেশপথ পূর্ব দিকে। পঙ্খের কাজ যুক্ত ন’টি চূড়াবিশিষ্ট নবরত্ন মাতৃমন্দির, ছ’টি আটচালার শিবমন্দির, দু’টি নহবতখানা, নাটমন্দির, ভোগের ঘর, গঙ্গায় স্নানঘাট ইত্যাদি তৈরি হয়েছিল। ছ’টি শিবমন্দির যথাক্রমে কল্যাণেশ্বর, কাম্বেশ্বর, কিন্নরেশ্বর, কেদারেশ্বর, কৈলাসেশ্বর, ও কপিলেশ্বর।

শিব ও অন্নপূর্ণার অষ্টধাতুর বিগ্রহ।

মন্দিরের গর্ভগৃহে অধিষ্ঠিত শিব ও অন্নপূর্ণার বিগ্রহ অষ্টধাতুর। রৌপ্যশতদল আসীনা দেবীর একটি পা ঝোলানো, বাঁ হাতে অন্নপাত্র আর ডান হাতে হাতা। মহাদেব পাশে দাঁড়িয়ে, ভিক্ষাপাত্র নিয়ে। দেবীকে পরানো হয় বেনারসি শাড়ি ও সোনার গয়না। মাতৃমূর্তি দক্ষিণমুখী।

অন্নপূর্ণা মন্দির তোরণদ্বারের ওপর স্থাপিত রয়েছে এক সিংহমূর্তি। কথিত আছে, এই সিংহমূর্তি নিয়ে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকের সঙ্গে বিবাদ সৃষ্টি হয়েছিল। ওই সিংহমূর্তি সরিয়ে নেওয়ার জন্য নানা ভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। কারণ ব্রিটিশদের দাবি ছিল, সিংহ তাদের রাজশক্তির প্রতীক। বিবাদ গড়ায় আদালত পর্যন্ত। তবে আইনি লড়াইয়ে জয় হয়েছিল রাসমণির পরিবারের।  

ব্যারাকপুরে অন্নপূর্ণা মন্দির প্রাঙ্গণে রয়েছে ছ’টি শিবমন্দির। এর পিছনেও একটি কাহিনি রয়েছে বলে জানা যায়। জগদম্বা দেবী মন্দিরপ্রাঙ্গণে বারোটি শিবমন্দিরই নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি স্বপ্নাদেশ পান যে তিনি যেন তাঁর মায়ের অতুলনীয় কীর্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মন্দির নির্মাণ না করেন। এর পরই তিনি ছ’টি মন্দির নির্মাণ করেন।

ব্যারাকপুর মন্দিরের নির্মাণ শুরু হয় সিবি স্টুয়ার্টের কুঠিবাড়ি কিনে। মূল মন্দিরের সামনে অবস্থিত নাটমন্দিরের কারুকার্য অনেক বেশি। এর থামে গথিক স্থাপত্যের প্রভাব রয়েছে। মন্দিরের ধনুকাকৃতি খিলানে রয়েছে সূক্ষ্ম অলংকরণ ও নকশা। মন্দিরের পাশেই চাঁদনি রীতির গঙ্গার ঘাট, যা রানি রাসমণি ঘাট নামে পরিচিত। এই ঘাটে মহিলাদের সজ্জাবদলের কক্ষ আছে। শোনা যায়, এই ঘাটে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ শিখ সৈন্যদের সঙ্গে স্নান করেছিলেন।

কথা হচ্ছিল মথুরমোহন বিশ্বাসের উত্তরসুরি বিশ্বজিৎ বিশ্বাসের সঙ্গে। তিনি জানালেন, এই শিবশক্তি অন্নপূর্ণা মন্দিরে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব মোট চার বার এসেছিলেন – জমি নির্বাচন, ভিত্তিস্থাপন, মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় এবং শেষ বার ১৮৮২ সালে উলটোরথ উপলক্ষ্যে। মন্দির প্রতিষ্ঠার দিন নৌকাযোগে এসে তিনি মন্দিরপ্রাঙ্গণের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে বেলতলায় বসেছিলেন। সেই বেলগাছটি আজও অক্ষত রয়েছে।

১৮৮৩ সালের ২২ ডিসেম্বর দক্ষিণেশ্বরে ভক্তদের সঙ্গে কথা বলার সময় চানকে অন্নপূর্ণা মন্দির প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গ পেড়েছিলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ। বলেছিলেন, “আমি চানকে অন্নপূর্ণা প্রতিষ্ঠার সময় দ্বারিকবাবুকে বলেছিলাম বড় দীঘিতে মাছ আছে গভীর জলে। চার ফেল, সেই চারের গন্ধে ঐ বড় মাছ আসবে। এক একবার ঘাই দেবে। প্রেম ভক্তি রূপ চার।” (কথামৃত, ৫ম ভাগ, দ্বাদশ খণ্ড, ৫ম পরিচ্ছেদ।)

তোরণদ্বারের ওপর স্থাপিত রয়েছে সিংহমূর্তি।

এই মন্দিরে প্রতিদিন দেবীকে অন্নভোগ দেওয়া হয়। এবং ভোগে মাছ থাকা আবশ্যিক। অন্নপূর্ণাপুজোর দিন ভোগে থাকে পোলাও, সাদাভাত, পাঁচ রকমের ভাজা, পাঁচ রকমের মাছ, তরকারি, চাটনি, পায়েস ইত্যাদি। প্রতি মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে বিশেষ পুজো হয়। তা ছাড়া কালীপুজোর পরের দিন এবং অন্নপূর্ণাপুজোর দিন অন্নকূট উৎসব পালন করা এই মন্দিরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।  প্রায় একশো কেজি চালের অন্নকূট হয় এই মন্দিরে।

কী ভাবে যাবেন

শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ট্রেনে ব্যারাকপুর এসে সেখান থেকে অটো ধরে মন্দিরে। আর কলকাতা থেকে বাসে ব্যারাকপুর গেলে নামতে হবে তালপুকুরে। সেখান থেকে রিকশায় বা মিনিট সাতেকের হাঁটা পথে পৌঁছে যান মন্দিরে। গাড়িতে ব্যারাকপুরের তালপুকুরে এসে বাঁ দিকের রাস্তা ধরে পৌঁছে যান মন্দিরে।

আর কী দেখবেন

ব্যারাকপুরে ঐতিহ্যশালী অন্নপূর্ণা মন্দির থেকে গান্ধীঘাট খুব বেশি দূরে নয়। দেখে নিন গান্ধীঘাট ও গান্ধী স্মৃতি-মন্দির তথা মিউজিয়াম। ৬টি গ্যালারি আর ৭ হাজার গ্রন্থের লাইব্রেরি নিয়ে এই সংগ্রহশালা। ধীরেন্দ্রনাথ ব্রহ্মের আঁকা ১০০ ফুটের দেওয়াল-চিত্রে চিত্রিত হয়েছে গান্ধীর জীবনী। এ ছাড়া রিভার সাইড রোডে রয়েছে মঙ্গল পাঁড়ে উদ্যান এবং বি টি রোডে ধোবিঘাটে মঙ্গল পাঁড়ের স্মৃতিতে তৈরি শহিদ স্মারক।

প্রয়োজনীয় পরামর্শ

ব্যারাকপুরে গেলে স্টেশন রোডে দাদা-বউদির বিরিয়ানির স্বাদ নিতে ভুলবেন না।

আরও পড়ুন: দিল্লি দেখো: প্রিয়তমা পত্নী মাহ বানুর স্মৃতিতে গড়া আবদুল রহিমের স্মৃতিসৌধ

আরও পড়তে পারেন

Leave a Reply

Your email address will not be published.