ভ্রমণ কাহিনি

নবাবি শহর মুর্শিদাবাদে : শেষ পর্ব

papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

হাজারদুয়ারী পরের দিনের জন্য তুলে রাখা ছিল। তাই হাজারদুয়ারী থেকে তিন কিলোমিটার উত্তরে কাঠগোলার উদ্দেশে রওনা দেওয়া। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মনে হয়েছিল চষে ফেলা হবে মুর্শিদাবাদের দর্শনীয় জায়গাগুলো। কিন্তু আর যেন শরীর দিচ্ছে না। মিসেস দত্তের মন শরীর হঠাৎ খারাপ হতে থাকায় ছেঁটে ফেলা হচ্ছে প্রতি কদমের সঙ্গে নির্ধারিত সূচি। ডাক্তার এক টানা কোনো কিছু করতে বারণ করেছেন। অগত্যা…।

জগৎ শেঠ উপাধিকৃত মানিকচাঁদ-ফতেচাঁদদের কুঠিবাড়ি বা প্রাসাদ ঘেঁষে পথ গিয়েছে কাঠগোলায়। লক্ষ্মীপৎ সিং দুগর ১৭৮০ সালে এই প্রাসাদ-বাগিচা নির্মাণ করেন। বাগিচায় বিখ্যাত ছিল কাঠগোলাপ। সেই থেকে নাম কাঠগোলা। পাশ্চাত্য শৈলীর নানা বিলাসসামগ্রী মনোরম করে তুলেছে প্রাসাদকে।

আরও পড়ুন নবাবি শহর মুর্শিদাবাদে : প্রথম পর্ব

কাছেই নসীপুর রাজপ্রাসাদ। হিন্দু দেবদেবীর প্রাধান্য থাকায় তা দেবালয়ের রূপ নিয়েছে। এখানে ঝুলনেরও প্রসিদ্ধি আছে। অদূরেই মোহনদাসের আশ্রম। পথ গিয়েছে এগিয়ে।

nimakharam deuri, lalbag
নিমকহারাম দেউড়ি।

ইতালীয় স্থাপত্যে নির্মিত জাফরাগঞ্জ দেউড়ি মিরজাফরের প্রাসাদ চোখে পড়ল। ধ্বংসের পথে সবই। একই পথে মিরজাফরের পুত্র মিরনের প্রাসাদ। মাত্র ২০ বছর বয়সে সিরাজ-উদ্‌-দৌল্লা এই বাড়িতে খুন হন। বিধ্বস্ত প্রাসাদটি মূক হয়ে দাঁড়িয়ে আজও। নাম হয়েছে নিমকহারাম দেউড়ি। শোনা যায় সিরাজের বিরুদ্ধে চক্রান্তের ব্লুপ্রিন্ট তৈরি হয় এই বাড়িতে। চোখে পড়ে সিরাজের বিলাসিতার হিরা ঝিল। একটু বসে বিশ্রাম নেওয়া। ভোর চারটে ওঠা শরীর আর দেয় না। শুধু তো দেখা নয়, মনে মনে বইয়ের পাতার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া। স্মৃতি থেকে টেনে তুলে আনার কী বিড়ম্বনা। ক্লান্তি বাড়ে। পৌর অতিথিনিবাসের কাছাকাছি ভাগীরথীর ঘাটের কাছে পঞ্চলিঙ্গের শিবের মন্দির। অদূরে কালীমন্দির, সেখানে শুরু হয়েছে সন্ধ্যারতি।

পরের দিন টোটো ঠিক সময় হাজির। আমাদের গন্তব্য ভাগীরথীর ওপারে খোসবাগ। টোটো উঠে গেল দেশীয় ভেসেল-এ। ভয়ে দুরু দুরু মন। ডাঙায় নামতে স্বস্তি। শান্ত স্নিগ্ধ আনন্দের বাগিচা খোসবাগ। নবাব আলিবর্দি, নবাব সিরাজ, বেগম লুতফাউন্নেষা সহ নবাব পরিবারের নানা জন এখানে চিরনিদ্রায় নিদ্রিত। হয়তো প্রিয়জনেরা এক সঙ্গে আছেন বলেই আনন্দের বাগিচা। নবাব আলিবর্দি খাঁ দিল্লির জামা মসজিদের অনুকরণে ৭.৬৫ একর জমির উপরে খোসবাগ বা ‘গারডেন অফ হ্যাপিনেস’ তৈরি করেন।

khosbag, lalbag
খোসবাগ।

ভাগীরথীর তীরে ডাহাপাড়াঘাটের কাছে আছে শ্রীজগদ্বন্ধু ধাম। পরম বৈষ্ণব জগদ্বন্ধুর জন্ম এই ডাহাপাড়ায়। প্রভুর জন্মমাসে বৈশাখে উৎসবের জাঁক দেখা যায়।

হাজারদুয়ারীর ডাকে কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদে আসা। বেলা ১০টা, টিকিট কাটার সময় এসে গিয়েছে। আগেই খোসবাগ ঘোরা হয়ে গিয়েছে। নবাব নাজিম হুমায়ুন জাঁ-র বসবাসের জন্য ব্রিটিশ স্থপতি স্যার ডানকান ম্যাকলিয়ডের নকশায় ইতালিয়ান শৈলীতে নির্মিত এই নবাব-প্রাসাদ। ৮০ ফুট উঁচু তিনতলার গম্বুজবিশিষ্ট ১২০ ঘরের এক হাজার দরজাসমেত প্রাসাদে নবাবিমহলের নানা নিদর্শন প্রদর্শিত। বাইরের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য ৯০০টি দরজা আসল ও ১০০টি কৃত্রিম দরজা। কথিত, নবাবের প্রাসাদ নামে খ্যাত হলেও নবাব নাজিম এই বাসগৃহে বসবাস করতেন না। কেবল মহারানি ভিক্টোরিয়ার পুরস্কার দেওয়া ১৬১টি ঝাড়যুক্ত বাতির নীচে রুপোর সিংহাসনে দরবারে বসতেন। চাইনিজ পোরসেলিনের প্লেটগুলির অভিনবত্ব হল নবাবরা এই প্লেটে খেতেন। খাবারে বিষ মেশানো থাকলে পাত্রগুলি ফেটে যেত। অস্ত্রাগারে অস্ত্রভাণ্ডার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

প্রাসাদের সামনে আছে মদিনা মসজিদ। মায়ের সাধ পূরণের জন্য শিয়াদের পতনভূমি কারবালার মাটি এনে তৈরি করিয়েছিলেন এক গম্বুজের এই মসজিদ। আছে ঘড়িঘর, বাচ্চাওয়ালি কামান ও প্রাসাদের বিপরীতে বড়ো ইমামবাড়া। সিরাজের তৈরি সম্পূর্ণ কাঠের বড়ো ইমামবাড়াটি আগুনে পুড়ে যায়। পরে বাংলার এই বৃহৎ ইমামবাড়া তৈরি করেন নবাব নাজিম মনসুর আলি।

তাড়াহুড়ো করে নবাবের মাটি ঘুরেফিরে দেখা যায় না। তাই বেশ নবাবি মেজাজ নিয়ে ও সময় নিয়ে আসাই শ্রেয়। (শেষ)

heerajhil, lalbag
হিরাঝিল।

কী ভাবে যাবেন

শিয়ালদহ/কলকাতা স্টেশন থেকে মুর্শিদাবাদ ট্রেনে পৌনে চার ঘণ্টা থেকে পৌনে পাঁচ ঘণ্টার পথ। সারা দিনই ট্রেন আছে। সময় জানতে দেখে নিন erail.in

কলকাতা থেকে বাসেও যেতে পারেন মুর্শিদাবাদ। এসপ্ল্যানেড থেকে সারা দিন নানা সরকারি, বেসরকারি বাস ছাড়ে বহরমপুরের উদ্দেশে, দূরত্ব ২২৮ কিমি। সেখান থেকে লালবাগ ১১ কিমি। বাস আছে। গাড়ি ভাড়া করেও যেতে পারেন লালবাগ।

কোথায় থাকবেন

লালবাগে নেতাজি রোডে পুরসভার অতিথিনিবাসটি ভালো। যোগাযোগ ০৩৪৮২ ২৭০০৩৩। এ ছাড়াও বেশ কিছু বেসরকারি হোটেল ও লজ আছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হোটেল সাগ্নিক (www.hotelsagnik.com), হোটেল গ্রিনহাউস (www.murshidabadhotelgreenhouse.in), হোটেল ইন্দ্রজিৎ (hotelindrajit.in), হোটেল রেমন্ড (www.hotelraymond.com), সৌরভ লজ (www.souravlodge.com), হোটেল মঞ্জুষা (hotelmanjusha.com), হোটেল অন্বেষা (hotelanwesha.com), নিরঞ্জন নিবাস লজ (যোগাযোগ ০৯৭৩২৭ ৬৫৬৩১) ইত্যাদি।

এ ছাড়াও বহরমপুরে থাকতে পারেন। রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের টুরিস্ট লজ। অনলাইন বুকিং www.wbtdcl.com । অনেক বেসরকারি হোটেলও আছে।

ছবি: লেখক

 

Leave a Comment

Your email address will not be published.

You may also like