২৫ হাজার ইঁদুরের রাজত্ব! রাজস্থানের এই মন্দিরে লাড্ডু-মিষ্টিই তাদের প্রসাদ, সাদা ইঁদুর দেখলে মেলে আশীর্বাদ

রাজস্থানের দেশনোকে করণীমাতা মন্দিরে ২৫ হাজারেরও বেশি ইঁদুরকে পবিত্র বলে মানা হয়। জানুন মন্দিরের কিংবদন্তি, ইতিহাস, স্থাপত্য, সাদা ইঁদুরের মাহাত্ম্য ও যাতায়াতের তথ্য।

মার্বেলের মেঝে। চারদিকে কারুকাজখচিত দেওয়াল। অথচ সেই মন্দিরের আনাচে-কানাচে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে হাজার হাজার ইঁদুর। কেউ গর্ত থেকে মুখ বার করছে, কেউ আবার ভক্তদের দেওয়া দুধ, শস্য কিংবা মিষ্টির প্রসাদে ভাগ বসাচ্ছে। শুনতে অবাক লাগলেও রাজস্থানের দেশনোকে এটাই বাস্তব। এখানেই রয়েছে বিখ্যাত করণীমাতা মন্দির, যা ‘র‍্যাট টেম্পল’ নামেও পরিচিত।

বীকানের থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের এই মন্দিরে রয়েছে ২৫ হাজারেরও বেশি ইঁদুর। স্থানীয়ভাবে যাদের ‘কাবা’ বলা হয়, তাদের সাধারণ ইঁদুর হিসেবে দেখা হয় না। ভক্তদের বিশ্বাস, তারা করণীমাতার বংশধর ও অনুগামীদের পুনর্জন্ম। তাই মন্দির চত্বরে তাদের অবাধ বিচরণ, খাবার দেওয়া এবং সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।

ইঁদুরের সঙ্গে জড়িয়ে কোন কিংবদন্তি?

করণীমাতার সৎপুত্র লক্ষ্মণ কপিল সরোবরে ডুবে মারা গিয়েছিলেন বলে প্রচলিত কাহিনি। শোকে কাতর করণীমাতা যমের কাছে লক্ষ্মণের প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার প্রার্থনা করেন। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত যম রাজি হলেও শর্ত দেন—করণীমাতার বংশের মানুষ মৃত্যুর পর ইঁদুররূপে পুনর্জন্ম নেবেন এবং পরে আবার মানবজীবনে ফিরবেন। সেই থেকেই এই মন্দিরের ইঁদুরগুলি ভক্তদের কাছে পবিত্র।

তাই ইঁদুর হত্যা এখানে গুরুতর অপরাধ বলে মনে করা হয়। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, কোনও ইঁদুর অনিচ্ছাকৃতভাবে মারা গেলেও তার বদলে রুপো বা সোনার ইঁদুর দান করার প্রথার কথা জানা যায়। হাজার হাজার ইঁদুরের মধ্যে সাদা ইঁদুর অত্যন্ত বিরল এবং বিশেষ পবিত্র বলে মনে করেন ভক্তরা। তাদের দর্শনকে শুভ বলেও মনে করা হয়।

শুধু ইঁদুর নয়, মন্দিরের স্থাপত্যও নজরকাড়া

মন্দিরটির বর্তমান রূপ গড়ে ওঠে বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় বীকানেরের মহারাজা গঙ্গা সিংহের আমলে। সাদা মার্বেলের কারুকাজ এবং রুপোর দরজা মন্দিরের অন্যতম আকর্ষণ। অন্তঃপুরে অধিষ্ঠিত করণীমাতার মূর্তিটি প্রায় ৭৫ সেন্টিমিটার উচ্চতার; এক হাতে ত্রিশূল, মাথায় মুকুট এবং গলায় মালা।

করণীমাতা ও তাঁর ‘সন্তান’ ইঁদুরদের জন্য মন্দিরে দুধ, শস্য, মিষ্টি-সহ নানা ধরনের ভোগের ব্যবস্থা থাকে। ইঁদুরদের খাওয়া প্রসাদও অনেক ভক্ত পবিত্র বলে গ্রহণ করেন।

কখন যাবেন, কী ভাবে যাবেন?

রাজস্থানের দেশনোক শহরে অবস্থিত এই মন্দির বীকানগর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে। দেশনোক রেলস্টেশন মন্দিরের কাছেই। প্রতিদিন ভোর ৪টে থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মন্দির খোলা থাকে। চৈত্র ও আশ্বিন—দুই নবরাত্রিতে এখানে বড় মেলা বসে এবং সেই সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু ভক্তের সমাগম হয়।

রাজস্থানের ধর্মীয় বিশ্বাস, লোককথা এবং সংস্কৃতির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন দেখতে চাইলে বীকানের ভ্রমণের সঙ্গে দেশনোকের করণীমাতা মন্দিরও রাখা যেতে পারে তালিকায়। কারণ, একই ছাদের নীচে দেবীর আরাধনা আর হাজার হাজার ইঁদুরের অবাধ বিচরণ—ভারতের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিতে এমন দৃশ্য সত্যিই বিরল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *