চেনাবৃত্তের বাইরে: পশ্চিমঘাটের কোলে সাওয়ন্তওয়াড়ী

  • by

ভ্রমণঅনলাইন ডেস্ক: মুম্বই থেকে গোয়া যাওয়ার পথে আরব সাগরের তটে কিংবা পশ্চিমঘাটের কোলে এমন বহু জায়গা আছে, যা পর্যটকদের দৃষ্টি এড়ায় না। সুযোগ পেলেই তাঁরা সে সব জায়গায় ছুটে যান। কোঙ্কন উপকূলের সে সব জায়গা মহারাষ্ট্রের পর্যটন মানচিত্রে ধীরে ধীরে স্থান করে নিয়েছে এবং ক্রমশই তারা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কিন্তু পর্যাপ্ত পর্যটনসম্পদ নিয়েও আজও একটা জায়গা ব্রাত্যই থেকে গিয়েছে। মুম্বই-গোয়া ট্রেনপথে বা সড়কপথে সেখানে আমরা যাত্রা-বিরতি ঘটাই বড়োজোর চা পানের জন্য। কিন্তু আর নয়, এ বার পরিকল্পনা করেই চলুন সেই জায়গায়। ভ্রমণঅনলাইন গ্যারান্টি দিচ্ছে, সেখানে গেলে ঠকবেন না।

ব্রিটিশের করদ রাজ্য ছিল সাওয়ন্তওয়াড়ী। তারই রাজধানী ছিল এই সাওয়ন্তওয়াড়ী শহর। এর আগের নাম ছিল সুন্দরওয়াড়ী। শেষ পর্যন্ত এই রাজ্যের শাসকদের পদবি অনুসারে রাজ্যের নাম হয় সাওয়ন্তওয়াড়ী। ১৯৪৭-এ স্বাধীনতার পর এই রাজ্য ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। কোঙ্কনিভাষীদের রাজ্য বলে প্রথমে এটিকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করার পরিকল্পনা ছিল। শেষ পর্যন্ত এই রাজ্যকে পুরোনো রত্নগিরি জেলায় ঢোকানো হয়। পরে রত্নগিরি জেলা ভেঙে সিন্ধুদুর্গ জেলা তৈরি হলে, সাওয়ন্তওয়াড়ী সিন্ধুদুর্গ জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়।            

তা হলে চলুন ঘুরে আসা যাক সাওয়ন্তওয়াড়ী।

উপভোগ করুন

পশ্চিমঘাট পাহাড়ের পাদদেশে সাওয়ন্তওয়াড়ী। চার দিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা, মাঝে মহারাষ্ট্রের এই মিউনিসিপ্যাল শহর। রাজ্যের অন্য শহরগুলির তুলনায় ছিমছাম, নিরিবিলি, শান্ত। চেষ্টা করুন মোতি তালাওয়ের পাড়ে থাকতে। সকাল-সন্ধ্যায় হাঁটাহাঁটি করুন, ভালো লাগবে। আর নানা মালবানি মশলাদার পদের স্বাদ নিতে ভুলবেন না।

কী দেখবেন

(১) মোতি তালাও – শহরের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত এই বিশাল জলাশয় ১৮৭৪ সালে তৈরি। তালাওয়ের মাঝখান দিয়ে রয়েছে সেতু। এবং তালাওকে ঘিরে রয়েছে হাঁটার জন্য বাঁধানো পথ। লেকের জলে বোটিং করতে পারেন।

সাওয়ন্তওয়াড়ী প্রাসাদ।

(২) রাজওয়াড়া (রাজকীয় প্রাসাদ বা সাওয়ন্তওয়াড়ী প্যালেস) – মোতি তালাওয়ের বিপরীতে, রাজা তৃতীয় খেমসাওয়ন্ত ভোঁসলের (১৭৫৫-১৮০৩) আমলে তৈরি এই প্রাসাদ। বর্তমান প্রবেশফটকটি তৈরি হয় ১৮৯৫-তে। কোঙ্কনি ও ইউরোপীয়, দুই স্থাপত্যশৈলীর মিশেল এই প্রাসাদ। লালমাটির দু’ তলা প্রাসাদ সুচর্চিত বাগানের মাঝে। দেখে নিন রঙিন শিলিং-এর দরবার হল, ঝাড়বাতি, রাজাদের তৈলচিত্র, সিংহাসন, অস্ত্রশস্ত্র এবং অন্যান্য শিল্পকর্ম।

(৩) চিত্রালি – মোতি তালাও থেকে একটু পাহাড়ি পথে হেঁটে গেলেই চিত্রালি, রকমারি কাঠের খেলনার সম্ভার এখানে। দেখে আপনি বিস্মিত হবেন। এই অঞ্চলেই চিতারি সম্প্রদায়ের মানুষদের বসতি। এঁরাই এ সব সামগ্রীর শিল্পী। কাঠ কেটে এঁরা যা খুশি বানাতে পারেন। তবে এঁদের বানানো ফল দেখে আপনি ঠকে যেতে পারেন। দেখে মনে হবে একেবারে টাটকা ফল।

(৪) শিল্পগ্রাম – ১৮৯১ সালে নির্মিত সাওয়ন্তওয়াড়ীর রঘুনাথ মার্কেটের একেবারে প্রতিরূপ এই শিল্পীদের গ্রাম এই শিল্পগ্রাম। সাওয়ন্তওয়াড়ীর হস্তশিল্প সম্পর্কে পর্যটকদের অবহিত করতেই এখানকার মিউনিসিপ্যালিটি এই শিল্পগ্রাম তৈরি করেছে। এখানে পর্যটকরা স্থানীয় হস্তশিল্প কেনাকাটা করতে পারেন, মালবানি রান্নার স্বাদ নিতে পারেন, এখানকার লোকসংস্কৃতিমূলক অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারেন।         

নরেন্দ্র ডোঙ্গারের পথে দর্শন।

(৫) নরেন্দ্র ডোঙ্গার – ডোঙ্গার মানে পাহাড়। সাওয়ন্তওয়াড়ী প্রাসাদ থেকে আড়াই কিমি। অনেকটাই গাড়ি যায়, তার পর হেঁটে কিছুটা উঠতে হয়। পাহাড়ি পথে নানা ধরনের গাছগাছালির মধ্য দিয়ে সেই ট্রেকিং মন ভালো করে দেয়। খেমসাওয়ন্তদের রাজপ্রাসাদ আগে এখানেই ছিল। পাহাড়ের মাথায় একটি বাগান আছে। পাহাড়শীর্ষে যাওয়ার পথেই পড়বে একটি হনুমান মন্দির।

(৬) আত্মেশ্বর তালি – সাওয়ন্তওয়াড়ী প্রাসাদ থেকে প্রায় দু’ কিমি। এখানে একটি বিশাল চৌবাচ্চার মতো রয়েছে, যেখানে মাটি থেকে ৪ ফুট উপরে ৩৬৫ দিন জল থাকে। কখনও কখনও এই জল চৌবাচ্চা ছাপিয়ে যায়। শোনা যায়, সাড়ে তিনশো বছর আগে শ্রী দামোদর স্বামী ‘জয় মাতে ভাগীরথী’ বলে মাটি লক্ষ্য করে তাঁর ত্রিশূলটি ছুড়ে দেন। সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে জল বেরোতে শুরু করে। ব্যাস, সে দিন থেকেই চলছে সেই জলপ্রবাহ, যা আজ আত্মেশ্বর তালি নামে পরিচিত। পাশেই আত্মেশ্বর মন্দির। এই মন্দির দু’টি শিবলিঙ্গ বিরাজমান।

হোটেল বুকিং-এর জন্য       

Booking.com

সাওয়ন্তওয়াড়ীর আশেপাশে

পিঙ্গুলির শিল্পকলা।

(১) পিঙ্গুলি – সাওয়ন্তওয়াড়ী থেকে ১৮ কিমি দূরে পিঙ্গুলি গ্রামে রয়েছে ঠকর আদিবাসী কলা অঙ্গন – গঙ্গাবনে পরিবার পরিচালিত একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও মিউজিয়াম। মহারাষ্ট্রের ঠকর আদিবাসীদের লোকসংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখার একটি উদ্যোগ। এখানে দেখা যাবে পুতুলনাচ এবং ‘চিত্রকথি’ – আঁকা দেখিয়ে গানের মাধ্যমে ঘটনা বর্ণনা (বাংলার পটচিত্রের মতো)। মিউজিয়ামে রয়েছে নানা ধরনের পুতুল, চিত্রাঙ্কন, বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি। এর মধ্যে কিছু জিনিস কয়েক শো বছরের পুরোনো।

(২) আমবোলি – শৈলশহর আমবোলি ৩০ কিমি দূরে। আমবোলির সৌন্দর্য উপভোগ করলে যেতে হবে ভরা বর্ষায়। আমবোলির পাহাড় তখন অসংখ্য জলপ্রপাতে ভরে থাকে। এখানে দেখে নিন হিরণ্যকেশি নদীর উৎস এবং সেখানকার মন্দির, কবলেশ্বেত পয়েন্ট, মহাদেবগাড পয়েন্ট, শিরগাওকর পয়েন্ট ইত্যাদি।

(৩) বেনগুরলা – ২৯ কিমি দূরে। বেনগুরলায় আরব সাগরের তীর ধরে একটার পর একটা সৈকত। তাদের মধ্যে সর্বোত্তম ক্যাজুরিনায় ছাওয়া সাগরেশ্বর সৈকত। এই সৈকতে রয়েছে সাগরেশ্বর শিবমন্দির। এখান থেকে ৩ কিমি উত্তরে নববাগ সৈকত ও বেনগুরলা লাইটহাউস। এখান থেকে আরও ৮ কিমি উত্তরে আরও এক সুন্দরী সৈকত, বয়ঙ্গনী। সাগরেশ্বর থেকে দক্ষিণে ৯ কিমি দূরে মোচেমাড় সৈকত। বেনগুরলার আশেপাশে দেখে নিন গণপতি মন্দির, বিঠোবা মন্দির ইত্যাদি। বেনগুরলা থেকে ২০ কিমি দূরে তেরেখোল ফোর্ট দেখে ফিরুন সাওয়ন্তওয়াড়ী, দূরত্ব ৩৪ কিমি।

সিন্ধুদুর্গ ফোর্ট।

(৪) সিন্ধুদুর্গ ফোর্ট ও তারকার্লি সৈকত – সাওয়ন্তওয়াড়ী থেকে ৫১ কিমি উত্তরে মালবান। সেখান থেকে বোটে চলুন সিন্ধুদুর্গ, আরব সাগরের মাঝে দুর্গ। ১৬৬৪ থেকে ১৬৬৭ সালের মধ্যে তৈরি। ছত্রপতি শিবাজিকে উৎসর্গ করা একটি মন্দিরও আছে দুর্গে। ফিরে এসে চলুন চার কিমি দূরে মহারাষ্ট্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৈকত তারকার্লি।                                            

কী ভাবে যাবেন

বেড়াতে বেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছোনোটাই বড়ো কথা নয়। যাত্রাপথের সৌন্দর্য উপভোগ করাও ভ্রমণের একটা অঙ্গ। ট্রেন ও সড়কপথ, মুম্বই থেকে দু’ ভাবেই পৌঁছোনো যায় সাওয়ন্তওয়াড়ী। তবে হাতে একটু সময় নিয়ে এ পথে দিনের বেলায় ভ্রমণ করাই উচিত। পশ্চিমঘাট পর্বতমালার বুক চিরে ছুটে গিয়েছে কোঙ্কন রেলপথ ও মুম্বই-গোয়া জাতীয় সড়ক। দু’ চোখ ভরে এই পথের অনাবিল, বিস্ময় জাগানো সৌন্দর্যের স্বাদ নিতে ভ্রমণ করুন দিনের বেলায়। 

(১) ট্রেনপথে – মুম্বই থেকে সাওয়ন্তওয়াড়ী যাওয়ার জন্য দিনে-রাতে অনেক ট্রেন আছে। মান্ডবী এক্সপ্রেস মুম্বই সিএসটি থেকে ছাড়ে সকাল ৭.১০ মিনিটে, সাওয়ন্তওয়াড়ী রোড পৌঁছোয় সন্ধে ৭.২০ মিনিটে। মুম্বই-মাডগাঁও ডাবলডেকার লোকমান্য টিলক টার্মিনাস থেকে ছাড়ে ভোর ৫.৫২ মিনিটে, সাওয়ন্তওয়াড়ী রোড পৌঁছোয় বিকেল ৩.৪০  মিনিটে। সব ট্রেনের বিস্তারিত সময় জানার জন্য দেখে নিন https://erail.in/ -এ।

কোঙ্কন রেলপথ।

(২) আর মুম্বই থেকে সড়কপথে দু’ ভাবে যেতে পারেন –

(ক) এশিয়ান হাইওয়ে ৪৭ দিয়ে, পুনে-সাতারা-কারাড-কোলহাপুর হয়ে, দূরত্ব ৫৩০ কিমি। দ্বিতীয় পথের তুলনায় এই পথে দূরত্ব বেশি, কিন্তু সময় লাগে কম। এই পথে সময় লাগে কমবেশি ৯ ঘণ্টা।  

(খ) আর দ্বিতীয় পথ মুম্বই-গোয়া জাতীয় সড়ক ৬৬ হয়ে, দূরত্ব ৪৮২ কিমি। এই পথে মাঝেমাঝেই ঘাট রোড আছে তাই সময় কিছু বেশি লাগে। এই পথে সময় লাগে কমবেশি ১১ ঘণ্টা। তবে পথের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে এই পথ ধরাই বাঞ্ছনীয়।

মুম্বই থেকে বাসে বা গাড়ি ভাড়া করে চলে আসুন সাওয়ন্তওয়াড়ী।

আরও পড়ুন: চেনা বৃত্তের বাইরে: কাশীরাম দাসের সিঙ্গি গ্রাম

কোথায় থাকবেন

নানা দামের, নানা মানের বেসরকারি হোটেল, রিসর্ট আছে সাওয়ন্তওয়াড়ীতে। নেটে সার্চ করলে খোঁজ পেয়ে যাবেন।  থাকতে পারেন মহারাষ্ট্র পর্যটন উন্নয়ন নিগমের (এমটিডিসি) আমবোলি গ্রিন ভ্যালি বা তারকার্লি বিচ রিসর্টে। অনলাইন বুকিং: https://mtdcrrs.maharashtratourism.gov.in/। আমবোলি বা তারকার্লিতে থেকে ঘুরে নিতে পারেন সাওয়ন্তওয়াড়ী।   

হোটেল বুকিং-এর জন্য      

Booking.com

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।