প্রতিদিনের ব্যস্ততা, অফিসের চাপ, ভ্যাপসা গরম আর শহরের যানজট— সব মিলিয়ে মন আর শরীর দুটোই যেন হাঁফিয়ে উঠছে। তবে সব সময় তো অফিসে টানা ছুটি পাওয়া যায় না। দু-এক দিনেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। তাই সপ্তাহান্তে দু’দিনের ছোট্ট ছুটি কাটাতে অনেকেই খোঁজেন কলকাতার কাছাকাছি এমন কিছু জায়গা, যেখানে খুব বেশি খরচও হবে না, আবার মনের ক্লান্তিও দূর হবে। পরিবার, বন্ধু কিংবা সঙ্গীর সঙ্গে উইকএন্ড ট্রিপের জন্য এই পাঁচটি জায়গা হতে পারে আদর্শ।
হেনরি আইল্যান্ড
কলকাতার কাছাকাছি নিরিবিলি সমুদ্রসৈকতের খোঁজ করলে চোখ বন্ধ করে চলে যেতে পারেন হেনরি আইল্যান্ড। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বকখালির কাছেই অবস্থিত এই ছোট্ট দ্বীপ প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে যেন এক স্বর্গ। এখানে দিঘার মতো ভিড় নেই। নেই অতিরিক্ত কোলাহল। বরং ম্যানগ্রোভ বন, কাঁকড়ায় ভরা সমুদ্রসৈকত, পাখির ডাক আর শান্ত পরিবেশ— সব মিলিয়ে দু’দিনের ছুটির জন্য আদর্শ জায়গা।গরমের সময়েও সকালে ও বিকেলে এখানকার আবহাওয়া বেশ উপভোগ্য। বিশেষ করে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় হেনরি আইল্যান্ডের সৌন্দর্য অন্য মাত্রা পায়।
কী ভাবে যাবেন?
ট্রেনে
শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখা থেকে নামখানা লোকাল ধরে নামখানা পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে টোটো বা গাড়িতে বকখালি হয়ে হেনরি আইল্যান্ড পৌঁছানো যায়।বর্তমানে হাতানিয়া-দোয়ানিয়া নদীর উপর সেতু হওয়ায় যাতায়াত আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে।
গাড়িতে
কলকাতা থেকে প্রায় ১৩০-১৪০ কিলোমিটার দূরে।
সময় লাগে আনুমানিক ৪-৫ ঘণ্টা। কলকাতা → বিদ্যাসাগর সেতু → ডায়মন্ড হারবার রোড (NH12) → আমতলা → ডায়মন্ড হারবার → কাকদ্বীপ → নামখানা → বকখালি → হেনরি আইল্যান্ড
কী কী দেখবেন?
হেনরি আইল্যান্ড বিচ: এই জায়গার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নির্জন সমুদ্রসৈকত। বিস্তীর্ণ বালুচর, লাল কাঁকড়ার দল আর শান্ত পরিবেশ মন ভাল করে দেয়। জোয়ারের সময় সমুদ্র অনেকটা এগিয়ে আসে। আবার ভাটার সময় বিশাল বালুচর দেখা যায়। ফটোগ্রাফির জন্য অসাধারণ জায়গা।
ওয়াচ টাওয়ার: হেনরি আইল্যান্ডের ওয়াচ টাওয়ার থেকে চারপাশের ম্যানগ্রোভ বন, মাছের ভেড়ি আর সমুদ্রের দৃশ্য দেখা যায়। সূর্যাস্তের সময় এখানে পর্যটকদের ভিড় সবচেয়ে বেশি হয়।
ম্যানগ্রোভ বন
সমুদ্রের দিকে যাওয়ার রাস্তার দু’পাশে ম্যানগ্রোভের সৌন্দর্য আলাদা অনুভূতি দেয়। সকালে হাঁটতে বেরোলে নানা ধরনের পাখিও দেখা যায়।
বকখালি
হেনরি আইল্যান্ড গেলে কাছেই বকখালিও ঘুরে নেওয়া যায়।
বকখালি সমুদ্রসৈকত, ১৬ মাথার খেজুর গাছ এবং ফ্রেজারগঞ্জ মৎস্যবন্দর অনেকেই দেখতে যান।
কোথায় থাকবেন?
হেনরি আইল্যান্ডে থাকার সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গা পশ্চিমবঙ্গ মৎস্য উন্নয়ন নিগমের ট্যুরিস্ট কমপ্লেক্স। এখানে কটেজ ও AC রুম দু’ধরনের ব্যবস্থাই রয়েছে। সমুদ্রের খুব কাছেই থাকার সুযোগ পাওয়া যায়। এ ছাড়াও বকখালিতে বিভিন্ন হোটেল বাজেট লজ , রিসর্ট, হোমস্টে পাওয়া যায়।

গড় জঙ্গল
পূর্ব বর্ধমান জেলার এই বনাঞ্চল একদিকে যেমন ইতিহাসে মোড়া, তেমনই প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছেও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। শাল, সেগুন, পিয়ালের জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে প্রাচীন মন্দির, লোককথা আর রহস্য। গরমের সময়েও সকালের দিকে এখানে আবহাওয়া তুলনামূলক মনোরম থাকে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির মধ্যে কয়েকটা শান্ত দিন কাটানোর জন্য গড় জঙ্গল আদর্শ জায়গা। পূর্ব বর্ধমান জেলার দুর্গাপুরের কাছে অবস্থিত একটি বনাঞ্চল। অজয় নদীর ধারে বিস্তৃত এই এলাকা ইতিহাস ও ধর্মীয় কাহিনির জন্য বিখ্যাত। অনেকের মতে, মহাভারতের সময়ের সঙ্গেও এই জায়গার যোগ রয়েছে। আবার স্থানীয়দের বিশ্বাস, ডাকাত রঘু ডাকাত নাকি এখানে কালীপুজো করতেন।
কী ভাবে যাবেন?
ট্রেনে
হাওড়া থেকে দুর্গাপুর বা পানাগড়গামী ট্রেনে যেতে হবে।
দুর্গাপুর স্টেশন থেকে গাড়ি ভাড়া করে গড় জঙ্গল পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা। কলকাতা → বিদ্যাসাগর সেতু → কোনা এক্সপ্রেসওয়ে → দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে (NH19) → পানাগড় → দুর্গাপুর ব্যারেজ → শিবপুর মোড় → গড় জঙ্গল।
গাড়িতে
কলকাতা থেকে দূরত্ব প্রায় ১৮০-২০০ কিলোমিটার।
সময় লাগে প্রায় ৪-৫ ঘণ্টা।
কী কী দেখবেন?
শ্যামরূপা মন্দির
গড় জঙ্গলের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এই প্রাচীন শ্যামরূপা মন্দির। স্থানীয় কাহিনি অনুযায়ী, বহু শতাব্দী আগে এখানে তন্ত্রসাধনা হত। মন্দির ঘিরে এখনও রহস্যের আবহ টের পাওয়া যায়।
অজয় নদীর পাড়
গড় জঙ্গলের কাছ দিয়েই বয়ে গিয়েছে অজয় নদী। বিকেলের দিকে নদীর ধারে বসে সময় কাটানো অনেকেরই পছন্দ। সূর্যাস্তের সময় পরিবেশ অসাধারণ লাগে।
ইছাই ঘোষের দেউল
গড় জঙ্গল থেকে খুব দূরে নয় ইছাই ঘোষের দেউল। প্রাচীন এই ইটের মন্দির ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ। বাংলার পুরনো স্থাপত্যের অসাধারণ নিদর্শন এটি।
কোথায় থাকবেন?
গড় জঙ্গলের ভিতরে থাকার ব্যবস্থা খুব সীমিত। তাই বেশিরভাগ পর্যটক দুর্গাপুর বা পানাগড়ে থাকেন। এখানে পাওয়া যায়: হোটেল , রিসর্ট ইকো স্টে, বনবাংলো ধরনের কিছু থাকার জায়গা
চাঁদপুর
পূর্ব মেদিনীপুরের ছোট্ট গ্রাম চাঁদপুর এখন ধীরে ধীরে অফবিট ট্রাভেলারদের মধ্যে জনপ্রিয় হচ্ছে। রূপনারায়ণ নদীর ধারে শান্ত পরিবেশ, সবুজ মাঠ আর নির্জনতা— এই জায়গার মূল আকর্ষণ। গরমের সময়েও নদীর ধারে সকাল ও সন্ধ্যার আবহাওয়া বেশ মনোরম লাগে। যাঁরা ভিড় এড়িয়ে দু’দিন শান্তিতে কাটাতে চান, তাঁদের জন্য এটি আদর্শ।
কী কী দেখবেন?
• রূপনারায়ণ নদীর পাড়
• গ্রামের কাঁচা রাস্তা ও সবুজ প্রকৃতি
• সূর্যাস্তের দৃশ্য
• স্থানীয় জেলে গ্রাম
কী ভাবে যাবেন?
হাওড়া থেকে কোলাঘাট বা তমলুকগামী ট্রেনে গিয়ে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করতে হবে।
নিজস্ব গাড়িতে গেলে প্রায় ৩-৪ ঘণ্টা লাগে। কলকাতা → বিদ্যাসাগর সেতু → কোনা এক্সপ্রেসওয়ে → NH16 (মুম্বই রোড) → কোলাঘাট → নন্দকুমার → তমলুক → চাঁদপুর।
কোথায় থাকবেন?
এখানে নদীর ধারে কয়েকটি রিসর্ট ও হোমস্টে রয়েছে।
বড়ন্তি লেক
পশ্চিম বর্ধমানের ছোট্ট অফবিট গ্রাম বড়ন্তি যেন প্রকৃতির কোলে লুকিয়ে থাকা এক শান্ত ঠিকানা। সাঁওতাল অধ্যুষিত এই গ্রামে ঢুকলেই চোখে পড়ে লাল মাটির রাস্তা, দূরে সারি সারি পাহাড় আর চারপাশ জুড়ে সবুজের বিস্তার। রমের সময়েও সকাল-বিকেলের আবহাওয়া এতটাই মনোরম যে শহরের ক্লান্তি মুহূর্তে দূর হয়ে যায়।
ট্রেনে
হাওড়া থেকে আসানসোল, আদ্রা বা রানিগঞ্জগামী ট্রেনে যেতে পারেন। সবচেয়ে সুবিধাজনক হল মুরাডি স্টেশন। সেখান থেকে গাড়িতে মাত্র ১৫-২০ মিনিটে বারান্তি পৌঁছে যাওয়া যায়।
গাড়িতে
গাড়িতে গেলে সময় লাগে প্রায় ৬-৭ ঘণ্টা। কলকাতা → দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে → আসানসোল → মুরাডি → বারান্তি।
কী-কী দেখবেন?
বারান্তি লেক
ভোরের কুয়াশা আর বিকেলের সূর্যাস্ত— দুটো সময়ই লেকের সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে। অনেকেই এখানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেন।
গড়পঞ্চকোট
বারান্তি থেকে খুব কাছেই গড়পঞ্চকোট। পাহাড়ের কোলে অবস্থিত এই প্রাচীন দুর্গ ও মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ।
মুরাডি পাহাড়
ছোট্ট ট্রেকিং করতে চাইলে মুরাডি পাহাড় ঘুরে দেখতে পারেন। খুব কঠিন ট্রেক নয়। উপরে উঠলে চারপাশের লাল মাটি আর লেকের দৃশ্য একসঙ্গে দেখা যায়।
কোথায় থাকবেন?
বারান্তিতে এখন বেশ কিছু সুন্দর রিসর্ট ও ইকো স্টে তৈরি হয়েছে।
এখানে পাওয়া যায় লেক ভিউ রিসর্ট , কটেজ , বাজেট হোটেল, ইকো রিসর্ট।
জুনপুট
দিঘা থেকে খুব বেশি দূরে নয় জুনপুট। কিন্তু ভিড়ের তুলনায় অনেকটাই শান্ত। সমুদ্র, ঝাউবন আর নির্জন পরিবেশের জন্য জায়গাটি দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। গরমের সময় দুপুরে রোদ থাকলেও সকাল ও বিকেলের হাওয়া বেশ আরাম দেয়।
কী কী দেখবেন?
• জুনপুট সমুদ্রসৈকত
• ঝাউবন
• মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র
• দরিয়াপুর লাইটহাউস
• কাছেই শংকরপুর
কী ভাবে যাবেন?
হাওড়া থেকে কাঁথি পর্যন্ত ট্রেনে গিয়ে গাড়িতে জুনপুট পৌঁছানো যায়।
কলকাতা থেকে সড়কপথে প্রায় ৫ ঘণ্টা লাগে। কলকাতা → বিদ্যাসাগর সেতু → কোনা এক্সপ্রেসওয়ে → NH16 → কোলাঘাট → নন্দকুমার → কাঁথি (কন্টাই) → জুনপুট
কোথায় থাকবেন?
সমুদ্রের ধারে রিসর্ট নতুন নতুন অনেক রিসর্ট গড়ে উঠেছে। সেগুলিরই একটায় থাকতে পারেন। এ ছাড়াও সরকারি টুরিস্ট লজও রয়েছে। একটু খুঁজলে বাজেটের মধ্যেও হোটেল পেয়ে যাবেন।




