আমাদের বাছাই

পুজোয় চলুন: গন্তব্য রাজস্থান

puja-destination-travel-plan-for-rajasthan

ভ্রমণ অনলাইন ডেস্ক: মোটামুটি অক্টোবরের দ্বিতীয় অর্ধ থেকে রাজস্থানের আবহাওয়া নরম হতে শুরু করে। গরম কমে যায়। বরং কোথাও কোথাও বাতাসে ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব অনুভূত হয়। এই সময়ে যাওয়াই যায় রাজস্থান ভ্রমণে। তাই ভ্রমণ অনলাইন এই পর্বে সাজিয়ে দিচ্ছে রাজস্থান বেড়ানোর পরিকল্পনা। আগের দুটি পর্বে ছিল গাড়োয়ালকুমায়ুন

ভ্রমণ ছক ১:  আগরা-ভরতপুর-দৌসা-জয়পুর-সরিস্কা-অলওয়র

প্রথম ও দ্বিতীয় দিন –  যেখান থেকেই যান আগরায় দু’টো দিন পুরো থাকুন।  

প্রথম দিন  দেখুন তাজমহল, আগরা ফোর্ট, ইতমাদ-উদ-দৌল্লা, রামবাগ, চিনি কা রৌজা, দয়ালবাগ। দ্বিতীয় দিন সকালেই চলুন ফতেপুর সিকরি (৩৫ কিমি), সেখান থেকে ফিরে দেখে নিন সিকান্দ্রা।

কলকাতা থেকে আগরা যাওয়ার ভালো ট্রেন দুটো – (১) জোধপুর এক্সপ্রেস হাওড়া থেকে রাত ১১.৩৫-এ ছেড়ে আগরা ফোর্ট পৌঁছোয় পরের দিন রাত পৌনে ৮টায়; (২) অজমের এক্সপ্রেস শিয়ালদহ থেকে রাত ১০.৫৫-য় ছেড়ে আগরা ফোর্ট পৌঁছোয় পরের দিন সন্ধে ৬.৩৫ মিনিটে। এ ছাড়া উদ্যান আভা তুফান এক্সপ্রেস হাওড়া থেকে সকাল ৯.৩৫-এ ছেড়ে আগরা ক্যান্টনমেন্ট পৌঁছোয় পরের দিন দুপুর ২.৫৫-য়। এ ছাড়া বেশ কিছু সাপ্তাহিক ট্রেন আছে। এগুলির বেশির ভাগই সন্ধে থেকে রাতের দিকে আগরা পৌঁছোয়।

ট্রেনে বা বিমানে দিল্লি হয়েও আসতে পারেন। দিল্লি থেকে ট্রেন বিশেষে ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টার যাত্রা আগরা। সক্কালেই দিল্লি থেকে আগরা পৌঁছোনোর বেশ কিছু ট্রেন আছে। দেশের সব বড়ো শহরের সঙ্গেই আগরা ট্রেনপথে যুক্ত।    

তৃতীয় দিন ও চতুর্থ দিন – রাত্রিবাস ভরতপুর। প্রথম দিন দেখে নিন লোহাগড় দুর্গ ও কেওলাদেও ঘানা জাতীয় উদ্যান। দ্বিতীয় দিন চলুন ৩৪ কিমি দূরের দীগ। দেখে নিন দীগ দুর্গ, সুরজমল প্রাসাদ বা গোপাল ভবন, সূর্য ভবন, গার্ডেন প্যাভিলিয়ন কেশব ভবন, রূপসাগরের শিশ মহল, পুরানা মহল, শ্বেতপাথরের হিন্দোলা প্রাসাদ ইত্যাদি।

আগরা থেকে ভরতপুর ট্রেনে যাওয়াই সুবিধাজনক। ভোর থেকে ট্রেন। বেশির ভাগ ট্রেন মেলে আগরা ফোর্ট থেকে। ঈদগা আর ক্যান্টনমেন্ট থেকেও ট্রেন পাওয়া যায়। ঘণ্টা খানেক সময় লাগে। সড়কপথে আগরা থেকে ভরতপুর ৫৫ কিমি, বাস চলে নিয়মিত। গাড়ি ভাড়া করেও আসতে পারেন। ভরতপুর থেকে দীগ নিয়মিত বাস চলে, গাড়িও পাবেন।

পঞ্চম দিন – রাত্রিবাস দৌসা। দৌসা থেকে সকালে চলে যান ১৩ কিমি দূরের ভান্ডারেজ। দেখে নিন প্রাসাদ আর রাজস্থানের সব চেয়ে আকর্ষণীয় স্টেপ-ওয়েল ভান্ডারেজ বাউড়ি। দৌসা ফিরে দুপুরের আহার সেরে চলুন ৩০ কিমি দূরে ভানগড় দুর্গ। ‘হানাবাড়ি’ বলে খ্যাত ভানগড় দুর্গে সন্ধে নামলে থাকা যায় না।

ভরতপুর থেকে সকাল ৬.০৮-এ আগরা ফোর্ট-অজমের ইন্টারসিটি ধরে দু’ ঘন্টায় চলে আসুন দৌসা। দৌসা থেকে গাড়ি ভাড়া করে প্রথমে চলে যান ভান্ডারেজ বাউড়ি। তার পর দৌসা ফিরে দুপুরের আহার করে গাড়ি ভাড়া করে চলে যান ভানগড় দুর্গ। শেয়ার জিপ বা বাসে গেলে ভানগড় দুর্গের কিছু আগে গোলা কা বাস পর্যন্ত যেতে হবে। তার পর হাঁটা।   

ষষ্ঠ ও সপ্তম দিন – রাত্রিবাস জয়পুর। জয়পুরে দেখে নিন হাওয়া মহল, বিড়লা মন্দির, মোতি ডুংরি, অ্যালবার্ট হল মিউজিয়াম, নাহাড়গড় দুর্গ, জলমহল, জয়গড় দুর্গ, সিসোদিয়া রানি কি বাগ, বিদ্যাধরজি কি বাগ, যন্তর মন্তর, সিটি প্যালেস, অম্বর দুর্গ ও প্রাসাদ (১১ কিমি), গলতা ও সূর্য মন্দির (১০ কিমি পুবে, হেঁটে পাহাড়ে চড়া) ও সঙ্গানের (১৬ কিমি দক্ষিণ পশ্চিমে, ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের জৈন মন্দির ও প্রাসাদ)।

দৌসা থেকে জয়পুর ট্রেনে আসাই সুবিধাজনক। সক্কাল থেকে ট্রেন আছে, ঘণ্টা দেড়েক সময় লাগে। বাসে বা গাড়িতেও আসা যায়। আগরা-জয়পুর জাতীয় সড়কের ওপর অবস্থিত দৌসা। দৌসা থেকে জয়পুর সড়কপথে ৫৮ কিমি।

অষ্টম দিন – রাত্রিবাস সরিস্কা।

সক্কাল সক্কাল জয়পুর থেকে বেরিয়ে বাসে বা গাড়িতে চলুন সরিস্কা, দূরত্ব ১১৩ কিমি। বিকেলে ও পরের দিন সকালে দু’টো সাফারি করার চেষ্টা করুন।

নবম দিন ও দশম দিন – রাত্রিবাস অলওয়র।

নবম দিন সকালে সরিস্কায় একটা সাফারি করে রওনা হয়ে যান অলওয়র। বাসে বা গাড়িতে চলে আসুন ৩৭ কিমি পথ। গাড়িতে এলে পথে দেখে নিন শিলিশেড় লেক ও প্রাসাদ।

অলওয়রে দেখে নিন সিটি প্যালেস তথা মিউজিয়াম, বালা কিলা বা অলওয়র দুর্গ, মুসি মহারানি কি ছত্রি, করণীমাতা মন্দির, পুরজন বিহার, বিনয় বিলাস প্রাসাদ (১০ কিমি, বিজয়সাগরের পাড়ে), জয়সমন্দ লেক (৬ কিমি) এবং শিলিশেড় লেক ও প্রাসাদ (যদি সরিস্কা থেকে আসার পথে দেখা না হয়ে থাকে)।

একাদশ দিন – দিল্লি হয়ে ফিরুন ঘরপানে। অলওয়র থেকে দিল্লি ১৬০ কিমি, মুহুর্মুহু বাস আছে। সকাল থেকে পর পর ট্রেন রয়েছে আলোয়ার-দিল্লি, সাড়ে তিন ঘণ্টা মতো সময় লাগে।

ভ্রমণ ছক ২:  জয়পুর-ফতেপুর-বিকানের-অজমের

প্রথম ও দ্বিতীয় দিন – যেখান থেকেই যান জয়পুরে অন্তত পুরো দু’টো দিন থাকুন। জয়পুরে কী দেখবেন তা জানতে আগের ভ্রমণসূচির ষষ্ঠ ও সপ্তম দিন দেখে দিন।

ভারতের সব বড়ো শহরের সঙ্গে জয়পুর ট্রেন ও বিমানপথে সংযুক্ত। কলকাতা থেকে জয়পুর যাওয়ার ভালো ট্রেন দু’টো – হাওড়া থেকে জোধপুর এক্সপ্রেস ও শিয়ালদহ থেকে অজমের এক্সপ্রেস। জোধপুর এক্সপ্রেস হাওড়া থেকে রাত ১১.৩৫-এ ছেড়ে জয়পুর পৌঁছোয় পরের দিন রাত ১২.৩৫-এ। অজমের এক্সপ্রেস  শিয়ালদহ থেকে রাত ১০.৫৫-য় ছেড়ে জয়পুর পৌঁছোয় পরের দিন রাত ১১.৫৫-য়। এ ছাড়া দু’টি সাপ্তাহিক ট্রেন আছে। দিল্লি থেকে জয়পুর সাড়ে ৪ ঘণ্টা থেকে ৬ ঘণ্টার জার্নি, অসংখ্য ট্রেন।  

তৃতীয়, চতুর্থ দিন ও পঞ্চম দিন – রাত্রিবাস ফতেপুর। জয়পুর থেকে ফতেপুর আসুন বাসে, ১৬৬ কিমি, ঘনঘন বাস আছে। গাড়িতেও আসতে পারেন। সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ুন।

শেখাবতী অঞ্চলের মধ্যমণি ফতেপুর। রাও শেখা থেকে নাম শেখাবতী। শেখা তথা মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের বাস এই অঞ্চলে। তাদেরই অর্থে এখানকার ৩৬০টি গ্রাম জুড়ে গড়ে উঠেছে ফ্রেস্কো চিত্রে নানা আখ্যানে সুশোভিত নানা বাড়ি বা হাভেলি।

যে দিন জয়পুর থেকে পৌঁছোবেন সে দিন ফতেপুরে দেখে নিন গোয়েঙ্কা, ডেবরা, সিংহানিয়া, সারাওগি, পোদ্দার, জালান ইত্যাদিদের হাভেলি।

পরের দিন একটা গাড়ি ভাড়া করে ভোরেই বেরিয়ে পড়ুন। চলুন লছমনগড় (২২ কিমি), সেখান থেকে শিকার (৩৩ কিমি), সেখান থেকে নওয়লগড় (৩৪ কিমি), নওয়লগড় থেকে ঝুনঝুনু (৪০ কিমি), ঝুনঝুনু থেকে মান্ডোয়া (৩২ কিমি) ও মান্ডোয়া থেকে ফিরুন ফতেপুর (২১ কিমি)। দেখে নিন নানা হাভেলি, মন্দির ও গড়।

পঞ্চম দিন গাড়ি ভাড়া করে চলুন স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতিধন্য খেতড়ি (১০৪ কিমি)। সক্কাল সক্কাল বেরিয়ে পড়ুন। সারা দিন ঘুরে দেখে নিন আরাবল্লি পাহাড়ের কোলে খেতড়ির রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম, রঘুনাথ মন্দির, ভোপালগড় দুর্গ, অজিত সাগর, বাগোর দুর্গ, সুখ মহল। রাতে ফিরে আসুন ফতেপুর।

ষষ্ঠ ও সপ্তম দিন – রাত্রিবাস বিকানের। সক্কালেই বেরিয়ে পড়ুন ফতেপুর থেকে বাসে বা গাড়িতে, ১৭২ কিমি।

বিকানেরে দেখে নিন জুনাগড় দুর্গ, গঙ্গা গোল্ডেন জুবিলি মিউজিয়াম, লালগড় প্রাসাদ, ভাণ্ডেশ্বর ও ষণ্ডেশ্বর জৈন মন্দির কমপ্লেক্স (৫ কিমি), দেবী কুণ্ড সাগর (৮ কিমি), ক্যামেল ব্রিডিং ফার্ম (৮ কিমি), গজনের স্যাংচুয়ারি ও প্রাসাদ (বিকানের-জৈসলমের পথে ৩১ কিমি) এবং দেশনোকে করণীমাতা মন্দির (বিকানের-অজমের পথে ৩২ কিমি)

অষ্টম ও নবম দিন – রাত্রিবাস অজমের।

বিকানের থেকে ২৫০ কিমি অজমের। বাসেই আসা প্রশস্ত। গাড়িতেও আসা যায়। গাড়িতে এলে পথে দেশনোকে করণীমাতা মন্দির দেখে নিতে পারেন। অজমের পৌঁছে প্রথম দিন দরগা শরিফ দেখে নিন।

পরের দিন দেখে নিন আড়াই-দিন-কা-ঝোপড়া, তারাগড় পাহাড়ে আকবর কা দৌলতখানা, দিগম্বর জৈন মন্দির সোনিজি কা নাসিয়া, আকবরের প্রাসাদে সরকারি মিউজিয়াম, দু’টি কৃত্রিম হ্রদ আনা সাগর ও ফয় সাগর  এবং আনা সাগরের পাড়ে জাহাঙ্গিরের গড়া দৌলত বাগ বাগিচা। চলুন ১৫ কিমি দূরে পুষ্করতীর্থে। হ্রদ ও অসংখ্য মন্দির নিয়ে মরুভূমির বুকে এক টুকরো পুষ্কর।

দশম দিন – ঘরপানে ফেরা। কলকাতায় ফিরলে দুপুর ১২.৫০-এ শিয়ালদহ এক্সপ্রেস ধরুন। দিল্লি হয়েও ফিরতে পারেন। বহু ট্রেন আছে। সময় লাগে ট্রেন বিশেষে সাড়ে ৬ ঘণ্টা থেকে ৯ ঘণ্টা।

ভ্রমণ ছক ৩:  বিকানের-জৈসলমের-বাড়মের-জোধপুর

প্রথম দিন – রাত্রিবাস বিকানের। যেখান থেকেই আসুন, চেষ্টা করুন সকালেই বিকানের পৌঁছোতে।

কলকাতা থেকে বিকানের যাওয়ার সরাসরি দৈনিক ট্রেন জোধপুর এক্সপ্রেস। হাওড়া থেকে রাত ১১.৩৫-এ ছেড়ে বিকানের পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল পৌনে ৯টায়। এ ছাড়াও দু’টি সাপ্তাহিক ট্রেন আছে – হাওড়া থেকে জৈসলমের এক্সপ্রেস (পৌঁছোয় সন্ধ্যায়) এবং কলকাতা স্টেশন থেকে প্রতাপ এক্সপ্রেস (পৌঁছোয় ভোরে)। মুম্বই বা চেন্নাই থেকে ট্রেনও এলে বিকেলে বিকানের পৌঁছোয়। দেশের যে কোনো জায়গা থেকে দিল্লি এসে সেখান থেকেও ট্রেনে বিকানের আসা যায়। দিল্লি-বিকানের সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস দিল্লি সরাই রোহিলা থেকে রাত ১১.৩৫-এ ছেড়ে বিকানের পৌঁছোয় সকাল ৭টায় এবং ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস সকাল ৮.৪০-এ সরাই রোহিলা থেকে ছেড়ে বিকানের পৌঁছোয় বিকেল ৪.৩৫-এ। 

দেশের যে কোনো বড়ো শহর থেকে বিমানে জয়পুর এসে সেখান থেকে ট্রেনে বিকানের আসা যায়। সময় লাগে ট্রেন বিশেষে সাড়ে ৬ ঘণ্টা থেকে সাড়ে ৯ ঘণ্টা। ট্রেনে দিনের যে কোনো সময়ে বিকানের পৌঁছোনো যায়।  সড়কপথে বাস বা গাড়ি ভাড়া করেও আসা যায়, দূরত্ব ৩৪২ কিমি। 

দ্বিতীয় দিন – সারা দিন বিকানের ঘুরে রাতে বাস ধরুন জৈসলমের যাওয়ার জন্য।
বিকানেরে দ্রষ্টব্য – দেখে নিন ভ্রমণ ছক ২-এর ষষ্ঠ ও সপ্তম দিন।

তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম দিন –  রাত্রিবাস জৈসলমের।

বিকানের থেকে জৈসলমের ৩৩০ কিমি। বাসে ঘণ্টা আটেক সময় লাগে। ভোরেই পৌঁছে যান জৈসলমের।

জৈসলমের অবস্থানকালে গাড়ি ভাড়া করে নিন। প্রথম দিন দেখে নিন সোনার কেল্লা, রাজ কা মহল, নাথমলজি কি হাভেলি, পাটোয়া কি হাভেলি, সেলিম সিংজি কি হাভেলি আর গদিসর লেক।

দ্বিতীয় দিন সকালে দেখে নিন ভাটি রাজাদের ছত্তীশ বড়াবাগ, ভাটি রাজাদের পূর্বতন রাজধানী লোধুর্বা ও মরুভূমির বুকে মরুদ্যান অমরসাগর। জৈসলমেরে ফিরে দুপুরের খাওয়া সেরে চলুন রাজকীয় বাগিচা মূলসাগর, মিউজিয়াম নগরী কুলধ্রা হয়ে স্যাম স্যান্ড ডিউনস (জৈসলমের থেকে ৪২ কিমি পশ্চিমে)। মরুভূমির বুকে রমণীয় সূর্যাস্ত দেখুন।

ভ্রমণের পঞ্চম দিনে অর্থাৎ জৈসলমের থাকার তৃতীয় দিন সকালে চলুন ১৭ কিমি দূরের উড ফসিল পার্কে, ১৮ কোটি বছরের ১৮টি জুরাসিক বৃক্ষের ফসিল। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর খুরির পথে চলুন  ডের্জার্ট ন্যাশনাল পার্কে (জৈসলমের থেকে ৯ কিমি), উটের গাড়িতে সাফারি করুন। সেখান থেকে চলুন খুরিতে (আরও ৩১ কিমি)। সূর্যাস্ত দেখে রাজস্থানের সংগীত-নৃত্য উপভোগ করে জৈসলমের ফিরুন।

ষষ্ঠ দিন – রাত্রিবাস বাড়মের।

জৈসলমের থেকে ১৩৫ কিমি দূরের বাড়মের বাসে ঘণ্টা চারেকের পথ। সকালেই বেরিয়ে পড়ুন। গাড়ি ভাড়া করেও আসতে পারেন।

বাড়মেরে দেখুন পাহাড়ের শিরে শ্বেতপাথরের অষ্টভুজা দুর্গা, ৩৮ কিমি দূরে পাকিস্তান সীমান্তের পথে হাজার বছরের মন্দির স্থাপত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কিরাডু এবং শহর থেকে সাত কিমি দূরে মহাবাড় বালিয়াড়ি থেকে অপরূপ সূর্যাস্ত।

সপ্তম ও অষ্টম দিন – জোধপুর।

সপ্তম দিন সকালেই রওনা হন জোধপুর, দূরত্ব ২০০ কিমি। বাসে চলে আসুন। ট্রেনও পাবেন। ভোর সাড়ে চারটে থেকে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত গোটা ছয়েক ট্রেন পাবেন। ট্রেন বিশেষে সময় লাগে সাড়ে ৩ ঘণ্টা থেকে ৫ ঘণ্টা। তবে চেষ্টা করুন ভোর সাড়ে ৪টের ডিএমইউ বা সকাল পৌনে ৭টার এক্সপ্রেস ধরতে। তা হলে হয় ৯.০৫ অথবা ১০.১০-এর মধ্যে পৌঁছে যাবেন জোধপুর।  

জোধপুরে একটা গাড়ি ভাড়া করে নিন। প্রথম দিন পৌঁছে দেখে নিন মেহরনগড় ফোর্ট ও দুর্গের পাদদেশে জশবন্ত সিংহের স্মারকসৌধ তথা ছত্তিশ জশবন্ত থাডা। বিকেলে চলুন ১০ কিমি পশ্চিমে কৈলানা হ্রদ, দেখুন সূর্যাস্ত। মন ভরে যাবে।

জোধপুর অবস্থানকালে দ্বিতীয় দিন সকালে দেখে নিন উমেদ ভবন প্যালেস, কাছেই মহারাজার রেলওয়ে ক্যারেজ, সদর গভর্নমেন্ট মিউজিয়াম। দুপুরে চলুন শহর থেকে ৮ কিমি উত্তরে ৬-১৪ শতকের পরিহারদের রাজধানী মান্ডোর। দেখে নিন মান্ডোরের এক কিমি আগে বালসমন্দ হ্রদ।

নবম দিন – আজই ঘরে ফেরার দিন। তার আগে সকালে চলুন ৬৬ কিমি উত্তরে থর মরুভূমির বুকে ওশিয়া। ৮-১১ শতকে পরিহারদের তৈরি হিন্দু ও জৈন মন্দিরগুলির ভাস্কর্য দেখার মতো। জোধপুর থেকে ট্রেনে দেড় ঘণ্টার পথ ওশিয়া। বাসে বা গাড়ি ভাড়া করেও আসা যায়।   কলকাতা, দিল্লি ও মুম্বইয়ের যাত্রীরা রাতে ঘরে ফেরার ট্রেন পাবেন। জোধপুর-হাওড়া এক্সপ্রেস জোধপুর ছাড়ে রাত ৮.১৫ মিনিটে, হাওড়া পৌঁছোয় তৃতীয় দিন ভোর সোয়া ৪টেয়। অন্য জায়গার যাত্রীরা দিল্লি হয়ে ফিরুন।

ভ্রমণ ছক ৪: জয়পুর-মাউন্ট আবু-উদয়পুর-চিতৌরগড়-বুঁদি-রনথম্ভৌর-আগরা

প্রথম ও দ্বিতীয় দিন – জয়পুর (দেখুন ভ্রমণ ছক ২, প্রথম ও দ্বিতীয় দিন)

তৃতীয় ও চতুর্থ দিন – মাউন্ট আবু। জয়পুর থেকে ট্রেনে চলুন।  

৩৯৯৯ ফুট উঁচু মাউন্ট আবুর কাছের রেলস্টেশন আবু রোড, দূরত্ব ২৯ কিমি। জয়পুর থেকে ভোর ৪.২৫-এর যোগ এক্সপ্রেস আবু রোড পৌঁছে দেয় সকাল ১১.৪০-এ। আরও ট্রেন আছে, তবে সময়ের দিক থেকে এটিই সব চেয়ে সুবিধার। আবু রোড স্টেশন থেকে বাস বা গাড়ি ভাড়া করে মাউন্ট আবু পৌঁছে প্রথম দিন দেখে নিন সানসেট পয়েন্ট থেকে আরাবল্লির কোলে মনোরম সূর্যাস্ত। হনিমুন পয়েন্ট থেকেও সূর্যাস্ত দেখতে পারেন। কাছেই নক্কি লেক।

মাউন্ট আবু অবস্থানের দ্বিতীয় দিনে প্রথমে চলুন শহর থেকে ১৫ কিমি উত্তর-পূর্বে আরাবল্লির সর্বোচ্চ শিখর গুরুশিখর (৫৮১৩ ফুট), রয়েছে ব্রহ্মা-বিষ্ণু–মহেশ্বরের মন্দির, পাহাড়ের মাথায় দত্তাত্রেয় মুনির পায়ের ছাপ। এর পর দেখে নিন চৌহান রাজাদের তৈরি অচলগড়, গড় থেকে নীচে অচলেশ্বর শিবের মন্দির। এর পর চলে আসুন শ্বেতপাথরের জৈন মন্দিররাজি দিলওয়ারা, কারুকার্য, অলংকরণ ও ভাস্কর্যে অনন্য। শহরের কাছাকাছি এসে দেখে নিন অর্বুদাদেবী তথা অধরাদেবী তথা দুর্গার মন্দির। দেখে নিন নক্কি লেকের কাছে টোড রক। আগের দিন হনিমুন পয়েন্ট না যাওয়া হয়ে থাকলে চলুন সেখানে।

পঞ্চম থেকে অষ্টম দিন – উদয়পুর।

সকালেই বেরিয়ে পড়ুন মাউন্ট আবু থেকে, চলুন উদয়পুর, ১৬৪ কিমি। বাসে ঘণ্টা চারেক সময় লাগে। সকালের বাস ধরে এলে দুপুরের মধ্যে পৌঁছে যাবেন উদয়পুর। গাড়ি ভাড়া করেও আসতে পারেন।

উদয়পুরে প্রথম দিন দেখে নিন লেক পিছোলার পাড়ে সিটি প্যালেস।

উদয়পুর অবস্থানকালে দ্বিতীয় দিন একটা গাড়ি ভাড়া করে উদয়পুর দেখে নিন। দেখে নিন ক্রিস্টাল গ্যালারি, মহারানাদের ভিন্টেজ গাড়ির প্রদর্শনী, সিটি প্যালেসের উত্তরে জগদীশ মন্দির, পিছলি গ্রামে লেক পিছোলা ও লেকের মাঝে জগনিবাস প্রাসাদ, লেকের দক্ষিণ পাহাড়ে জগমন্দির, লেকের পিছনে সজ্জননিবাস বাগ, লেকের উত্তরে ফতেহ সাগর, ফতেহ সাগরের পূবে বাঁধের নীচে সহেলিয়োঁ–কি-বাড়ি, ফতেহ সাগরে রমণীয় দ্বীপ-উদ্যান নেহরু পার্ক, বিপরীতে মোতি মাগরি পাহাড়ে প্রতাপ স্মারক, শহর থেকে ৫ কিমি পশ্চিমে সজ্জনগড় তথা মনসুন প্যালেস, ৬ কিমি উত্তর-পশ্চিমে উদয়পুরের নবতম আকর্ষণ শিল্পীগ্রাম এবং শহর থেকে ৩ কিমি পুবে শিশোদিয়া রাজাদের অতীতের রাজধানী পাহাড়ে ঘেরা আহার।

তৃতীয় দিন তথা ভ্রমণের সপ্তম দিন একটা গাড়ি ভাড়া করে সারা দিনের জন্য বেরিয়ে পড়ুন শহর থেকে উত্তরে। চলুন রাজসমন্দ-কাঁকরোলি-নাথদ্বার-দেবীগড়-একলিঙ্গজি-নাগদা। প্রথমে চলুন ৬৩ কিমি দূরে রাজসমন্দ লেক এবং কাঁকরোলি। দেখুন মহারানা রাজ সিংহের তৈরি ৭.৭ বর্গ কিমি আয়তন বিশিষ্ট লেক, লেকের পাড়ে শিলালিপি, শ্বেতপাথরের ন’টি মণ্ডপ তথা নওচৌকি, বাগিচা, শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকাধীশ মন্দির ইত্যাদি। এ বার উদয়পুরের দিকে ১৮ কিমি এসে বৈষ্ণবতীর্থ নাথদ্বার, দেখুন শ্রীকৃষ্ণের মন্দির। নাথদ্বার থেকে উদয়পুরের দিকে প্রায় ২১ কিমি এগিয়ে এলে দেবীগড়, ১৮ শতকের ফোর্ট প্যালেস। আরও ৭-৮ কিমি এসে একলিঙ্গজি, ৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে তৈরি পিরামিড ধাঁচের মন্দির কমপ্লেক্স। উদয়পুরের দিকে একলিঙ্গজির একেবারে গায়েই নাগদা, রাওয়াল নাগাদিত্যের ১১ শতকের রাজধানী, প্রাচীন নগরী। ফিরে আসুন উদয়পুরে।

উদয়পুরে অবস্থানকালে শেষ দিন চলুন রনকপুর-কুম্ভলগড়-হলদিঘাটি। সক্কালেই গাড়ি ভাড়া করে বেরিয়ে পড়ুন। প্রথম গন্তব্য ৯৩ কিমি দূরের রনকপুর। ২৯টি জৈন মন্দিরের কমপ্লেক্স, দিলওয়ারাতুল্য। এখান থেকে চলুন ৩৩ কিমি দূরে আরাবল্লি পাহাড়ের ঢালে ৩৫৬৬ ফুট উঁচুতে কুম্ভলগড় দুর্গ। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাচীরে ঘেরা দুর্গ, রানা কুম্ভের তৈরি। দুর্গের নানা মহলে ফ্রেস্কো চিত্র। বহু মন্দির। র‍্যামপার্ট থেকে মাড়োয়ারের সমতল ও আরাবল্লির জঙ্গল-পাহাড় সুন্দর দৃশ্যমান। চার কিমি দূরে কুম্ভলগড় স্যাংচুয়ারি। এ বার উদয়পুর ফেরার পথে চলুন হলদিঘাটি, আকবরের বাহিনীর সঙ্গে রানা প্রতাপের সেই যুদ্ধস্থল, যেখানে প্রাণ দিয়েছিল প্রতাপের প্রিয় ঘোড়া চেতক, কুম্ভলগড় থেকে ৫০ কিমি। হলদিঘাটি দর্শন শেষে ফিরে আসুন ৪০ কিমি দূরের উদয়পুর।

নবম দিন – রাত্রিবাস চিতৌড়গড়।

উদয়পুর থেকে ট্রেনে সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ, বাসেও একই সময় লাগে। উদয়পুর-চিতৌড়গড় বাস চলে মুহুর্মুহু। এক দিন থেকে দেখে নিন রানি পদ্মিনী, জহরব্রত, মীরাবাঈ, রানা কুম্ভের স্মৃতিবিজড়িত চিতৌড়গড়।

দশম ও একাদশ দিন – রাত্রিবাস কোটা।

ট্রেন আছে বটে, তবে চিতৌড়গড় থেকে কোটা বাসে আসাই ভালো। ভোর থেকেই বাস রয়েছে। বাসের সময় লাগে সাড়ে চার ঘণ্টা থেকে ছ’ ঘণ্টা।

কোটায় দেখে নিন চম্বল নদীর পাড়ে রাও মাধো সিংজির গড়া দুর্গ। দেখে নিন বিভিন্ন মহল। দুর্গের ডাইনে মহারাজা মাধো সিং মিউজিয়াম। দেখুন ১৮ শতকের ভীম মহল, শহরের উত্তরে উমেদ ভ্রমণ প্রাসাদ, দুর্গের পিছনে চম্বলের ওপর কোটা ব্যারেজ, কিশোর সাগর, দ্বীপ মহল, ব্রিজরাজ ভবন প্রাসাদ ও জওহর বিলাস গার্ডেন। সন্ধ্যায় চম্বল উদ্যান অবশ্য দ্রষ্টব্য।

বুঁদির কেল্লার কথা নিশ্চয়ই মনে আছে, রবীন্দ্রনাথ যাকে স্মরণীয় করে গেছেন। সেই বুঁদির কেল্লা কোটা থেকে সাড়ে ৩৮ কিমি। আধ ঘণ্টা অন্তর বাস আছে। গাড়ি ভাড়া করেও যেতে পারেন বুঁদি। দ্বিতীয় দিনে চলুন বুঁদি। বাসে করে এলে অটো বা টাঙা ভাড়া করে দেখে নিন ১৩৫৪-য় রাজস্থান শৈলীতে তৈরি বুঁদির কেল্লা তথা তারাগড় ফোর্ট, শহরের প্রান্তে রানিজি কি বাউড়ি, কেল্লা থেকে ৫ কিমি উত্তর-পশ্চিমে ফুল সাগর প্রাসাদ, চোগান গেটে নগর সাগর কুণ্ড, ক্ষার বাগে রাজ পরিবারের ছত্তিশ, জৈৎ সাগর লেক, লেকের উত্তর পাড়ে সুখ নিবাস। বুঁদি থেকে ফিরুন কোটায়। 

দ্বাদশ দিন –  রাত্রিবাস রনথম্ভৌর/সোয়াই মাধোপুর।

কোটা থেকে রনথম্ভৌর ১৪৪ কিমি, বাসে তিন থেকে চার ঘণ্টার পথ। কিংবা বাসে বা ট্রেনে সোয়াই মাধোপুর এসে মিনিবাস বা গাড়িতে ১৪ কিমি দূরের রনথম্ভৌরে আসা যায়। সব চেয়ে ভালো হয় ট্রেনে এলে। প্রচুর ট্রেন আছে। তবে সব চেয়ে সুবিধাজনক ভোর ৫.২০-এর আগস্ট ক্রান্তি এক্সপ্রেস, ৫.৫৫-এর নিজামুদ্দিন শতাব্দী, ৭.১৫-এর যমুনা ব্রিজ আগরা প্যাসেঞ্জার অথবা  কিংবা ৭.৪০-এর দাওদাই এক্সপ্রেস। খুব বেশি হলে ঘণ্টা দুয়েক লাগে ট্রেনে। তবে সোয়া ৭টার প্যাসেঞ্জার ট্রেনটি একেবারে রনথম্ভৌর পৌঁছে দেয় কিছু কম তিন ঘণ্টা সময়ে।

দু’টো সাফারি করার চেষ্টা করুন। প্রথমটা যে দিন পৌঁছোবেন সে দিন বিকেলে, দ্বিতীয়টি পরের দিন সকালে। সাফারি করা ছাড়া আর দেখুন পাহাড়ের ওপর কেল্লা। পরের দিন সকালে সাফারি করে এসে কেল্লা দেখুন।  রাতের ট্রেন ধরে রওনা হয়ে যান আগরা।

ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ দিন – রাত্রিবাস আগরা।

ত্রয়োদশ দিন রনথম্ভৌর ঘুরে রাত ১১টার (রনথম্ভৌর থেকে) হলদিঘাটি প্যাসেঞ্জার ট্রেন ধরে পরের দিন সকাল ৬টায় পৌঁছে যান আগরা ফোর্ট স্টেশনে। আগরা কী ভাবে ঘুরবেন, দেখুন ভ্রমণ ছক ১, প্রথম ও দ্বিতীয় দিন   

পঞ্চদশ দিন – ঘরের পথে রওনা।

দেশের যে কোনো শহরের সঙ্গে ট্রেন পথে আগরার যোগাযোগ রয়েছে। না হলে দিল্লি হয়ে ঘরে ফিরুন। হাওড়া আসার ভালো ট্রেন হাওড়া-জোধপুর, আগরা ফোর্ট থেকে ছাড়ে সকাল ৫.৫৫ মিনিটে। তবে ভ্রমণের চতুর্দশ দিনে সময়টা একটু হিসেব করে নিলে ওই দিনই সন্ধে ৬.৫০-এ আগরা ফোর্ট অজমের-শিয়ালদহ এক্সপ্রেস ধরা যায়।

ভ্রমণ ছক ৫: জয়পুর-অজমের-জোধপুর-জৈসলমের-বাড়মের-মাউন্ট আবু-উদয়পুর-চিতৌড়গড়-বুঁদি-রনথম্ভৌর

প্রথম ও দ্বিতীয় দিন – জয়পুর (ভ্রমণ ছক ১, প্রথম ও দ্বিতীয় দিন)

তৃতীয় দিন – খুব ভোরে বেরিয়ে পড়ুন, পুষ্কর হয়ে চলুন জোধপুর, ৩৩৬ কিমি। রাত্রিবাস জোধপুর।   

চতুর্থ দিন – রাত্রিবাস জোধপুর। এ দিন দেখে নিন মেহরনগড় ফোর্ট ও দুর্গের পাদদেশে জশবন্ত সিংহের স্মারকসৌধ তথা ছত্তিশ জশবন্ত থাডা, উমেদ ভবন প্যালেস, কাছেই মহারাজার রেলওয়ে ক্যারেজ, সদর গভর্নমেন্ট মিউজিয়াম। বিকেলে চলুন ১০ কিমি পশ্চিমে কৈলানা হ্রদ, দেখুন সূর্যাস্ত। মন ভরে যাবে।

পঞ্চম দিন – জোধপুর থেকে ভোর ভোর বেরিয়ে পড়ুন। আজকের গন্তব্য জৈসলমের, পথে দেখতে দেখতে চলা। প্রথমে ১৫ কিমি উত্তরে বালসমন্দ হ্রদ। তার পর আরও ৩ কিমি গিয়ে ৬-১৪ শতকের পরিহারদের রাজধানী মান্ডোর। মান্ডোর দেখে চলুন ওশিয়া, ৫৩ কিমি, ৮-১১ শতকে পরিহারদের তৈরি হিন্দু ও জৈন মন্দিরগুলির ভাস্কর্য দেখার মতো। ওশিয়া থেকে পরবর্তী গন্তব্য ফালোদি, ৭৯ কিমি, দুর্গ, মন্দির, জাফরি কাটা নানা হাভেলি। এখান থেকে ৭ কিমি দূরে খিচেন, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসা হাজারো সারসের আবাসভূমি। ফিরে আসুন ফালোদি। চলুন ‘সোনার কেল্লা’ খ্যাত রামদেওরা, ৫০ কিমি, দেখে নিন ষোড়শ শতকের তনোয়ার রাজপুত সাধু বাবা রামদেবের মন্দির। পরমাণু পরীক্ষার জন্য খ্যাত পোখরন হয়ে সোজা পৌঁছে যান জৈসলমের, ১১৮ কিমি। পৌঁছোতে রাত হবে, অসুবিধা নেই। রাত্রিবাস জৈসলমের।          

ষষ্ঠ ও সপ্তম দিন – রাত্রিবাস জৈসলমের।

জৈসলমেরে প্রথম দিন সকালে দেখে নিন সোনার কেল্লা, রাজ কা মহল, নাথমলজি কি হাভেলি, পাটোয়া কি হাভেলি, সেলিম সিংজি কি হাভেলি, গদিসর লেক। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর খুরির পথে চলুন ডের্জার্ট ন্যাশনাল পার্কে (জৈসলমের থেকে ৯ কিমি), উটের গাড়িতে সাফারি করুন। সেখান থেকে চলুন খুরিতে (আরও ৩১ কিমি)। সূর্যাস্ত দেখে রাজস্থানের সংগীত-নৃত্য উপভোগ করে জৈসলমের ফিরুন। 

দ্বিতীয় দিন সকালে দেখে নিন ভাটি রাজাদের ছত্তীশ বড়াবাগ, ভাটি রাজাদের পূর্বতন রাজধানী লোধুর্বা ও মরুভূমির বুকে মরুদ্যান অমরসাগর। জৈসলমেরে ফিরে দুপুরের খাওয়া সেরে চলুন রাজকীয় বাগিচা মূলসাগর, মিউজিয়াম নগরী কুলধ্রা হয়ে স্যাম স্যান্ড ডিউনস (জৈসলমের থেকে ৪২ কিমি পশ্চিমে)। মরুভূমির বুকে রমণীয় সূর্যাস্ত দেখুন।

অষ্টম দিন – চলুন বাড়মের, ১৫৬ কিমি। পথে দেখে নিন জৈসলমের থেকে ১৭ কিমি দূরের উড ফসিল পার্কে, ১৮ কোটি বছরের ১৮টি জুরাসিক বৃক্ষের ফসিল। বাড়মেরে দেখুন পাহাড়ের শিরে শ্বেতপাথরের অষ্টভুজা দুর্গা, ৩৮ কিমি দূরে পাকিস্তান সীমান্তের পথে হাজার বছরের মন্দির স্থাপত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কিরাডু এবং শহর থেকে সাত কিমি দূরে মহাবাড় বালিয়াড়ি থেকে অপরূপ সূর্যাস্ত। রাত্রিবাস বাড়মের।  

নবম ও দশম দিন – রাত্রিবাস মাউন্ট আবু।

নবম দিনে সকাল সকাল বাড়মের থেকে বেরিয়ে পড়ুন, চলুন মাউন্ট আবু, ২৮৭ কিমি। ওই দিন মাউন্ট আবু পৌঁছে দেখে নিন সানসেট পয়েন্ট থেকে আরাবল্লির কোলে মনোরম সূর্যাস্ত। হনিমুন পয়েন্ট থেকেও সূর্যাস্ত দেখতে পারেন। কাছেই নক্কি লেক।

মাউন্ট আবু অবস্থানের দ্বিতীয় দিনে প্রথমে চলুন শহর থেকে ১৫ কিমি উত্তর-পূর্বে আরাবল্লির সর্বোচ্চ শিখর গুরুশিখর (৫৮১৩ ফুট), রয়েছে ব্রহ্মা-বিষ্ণু–মহেশ্বরের মন্দির, পাহাড়ের মাথায় দত্তাত্রেয় মুনির পায়ের ছাপ। এর পর দেখে নিন চৌহান রাজাদের তৈরি অচলগড়, গড় থেকে নীচে অচলেশ্বর শিবের মন্দির। এর পর চলে আসুন শ্বেতপাথরের জৈন মন্দিররাজি দিলওয়ারা, কারুকার্য, অলংকরণ ও ভাস্কর্যে অনন্য। শহরের কাছাকাছি এসে দেখে নিন অর্বুদাদেবী তথা অধরাদেবী তথা দুর্গার মন্দির। দেখে নিন নক্কি লেকের কাছে টোড রক। আগের দিন হনিমুন পয়েন্ট না যাওয়া হয়ে থাকলে চলুন সেখানে।

একাদশ, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ দিন – রাত্রিবাস উদয়পুর। 

একাদশ দিনে মাউন্ট আবু থেকে উদয়পুর সরাসরি (১৬৪ কিমি) না গিয়ে ঘুরে চলুন। প্রথমে চলুন রনকপুর, ১৬২ কিমি। ২৯টি জৈন মন্দিরের কমপ্লেক্স, দিলওয়ারাতুল্য। এখান থেকে চলুন ৩৩ কিমি দূরে আরাবল্লি পাহাড়ের ঢালে ৩৫৬৬ ফুট উঁচুতে কুম্ভলগড় দুর্গ। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাচীরে ঘেরা দুর্গ, রানা কুম্ভের তৈরি। দুর্গের নানা মহলে ফ্রেস্কো চিত্র। বহু মন্দির। র‍্যামপার্ট থেকে মাড়োয়ারের সমতল ও আরাবল্লির জঙ্গল-পাহাড় সুন্দর দৃশ্যমান। চার কিমি দূরে কুম্ভলগড় স্যাংচুয়ারি। কুম্ভলগড় দেখে উদয়পুর পৌঁছোতে পৌঁছোতে (৮৫ কিমি) সন্ধে।

উদয়পুর অবস্থানের দ্বিতীয় দিনে সকালে চলুন ‘রাজস্থানের খাজুরাহো’ জগত-এ, দূরত্ব ৩৫ কিমি, দেখুন আশ্চর্য ভাস্কর্যের অম্বিকামাতা মন্দির। উদয়পুর ফিরে এসে সিটি ট্যুর করুন।

উদয়পুরের দ্রষ্টব্য –

সিটি প্যালেস, ক্রিস্টাল গ্যালারি, মহারানাদের ভিন্টেজ গাড়ির প্রদর্শনী, সিটি প্যালেসের উত্তরে জগদীশ মন্দির, লেক পিছোলার মাঝে জগনিবাস প্রাসাদ, লেকের দক্ষিণ পাহাড়ে জগমন্দির, লেকের পিছনে সজ্জননিবাস বাগ, লেকের উত্তরে ফতেহ সাগর, ফতেহ সাগরের পূবে বাঁধের নীচে সহেলিয়োঁ–কি-বাড়ি, ফতেহ সাগরে রমণীয় দ্বীপ-উদ্যান নেহরু পার্ক, বিপরীতে মোতি মাগরি পাহাড়ে প্রতাপ স্মারক, শহর থেকে ৫ কিমি পশ্চিমে সজ্জনগড় তথা মনসুন প্যালেস, ৬ কিমি উত্তর-পশ্চিমে উদয়পুরের নবতম আকর্ষণ শিল্পীগ্রাম এবং শহর থেকে ৩ কিমি পুবে শিশোদিয়া রাজাদের অতীতের রাজধানী পাহাড়ে ঘেরা আহার।

দ্বিতীয় দিন যতটা সম্ভব দেখুন, বাকিটা তোলা থাক পরের দিনের দ্বিতীয়ার্ধের জন্য।

উদয়পুর অবস্থানের তৃতীয় দিনে অর্থাৎ ভ্রমণের ত্রয়োদশ দিনে সকালেই বেরিয়ে পড়ুন। প্রথমে চলুন একলিঙ্গজি, ২০ কিমি, ৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে তৈরি ১০৮ শ্বেতপাথরের মন্দির কমপ্লেক্স, নানান দেবতা। সেখান থেকে চলুন নাথদ্বার, ৩০ কিমি, ভারতের দ্বিতীয় সম্পদশালী মন্দির, বিগ্রহ শ্রীকৃষ্ণ। সেখান থেকে চলুন রানা প্রতাপ আর তাঁর প্রিয় ঘোড়া চেতকের স্মৃতিবিজড়িত হলদিঘাটি, ১৬ কিমি। উদয়পুর ফিরে (৪৬ কিমি) সিটি ট্যুরের বাকিটা সম্পূর্ণ করুন।

চতুর্দশ দিন – ভোরেই বেরিয়ে পড়ুন, প্রথমে চলুন চিতৌরগড়, ১১৯ কিমি। এর পর চলুন মেনাল, ৮৩ কিমি, ১২ শতকের শিবমন্দির আর জলপ্রপাতের জন্য প্রসিদ্ধ। সেখান থেকে চলুন বুঁদি, ৭৪ কিমি। রাত্রিবাস বুঁদি।

পঞ্চদশ দিন – সকালবেলায় বুঁদির কেল্লা দেখে চলুন সোয়াই মাধোপুর/রনথম্ভৌর, ১৪৪ কিমি। রাত্রিবাস সোয়াই মাধোপুর/রনথম্ভৌর।       

ষোড়শ দিন – সকালে রনথম্ভৌর ন্যাশনাল পার্কে সাফারি করে পাহাড়ের ওপর কেল্লা দেখুন। রাতে সোয়াই মাধোপুর স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে দিল্লি আসুন। সেখান থেকে ঘরপানে।

সোয়াই মাধোপুর থেকে দিল্লি যাওয়ার এক গুচ্ছ ট্রেন আছে।     

কোথায় থাকবেন

সব জায়গাতেই রয়েছে বেসরকারি হোটেল। হোটেল বুকিং-এর বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে তাদের সন্ধান পেয়ে যাবেন। অজমের, অলওয়র, ভরতপুর, বিকানের, চিতৌরগড়, জয়পুর, জৈসলমের, জোধপুর, কোটা, মাউন্ট আবু, সরিস্কা, সোয়াই মাধোপুর, উদয়পুরে পাবেন রাজস্থান পর্যটনের হোটেল। শিলিশেড়েও রাজস্থান পর্যটনের হোটেল আছে। অলওয়রে না থেকে, এখানেও থাকতে পারেন। আগরায় বেসরকারি হোটেল ছাড়াও পাবেন উত্তরপ্রদেশ পর্যটনের হোটেল।

কী ভাবে ঘুরবেন

রাজস্থানে রাস্তার অবস্থা খুব ভালো। বাস পরিবহণ ব্যবস্থা যথেষ্ট ভালো। তবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার সময় পথে কিছু দেখার থাকলে পয়েন্ট টু পয়েন্ট গাড়ি ভাড়া করে নেওয়া ভালো। আর বিভিন্ন শহরের দ্রষ্টব্য দেখার জন্য স্থানীয় গাড়ি বুক করে নেবেন। তবে জয়পুর শহরের দ্রষ্টব্যস্থানগুলি রাজস্থান পর্যটনের বাসে দেখতে পারেন। আগাম সিট পর্যটনের ওয়েবসাইট থেকে বুক করে নিতে পারেন।

ভ্রমণ ছক ৫-এর জন্য জয়পুর থেকে গাড়ি ভাড়া করে নেবেন। সেই গাড়িতে ঘুরে সোয়াই মাধোপুরে ছেড়ে দেবেন।  

প্রয়োজনীয় তথ্য

(১) ট্রেনের সময়ের জন্য দেখে নিন erail.in

(২) অনলাইন হোটেল বুকিং করার জন্য রাজস্থান পর্যটনের ওয়েবসাইট https://rtdc.tourism.rajasthan.gov.in/

(৩) অনলাইনে বুকিং-এর জন্য উত্তরপ্রদেশ পর্যটনের ওয়েবসাইট https://uptourism.gov.in/

(৪) বেসরকারি হোটেলের জন্য বিভিন্ন ওয়েবসাইট www.trivago.in/, www.tripadvisor.in, www.booking.com, www.tripsavvy.com/, www.makemytrip.com, www.yatra.com, www.holidayiq.com

(৫) অনলাইনে বাস বুকিং করার জন্য রাজস্থান পরিবহণ নিগমের ওয়েবসাইট https://rsrtconline.rajasthan.gov.in

(৬) অনলাইন বেসরকারি বাস বুকিং-এর জন্য দেখুন https://www.redbus.in, https://www.goibibo.com, https://bus.makemytrip.com/ ইত্যাদি ওয়েবসাইট।

(৭) রাজস্থান পর্যটনের কলকাতা অফিস – কমার্স হাউস, ২ গণেশচন্দ্র অ্যাভিনিউ, কলকাতা ৭০০০১৩, যোগাযোগ – ০৩৩ ২২১৩ ২৭৪০

(৮) জৈসলমেরে সোনার কেল্লা দেখার জন্য গাইডের সাহায্য নিন।

(৯) ডের্জার্ট ন্যাশনাল পার্কে সাফারি করার জন্য প্রয়োজনীয় ফি দিয়ে অনুমতিপত্র সংগ্রহ করতে হবে। জৈসলমেরে যে হোটেলে উঠবেন তারা বলে দেবে কোথায় এই অনুমতিপত্র মেলে।

(১০) মাউন্ট আবুতে রাজ্য পরিবহণের সারা দিনের কন্ডাক্টেড ট্যুরে দ্রষ্টব্যগুলো দেখে নিতে পারেন। সরকারি বাসস্ট্যান্ড থেকেই বাস মেলে।

(১১) উদয়পুরের সিটি প্যালেস দেখার জন্য গাইডের সাহায্য নেওয়া ভালো। ঘণ্টা তিনেক সময় লাগে।

(১২) রাজ্য পর্যটনের ব্যবস্থাপনায় কন্ডাক্টেড ট্যুরে চিতৌড়গড় দেখানোর ব্যবস্থা আছে। তবে মাঝে মাঝে এটি বন্ধ হয়ে যায়। চিতৌড়গড়ে যে হোটেলে উঠবেন সেখানে খোঁজ করে নেবেন। অন্যথায় গাড়ি ভাড়া করে নিন।

(১৩) ভ্রমণ ছক -১ অনুযায়ী তুফান এক্সপ্রেসে আগরা এলে আগরায় আরও এক দিন থাকার প্রয়োজন হতে পারে। কারণ ট্রেন যদি রাইট টাইমে পৌঁছোয়ও (যার সম্ভাবনা খুবই কম), হোটেলে ওঠার পর শহরের দু-একটি দ্রষ্টব্য ছাড়া কিছুই দেখা সম্ভব হবে না।

(১৪) ভ্রমণ ছক ৪-এ চিতৌড়গড় থেকে রাত্রি ১২.০৫-এর কোটা প্যাসেঞ্জার ধরলে ভোর ৫টায় কোটা পৌঁছোনো যায়। সে ক্ষেত্রে নবম দিন উদয়পুর থেকে চিতৌড়গড় এসে চিতৌড়গড় ঘুরে সে দিনই রাতে কোটা প্যাসেঞ্জার ধরা যায়। দশম দিনে কোটা-বুঁদি দেখে একাদশ দিন সকালেই সোয়াই মাধোপুর গেলে ভ্রমণ এক দিন কমিয়ে দেওয়া যায়।

(১৫) ভ্রমণ ছক ৪-এ কোটা থেকে ভোরের ট্রেন ধরতে পারলে ওই দিনই প্রথমে রনথম্ভৌর ফোর্ট দেখে নিতে পারেন। তার পর বিকেলে একটা সাফারি করুন। পরের দিন সকালে আরও একটা সাফারি করুন।

(১৬) রনথম্ভৌরে যে হোটেলে থাকবেন, সেখানে সাফারির ব্যাপারে খোঁজখবর করে নিন।

(১৭) ভ্রমণ ছক ৪-এ আগরা আগে ঘোরা থাকলে রনথম্ভৌর থেকে আগরা হয়ে সরাসরি ঘরে ফিরে যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ভ্রমণ দু’টো দিন কমে যেতে পারে।

0 Comments

Reply your comment

Your email address will not be published. Required fields are marked*