দুর্গাপুজো মানেই নতুন পোশাক। মহালয়া থেকেই নতুন শাড়ি কিংবা জামা পরার রেওয়াজ রয়েছে অনেক বাঙালি পরিবারে। ষষ্ঠী থেকে দশমী—কোন দিন কোন পোশাক, তার পরিকল্পনাও শুরু হয়ে যায় অনেক আগে। এ বার চেনা শপিং মল বা দোকানের বদলে সরাসরি তাঁতিদের ঘর থেকে শাড়ি কিনলে কেমন হয়? কেনাকাটার পাশাপাশি বাংলার গ্রাম, প্রকৃতি ও ইতিহাসও দেখা হয়ে যাবে।
মুর্শিদাবাদের তাঁতিপাড়ায় সিল্কের খোঁজে
লালপাড় গরদ থেকে বালুচরী, পিওর সিল্ক থেকে মসলিন—মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জের তাঁতিপাড়ায় রয়েছে নানা সম্ভার। সদরঘাট থেকে টোটোয় পৌঁছে যাওয়া যায় তাঁতিপাড়ায়। সরু গলিতে হাঁটতে হাঁটতে শোনা যায় তাঁত বোনার শব্দ। চাইলে তাঁতিদের কাজও চোখের সামনে দেখে নেওয়া যায়।
সঙ্গে ঘুরে নিতে পারেন হাজারদুয়ারি, আজিমগঞ্জ-জিয়াগঞ্জ ও কাঠগোলার ঐতিহাসিক স্থাপত্য এবং জৈন মন্দির। হাওড়া থেকে ট্রেনে আজিমগঞ্জ হয়ে জিয়াগঞ্জ যাওয়া যায়। বহরমপুর হয়েও পৌঁছনো সম্ভব।
ফুলিয়ায় টাঙ্গাইলের ছোঁয়া
দেশভাগের পর বাংলাদেশের টাঙ্গাইল থেকে বহু তাঁতি ফুলিয়ায় এসে বসতি গড়েন। শান্তিপুরের বয়নশৈলীর সঙ্গে টাঙ্গাইলের ঘরানার মিশেলে তৈরি হয় ফুলিয়া টাঙ্গাইলের নিজস্ব পরিচয়। এখানকার তাঁতের পাশাপাশি রেশম, তসর ও জামদানি শাড়িও বেশ জনপ্রিয়।
কেনাকাটার ফাঁকে কবি কৃত্তিবাস ওঝার স্মৃতিবিজড়িত স্থান ঘুরে দেখা যায়। চাইলে কাছের শান্তিপুরে রাত কাটিয়ে পরদিন আরও কিছু জায়গা ঘুরে নিতে পারেন। শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে ফুলিয়া পৌঁছে টোটোয় তাঁতিপাড়া বা দোকানে যাওয়া যায়।
বালুচরীর টানে বিষ্ণুপুর
বালুচরী, স্বর্ণচরী, গরদ কিংবা সিল্ক—শাড়ির সম্ভারে বিষ্ণুপুরের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। তাঁতিদের বসতি রয়েছে চকবাজার, রঘুনাথপুর, কৃষ্ণগঞ্জ-সহ বিভিন্ন এলাকায়। দোকানের পাশাপাশি তাঁতিপাড়ায় গিয়ে সরাসরি শাড়ি কেনার সুযোগও রয়েছে।
শাড়ির সঙ্গে বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা মন্দির দেখাও হয়ে যাবে। রাসমঞ্চ, শ্যামরাই, জোড়বাংলা, মদনমোহন মন্দির কিংবা দলমাদল কামান ঘুরে দেখতে চাইলে এক-দু’দিনের সফর পরিকল্পনা করাই ভাল। হাওড়া থেকে ট্রেনে, আবার সড়কপথেও বিষ্ণুপুর যাওয়া যায়।
কাঁথাস্টিচের টানে শান্তিনিকেতন
শান্তিনিকেতনের সোনাঝুরি হাটে কাঁথাস্টিচের শাড়ি, পাঞ্জাবি, স্টোল, জ্যাকেট-সহ নানা পোশাক পাওয়া যায়। ফুল, লতা, পাখির নকশায় সেজে ওঠে হাতের কাজের এই শাড়ি। কাঁথাস্টিচের পাশাপাশি বাটিক, খেস, কলমকারি ও অ্যাপ্লিকের কাজের শাড়িও মেলে। দামও রয়েছে বিভিন্ন রকম—প্রায় ৫০০ টাকা থেকে ১০-১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।
কেনাকাটার ফাঁকে কঙ্কালীতলা, শান্তিনিকেতনের বিভিন্ন স্মৃতিবিজড়িত স্থান ঘুরে দেখা যায়। শরতের কাশফুল আর সবুজ ধানখেত সফরের বাড়তি পাওনা। হাওড়া থেকে ট্রেনে শান্তিনিকেতন যাওয়া যায়, সড়কপথেও কলকাতা থেকে পৌঁছনো সম্ভব।
ধনেখালির তাঁতঘরে
ধনেখালির তাঁতের শাড়ির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তুলনামূলক মোটা বুননের এই শাড়ির আঁচলে দেখা যায় ‘খেজুরছড়ি’ নকশা। মদনমোহনতলা, সোমাসপুর ও আশপাশের এলাকায় রয়েছে বহু তাঁতিবাড়ি। সেখানে গিয়ে শাড়ি কেনার পাশাপাশি তাঁত বোনার পদ্ধতিও দেখা যায়।
কাছেই দশঘরার জমিদারবাড়ি। ইউরোপীয় ও ভারতীয় স্থাপত্যরীতির মিশেলে তৈরি এই ঐতিহাসিক বাড়িটিও ঘুরে দেখা যায়। হাওড়া-বর্ধমান কর্ড লাইনে ধনেখালি হল্ট, শিবাইচণ্ডী বা গুড়াপ হয়ে সড়কপথে তাঁতিপাড়ায় পৌঁছনো যায়।
পুজোর কেনাকাটাকে যদি নিছক বাজার করা না বানিয়ে ছোট্ট ভ্রমণের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে চান, বাংলার এই তাঁতপাড়াগুলি হতে পারে বেশ অন্যরকম গন্তব্য। পছন্দের শাড়ি তো মিলবেই, সঙ্গে মিলবে তাঁতিদের পরিশ্রম, বাংলার লোকশিল্প আর শরতের গ্রামবাংলাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ।




