করোনাকালে ডুয়ার্স ভ্রমণ ১: ‘হৃদকমল’-এর আশ্রয়ে

সুব্রত গোস্বামী

গত আট মাস ধরে করোনার ভয়ে গৃহবন্দি থাকতে থাকতে প্রাণ যেন হাঁসফাঁস করছিল। ছটফট করছিল উচাটন মন, খালি ভাবছিলাম কবে একটু পাহাড়ে যাব। ঠিক সেই সময়েই এল সুপ্রতীমদার হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ… “চলে আসুন আমার ময়নাগুড়ির অতিথিশালায়”।

ময়নাগুড়িকে বলা যায় ডুয়ার্সের প্রবেশদ্বার। সুপ্রতীমদার প্রস্তাবটা পেয়ে যেন হাতে চাঁদ পেলাম। আর নয়, ডাক যখন এসেছে, বাইরে বেরিয়ে পড়তেই হবে। ২০১৯-এর আগস্ট মাসে ঘুরে এসেছিলাম কৈলাস-মানস সরোবর। তার পর থেকে গৃহবন্দি। বন্ধুরা বলে, আমার পায়ের তোলায় নাকি সরষে! একটা জায়গা ঘুরে আসার আগেই পরের যাত্রার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। মাঝে অবশ্য আট বার সুন্দরবন ঘুরে এসেছি। সেটা অবশ্য অন্য উদ্দেশ্যে, নির্ভেজাল নিখাদ বেড়ানো নয়, ঘূর্ণিঝড় আমফান-বিধ্বস্ত অসহায় আত্মজনের সেবায়।

সবুজের মাঝে পথ চলা।

সুপ্রতীমদার আমন্ত্রণ পেয়ে আর দেরি করলাম না। ট্রেনের টিকিট না পেয়ে ধর্মতলা থেকে উত্তরবঙ্গ পরিবহনের ভলভো বাসের টিকিট কেটে ফেললাম। শুরু হয়ে গেল ব্যাগ গোছানোর কাজ।

সুপ্রতীমদার সঙ্গে আলাপ ওই সুন্দরবনেই। অল্প কয়েক দিনের আলাপেই উনি ‘মনের মানুষ’ হয়ে উঠলেন। তাই দাদা যখন ময়নাগুড়ি যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন, তখন আর দ্বিধা করিনি। অল্প কিছু দিনের উপযোগী জামাকাপড় নিয়ে সপরিবার উঠে পড়লাম উত্তরবঙ্গ পরিবহন নিগমের ভলভো বাসে। ঘড়ির কাঁটা যখন সন্ধ্যা ঠিক সাড়ে ৬টা, বাসের চাকা গড়াতে চলতে শুরু করল। এক্কেবারে সূচি মেনে শুরু হল যাত্রা। ভয় ছিল বাসে হয়তো অনেক ভিড় হবে। কিন্তু না, অমূলক ছিল সেই ভয়। শিলিগুড়িগামী বাসে আমাদের মতো অল্প কিছু ভ্রমণপিপাসু মানুষ।

আধো ঘুমে, আধো জাগরণে সময় কাটছিল। ঘড়ির কাঁটায় তখন ভোর ৪.১৪ মিনিট। দেখি সুপ্রতীমদার মেসেজ… “আপনারা কত দূরে?” এত সকালে ওঁর মেসেজ পেয়ে অবাকই হয়ে গেলাম। আমাদের জন্য উনি কি সারা রাত জেগে বসে আছেন? যাতে ঠিক সময়ে আমাদের কাছে ময়নাগুড়ি যাওয়ার গাড়ি পাঠাতে পারেন।

ঠিক ৫টার সময় আমাদের বাস শিলিগুড়ি তেনজিং নোরগে বাসস্ট্যান্ডে প্রবেশ করল। আমরা তো অবাক। সকাল সাড়ে ৬টায় পৌঁছোনোর কথা, পৌঁছে গেল ৫টায়। দেড় ঘণ্টা আগে। শীতের ভোর, তখনও অন্ধকার কাটেনি। সত্যি বলতে কী আমি একটু অবাকই হলাম। আমাদের দেশে কোনো কিছুই তো সময় মেনে চলে না। সেখানে ঠিক সময়ে বাস ছাড়া ও নির্ধারিত সময়ের দেড় ঘণ্টা আগে শিলিগুড়িতে প্রবেশ! সাবাস উত্তরবঙ্গ পরিবহন নিগম।

পথের সঙ্গী যেখানে চা বাগান।

বাস থেকে নেমে গরম গরম দু’ কাপ চা খেতে খেতে দেখি আমাদের গাড়ি এসে হাজির। গাড়ির মালিক পাপাই নিজেই চলে এসেছে আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে। পুব দিকের আকাশ ধীরে ধীরে আলোকিত হচ্ছে। রোদ ঝলমলে সকাল আমাদের স্বাগত জানাল। দেখি পাহাড়ের রানি কাঞ্চনজঙ্ঘাও যেন দু’ হাতে বাড়িয়ে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে। ঝকঝক করছে। চলার পথে সে আমাদের সঙ্গী। আমার পুত্র ঋষভের আনন্দ আর দেখে কে! গাড়ির চালকের পাশের সিটে বসে অবিরাম ক্যামেরার শাটার টিপে চলেছে… আর শুধু বলছে, ‘এ কোথায় এলাম’!

শিলিগুড়ি থেকে সড়কপথে ময়নাগুড়ির দূরত্ব প্রায় ৬০ কিমি। আমাদের মনোরঞ্জনের জন্য পাপাই প্রচলিত রাস্তা ছেড়ে চা বাগানের ভিতর দিয়ে গাড়ি নিয়ে এগিয়ে চলল। চার দিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। এমন তৃপ্তিদায়ক সবুজ আমাদের দেশে খুব কমই দেখা যায়। নীল আকাশের নীচে যেন সবুজ গালিচা পেতে রেখেছে প্রকৃতি। উঁচু-নিচু টিলা আর টিলাঘেরা সমতলে সবুজের চাষাবাদ। মাঝে মাঝে টিলা বেষ্টিত ছোটো ছোটো জনপদ। কোনো যান্ত্রিক দূষণ নেই। প্রকৃতির সকল সৌন্দর্যের সম্মিলন যেন এখানে। এমনই অন্তহীন সৌন্দর্যে একাকার হয়ে আছে ডুয়ার্সের চা বাগান। সারা বিশ্ব জুড়ে যে চায়ের চাহিদা।

প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে গিয়েছিলাম। সম্বিত ফিরল পাপাইয়ের ডাকে। দেখি আমরা ‘হৃদকমল’-এ চলে এসেছি। (চলবে)

ছবি: ঋষভ গোস্বামী

আরও পড়ুন: কলকাতা দর্শন: দেখে আসুন সেন্ট পল্‌স ক্যাথিড্রাল

আরও পড়তে পারেন

Leave a Reply

Your email address will not be published.