গন্তব্য, পশ্চিমবঙ্গ, পাহাড়, ভ্রমণ কাহিনি

জঙ্গল, পাহাড় ও কাঞ্চনময় তিনচুলে

a-visit-to-tinchuley-a-combination-of-jungle-mountain-and-kanchanjungha
ankita datta অঙ্কিতা দত্ত
অঙ্কিতা দত্ত

“এ তো গভীর জঙ্গল! সূর্যের আলো প্রায় ঢুকছেই না” – গাড়ি থেকে নেমেই জেঠু বললেন। এইমাত্র তিনচুলে এসে পৌঁছোলাম। দু’দিকের চা বাগান আর তার মাঝের রাস্তা দিয়ে গাড়ি করে আসতে আসতে চা বাগানের রেশ এখনও কাটেনি। তার মধ্যে আরেক নতুন চমক। আচ্ছা, এই জঙ্গলে কোনো জন্তু আছে? কী জন্তু? লেপার্ড না ভাল্লুক? এই সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে দেখলাম বাবা ঘরে যাওয়ার জন্য ডাকছে। বাবার পেছন পেছন ঘরে গেলাম।

আরও পড়ুন কাঁকসা, দেউল ও কেঁদুলির জয়দেব

গেস্ট হাউসের নাম অবিরাজ। ঘরে ঢুকেই মন ভালো হয়ে গেল। বিরাট বড়ো ঘর আর সামনে খোলা বারান্দা। ঘর থেকেই কাচের জানালা দিয়ে সব দেখা যায়, তবু বারান্দায় গেলাম। সামনেই চা বাগান। দূরের পাহাড়ে অনেক বাড়ি দেখা যাচ্ছে। এক দিকে কালিম্পং আর আরেক দিকে সিকিমের কিছু অংশ। আকাশ আংশিক মেঘলা। হালকা মেঘ খেলে বেড়াচ্ছে গাছেদের সঙ্গে। মনে হচ্ছে কয়েক দিন বেশ ভালোই কাটবে।

ফুলের ঝাড়।

স্নান করে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। তবে ঘুমোতে ইচ্ছে করল না। বারান্দাটা বড্ড টানছে। আবার চলে গেলাম। এ বার চেয়ার নিয়ে বসে পড়লাম। ভালো করে আবার চার দিক দেখলাম। চা বাগানের নীচে কয়েকটি বাড়ি। হয়তো চা বাগানের শ্রমিকদের বাড়ি। বারান্দার ডান পাশে একটি অ্যাসেলিয়া ফুলগাছের ঝাড় আছে। হোটেলের নিজস্ব বাগানেও অনেক রকম ফুলগাছ, তাতে হরেক ফুল।

চা শ্রমিকদের বাড়ি?

আকাশ এ বার কালো করে এসেছে। দূরের পাহাড়গুলো আর দেখা যাচ্ছে না। তবে চা বাগানে এখনও কাজ করছেন কিছু শ্রমিক। নীচের দিকের একটা বাড়িতে দেখলাম একটি মেয়ে তার পোষা কুকুরের সঙ্গে খেলছে। ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা। আস্তে আস্তে চারিদিক ঢেকে গেল মেঘে। আর চা বাগানের শ্রমিক বা মেয়েটি, কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। এ বার আমার ঘরে ফেরা উচিত কিন্তু বৃষ্টি দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। দেখতে লাগলাম বৃষ্টির শোভা। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি গাছের পাতায় পড়ছে, আবার ঝরে যাচ্ছে। বৃষ্টি নামার পরে আবার নীচের মেঘ পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির তেজ ধীরে ধীরে বেড়েই চলেছে। তার সঙ্গে বিদ্যুতের ঝলক। খুব ইচ্ছে হল ওই জঙ্গলটা দেখার। বারান্দা দিয়ে জঙ্গলটা দেখা যায় না। ওখানে গাছের পাতায় বৃষ্টি পড়ে কেমন লাগছে কে জানে। না! আর থাকা যাবে না। বৃষ্টির সঙ্গে হাওয়ার তেজ বাড়তে শুরু করেছে। বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে যাচ্ছি। ঘরে চলে এলাম।

কালিম্পং-এর দিকের আলোগুলো যেন ভারতের মানচিত্র।

প্রায় সারা সন্ধ্যা বৃষ্টি হল। বিকেলে বেরোনো গেলো না। ঘরে বসেই মোমো আর স্যুপ নিয়ে গানের আসর বসল। পরে রাতে খেতে যাওয়ার সময় বুঝলাম বৃষ্টি আর হচ্ছে না। খেয়ে এসে আবার বারান্দায় গেলাম। একী! এ যে চমকের পর চমক! বৃষ্টি তো কমে গিয়েছেই, দূরের পাহাড়ের গায়ের সব বাড়ির আলো জ্বলে উঠেছে! পাহাড়ের গায়ে যেন মণিমানিক্য বসিয়ে দিয়েছে কেউ। আরে! কালিম্পং-এর দিকের আলোগুলো একসঙ্গে কেমন ভারতের মানচিত্রের আকার নিয়েছে না? হ্যাঁ, তাই তো। আকাশ জুড়ে তারা জ্বলজ্বল করছে। বৃষ্টির কোনো চিহ্নই আর নেই। এই কারণেই বোধহয় গুণীজনেরা বলে গিয়েছেন, পাহাড় বড়োই চঞ্চল, বড়োই খামখেয়ালি।

আরও পড়ুন চলুন ঘুরে আসি: পাখিপাহাড়

পরের দিন ঘুম ভাঙল মায়ের ডাকে। বারান্দা পুব দিকে বলে ভোরের সূর্যের আলোয় ঘর আলোকিত। কিন্তু বারান্দায় বাবা আর জেঠু ক্যামেরা উত্তর দিকে তাক করে দাঁড়িয়ে আছে কেন? তবে কি!! দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে দেখি আহা! ঠিক তাই! সূর্যের আলো পড়ে চিকচিক করছে…। হ্যাঁ, কাঞ্চনজঙ্ঘা! বারান্দা থেকে দেখে যেনো মন ভরল না। বাবা আর জেঠুর পেছন পেছন আমিও চলে গেলাম ছাদে। চোখ ভরে দেখলাম আমাদের কাঞ্চনকে। মুগ্ধ চোখে চেয়ে কতক্ষণ বসে ছিলাম জানি না, বাবার ডাকে সম্বিত ফিরল। হাঁটতে বেরোনো হবে। এ বার জঙ্গলটাও দেখা যাবে ভালো করে।

জঙ্গলের পথে।

আকাশে ঝলমলে রোদ থাকা সত্ত্বেও জঙ্গলে কিন্তু রোদ ঢুকছে না। জঙ্গলে প্রধানত পাইন গাছ। তবে পাহাড়ের গায়ে গায়ে অ্যাসেলিয়ার ঝাড়ও আছে। নানা রকম লিলি আর অর্কিডও চোখে পড়ল। এ দিকে রোদ পড়ে না বলে রাস্তায় জল জমে আছে খানাখন্দে। পেছনে তাকালে গাছের ফাঁকে ফাঁকে আবার দেখা যাচ্ছে কাঞ্চনকে। সে যেন উঁকি দিয়ে আমাদেরই দেখছে।

আরও পড়ুন সুন্দরবন ছাড়াও ঘরের কাছে রয়েছে আরও এক ম্যানগ্রোভ অরণ্য, এই সপ্তাহান্তে চলুন…

কিছু দূর গিয়ে জঙ্গল শেষ হয়ে গেল। একটা কুকুরও যাচ্ছে আমাদের সঙ্গে। আমরা দাঁড়াতেই দেখি, সে লেজ নেড়ে আমাদের দিকে এল। একটু আদর করতেই আবার লেজ নেড়ে জল খেতে চলে গেল। আমরা আবার এগিয়ে চললাম। দেখি সে-ও আবার চলল আমাদের সঙ্গে সঙ্গে। এ দিকে কয়েকটি হোম স্টে আছে। গুরুঙ্গ গেস্ট হাউস আছে। একটা চায়ের দোকান দেখা গেল। দেখলাম একজন বয়স্ক মহিলা চা শুকোতে দিয়েছেন। জিজ্ঞেস করে জানলাম এটা অরগ্যানিক চা। ওই দোকানেই চা খেলাম। এ বার এই দিকটা একটু ঘোরা যাক। কিছুটা যেতেই একটি খেলার মাঠ চোখে পড়ল। জানলাম এই রাস্তা দিয়েই তাকদা যাওয়া যায়। হঠাৎ দূরের গাছে একটি লাল পাখি চোখে পড়ল। পিঠের দিকটা কালো, নীচের দিকটা লাল। লেজটাও কালো আর লাল মেশানো। জেঠু বললেন পাখিটি হল স্কারলেট মিনিভেট, বাংলায় যাকে বলে আলতাপরী। কী সুন্দর দেখতে পাখিটি।

কাঞ্চনের উঁকি।

এ বার আবার ফেরার পালা। আবার সেই জঙ্গলের রাস্তায়। কুকুরটি কিন্তু এখনও আমাদের সঙ্গেই আছে। কত ছোটো বাচ্চা হেঁটে হেঁটে স্কুলে যাচ্ছে। খুব হিংসা হল। ওরা কী সুন্দর দূষণমুক্ত সুন্দর পরিবেশে থাকে। আমাদের তো আবার সেই শহরে ফিরতে হবে। যা-ই হোক আবার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে দেখতে ফিরে এলাম। আমাদের হোটেলে পৌঁছে দিয়ে কুকুরটি নিশ্চিন্তে ফিরে গেল। এখন একটু একটু করে মেঘ গ্রাস করছে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে। দূরের আকাশে এক টুকরো মেঘ আছে বটে তবে রোদ ঝলমল করছে। মনে হচ্ছে এই জায়গার যিনি নাম দিয়ে থাকুন না কেনো, নামটি একদম স্বার্থক। চা বাগান, জঙ্গল ও কাঞ্চনময় ‘তিন’চুলে। আহা যদি সারা জীবন থাকতে পারতাম এখানে। কতই না ভালো হত!

কী ভাবে যাবেন

ভারতের যেখানেই থাকুন, তিনচুলে যেতে গেলে আপনাকে প্রথমে পৌঁছোতে হবে নিউ জলপাইগুড়ি বা বাগডোগরা বিমানবন্দর। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে তিনচুলের দূরত্ব ৭৪ কিমি, বাগডোগরা থেকে ৭৭ কিমি। এই পথে বাস চলে না। শেয়ার জিপ অবশ্য পাওয়া যায়। তবে গাড়ি ভাড়া করে যাওয়াই সব থেকে ভালো। অবশ্য যে জায়গায় থাকবেন তাদের বলে রাখলে নিউ জলপাইগুড়ি বা বাগডোগরায় গাড়ি পাঠিয়ে নিয়ে যাবে।

কোথায় থাকবেন

তিনচুলেতে বেশ কিছু রিসর্ট-হোমস্টে রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অবিরাজ হোমস্টে (৯৭৪৯৩৭০৯৬৫, ০৭৬০২৮৫০৩২), গুরুং গেস্ট হাউস (৯৯৩৩০৩৬৩৩৬, ৯৪৩৪৫১৪৬১৪)।

ছবি: অনুপম দত্ত

5 Comments

5 Comments

  1. বিদ্যুৎ দে
    August 9, 2018 at 12:01 am

    বাহ সহজ সরলতায় সুন্দর।

  2. RATHIN CHAKRABORTY
    August 9, 2018 at 1:07 am

    Khub valo lekha hoyeche…tobe kothay thakben ki khaben jatio tothyo na diye aar ektu ros de, manush der niye r ektu bol…bujhte parchi amader vat marbi…tobe setai amader sabcheye baro anondo

  3. Amit
    August 9, 2018 at 1:25 pm

    The binding of the writing is commendable. ভালো লাগল।

  4. ডা অশোক কুমার ঘোষ
    August 9, 2018 at 3:55 pm

    লেখার ধরনটা ভাল, দিনলিপি ধরনে। রথীনের বক্তব্যর সাথে একমত। প্রাকৃতিক জিনিসের নাম দিলে সঠিক হ‌ওয়া উচিত, এসেলিয়া হবেনা, হবে এজেলিয়া। আর‌ও ভাল লেখা চাই।

  5. জয়ন্তী গুহরায়
    August 9, 2018 at 6:17 pm

    খুব সাবোলিল লেখা। পড়ে যেনো মনে হলো আমিও একই সাথে ঘুরে আসলাম।

Reply your comment

Your email address will not be published. Required fields are marked*