অন্য রাজ্য আমাদের বাছাই

চলুন বেরিয়ে পড়ি: কর্নাটক ১

Abbe falls

ভ্রমণঅনলাইন ডেস্ক: পর্যটন সম্পদে রীতিমতো সমৃদ্ধ কর্নাটক।  ইতিহাস, স্থাপত্য, জঙ্গল, সমুদ্র, পাহাড়  – কী নেই এই রাজ্যে। সাধে এই রাজ্যের পর্যটনের স্লোগান ‘এক রাজ্য, অনেক বিশ্ব’! কিন্তু বাঙালি এই রাজ্যে বেঙ্গালুরু-মায়শুরু (মহীশুর) কেন্দ্রিক ঘোরাঘুরি করে চলে আসে। ভ্রমণ অনলাইন আপনাদের জন্য সাজিয়ে দিল কর্নাটকের তিনটি ভ্রমণ-ছক। আজ প্রকাশিত হল প্রথম ভ্রমণ ছকটি। 

ভ্রমণছক ১: দক্ষিণ কর্নাটক

প্রথম দিন – ট্রেনে বা বিমানে বেঙ্গালুরু পৌঁছোন। 

ভারতের প্রায় সব বড়ো জায়গার সঙ্গে বেঙ্গালুরু ট্রেন ও বিমানপথে যুক্ত।  হাওড়া থেকে বেঙ্গালুরু যাওয়ার সব থেকে ভালো ট্রেন দুরন্ত এক্সপ্রেস, সোম আর বৃহস্পতিবার বাদে সপ্তাহে পাঁচ দিন সকাল ১১টায় হাওড়া ছেড়ে যশবন্তপুর পৌঁছোয় পরের দিন বিকেল ৪টেয়। হাওড়া-যশবন্তপুর এক্সপ্রেস প্রতি দিন রাত ৮:৩৫-এ ছেড়ে যশবন্তপুর পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল ৭:১৫-এ। কলকাতা থেকে দিনে অন্তত ১৪-১৫টা বিমান রয়েছে।

লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেনে গ্লাস হাউস।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন  – বেঙ্গালুরু ঘোরাঘুরি।

বেঙ্গালুরুতে কী দেখবেন

(১) শহরে – টিপুর প্রাসাদ, লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেন, নন্দী মন্দির তথা বুল টেম্পল, বিধানসৌধ (রাস্তা থেকে দেখা), কুব্বন পার্ক।

বান্নেরঘাটা জাতীয় উদ্যানে।

(২) বান্নেরঘাটা জাতীয় উদ্যান – শহর থেকে ২২ কিমি

(৩) নন্দী হিলস – বেঙ্গালুরু থেকে ৫৫ কিমি। উচ্চতা ৪৮৫১ ফুট।

(৪) শিবগঙ্গা – চিত্রদুর্গের রাস্তায় ৫২ কিমি, ৪৫২৭ ফুট উঁচু পাহাড়।

শিবগঙ্গা।

চতুর্থ দিন –  শ্রবণবেলগোলা হয়ে বেলুর, ২৩০ কিমি। শ্রবণবেলগোলায় দেখে নিন গোমতেশ্বরের মূর্তি। বিকেলের মধ্যে পৌঁছোন বেলুর। রাত্রিবাস বেলুর।

পঞ্চম দিন ও ষষ্ঠ দিন – থাকুন বেলুরে

মন্দির ভাস্কর্য, বেলুর।

পঞ্চম দিনে দেখুন

(১) চেন্নাকেশব মন্দির – বেলুরের প্রধান আকর্ষণ। অসাধারণ কারুকার্যের জন্য বিখ্যাত। ১১১৬ সালে মন্দির তৈরি শুরু, সম্পূর্ণ হয় ১০৩ বছরে। মন্দিরের গায়ে নানা ভাস্কর্য। মন্দির দেখতে অন্তত ঘণ্টা দুয়েক সময় দিন।

(২) হালেবিডু – বেলুর থেকে ১৬ কিমি। এই মন্দিরের খ্যাতিও তার ভাস্কর্যের জন্য। মন্দিরের ভেতরে প্রথমে হোয়েসলেশ্বর শিব, পরে সান্থালেশ্বর শিব।

বীরনারায়ণ মন্দির, বেলাওয়াড়ি।

(৩) বীরনারায়ণ মন্দির, বেলাওয়াড়ি – বেলুর আর হালেবিডুর কিছুটা আড়ালেই রয়েছে এটি। কিন্তু হোয়সলদের কীর্তির আরও এক অনন্য নিদর্শন। হালেবিডু থেকে ১৬ এবং বেলুর থেকে ৩২ কিমি।

ষষ্ঠ দিনে দেখুন

চলুন বেলুর থেকে চিকমাগালুর হয়ে কেম্মানাগুন্ডি, ৮৯ কিমি। পথে দেখে দিন হেব্বে জলপ্রপাত। কফিবাগিচার মধ্য দিয়ে পথ, দারুণ শোভা। সবুজে ছাওয়া পাহাড়ি শহর কেম্মানাগুন্ডি, সূর্যাস্ত মনোরম।

বেলুর থেকে মাদিকেরির পথে।

 

সপ্তম দিন – বেলুর থেকে চলুন মাদিকেরি (৫৭৪১ ফুট), ১২৩ কিমি। রাত্রিবাস মাদিকেরি।

অষ্টম ও নবম দিন – থাকুন মাদিকেরিতে।

কী ভাবে ঘুরবেন মাদিকেরি

প্রথম দিন পৌঁছে শহরের দ্রষ্টব্য স্থানগুলি দেখে নিন। 

(১) ওঙ্কারেশ্বর মন্দির

(২) হিন্দুরাজাদের সমাধিসৌধ

(৩) অ্যাবে ফলস – মাদিকেরি শহর থেকে ৬ কিমি।

(৪) মাদিকেরি ফোর্ট – শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। পাহাড়চুড়োয় অবস্থিত এই দুর্গটি এখন জেলাশাসকের দফতর। এখানে সেন্ট মার্ক্স গির্জায় রয়েছে একটি ছোট্ট মিউজিয়াম।

(৫) রাজাস সিট – শহরের পশ্চিম প্রান্তে। এখান থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দৃশ্যমান।

মাদিকেরির দ্বিতীয় দিন, অর্থাৎ ভ্রমণের অষ্টম দিন দেখুন 

(১) কুশলনগর, বায়লাকুপ্পে – মাদিকেরি থেকে ৩০ কিমি কুশলনগর। কাবেরীর জলে ঘেরা তৃণভূমি। এখান থেকে দু’কিমি দূরে নিসর্গধাম। পাখি, প্রজাপতি ও বাঁশ-চন্দন-সহ নানা বৃক্ষ শোভিত কাবেরীর দ্বীপ। কুশলনগর থেকে ১১ কিমি বায়লাকুপ্পে। ভারতে দ্বিতীয় বৃহত্তম তিব্বতি বসতি। রয়েছে অনেক মনাস্টেরি, যার মধ্যে প্রধান নামদ্রোলিং মনাস্ট্রি।

(২) দুবারে এলিফ্যান্ট ক্যাম্প –  বায়লাকুপ্পে থেকে ২৫ তথা মাদিকেরি থেকে ৩৬ কিমি। কাবেরী নদীর ধারে অবস্থিত এই এলিফ্যান্ট ক্যাম্পটি। কর্নাটকের বনবিভাগের হাতিদের আবাসস্থল।

মাদিকেরির দ্বিতীয় দিন, অর্থাৎ ভ্রমণের নবম দিন দেখুন 

(১) বাগমন্ডলা – মাদিকেরি থেকে ৩০ কিমি। কাবেরী, কনক এবং সুজ্যোতির সঙ্গম। শ্রীবাগান্ডেশ্বর মন্দির

বাগমন্ডলা

(২) তলাকাবেরী – বাগমন্ডলা থেকে আরও ৯ কিমি। কোডাগু পর্বতমালায় কাবেরীর উৎসস্থল। তুলাসংক্রান্তিতে মেলা বসে এখানে। ৩৬৫ ধাপের সিঁড়ি ভেঙে পৌঁছে যাওয়া যায় ব্রহ্মগিরি পর্বতে ।

দশম দিন – মাদিকেরি থেকে চলুন মহীশূর (মায়সুরু), ১১৭ কিমি। রাত্রিবাস মহীশূর।

একাদশ থেকে ত্রয়োদশ দিন – থাকুন মহীশূরে। 

মহীশূরে কী দেখবেন

mysuru palace
মায়সুরু প্রাসাদ।

(১) মায়সুরু প্রাসাদ – সকাল ১০টা  থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত। বিজয়া দশমীতে বিশেষ ভাবে সেজে ওঠে এই প্রাসাদ।

(২) চামরাজেন্দ্র চিড়িয়াখানা – চিড়িয়াখানার ভেতরে পথ নির্দেশ করা আছে। ব্যাটারিচালিত গাড়ি আছে।

(৩) চামুণ্ডী পাহাড় – মহীশূর থেকে ১৩ কিমি। পাহাড় বেয়ে পথ। প্রথমেই স্বাগত জানাবে দণ্ডায়মান মহিষাসুরের মূর্তি। রয়েছে চামুণ্ডী মন্দির, মহারাজার বিশ্রামাবাস, রাজেন্দ্রবিলাস প্রাসাদ। নামার পথে বিশাল নন্দীমূর্তি।

(৪) রেল মিউজিয়াম – দেশের প্রথম রেল মিউজিয়াম। স্টেশনের কাছেই।

(৫) সেন্ট ফিলোমেনা চার্চ – মায়সুরু প্রাসাদ থেকে ২ কিমি। দুশো বছরের পুরনো।

(৬) জগমোহন প্রাসাদ তথা জয়া চামরাজেন্দ্র আর্ট গ্যালারি

(৭) শ্রীরঙ্গপত্তন – টিপুর রাজধানী। রয়েছে শ্রীরঙ্গনাথস্বামী মন্দির, ক্যাপ্টেন ডালির ডানজান (কারাকক্ষ), টিপুর নিহত হওয়ার জায়গা, জামি মসজিদ, দরিয়া দৌলতবাগ, গম্বুজ মসজিদ তথা হায়দর আলি, টিপু ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সমাধি, সঙ্গম, কারিঘাট্টা পাহাড় ও মন্দির।

vrindavan gardens
বৃন্দাবন গার্ডেন্স।

(৮) বৃন্দাবন গার্ডেন্স – মহীশূর থেকে ২২ কিমি। কাবেরী নদীতে কৃষ্ণরাজসাগর বাঁধ।  আলোর কারসাজি।

(৯) কেশব মন্দির – মহীশূর থেকে সোমনাথপুর, ৪০ কিমি। হোয়সলদের আরও এক অনন্য কীর্তি।

(১০) টি (তিরুমাকুদাল) নরসিপুরা ত্রিবেণী সঙ্গম – সোমনাথপুর থেকে ১০ এবং মহীশূর থেকে ৩৬ কিমি। দক্ষিণের প্রয়াগ। কাবেরী, কাবিনি এবং পৌরাণিক সরোবর গুপ্তগামিনীর সঙ্গম। রয়েছে গুঞ্জ নরসিংহস্বামীর মন্দির।

(১১) শিবসমুদ্রম জলপ্রপাত – মহীশূর থেকে ৭২ কিমি। ৪০০ ফুট ওপর থেকে কাবেরীর ঝাঁপ। দু’টি অংশ বড়ো চুক্কি এবং গগন চুক্কি। বড়ো চুক্কি বিখ্যাত ব্যপ্তির জন্য, গগন চুক্কি উচ্চতার জন্য।

(১২) বিআর হিলস – মহীশূর থেকে ৮৩ কিমি। তামিলনাড়ুর সীমান্তে অবস্থিত অভয়ারণ্য। রয়েছে বিলিগিরি রঙ্গস্বামী মন্দির।

keshav temple
সোমনাথপুরের কেশব মন্দির।

চতুর্দশ দিন – ফেরার দিন। মহীশূর বা বেঙ্গালুরু থেকে ফেরার ট্রেন ধরুন। মহীশূর থেকে সরাসরি কলকাতা ফেরার জন্য রয়েছে হাওড়া এক্সপ্রেস। প্রতি সোমবার রাত সাড়ে বারোটায় ছেড়ে হাওড়া পৌঁছোয় মঙ্গলবার দুপুর ২:৫০-এ। বেঙ্গালুরু থেকে ফেরার জন্য রয়েছে যশবন্তপুর-হাওড়া দুরন্ত এক্সপ্রেস। ট্রেনটি বুধ এবং শনিবার বাদে রোজ যশবন্তপুর থেকে সকাল সওয়া এগারোটায় ছেড়ে হাওড়া পৌঁছোয় পরের দিন বিকেল সওয়া চারটেয়। যশবন্তপুর-হাওড়া এক্সপ্রেস প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭:৩৫-এ ছেড়ে হাওড়া পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল ৬:১০-এ। ভারতের বিভিন্ন জায়গার সঙ্গে মহীশূরও ট্রেনপথে যুক্ত।

কোথায় থাকবেন

বেঙ্গালুরু ছাড়া এই সূচির সব জায়গাতেই রয়েছে কর্নাটক পর্যটন উন্নয়ন নিগমের হোটেল। অনলাইনে বুক করতে পারেন। এ ছাড়াও রয়েছে বেসরকারি হোটেল। হোটেল বুকিং-এর বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে তাদের সন্ধান পেয়ে যাবেন।

কী ভাবে ঘুরবেন

কর্নাটক রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমের বাস পরিষেবা পাওয়া যায় রাজ্যের সর্বত্র। তবে আরামে ঘোরার জন্য গাড়িই সব থেকে ভালো উপায়। বেঙ্গালুরু থেকে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে নিন। পয়েন্ট টু পয়েন্ট গাড়িও করতে পারেন।

মনে রাখবেন

(১) বেঙ্গালুরুতে সকালে টিপুর প্রাসাদ দেখে চলুন বান্নেরঘাটা জাতীয় উদ্যান। ৪৫ মিনিটের সাফারি করে দুপুরে চলে আসুন বেঙ্গালুরু। শহরের বাকি দ্রষ্টব্য দেখে নিন।

(২) যদি নন্দী হিলস ও শিবগঙ্গা যেতে বেঙ্গালুরু থেকে ভোরে বেরিয়ে নন্দী হিলস ঘুরে এসে বেঙ্গালুরু ফিরে দুপুরের খাওয়া সেরে চলুন শিবগঙ্গা।

(৩) বেলুর, হালেবিডুতে অবশ্যই গাইড নেবেন।

(৪) মাদিকেরিতে তিন রাত থাকবেন। যে দিন পৌঁছোবেন সে দিন শহরের দ্রষ্টব্যগুলো দেখে নিন। এক দিন ঘুরে আসুন বাগমন্ডলা ও তলাকাবেরী। আরেক দিন চলুন কুশলনগর, বায়লাকুপ্পে ও দুবারে এলিফ্যান্ট ক্যাম্প।

(৫) মহীশূরে চার রাত থাকবেন। প্রথম দু’ দিন শ্রীরঙ্গপত্তন-সহ শহরের দ্রষ্টব্যগুলো দেখে নিন। তৃতীয় দিন সকালে চলুন সোমনাথপুর ও টি (তিরুমাকুদাল) নরসিপুরা ত্রিবেণী সঙ্গম। সন্ধ্যায় বৃন্দাবন গার্ডেন্স। চতুর্থ দিন ভোরে বেরিয়ে পড়ুন। প্রথমে চলুন শিবসমুদ্রম জলপ্রপাত। সেখান থেকে চলে আসুন বিআর হিলস (৫০ কিমি)। সন্ধ্যায় ফিরুন মহীশূরে।

(৬) বেঙ্গালুরু থেকে যদি ফেরার জন্য দুরন্ত এক্সপ্রেসে টিকিট থাকে তা হলে চোদ্দোতম দিন বেঙ্গালুরু ফিরে ওই রাতটা বেঙ্গালুরুতে কাটিয়ে নিন।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

You may also like