ভ্রমণ অনলাইন ডেস্ক: ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে কলকাতার অবদান অনস্বীকার্য। এই শহরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা ৫টি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান হল: ভবানীপুরের নেতাজি ভবন, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, কলেজ স্ট্রিটের ইন্ডিয়ান কফি হাউস (আলবার্ট হল), বিবাদী বাগ এলাকার রাইটার্স বিল্ডিং এবং আলিপুর জেল মিউজিয়াম।
নীচে কলকাতার এই ৫টি ঐতিহাসিক স্থানের বিস্তারিত ইতিহাস এবং ২০২৬ সালের বর্তমান সময়সূচি ও নির্দেশিকা দেওয়া হল:

নেতাজি ভবন (এলগিন রোড)
ইতিহাস: ১৯০৯ সালে নেতাজির বাবা জানকীনাথ বসু এই বাড়িটি তৈরি করেন। ১৯৪১ সালের ১৬ জানুয়ারি গভীর রাতে ব্রিটিশ পুলিশের নজরদারি এড়িয়ে এই বাড়ি থেকেই সুভাষচন্দ্র বসু ছদ্মবেশে এক ঐতিহাসিক মহানিষ্ক্রমণ ঘটান। বর্তমানে এটি নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক মানের সংগ্রহশালা।
প্রধান আকর্ষণ: নেতাজির শোবার ঘর, পড়ার ঘর, তাঁর ব্যবহৃত ঐতিহাসিক জার্মান ‘ওয়ান্ডারার’ গাড়ি এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের বহু স্মৃতিচিহ্ন।
দেখার সময়সূচি: মঙ্গলবার থেকে রবিবার, সকাল ১১:০০ থেকে সন্ধ্যা ৬:০০ পর্যন্ত. (সোমবার সাপ্তাহিক বন্ধ)।
টিকিটমূল্য: প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৫০ টাকা এবং ১২ বছরের কম বয়সিদের জন্য ২০ টাকা।
কী ভাবে যাবেন: মেট্রো করে ‘নেতাজি ভবন’ স্টেশনে নেমে মাত্র কয়েক মিনিটের হাঁটা পথ। বাসে এলগিন রোডের মোড়ে নেমে হেঁটে পৌঁছোনো যায়।

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি (রবীন্দ্র ভারতী মিউজিয়াম)
ইতিহাস: এটি প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের অষ্টাদশ শতাব্দীতে নির্মিত ঠাকুর পরিবারের আদি বাসস্থান। এই বাড়িতেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ও প্রয়াণ ঘটে. ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় এটি ছিল স্বদেশি ভাবাবেগের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
প্রধান আকর্ষণ: কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত ঘরগুলি, তাঁর আঁকা মূল চিত্রকর্ম, পাণ্ডুলিপি এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কবির সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে তৈরি গ্যালারি।
দেখার সময়সূচি: মঙ্গলবার থেকে রবিবার, সকাল ১০:৩০ থেকে বিকেল ৫:০০ পর্যন্ত. (সোমবার বন্ধ থাকে)।
টিকিটমূল্য: ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ৩০ টাকা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ টাকা (আইডি কার্ড আবশ্যক)।
বিশেষ নিয়ম: মিউজিয়ামের ভেতরে জুতো পরে প্রবেশ নিষেধ এবং গ্যালারির অভ্যন্তরে ছবি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
কী ভাবে যাবেন: মেট্রোয় এলে নামতে হবে মহাত্মা গান্ধী রোড বা গিরীশ পার্ক স্টেশনে। তারপর হাঁটাপথ। আর বাসে গেলে মহাজাতি সদন বাস স্টপে নেমে হাঁটাপথ।

ইন্ডিয়ান কফি হাউস (কলেজ স্ট্রিট)
ইতিহাস: ১৮৭৬ সালে এটি ‘আলবার্ট হল’ নামে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ভারতের স্বাধীনতা সংক্রান্ত বহু রাজনৈতিক সভার সাক্ষী। স্বাধীনতা আন্দোলনের যুগে মাস্টারদা সূর্য সেন, নেতাজি সুভাষচন্দ্র এবং বহু তরুণ বিপ্লবী এখানে এসে রাজনৈতিক আলোচনা ও গোপন বৈঠক করতেন।
প্রধান আকর্ষণ: এর ঐতিহ্যবাহী বড় হলঘর, বিশাল জানালা এবং আজও বজায় থাকা আড্ডার পরিবেশ।
যাওয়ার সময়সূচি: প্রতিদিন সকাল ৯:০০ থেকে রাত ৯:০০ পর্যন্ত খোলা থাকে (রবিবার সকালের দিকে কিছুটা দেরিতে খোলে)।
প্রবেশমূল্য: কোনো প্রবেশমূল্য নেই, তবে নিজের খরচায় কফি ও স্ন্যাক্স খেতে পারেন।
কী ভাবে যাবেন: কফি হাউস কলেজ স্ট্রিটে, মহাত্মা গান্ধী রোডের মোড়ের কাছেই। শহরের যে কোনো জায়গা থেকে বাসে চলে আসুন এই মোড়ে। মেট্রোয় এলে নামতে হবে মহাত্মা গান্ধী রোড স্টেশনে। তারপর হাঁটা পথে কয়েক মিনিট।

রাইটার্স বিল্ডিং বা মহাকরণ (বিবাদী বাগ)
ইতিহাস: ১৭৭৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জুনিয়র ক্লার্ক বা ‘রাইটার্স’দের থাকার জন্য এটি তৈরি হয়। ১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর বিনয়, বাদল ও দীনেশ ইউরোপীয় পোশাকে এই ভবনে ঢুকে অত্যাচারী ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্নেল সিম্পসনকে গুলি করে হত্যা করেন। এই ঘটনা ‘অলিন্দ যুদ্ধ’ নামে খ্যাত।
বর্তমান অবস্থা: এটি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভবন এবং এর সংস্কার কাজ চলছে.
প্রয়োজনীয় তথ্য: যেহেতু এটি একটি সক্রিয় সরকারি কার্যালয় এবং হেরিটেজ ভবন, তাই সাধারণ পর্যটকদের এর ভেতরে অবাধ প্রবেশাধিকার নেই। তবে বিবাদী বাগ চত্বরে হেঁটে এই ভবনের বাইরে থেকে এর ঐতিহাসিক গ্রেকো-রোমান স্থাপত্য এবং বিনয়-বাদল-দিনেশের স্মারক দেখা যায়।
কী ভাবে যাবেন: শহিদ ক্ষুদিরাম-দক্ষিণেশ্বর মেট্রো লাইনে এসপ্ল্যানেড স্টেশনে নেমে হেঁটে চলে যান বিবাদী বাগ। হাওড়া ময়দান-সেক্টর ফাইভ মেট্রো লাইনে মহাকরণ স্টেশন। ইচ্ছা করলে এসপ্ল্যানেড স্টেশনে মেট্রো বদল করে মহাকরণ স্টেশনে আসতে পারেন।

আলিপুর জেল (বর্তমানে আলিপুর মিউজিয়াম)
ইতিহাস: ব্রিটিশরাজের সময় দেশের প্রথম সারির বিপ্লবীদের এই সংশোধনাগারগুলিতে বন্দি রেখে নির্যাতন করা হত। অরবিন্দ ঘোষ (আলিপুর বোমা মামলার সময়), নেতাজি, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ-সহ বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী এখানে বন্দি ছিলেন। ক্ষুদিরাম বসু এবং প্রমোদরঞ্জন চৌধুরীর মতো মহান বিপ্লবীদের এখানেই ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল।
বর্তমান অবস্থা: এই ঐতিহাসিক জেলটিকে এখন একটি আধুনিক স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগ্রহশালা বা ‘আলিপুর জেল মিউজিয়াম’-এ রূপান্তরিত করা হয়েছে।
দেখার সময়সূচি: মঙ্গলবার থেকে রবিবার, দুপুর ১২:০০ থেকে সন্ধ্যা ৬:০০ পর্যন্ত খোলা থাকে (সোমবার বন্ধ)।
প্রধান আকর্ষণ: ফাঁসি মঞ্চ, বিশেষ সেলেব বন্দিদের সেল (যেমন নেহরু সেল), এবং বিপ্লবীদের স্মরণে তৈরি লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো।
টিকিটমূল্য: ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ৩০ টাকা এবং লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শোয়ের জন্য মাথাপিছু ১০০ টাকা।
কী ভাবে যাবেন: যতীন দাস পার্ক মেট্রো স্টেশনে নেমে সেখানে থেকে অটো বা টোটোয় পৌঁছোনো যায়। আলিপুরগামী বাসে চেপেও এখানে আসা যায়। ন্যাশনাই লাইব্রেরি স্টপেজে নেমে হেঁটে পৌঁছোনো যাবে। হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে ক্যাব ভাড়া করে যাওয়া যেতে পারে।




