Categories
অন্য রাজ্য ইতিহাস/স্থাপত্য হেরিটেজ

ঘরে বসে মানসভ্রমণ: রন-ভূমির সদর ভুজ

ভ্রমণ অনলাইন ডেস্ক: বাঙালি ভ্রমণার্থীদের কাছে গুজরাত আর খুব একটা অপরিচিত জায়গা নয়। তবে বেশির ভাগ বাঙালি পর্যটকই গুজরাত বলতে বোঝেন উপকূল গুজরাত অর্থাৎ দ্বারকা, পোরবন্দর, সোমনাথ আর দিউ, গির ফরেস্ট, জুনাগড়, অমদাবাদ এবং তার আশপাশ, বুনো গাধা দেখার জন্য কচ্ছের লিটল্‌ রন, আর খুব বেশি হলে ধোলাভিরা, মধেরা, পাটন, জামনগর ইত্যাদি। তাঁদের ভ্রমণসূচিতে ব্রাত্যই থেকে যায় কচ্ছের গ্রেট রন, যার মধ্যমণি ভুজ। অথচ এই রন-ভূমিই বোধহয় গুজরাতের সব চেয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ জায়গা। পাকিস্তান সীমান্ত সংলগ্ন এই জায়গা আমাদের মধ্যে নানা কৌতূহলও সৃষ্টি করে।

তাই ভ্রমণ অনলাইন এ বার মানসভ্রমণে নিয়ে যাচ্ছে ভুজ। ঘরবন্দি থাকার অবসরে পড়ুন, আবিষ্কার করুন রন-ভূমিকে এবং ভবিষ্যৎ-ভ্রমণের পরিকল্পনা তৈরি করে রাখুন।       

hamirsar lake and bhuj city
হামিরসর লেক ও ভুজ শহর।

উঁচু নিচু পাহাড়ি জমির ওপর ১৫১০ সালে ভুজ শহর প্রতিষ্ঠা করেন মহারাও হামির। ১৫৪৯ সালে মহারাও প্রথম খেঙ্গারজি ভুজকে কচ্ছের রাজধানী করেন। তার পর থেকে বার ছয়েক আক্রান্ত হয়েছে ভুজ। ঘূর্ণিঝড়, খরা, ভূমিকম্প-সহ নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। ২০০১-এর ভূমিকম্পে কার্যত বিধ্বস্ত হয়েছে ভুজ। আবার নতুন করে গড়ে উঠেছে শহর। ১৯৪৭-এ ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ব্রিটিশ করদ রাজ্য কচ্ছ স্বাধীন ভারতে শামিল হয়। ১৯৬০-এ তৎকালীন বোম্বে থেকে কেটে গুজরাত প্রদেশের জন্ম হলে কচ্ছ রাজ্যের একটি জেলা হয় এবং ভুজ হয় সেই জেলার সদর শহর।

সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের ভাণ্ডার ভুজ। সে দিনের ভুজ ছিল দুর্গনগরী। আজকের ভুজ পুরোনো আর নতুন শহর নিয়ে। পুরোনো শহর প্রাচীরে ঘেরা দুর্গের মধ্যে। সেই প্রাচীরের বিশেষ কিছু অবশিষ্ট নেই। অনেকটাই ধ্বংস হয়েছে ২০০১-এর ভূমিকম্পে আর কিছুটা শহরের উন্নয়ন যজ্ঞে বলি হয়েছে। তবে আজও গৌরবময় ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে পুরোনো শহরের পাঁচটি গেট, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মহাদেব গেট।       

Prag Mahal Palace
প্রাগ নহল প্রাসাদ।

ভুজে কী দেখবেন

(১) হামিরসর লেক – পুরোনো শহরের বিধ্বস্ত প্রাচীর ঘেঁসে ২৮ একর এলাকা জুড়ে এই লেক, ভুজ শহরের প্রাণ। স্থানীয় তিনটি নদীর জল ধরে রেখে শহরবাসীদের জল সরবরাহ করার জন্য এই লেক তৈরি করা হয়। এখানে প্রচুর ফ্লেমিঙ্গো, পেলিক্যান আসে। মূলত বর্ষা-নির্ভর এই লেক। তাই যে বছর ভুজে ভালো বৃষ্টি হয়, সে বছর আনন্দে ভাসে ভুজ।

(২) দরবারগড় ফোর্ট তথা রয়্যাল প্যালেস – এই রয়্যাল প্যালেস কমপ্লেক্সেই রয়েছে ষোড়শ শতকে নির্মিত আয়না মহল তথা ‘হল অফ মিররস্‌’ – সার্থক নামকরণ – আলো জ্বালালে একটি আলোই লক্ষ আলো হয়ে ওঠে আয়না-খচিত মহলে।

(৩) প্রাগ মহল প্রাসাদ – আয়না মহলের কাছেই প্রাগ মহল প্রাসাদ। ইতালীয়-গথিক শৈলীতে উনিশ শতকে তৈরি। এখানেই রয়েছে ৪৫ মিটার উঁচু ক্লক টাওয়ার, যার ওপরে উঠে ভুজ শহর দেখা কখনোই মিস করা উচিত নয়।       

(৪) শারদ বাগ প্যালেস – হামিরসর লেকের পুবে সুন্দর বাগিচার মাঝে ১৮৬৭-তে গড়া এই প্রাসাদ।

(৫) ছতরদি – হামিরসর লেকের পশ্চিম তীর ঘেঁষে রয়েছে লাখপতজি, দ্বিতীয় রায়ধনজি আর দেসরজির লাল বেলেপাথরের সমাধি সৌধ তথা ছত্তিশ।  

(৬) কচ্ছ মিউজিয়াম – হামিরসর লেকের দক্ষিণ পুব তীরে মহাদেব গেটের বিপরীতে গোলাপি মর্মরের কচ্ছ মিউজিয়াম। অভিনবত্ব ও বৈচিত্র্যে ভরা সংগ্রহ রয়েছে গুজরাতের এই প্রাচীনতম (১৮৭৭ সালে তৈরি) এই মিউজিয়ামে।

(৭) ভুজিয়া দুঙ্গার ও ভুজিয়া ফোর্ট – সাপেদের রাজা ভুজঙ্গের নামে এই দুঙ্গারের (পাহাড়) নাম ভুজিয়া দুঙ্গার। জাদেজা রাজারা সপ্তদশ শতকে এই পাহাড় ঘিরে দুর্গ তৈরি করেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর দখলে ছিল এই দুর্গ। তবে ২০০১-এর ভূমিকম্পের পর তারা তাদের নতুন আস্তানায় চলে যায়। দুর্গ আজ অনেকটাই ধ্বংস, তবে দুর্গের প্রাচীর বরাবর সিঁড়ি দিয়ে উঠে উপর থেকে ভুজ শহরের দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

(৮) রামকুণ্ড স্টেপড্‌ ওয়েল – কচ্ছ মিউজিয়ামের পিছনেই রামকুণ্ড, গুজরাতের ঐতিহ্যমণ্ডিত ধাপওয়ালা কুয়া (স্টেপড্‌ ওয়েল)। কাছেই রাম ধুন মন্দির।      

tapakeshwari temple
টপকেশ্বরী দেবীর মন্দির।

(৯) টপকেশ্বরী দেবী মন্দির – ভুজ শহর থেকে ৯ কিমি।

(১০) ভূজোডি – ভুজ শহর থেকে ১০ কিমি দূরে ভূজোডি কার্যত শিল্পীগ্রাম। কচ্ছের নানা ধরনের হস্তশিল্পের কাজ দেখে নিতে পারেন এখানে। ইচ্ছা করলে কেনাকাটাও করতে পারেন।  কাছেই আছে আশাপুরা ক্র্যাফটস পার্ক। কাছেই আছে শ্রুজন – শতাধিক গ্রামের সাড়ে ৩ হাজার মহিলার এমব্রয়ডারি শিল্পের কর্মযজ্ঞ চলছে।

এ ছাড়াও ভুজ শহরে দেখে নিন স্বামীনারায়ণ মন্দির, ভারতীয় সংস্কৃতি দর্শন মিউজিয়াম ইত্যাদি।            

lakhhpat
লাখপত।

ভুজ থেকে চলুন

(১) ভোর ভোর বেরিয়ে পড়ুন ভুজ থেকে। রন-ভূমি ভেদ করে প্রথমে চলুন মাতা নো মাঢ়, ৯৪ কিমি। দেখে নিন মা আশাপুরা মন্দির। এখান থেকে চলুন লাখপত (দুর্গনগরী, গুরু নানকের স্মৃতিধন্য), ৪১ কিমি। এখানে খানিকক্ষণ কাটিয়ে চলুন নারায়ণ সরোবর, ৩৩ কিমি। এখান থেকে ২ কিমি দূরে কচ্ছ উপসাগরের তীরে ভারতের শেষ প্রান্ত কোটেশ্বর, দেখে নিন কোটিলিঙ্গেশ্বরের মন্দির। কোটেশ্বর থেকে চলে আসুন মাণ্ডবী, ১৪৬ কিমি। এখানে দেখে নিন বিজয়বিলাস প্রাসাদ, উপভোগ করুন সাগরবেলাসূর্যাস্ত দেখে ফিরে চলুন, ৫৮ কিমি।

koteshwar
কোটেশ্বর।

(২) ভুজ থেকে আজও বেরিয়ে পড়ুন সকাল সকাল। প্রথমে চলুন দিনোধর পাহাড় (১২৬৬ ফুট), ৬৫ কিমি। পাহাড়চুড়োয় আছে ধোরামনাথের মন্দির। কথিত আছে, এখানে ১২ বছর ধরে ধোরামনাথ প্রায়শ্চিত্ত করেছিলেন। এই দিনোধার পাহাড় ট্রেকিং-এর আদর্শ জায়গা। উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীকুলের আদর্শ বাসস্থান। পাহাড়তলিতেও রয়েছে ধোরামনাথ-সহ এক গুচ্ছ মন্দির। দিনোধার পাহাড় থেকে চলুন কিরো দুঙ্গার, এক মৃত আগ্নেয়গিরি। এখানে শামুক, শঙ্খ-সহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর জীবাশ্ম দেখতে পাওয়া যায়, যার বয়স সাড়ে ছ’ কোটি বছর। কিরো দুঙ্গার থেকে চলুন চাদওয়া রখল, ৬৮ কিমি, (রখল হল সংরক্ষিত বনাঞ্চল, কচ্ছের প্রাক্তন শাসকরা এ রকম প্রায় ৪৫টি বনাঞ্চল তৈরি করেছিলেন কচ্ছে) – মন জুড়োনোর ভালো জায়গা।  চাদওয়া রখল থেকে ফিরে চলুন ভুজ, ২৫ কিমি।

(৩) ভুজ থেকে এক দিনের জন্য বেরিয়ে পড়ুন সাদা রন দেখতে। প্রথমে চলুন ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের কাছে কালো দুঙ্গার (কালো পাহাড়), দূরত্ব ৯০ কিমি। কচ্ছের সর্বোচ্চ পাহাড়, ১৫১৫ ফুট উঁচু। পাহাড়চুড়ো থেকে কচ্ছের গ্রেট রন উপভোগ করুন। পাহাড়শীর্ষে রয়েছে দত্তাত্রেয় (একই শরীরে তিন মাথা – ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর) মন্দিরসূর্যাস্ত দেখুন, মন্দিরে সন্ধ্যারতি দেখে নেমে আসুন। চলুন ধোরদো, ৪৮ কিমি। সাদা রনভূমি দেখার সর্বোত্তম জায়গা ধোরদো। রাত্রিবাস এখানে। ভোরে রনে সূর্যোদয় দেখুন। ধোরদোয় সকলটা কাটিয়ে ফিরে আসুন ভুজ। ফেরার পথে দেখে নিন – কোটেতে (৭৩ কিমি) সোলাঙ্কি আমলে (১০ থেকে ১৪ শতক) তৈরি মন্দির, কেউ বলেন শিব কেউ বলেন সূর্য মন্দির, মন্দিরের কারুকাজ দেখার মতো; রুদ্রমাতায় (কোটে থেকে ১১ কিমি) দেখে নিন রুদ্রাণী মন্দির। ফিরুন ভুজ, ১৭ কিমি।

dinodhar
দিনোধর পাহাড়।

কী ভাবে যাবেন

ট্রেনপথে ও বিমানপথে যুক্ত ভুজ। তবুও ভুজ যেতে হলে দেশের অনেক প্রান্ত থেকেই সরাসরি যাওয়া যায় না। অমদাবাদ বা মুম্বই থেকে যেতে হয়। কলকাতা থেকে ভুজ যাওয়ার সরাসরি ট্রেন সাপ্তাহিক (শনিবার) শালিমার-ভুজ এক্সপ্রেস, শালিমার থেকে ছাড়ে রাত ৮.২০ মিনিটে, ভুজ পৌঁছোয় তৃতীয় দিন বিকেল সাড়ে ৪টেয়।

ট্রেন বদল করে চলুন –

(১) গান্ধীধামে বদলগর্ভ এক্সপ্রেস প্রতি সোমবার রাত ১১টায় হাওড়া ছেড়ে তৃতীয় দিন বিকেল সাড়ে ৪টেয় গান্ধীধাম পৌঁছোয়। গান্ধীধাম থেকে ভুজ ৫৭ কিমি, বাস ও গাড়ি পাবেন।

(২) অমদাবাদে বদল – দৈনিক হাওড়া-অমদাবাদ এক্সপ্রেস, ত্রিসাপ্তাহিক হাওড়া-পোরবন্দর-ওখা এক্সপ্রেস বা সাপ্তাহিক কলকাতা-অমদাবাদ এক্সপ্রেসে অমদাবাদে এসে ট্রেনে বা বাসে চলুন ভুজ। অমদাবাদ থেকে রাত ১১.৫৯-এর দাদার-ভুজ এক্সপ্রেস এবং রাত্রি ২.০৫ মিনিটের কচ্ছ এক্সপ্রেস ভুজ পৌঁছে দেয় যথাক্রমে সকাল ৭টা এবং সকাল ৮.৫০ মিনিটে। এ ছাড়াও ত্রিসাপ্তাহিক ও দ্বিসাপ্তাহিক ট্রেনও আছে। তবে সব ট্রেনই আসে মুম্বই থেকে। তাই কলকাতা থেকে এলে অমদাবাদের পরিবর্তে মুম্বইয়ে ট্রেন বদল করার সুবিধার।

আরও পড়ুন: ঘরে বসে মানসভ্রমণ: তিন দিকে সাগর দিয়ে ঘেরা মুরুদেশ্বর

(৩) মুম্বইয়ে বদল – হাওড়া থেকে মুম্বই যাওয়ার অনেক ট্রেন আছে। মুম্বই থেকে ভুজ যাওয়ার ট্রেন – (১) দাদার-ভুজ এক্সপ্রেস – বিকেল ৩টেয় দাদার ছেড়ে ভুজ পৌঁছোয় পরের দিন সকাল ৭টায়; (২) কচ্ছ এক্সপ্রেস – বিকেল পৌনে ৬টায় বান্দ্রা টার্মিনাস ছেড়ে ভুজ পৌঁছোয় পরের দিন সকাল ৮.৫০ মিনিটে। আরও সাপ্তাহিক, দ্বিসাপ্তাহিক ট্রেনও আছে।   

(৪) দিল্লিতে বদল – হাওড়া থেকে দিল্লি যাওয়ার অনেক ট্রেন আছে। দিল্লি থেকে ভুজ যাওয়ার ট্রেন – (ক) আলা হজরত এক্সপ্রেস – বরেলি থেকে ট্রেনটি আসে। দিল্লি থেকে মঙ্গল, বৃহস্পতি ও শনিবার ছাড়ে সকাল ১১.৫০ মিনিটে, ভুজ পৌঁছোয় পরের দিন দুপুর ২.০১ মিনিটে; (খ) বরেলি-ভুজ এক্সপ্রেস – সপ্তাহের বাকি চার দিন দিল্লি থেকে ছাড়ে সকাল ১১.৫০ মিনিটে, ভুজ পৌঁছোয় পরের দিন সকাল সাড়ে ৯টায়।

kalo dungar
কালো দুঙ্গার।

কী ভাবে ফিরবেন

ভুজ থেকে সরাসরি কলকাতা ফিরতে পারেন। ভুজ-শালিমার এক্সপ্রেস প্রতি মঙ্গলবার দুপুর ২.৩০ মিনিটে ভুজ থেকে ছেড়ে শালিমার পৌঁছোয় বৃহস্পতিবার সকাল ১০.০৫ মিনিটে। গান্ধীধাম থেকেও ফেরার ট্রেন ধরতে পারেন। গর্ভ এক্সপ্রেস প্রতি শনিবার বিকেল ৫:৪০-এ ছেড়ে হাওড়া পৌঁছোয় সোমবার দুপুর ১:১০-এ।

তা ছাড়া মুম্বই, অমদাবাদ ও দিল্লিতে ট্রেন বদল করেও ফিরতে পারেন। ভুজ থেকে বিমানেও ফেরা যায়।  

কোথায় থাকবেন

ভুজ এবং ধোরদোয় আপনাকে থাকতে হবে বেসরকারি ব্যবস্থায়। প্রচুর হোটেল, লজ, রিসর্ট আছে। নেট সার্চ করলে পেয়ে যাবেন।  

mandvi
মাণ্ডবী সৈকত।

জেনে রাখুন

ট্রেন সম্পর্কে বিশদ তথ্য পেতে হলে দেখুন erail.in

অমদাবাদ থেকে ভুজের বাস যোগাযোগ খুবই ভালো। নেট সার্চ করলে প্রচুর বাসের সন্ধান পাবেন।

ট্রেনের বদলে বিমানে মুম্বই বা অমদাবাদ এসে সেখান থেকে ট্রেনে বা বিমানে আসতে পারেন ভুজ। নেট সার্চ করলে বিমান পরিষেবার খবর পাবেন।

ভুজের প্রায় প্রতিটি দ্রষ্টব্য ভবন আজ মিউজিয়ামে রূপান্তরিত। সব জায়গাতেই ঢোকার জন্য কিছু না কিছু দর্শনী লাগে।

কচ্ছের হস্তশিল্প হল এখানকার কৃষ্টি – কাচ বসানো সূচিশিল্পের চোখ ধাঁধানো এমব্রয়ডারি, পাথর, দারু ও চর্মজাত হস্তশিল্প, উলেন শাল, এমব্রয়ডারি করা শয্যাসম্ভার – স্মারক হিসাবে সংগ্রহ করে নিয়ে যেতে পারেন ভুজ থেকে।

Categories
ভ্রমণের খবর

নরেন্দ্র মোদীর চা স্টল হবে পর্যটনস্থল

ভ্রমণ অনলাইনডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ছেলেবেলার কথা নিশ্চয়ই শুনেছেন? তাঁর পরিবারের সকলের খাওয়াপরার দায়িত্ব ছিল তাঁরই কাঁধে। তিনি তখন ছিলেন স্টেশনের এক সামান্য চা বিক্রেতা। ছেলেবেলার সেই ‘চায়েওয়ালা’ থেকে এখন তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী, যা সাধারণ মানুষের কাছে সত্যিই শিক্ষণীয়।

জানা যায়, গুজরাতের বাদনগর (নরেন্দ্র মোদীর জন্মভূমি) স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে একটি চায়ের স্টলে চা বিক্রি করতেন মোদী। সেখানে তিনি নিজেই চা বানিয়ে যাত্রীদের খাওয়াতেন। এই স্টলকে ঘিরেই একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী প্রহ্লাদ সিং পটেল সম্প্রতি বাদনগর ঘুরে এসে এই সিদ্ধান্ত নেন।

এই চায়ের দোকানটির বড়োই জীর্ণ অবস্থা। তবে পর্যটনমন্ত্রী এই দোকানটির ঐতিহ্য নষ্ট করতে চান না। দোকানটিকে তার পুরোনো রূপে রেখেই কাচের শেড দিয়ে ঘিরে দেওয়া হবে। দোকানটি সংস্কার করার কোনো পরিকল্পনা রাজ্যের নেই। আসলে অতীতের ঐতিহ্য যেমন আছে তেমনই রেখে দেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রীর শৈশবের দিনগুলি সাধারণ মানুষের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় এবং শিক্ষণীয়ও বটে। তিনি একবার বলেছিলেন যে তিনি সাধারণ মানুষের দুঃখ বোঝেন কারণ তিনিও তাঁর বাল্যবয়সে অসম্ভব দারিদ্রতার মধ্য দিয়ে জীবন কাটিয়েছিলেন। সুতরাং ওই টি স্টলের সঙ্গে একটা আবেগও জড়িয়ে আছে। আর সাধারণ মানুষকে সেই আবেগেরই ভাগীদার করতে চায় গুজরাতের পর্যটন মন্ত্রক।

Categories
আমাদের বাছাই

শীতে চলুন /৩ : হেরিটেজ গুজরাত

গুজরাত বেড়ানোর আদর্শ সময় শীতকাল – নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত। গুজরাতের জন্য তিনটি ভ্রমণ পরিকল্পনা তৈরি করেছে  ভ্রমণ অনলাইন। আজ প্রথমটি, হেরিটেজ গুজরাত। 

বডোদরা (বরোদা)-অমদাবাদ-মহেসানা-মাউন্ট আবু

প্রথম ও দ্বিতীয় দিন – রাত্রিবাস বডোদরা।

sursagar lake, vadodara
সুরসাগর লেক, বডোদরা।

হাওড়া-অমদাবাদ এক্সপ্রেস হাওড়া ছাড়ে রাত ১১.৫৫-য় বডোদরা পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল ১০.৫৬ মিনিটে। এ ছাড়া রয়েছে হাওড়া-পোরবন্দর-ওখা ত্রিসাপ্তাহিক এক্সপ্রেস। হাওড়া ছাড়ে মঙ্গল, শুক্র ও শনিবার রাত ১০.৫০-এ, বডোদরা পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল ৬.৫৩ মিনিটে। সাপ্তাহিক শালিমার-ভুজ এক্সপ্রেস। প্রতি শনিবার রাত ৮.২০-এ শালিমার ছেড়ে বডোদরা পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল ৬.৫০ মিনিটে। সাপ্তাহিক পোরবন্দর কবিগুরু এক্সপ্রেস প্রতি রবিবার রাত ৯.২৫-এ সাঁতরাগাছি ছেড়ে বডোদরা পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল ৮.২৫-এ। সাপ্তাহিক গর্ভ এক্সপ্রেস প্রতি সোমবার রাত ১১টায় হাওড়া ছেড়ে বডোদরা পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল ৮.৪০-এ।

দিল্লি থেকে বডোদরা আসার অনেক ট্রেন আছে। তারই মধ্যে হজরত নিজামুদ্দিন থেকে বিকেল ৪.৫০-এর আগস্ট ক্রান্তি রাজধানী, নিউদিল্লি থেকে বিকেল ৪.২৫-এর মুম্বই রাজধানী এবং ৪.৪৫-এর পশ্চিম এক্সপ্রেস বডোদরা পৌঁছে দেয় সকালের মধ্যে।

আরও পড়ুন শীতে চলুন/১: গড়-জঙ্গল-হাভেলির রাজস্থান

মুম্বই থেকে বডোদরা পাঁচ-ছ’ ঘণ্টার ট্রেন জার্নি। সব চেয়ে ভালো ট্রেন মুম্বই সেন্ট্রাল থেকে সকাল ৬.২৫-এর শতাব্দী এক্সপ্রেস। বডোদরা পৌঁছোয় সকাল ১১টায়। ভারতের অন্য জায়গা থেকে এলে মুম্বই বা দিল্লি হয়ে বডোদরা আসা ভালো।

 ভারতের প্রায় সব বড়ো শহরের সঙ্গে বডোদরা বিমানপথে যুক্ত। 

shri aurovanda niwas, vadodara
শ্রীঅরবিন্দ নিবাস, বডোদরা।

শ্রীঅরবিন্দের স্মৃতি বিজড়িত বডোদরা পৌঁছে প্রথম দিন দেখে নিন সুরসাগর লেক, লেকের পাড়ে ন্যায় মন্দির, তিলক রোডে সওয়াজি বাগ, শ্রীঅরবিন্দ নিবাস, স্টেশন থেকে তিন কিমি দূরে ই এম ই স্টিল টেম্পল, নন্দলাল বসুর দেওয়াল-অঙ্কন সমৃদ্ধ কীর্তি মন্দির, বরোদা মিউজিয়াম অ্যান্ড আর্ট গ্যালারি, শ্রী সওয়াজি সরোবর ইত্যাদি।

দ্বিতীয় দিন চলুন চম্পানের-পাওয়াগড়-জম্বুঘোড়া।

jama masjid, champaner
জামা মসজিদ, চম্পানের।

ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত চম্পানের-পাওয়াগড় প্রত্নতাত্ত্বিক পার্ক ১৫২৩-এ সুলতান বাগেড়ার তৈরি জামা মসজিদ শৈল্পিক উৎকর্ষে অনবদ্য। দেখে নিন কেভাদা মসজিদ, লীলা গুম্বজ কি মসজিদ, নাগিনা মসজিদ ও সেনোট্যাফ। পাহাড়ের নীচে রাজপুত-কীর্তি সাত মাইল প্রাসাদ। মাচি থেকে দেড় কিমি হেঁটে বা ৭০০ মিটার দীর্ঘ রোপওয়ে চড়ে পৌঁছে যান ৮২০ মিটার উঁচু পাওয়াগড়ের পাহাড়চুড়োয়। সোলাঙ্কিদের দুর্গ ও প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ দেখুন। ২২৫ সিঁড়ি উঠে পাওয়াগড় শিখরে দেখুন মহাকালিকা মন্দির। আছে লাকুলিসা মন্দির, এক গুচ্ছ জৈন মন্দির, দুধিয়া তালাও, ছাঁছিয়া তালাও, ত্রিতলিকা চম্পাবতী মহলচম্পানের-পাওয়াগড় দেখে চলুন ২০ কিমি দূরের জম্বুঘোড়া অভয়ারণ্য। সবুজ জঙ্গল-পাহাড়-জলাশয়ে মোড়া প্রকৃতিবীক্ষণ কেন্দ্র।

তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম দিন ও ষষ্ঠ দিন – রাত্রিবাস অমদাবাদ

বডোদরা  থেকে অমদাবাদ  আসার জন্য সারা দিন অনেক ট্রেন রয়েছে। সকালের দিকে যে কোনো ট্রেন ধরে ঘণ্টা দুয়েকে চলে আসুন অমদাবাদ। বাসও চলে মুহুর্মুহু। আর যদি গাড়ি ভাড়া করে আসেন তা হলে বডোদরা থেকে ৮৯ কিমি দূরের ডাকোর দেখে সেখান থেকে ৯২ কিমি দূরের অমদাবাদ পৌঁছোন। ডাকোরে দেখুন রণছোড়জি তথা শ্রীকৃষ্ণের মন্দির

kankaria lake, ahmedabad
কাঁকারিয়া লেক, অমদাবাদ।

সবরমতীর ধারে অমদাবাদ। এখানে দ্রষ্টব্য অনেক। প্রায় তিনটে দিন লেগে যায় অমদাবাদ দেখতে। শুরু করুন রিভার ফ্রন্ট দিয়ে। চলুন লাল দরোজার কাছে সিদি সৈয়দ জালি মসজিদ। এর পর ভদ্রা ফোর্ট ও ভদ্রকালী মন্দির দেখুন। তার পর চলুন সরখেজ রোজায় সুলতান মামুদ বেগারার সমাধি দেখতে। দেখুন রানি সিপ্রির মসজিদ, স্বামীনারায়ণ মন্দির, জামা মসজিদ, তিন দরওয়াজা। দেখুন এক গুচ্ছ মিউজিয়াম — ক্যালিকো মিউজিয়াম অব টেক্সটাইলস, বেচার ইউটেনসিল মিউজিয়াম, কাইট মিউজিয়াম দেখে নিন সর্দার পটেল মিউজিয়াম। বিনোদনের হরেক ব্যবস্থা সহ কাঁকারিয়া হ্রদ। হ্রদের পাড়ে বাল বাটিকা।

দেখুন গান্ধীজির গড়া সবরমতী আশ্রম। এলিস ব্রিজে সবরমতী পেরিয়ে শহর থেকে ৭ কিমি উত্তরে সবরমতীর ধারে আশ্রম। এলিস ব্রিজে সবরমতী পেরোনোর আগে দেখুন ভিক্টোরিয়া গার্ডেন

adalaj vav
আদালজ ভাভ।

রয়েছে আরও দ্রষ্টব্য — শাহ আলমের রৌজা (শহর থেকে ৩ কিমি দক্ষিণ পুবে), রানি রূপমতী মসজিদ (মির্জাপুরে), মসজিদ-ই-নাগিরা (মানেকচকে), দরিয়া খাঁয়ের সমাধি (গুজরাতের সর্বোচ্চ গম্বুজ), আদালজ ভাভ তথা স্টেপওয়েল (১৯ কিমি), অক্ষরধাম মন্দির (২৩ কিমি দূরে গান্ধীনগরে) ইত্যাদি।

অমদাবাদ অবস্থানকালে এক দিন ঘুরে আসুন লোথাল ও নল সরোবর – অমদাবাদ থেকে ৭৫ কিমি, ট্রেনে তিন ঘণ্টার পথ লোথাল। বাসও চলে। তবে সময় বাঁচাতে গাড়ি ভাড়া করে নেওয়াই ভালো। সিন্ধু সভ্যতার সমসাময়িক সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে লোথালে। বলা হয়, হরপ্পা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ৫০০ বছরে পরেও লোথাল সভ্যতা টিকে ছিল। পরবর্তী কালে বন্যায় ধ্বংস হয় এই সভ্যতা। লোথাল দেখে চলুন ৪০ কিমি দূরের নল সরোবর পাখিরালয়। দেশ-বিদেশ থেকে আসা পাখিরা শীতে আস্তানা গাড়ে নল সরোবরের বেট থেকে বেটে। বেট অর্থে দ্বীপ। নল সরোবর দেখে ফিরে আসুন ৬৬ কিমি দূরের অমদাবাদে।

nal sarovar
নল সরোবর

সপ্তম দিন – রাত্রিবাস মহেসানা

অমদাবাদ থেকে সকালের ট্রেন বা বাস ধরে ৭০ কিমি দূরের মহেসানা আসুন। ঘণ্টা দুয়েক সময় লাগবে। মহেসানা থেকে গাড়ি ভাড়া করে প্রথমে চলুন বহুচরাজি৩৯ কিমি দূরে বহুচরাজিতে দেখে নিন দেবী বহুচরাজি তথা সাত বাহনে মা দুর্গাকে। এখান থেকে চলুন ১৬ কিমি দূরে মধেরা। দেখুন আট শতকে তৈরি শিল্পসুষমা মণ্ডিত ভাস্কর্যে অনবদ্য সূর্য মন্দির। এখান থেকে চলুন ৩৩ কিমি দূরের সোলাঙ্কি রাজাদের রাজধানী পাটন। দেখে নিন ১০৫০ সালে তৈরি গুজরাতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্টেপওয়েল রানি কি ভাভ। ফিরে আসুন মহেসানায়।

ambaji temple
অম্বাজি মন্দির।

অষ্টম দিন ও নবম দিন – রাত্রিবাস মাউন্ট আবু

অষ্টম দিন একটা গাড়ি ভাড়া করে সক্কালেই বেরিয়ে পড়ুন মহেসানা থেকে। চলুন ১২৩ কিমি দূরে অম্বাজি। অম্বাজি দর্শন এগিয়ে চলুন ৫২ কিমি দূরে রাজস্থানের মাউন্ট আবু। মহেসানা থেকে অম্বাজি যাওয়ার পথে দেখে নিতে পারেন তরঙ্গ পাহাড়ে ৫টি দিগম্বর ও ৫টি শ্বেতাম্বর জৈন মন্দির

(মাউন্ট আবু কী ভাবে ঘুরবেন, দেখে নিন শীতে চলুন /২ : থর ঘুরে আরাবল্লি হয়ে জঙ্গলের রাজস্থানে)

দশম দিন – ঘরে ফেরা।

আবু রোড কলকাতা ফেরার একমাত্র ট্রেন সাপ্তাহিক কলকাতা এক্সপ্রেস। তাই জয়পুর বা দিল্লি হয়ে ফেরাই সুবিধাজনক। মুম্বই বা অমদাবাদের সঙ্গেও সরাসরি দৈনিক ট্রেন সংযোগ রয়েছে।

কোথায় থাকবেন

একমাত্র অমদাবাদ ও মাউন্ট আবু ছাড়া কোথাওই গুজরাত পর্যটনের কোনো হোটেল নেই। অমদাবাদে গান্ধী আশ্রমের উলটো দিকে রয়েছে গুজরাত পর্যটনের হোটেল তোরণ গান্ধী আশ্রম। অনলাইনে বুক করার জন্য লগইন করুন booking.gujarattourism.com। এ ছাড়া সব জায়গাতেই রয়েছে বেসরকারি হোটেল এবং রিসোর্ট। হোটেল বুকিং-এর একাধিক ওয়েবসাইট থেকে তা বুক করতে পারেন। মাউন্ট আবুতে রাজস্থান পর্যটনের হোটেল আছে। অনলাইন বুকিং https://rtdc.tourism.rajasthan.gov.in/

sabarmati gandhi ashram
সবরমতী গান্ধী আশ্রম।
কী ভাবে ঘুরবেন

(১) বডোদরা  থেকে ৪৫ কিমি দূরে চম্পানের, আরও ৪ কিমি দূরে পাওয়াগড়। বডোদরা থেকে নিয়মিত বাস পাওয়া যায় চম্পানের-পাওয়াগড় পথে হিল স্টেশন মাচি পর্যন্ত। গাড়ি ভাড়া করেও আসতে পারেন। গাড়ি ভাড়া করে এলে জম্বুঘোড়া অভয়ারণ্য ঘুরে নেওয়া সুবিধার।

(২) অমদাবাদে স্থানীয় গাড়ি ভাড়া করে ঘুরুন।

মনে রাখবেন

(১) নল সরোবর দেখার জন্য অনুমতি সংগ্রহ করবেন conservator of forests, sector 16, gandhinagar, ph. 02715-245037

(২) লোথালে প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের সংগ্রহশালা খোলা থাকে ছুটির দিন ছাড়া সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।

(৩) যদি মাউন্ট আবু আগে দেখা থাকে তা হলে সরাসরি আবু রোড থেকে ঘরে ফেরার ট্রেন ধরুন।

(৪) ট্রেনের বিস্তারিত সময়ের জন্য দেখে নিন erail.in 

(৫) বেসরকারি হোটেল বুকিং-এর বিভিন্ন ওয়েবসাইট www.goibibo.com , www.makemytrip.com , www.trivago.in ,  www.yatra.com , www.hotelscombined.com ,  www.tripadvisor.in , www.holidayiq.com ইত্যাদি।