নবাবের মুর্শিদাবাদে ছড়িয়ে ইতিহাসের আর এক দুনিয়া

হাজারদুয়ারি-ইমামবাড়ার বাইরেও মুর্শিদাবাদে ছড়িয়ে রয়েছে জৈন মন্দির, টেরাকোটা স্থাপত্য, আর্মেনীয় গির্জা, ডাচ কবরস্থান, সিল্কের তাঁত ও রায়বেঁশের ঐতিহ্য। ঘুরে দেখুন নবাবের শহরের অচেনা ইতিহাস।

মুর্শিদাবাদ বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাজারদুয়ারি, ইমামবাড়া, কাটরা মসজিদ কিংবা নবাবি আমলের স্মৃতি। কিন্তু ভাগীরথীর দুই পাড়ের এই প্রাচীন জনপদের ইতিহাস তার চেয়েও অনেক বিস্তৃত। জৈন বণিকদের অট্টালিকা, টেরাকোটার মন্দির, আর্মেনীয় গির্জা, ডাচ কবরস্থান, সিল্কের তাঁত আর রায়বেঁশের মতো লোকসংস্কৃতি—সব মিলিয়ে মুর্শিদাবাদ আসলে বহু সংস্কৃতির এক জীবন্ত উত্তরাধিকার।

এই বিস্তৃত ঐতিহ্যকে সামনে আনতেই ৬ থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ আয়োজিত হয়েছিল মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ ফেস্টিভ্যাল। মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির উদ্যোগে আয়োজিত এই উৎসবে ঐতিহাসিক স্থাপত্যের পাশাপাশি স্থানীয় খাবার, তাঁত, নদী ও লোকসংস্কৃতিকেও পর্যটনের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

আর্মেনীয় গির্জা, ডাচ কবরস্থান

মুর্শিদাবাদের বাণিজ্যিক ইতিহাসে শুধু দেশীয় বণিকরাই ছিলেন না। আর্মেনীয় বণিকদের উপস্থিতির সাক্ষী বহন করছে সইদাবাদের সেন্ট মেরি আর্মেনীয় চার্চ। ১৭৫৮ সালে খোজা পেট্রুস আরাথুন নিজের অর্থে এই গির্জা নির্মাণ করেছিলেন। পরে দীর্ঘ সংস্কারের পর ২০০৬ সালে তা পুনরায় ধর্মীয় ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া হয়।

অন্য দিকে, কাশিমবাজারের কালিকাপুরে রয়েছে ডাচ কবরস্থান। মুর্শিদাবাদ জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এই এলাকায় ১৬৬৬ সালে ডাচদের বড় কারখানা ছিল। আজ সেই বাণিজ্যিক অতীতের স্মৃতি বহন করছে কবরস্থানটি।

বড়নগরে রানি ভবানীর টেরাকোটার মন্দির

ভাগীরথীর পশ্চিম পাড়ের বড়নগর যেন মুর্শিদাবাদের অন্য এক মুখ। এখানে রয়েছে রানি ভবানীর তৈরি চার বাংলা মন্দির। চারটি মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার ফলকে ফুটে উঠেছে পুরাণের নানা দৃশ্য ও তৎকালীন সমাজজীবনের ছবি। আশপাশে ছড়িয়ে রয়েছে আরও কয়েকটি প্রাচীন মন্দির। মুর্শিদাবাদ জেলা প্রশাসনের পর্যটন তালিকাতেও চার বাংলা মন্দিরকে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাঁতিপাড়ায় সিল্কের গল্প

মুর্শিদাবাদ ঘুরে শুধু প্রাসাদ-মন্দির দেখলে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আজিমগঞ্জ-জিয়াগঞ্জের তাঁতিপাড়ায় এখনও বেঁচে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প। মুর্শিদাবাদি সিল্ক, বালুচরি ও নানা ধরনের শাড়ির বুনন দেখতে দেখতে বোঝা যায়, এই জেলার ঐতিহ্য শুধু পাথর-ইটের স্থাপত্যে আটকে নেই—মানুষের হাতেও তা বেঁচে রয়েছে। হেরিটেজ ফেস্টিভ্যালেও তাঁতিপাড়াকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

রায়বেঁশের ছন্দে অন্য মুর্শিদাবাদ

মুর্শিদাবাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রায়বেঁশে। এটি মূলত পুরুষদের পরিবেশিত এক ধরনের যুদ্ধভিত্তিক লোকনৃত্য, যেখানে বাঁশের লাঠি, শরীরী কসরত ও সামরিক ভঙ্গিমার ব্যবহার দেখা যায়। মুর্শিদাবাদ-সহ বীরভূম ও বর্ধমানে এই নৃত্যের ঐতিহ্য রয়েছে।

জৈন বণিকদের বৈভব

আজিমগঞ্জ-জিয়াগঞ্জে ঢুকলেই চোখে পড়বে মুর্শিদাবাদের জৈন ঐতিহ্যের চিহ্ন। নবাবি আমলে রাজস্থান থেকে আসা জৈন বণিক পরিবারগুলি ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে এখানে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাঁদের হাত ধরেই গড়ে ওঠে একাধিক জৈন মন্দির ও প্রাসাদোপম কোঠি। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, আজিমগঞ্জ-জিয়াগঞ্জ এলাকায় ১৪টি জৈন মন্দির রয়েছে।

এই ঐতিহ্যের অন্যতম আকর্ষণ কাঠগোলা প্রাসাদ। বাগানঘেরা এই প্রাসাদে ভারতীয় ও ইউরোপীয় স্থাপত্যের মিশেল দেখা যায়। কাছেই জগৎ শেঠের বাড়ি ও অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপনাও রয়েছে।

ইতিহাসের সঙ্গে খাবারও

মুর্শিদাবাদে নবাবি খাবারের পাশাপাশি রয়েছে শহেরওয়ালি রান্নার নিজস্ব ঐতিহ্য। জৈন বণিকদের হাত ধরে গড়ে ওঠা এই খাদ্যসংস্কৃতিতে রাজস্থানি রান্নার সঙ্গে বাংলার মশলা ও নবাবি রন্ধনশৈলীর প্রভাব মিশেছে। হেরিটেজ ফেস্টিভ্যালেও শহেরওয়ালি খাবারকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছিল।

আর নদীর ধারে সন্ধ্যা নামলে ভাগীরথীর ঘাট, গঙ্গা আরতি ও স্থানীয় খাবারের স্বাদ যোগ করে ভ্রমণে অন্য মাত্রা। ফলে মুর্শিদাবাদকে শুধু ‘নবাবের শহর’ হিসেবে দেখলে তার ইতিহাসের বড় অংশই অদেখা থেকে যায়।

লালবাগ, বড়নগর, আজিমগঞ্জ-জিয়াগঞ্জ, কাশিমবাজার, কাঠগোলা—সব মিলিয়ে মুর্শিদাবাদ আসলে একাধিক সময় ও সংস্কৃতির পাশাপাশি বেঁচে থাকা এক বিশাল ইতিহাসের মানচিত্র। তাই এই জেলা এক সফরে পুরোপুরি দেখা সম্ভব নয়; ইতিহাসের আরও গভীরে যেতে চাইলে বারবার ফিরতেই হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *