ঘরে বসে মানসভ্রমণ: হিমালয়ের কোলে কসৌলি

ভ্রমণ অনলাইন ডেস্ক: বিধু বিনোদ চোপরার ‘1942 a love story’  সিনেমাটা দেখে অনেকেই হিমাচলের এই জায়গাটার প্রেমে পড়ে যান। মনে মনে ভাবেন, এ বার হিমাচল গেলে অবশ্যই এই জায়গাটায় যাবেন। কিন্তু সত্যি সত্যি যখন হিমাচল বেড়াতে যাওয়া হয়, তখন কালকায় নেমেই এক ছুটে শিমলা। সেখান থেকে হয় কিন্নর-কৈলাস, কিংবা লাহুল-স্পিতি অথবা কুলু-মানালি। কিংবা একেবারেই শিমলার সঙ্গে সম্পর্কহীন ডালহৌসি-খাজিয়ার। কালকার অদূরেই এত সুন্দর জায়গাটা বাঙালির কাছে ব্রাত্য হয়ে পড়ে থাকে,। তবে দিল্লি-চণ্ডীগড়ের মানুষজন গরমে এখানে ভিড় জমান। চলুন আজ সেই জায়গায় যাই। 

ভ্রমণ অনলাইন আজ মানসভ্রমণে নিয়ে যাচ্ছে কসৌলি, ১৯২৭ মিটার তথা ৬৩২২ ফুট উচ্চতায় শৈলশহর। শিমলা যাওয়ার পথে দু’-একটা দিন কাটিয়ে যান এখানে, ভালো লাগবে।

পাহাড়ের কোলে কসৌলি শহর।

উপভোগ করুন

সোলান জেলার কসৌলি মহিমাময় হিমালয়ের কোলে হিমাচলের আপাত নিরিবিলি অনিন্দ্যসুন্দর শৈলশহর। ব্রিটিশদের চোখে পড়েছিল এই নিরালা স্থানটি। ১৮৪২ সালে তৈরি হয় ক্যান্টনমেন্ট। আর এই ক্যান্টনমেন্টকে ঘিরেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে কসৌলি শহর। ক্রমে ক্রমে নাম ছড়িয়ে পড়ে কসৌলির। স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের বাসনায় ব্রিটিশরা ছুটে আসতেন এখানে। শুধু ব্রিটিশদের কাছেই নয়, গোটা পশ্চিমি দুনিয়ার মানুষের কাছে ছুটি কাটানোর অত্যন্ত প্রিয় গন্তব্য হয়ে ওঠে কসৌলি। সেই ব্রিটিশ-রাজের গন্ধ এখানে যেন লেগে আছে কসৌলির গায়ে – ঢালু ছাদের তিনকোনা দেওয়াল বিশিষ্ট বাড়ি, পাথুরে পথ। ওক, চির, পাইন, চেস্টনাট গাছে ছাওয়া নিরালা কসৌলি। কসৌলি থেকে উত্তরে দেখুন হিমালয়ের চোরচাঁদনি (৩৬৪৭ মিটার), আর দক্ষিণে চণ্ডীগড়ের আলোকমালা।

শহর ছোটো হলেও নৈসর্গিক শোভা নয়নাভিরাম। চেনা-অচেনা নানা পাখির কলকাকলিতে ভরে থাকে কসৌলি। লোয়ার ম্যাল থেকে আপার ম্যাল পর্যন্ত পথটুকু নানা গাছে ছাওয়া। এই পথে হেঁটে কসৌলি উপভোগ করুন।

Gilbert Trail.

গিলবার্ট ট্রেল।

(১) গিলবার্ট হিল – প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য। সানসেট পয়েন্ট থেকে কিছুটা এগিয়ে গেলেই পড়বে গিলবার্ট ট্রেল – চারিদিকে সবুজ, পাথুরে পথ দিয়ে দেড় কিমি হাঁটা – প্রকৃতির কোলে গিলবার্ট হিল। পাখি দেখারও আদর্শ জায়গা। পর্যটকদের পা খুব একটা পড়ে না। যখনই যান, সন্ধের মধ্যে ফিরে আসবেন।

(২) সানসেট পয়েন্ট – আপার ম্যালের কাছে, বাসস্ট্যান্ড থেকে ১ কিমি দূরে। সূর্যাস্তের সময় রঙের খেলা মন ভরিয়ে দেয়।  পরিষ্কার দিনে এখান থেকে চণ্ডীগড় দেখা যায়।    

(৩) মাঙ্কি পয়েন্ট – শহরের কেন্দ্র থেকে সাড়ে ৩ কিমি দূরে সাড়ে ৭ হাজার ফুট উচ্চতায় কসৌলির সব চেয়ে জনপ্রিয় সাইটসিয়িং স্থান। পাহাড়চুড়োয় এয়ার ফোর্স স্টেশনের মাঝে সঞ্জীবনী হনুমান মন্দির। পরিষ্কার দিনে এখান থেকে দেখুন তুষারাবৃত ধৌলাধার পাহাড়, সবুজ উপত্যকা দিয়ে বয়ে চলা শতদ্রু নদী। লোয়ার ম্যালের একেবারে শেষে নিজেদের নাম নথিভুক্ত করে এয়ার ফোর্স গার্ড স্টেশনের মধ্য দিয়ে মাঙ্কি পয়েন্টে যেতে হয়। বিকেল ৫টার মধ্যে ঢুকতে হয় এয়ার ফোর্স গার্ড স্টেশনে।         

christ church

ক্রাইস্ট চার্চ।

(৪) ক্রাইস্ট চার্চ – ম্যাল রোডে বাসস্ট্যান্ডের হিমাচলের সব চেয়ে প্রাচীন গির্জা। ১৮৫৩ সালে এর উদ্বোধন হয়। গির্জার স্থাপত্য দেখার মতো। আর দেখার হল এর ঘড়িটি। ভারতের সব চেয়ে প্রাচীন টাওয়ার টারেট (বুরুজ) ঘড়ি হিসাবে লিমকা বুক অফ রেকর্ডস-এ নাম উঠেছে।

(৫) সানরাইজ পয়েন্ট – কসৌলি এমন একটি জায়গা যেখান থেকে শুধু সূর্যাস্ত নয়, সূর্যোদয়ও দেখা যায়। লোয়ার ম্যাল অঞ্চলে। আগে নাম ছিল হাওয়া ঘর। 

আরও পড়ুন: ঘরে বসে মানসভ্রমণ: রন-ভূমির সদর ভুজ

(৬) কৃষ্ণ ভবন মন্দির – শহরের কেন্দ্রস্থলে। ইউরোপীয় ও ভারতীয় স্থাপত্যের মিশেলে ১৯২৬ সালে তৈরি শ্রীকৃষ্ণ মন্দির।

(৭) নাহরি মন্দির – শহর থেকে সাড়ে ৫ কিমি দুর্গা ও শিবের মন্দির। ১৫০ বছরের প্রাচীন এই মন্দির ‘যন্তর মন্তর’ বা ‘ছু মন্তর মহাদেব মন্দির’ নামেও খ্যাত।

(৮) সনোয়ার – শহর থেকে ৬ কিমি দূরে দেড়শো বছর আগে প্রতিষ্ঠিত লরেন্স স্কুল। পাইন, দেবদারুতে ছাওয়া স্কুল চত্বরে বিচরণ করুন, সেই ঔপনিবেশিক আমলের বাড়িগুলো দেখুন।

Road to Sunset Point

সানসেট পয়েন্টে যাওয়ার রাস্তা। ছবি সৌজন্যে কসৌলি ডট অর্গ।

(৯) গোর্খা ফোর্ট – কসৌলি থেকে ২৫ কিমি দূরে সুবাথু টাউনে। পাইন আর ইউক্যালিপটাসের বনবীথির মাঝে। গোর্খা যুদ্ধে ব্যবহৃত ১৮০ বছরের পুরোনো কামান রয়েছে এই ফোর্টে। ইতিহাসে আপনার যদি আগ্রহ থাকে আর আপনি যদি প্রকৃতি-প্রেমিক হন, তা হলে অবশ্যই যেতে হবে গোর্খা ফোর্টে।                          

কী ভাবে যাবেন

কসৌলির কাছের রেলস্টেশন কালকা। দিল্লি, কলকাতা ও মুম্বইয়ের সঙ্গে সরাসরি রেলপথে যুক্ত কালকা। ভারতের অন্য জায়গা থেকে এলে দিল্লিতে ট্রেন বদল করে আসতে হবে। চণ্ডীগড়েও ট্রেন বদল করে আসা যায়।

কলকাতা থেকে ট্রেন – হাওড়া-দিল্লি-কালকা মেল – হাওড়া ছাড়ে সন্ধে ৭.৪০-এ, কালকা পৌঁছোয় তৃতীয় দিন ভোর ৪.৩৫-এ।

snowfall in Kasauli

বরফে ঢাকা কসৌলি।

বিমানে সরাসরি চণ্ডীগড় এসে বা দিল্লি হয়ে চণ্ডীগড় এসে সেখান থেকে চলে আসুন কসৌলি।  

কালকা থেকে কসৌলি ২৪ কিমি, চণ্ডীগড় থেকে কসৌলি ৫৭ কিমি। গাড়ি ভাড়া করে চলে আসুন।

কালকা-শিমলা টয় ট্রেনে ধরমপুর এসে সেখান থেকে কসৌলি যেতে পারেন, দূরত্ব ১০ কিমি।     

Hotel Ros Common

হোটেল রস কমন।

কোথায় থাকবেন

থাকার সব চেয়ে ভালো জায়গা হিমাচল পর্যটনের হোটেল রস কমন। অনলাইন বুকিং https://himachaltourism.nic.in/।  এ ছাড়াও অনেক বেসরকারি হোটেল, রিসর্ট রয়েছে। নেট সার্চ করলে সন্ধান পেয়ে যাবেন।

জেনে রাখুন

ট্রেনের বিশদ তথ্যের জন্য দেখুন erail.in।   

Leave a Reply