গন্তব্য পশ্চিমবঙ্গ ভ্রমণ কাহিনি হেরিটেজ

পটের বিবি-সাহেব-গোলাম, চলুন পটের গ্রাম নয়া

সায়ন ভট্টাচার্য

“দাঁড়িয়া মাছের বিয়ে করাতে চলো গো রঙ্গিলা।

পুঁটি মাছ বলে আমি, তোমার কানের পাশা হব লো রঙ্গিলা।।

দাঁড়িয়া মাছের বিয়ে করাতে চলো গো রঙ্গিলা।

কাতলা মাছ বলে আমি, তোমার পালকি নয়ে যাবো লো রঙ্গিলা”।।

ন্যাড়া মাথা একরত্তি মেয়েটা, মায়ের সঙ্গে আধো-আধো গলা মিলিয়ে গেয়ে চলেছে গানটা। আলতো আদর করে দিতেই লজ্জায় একেবারে মায়ের বুকে মিশে গেল।

on the village path
গ্রামের পথে।

এসেছি পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলা ব্লকের অন্তর্গত নয়াগ্রামের পটুয়াপাড়ায়। হাওড়া থেকে খড়গপুর কিংবা মেদিনীপুর লোকালে বালিচক স্টেশন। বালিচক থেকে নয়াগ্রাম ১৮ কিমি। বাস কিংবা ট্রেকার মেলে এ পথে। নয়াগ্রাম নেমেই বাঁ দিকে লাল মোরামের রাস্তা চলে গিয়েছে দু’ পাশে সবুজে মোড়া ধানখেতের উপর দিয়ে। সেই নয়নলোভন পথে বেশ কিছুটা এগোতেই মোলাকাত সঞ্জয় চিত্রকরের সঙ্গে।

“এটা তো পটুয়াপাড়ার রাস্তা নয়”, বললেন সঞ্জয়। সাইকেল থেকে নেমে নিজের পরিচয় দিয়ে আমাদের গাইড হয়ে নিয়ে চললেন নিজের গ্রামের দিকে। গ্রামে সব মিলিয়ে ২২-২৩ ঘর চিত্রকরের বাস। গোটা গ্রামটাই আর্ট গ্যালারি যেন। কোনো বাড়ির দেওয়াল জুড়ে আঁকা ফুলের বাগান, কোথাও বিশাল প্রজাপতি। কোনো বাড়ির দেওয়ালে দেখা যাবে আদিবাসী পরিবার, আবার কোথাও রকমারি প্যাঁচা কিংবা বৃহৎ দুই ষাঁড়। এক বাড়ির দরজায় আঁকা মাছের সংসার, আবার কোনো জানালা জুড়ে রয়েছে বাহারি লতাপাতা।  বাইরেটা দেখেই এই গ্রামের অন্দরে কি মণি-মানিক ছড়িয়ে আছে তার আন্দাজ পাওয়া যায়।

another wall painting
আরও এক দেওয়ালচিত্র।

গ্রামের এক প্রান্তে সঞ্জয়ের শ্বশুরমশাই শ্যামসুন্দর চিত্রকরের ঘর। তাঁকে ডেকে দিয়েই সঞ্জয় ছুটল আমাদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতে। একটু উঁকি মারলেই দেখা যায়, টালির চালের ঘরের অন্তরমহলেও দেওয়াল জুড়ে চোখজুড়োনো নকশা কাটা। কপালজোরে আমাদের বসার জায়গা হল চিত্রকরের স্টুডিয়োতে। একটা দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে অনেকগুলি পট। একটা তক্তপোশ জুড়ে শ’য়ে শ’য়ে পট। তক্তপোশের নীচে ঠাসা বিভিন্ন নারকেলমালায় গোলা রঙ, আঠা, কাগজ ইত্যাদি উপাদান। এ ছাড়া ছাউনির নীচের বাঁশের ফাঁকেফাঁকেও গোটানো পটের সমাহার। কাপড় ও কাগজের পটে উঠে এসেছে রামায়ণ, মহাভারত, চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, মনসামঙ্গল, বিভিন্ন দেবদেবী, সমাজ সচেতনতা কিংবা দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ছবি।

“দাঁড়িয়া মাছের বিয়ে করাতে চলো গো রঙ্গিলা।

সব মাছ বলে আমি, তোমার বিয়ের খাবান খাবো লো রঙ্গিলা”

একটি মাছের পট দেখিয়ে, আমাদের সেই পটের গান শোনাচ্ছিলেন শ্যামসুন্দর চিত্রকরের মেয়ে, নাতনিরা। ছবি আর সুর মিলিয়ে গোটা গল্পটা চোখের সামনে ভাসছে, ঠিক যেন অ্যানিমেশন মুভি।

shyamsundar chitrakar
শ্যামসুন্দর চিত্রকর।

“আগে গ্রামে গ্রামে এই পটের গান শুনিয়ে মাধুকরী সংগ্রহ করেই দিন গুজরান হত, এখন আর সেদিন নেই”- বললেন রঙ তৈরির কাজে ব্যস্ত ৮০ ছুঁই-ছুঁই শ্যামসুন্দর। মেয়ে ইতিমধ্যেই তিন বার বিদেশ পাড়ি দিয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীরা অনেকটাই সফল বাংলার প্রাচীন এই শিল্পকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিতে। তবে বাণিজ্যিক কারণে পট ছাড়াও এখন বিভিন্ন বস্ত্রসামগ্রী, বাঁশের হাতপাখা, ঝুড়ি, কুলো, কৌটো, ফুলদানি ইত্যাদি রাঙিয়ে তুলছেন তাঁরা।

“এটা কীসের গল্প বলো তো?” – একটা ছোট পট দেখিয়ে প্রশ্ন করলেন শ্যামসুন্দর। আমাদের চুপ থাকতে দেখে নিজেই বললেন, “শ্রীচৈতন্য গৃহত্যাগ করার সময়, তাঁকে বাধা দিচ্ছে তাঁর স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়া”। কিছুটা আনন্দ ও গর্বের সঙ্গেই জানালেন যে, গ্রামে তিনিই প্রথম শ্রীচৈতন্য ও বিষ্ণুপ্রিয়াকে নিয়ে পট তৈরি করেন। ইতিমধ্যে সঞ্জয় এসে জানাল দুপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছে।

শ্যামসুন্দর চিত্রকরের বাড়ির ঠিক উলটো দিকেই বাহাদুর চিত্রকরের ঘর এবং লাগোয়া বিখ্যাত পটচিত্র সংগ্রহশালা। নিজের ব্যাক্তিগত উদ্যোগেই, পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও বিহার, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন সময়ের পটচিত্র সংগ্রহ করে প্রদর্শনশালা গড়েছেন বাহাদুর। প্রবেশ করে দেখা গেল শুধুমাত্র পটচিত্র নয়, রয়েছে বিভিন্ন হস্তশিল্পসামগ্রী – কাঠের তৈরি বিভিন্ন মুখা (মুখোশ), ডোকরা শিল্পের অসাধারণ কিছু নিদর্শন।

আরও পড়ুন স্বল্পচেনা উত্তরবঙ্গ: কার্শিয়াং ইকো ভিলেজ

বাহাদুর চিত্রকর ঘরে ছিলেন না, আলাপ হল তাঁর ছেলে রাজেশ চিত্রকরের সঙ্গে। তাঁর কাছেই দেখলাম কী ভাবে শিমগাছের পাতা থেকে সবুজ, লাটখন পাতা থেকে লাল, অপরাজিতা ফুল থেকে নীল, কাঁচা হলুদ থেকে হলুদ ইত্যাদি প্রাকৃতিক রঞ্জকের সঙ্গে তেঁতুলের আঠা মিশিয়ে পাকা রঙ তৈরি করা হয় যা ব্যবহার হয় পট আঁকার কাজে। রাজেশ আমাদের আমন্ত্রণ জানালেন পটমেলায় আসার জন্য। প্রতি বছর নভেম্বর মাসে নয়াগ্রামে অনুষ্ঠিত হয় পটমেলা।

গ্রামে আছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোগের তৈরি একটি রিসোর্স সেন্টার। সেখানে বেশ কিছু পট ও হস্তশিল্পের প্রদর্শনীর সঙ্গে রয়েছে পটশিল্পের ইতিহাস কিংবা পটুয়াদের জীবনযাত্রা সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন ওয়ার্কশপ-সেমিনার-আলোচনাসভা ইত্যাদির আয়োজনও করা হয় সেখানে। এমনকি রাত্রিবাসের ব্যবস্থাও আছে রিসোর্স সেন্টারে।

different pots
নানা ধরনের পট।

বংশ পরম্পরায় এই গ্রামের সবাই শিল্পী, অক্লান্ত পরিশ্রম করে ফুটিয়ে চলেন নানা রঙের পট। কাপড়ের উপর আঠা দিয়ে শক্ত কাগজ জুড়ে তৈরি হয় পট, যা মূলত তিন ধরনের। গোটানো বা জড়ানো পট – এগুলি সাধারণত ৩ থেকে ১০ ফুট কিংবা আরও লম্বা হয়, কোনো ঘটনা বা কাহিনির ধারাবাহিক বর্ণনা তুলে ধরা হয় এই পটে। এগুলি দেখিয়েই পটের গান শোনান চিত্রকররা। জনমানসে এই পটের গান বেশ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম, তাই বর্তমানে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-পরিবশ সচেতনতা ইত্যাদি বিষয়ে প্রচার করা হয় পটের গানের মাধ্যমে। এ ছাড়া আড়েলাটাই বা আয়তাকার পট এবং চৌকো বা বর্গাকার পট – সাধারণত এই পটে থাকে ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় বা বিশেষ সামাজিক কোনো চরিত্র।

কোনো গ্রামে বাইরে থেকে কেউ এলে সারা গ্রামে সেই খবর ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তের মধ্যে। এখানেও তার ব্যাতিক্রম ঘটল না। চার পাশে কৌতূহলী মুখ, সবাই চায় আলাপ করতে – বাড়িতে ডেকে নিজের হাতের কাজ দেখাতে। এক বার ঢুঁ মারলাম ইয়াকুব চিত্রকরের কুটিরে। পরিবারের সবাই এক সঙ্গে দালানে বসে কোনো না কোনো কাজে ব্যাস্ত। কেউ পট আঁকছেন তো কেউ আঁকছেন টি-শার্ট। ভিন্ন ধর্মের মানুষ হয়েও, পটু হাতে ফুটে উঠছে পরধর্মের দেবদেবীর চিত্র। দেওয়ালে জ্বলজ্বল করছে ইয়াকুব সাহেবের কাজের সম্মাননা স্মারক। গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে এক জানলার ফাঁক দিয়ে দেখি, দু’টো রঙমাখা কচি মুখ অবাক দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে। রঙ নিয়ে খেলা করছে দু’টোতে। ওঁদের মা হালেমা চিত্রকর ইতিমধ্যেই মাদুর পেতে দিয়েছেন। গ্রাম-পঞ্চায়েত থেকে বানিয়ে দেওয়া বাশঁ ও টিনের চালের ঘরে অভাবের ছাপ স্পষ্ট। মাসে সরকারি ভাতা ১০০০ টাকা মাত্র। হালেমা কিন্তু রঙ-তুলি হাতে উজ্জ্বল। যদিও অন্য চিত্রকরদের তুলনায় হালেমার কাছে যেন পটের প্রাচুর্য ও বৈচিত্র্য  বেশ কম।

artist is busy with her work
ব্যস্ত শিল্পী।

“আমি নতুন কাজ শিখেছি আব্বুর থেকে, এখনও সব ধরনের পট আঁকতে পারি না”। কত সহজ ভাবে ধরা দিতে পারেন হালেমা। তা ছাড়া বাড়ির সব কাজ করে, ছেলে-মেয়ে-স্বামী-শ্বশুর সবাইকে একা হাতে সামলে কতটুকুই বা সময় পান হালেমা? ওঁর থেকেই কিছু পট সংগ্রহ করলাম। তার পর একটি রাধা-কৃষ্ণের পট দেখিয়ে আমরা গান শোনানোর আবদার করতেই, হেসে কাপড়ে মুখ ঢাকে হালেমা। ব্যাপার কী? “বাইরের লোকের সামনে গান গাইতে আমার খুব লজ্জা”- হালেমার সহজ উত্তর। অনেক বোঝানোর পর খুব মৃদু-লাজুক গলায় শুরু হল –

“সাঁঝের বেলায়, যমুনার জল, আনতে বলে কে?

অস্ত মাঘে পুকুর ঘাটে কানায় দেখা দিল, কানায়ে দেখিয়া রাধে ঘোমটা টানিল।

সাঁঝের বেলায়, যমুনার জল, আনতে বলে কে?

তরুতলে কৃষ্ণ যে মুরলী দিল টান, শুনে যত ব্রজের গোপী, না ধরে পরাণ।

সাঁঝের বেলায়, যমুনার জল, আনতে বলে কে?”

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে খড়গপুরগামী বা মেদিনীপুরগামী লোকাল ট্রেনে বালিচক। সেখান থেকে ১৮ দূরের নয়াগ্রাম বাস বা ট্রেকারে। আর সরাসরি গাড়িতে এলে কলকাতা থেকে বোম্বে রোড তথা ৬ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে ডেবরা আসুন। সেখান থেকে বাঁ দিকের পথ ধরে চলুন মুন্দামারি, ফের বাঁ দিকের পথে পৌঁছে যান নয়া, দূরত্ব ১২০ কিমি।  

ছবি – পলাশ মিদ্দে

Leave a Comment

Your email address will not be published.

You may also like