Browsing Tag:গ্যাংটক

the-mysterious-silk-route-last-part-returning-home-from-gangtok
sudip paul
সুদীপ পাল

গ্যাংটকের হোটেলে ঘরগুলো খুব সুন্দর পজিশনে ছিল। বড়ো বড়ো জানলা দিয়ে দূরের পাহাড় দেখা যায়। পরে জেনেছিলাম ওই পাহাড়েই বোনঝাকরি ফলস-সহ কিছু ট্যুরিস্ট স্পট আছে। যদিও জানলা দিয়ে বিশাল সবুজ পাহাড় ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। এমনকি পাহাড়ের গায়ে কোনো বাড়িঘরও দেখা যাচ্ছে না।

ঝটপট ব্যাগপত্র রেখে ঘরে তালা মেরে ডাইনিং হলে চলে এলাম। এখন ৩টে বাজে। খিদেয় পেট জ্বলছে। এই ট্যুরে এই প্রথম মাছ খেলাম। হোটেলের মালিক ও ম্যানেজার দু’জনেই বাঙালি, তাই বেশ একটা স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করছি।  খাওয়াপর্ব মিটে যাওয়ার পর ভূপালকে বিদায় জানানোর পালা। সত্যি এই ট্যুরে ও না থাকলে হয়তো ওই পথ পুরো কভার করে আসতে পারতাম না।

আরও পড়ুন রহস্যময় রেশম পথ / পর্ব ১০ : কুপুপ থেকে গ্যাংটক

ক্যালেন্ডারে দেখেছিলাম আজ বুদ্ধপূর্ণিমা। তাই ভেবেছিলাম, পুজোপাঠ ও উৎসব দেখার জন্য রুমটেক মনাস্টেরি যাব। কিন্তু হোটেল-মালিক কোথাও ফোন করার পর জানালেন, পূর্ণিমা আজ সকালেই ছেড়ে গিয়েছে। প্রোগ্রাম সব কাল ছিল, আজ কোনো প্রোগ্রাম নেই। মনটা দমে গেল।

MG marg in the evening
বৃষ্টিভেজা সন্ধের এম জি মার্গ।

হতচ্ছাড়া বৃষ্টি যেন পিছু ছাড়ে না। টিপ টিপ করে পড়ছে। বৃষ্টির মধ্যেই ছাতা চলে এলাম এমজি মার্গে। আলো ঝলমলে এমজি মার্গ, গ্যাংটকের ম্যাল। বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট, বসার জায়গা সব ভিজে গিয়েছে। রাস্তার দু’দিকে হরেক রকম সম্ভার নিয়ে সাজানোগোছানো প্রচুর দোকান। বৃষ্টির মধ্যেই রাস্তায় মানুষের ঢল। অধিকাংশই বাঙালি ট্যুরিস্ট। আমরাও সেই দলে মিশে গেলাম। দু’ ঘণ্টা হাঁটাহাঁটি করে পায়ের অবস্থা খারাপ। তাই ১০০ টাকা দিয়ে ট্যাক্সি ভাড়া করে হোটেলে ফিরে এলাম।

আমাদের কাররওই এটা প্রথম বার গ্যাংটকভ্রমণ নয়, জনপ্রিয় স্পটগুলো সবারই ঘোরা। অথচ কালকের পুরো দিনটা আমাদের হাতে। হোটেলবন্দি হয়ে থাকার কোনো মানেই হয় না। তাই অনেক মাথা ঘামিয়ে কালকের ভ্রমণসূচি বানালাম –  ইঞ্চে মনাস্ট্রি, দো দ্রুল চোর্তেন, গ্যাংটক ফ্লাওয়ার একজিবিশন সেন্টার আর ইনস্টিটিউট অফ টিবেটোলজি। রাতের খেতে যাওয়ার আগে ম্যানেজারকে দিয়ে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করলাম।

enchey monastery
ইঞ্চে মনাস্টেরি।

পরের দিন ৯টার মধ্যে স্নান সেরে প্রাতরাশ সারা। গাড়ি সময়মতো চলে এসেছে। আমাদের প্রথম গন্তব্য আপার গ্যাংটকে, ইঞ্চে মনাস্টেরিতে।

আপার গ্যাংটক অভিজাত এলাকা। মন্ত্রী থেকে শুরু করে বড়ো বড়ো সরকারি পদাধিকারীরা এখানে থাকেন। জায়গাটাও বেশ সুন্দর। রাস্তার ধারে পাইন গাছের সারি। এ সব দেখতে দেখতে চলে এলাম ইঞ্চে মনাস্টেরি। নানা রঙের তিব্বতি কলকা ফটকে। গাছপালায় ঢাকা পথ ধরে অনেকটা হেঁটে যেতে হয়। হেঁটে যাওয়ার পথে বাঁ দিকের মনোমুগ্ধকর নিসর্গ দেখা যায়। তবে যে হারে ঘরবাড়ি তৈরি হচ্ছে, এ দৃশ্য আর কত দিন দেখা যাবে জানি না।

view from enchey monastery
ইঞ্চে মনাস্টেরি থেকে।

১৮৪০ সালে তিব্বতি লামা দ্রুপথ্রব কার্পো এই গুম্ফাটি নির্মাণ করেন। শোনা যায় তিনি দৈবক্ষমতা বলে উড়তে পারতেন। এর পর ১৯০৮ সালে তখনকার ১০ম রাজা সিকিয়ং টুলকু এই গুম্ফার পুনর্নির্মাণ করেন। সিকিয়ং টুলকু গুম্ফার যে রূপ দান করেন আমরা এখন সেটাই দেখতে পাই। পথের দু’ পাশেই রঙিন প্রার্থনাপতাকা ও প্রার্থনাচক্র সারিবদ্ধ ভাবে লাগানো আছে। ডান দিকের চক্র ঘোরাতে ঘোরাতে মনাস্টেরিতে  যেতে হয় এবং বিপরীত দিকের চক্রগুলো ঘোরাতে ঘোরাতে ফিরতে হয়।

বেশ বড়ো গুম্ফা। জুতো খুলে সাত ধাপ সিঁড়ি বেয়ে ভিতরে ঢুকলাম। বিশাল বুদ্ধমূর্তি মুর্তি। ভিতরে চলার পথের দু’ পাশে পাঁচ জন করে মোট দশ জন সন্ন্যাসী মুখোমুখি বসে মন্ত্রপাঠ করছেন। তাঁদের মন্ত্রোচ্চারণের সুর মুগ্ধ হয়ে বসে শুনতে হয়। এত সুন্দর ছন্দ আমি কখনও শুনেছি বলে মনে পড়ে না। তন্ময় হয়ে ধীর পায়ে তাঁদের সামনে দিয়ে মূর্তির কাছে এলাম। তিব্বতি কারুকার্য করা বেদিতে অনেক বাতি জ্বলছে। প্রচুর ফুল দিয়ে সাজানো। ভিতরের দেওয়ালেও তিব্বতি কারুকার্য। মন্ত্রোচ্চারণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনলাম। তার পর বেরিয়ে এলাম। কানে তখনও বাজছে সেই সুর। কয়েকটা মিনিট মনের আবহই পালটে দিল।

 flower exhibition centre
ফ্লাওয়ার একজিবিশন সেন্টার।

এ বারের গন্তব্য গ্যাংটক ফ্লাওয়ার একজিবিশন সেন্টার। টিকিট কেটে প্রবেশ। ভিতরে ঢুকেই চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। কত রকমের কত ফুল রে ভাই! কলকাতায় শীতকালে কিছু পুষ্পপ্রদর্শনী দেখেছি, কিন্তু এত ফুলের সমাহার দেখিনি। চতুর্দিক আলো করে আছে বিভিন্ন রঙের ফুল। আমরা যেন ফুল বাগিচার মৌমাছি । কোন দিকে কোন ফুলের কাছে যাব তা যেন ঠিক করতে পারছি না।

 flower exhibition centre 2
ফুলের জলসা।

ঘন্টা খানেক ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়িয়ে বেরিয়ে এলাম। কিন্তু গাড়ি কথায় গেল? সারথিকে ফোন করে জানলাম গাড়ি যেখানে আছে সেখানে যেতে আমাদের হাফ কিমি হাঁটতে হবে। গ্যাংটকের ট্র্যাফিক পুলিশ বেশ কড়া। রাস্তার ধারে ফাঁকা জায়গা রয়েছে। তা সত্ত্বেও পার্কিং-এ গাড়ি রাখা বাধ্যতামূলক। হাঁটতে হাঁটতে গাড়ির কাছে এলাম। সুন্দর সাজানো গোছানো শহর, গাছে ঢাকা অথচ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তা। 

near flower exhibition centre
ফ্লাওয়ার একজিবিশন সেন্টারের কাছে।

সারথি জানালেন, এ বারের গন্তব্য দো দ্রুল চোর্তেন। চোর্তেনের কাছে পৌঁছে গাড়ি থেকে নেমে কিছুটা হাঁটতে হয়। হাঁটতে হাঁটতে এই স্তুপ সম্পর্কে যেটুকু জানি সেটা বলি। দ্রোদুল চোর্তেন ১৯৪৫ সালে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের নিংমা সম্প্রদায়ের প্রধান ত্রুলসিক রিনপোচে নির্মাণ করেছিলেন। তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মের চারটি প্রধান সম্প্রদায় হল নিংমা, কাগিউ, শাক্য ও গেলুগ। নিংমা শব্দের অর্থ হল প্রাচীন। এখানে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের অনেক দুষ্প্রাপ্য পুথি রাখা আছে। 

dro dul chorten
দ্রো দুল চোর্তেন।

ভিতরে ঢুকে স্তূপগুলোর ছবি তুললাম। দু’জন সন্ন্যাসীকে দেখে এগিয়ে গেলাম। নমস্কার জানিয়ে এই চোর্তেন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলাম। এই চোর্তেনের প্রধানের সঙ্গে দেখা করার পরামর্শ দিয়ে তাঁরা চলে গেলেন। আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁদের চলে যাওয়া দেখলাম। 

মৌসুমীকে সঙ্গে নিয়ে চোর্তেনের অফিসে প্রধান আধিকারিকের কাছে এলাম। তাঁর অনুমতি নিয়ে অফিসের ভিতরে ঢুকলাম। সাজানো-গোছানো ঘর। দামি চেয়ার-টেবিলে বসে আধিকারিক একজন সন্ন্যাসীর সঙ্গে কথা বলছিলেন। আমরা যাওয়ার পর উঠে দাঁড়ালেন, তবে তা আমাদের প্রতি সৌজন্যতা প্রকাশ করার জন্য নয়, বাইরে বেরোনোর জন্য।  আমাদের আসার কারণ জানালাম। সব শুনে তিনি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকলেন। তার পর যা বললেন তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। ওঁর মোদ্দা কথা, উনি এখানে নতুন এসেছেন। এখানকার চোর্তেন সম্পর্কে কিছু জানেন না। এ সম্পর্কে কোনো বুকলেটও নেই। কিছু জানতে হলে গুগুল সার্চ করতে হবে। 

ব্যথিত হলাম। বৌদ্ধধর্মকে আমি শ্রদ্ধা করি। এই ধর্মে শিক্ষার একটা আলাদা গুরুত্ব আছে। বৌদ্ধ সংস্কৃতি আমাদের অনেক কিছু শেখায় কিন্তু আজ যা অভিজ্ঞতা হল তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। 

 institute of tibetology
ইনস্টিটিউট অব টিবেটোলজি।

চোর্তেন থেকে বেরিয়ে এলাম। কিছুটা হেঁটেই ইনস্টিটিউট অফ টিবেটোলাজি। চোর্তেন যাওয়ার সময় এর পাশ দিয়েই যেতে হয়। আগে চোর্তেন দেখে এখন ফেরার পথে ঢুকছি। সত্যজিৎ রায়ের ‘গ্যাংটকে গণ্ডগোল’-এ এই জায়গার নাম পাই। গল্পে ‘যমন্তক’ নামে এক বুদ্ধমূর্তির উল্লেখ আছে যার  ৯টা মাথা ও ৩৪টা হাত। এখানে কি সেই মূর্তির দেখা পাব? নাকি সবটাই নিছক গল্প! 

মাথাপিছু ৪০ টাকা করে টিকিট কেটে ঢুকলাম। ভিতরে ফটো তোলা নিষেধ। মাঝারি সাইজের হলঘরে বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য জিনিস রাখা আছে।  প্রাচীন বই, পুথি, চিত্র, অস্ত্র, মুদ্রা, কার্পেট/কাঁথা, মূর্তি, বাসন ইত্যাদি। ইংরাজিতে তার বিবরণ ও লেখা আছে।

 on the way to institute of tibetology
ইনস্টিটিউট অব টিবেটোলজির পথে।

কিন্তু কোথায় যমন্তক? গল্পের বইয়ে সবটাই কি গল্প? এই সব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে যাচ্ছি, হঠাৎ সামনের দেওয়ালে একটা মূর্তি চোখে পড়ল। এটা কী? হ্যাঁ, এই তো সেই যমন্তক! নাহ্‌, সব গল্প ছিল না। গুনে দেখলাম ফুট খানেক বা তার সামান্য কিছু বড়ো মূর্তিটার ৫ ধাপে মোট ১১টা মাথা এবং গোল করে সাজানো মোট ৪২টা হাত।

ইনস্টিটিউট অফ টিবেটোলাজি থেকে বেরিয়ে এলাম। রাস্তার ও পারে একটা স্মারকের দোকান। সেখানে ঢুকলাম। সবই প্রায় বৌদ্ধ বা তিব্বতি সংস্কৃতির দ্রব্য।  এটা ওটা দেখলাম, দাম করলাম। দাম শুনেই পকেটে আগুন লেগে যাচ্ছে। তবুও সাধ্যমতো দু’টো জিনিস কিনলাম। একটা ড্রাগন আর একটা বুদ্ধমূর্তি। এখনকার মতো ঘোরা শেষ করে ফিরে চললাম হোটেলে। 

একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার পথে। আকাশের অবস্থা খুব একটা ভালো না। পাহাড়ে ওঠা ইস্তক ভালো আবহাওয়া পাইনি বললেই চলে। সব সময় আকাশের মুখ ব্যাজার। কোনো জায়গা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার টিকিটাও দেখতে দিল না!

লাল মার্কেটে চক্কর মেরে এলাম মূল ম্যালে। এ-দোকান ও-দোকান ঘুরছি। অল্পবিস্তর কেনাকাটি হয়েছে। গ্যাংটকে এসে  অব্দি মোমো খাওয়া হয়নি। মোমো আমার খুব পছন্দের খাবার। আমি আজ মোমো খাবই পণ করেছি। ও দিকে অরূপদাও চা চা করছে। অতএব মোমো তো খাওয়া হলই, সঙ্গে শিঙাড়া, মিষ্টি, কফি – কিছুই বাদ গেল না।

বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে। এ বৃষ্টি আরও বাড়বে। ছাতাও আনিনি, ঘোরাঘুরি মাথায় উঠল। হাঁটার তো প্রশ্নই নেই, ট্যাক্সি খুঁজতে খুঁজতেই জোর বৃষ্টি এল।  বেশি টাকা কবুল করে একটা ট্যাক্সি ঠিক করলাম। ততক্ষণে ভিজে গিয়ে আমার অবস্থা  লর্ড চমচমের মতো।

view from of hotel
ততক্ষণে কাঞ্চনজঙ্ঘা আবার মুখ লুকিয়েছে।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই জানলার পর্দা সরিয়ে রোজকার মতোই বাইরের দিকে তাকালাম। বাইরে তাকিয়েই চক্ষু স্থির! এ কী দেখছি আমি! অবশেষে কাঞ্চনজঙ্ঘা! সামনের পাহাড়ের পিছনে লুকিয়ে থেকে কেবল মাথাটা বাড়িয়ে উঁকি মেরে আমাদের দেখছে কাঞ্চন। সমগ্র ট্যুরের মাঝে তাকে খুঁজে পাইনি, আজ ফেরার দিন তাকে ধরে ফেলেছি। না না, ভুল হল। আমরা তাকে ধরিনি, শেষ দিন বলে সেই-ই আমাদের কাছে ধরা দিল। 

আনন্দে সবাইকে ডেকে দেখালাম। না-ই বা দেখা গেল পুরো কাঞ্চনকে, কিছুটা তো দেখা যাচ্ছে। সবাই সম্মোহিতের মতো সে দিকে তাকিয়ে রইলাম। অনেকক্ষণ ধরে দেখেও সাধ মেটে না, কিন্তু উপায় নেই। এখনও কিছু গোছগাছ বাকি। একটু পরেই তো রওনা হতে হবে বাড়ির পথে। (শেষ)

ট্যুর প্ল্যান-

দিন ১ – এনজেপি থেকে রামধুরা। রাত্রিবাস।

দিন ২ – সকালে বেরিয়ে ইচ্ছেগাঁও, সিলারিগাঁও ঘুরে রিশিখোলায় রাত্রিবাস।

দিন ৩ – সকালে বেরিয়ে অরিটার লেক ঘুরে রংলি থেকে পারমিশন করে জুলুক। রাত্রিবাস।

দিন ৪ – সকালেই বেরিয়ে জুলুক ভিউ পয়েন্ট, থাম্বি ভিউ পয়েন্ট, নাথাং ভ্যালি, বাবা মন্দির, কুপুপ লেক, ছাঙ্গু লেক হয়ে সোজা গ্যাংটক। রাত্রিবাস।

দিন ৫ – গ্যাংটকে বিশ্রাম।

দিন ৬- এনজেপি থেকে ফেরার ট্রেন ধরা।

ছবি লেখক

0 Comments
Share
the-mysterious-silk-route-part-10-from-kupup-to-gangtok
sudip paul
সুদীপ পাল

পুরোনো বাবা মন্দির থেকে মাত্র কয়েক কিমি রাস্তা, আধ ঘণ্টায় চলে এলাম কুপুপ লেক। বরফ গলতে শুরু করেছে। রাস্তায় কাদা-কাদা ভাব। অত্যন্ত স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়া। হালকা কুয়াশায় চারিদিকে একটা বিবর্ণতার প্রলেপ। এটাই এই পথের সর্বোচ্চ স্থান, ১৪০০০ ফুট।

আরও পড়ুন রহস্যময় রেশম পথ / পর্ব ৯ : বরফের রাজ্যে

গাড়ি থেকে নেমে এলাম। জুতো অনেক আগেই ভিজে গিয়ে রসবড়া হয়ে গিয়েছে, সুতরাং আর জুতো ভেজার ভয় নেই। অরূপদাও নামল। বাকিরা গাড়ির বন্ধ জানলার ভিতর থেকে কুপুপ লেক দর্শন করেই সন্তুষ্ট। আমাদের পিছনে পিছনে মহিলাদের গাড়িটাও চলে এসেছে। ওঁরাও নেমে পড়লেন। এ-দিক ও-দিক কিছু ফোটো তোলার পর আমার ক্যামেরাটা ওঁদেরই একজনের শ্রীহস্তে সমর্পণ করলাম আমাদের দু’জনের চাঁদবদনের ছবি তোলার জন্য। 

kupup lake
কুপুপ লেক।

জায়গাটার নাম কুপুপ, সেখান থেকেই কুপুপ লেক নামে পরিচিতি। আসল নাম এলিফ্যান্ট লেক। উপর থেকে লেকের আকার হাতির মতো দেখতে লাগে। লেকের বাম তীর বরাবর জেলেপ-লা যাওয়ার রাস্তা সরু ফিতের মতো দেখা যাচ্ছে। এ পথ এখন সেনাবাহিনীর দখলে, সাধারণ মানুষের যাওয়া নিষিদ্ধ। ভারত, চিন ও ভুটানের সংযোগস্থলে ডোকলা সীমান্ত। এই ডোকলা নিয়ে বছরখানেক ধরে ভারত ও চিনের মধ্যে উত্তপ্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আর এই পথ হল ডোকলা যাওয়ার।

চারিদিক কুয়াশাচ্ছন্ন ও বরফাবৃত হয়ে থাকার কারণে লেকের জল কাকচক্ষুর মতো কালো দেখাচ্ছে।  এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে মিলিটারি ক্যাম্প ও বিশ্বের সর্বোচ্চ ইয়াক গলফ কোর্স।

আমরা ফিরতেই ভূপাল গাড়ি ছেড়ে দিল। সেই সঙ্গে জানিয়ে দিল, আমরা এ বার মিলিটারি ক্যাম্প এরিয়ার ভিতর দিয়ে যাব। কেউ যেন কোনো ফোটো না তুলি। ধরা পড়লে ক্যামেরা বাজেয়াপ্ত হওয়া, জেল প্রভৃতি অনেক কিছুই সাজা হতে পারে। ক্যামেরা অফ করে রেখে দিলাম। 

yak golf course and ice hockey ground
ইয়াক গলফ কোর্স ও আইস হকির মাঠ।

সেনাশিবির পেরিয়ে আসার পরেই ডান দিকে বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তর পেলাম। এটাই ইয়াক গলফ কোর্স। ইয়াক গলফ কোর্সের এক ধারে আইস হকি ফিল্ড। আইস হকি ফিল্ডের পিছনে একটা গ্রাম দেখা যাচ্ছে । ২০/২৫ টা বাড়ি নিয়ে এই গ্রাম। এই গ্রামে বাইরের লোক বা ট্যুরিস্টদের থাকার অনুমতি দেওয়া হয় না। এখানে থাকার জন্য গ্রামবাসীদের প্রতি মাসেই অনুমতি নবীকরণ করাতে হয়। 

বরফ গলা শুরু হয়ে গিয়েছে। চারিদিক থেকে জল বয়ে যাচ্ছে ফলে একটা কেমন একঘেয়ে ঝিম ধরা আওয়াজ। এক সময় ইয়াক গলফ কোর্স আড়ালে চলে গেল। আমাদের বাঁ পাশে বিশাল এক খাদ রাস্তা বরাবর চলেছে। খাদে ও পাহাড়ের গায়ে হাজার হাজার পাইন গাছ। ভূপাল জানাল, ওই খাদেই কোনো এক জায়গায় রয়েছে মেমেঞ্চ লেক। মেমেঞ্চ লেকে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল কিন্তু এখন সম্ভব নয়। কারণ, ২/৩ কিমি ট্রেক করে লেকে পৌঁছোতে হয়।

new baba mandir
নতুন বাবা মন্দির।

চলে এলাম নতুন বাবা মন্দিরে। আমরা পুরোনো বাবা মন্দির দেখে আসছি, যা আসল বাবা মন্দির। দীর্ঘ জার্নিতে শরীরের সঙ্গে মনেও একটা ক্লান্তি এসেছে। তাই কেউ নামতে রাজি হল না। মন্দিরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ি থেকেই দেখে নিলাম। ভিতরে সিংহাসনে হরভজন সিং-এর ছবি। পুরোনো বাবা মন্দির অনেক উঁচুতে আর অনেকটাই দূরে। সবাই সেখানে যেতে পারেন না। তাই অনেকটা নীচে এখানে এই নতুন বাবামন্দির তৈরি হয়েছে।

বরফঢাকা পরিবেশের মধ্যে চলেছি। এ দিকে রূপের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। ওর জ্বর এসেছিল লক্ষ্মণচকে। নাথাং ভ্যালি পৌঁছোনোর আগেই ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। এখন ক্লান্তির কারণে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে সম্ভবত। ওকে কোকা ৩০ খাইয়ে হাতে কর্পূরের শিশি ধরিয়ে দেওয়া হল শোঁকার জন্য। এই দু’টো জিনিসই শ্বাসকষ্টে খুব কাজের।

hangu lake with welcome gate
হাঙ্গু লেক ও ওয়েলকাম গেট।

আমাদের গাড়ি হাঙ্গু লেকের (ছাঙ্গু নয়) সামনে চলে এল। এটাই হল পৃথিবীর উচ্চতম লেক যেখানে বোটিং হয়। একটা ওয়েলকাম গেট রয়েছে। গেটে লেখা অ্যালপাইন পার্ক। কোত্থাও কেউ নেই। লেকে যাওয়ার জন্য প্রবেশমূল্য লাগে কিনা জানি না। একটাও বোট চোখে পড়ল না। বরফে চাপা পড়ে থাকতে পারে। 

ganju lama war museum
গঞ্জু লামা ওঅর মিউজিয়াম।

হাঙ্গু লেকের পাড় বরাবর রাস্তা। লেক পেরিয়ে কিছুটা আসার পর বাঁ দিকে পড়ল গঞ্জু লামা ওঅর মিউজিয়াম। ভারত-চিন যুদ্ধের স্মৃতিতে এই মিউজিয়াম। মিউজিয়াম সম্ভবত খোলা আছে কিন্তু কোনো জনপ্রাণীও নেই। তবে এখন মিউজিয়াম দেখতে যাওয়ার মতো ধৈর্যও আমাদের নেই।

কিছু পরে রাস্তার ডান দিকে নাথুলা যাওয়ার রাস্তা উপর দিকে উঠে গিয়েছে দেখলাম। রাস্তার শুরুতেই একটা ওয়েলকাম গেট। নাথুলা যাওয়ার জন্য আলাদা অনুমতি নিতে হয় গ্যাংটক থেকে। আমাদের সেই অনুমতি নেই, তাই যাওয়ার প্রশ্নই নেই। 

sherthang
শেরথাং।

রাস্তার বাঁ দিকে আবার এক লেকের দেখা পেলাম, নাম মঞ্জু লেক, হাঙ্গু বা ছাঙ্গুর তুলনায় অনেক ছোটো। লেকের জল পুরো হোয়াইট ওয়াশ হয়ে গিয়েছে। রাস্তার ধারে ৬ ইঞ্চি পুরু বরফ। এখানেও গাড়ি না থামিয়া চলে এলাম শেরথাং। নাথুলা বর্ডার দিয়ে যে সব ট্যুরিস্ট কৈলাস-মানস সরবোর যান তাঁদের জন্য সুন্দর সুন্দর কিছু ঘর করা আছে এখানে। অর্থাৎ তাঁদের আক্লাইমেটাইজ করার জন্য ব্যবস্থা। দুধ-সাদা বাড়িগুলির সবুজ ছাদ এখন বরফে সাদা।

গাড়ি চলছে থেগুর উপর দিয়ে। ছাঙ্গু এখনও ৪ কিমি দূরে। হঠাৎ ‘মোনাল’,  ‘মোনাল’, বলে ভূপাল সজোরে গাড়ি ব্রেক কষল। খ্যাসসসস করে আওয়াজ তুলে বরফে ফুট খানেক হড়কে গিয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। চেয়ে দেখি সামনে ডান দিকে সিকিমের রাজ্য পাখি মোনাল। হাঁসের মতোই আকার। দেহের গঠন ময়ুরের মতো। সবুজ মাথায় ময়ুরের মতোই একটা ঝুঁটি। সামান্য লম্বা গলায় উজ্জ্বল লাল ও হলুদ রঙ থেকে যেন দ্যুতি বেরোচ্ছে। উজ্জ্বল ঘন নীল রঙের দেহ। পানকৌড়ির লেজের মতো লেজ। লেজের শেষ দিকটা কমলা রঙ। মোনালের সারা শরীরের সমস্ত রঙই মেটালিক। অপুর্ব তার রূপ। যারা মোনাল চেনে না তারা ময়ূর বলে ভুল করতে পারে।

monal
মোনালের ছবি তোলার ব্যর্থ চেষ্টা।

জীবনে প্রথম মোনাল দেখলাম। পাখিটা ব্রেকের শব্দে ও আকস্মিক গাড়ি থামার কারণে ভয় পেয়ে ডান দিকের পাহাড় বেয়ে দ্রুত উঠতে শুরু করেছে। আমি বিহ্বল হয়ে তাকে দেখছি। গলায় ক্যামেরা ঝুলছে কিন্তু ফোটো তোলার কথা ভুলে গিয়েছি।

ক্যামেরা বার করুন – ভূপালের কথায় সংবিৎ ফিরল। ক্যামেরার ব্যাগ থেকে দ্রুত ক্যামেরা বার করে অন করতে করতে সে আরও খানিকটা উপরে। মোটামুটি ক্যামেরার রেঞ্জের বাইরে। তার উপর উজ্জ্বল সাদা আকাশের ব্যাকগ্রাউন্ড। ছবি কালো আসছে, তবুও শট নিলাম। মনের মধ্যে মিশ্র অনুভুতি। এক দিকে মোনাল দেখার আনন্দ অপর দিকে তাকে ঠিকমতো ক্যামেরাবন্দি করতে না পারার দুঃখ।  

মোনাল চোখের আড়ালে যেতেই আবার যাত্রা শুরু। রাস্তার বাম দিকে গভীর খাদ। খাদের অপারে উত্তুঙ্গ পর্বতশ্রেণি মাথায় বরফের মুকুট পরে দাঁড়িয়ে আছে। ওই পাহাড়শ্রেণির যে রাস্তা লেপটে আছে সেই রাস্তায় কিছুক্ষণ পরেই চলে এলাম। ছাঙ্গু লেক আর দু’ কিলোমিটার।

way to tsomgo lake
ছাঙ্গু যাওয়ার পথ।

রাস্তায় জওয়ানদের আনাগোনা দেখতে পাচ্ছি। আমরা হাত নাড়লে তাঁরাও হাত নেড়ে অভিনন্দন জানাচ্ছে। এক সময় অনেক উপর থেকে লম্বালম্বি ভাবে ছাঙ্গু লেককে দেখতে পেলাম। লেকের দু’ দিক পাহাড় দিয়ে ঘেরা। আমরা যে দিকে এখন আছি সে দিক ধরলে তিন দিক হয়। মনে হল বিশাল দৈত্যাকার সাদা রঙের এক নৌকার খোলে খানিকটা জল জমে আছে। খানিকক্ষণ বাদে বাদে ইউ টার্ন নিয়ে গাড়ি ক্রমশ নীচের দিকে নামতে থাকল। যত এগোচ্ছি লেকের আকার ততোই বড়ো হচ্ছে আমাদের চোখে।  এর আগে ২০১৫-য় গ্যাংটক থেকে ছাঙ্গু লেক পর্যন্ত আসতে পেরেছিলাম। বরফের কারণে রাস্তা বন্ধ থাকায় আমরা আর যেতে পারিনি। এ বারেও যাঁরা নাথুলা বা বাবা মন্দির যাওয়ার জন্য গ্যাংটক থেকে আসছেন তাঁদের ছাঙ্গু লেকের পরে আর যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।  আমরা বিপরীত দিক থেকে আসছি, তাই আমাদের এ পথে যাওয়ার সৌভাগ্য হল। 

tsomgo lake
রাস্তার পাশেই ছাঙ্গু লেক।

লেকের পাশে রাস্তার এক ধারে গাড়ি দাঁড়াল। সবাই নেমে পড়লাম। লেকের জলে পাশের পাহাড়শ্রেণির প্রতিবিম্ব।  ২০১৫ সালে ছাঙ্গু এত ঘিঞ্জি ছিল না। প্রচুর ঘরবাড়ি হয়েছে, রোপওয়ে চালু হয়েছে। সেবার লেকের ধার ধরে হেঁটে হেঁটে ও পারে গেছিলাম। এ বার আর সেই এনার্জি আর নেই। তা ছাড়া চারিদিকে মোটা বরফের স্তর। বরফগলা জলে ইয়াকের বিষ্ঠা মিশে যাচ্ছেতাই নোংরা হয়ে আছে।

রোপওয়ে স্টেশনে যাওয়ার সিঁড়ির কাছেই লেক থেকে একটা জলধারা বেরিয়ে এসেছে। এটাই রোরো নদী। এই নদী তিস্তার সাথে মিশেছে। মেঘলা স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায় লেকের ধারে আধ ঘণ্টা ঘোরাঘুরি করে ফটোসেশন করে গাড়িতে উঠলাম। 

market area neas tsomgo lake
ছাঙ্গু পেরিয়ে এসে বাজার এলাকা।

কয়েকটা হেয়ারপিন বেন্ড দিয়ে দু’ কিমি রাস্তা পেরিয়ে একটা বাজার এলাকা পেলাম। বাজার বলতে মূলত রেস্টুরেন্ট, শীতবস্ত্রের আর  মেমেন্টোর দোকান। একটা দোকানে মোমোর অর্ডার দিলাম। চা-ও খেতে হবে। ভেজ মোমো আমার ভীষণ পছন্দের খাবার। ভূপাল দেখি থুকপার বাটি নিয়ে বসেছে। খাওয়ার পর গরম চা-এর কাপে চুমুক। কী আরাম যে লাগল। সব ক্লান্তি যেন নিমেষে গায়েব। খাওয়ার পর্ব শেষ, আবার যাত্রা।  

 way to gangtok
গ্যাংটকের পথে ক্রমশই নেমে যাওয়া।

এই রাস্তাটাও বড়ো সুন্দর। চারিদিকে সবুজ ঘাসে মোড়া পাহাড়ের গায়ে পাইন গাছের ছড়াছড়ি। পাইন গাছের ফাঁক দিয়ে মেঘের লুকোচুরি। চলতে চলতে একটা ঝরনার সামনে থামলাম। এই ঝরনার নাম কংনসলা ওয়াটার ফল্‌স। এই জায়গা বোধহয় সারা বছরই কুয়াশাঢাকা থাকে। গাড়ি থেকে কেউ নামল না। আমি একা নেমে ঝরনার ক’টা ঝাপসা ছবি তুলে আনলাম।

temporary falls
হঠাৎ ঝরনা।

খানিকক্ষণের মধ্যেই শুরু হল ঝিমঝিম বৃষ্টিল। এই আবহাওয়ায় পাহাড়ে চলার মজা হল, রাস্তার ধারে ধারে হঠাৎ তৈরি হওয়া ঝরনা দেখতে পাওয়া যায়। আমরাও পথের ধারে তেমন কিছু ঝরনা পেলাম। ক্রমশ নীচের দিকে নামছি। গাছপালারও পরিবর্তন হচ্ছে। পাইন গাছের পাশাপাশি ঝোপঝাড় ও অন্য বড়ো গাছও চোখে পড়ছে।

ঝিমঝিমে বৃষ্টিতেই ঢুকে পড়লাম গ্যাংটকে। কিছুক্ষণ আগেও যে পরিবেশে ছিলাম তার সঙ্গে কিছুতেই যেন মেলাতে পারছি না। কংক্রিটের জঙ্গল, গাড়ির ভিড়, মানুষের কোলাহল। অসহ্য। এম জি মার্গের নীচের দিকেই আমাদের লজ। পৌঁছে গেলাম সেখানে। (চলবে)

ছবি লেখক

0 Comments
Share
nbstc-arranges-special-package-for-gangtok

রাজা বন্দ্যোপাধ্যায়, জলপাইগুড়ি: পর্যটকদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিল উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগম (এনবিএসটিসি)। জলপাইগুড়ি থেকে সিকিমের রাজধানী গ্যাংটকে পর্যটকদের ঘুরিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে তারা। ইতিমধ্যে জলপাইগুড়ি থেকে সাতটি জায়গায় বাসে করে পর্যটকদের ঘুরিয়ে আনছে নিগম। গ্যাংটকে ঘোরানোর ব্যবস্থা চালু হলে এনবিএসটিসির জলপাইগুড়ি ডিপোর মুকুটে নতুন পালক যোগ হবে।

নিগমের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সুবল রায় বলেন, “জলপাইগুড়ি থেকে পর্যটকদের গ্যাংটকে ঘোরানোর জন্য একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আন্ত:রাজ্য পরিবহণের কিছু সমস্যা আছে। সেগুলি মিটে গেলেই পর্যটকরা জলপাইগুড়ি থেকে গ্যাংটকে ঘুরতে যেতে পারবেন।”

এনবিএসটিসি সুত্রে জানা গিয়েছে যে দু’রাত-তিন দিনের একটি প্যাকেজে এই গ্যাংটক সফরের পরিকল্পনা করছে নিগম। থাকা, খাওয়া-সহ এই সফরে মোট খরচ ধার্য হয়েছে জনপ্রতি ৬ হাজার ৫০০ টাকা। গ্যাংটক থেকে এক দিন নিয়ে যাওয়া হবে ছাঙ্গু লেকে। অন্য দিনটিতে গ্যাংটকের সাতটি পয়েন্ট ঘুরিয়ে দেখানো হবে। ২৬ আসনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে পর্যটকদের নিয়ে যাওয়া হবে। এনবিএসটিসির কোচবিহার ডিপোর এক আধিকারিক বলেন, “পর্যটকরা টিকিট কেটে বাসে ওঠার পর তাঁদের আর কোনো খরচ নেই। তাঁরা বাসে করে নিশ্চিন্ত মনে গ্যাংটকে যাবেন। আবার জলপাইগুড়িতে ফিরে আসবেন। থাকা-খাওয়া সমেত ছাঙ্গু লেকে যাওয়ার এবং গ্যাংটকে ঘোরার ব্যবস্থা আমরাই করব।”

জলপাইগুড়ির বাসটি গ্যাংটকের কোথায় থাকবে সেটাও একটা বিষয়। এনবিএসটিসি কর্তৃপক্ষের ইচ্ছে বাসটি গ্যাংটকের এসএনটি (সিকিম ন্যাশনালাইজড ট্র্যান্সপোর্ট) কর্তৃপক্ষের ডিপোয় থাক। কারণ বাইরে রাখলে তুলনায় খরচ বেশি। সে বিষয়েও এসএনটি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

এনবিএসটিসির জলপাইগুড়ি ডিপো থেকে আপাতত সাতটি জায়গায় এই ধরনের পর্যটনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেগুলি হল

১) ঝালং, জলঢাকা এবং বিন্দু, একদিনের সফর, জনপ্রতি খরচ খাওয়া সমেত ৮০০ টাকা।

২) লাভা, একদিনের সফর, জনপ্রতি খরচ খাওয়া সমেত ৮০০ টাকা।

৩) মিরিক, একদিনের সফর, জনপ্রতি খরচ খাওয়া সমেত ৮০০ টাকা।

৪) রাজাভাতখাওয়া/জয়ন্তী, একদিনের সফর, জনপ্রতি খরচ খাওয়া সমেত ৮৫০ টাকা।

৫) লাভা, রিশপ অথবা লাভা ছাঙ্গে ফলস ভায়া–ডেলো, কালিম্পং, একরাত দুই দিনের সফর, খাওয়া সমেত জনপ্রতি খরচ ২২৫০ টাকা।

৬) জলদাপাড়া, জঙ্গল সাফারি, জয়গাঁ, ফুন্টসিলিং, এক রাত-দু’দিনের সফর, জনপ্রতি খরচ খাওয়া সমেত ২৬০০ টাকা।

৭) রামসাই, মেদলা, গরুমারা সাফারি- একরাত-দু’দিনের সফর, জনপ্রতি খরচ খাওয়া সমেত ২৬০০ টাকা।

এই পর্যটনের দু’রকম ব্যবস্থা আছে। এক, বিভিন্ন সময়ে ছুটির দিন এনবিএসটিসি কর্তৃপক্ষ এই পর্যটনের ব্যবস্থা করেন। তার সাতদিন আগে মাইকে প্রচার করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রচারপত্রও বিলি করা হয়। পর্যটকরা আগে থেকে টিকিট কেটে রাখেন। নির্দিষ্ট সময়ে তাঁরা ডিপোয় এসে বাসে ওঠেন। দুই, পর্যটকরা দলবদ্ধভাবে যেতে চাইলে তাঁরাই দিন ঠিক করে এনবিএসটিসি কর্তৃপক্ষকে জানালে নিজেরাই সেই দিনের জন্য বাস রিজার্ভ করতে পারেন। এই পর্যটকদের একইভাবে ঘুরিয়ে আনা হয়। ভাড়া জনপ্রতি যা ঠিক করা আছে তাই লাগে। গ্যাংটকের ক্ষেত্রেও এই দুটি ব্যবস্থাই চালু থাকবে।

0 Comments
Share