দ্য গ্রেট গোয়া ২ / ডলফিন ট্যুর সেরে কন্ডোলিমে কিছুক্ষণ

  • by
স্বপ্ন পাল

স্নান খাওয়া করে সমুদ্রের ধারে যখন গেলাম তখন সন্ধ্যা নামছে। সমুদ্রের ধারেই হোটেল। গোয়ার সমুদ্রের প্রথম ছোঁয়া মনকে এক লহমায় পুলকিত করে দিল। শরীরের সমস্ত ক্লান্তি যেন কোথায় উবে গেল। বাচ্চা-বড়ো সবাই সমুদ্রের জলে পা ভিজিয়ে নিলাম। অন্ধকারে দু-একটা ফটো তোলার চেষ্টা করলাম। ভালো হল না। অগত্যা সেগুলো ডিলিট করার কাজে মন দিলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে রূপ এসে আমায় টানাহ্যাঁচড়া করে বিরক্ত করতে শুরু করল। অন্যমনস্ক হয়ে ক্যামেরায় ‘ডিলিট অল’ অপশন টিপে বসলাম! মুহূর্তের মধ্যে সব ফটো মুছে গেল!

আমার দু দিনের পরিশ্রম, সাধনা সব আরব সাগরের পাড়ে নিমেষে শেষ হয়ে গেল! মেজাজ হারিয়ে ক্যামেরাটা ছুড়ে সমুদ্রের জলে ফেলে দিতে যাচ্ছিলাম, সৈকত আর সুকুমারদা আমাকে আটকাল

কালবিলম্ব না করে হোটেলে ফিরে এলাম। মনমরা হয়ে চা এর আসরে বসলাম সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারাক্রান্ত মনটাও একটু একটু করে স্বাভাবিক হতে শুরু করল। কাল নর্থ গোয়া ঘোরার প্ল্যান। কালকের ভ্রমণের ব্যবস্থা পাকা করে বেরোলাম, কোলভাকে একটু ঘুরে দেখতে।

আলো ঝলমলে কোলভা। ট্যাক্সিস্ট্যান্ড, অটোস্ট্যান্ড, বাসস্ট্যান্ড, দোকানপাট, হোটেল, রেস্তোরাঁ, বার, ওয়াইন শপ – কী নেই। কিন্তু চোখে পড়ল না ওষুধের দোকান আর ডাক্তারখানা। আছে হয়তো কোথাও!

কথায় আছে, যেখানেই যাও বাঙালি পাবে। এখানেও তার ব্যত্যয় হল নাআমাদের কোলমার বিচ রিসর্ট তো বাঙালিদেরই আস্তানা। সারা ক্ষ বাংলায় কথা, বাঙালি খাওয়াদাওয়া।

রিসর্টের বাইরেও প্রচুর বাঙালি ট্যুরিস্ট। অনেকের সাথেই আলাপ হল। ‘বাঙালি বাবুর হোটেল’ লেখা দেখে এগিয়ে গেলাম। পুরো বাংলা পরিবেশ। বাইরে বাংলায় মেনু লেখা। মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, তরকারি, ভাজা সবই পাওয়া যায়। বাঙালি পরিচালিত হোটেল।

কোলভায় সূর্যাস্ত।

ভোরবেলা সৈকতের ফোনে ঘুম ভাঙল। সমুদ্রের ধারে যখন এলাম হালকা আলো ফুটেছে। এই মুহূর্তে বিচ জনবিরল। আরব সাগর ভারতের পশ্চিমে, তাই এখানে সমুদ্র থেকে সুর্যয়দয় হয় না, সমুদ্রে সূর্যাস্ত হয়। বিচের এক দিকে সমুদ্র, অন্য দিকে নারকেল গাছের সারি। সত্যি এ এক অনবদ্য পটভূমি। আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্যুরিস্টের সংখ্যাও বাড়তে লাগল বিচে। এরই মাঝে কখন যেন পিংপং বলের মতো লাল সূর্যটা টুপ করে লাফ দিয়ে নারকেল গাছের মাথায় চড়ে বসেছে বুঝতে পারিনি। নারকেল গাছের উপর এক চিলতে আকাশের কপালে যেন একটা রাঙা টিপ।

একে একে জেলে নৌকাগুলো ফিরল। আমরাও ফিরলাম। সকাল ৯টা। প্রাতরাশ সেরে লাঞ্চ প্যাক করে বেরিয়ে পড়লাম উত্তর গোয়া ট্যুরে।

ঝাঁ চকচকে লাল এসি। জাইলো। ড্রাইভার বাদে সাত জন বসতে পারে। আমাদের জন্য একদম পারফেক্ট। আলাপ হল ড্রাইভারের সঙ্গে। নাম আসিফ বড। আমাদেরই বয়সি। গোঁফজোড়াটি দেখার মতো। কথা বলে মনে হয় বেশ খোলামেলা

গাড়ি চালাতে চালাতে আসিফ জানিয়ে দিল, আমরা এখন মুম্বইগোয়া হাইওয়ে দিয়ে যাচ্ছি। প্রথমেই যাব ডলফিন ট্রিপে।

ডলফিন দেখতে সমুদ্রপাড়ি।

মুম্বইগোয়া হাইওয়ে ঝকঝকে রাস্তা, সামনেই পাহাড়, চারিদিকে সবুজ। পেরোলাম জুয়ারি নদী। এলাম মান্ডবী নদীর ধারে, পৌঁছে গেলাম গোয়ার রাজধানী পানাজি। মান্ডবী পেরিয়ে অবশেষে পৌঁছোলাম সিঙ্কুয়েরিম ডলফিন ট্রিপের সামনে। মাথাপিছু ৩০০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে গায়ে লাইফ জ্যাকেট চড়িয়ে বোটে বসে পড়লাম। মান্ডবির একটি শাখা নদী দিয়ে আমরা সমুদ্রে যাব ডলফিন দেখতে। বেশ অ্যাডভেঞ্চারাস লাগছে।

বোটে ১৪টা চেয়ার। আমরা ছাড়াও আরও একটা সাত জনের দল উঠল। সাত জনই বেশ হৃষ্টপুষ্ট। আমরা সামনের দিকে বসেছি। সৈকত আমায় সতর্ক করে দিল – দেখিস বোট আবার পিছন দিক থেকে না উলটে যায়।

বোট ছাড়ল। দৃশ্যপট বড়ই সুন্দর। এক জায়গায় এসে বোট ইঞ্জিন বন্ধ করে দাঁড়িয়ে গেল। আশেপাশে আরও দুটো বোট আমাদের মতো ইঞ্জিন বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ দেখি অনেকটা দূরে একটা কালো রঙের কিছু একটা জল থেকে ভুস করে ভেসে উঠেই আবার জলের নীচে চলে গেল। ভালো করে কিছু বুঝে উঠলাম না। আবার অপেক্ষা, আবার উঠল, এ বার দেখতে পেলাম ডলফিনটাকে।

ফটো তোলার চেষ্টা করলাম। ডান দিকে ক্যামেরা তাক করি তো বাঁ দিকে দেখা যায়, বাঁ দিকে তাক করি তো ডান দিকে দেখা যায়। সামনে, পিছনে, ডানদিক, বাঁদিক করতে করতে এক সময় ক্যামেরাবন্দি হল ডলফিন

বোট এ বার মাথাপিছু ৩০০ টাকার ডিউটি শেষ করে ফিরে চলল। যাওয়ার পথে পাহাড়ের মাথায় আগুয়াদা ফোর্ট দেখতে পেলাম। নদীর দুধারে নারকেল গাছে ঘেরা রিসর্ট, হোটেলগুলো দেখতে বেশ ভালো লাগছে।

আগুয়াদা ফোর্ট।

বোট জার্নি শেষ, আবার গাড়ি। আসিফ আমাদের হাজির করল আগুয়াদা ফোর্টের সামনে এনে। দুপুরবেলা। যেমন রোদের তেজ তেমনি গরম। অনেকটা হেঁটে যেতে হবে । হাঁটতে হাঁটতে দুর্গ সম্পর্কে যেটুকু জানলাম বলি

গোয়া ছিল পর্তুগিজ উপনিবেশ। ডাচ ও মারাঠাদের থেকে বাঁচতে ১৬১২ সালে কন্ডোলিম বিচের দক্ষিণে পাহাড়ের উপর পর্তুগিজরা এই দুর্গ বানায়। এর মধ্যে একটা লাইটহাউস আছে যা এশিয়ার প্রাচীনতম। এখান থেকে যেমন রাতে জাহাজগুলিকে আলো দেখান হত তেমন জাহাজে পানীয় জলও সরবরাহ করা হত। পর্তুগিজ ভাষায় ‘আগুয়াদা’ শব্দের অর্থ জল। এই কারণেই এই দুর্গের নাম আগুয়াদা ফোর্ট।

দুর্গে ২৩৭৬০০০ গ্যালন জল মজুতের ব্যবস্থা ছিল যা তৎকালীন সময়ে এশিয়ার বৃহত্তম রিজার্ভার। দুর্গের দুটি অংশ উপরের অংশটি দুর্গ হিসাবে ব্যবহৃত হত এবং নীচের অংশটিতে সমুদ্রের জল ঢুকিয়ে পর্তুগিজ জাহাজগুলিকে আশ্রয় দেওয়া হত। দুর্গের মধ্যে স্বাভাবিক ভাবেই বন্দিশালাও আছে। দুর্গের অনেক জায়গাই ট্যুরিস্টদের প্রবেশ নিষেধ।

দুপুর একটা। জিরা রাইস আর চিলি পনির দিয়ে লাঞ্চ করে আবার যাত্রা শুরু। অল্প কিছুটা গিয়েই আগুয়াদা বিচ যার পোশাকি নাম সিঙ্কুয়েরিম বিচ। নারকেল গাছে ঘেরা সোনালি সৈকত। সমুদ্র থেকে অনেকটা উপরে দুদিকে দেওয়াল গেঁথে বাঁধের মতো করা আছে। তার উপর দিয়েই হেঁটে যেতে হয়। বিচে যেতে গেলে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে হয়। এই বাঁধের অপর প্রান্ত সমুদ্রের অনেকটা ভিতরে একটা বিরাট বৃত্তাকার চৌবাচ্চা মতো জায়গায় গিয়ে শেষ হয়েছে। এটি আগুয়াদা ফোর্টেরই অংশ। জাহাজগুলি সমুদ্রে এখানেই চৌবাচ্চার বাইরের দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়াত এবং ভিতরে ফোকরের পাল্লা খুলে সেখান দিয়ে উপর থেকে জাহাজে জল ভরা হত।

আমরা এখানে খানিক ঘোরাঘুরি করে ফোটো সেশন শেষ করে ফিরে এলাম গাড়িতে।

পাশের বিচটাই কন্ডোলিম। আসিফকে যাওয়ার কথা বলতেই ও বলল, ওখানে সব বিদেশিদের ভিড়। আপনারা ফ্যামিলি নিয়ে ওই রকম আডাল্ট মার্কা বিচে যাবেন? আমরা যাওয়ার কথা বলতেই ও কয়েক মিনিটের মধ্যেই পৌঁছিয়ে দিল কন্ডোলিম বিচে

কন্ডোলিম সৈকত।

লম্বা ঝোপঝাড়ের সারি বিচের সামনে পাঁচিলের মতো দাঁড়িয়ে। সেই দেওয়াল ভেদ করে বিচের সামান্যতম অংশও চোখে পড়ে না। ঝোপঝাড়ের মাঝখান দিয়ে বিচে যাওয়ার কাঁচা রাস্তা। ওই রাস্তা ধরেই বিচে চলে এলাম। লম্বাচওড়ায় বেশ বড় বিচ। তবে ফাঁকাই বলা যায়। গুটিকয়েক বিদেশি নারীপুরুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে। তারা কেউ রৌদ্রস্নান করছে কেউ বা সমুদ্রস্নান করছে। আবার কেউ ছাতার নীচে বিছানায় শুয়ে। বিচে ভারতীয় বলতে আমরা জন আর দুজন কর্তব্যরত লাইফ গার্ড।

চোখ আটকাল এক দম্পতির দিকে। তাদের সঙ্গে একটা বছর দুইতিন বাচ্চাও আছে। তারা পালা করে সমুদ্রে স্নান করছে। একজন বাচ্চাটির কাছে বসে থাকছে এবং অপরজন সমুদ্রে স্নান করছে। বেশ ভাল লাগল ওদের দেখে। কন্ডোলিম বিচে কিছুক্ষণ উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটাহাঁটি করে এগিয়ে চললাম পরবর্তী গন্তব্যের দিকে। (চলবে)

 

Leave a Reply