গরমে চলুন হৃষীকেশ: র্যাফটিংয়ের বাইরেও উপভোগ করুন আসল সৌন্দর্য
ভ্রমণ অনলাইন ডেস্ক: গরমের ছুটি এলেই অনেক ভ্রমণপিপাসু মানুষ খোঁজেন এমন একটি জায়গা, যেখানে মিলবে ঠান্ডা আবহাওয়া, প্রকৃতির শান্তি এবং মানসিক প্রশান্তি। দিল্লির কাছাকাছি হওয়ায় সারা বছরই পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য হৃষীকেশ। অনেকে এই শহরকে শুধু রিভার র্যাফটিংয়ের জন্য চিনলেও, হৃষীকেশের আকর্ষণ তার চেয়েও অনেক বেশি।
এখানে একদিকে যেমন আছে অ্যাডভেঞ্চারের রোমাঞ্চ, অন্যদিকে আছে আধ্যাত্মিক পরিবেশ, যোগ-ধ্যানের প্রশান্তি, গঙ্গার তীরে শান্ত সময় কাটানোর সুযোগ এবং পাহাড়-নদীর অনন্য সৌন্দর্য। তাই যাঁরা একটু ভিন্ন ধরনের ভ্রমণ চান, তাদের জন্য হৃষীকেশ হতে পারে আদর্শ ঠিকানা।
হৃষীকেশে ৭টি অনন্য অভিজ্ঞতা
সূর্যোদয়ে ঘাটের ধারে শান্ত সকাল
দিনের শুরুটা করতে পারেন গঙ্গার ঘাটে হাঁটাহাঁটি দিয়ে। সূর্য ওঠার সময় নদীর জলে সোনালি আলো পড়ার দৃশ্য মনকে শান্ত করে দেয়। চারপাশে অনেককে যোগব্যায়াম করতে বা প্রার্থনায় মগ্ন থাকতে দেখা যায়। সকালের এই নিরিবিলি পরিবেশ মানসিকভাবে নতুন শক্তি জোগায়।

ত্রিবেণি ঘাটে গঙ্গা আরতি।
গঙ্গা আরতির অপূর্ব আধ্যাত্মিক পরিবেশ
সন্ধ্যায় হৃষীকেশের গঙ্গা আরতি এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। পুরোহিতদের মন্ত্রোচ্চারণ, প্রদীপের আলো, ঘণ্টাধ্বনি ও ভক্তিমূলক সংগীত পুরো পরিবেশকে মোহময় করে তোলে। নদীতে ভাসমান প্রদীপের আলো দেখলে এক অন্যরকম অনুভূতি তৈরি হয়। হৃষীকেশের আধ্যাত্মিক সত্তাকে কাছ থেকে অনুভব করার সেরা উপায় এটি।
যোগ ও মেডিটেশনে মন-শরীরের পুনর্জাগরণ
বিশ্ব জুড়ে হৃষীকেশ পরিচিত যোগনগরী হিসেবে। এখানে নবীন থেকে অভিজ্ঞ—সবাইয়ের জন্য রয়েছে নানা ধরনের যোগ ও মেডিটেশন সেশন। প্রকৃতির মাঝে বসে যোগচর্চা করলে শরীর যেমন সতেজ হয়, তেমনই ধ্যান মনকে শান্ত করে। অল্প সময়ের অনুশীলনও অনেক প্রশান্তি এনে দিতে পারে।

লছমনঝুলা। ছবি উইকিপিডিয়া থেকে নেওয়া।
বিখ্যাত ঝুলন্ত সেতুতে হাঁটার রোমাঞ্চ
লছমনঝুলা, রামঝুলা ও নবনির্মিত বজরং সেতু – হৃষীকেশের বিখ্যাত সাসপেনশন (ঝুলন্ত) ব্রিজগুলোয় হাঁটা বেশ মজার অভিজ্ঞতা। হালকা দুলতে থাকা সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে গঙ্গা নদী ও পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়। একই সঙ্গে শহরের দৈনন্দিন জীবনও চোখে পড়ে। প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও হালকা রোমাঞ্চ—সব একসঙ্গে পাওয়া যায় এখানে। তবে সবচেয়ে পুরনো সেতু লছমনঝুলা আপাতত বন্ধ।
নদীর ধারে নিরিবিলি সময় কাটানো
ব্যস্ত জীবন থেকে একটু দূরে গিয়ে নদীর ধারে বসে থাকা অনেক সময় সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। গঙ্গার জলের শব্দ, ঠান্ডা বাতাস এবং চারপাশের নীরবতা মনকে শান্ত করে দেয়। বই পড়া, গল্প করা কিংবা শুধু প্রকৃতি দেখা—সবই এখানে উপভোগ্য।

ত্র্যম্বকেশ্বর মন্দির।
প্রাণবন্ত ক্যাফে সংস্কৃতির স্বাদ
হৃষীকেশে এখন বেশ জনপ্রিয় ক্যাফে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। অনেক ক্যাফেতে পাওয়া যায় অর্গানিক খাবার, হার্বাল চা এবং নানা দেশের জনপ্রিয় পদ। অনেক জায়গা থেকেই দেখা যায় নদীর সুন্দর দৃশ্য। কোথাও কোথাও লাইভ মিউজিকও থাকে। আরাম করে বসে সময় কাটানোর জন্য দারুণ জায়গা এসব ক্যাফে।
স্থানীয় বাজারের রঙিন জগৎ
হৃষীকেশের স্থানীয় বাজার খুবই প্রাণবন্ত ও রঙিন। এখানে পাওয়া যায় হাতে তৈরি গয়না, পোশাক, আধ্যাত্মিক সামগ্রী, সুভেনির-সহ নানা জিনিস। দোকানিদের আন্তরিক ব্যবহার ভ্রমণকে আরও আনন্দদায়ক করে তোলে। এখান থেকে স্মৃতিচিহ্ন কিনে নিয়ে যেতে পারেন সহজেই।
ঋষিকেশ শুধু অ্যাডভেঞ্চারের জায়গা নয়, এটি এমন এক গন্তব্য যেখানে প্রকৃতি, আধ্যাত্মিকতা, শান্তি ও সংস্কৃতি একসঙ্গে মিশে আছে। তাই রাফটিংয়ের বাইরে যদি ঋষিকেশকে সময় নিয়ে দেখেন, তাহলে এই সফর আপনার মনে দীর্ঘদিন জায়গা করে নেবে।

পরমার্থ নিকেতন।
কী দেখবেন
হৃষীকেশে এই অভিজ্ঞতা অর্জন করার ফাঁকে দেখে নিন স্থানীয় দ্রষ্টব্য। লছমনঝোলার মুখে লক্ষ্মণমন্দির ও রাধাকৃষ্ণ মন্দির। ঝোলা পুলে গঙ্গা পেরিয়ে কৈলাসানন্দ মিশন, কালীকমলীর সমাধিমন্দির, রামেশ্বর মন্দির, লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির, গীতাভবন, স্বর্গাশ্রম ও পরমার্থ নিকেতন। রামঝোলায় গঙ্গা পেরিয়েও দেখে নেওয়া যায় এই দ্রষ্টব্যগুলি। এ ছাড়াও হৃষীকেশে ঘুরে নিতে পারেন মহেশ যোগীর আশ্রম, শঙ্করাচার্য নগর, তপোবন, শিবানন্দ আশ্রম ইত্যাদি।
আরও কোথায় ঘুরবেন
হাতে কয়েকটা দিন সময় থাকলে হৃষীকেশ থেকে ঘুরে আসতে পারেন হরিদ্বার, দেহরাদুন, রাজাজি ন্যাশনাল পার্ক। সড়কপথে হৃষীকেশ থেকে হরিদ্বার ৩৬ কিমি। হরিদ্বারে হর-কী-পৌড়ীকে গঙ্গা আরতি দেখুন। রোপওয়েতে চড়ে ঘুরে আসুন পুবে চণ্ডী পাহাড়, পশ্চিমে মনসা পাহাড়। চলুন ৫ কিমি দূরের কনখল। দেখে নিন দক্ষের যজ্ঞস্থল দক্ষ প্রজাপতি মন্দির, সতীর আত্মাহুতিস্থল সতীকুণ্ড, দুর্গামন্দির, শ্রীজগৎগুরু আশ্রমে কালী, রাধামাধব ও রাজরাজেশ্বরী, মৃত্যুঞ্জয় মন্দিরে পারদের শিবলিঙ্গ, আনন্দময়ী মায়ের আশ্রম ইত্যাদি। হৃষীকেশ থেকে হরিদ্বারের পথে দেখে নিতে পারেন পবনধাম, কাছেই ভারতমাতা মন্দির, ভীমের খোঁড়া ভীমগোদা ক্যানাল ও ভীমগোদা ট্যাঙ্ক, সপ্তঋষির তপস্যাস্থল, সপ্তঋষি আশ্রম ও সপ্ত সরোবর ইত্যাদি।

হর-কী-পৌড়ী, হরিদ্বার।
সড়কপথে হৃষীকেশ থেকে দেহরাদুন ২৫ কিমি। শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে সহস্রধারা। গন্ধক জলের প্রস্রবণ ও ঝরনার জন্য প্রসিদ্ধ। দেহরাদুন রেলস্টেশন থেকে সাড়ে ৫ কিলোমিটার দূরে টন্স নদীর তীরে টপকেশ্বর মহাদেব। প্রবেশদ্বারে দুর্গামন্দির। সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গুহার মধ্যে স্বয়ম্ভু শিবলিঙ্গ। টপ টপ জল পড়ছে লিঙ্গের মাথায়। পাশেই বাল্মীকি গুহা। শহর থেকে ৮ কিমি দূরে টন্স নদীর তীরে রবার্স কেভ তথা গুচ্ছ পানি। চক্রাতার পথে ৫ কিমি দূরে ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট। এর মিউজিয়ামটি দেখার মতো। সোম থেকে শুক্রবার ১০টা-৫টা খোলা।
দেখে নিন রাজাজি ন্যাশনাল পার্ক। জাতীয় উদ্যানে প্রবেশদ্বার ছ’টি – হৃষীকেশের কাছে কুন্নাও। ৮২০ বর্গকিমি আয়তনবিশিষ্ট এই জাতীয় উদ্যানে রয়েছে হাতি, চিতাবাঘ, নীলগাই, শম্বর, হরিণ, লাঙ্গুর, ভাল্লুক ইত্যাদি। সকালে-বিকালে হাতি-বিহারে জঙ্গল দেখা।

সহস্রধারা, দেহরাদুন।
কোথায় থাকবেন
হৃষীকেশ ও হরিদ্বারে থাকার মতো অনেক হোটেল, রিসর্ট, ধর্মশালা আছে। দেহরাদুনে আছে হোটেল ও রিসর্ট। সন্ধান পেয়ে যাবেন গুগল সার্চ করে। এ ছাড়াও হৃষীকেশে রয়েছে গাড়োয়াল মণ্ডল বিকাশ নিগমের (জিএমভিএন) ভারতভূমি ট্যুরিস্ট কমপ্লেক্স, হরিদ্বারে রয়েছে রাহী হোটেল এবং হোটেল অলকানন্দা। বুকিং করুন gmvnonline.com– এ গিয়ে।
কী ভাবে যাবেন
ভারতের প্রায় সব জায়গার সঙ্গে ট্রেনে যোগাযোগ রয়েছে হরিদ্বারের। হরিদ্বার থেকে বাসে বা ভাড়া গাড়িতে চলে যান হৃষীকেশ। কলকাতা থেকে সরাসরি হৃষীকেশ চলে যেতে পারেন দৈনিক দুন এক্সপ্রেসে। দুন এক্সপ্রেস ছাড়ে হাওড়া থেকে। কলকাতাব স্টেশন থেকে পাবেন কলকাতা-যোগনগরী হৃষীকেশ স্পেশ্যাল। এই ট্রেন সপ্তাহে দু’দিন ছাড়ে কলকাতা থেকে – শনিবার বা রবিবার। এ ছাড়াও হাওড়া থেকে রয়েছে কুম্ভ এক্সপ্রেস ও উপাসনা এক্সপ্রেস। কুম্ভ এক্সপ্রেস ছাড়ে সপ্তাহে পাঁচ দিন – সোম, বুধ, বৃহস্পতি, শনি ও রবিবার। সপ্তাহের বাকি দু’দিন মঙ্গল ও শুক্রবার চলে উপাসনা এক্সপ্রেস। ট্রেনের সময় সম্পর্কে বিস্তারিত জানার দেখুন erail.in। আর আসন সংরক্ষণের জন্য আইআরসিটিসি-র ওয়েবসাইট www.irctc.co.in –এ যান।
