Browsing Tag:garhwal

a-trip-to-garhwal-last-part-from-kartik-swami-to-dhari-devi-via-baniyakund
ashok ghosh
অশোক কুমার ঘোষ

গাড়ি এগিয়ে চলল কনকচৌরির দিকে। ভিরি, বাসওয়ারা, ভানাজ হয়ে চন্দ্রনগর। বেশ বড়ো নগর। কিছু জায়গায় ধাপচাষ। তার পরেই বেশ ঘন জঙ্গল। এল মোহনখাল। এখান থেকে রাস্তা দু’ ভাগ – একটি গিয়েছে পোখরি, আমরা ধরলাম কনকচৌরির পথ। কনকচৌরিতে আগের বারের কটেজেই থাকা হল। সামনে বাগান, তার পর ঢাল নেমে গিয়েছে নীচের গ্রামের দিকে। আগের বারের তোলা ছবি দিতেই বাচ্চাদের এবং তাদের মায়েদের কী আনন্দ। কিছুটা পাহাড়ে উঠে চৌখাম্বা শিখর এবং তার প্রতিবেশীদের উপর অস্ত রবির আভা মন ভরিয়ে দিল। সন্ধ্যাটা গানের মজলিসেই কাটল।

on the way to kartikswami
কার্তিকস্বামীর পথে শেষ চড়াই।

পর দিন সকাল সকাল উঠে রওনা কার্তিকস্বামীর উদ্দেশে। হালকা চড়াই, মুখ্যত রোডোডেনড্রন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে। পাখিরা জেগে উঠেছে, ডাকছে, ব্ল্যাক বার্ড, রামদাঙরা (সিনেরিয়াস টিট) আছে, হোয়াইট চিক্‌ড বুলবুলিও আছে। গাছের ফাঁক দিয়ে চৌখাম্বারা সব সময়ে  দেখা দিচ্ছে। অল্প ফাঁকা জায়গায় একটা বার্কিং ডিয়ার দাঁড়িয়েছিল, আওয়াজ পেয়েই গাঁক গাঁক ডাক ডেকে এক ছুটে জঙ্গলের ভিতর। স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে দেখা গেল অন্তিম রিজটি, যার শেষ বিন্দুতে আছে কার্তিকস্বামী মন্দির। তবে এখন‌ও দূর, রাস্তাটা পুরো হেয়ারপিন বাঁক নিলে তবে আসবে ওই রিজটি। এ ভাবেই চড়াই উঠতে উঠতে বাম দিকের রিজ ছেড়ে ডান দিকের রিজে চড়া। কিছু পরেই পুরোহিত মশাইদের থাকার জায়গা, তার পর থেকেই সিঁড়ি শুরু। আগের বার যখন এসেছিলাম তখন সিঁড়ি শুরু হয়েছিল আরো অনেক পর থেকে। রাস্তা বাঁধানাও হয়েছে। মহাদেবের মন্দিরের পর সিঁড়ি আরও খাড়া হল। গাছের সংখ্যা কমে গিয়েছে, তবে সারা রাস্তায় প্রচুর প্রজাপতি এখনও আছে।

 kartikswami temple
কার্তিকস্বামী মন্দির।

অবশেষে কার্তিকস্বামী মন্দির। উত্তর ভারতে একমাত্র কার্তিকের মন্দির। কথিত, গণেশ মাতাপিতাকে প্রদক্ষিণ করেই পৃথিবী পরিক্রমা সেরে ফেলেন। বর‌ও পান, যে কোনো  পুজোয় প্রথম পুজো পাওয়ার অধিকার। কার্তিকের অভিমান হল। কঠোর ধ্যানের মাধ্যমে শরীরের মাংস ত্যাগ করলেন, তার পর এখানে এসে হাড় ত্যাগ করলেন। তাই এই মন্দিরের পূজিত মূর্তিতে হাড়ের অবয়ব। মন্দিরের বাইরে কার্তিকের একটি মাটির মূর্তি দেখলাম, আগের বার ছিল না। মন্দিরের পিছনেই ১৮০ ডিগ্রি তুষারশিখরের প্যানোরামা। বাঁ দিক থেকে জাঁওলি, বন্দরপুঞ্ছ, গঙ্গোত্রী ১, ৩, ২, যোগীন ২, ১, থ্যালাইসাগর, ভাতৄকুন্ঠা, কেদারনাথ, কেদারডোম, সুমেরু, খরচাকুণ্ড, ইয়ানবক, ভাগীরথী, সতোপন্থ, মান্দানী, জানুকোট, চৌখাম্বা ৪,৩,২,১ এবং নীলকন্ঠ।  ঘণ্টা বাজিয়ে ফিরে চলা। চার পাশ খোলা থাকায় এই ঘন্টাধ্বনি বহু দূর থেকে শোনা যায়।   কনকচৌরিতে ফিরে মধ্যাহ্ণভোজ সেরে রওনা বানিয়াকুণ্ডের পথে।

বানিয়াকুণ্ডে  সূর্যোদয়

সাময়িক চা পানের বিরতি চোপতায়। হিমালয়ের কোনো জায়গা  প্রথম দেখার যে মুগ্ধতা থাকে, পরবর্তী দর্শনে ততটা থাকে না বিভিন্ন কারণে।  হোটেলের সংখ্যা বৃদ্ধি দৃষ্টিদূষণ ঘটাচ্ছে। মঙ্গল সিং-এর চটির পাশেই  তাঁর পুত্রের তৈরি বিলাসবহুল হোটেল কেমন যেন বেমানান।  আমাদের রাত্রিকালীন বিশ্রামস্থল বানিয়াকুণ্ড এখান থেকে তিন কিমি।

পাহাড়ি পথে এ-ধারে ও-ধারে বাঁক ঘুরতে ঘুরতে কিছুক্ষণের মধ্যেই বানিয়াকুণ্ড। উত্তর দিক ধু ধু খোলা। পাহাড়ি ঢাল নেমে গিয়েছে, ফলে উন্মুক্ত তুষারশ্রেণি। পড়ন্ত সূর্যের আলোয় মায়াবী আভা চার পাশে। দক্ষিণ দিকে পাহাড়ের অপর দিক উপরে উঠে গিয়েছে গাছের কম্বল গায়ে দিয়ে। পাখির ডাক কানে আসছে। আলো পড়ে আসছে। সঙ্গের মালপত্র রিসর্টের ঘরে তোলা হয়ে গিয়েছে।  গা সির সির করছে, তবু ঘরে ঢুকতে ইচ্ছা করছে না। নিস্তব্ধতা নামছে। সোলার আলোর ছটা ঘরের ভিতর থেকে চুঁইয়ে বাইরে আসায় আধিভৌতিক পরিমণ্ডল তৈরি হয়েছে। টর্চের আলোয় মূল রাস্তা থেকে নেমে, ছোটো একটি শৌখিন সাঁকো পার হয়ে, ঘাসের জমি মাড়িয়ে কটেজের ঘরে প্রবেশ। হাত-মুখ ধুতে হবে। কটেজের দেওয়াল ভালো রকম ইনসুলেটেড, বেশ আরাম লাগছে। এ বার চা পান পর্ব শুরু হবে, চলবে সান্ধ্য আড্ডা। 

আরও পড়ুন গাড়োয়ালে ইতিউতি ১ / তুষারাবৃত বদরীনাথকে প্রণাম

২০১৩ সালে তুঙ্গনাথ থেকে ফেরার পথে এখানে শকুন দেখে গাড়ি থেকে নেমেছিলাম ছবি তুলব বলে। তখন জায়গাটা একেবারে ফাঁকা ছিল। শকুনদের জমায়েতের কাছে হাড়গোড় পড়েছিল। আমরা ভেবেছিলাম, শকুনরা চিতাবাঘের মারা জন্তুর অবশিষ্ট অংশ‌ই ভক্ষণরত। ভাবার কারণ হল এ অঞ্চলে চিতাবাঘ প্রায়শ‌ই দেখা যায়। ২০১৩ সালে আমরা চোপতা পৌঁছোনোর পাঁচ মিনিট পরে যে গাড়িটি আসে, তারা সাড়ে চার ফুটিয়া চিতাবাঘের দর্শন পেয়েছিল। দেখা যাক এ বারে আমাদের দর্শন দেন কি না।

baniyakund
বানিয়াকুণ্ড।

আরামদায়ক পরিবেশে ঘুম ভালোই হল, শুধু মাঝে বেশ কয়েক বার কুকুরের ডাক শোনা গিয়েছিল। জানা ছিল, বন্যজন্তু বিশেষ করে চিতাবাঘ এলে কুকুর চেঁচিয়ে সবাইকে সাবধান করে। তা হলে কি তিনি এসেছেন? সাহস হয়নি, বাইরে বেরিয়ে সত্যতা যাচাই করার। গাড়ির ভিতর থেকে দেখাই ভালো, অথবা দরজার ফাঁক দিয়ে, যেমনটা ঘটেছিল রুদ্রনাথ যাওয়ার পথে পানার বুগিয়ালে, তবে সে অন্য পর্ব।         

ভোর ভোর ওঠা, সূর্যোদয় দেখতে হবে। গরম জামাকাপড় চাপিয়ে বাইরে এলাম, আধো আলোয় মনোরম পরিবেশ। ধীরে ধীরে রং ধরতে লাগল তুষারশৃঙ্গের গায়ে। বানিয়াকুণ্ডের যে ঢাল নেমে গিয়েছে উত্তর দিকে, তার পরেই তুষারপ্রাচীর সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ডান দিক থেকে বাঁ দিকে বয়ে গিয়েছে। ঢেউয়ের মাথাগুলি কেদারনাথ, চৌখাম্বা, জানুকোট নাম ধারণ করে নিজেদের উপস্থিতি জানাচ্ছে। ‘আহা কী দেখিলাম, জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না’। এই তুষারশ্রেণি শ্রেণী আরও কাছ থেকে দেখেছি চন্দ্রশিলা  ও চন্দ্রবদনী থেকে। এখান থেকে যা দর্শন করছি তা কেমন ধীরে ধীরে সামনের সবুজ অঞ্চল অপসৃয়মান হতে হতে নীচের জীবকুলকে রক্ষা করার জন্য নিজেকে খাড়া দেওয়ালে রূপান্তরিত করল। পাখির ডাক শুনছি। তিনটি রেড বিল্‌ড ব্লু ম্যাগপাই উড়ে গেল। ঘন গাছের মধ্যে লাফিং থ্রাশ ওড়াউড়ি করছে। বুলবুলি আছেই, আর আছে শালিক এবং দাঁড় কাক। কুকুর দেখা যাচ্ছে না, হয়তো গত রাতে ডিউটি দেওয়ার পর বিশ্রাম নিচ্ছে।       

 baniyakund in early morning
বানিয়াকুণ্ডে ভোর।

বলা হয়ে থাকে যে ব্যবসায়ীরা অর্থাৎ বানিয়ারা কোনো এক সময়ে এখানে শিবির স্থাপন করতেন ব্যবসার উদ্দেশ্যে যাত্রার সময়, তাই এই নাম। কুণ্ডের কোনো হদিস পা‌ইনি, কেবলমাত্র একটি ঝরনা দক্ষিণ দিকের পাহাড়ি ঢাল দিয়ে একাধিক ধারায় নেমে এসেছে। কোনো  কোনো ধারায় নল লাগিয়ে প্লাসটিকের ড্রামে জল ভরা হচ্ছে। এই জলধারার উৎসমুখে যাবার উদ্দেশ্যে দক্ষিণ দিকের চড়াই ভাঙতে শুরু করেছি, দেখি একটি কুকুর ডাকতে ডাকতে একটি বানরকে তাড়া করছে। বানরটি গাছে উঠে রক্ষা পেল, এবং তার পর‌ই বানরটা মুখ ভেংচাতে লাগল কুকুরটার দিকে। ঠিক যেন ‘কুমির জলকে নেমেছি’ খেলা।  মাথার ওপর দিয়ে সাদা কালো ডানা ছড়িয়ে উড়ে গেল কয়েকটি শকুন। বেশ কয়েক জায়গায় হাড়গোড় পড়ে আছে, আয়তন দেখে গবাদি পশু বলেই মনে হল। অর্থাৎ, প্রথমে আমরা যেটাকে চিতাবাঘ মারি বলে ভেবেছিলাম, সেটা নয়। এ স্থানকে হয়ত ভাগাড় হিসাবেই ব্যবহার করা হত।               

পায়চারি করে প্রকৃতি উপভোগ করে এবং পাখি দেখে সকাল কাটল। এ বার বানিয়াকুণ্ডের পরিবেশ ছেড়ে যাওয়ার সময়। মধ্যাহ্নভোজ সেরে রওনা দে‌ওয়া হল ধারি দেবীর উদ্দেশে।

ধারি দেবী দর্শন

গাড়োয়ালে বিভিন্ন যাত্রাপথে বহু স্থানের উপর দিয়ে যাওয়া হয়, থাকা আর হয় না। এ বারে ঠিক হল ধারি দেবীতে রাত্রিবাস করা হবে। স্থানটির আসল নাম কালিয়াসৌর। একেবারে অলকানন্দার তীরে। এখানে অলকানন্দা অনেক বদলে গিয়েছে গত কয়েক বছরে। ড্যাম তৈরির কারণে, নদী তার স্বাভাবিক বহমান ছন্দ হারিয়েছে, এখন আর সে নৄত্যরতা কিশোরী নয়। এখন ধীরস্থির সরোবর সম। সবজে নীল বসনে সমাহিত। জলস্তর বৃদ্ধির ফলে তীরবর্তী গাছ প্লাবিত হয়ে মনে হত নদীর মধ্য থেকে মাথা তুলে আছে। ‘বন্যরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’। তাই মাঝ-নদী ডাঙার গাছের মাতৃক্রোড় নয়, গাছগুলি ধীরে ধীরে শুকিয়ে গেল।  এবারে দেখলাম তাদের কঙ্কাল। ধারী দেবীতে থাকার জায়গা ভারত সেবাশ্রম সংঘ। দু’ তলা, আরও ঘর তৈরি হচ্ছে, সামনে ছোটো বাগান, পিছনে অলকানন্দার পান্না জল।                       

dhari devi
ধারী দেবী।

পর দিন ভোরে কুয়াশাছন্ন আবহাওয়ায় রাস্তার অপর পারের পাহাড়ি ঢালের গাছগুলিকে জলছবি বোধ হচ্ছিল। সামনের ছোটো বাগানের এক জায়গায় জমা জলে এক জোড়া বুলবুল স্নান পর্ব  সারছে, হয়তো আমাদের মতো পুজো দিতে যাবে। আমরাও বার হলাম ধারীদেবী মন্দিরেরর পথে। অল্প কিছু হেঁটে মন্দিরের প্রবেশ দ্বার, বাঁধানো রাস্তা দিয়ে এঁকেবেঁকে নামা। পাশের ঝোপে পাহাড়ি চড়াই, সিলবার বিল আর বুলবুলির দাপাদাপি। সাঁকোর উপর দিয়ে গিয়ে মন্দিরচত্বর। ধারী দেবী মূর্তি, দেবীর ঊর্ধ্বাংশ। কালো পাথরে গড়া। কথিত যে দেবীর নিম্নাংশ কালীমঠে পূজিতা হন। সর্ববিধ প্রথা মেনে পূজাপাঠ চলছে, নারকেল ভেঙে প্রসাদ হিসাবে বিতরণ হচ্ছে। বেশ সংগঠিত এবং সুষ্ঠ ব্যবস্থা, কোনো হুড়োহুড়ি তাড়াহুড়ো নেই। শান্ত পরিবেশ। ড্যাম তৈরির প্রাক্কালে, দেবীমূর্তি স্থানান্তরিত করা হয়। তার কিছু দিনের মধ্যেই প্রলয় কাণ্ড ঘটে কেদারখন্ডে, মেঘফাটা জলে তাণ্ডব ঘটে যায়। দেবীর রোষ থেকে বাঁচতে নদীর বুকে থাম গেঁথে পূর্ব স্থানেই দেবীর পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। 

আরও পড়ুন গাড়োয়ালে ইতিউতি ২ / তিন বদরী, কল্পেশ্বর ছুঁয়ে মক্কুমঠে

মধ্যাহ্ণভোজ সারা। এ বার হরিদ্বারের উদ্দেশে র‌ওনা। গাড়োয়ালের পাহাড় ছেড়ে যেতে হবে এ বারের মতো। পাশের ঝোপ থেকে পুটুস ফুল (ল্যান্টানা কামারা) এনে গাড়ির চালক বাপিকে দিলাম। এক বছর বয়সি মেয়েকে আদর করে পুটুস বলে ডাকে। এই নামকরণের কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। ওই নামের যে কোনো ফুল আছে তা-ই জানত না। বাপির মুখে হাসি, খুব খুশি। গাড়ীর চাকা গড়াল, রাস্তার পাশের গাছ থেকে বিদায় জানাল কোকিলের কুহু কুহু। (শেষ)

ছবি: লেখক

2 Comments
Share
a-trip-to-garhwal-part-2-visit-to-three-badris-kalpeswar-and-makkumath
ashok ghosh
অশোক কুমার ঘোষ

বদরীনাথ থেকে ফিরতিপথে জমাট তুষার ছিল পথের দু’ পাশে, যেন টুথপেস্ট লাগানো। যাওয়ার সময় যে গাছগুলোকে দেখে মনে হয়েছিল কেউ যেন  তাদের গায়ে ওপর থেকে আটা ঢেলে দিয়েছে, তারা এখন সেটা ঝেড়ে ফেলেছে। এই ভাবে নামতে নামতে অলকানন্দা পার হলাম বলরাম মেমোরিয়াল ব্রিজের উপর দিয়ে। সাঁকো তৈরি করতে গিয়ে যাঁর প্রয়াণ হয়েছিল, তাঁর নামেই নামকরণ।

চলে এলাম পাণ্ডুকেশ্বর (১৯২০ মি)। কথিত যে এখানেই পাণ্ডু এবং কুন্তীর বিয়ে হয়েছিল। আর আছে যোগধ্যান বদরী মন্দির। সিঁড়ি দিয়ে বেশ কিছুটা নেমে মন্দিরচত্বর। রাস্তার দু’ পাশের বাড়িগুলিতে ঝলমল করছে এনিমোন গাঁদার ঝাড়। দু’টি মন্দির পাশাপাশি, একটি যোগ বদরীর, অপরটি বাসুদেবের। বড়োই সুন্দর মূর্তি। গ্রামটি বর্ধিষ্ণু।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালে ইতিউতি ১ / তুষারাবৃত বদরীনাথকে প্রণাম

yog dhyan badri temple
যোগধ্যান বদরীনাথ মন্দির, পাণ্ডুকেশ্বর।

আবার চলা। একটু থেমে দর্শন হল বিষ্ণুপ্রয়াগ (১৪৫৮ মি), ধৌলিগঙ্গা এবং অলকানন্দার মিলনস্থল। চড়াইপথে উঠে চলা। দেওয়ালির ভিড়ের জন্য যোশীমঠে ঢোকার মূল রাস্তা বন্ধ, তাই বাইপাস ধরে এগিয়ে যাওয়া। রাস্তার দু’ পাশে পয়েনসেটিয়া ফুটতে শুরু করেছে। বাড়ির গামলায় বিভিন্ন রঙের জেরেনিয়াম জ্বলজ্বল করছে।

এ বার থামা হল উনিমঠ গ্রামে, এখানেই আছে বৃদ্ধ বদরীনাথের মন্দির (১৪৮৫ মি)। সিঁড়ি দিয়ে নামা গ্রামের মধ্য দিয়ে। মন্দিরচত্বর পরিছন্ন, শান্ত, মনোরম। ছোটো ফুলবাগান আছে। মধ্যাহ্ণভোজের বিরতি হল হেলাং-এর কাছেই।

A local child
বৄদ্ধ বদরীনাথ মন্দিরের কাছে এক স্থানীয় শিশু।

এর পরের পথ বেশ খারাপ। কাঁচা রাস্তা এবং অসমান। জায়গায় জায়গায় জল জমে কর্দমময়। কিছু জায়গায় কাজ চলছে রাস্তা মেরামতের।  অল্প পরেই পথের দু’ পাশে অরণ্য। চোখে পড়ল বাঁদর (রেসাস) এবং কিছু পাখি, হোয়াইট চিক্‌ড বুলবুল এবং ব্ল্যাক বার্ড। এ ভাবেই উরগম পার হয়ে হাজির দেবগ্রামে। গ্রামে গাড়ি ঢুকবে না, মালপত্র নিয়ে পায়ে চলার পথ ধরে উপস্থিত পথিক লজে। আজকের বিশ্রামস্থল।

শেষ বার এখানে থেকেছিলাম ২০১৪ সালে, রুদ্রনাথ থেকে ডুমক হয়ে ফেরার পথে। খুব একটা বদল হয়নি গ্রাম। দূরে দেখা যাচ্ছে নন্দাদেবীর তুষারশৃঙ্গ। কিছুক্ষণ বাদেই সূর্যাস্তের অস্তরাগে রাঙা হবে। সামনের একটা গাছে কাঠঠোকরা ঠকঠক করছে। আলো পড়ে আসছে, তাই প্রজাতি চিনতে পারলাম না। পরে ছবি দেখে যদি প্রজাতি চেনা যায়! চা পান করে লটবহর নিয়ে ঘরে প্রবেশ। আরামদায়ক শীতলতা। হালকা কম্বলেই হয়ে যাবে। এখানে রাতের খাবার সাড়ে সাতটার মধ্যেই সারতে হবে, জানালেন লজের মালিক রাজেন্দ্র নেগি। এদের দিন শুরু হয় রাতের অন্ধকার পরিষ্কার হওয়ার আগেই।

কল্পেশ্বর কেদারনাথ

nandadevi peak from devagram
অস্তরাগে নন্দদেবী শিখর, দেবগ্রাম।

পরের দিন সকাল সকাল যাত্রা শুরু কল্পেশ্বর মহাদেবের মন্দিরের উদ্দেশে। একটি ছোটো নালা পার হলাম সাঁকোর ওপর দিয়ে। দু’ পাশে ঘরসংলগ্ন জায়গায় লাগানো হয়েছে বাঁধাকপি, লঙ্কা, রাইশাক ইত্যাদি। ডালিয়া এবং ছোটো এনিমোন গাঁদাও ফুটে আছে। গত বারে একটি বেশ বড়ো ন্যাসটারসিয়ামের ঝাড় দেখেছিলাম, এ বার সেটা নেই। গ্রামের পথে চলতে চলতে অনেক মহিলাকে দেখলাম, যাঁরা ঘাড়ে বিশাল ঘাসপাতার বোঝা নিয়ে আসছেন। গবাদিপশুর খাদ্য। অন্ধকার থাকতেই ওঁরা র‌ওনা হয়েছেন পাহাড়ের উঁচুতে ঘাসভূমিতে। পরিশ্রমে কপালে ঘাম, একটু জিরিয়ে নিচ্ছেন মাঝেমাঝে। দলে দলে যান এবং এক‌ই ভাবে ফেরেন, বন্যজন্তুর ভয় রয়েছে তো।

on the way to kalpeshwar
কল্পেশ্বরের পথে।

পথরেখা দু’ ভাগে ভাগ হল। বাঁ দিকেরটি গিয়েছে গ্রামের ওপর দিকে, যে পথ ধরে আমরা গত বার ফিরেছিলাম ডুমক গ্রাম থেকে। আমরা ধরলাম ডান দিকের পথ। আমাদের পথের ডান দিকের খেত খালি, রামদানা কেটে নেওয়া হয়েছে, গোলাপি ডালগুলো দাঁড়িয়ে আছে। এ-ডাল থেকে ও-ডালে উড়ে যাচ্ছে লেজ ঝোলা রেড বিল্‌ড ব্লু ম্যাগপাই। বুলবুলি এবং চড়াই আছেই। আর আছে পাতার গভীরে ওয়ার্বলার, দেখা দিয়েই ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। আমাদের পরমপরিচিত ছাতারের ক্যাঁচর ম্যাচর শোনা যাচ্ছেই।

পথ জায়গায় জায়গায় বাঁধানো। মৃদু চড়াই। গ্রাম ছেড়ে মাটির পথ হালকা গাছালির মধ্য দিয়ে। একটা ফাঁকা জায়গায় যাযাবরেরা আস্তানা গেড়েছে। বাচ্চাদের বেলুন ফুলিয়ে দিতে কী আনন্দ! ডান দিকে একটি সুন্দর ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড।

একটু পরেই কল্পগঙ্গা পার হলাম মজবুত সাঁকোর ওপর দিয়ে। গত বার এটা ছিল না। কয়েকটি সিঁড়ি উঠে তীর্থস্থানের গেট। ঘণ্টা বাজিয়ে প্রবেশ। ডান দিকে পাহাড়ি ঢালে খান দুয়েক ঘর, ভ্রাম্যমাণ সাধুরা থাকেন। রঙিন পতাকাশোভিত ত্রিশুল গাঁথা আছে পর পর। জুতো খুলে প্রবেশ গুহামন্দিরে। গুহা্র ওপরে মন্দিরের চূড়া বানানো আছে। গুহার ভিতরে পাথরের উঁচু চাতালে কল্পনাথ লিঙ্গ। মালা, ফুল দেওয়া আছে। আমরা, নিজেদের সঙ্গে আনা বেলপাতা, ধুতরো ফুল আর গঙ্গাজল সহযোগে নিজেদের মতো করে পুজো করলাম। ধূপ জ্বালিয়ে আরতিও করা হল। পূজারি পরে আসবেন নিত্যপূজার জন্য।

এই ফাঁকে কল্পেশ্বরের কাহিনিটা বলে নেওয়া যাক। স্বজনহত্যার পাপস্খালনের জন্য পাণ্ডবরা মহাদেবকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। তিনিও ধরা দেবেন না। অবশেষে তিনি মহিষরূপ ধারণ করলেন ছদ্মবেশ হিসাবে। তবুও ধরা পড়ে গেলেন। এড়াতে না পেরে পাতালে প্রবেশ করতে লাগলেন, শেষ সময়ে পাণ্ডবরা যাতে তাঁকে ধরতে না পারেন। সেই অবস্থায় মহিষের যে যে অংশ মাটির উপর ছিল সেগুলি এক একটি কেদারতীর্থ। কল্পেশ্বরনাথ সেই হিসাবে মহাদেবের জটা। পরিপূর্ণ হৃদয়ে ফিরে চললাম। যাযাবর পরিবার হাত নেড়ে বিদায় জানাল। প্রাতরাশ সেরে এ বার আমাদের দেবগ্রাম ছেড়ে যাওয়ার পালা।

আরও এক বদরীনাথ এবং তুঙ্গনাথদেবের শীতকালীন আবাস

প্রাতরাশের পর নেগি পরিবারকে সম্ভাষণ জানিয়ে বিদায় নিলাম। দেবগ্রাম ছাড়ার কিছু পরেই ধ্যান বদরীনাথের মন্দির। ২০১৪ সালে যখন এসেছিলাম তখন দরজা খুলেছিলেন এক বৄদ্ধা, মুখে সব সময় ‘পরমাত্মা’ শব্দ।। খোঁজ করে ওঁর বাড়ি গেলাম – অথর্ব, কথাও বলতে পারেন না, বুঝতেও পারেন না। ওঁর ছবি দিতে উনি হাতে নিলেন কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। বয়সকালের ডিমেনসিয়া, যেটা আমরা দেখছি বাইরে থেকে। ওঁর মনের ভিতরের অবস্থান জানার জাদুকর আমরা নই। বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠার ছবি পেয়ে সকলে খুশি। কয়েক জন সঙ্গেও এলেন মন্দির অবধি। মন্দিরপ্রাঙ্গণ বেশ প্রশস্ত, পাথর দিয়ে বাঁধানো।

woman with bundle of grass
ঘাস পিঠে মহিলা, দেবগ্রাম।

এর পরের পাহাড়ি রাস্তার পাশে কখন‌ও বসতি, কখন‌ও জঙ্গল। টান টান হয়ে চোখ খোলা রাখছি। মাঝে মাঝে লেপার্ড বাবাজীবন দেখা দেন এ অঞ্চলে। এ যাত্রায় দেখা দিলেন না, হয়তো তিনি অথবা তেনারা পাতার চিকের আড়াল থেকে আমাদের দর্শন করেছেন। একটি বসতি, জগপুরা, চোখে পড়ল একটি হোম স্টে, ব্রহ্মকমল কলোনি। কিছুটা যাওয়ার পর গাড়ি নীচে নামতে লাগল। পৌঁছোলাম মক্কুমঠ। সিঁড়ির ধাপ উঠে গিয়েছে বসতবাড়ির পাশ দিয়ে। কৌতূহলী বাসিন্দারা দেখছেন। স্থানটির চার পাশ পাহাড় দিয়ে ঘেরা থাকায় তুষারশৃঙ্গ দেখা যায় না।

local old lady
ভক্তিমতী বৄদ্ধা।

মন্দিরচত্বরটি বাঁধানো। মুখোমুখি তুঙ্গনাথদেবের শীতকালীন আবাসস্থল (মন্দির) এবং গঙ্গাদেবীর মন্দির। গঙ্গাদেবী মন্দিরের ভিতরে একটি মুখ দিয়ে ঝর্ণাধারা অবিরাম বয়ে চলেছে। দর্শনার্থীরা সেই জলে আচমন করে তুঙ্গনাথদেবকে দর্শন করছেন। প্রচলিত বিশ্বাস, তুঙ্গনাথদেব মহাদেবের বাহু। মন্দিরএলাকা লোহার বেড়া দিয়ে ঘেরা। এক দিকে পূজারির থাকার ঘর। আমাদের দেখে কয়েক জন বাসিন্দা এগিয়ে এলেন। আলাপচারিতায় জানা গেল, পড়াশোনার চল আছে। ওদের মধ্যে একটি মেয়ে গোপেশ্বরে পলিটিক্যাল সায়েন্স বিষয়ে এমএ পড়ছেন।

এই অঞ্চলের এক অশীতিপর ব্যাক্তি প্রতি বছর মন্দির বন্ধের সময় তুঙ্গনাথ যেতেন। তুঙ্গনাথদেবকে সঙ্গ দিয়ে মক্কুমঠে ফিরিয়ে আনতেন। ২০১৩ সালে ওঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তুঙ্গনাথে। ওঁরও ছবি আনা হয়েছে ওঁর হাতে দেওয়ার জন্য। কিন্তু জানা গেল, দু’ বছর আগে উনি প্রয়াত হয়েছেন। ভারাক্রান্ত মনে অনুপম ছবিটি একজনকে দিল, ওঁর বাড়ির কাউকে দেওয়ার জন্য। ফিরতিপথে চোখে পড়ল নির্মীয়মাণ কিছু অত্যাধুনিক রিসর্ট। এই স্থানটি পক্ষীপ্রেমীদের স্বর্গ বলে পরিচিত। (চলবে)

ছবি: লেখক

0 Comments
Share
a-trip-to-garhwal-part-1-snow-covered-badrinayh
ashok ghosh
অশোক কুমার ঘোষ

গিন্নির বড়ো দুঃখ, কেদার-বদরী দর্শন হল না। অতীতে তিনি অমরনাথ এবং হর-কি-দুন গিয়েছেন ট্রেকিং করেই, কিন্তু এখন হাঁটু সহযোগিতা করবে না কেদারনাথের চড়াইয়ের সঙ্গে। সহধর্মিনীর দুঃখ লাঘবের জন্য ঘোলের প্রস্তাব দে‌ওয়া হল দুধের বদলে। সিদ্ধান্ত গৃহীত হল বদরীনাথের পাশাপাশি প‍‌ঞ্চম কেদার কল্পেশ্বর, তৎসহ কার্তিকস্বামী ইত্যাদি দর্শনের। আমরা দু’ জন এবং অনুজ বন্ধু অনুপমদের তিন জন, এই পঞ্চপাণ্ডবের দল রওনা হলাম। হরিদ্বার থেকে গাড়িতে জোশীমঠ, বদরীনাথদেবের শীতকালীন আবাস।

৩ নভেম্বর। চলছে টিপটিপ বৃষ্টি। তারই মধ্যে সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ রওনা জোশীমঠ থেকে। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টির মুষলধার রূপ। অলকানন্দা পার হয়ে কিছুটা যাওয়ার পর চোখে পড়ল বদরীনাথ থেকে নামা গাড়ির ছাদে এবং উইন্ডশিল্ডে বরফ, অতএব প্রমাণিত বদরীনাথে বরফ। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের যাত্রাপথে তুষারপাত শুরু। আমাদের আনন্দ দেখে কে! জানলার কাচ নামিয়ে ছবি তোলার হুড়োহুড়ি।

আরও পড়ুন কুমারী সৈকত চাঁদপুরে একটা দিন

তুষারপাতের মধ্য দিয়ে চলেছি আমরা, পথের পাশে গাছে গাছে বরফের আস্তরণ। রাস্তার ওপরের বরফ শক্ত হতে শুরু করায় গাড়ির চাকা স্কিড করতে লাগল। গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। ওপর থেকে একটা বড়ো ট্রাক নীচে নামার ফলে যে চওড়া চাকার দাগ তৈরি হল, সেই দাগে চাকা ফেলে আমাদের গাড়ি চলল এগিয়ে।

অবশেষে বদরীনাথ। বরফ ঠেলে ভারত সেবাশ্রম সংঘ বিনোদ ভিউ। সেখানকার বারান্দাও তুষারাবৃত। কিছুক্ষণ পরে তুষারপাতের মধ্যেই ছাতা আর পঞ্চু চাপিয়ে প্রায় এক ফুট নরম বরফ ঠেলে মধ্যাহ্নভোজ সেরে আসা হল। তুষারপাতের বিরাম নেই। চারপাশ ঘোলাটে। বরফের ভারে গাছের ডালপালা নুয়ে পড়েছে। আমরা বাধ্য হয়ে ঘরবন্দি। বিকেলে বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন। অন্ধকারের মধ্যেই ভক্তি মহারাজের বৈরাগ্যআলেখ্য শোনা হল। রসিক ব্যক্তি, নিজেকে নিয়ে মজা করতে পারেন।

তুষারপাত বেড়েছে, তারই সঙ্গে বেড়েছে হাওয়ার দাপট‌ও। চার পাশের অন্ধকার, তাই তুষারের ধারাপাত স্পষ্ট। জেনারেটারের কারণে শুধুমাত্র বদরীনাথ মন্দির আলোকসজ্জায় সুসজ্জিত। সকালের আনন্দভাবের ওপর ধীরে ধীরে চিন্তার প্রলেপ পড়তে শুরু করেছে। একে অন্ধকার, তায় অবিরাম বরফবৃষ্টি। তাই বাইরে খেতে যাওয়া নাকচ হল। নৈশভোজ সারা হল সঙ্গের চিঁড়ে ভাজা আর খেজুর দিয়ে। আমাদের থার্মোমিটারে -৬ সেলসিয়াস। গরম জামাকাপড় গায়ে চাপিয়ে লেপ কম্বলের নীচে। কানে আসছে একটা ঝরনার আওয়াজ, সঙ্গে অলকানন্দার প্রবাহের শব্দ।                           

badrinath temple
বদরীনাথ।

ভোররাত্রে ধুপধাপ আওয়াজ। হয়তো বরফের চাঙড় খসে পড়ছে। তাড়াতাড়ি উঠেই বা কী হবে? থাকতে তো হবে ঘরবন্দি। দরজার নীচে দিয়ে ঢোকা আলো দেখে বাইরে এসে তাজ্জব। হাই ফোকস্! ইট্‌স আ ব্রাইট ডে। সবাই বাইরে। ছবি তোলার ধুম। ঝকঝক করছে চার পাশ। রোদ এসে পড়েছে পাহাড়ের এক দিকে। বদরীনাথ মন্দির পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। এক জন বাড়ির ছাদে উঠে থালায় করে বরফ পরিষ্কার করছেন। মন্দিরচত্বরে লোকজনের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে এখানকার বারান্দা থেকেই। আমরাও র‌ওনা দিলাম।

কিছু কিছু বরফ গলে পথ পিচ্ছিল। অতি সাবধানে পদচারণা করতে হচ্ছে। বেলচা দিয়ে বরফ সরানো হচ্ছে। অলকানন্দার ওপর যে ব্রিজ, তাতেও বরফ। অবশেষে বদরীনাথ দর্শন। মন্দির প্রায় খালি। বদরীনাথজি ভালো দর্শন দিলেন। মাথায় রত্নখচিত মুকুট অথচ দেখতে কী মায়াময়। মায়াবী, সংবেদনশীল দৃষ্টিতে দেখছেন। মনের থলি ভরে নিয়ে মন্দির প্রদক্ষিণ ক‍রে বাইরে আসতেই দেখি, দর্শনার্থী সমাগম বেশ হয়েছে, তার সঙ্গে হাজির পেশাদার আলোকচিত্রীর দল। ঝকঝকে রোদে চার পাশ ঝলমল করছে। হলুদ ঠোঁট চাও ওড়াউড়ি করছে। আমরাও মন্দির থেকে ফেরার পথ ধরলাম।

আরও পড়ুন বিশ্বনাথের বারাণসী, বারাণসীর বিসমিল্লাহ

একটি গাড়িও র‌ওনা দিল, কিন্তু যেতে পারল না বিশেষ। বদরীনাথ ঢোকা-বেরোনোর চৌকিতে আটকে দেওয়া হল, রাস্তা চলাচলের উপযুক্ত না হ‌ওয়ায়। ষোলো ঘণ্টার অবিরাম তুষারপাতের ফলে জায়গায় জায়গায় দু’ ফুট তুষারের আস্তরণ।

ঘরবন্দি হয়ে থাকতে আর ভালো লাগছে না, বিকেলে পায়চারি করতে বেরোলাম। মাথার ওপর হেলিকপ্টারের চক্কর। অনুপম বলল, “রিপোর্টার”। সেটা যে ভুল তা বুঝেছিলাম পরের দিন। যা-ই হোক বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে একেবারে মন্দিরচত্বরে, দর্শনার্থীদের লম্বা লাইন। সকালের মতো আর ফাঁকা নেই। মন্দিরের বাঁহাতি রাস্তা ধরে চলতে লাগলাম চরণপাদুকার দিকে। দু’ পাশের দোকানগুলোর ছাদ থেকে বরফগলা জল টপ টপ করে পড়ছে। রাস্তায় বরফকুচি আর জলের কাদা। সাবধানে চলতে হচ্ছে। চরণপাদুকার দিকে ওঠার সিঁড়ি বরফে ভর্তি। স্থানীয় একজন উঠতে বারণ করলেন। উঠতে পারলে‌ও নামা কঠিন হবে। অগত্যা ফিরতি-পথ। অলকানন্দার ওপর সাঁকো পার হতেই চোখে পড়ল এক সাধু তাঁর ক্রাচ দিয়ে বসার বেঞ্চ থেকে বরফ সরাচ্ছেন। একটা জলুস আসছে বাজনা বাজিয়ে। এক আঞ্চলিক গ্রাম্য দেবতাকে আনা হচ্ছে বদরীনাথ দর্শনের জন্য। ছবি তুলতে গিয়ে দেখি চার্জ শেষ। গতকাল থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই পাওয়ার ফল্টের কারণে।

first sunrays on neelkantha peak
নীলকণ্ঠ শিখরে প্রথম সূর্যকিরণ।

পরের দিন সকালে ঠিক হল ফিরতি পথে র‌ওনা হ‌ওয়ার আগে চেষ্টা হবে মানা গ্রামে যাওয়ার। জানা গেল রাস্তা খোলা। গাড়ির সামনের বরফ পরিষ্কার করতে হাত লাগাল অনুপম। বরফ পরিষ্কার করে মানা যাওয়ার রাস্তা গাড়ি চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। ফৌজি চৌকি থাকায় এই রাস্তার গুরুত্ব অপরিসীম। এই অঞ্চলে ভালো আলুচাষ হয়। এখন জমি ফাঁকা। জানা গেল, ইন্টারনেটের দৌলতে আগাম আবহা‌ওয়ার পূর্বাভাস পেয়ে চাষিরা আলু তুলে বিক্রি করে দিয়েছেন। সামরিক বাহিনীর ক্যাম্প পর্যন্ত‌ই রাস্তা পরিষ্কার। এর পর গাড়ি আর বেশি দূর এগোতে পারল না।

ফিরে আসার জন্য গাড়ি ব্যাক করতে লাগল। কিন্তু জমাট বরফে চাকা স্কিড করে একেবারে খাদের ধারে। সারথি বাপি চরম দক্ষতায় ব্রেক কষল। এর পর? গাড়ি চালু করলে চাকা বরফের উপর ঘুরে ঘুরে আর‌ও হড়কে যাবে। সারথি জানালেন, অন্তত পাঁচ জন যদি গাড়ি ঠেলতে পারে তবেই গাড়ি সোজা করা যাবে।  আমরা চললাম সামরিক ক্যাম্পের উদ্দেশে, ওঁদের সাহায্য যদি পাওয়া যায়, সেই আশায়। দেখা হয়ে গেল যমুনোত্রী থেকে আসা কয়েক জনের সঙ্গে। ওঁরাও চলেছেন মানাগ্রাম। ওঁরা রাজি হলেন। দলে আমরা সাত জন। প্রথমে গাড়ির সামনে থেকে ঠেলা, পরে পিছন থেকে ঠেলা। পা হড়কে যাচ্ছে, তবুও পরিশ্রম কাজে এল।             

আরও পড়ুন ওখরে-হিলে-ভার্সে, যেন মেঘ-বালিকার গল্প

বদরীনাথ ঢোকার চৌকিতে আটকে দেওয়া হল। নীচের রাস্তায় গলা জল রাত্রে জমে গিয়ে বিপজ্জনক অবস্থা। অ্যাক্সিডেন্টের আশঙ্কা প্রবল। রোদে বরফ গলে গেলে গাড়ি ছাড়া হবে। অগত্যা অপেক্ষা। নেমে পায়চারি করা ছাড়া উপায় নেই। হঠাৎ কিছু ব্যস্ততা চোখে পড়ল। একটা গাড়ি ছেড়ে দে‌ওয়া হল। যাত্রী মুকেশ আম্বানি। কিছুক্ষণ পর ওঁকে নিয়ে হেলিকপ্টার উড়ে গেল। গতকালের হেলিকপ্টার-রহস্যের সমাধান।

আবার অপেক্ষা। সকাল দশটা নাগাদ নীচে থেকে গাড়ি আসতে শুরু করল। স্থানীয় প্রশাসনের গাড়ি এসে সবুজ সংকেত দেওয়ার পর আমাদের যাত্রা শুরু হল। তুষারাবৃত বদরীনাথকে প্রণাম জানিয়ে এগিয়ে চললাম পরবর্তী গন্তব্যের দিকে। (চলবে)

ছবি: লেখক 

 

1 Comments
Share
a-visit-to-garhwal-part-5-to-jankichatti-via-barkot
tanmoy bhattacharya
তন্ময় ভট্টাচার্য

উত্তরকাশী থেকে বেরিয়ে একটু দ্রুত এগোতে লাগলাম। কিন্তু ধরাসু বেন্ডে এসে আবার দাঁড়িয়ে পড়তে হল। সামনে গাড়ির লাইন জানান দিল ধস নেমেছে। তবে খুব বড়োসড়ো নয়। ঘন্টা খানেকের অপেক্ষা। ধস পরিষ্কার হতে আবার যাত্রা। গাড়ি ধরাসু বেন্ড পেরিয়ে এ বার নতুন রাস্তা নিল। ফেলে আসা টিহরীর দিকে না গিয়ে ডান দিকে ঘুরে চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে গাড়ি চলতে লাগল। সাধারণ পার্বত্য পথ। বিশেষ কিছু দেখার নেই। পথে শিবের মন্দির, গুম্ফা পেলাম। ব্যাস, আর কিছু বলার নেই। ঘণ্টা দুয়েক চলার পর পেয়ে গেলাম বারকোট বেন্ড। বারকোট শহর আমাদের সামনে আসবে যখন আমরা মুসৌরির দিকে যাব। কিন্তু আমাদের যাত্রা ডান দিকের পথে, গন্তব্য যমুনোত্রী। তাই ফেরার পথে বারকোট শহরকে পাব।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / প্রথম পর্ব : ধনৌলটি ছুঁয়ে নিউ টিহরী

এই বেন্ডে আমাদের আজকের ঠিকানা হোটেল আদিত্য প্যালেস। প্যালেস শুনে চমকে যাবেন না। ভাড়া মাত্র ৭০০ টাকা। দোতলা আবাস। তবে ওপরের ঘরগুলো বেশ সুন্দর। নীচের গুলো একটু ছোটো। দরাদরি করে ৫০০ করা হল। দূর থেকে আসা তীর্থযাত্রীরা বারকোটে এক রাত থেকে পরের দিন ভোরে উঠে জানকীচট্টি যান। সেখান থেকে ট্রেক করে যমুনোত্রী মন্দিরে পূজা দিয়ে আবার রাতের আগেই বারকোটে ফিরে আসেন। এর ফলে জানকীচট্টির হিমশীতল পরিবেশ থেকে বাঁচা যায়।  এখানে এই বারকোটে একটু দূরে যমুনার পারে তাঁবুতে থাকাই যেত। সেখান থেকে যমুনোত্রী হিমবাহের পাহাড়ের দেখা মেলে। কিন্তু পকেট অনুমতি দেয়নি।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / দ্বিতীয় পর্ব : টিহরী থেকে উত্তরকাশী হয়ে হরসিল

এই বারকোটেই আমাদের আধার কার্ড দেখিয়ে নাম নথিভুক্ত করতে হল। তবে দুপুরের খাওয়ার পরে। ছবিও তুলে রেখে দিল। একটি অনুমতিপত্র জাতীয় কাগজ প্রত্যেকের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হল। যদিও সেই কাগজ কোথাও কাজে লাগেনি। তবে দেখানোর দরকার পড়লে বা বিপদে কাজে লাগে। এখানে ঠান্ডা অনেক কম। উচ্চতাও অনেক কমে গিয়েছে। কাল প্রায় ৩০০০ ফুট গাড়িতে উঠব, তার পর হাঁটা। তবে দুপুরের বৃষ্টি আমাদের পিছু ছাড়েননি। বৃষ্টি হয়ে একটু ঠান্ডা বাড়িয়ে দিল। না হলে গায়ে গরমজামা ছাড়াই চলছিল।

shani tample
শনি মন্দির, জানকীচটি।

পরের দিন ভোর ৫টাতেই বেরিয়ে পড়লাম। একটু এগিয়ে দু’টো বাঁক নিতেই চমক। যমুনোত্রী হিমবাহের সঙ্গে আরও নাম-না-জানা দু-এক জন হাজির রূপের ডালি নিয়ে। এ যেন শেষ না হওয়া রূপকথা। ঘণ্টা তিন গাড়িতে থাকার পর আবার ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে পৌঁছে গেলাম হনুমানচট্টি। এখানেও অনেকে থাকেন। এখান থেকেই হেঁটে যান। জিএমভিএনের টুরিস্ট বাংলো এখানেও আছে। তবে আমরা শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যাব। একটু চা খেয়ে পুলিশের তল্লাশি পেরিয়ে আমরা এসে গেলাম জানকীচট্টি। এটা যমুনোত্রীর বেস ক্যাম্প। এখানেও আমাদের জিএমভিএন টুরিস্ট বাংলোয় বুকিং। ম্যানেজার নেই। একজন কেয়ারটেকার। একটু বয়স্ক। আমাদের ন’টা ঘর দেখাতে দেখাতে হাঁপিয়ে উঠলেন। তায় আমাদের দু’টো ঘর পছন্দ না হওয়ায় ইকো থেকে ডিলাক্স রুমে পরিবর্তন করে নিলাম। বাকি ঘরগুলি ১২টার মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে বলে আশ্বাস ছিল। কিন্তু ঠিক হতে হতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল।

manasa temple
মনসা মন্দির।

এই প্রথম আমাদের ঘর থেকেই দেখা দিলেন যমুনোত্রী হিমবাহ, একধারে কুলকুল করে বয়ে চলেছে যমুনা নদী। স্বর্গীয় অনুভুতি, কিন্তু ঘর অপরিচ্ছন্ন। তবে খাবারদাবার ভালোই। যাঁদের যমুনোত্রী যাওয়ার, তাঁরা চটপট আলুর পরোটা খেয়ে ঘোড়ার দরদস্তুর করে বেরিয়ে পড়ল। তাঁরা সংখ্যায় সাত। ঘোড়াপ্রতি যাওয়া-আসা নিয়ে ১০০০ টাকা। ডুলি চেপে যাওয়ার ইচ্ছা হয়েছিল আমার স্ত্রীর। কিন্তু তারা ৮০০০ টাকা চেয়ে বসায় তিনি রণে ভঙ্গ দেন। স্বাভাবিক ভাবেই মনটা খারাপ। আমরা জনা ছয়েক টিফিন করে বেরিয়ে পড়লাম জানকীচট্টি ঘুরে দেখতে। মন্দিরের দূরত্ব ৫ কিমি। কিন্তু রাস্তা খাড়াই। তাই ও দিকে না গিয়ে টুরিস্ট বাংলোর দায়িত্বে থাকা ভদ্রলোকের কথামতো চললাম সরস্বতী ও শিবমন্দির দেখতে। চড়াই এড়িয়ে যেতে গেলে অনেকটা ঘুরে যেতে হয়। তাই চড়াই পথই ধরলাম। আর কষ্ট করলাম বলে কেষ্টও মিলল, পথের সৌন্দর্য। প্রায় দু’ কিমি হেঁটে মন্দিরে পৌঁছোলাম। মা যমুনা কার্তিক পূর্ণিমার পরেই নেমে আসেন এই মন্দিরে। মন্দিরে একটি উষ্ণ প্রস্রবণ আছে। অনেকেই সেখানে প্রসাদ ফেলে ফুটিয়ে নেন। বোতলে করে জল নিয়ে আসেনয়। তার পর মন্দিরে পূজা দেন। মায়ের শীতকালীন আবাসে আমরা অবশ্য সাধারণ ভাবেই সরস্বতী মায়ের ও শিবের পূজা দিলাম। যমুনার ঠান্ডা জলের ছিটে আর গুরুগম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণ পরিবেশটা বেশ প্রাণময় করে তুলল। এই মন্দিরের ঠিক মাথায় যমুনোত্রী হিমবাহ। আর পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে যমুনা নদী। হু হু করে বইছে ঠান্ডা হাওয়া।

snow covered mountain from janakichati
তুষারাবৃত পর্বত, জানকীচটি থেকে।

এর পর আমরা চললাম গাড়োয়ালী গ্রাম দেখতে। গ্রামের ভেতর দিয়ে রাস্তা। অনেকটা হেঁটে পৌঁছে গেলাম শনি-নাগদেবতা মন্দিরে। মূল মন্দিরটি চারশো বছরের পুরনো। পাথর ও কাঠ দিয়ে তৈরি। সংকীর্ণ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। ভেতরে আলো খুব কম। মন্দিরের নীচে রামলীলার আয়োজন হচ্ছে। একটু দূরেই নতুন মন্দির তৈরি হয়েছে। ভেতরে ঢোকার জায়গা দেখতে পেলাম না। বাইরে থেকে প্রণাম সারলাম। শুনলাম শনিদেবতা এখন বদরী মহারাজের ওখানে গেছেন। নাগদেবতা আছেন। মন্দিরের পেছনেই তুষারশুভ্র পর্বতের উপস্থিতি। দর্শন শেষে ফিরে এলাম। কষ্ট কম হল, রাস্তা উৎরাই বলে। নীচে একটা ঝুলন্ত সেতু, যমুনা পেরোনোর ব্যবস্থা। এখান থেকেই শুর যমুনা-দূষণের।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / তৃতীয় পর্ব : গঙ্গোত্রীতে এক রাত

ক্লান্ত পদযুগলকে টেনে নিয়ে বাংলোয় ফিরে দেখি ঘর বসবাসযোগ্য হতে দেরি আছে। অগত্যা সামনের উঠোনে বসেই হিমবাহ দর্শন। এত কাছ থেকে হিমবাহ অনেকেই দেখেননি। এখন একটু ঠান্ডা কম, তাই পাহাড়ের গায়ের বরফ গলে যাচ্ছে। যাঁরা যমুনোত্রী মন্দির দর্শনে গিয়েছিলেন তাঁরাও ধীরে ধীরে ঘোড়ায় চেপে ফিরে এলেন। ততক্ষণে আমাদের দুপুরের খাওয়া সারা।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / চতুর্থ পর্ব : বারসুতে রাত কাটিয়ে বারকোটের পথে

সব ঘর পরিষ্কার হতে হতে বিকেল হয়ে গেল। বিকেলে সবাই যে যার ঘরে ব্যাগ রেখে একটি ঘরে মেয়েরা ও একটি ঘরে ছেলেরা জমায়েত হল। গল্প, তাস সঙ্গে চুটিয়ে আড্ডা। আমি এক বার ওই ঠান্ডায় বাইরে এসেছিলাম। চাঁদের আলোয় হিমবাহের অপার সৌন্দর্যের রূপ আমার সামনে ধরা দিয়েছিল। যমুনার কুলকুল শব্দ এখন যেন গর্জন। শুনলাম কয়েক মাস আগে মেঘফাটা বৃষ্টি ও সঙ্গে হড়কা বানের কবলে পড়েছিল এই অঞ্চল। এই বাংলো বরাতজোরে বেঁচে গিয়েছে। হারিয়ে গিয়েছে সামনের একটি হোটেল। আজও পারদ শূন্যের নীচে। তাই বেশি দেরি না করে শুয়ে পড়াই মঙ্গল। কাল ফিরব মুসৌরি। অনেক পথ। (চলবে)

ছবি লেখক

0 Comments
Share
a-visit-to-garhwal-part-4-on-the-way-to-barkot
tanmoy bhattacharya
তন্ময় ভট্টাচার্য

ইচ্ছা ছিল বা বলা যায় প্রায় নিশ্চিত ছিলাম বরফ পড়বে, কিন্তু বিধি বাম। গঙ্গোত্রীতেও তুষারপাত হল না। তবে সুগতদা চিন্তিত ছিলেন যে বরফ পড়লে ঠান্ডায় আমাদের আরও কষ্ট হবে। সঙ্গে প্রাকৃতিক যে দৃশ্য আমরা দু’ চোখ ভরে গিলছি, কিছুই পাওয়া যাবে না। কিন্তু আমার খুব ইচ্ছা ছিল অন্তত তুষারপাতের অভিজ্ঞতাটা হয়ে যাক। কিন্তু হল না। ব্যাজার মুখে গাড়িতে চড়লাম। একই রাস্তায় নেমে আসতে হবে ভাটোয়ারি পেরিয়ে গাংনানি অবধি। গানানির একটু আগে ডান দিকে রাস্তা উঠে যাবে। সেখান থেকে ১০ কিলোমিটার মতো গেলেই বারসু গ্রাম। বারসু গ্রাম হল দায়রা বা দরিয়া বুগিয়ালের বেস ক্যাম্প। এখানে সবাই ট্রেক করতেই আসে। কিন্তু আমাদের দলে সেই লোক হাতে গোনা চার-পাঁচ। তাই ট্রেক নয়, আমরা যাচ্ছি সৌন্দর্য আস্বাদন করতে।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / প্রথম পর্ব : ধনৌলটি ছুঁয়ে নিউ টিহরী

গাংনানির পর বারসুর রাস্তা ধরতেই চোখের সামনে হই হই করে চলে এল একের পর এক সাদা শৃঙ্গ। কেউ কেউ নাম করা যেমন কেদার, কেউ বা অনামী। সদ্য গতকাল রাতে বরফ পড়ে সাদা হয়ে সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলেছে। আমাদের গাড়ির গতিও তাই রুদ্ধ হয়ে গেল। আজ মোট যাওয়ার ছিল ৪০ কিমি মতো। তার শেষ ১০ কিমি পথে চলল আমাদের ছবি তোলার ধুম। তাই সেই পথ পাড়ি দিতে সময় লেগে গেল প্রায় এক ঘণ্টা। লাগবেই না কেন। এক এক বাঁকে এক এক শুভ্র হিমশীতল চূড়া আমাদের অভ্যর্থনা করছে যে। না নেমে উপায় কী? আমাদের গাড়ি হিমাচল থেকে আনানো হয়েছিল। স্থানীয় নন। তবে চালক আমাদের খুবই পরিচিত – যোগরাজ ভাই। গাড়ি দাঁড় করিয়ে ছবি তোলাতে তিনি তো অখুশি ননই, বরং যেখানে যেমন খুশি দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে আমাদের সাহায্য করেছেন। হয়তো দ্রষ্টব্য স্থান আমাদের খুঁজে নিতে হয়েছে, কিন্তু কোনও সময় তাড়াহুড়ো করেননি। ফলে ক্যামেরা ভরে ভরে ছবি এসেছে বাড়িতে।

barsu
বারসু।

আমরা পৌঁছোলাম জিএমভিএন-এর টুরিস্ট বাংলোয়। এই প্রথম গাড়ি একদম বাংলোর সামনে আমাদের পৌঁছে দিতে পারল। অন্যগুলির মতো এরও ঘর থেকে কোনো প্রাকৃতিক দৃশ্য সে ভাবে নেই। তবে ঘর পরিষ্কার যতই পুরোনো হোক। রান্নাও ভালো। বিপদ হতে পারত। অন্য সব টুরিস্ট বাংলোর মতো এখানে আমাদের আগমনের অগ্রিম খবর কর্তৃপক্ষ এঁদের পাঠায়নি। ফলে আমাদের আগে কোনো ট্রেকার দল এসে গেলে আমাদের ঘর তাদের হয়ে যেত। এখানে মূল আবাসে ৭টি ঘর ও সুন্দর তাঁবুসদৃশ দু’টি ঘর নেওয়া হয়েছে। তাঁবুগুলি থেকে সরাসরি বরফচূড়া দেখা যায়।

আসার পথে ভাটোয়ারির আগে পেটভরে প্রাতরাশ সেরে নিয়েছিলাম। আমাদের লক্ষ্য দু’টো – যেখানে যা খাবার পাওয়া যাবে, পেট ভরে খেয়ে নাও, আর যেখানে প্রথম তুষারশৃঙ্গ দেখা যাবে, ছবি তুলে চোখ ভরে দেখে নাও। দু’ ক্ষেত্রেই পরে আর নাও পেতে পারো। আজ সেই মন্ত্র কাজে দিল। এদের দুপুরের খাবার পরিবেশনে একটু দেরি হল। ১৯ জনের দল যে এখানে আসবে তার জন্য তারা প্রস্তুত ছিল না। তবে মানুষজন খুব ভালো। যথাসাধ্য সাহায্য করা এদের ধর্ম। সুন্দর প্রকৃতির মানুষ সুন্দর।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / দ্বিতীয় পর্ব : টিহরী থেকে উত্তরকাশী হয়ে হরসিল

আশেপাশে জঙ্গল আছে। একটু দূরে উঁচুতে ভোলানাথের মন্দির। দলের কয়েক জন সেখান থেকে ঘুরেও এলেন। আমরা দোতলার ছাদে দাঁড়িয়ে দূরের পাহাড় দেখতে লাগলাম আর রোদ গায়ে লাগাতে লাগলাম। এখানে তাপমাত্রা দশের আশেপাশে থাকলেও গঙ্গোত্রী হরসিলের পরে এখানে সে ভাবে আর ঠান্ডা লাগছিল না। ফলে লেপের তলায় ঢুকতে সবার আপত্তি। বিকেলে চায়ের আসরে শুনলাম এখানে অনেক ছায়াছবির শুটিং হয়েছে। তবে বেশির ভাগ নেপালি ছবি। নেপালি ছবিতে জায়গাটা নেপাল বলে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্যান্টিনের ইনচার্জ আমাদের এ সব গল্প শোনাচ্ছিলেন। এখন অবধি যেখানে যেখানে গিয়েছি, মনে হয় সর্বত্রই শুটিং করা যায়। কেন এখনও হলিউড এখানে পদার্পণ করেনি সেটাই বিস্ময়ের।

বিকেলে আকাশ মেঘাছন্ন হয়ে পড়ল। ঠান্ডাও শূন্যের দিকে যেতে লাগল রাত বাড়তেই। তবে কি বরফ পরবে? এর মধ্যে শুনতে পেলাম সব থেকে দুঃখের খবর। আমাদের দলের এক সদস্যের পরিচিত কয়েক জন আজ গঙ্গোত্রী গিয়েছেন। গিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু থাকতে পারেননি। কারণ? তুষারপাত। আমরা গঙ্গোত্রী থেকে বেরোনোর কয়েক ঘণ্টা পরেই শুরু হয়েছে তুষারপাত। সেনাবাহিনী সব গাড়ি কম করে দশ কিমি নীচে নামিয়ে দিয়েছেন। হায় কপাল। কয়েক ঘণ্টার তফাতে আমি জীবনের প্রথম তুষারপাত মিস করলাম। ভাগ্যে ছিল না, বা অন্য ভাবে ভাগ্য ভালো ছিল। কারণ বরফে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের নামা মুশকিল হয়ে যেত, থাকা মুশকিল হত। এর পর দুঃখী মন নিয়েই রাতের নিদ্রা।

another view frombarsu
বারসু থেকে আরও।

সকালে মন ভালো হয়ে গেল। কালকের বরফঢাকা পাহাড়গুলোর মাথায় চেপেছে আরও বরফ, আর ন্যাড়া পাহাড়গুলো রাতের বরফপাতে একদম সাদা। যেন আইসক্রিম। খুশির শেষ নেই। ক্যামেরা বার করে ছবি তুলতে তুলতে বুঝতে পারলাম এদের দূরত্ব খুব বেশি নয়। এমনকি বরফ শেষ যেখানে পড়েছে তার থেকে এই বাড়ির দূরত্ব সামান্যই। অর্থাৎ সেই হরসিলের মতো আবার কাছে এসেও এল না।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / তৃতীয় পর্ব : গঙ্গোত্রীতে এক রাত

আমরা বেড়িয়ে পড়লাম সকাল সকাল। আজ উত্তরকাশী হয়ে বারকোট যাব। উত্তরকাশীতে খানিকক্ষণ কাটাব, তা ছাড়া আজকের রাস্তাও অনেকটা। তাই ৭টায় বেরিয়ে পড়া ছাড়া উপায় ছিল না। তখন সবে পাহাড়ের মাথায় ধীরে ধীরে সূর্যের আলো এসে পৌঁছেছে। বরফঢাকা পাহাড়গুলি যেন ঝলসে উঠছে। ঘোড়ায় চড়ে দিনের কাজে বেরিয়ে পড়েছেন গ্রামবাসীরা। কালকে রাতে পরিচিত হওয়া এক বাঙালি ভদ্রলোক তাঁর গাইড নিয়ে দরিয়া বুগিয়াল চলে গেলেন। আমরা গাংনানি হয়ে উত্তরকাশী নেমে আসতে লাগলাম।

উত্তরকাশীতে আবার

একই রাস্তায় ফিরতে হবে বলে উত্তরকাশীর বিশ্বনাথ দর্শন আমরা ফেরার পথে করব বলে ঠিক করে রেখেছিলাম। সেইমতো ৯টা নাগাদ এখানে পৌঁছে মন্দির দর্শনে গেলাম। মন্দিরে শিব ও শক্তি। আগে শক্তির পূজা করে চলে গেলাম শিবের মন্দিরে, পাশাপাশি। বলা হয় গঙ্গার ধারা যেখানে উত্তরবাহিনী, অর্থাৎ সাধারণ নদীর তুলনায় একটু অন্যমুখী, সেই সব পীঠস্থান কাশী নামে পরিচিত। যেমন বারাণসী, উত্তরকাশী, গুপ্তকাশী প্রভৃতি। প্রচুর সন্ন্যাসী এই উত্তরকাশীতে তপশ্চর্যা করেন। এখানে ভাগীরথী তেজি কিন্তু জলের ধারা এখন সরু। মন্দিরে আমাদের পূজা ভালো ভাবেই সম্পন্ন হল। মনে শান্তি এল। শিবের দর্শন না পাওয়া পর্যন্ত আমার মন খুঁতখুঁত করছিল। এখানে এসে যেন প্রায় সম্পূর্ণ। এর পর বাকি শুধু যমুনোত্রী। এখানে প্রাতরাশ সেরে শহর ঘুরে দেখতে লাগলাম। সব রকম আধুনিক সুবিধাযুক্ত এই পাহাড়ি শহর।গাড়ি এক প্রস্থ সারাই হয়ে এল। আমরা উঠে বসলাম, ধারাসু বেন্ড হয়ে চললাম বারকোটের পথে। (চলবে)

ছবি লেখক

 

0 Comments
Share
a-visit-to-garhwal-part-3-one-night-in-gangotri
tanmoy bhattacharya
তন্ময় ভট্টাচার্য

হরসিলে আমরা তুষারপাত পেলাম না। এই ভ্রমণকাহিনি লেখার সময় হরসিলে ভালো তুষারপাত হয়েছে বলে শুনেছি। বিধি বাম। তবে তুষারপাত হলে পরিষ্কার সকাল উপভোগ করা যেত না। আজও সকাল ৭টা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম গঙ্গোত্রীর পথে। বেশি রাস্তা নয়, ঘণ্টা খানেকের। কিন্তু আমরা থেমে থেমে যাব বলে একটু তাড়াতাড়ি বেরোচ্ছি প্রতি দিন। আর থামব নাই-বা কেন? এক একটা মোড় ঘুরতেই বরফসাদা পাহাড়চূড়া এসে আমাদের দৃষ্টি সার্থক করে দিচ্ছে। আজও ব্যাতিক্রম নয়। একটু এগোতেই মাউন্ট শিবলিঙ্গ, সুদর্শন দেখা দিতে লাগলেন। যেন ডেকে নিয়ে যেতে চান। কালকে রাতে  ঠান্ডার ধাক্কা এখনও সহযাত্রীরা সামলাতে পারেননি। তাই গাড়ি থেকে নেমে ছবি তোলার লোক আজ সামান্যই, ২-৩ জন। বাকিরা গরম গাড়ির ভেতরেই। কাল রাতের পারদ শূন্যের নীচেই ছিল বলে শুনেছি। বেরোনোর সময় দেখেছি, জমে থাকা জল জেলি বা সাদা সাদা হয়ে গিয়েছে। যাকে গ্রাউন্ড ফ্রস্টিং বলে। আজকে সকালেও সেই ঠান্ডা কমার কোনো লক্ষণ নেই। উলটে আজ রাতে আরও বেশি ঠান্ডা পড়বে। তবে কি বরফ পাব?

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / দ্বিতীয় পর্ব : টিহরী থেকে উত্তরকাশী হয়ে হরসিল

অচিরেই আমরা গঙ্গোত্রী মন্দির থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরের গেটে এসে পৌঁছোলাম। এখানেই গাড়ির যাত্রা শেষ। আর এগোনোর অনুমতি নেই। আবার মালবাহক লাগবে, মালপত্র বয়ে নিয়ে যেতে হবে। এক এক বার এক এক মালবাহককে দিতে হবে ১১০ টাকা। এখানেও আমাদের থাকার জায়গা জিএমভিএন-এর ট্যুরিস্ট বাংলো। পাঠক, মনে রাখবেন এখানে জিএমভিএন-এর দু’টি বাংলো আছে –  একটি ছোটো, গঙ্গোত্রী মায়ের মন্দির লাগোয়া আর অন্যটি বড়ো, মন্দির থেকে ৫০০ মিটার দূরে, নদীর অন্য প্রান্তে। আমাদের বুকিং ছিল বড়োটিতে। খুঁজে পেতে অসুবিধা হবে না। তবে একটু দূরে, এই যা। নদীর ওপরে তৈরি ব্রিজ পেরোতে হবে এবং একটু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বাংলোয় পৌঁছোতে হবে। বয়স্কদের একটু অসুবিধা হতে পারে।

mount sudarshan
মাউন্ট সুদর্শন।

আমাদের দু’টি পরিবারের জন্য একটি রুমের ব্যবস্থা হয়েছে, যাকে বলা হয় ফ্যামিলি রুম। ভাড়া ১৬০০-এর মতো। বাকি প্রতিটি পরিবারের জন্য একটি করে ডিলাক্স রুম। ডিলাক্স রুমে প্রাতরাশ বিনা পয়সায়। ঘর থেকে কোনো পর্বত দেখতে পাওয়া যায় না, কিন্তু সামনের লনে এলেই কেদার ও সুদর্শন হাজির রূপের পসরা নিয়ে। বাংলোটি এত সুন্দর জায়গায় যে ডান দিকে কয়েক পা এগোলেই সূর্যকুণ্ড নামের ঝরনা। প্রবল বেগে নেমে আসছে ভাগীরথী।আর এক প্রান্তে সীতাকুণ্ড।

পুরাণ অনুসারে সগর রাজার ষাট হাজার সন্তান কপিলমুনির অভিশাপে ভস্ম হয়ে গেলে তাদের উত্তরপুরুষ ভগীরথ তপস্যাবলে মা গঙ্গার আগমন ঘটান মর্ত্যে। সেই পুণ্য গঙ্গার স্রোতে মুক্তিলাভ ঘটে সগররাজার সন্তানদের। এই গঙ্গোত্রীতেই মা গঙ্গার মর্ত্যে আগমন। ভগীরথের নামে এখানে তিনি ভাগীরথী। দেবপ্রয়াগে আলকানন্দার সঙ্গে মিশে গঙ্গা নামে প্রবাহিত। কিন্তু মা গঙ্গার স্রোতধারা মহাদেবের জটায় ধারণ ছাড়া মর্ত্যের বিনাশ আটকানো সম্ভব ছিল না। তাই মনে করা হয় এই সূর্যকুণ্ডে মহাদেব গঙ্গামা-কে জটায় ধারণ করেন। বিজ্ঞান বলছে, অনেক আগে গঙ্গোত্রী হিমবাহ গঙ্গোত্রী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ধীরে ধীরে গোমুখ পর্যন্ত পিছিয়ে যায়। এখন আরও পিছিয়ে গিয়েছে, যার নাম গোমুখ ২। গঙ্গোত্রী থেকে গোমুখ, গোমুখ ২ ট্রেক করে যাওয়া যায় বা ঘোড়ায় চড়ে।

suryakund
সূর্যকুণ্ড।

মালপত্র রেখে কুলিভাড়া মিটিয়ে আমরা চললাম গঙ্গামায়ের মন্দির দর্শনে। সূর্যকুণ্ডে রামধনু দেখা যায়। কিন্তু আজ অদৃশ্য। সূর্যকুণ্ড থেকে মাউন্ট সুদর্শন দেখে ছবি তুলে এগিয়ে চললাম। ভাগীরথীর একটি ধারা পেরিয়ে, প্রধান ধারার ওপরে ব্রিজে পৌঁছোনোর আগে ভাগীরথী শিলা। মনে করা হয় এখানেই ভগীরথ শিবের তপস্যা করেছিলেন। তার পর ব্রিজ পেরিয়ে মন্দির। মন্দিরে প্রধান বিগ্রহ মা গঙ্গা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ এসে এখানে পূজা দেন। আমিও ব্যতিক্রম নই। জল মাথায় দিলাম। ভালো ঠান্ডা, কিন্তু কেমন যেন সহ্য হয়ে গেল। ছোটো ছোটো ১০০ মিলিলিটারের বোতল বিক্রি হচ্ছে। ১০ টাকায় কিনে জল ভরে নিলাম। পুজোর প্রসাদ খই ও নকুলদানা। ভক্তিভরে খেয়ে নিলাম। ইতিহাস মতে, মন্দির তৈরি করেন নেপালি জেনারেল অমর সিং থাপা। নদীর এঁকে বেঁকে হারিয়ে যাওয়ার আগেই এক পাশে মন্দির। মন্দিরের উঠোনে দাঁড়ালে উলটো দিকে মাউন্ট সুদর্শন, সঙ্গী কেদার। যেন মা গঙ্গাকে পাহারা দিচ্ছেন। অপরূপ দৃশ্য। একটু থেকে বেরিয়ে এলাম।

এ বার ফেরার পালা। ফেরার পথে খেয়াল করলাম বন বিভাগের রেস্টহাউস এখানেই আছে। দুপুরের খাওয়া এখনও একটু দেরি আছে। তাই চললাম দেড় কিলোমিটার দূরের পাণ্ডব গুহা দেখতে। প্রথম দিকে ভালো চড়াই-উৎরাই থাকলেও শেষের দিকে প্রায় সমতল রাস্তা। দেড় কিমি থেকে একটু বেশিই হবে। হেঁটে যেতে বেশ লাগে। জঙ্গলের ভেতরে গাছের ফাঁকে ফাঁকে পাখির ডাক শুনে এগিয়ে চলা। নীচে দিয়ে বয়ে চলা ভাগীরথীর গর্জন। অবশেষে পৌঁছে গেলাম। একটা বড়ো পাথরের ভেতরে ছোটো গুহায় কয়েক জন সাধুর বসবাস। রান্নার ধোঁয়ায় ভেতরে থাকা বড্ড কষ্টকর। রাস্তার সৌন্দর্যের সঙ্গে এই জায়গাটার কোনো তুলনাই চলে না। তাই একটু হতোদ্যম হয়েই ফিরে চললাম।

pandav guha
পাণ্ডব গুহা।

সর্বত্র ফেরার সময় কম লাগে। এ বারেও তাই। তার মধ্যে বাংলো থেকে সহযাত্রীদের ফোন, আমার চলার গতি বাড়াতে আরও সাহায্য করল। দুপুরের গরম গরম নিরামিষ খাবার ডাকছে। ২০ মিনিটে ফিরে এলাম। পেটে চনমনে খিদে, গোগ্রাসে গিলে নিলাম সব। কিন্তু খাওয়ার পর থেকেই ঠান্ডা লাগতে লাগল বেমক্কা। হাঁটাচলার জন্য যে গা গরম হয়েছিল তা কিছুক্ষণের মধ্যেই উধাও। বেজায় ঠান্ডায়ে শরীরের হাড়গুলো যেন ঠোকাঠুকি করতে লাগল। সূর্য ডুবতেই উষ্ণতা একদম নিশ্চিত শূন্যের নীচে। ওদের অফিসরুমের বাইরে লাগানো থার্মোমিটার জানা দিচ্ছে -২ ডিগ্রি এখনই। রুমহিটারের খোঁজ নিয়ে পাওয়া গেল না। পেলেও লাভ হত না। সারা দিন বিদ্যুতের দেখা নেই। সন্ধের পর থেকেই চলছে জেনারেটর। ১১টা অবধি আলো জ্বালিয়ে রাখা, তার পরেই অন্ধকার। এরই মধ্যেই রাতের খাওয়া শেষ করে শুয়ে পড়া ছাড়া আর কোনো কাজ নেই।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / প্রথম পর্ব : ধনৌলটি ছুঁয়ে নিউ টিহরী

চলছে কনকনে হাওয়া। বরফের পাহাড়গুলো খুব কাছে হওয়ায় ঠান্ডা মাত্রাতিরিক্ত। পরের দিন সকাল সকাল ছবি তুলেই পালিয়ে আসার পথ ধরলাম। সকাল ৬টা নাগাদ সব গুছিয়ে বেরিয়ে আসার সময় উষ্ণতা দেখা গেলো -২। আজ যাব বারসু।

প্রসঙ্গত বলে রাখি গঙ্গোত্রীর উচ্চতা ১০ হাজার ফুটের একটু বেশি। সাধারণত শ্বাস নিতে অসুবিধা না হলেও, উত্তেজনা, ক্রোধ ইত্যাদিতে শ্বাসকষ্ট শুরু হতেই পারে। দরকারে পুলিশ বা সেনাবাহিনীর সাহায্য নিতে হবে। অতিরিক্ত ঠান্ডা থেকে বাঁচতে চকোলেট বা গা গরম রাখার খাবার খাওয়া প্রয়োজন। তবে নিরামিষ একমাত্র ভরসা, কারণ মাংস নৈব নৈব চ। ওতেই মানিয়ে নিতে হবে। (চলবে)

ছবি: লেখক

 

0 Comments
Share
a-visit-to-garhwal-part-2-from-new-tehri-to-harsil-via-uttarkashi
tanmoy bhattacharya
তন্ময় ভট্টাচার্য
এ কঁহা আ গয়ে হম

ভোর ভোর বেরিয়ে পড়লাম। চিনিয়ালসর, ধরাসু বেন্ড হয়ে উত্তরকাশীর ‘হোটেল গঙ্গাশ্রয়’ আজ আমাদের গন্তব্য। কিন্তু গাড়ি গতি তুলবে কী করে? চিনিয়ালসরের রাস্তা ধরতেই তো স্বর্গে প্রবেশ। ধীরে ধীরে সূর্যদেবতার উদয়, ডান দিকে নীচে দিগন্তবিস্তৃত জলরাশি, দূরে গাড়োয়াল মণ্ডলের ভাসমান কটেজ। পাহাড়েঘেরা ভাগীরথীর পাখির চোখে দৃশ্যায়ন। পুব আকাশ রক্তিম। বাঁকে বাঁকে শিহরন। বার বার গাড়ি থামিয়ে ছবি তোলা আর চোখের আরাম। এ দিকে দেরি হয়ে গেলে উত্তরকাশীতে আমাদের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিতে সমস্যা হতে পারে। তাই একটা তাড়া ছিলই। না হলে এখানেই তো থেকে যাওয়া যায়। এ ভাবেই ধীরে ধীরে পৌঁছে গেলাম ধরাসু বেন্ড। এখানে রাস্তা দু’ ভাগ – একটা গিয়েছে বারকোট হয়ে যমুনেত্রী বা দেহরাদুন আর অন্যটি উত্তরকাশী হয়ে হরসিল এবং গঙ্গোত্রী। আমরা দ্বিতীয়টি তথা ডান দিকে উত্তরকাশীর রাস্তা ধরলাম। তার আগে সেরে নিলাম প্রাতরাশ।

আরও পড়ুন গাড়োয়ালের অলিগলিতে / প্রথম পর্ব : ধনৌলটি ছুঁয়ে নিউ টিহরী

bandarpuch from dharasu bend
ধরাসু বেন্ড থেকে বান্দরপুঁছ।

গাড়ি চলতে শুরু করতেই আবার থামাতে হল। ধরা দিলেন মাউন্ট বান্দরপুঁছ। একটা বাঁক পেরোতেই। বাঁদরের লেজের মতো বলে এঁর নাম বান্দরপুঁছ। তিনটি শিখর নিয়ে দাঁড়িয়ে। ইলেকট্রিক তারের বাধা টপকে মনের মতো ছবি হয়ত তোলা গেল না, কিন্তু চোখের আরাম ষোলো আনা। আবার গাড়ি এগিয়ে চলল। ঘণ্টা চারেক পরে উত্তরকাশী শহরে প্রবেশ। প্রথম এলাম কৈলাস আশ্রমে। এখানে পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠান ছিল আমাদের। সাধুসন্তদের ‘ভাণ্ডারা’ প্রদান। কয়েক ঘণ্টার অনুষ্ঠান সমাধা করে অনেকে আশ্রমেই মধ্যাহ্নভোজ সেরে নিলেন। আশ্রমের পাশেই বয়ে চলেছে ভাগীরথী। গঙ্গাদর্শন করে পৌঁছে গেলাম প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে আমাদের আজকের আস্তানা ‘হোটেল গঙ্গাশ্রয়’-এ। ঘরপ্রতি ভাড়া ১২০০। হোটেলটি একদম নদীর ধারেই। নদী কিছুটা নিচু দিয়ে প্রবাহিত। ঘরের পাশে লনে দাঁড়ালেই দেখা যায় এঁকে বেঁকে নদী এসেই আবার পাহাড়ের বাঁকে মিলিয়ে গেল। কয়েক ধরনের মাছরাঙার দেখা পেলাম।

khedi falls
খেড়ি ঝরনা।

একটু বিশ্রাম নিয়েই চলে গেলাম কাছেই মনুষ্যসৃষ্ট খেড়ি ফলস দেখতে। এটা একটি উপ-জলধারা, যা ভাগীরথীতে এসে মিশেছে। জলপ্রপাতের পাশে তৈরি হয়েছে রামধনু। শেষ বিকেলে এখানে পৌঁছোনোর মজাই আলাদা। ফিরে এসে নামলাম নদীর বুকে। জল ভালো ঠান্ডা। একে তো বরফগলা, তায় এখানে তাপমাত্রা নামতে শুরু করেছে। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই ঠান্ডার দাপট। তাড়াতাড়ি রাতের আহার শেষ করেই সারা দিনের ক্লান্তি দূরে করতে বিছানায় আশ্রয় নিলাম। তবে তার আগে এক প্রস্থ গানের লড়াই খেলে নিতে অসুবিধা হল না। এই স্বর্গীয় ভুমিতে মন আনন্দে গুন গুন করে উঠবেই “এ কঁহা আ গয়ে হম, তেরে সাথ…।” কাল আমাদের স্বপ্নের গন্তব্য হরসিল।

river bhagirathi from uttarkashi hotel
উত্তরকাশী হোটেল থেকে ভাগীরথী।

উত্তরকাশীর ‘হোটেল গঙ্গাশ্রয়’ নিঃসন্দেহে ভালো। শহর থেকে একটু দূরে, কিন্তু নিরিবিলি। তবে খাবারের দাম নিয়ে দরাদরি আবশ্যক। না হলে বেশি দামে কম খাবার। এ ছাড়া এখানে একটা অঙ্কগত সমস্যা দেখছি – সরকারি বেসরকারি সর্বত্রই। হিসেবে ভুল করা – মোট ক’টা রুটি খেলাম, খাবারের বিল কম-বেশি করে ফেলা ইত্যাদি। তাই নজর রাখতে হচ্ছে।

হরসিলের পথে

কনকনে ঠান্ডা উপেক্ষা করেই সক্কাল সক্কাল শয্যা ছাড়তে হল।৬টাতেই রওনা দিলাম হরসিলের পথে – রাজ কাপুরের স্বপ্নের হরসিল। উচ্চতা প্রায় ৮০০০ ফিট। এখানে আমাদের থাকার জায়গা জিএমভিএন-এর লজে।

গাড়ি চলছে, পাশে পাশে ভাগীরথীও। আগের দিন দেখা খেড়ি ফলসের একটু আগে উত্তরাখণ্ড পুলিশ প্রতিটি গাড়ির তথ্য সংরক্ষণ করে রাখে। খেড়ি ফলস ছাড়িয়ে মানেরি বাঁধ পেরিয়ে চলতে লাগলাম। মানেরি বাঁধও সুন্দর, প্রায় টিহরীর দোসর। সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। তবে আমাদের গ্রুপ ক্যাপ্টেনের ম্যানেজ করার একটা ‘স্কিলে’ আছে। তাতেই ভেতরে ঢোকার অনুমতি পেলাম, তবে ছবি তোলা নৈব নৈব চ। ভাটোয়ারিতে গাড়ির চাকা ঠিক করানো হল। এর পরে আর গাড়ির সারাই বা তেল ভরার আর কোনো দোকান পাওয়া যাবে না।

on way to harsil
হরসিলের পথে।

এই পথ যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ডালি নিয়ে অপেক্ষা করে আছে। তাই প্রায়ই বাঁকে বাঁকে গাড়ি থামিয়ে ছবি তোলা আর সেই সৌন্দর্যের স্বাদ নেওয়া চলছে। তার ওপর বড়ো গাড়ি, গতি তুলনায় কম। তাই মাত্র ৬৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে হরসিল পৌঁছোতেও কম করে চার ঘণ্টা লেগে গেল।

‘পাহাড়ি’ উইলসনের রাজ্যে

ভাগীরথী একটু ডান দিকে মোচড় নিয়ে এগিয়ে গিয়ে এই ভাবে একটা সুন্দর উপত্যকা বানিয়ে ফেলবে তা কল্পনা করতে পারিনি। সেনাবাহিনীর ক্যাম্প পেরিয়ে, ছোটো একটা নদীর ওপর দিয়ে এগিয়ে হরসিল গ্রামে প্রবেশ করা পর্যন্ত চারিদিকে বরফপড়া পাহাড়ের চূড়া দেখা যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু ভাগীরথী দেখতে আমাদের হরসিল জিএমভিএন-এর লজ অবধি যেতেই হত। মালপত্র বয়ে আনার জন্য কুলির ব্যবস্থা করে, ঘরের দাবি পেশ করে, আমাদের ঘরে মালপত্র ঢুকিয়ে ছুটলাম লজের লনে। সেখানে চমক। ঘরে বসে সব পাওয়া যাবে না। সামনের দিকের ঘরগুলি বা ওপরের ঘরগুলি থেকে কিছু দৃশ্য পাওয়া গেলেও বেশির ভাগ ঘরেই দৃশ্য নেই। তবে লনে কাচ দিয়ে ঘেরা কয়েকটি ঘর। সেখানে বসে আড্ডা ও ভাগীরথী দর্শন। সাথী হিমালয়ের কিছু বরফাবৃত চূড়া – বান্দরপুঞ্চ, শিবলিং, সুদর্শন – আরও কত! সব নাম কি ছাই জানি?

চূড়াগুলোতে একটু যেন কম কম বরফ। গলে গিয়েছে হয় তো। কিন্তু প্রকৃতিদেবী একটু বেলা বাড়তেই মেঘ এনে সেই খামতি মিটিয়ে দিতে লাগলেন। আমরা দূর থেকে সেই হোয়াইট ওয়াশ দেখতে লাগলাম। অনেকখানি জায়গা জুড়ে ভাগীরথী এঁকে বেঁকে, লজের সীমা চুম্বন করে, দূরের পাহাড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। স্রোত ভয়ানক বেশি, তবে জল কম। নদীর ধারে অসংখ্য নুড়িপাথর আর অগুনতি পাখির সমাহার। লালঝুঁটি থেকে সাধারণ বুনো পায়রা, উপস্থিত সবাই। কারণ? নদীর ধারে ভেসে আসা আপেল। এখানে আপেলের চাষ হয়। আর এ বছর আপেলের ফলন বেশ ভালো। লজের নিজস্ব গাছে আপেল পেড়ে খেতে আপত্তি নেই, কিন্তু গ্রামের মানুষের ফল পাড়া যায় না। বাজারে আপেলের দাম ২০ টাকা প্রতি কেজি। কল্পনা করা যায়?

bhagirathi at harsil
হরসিলে ভাগীরথী।

হরসিল বলিউডখ্যাত। গল্প শুনেছি রাজ কাপুর সাহেব হরসিলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বানিয়েছিলেন ‘রাম তেরি গঙ্গা মইলি’র মতো সিনেমা। এর বেশির ভাগ শুটিং এখানেই। মন্দাকিনীর নামে একটা ঝরনাও আছে, কিন্তু খুঁজে পেতে একটু কষ্ট। রাজ কাপুর কেন মুগ্ধ হয়েছিলেন তা এসেই বুঝতে পারছি। চারিদিকে বরফসাদা পাহাড়ের মাঝে এঁকে বেঁকে চলে যাওয়া ভাগীরথী তৈরি করেছে এক মনোরম উপত্যকা, এই এত্ত উঁচুতে। আর সেই উপত্যকায় সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আপেলগাছ।

এই হরসিলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘পাহাড়ি’ উইলসনের নাম। পুরো নাম, ফ্রেডরিক ই উইলসন। অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় উইলসন ১৮৫৭-এর সিপাহী বিদ্রোহের সময় ব্রিটিশ আর্মি ছেড়ে পালিয়ে এসে টিহরী মহারাজের আশ্রয় চান। কিন্তু ব্রিটিশবন্ধু মহারাজ তাঁকে আশ্রয় না দেওয়ায় তিনি পালিয়ে আসেন হিমালয়ের এই দুর্গম জায়গায়, লুকিয়ে থাকেন এই হরসিলে। বিয়ে করেন গুলাবি নামে এক পাহাড়ি-দুহিতাকে। তার পর পাহাড়ি মানুষদের আপেলের চাষের উপায় বাতলে ও গাছের গুঁড়ির ব্যবসা করে ধীরে ধীরে নিজেই হয়ে যান ‘রাজা’। লোকমুখে আজও তাঁর কাহিনি ঘোরে।

নদীতে নামা যেত। তবে সাহস হল না, একে নদী খরস্রোতা, তার ওপর আমার ‘ব্যালেন্স’ খুব একটা ভালো না। তবে চোখ ভরে দেখলাম প্রকৃতি। বেলা বাড়তেই হু হু করে হাওয়ার দাপট। মেঘে ভরে গেল আকাশ। মাঝারি বৃষ্টি শুরু হল। আশা জাগল যদি বরফ পড়ে। এখানে প্রকৃতি এখন এ রকমই। সকালে পরিষ্কার, বেলা বাড়তে থাকলে মেঘ এসে হাজির হবে। তার পর বৃষ্টি হয়ে আবার রাতের দিকে পরিষ্কার। স্থানীয়রা বললেন, আজ একটু বেশি সময় বৃষ্টি হল। আশেপাশের সবুজ পাহাড় স্নান করে আরও সুন্দর হল।

a view from harsil
হরসিল থেকে।

আর চোখের সামনে দেখতে পেলাম সামনের উচ্চ শৃঙ্গগুলি আরও সাদা। অনেক নীচে পর্যন্ত বরফ পড়েছে। চাঁদ উঠল। তবে মাথার ওপরে। লজের আলোয় আলাদা করে খুব বেশি না হলেও সামান্য সামান্য দেখা যেতে লাগল। কলকাতার সংস্থা ওয়েদার আল্টিমা আসার আগে আমাকে বলে দিয়েছিল যে এই সময় পশ্চিমী ঝঞ্জার কারণে হরসিল বা গঙ্গোত্রীর মতো উঁচু জায়গায় বৃষ্টি তো পড়বেই, বরফও পড়তে পারে। তাই আশায় বুক বাঁধলেও শেষমেশ হতাশই হলাম। রাতের ঠান্ডা ভয়ংকর। শূন্যের কাছাকাছি। বাঁচোয়া যে রুমহিটার চলছিল, বিদ্যুতেরও সমস্যা হয়নি।

আমার হরসিলে দু’ রাত থাকার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু আমাদের পরিকল্পনায় এক রাত। ঠান্ডায় কষ্ট করে এক রাত কাটিয়ে দেওয়া যায় শুধুমাত্র প্রাকৃতিক দৃশ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করে। এখানে প্রকৃতি যেন একটু বেশি সুন্দর সাজে। বৃষ্টি না হলে হয়তো গ্রাম ঘুরে দেখতাম। তবে পরের দিন সকালে উঠে বেরিয়ে পড়ার তাড়ার মধ্যেও সকালের পরিষ্কার আকাশে আরও কয়েক বার উপত্যকার সৌন্দর্য অবলোকন করতে ভুলিনি। আবার কবে আসব কে জানে আমার এই স্বপ্নপুরীতে। (চলবে)

ছবি: লেখক

0 Comments
Share
a-visit-to-garhwal-from-haridwar-to-tehri-via-dhanaulti
tanmoy bhattacharya
তন্ময় ভট্টাচার্য
গাড়োয়ালের প্রবেশদ্বারে

গাড়োয়াল শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আকাশপারে গাড়োয়াল হিমালয়ের বরফাবৃত শৃঙ্গরাজি, আর নীচে দিয়ে বয়ে চলা গঙ্গার বা যমুনার বিভিন্ন উপনদী। স্বপ্নের কাছাকাছি এই অঞ্চলে যাওয়ার জন্য আমাদের পরিকল্পনা প্রায় এক বছরের। ঠিক হল, সুগত বসুর নেতৃত্বে আমাদের ১৯ জনের দল ১৭ অক্টোবর মহাষ্টমীর দিন হরিদ্বারে মিলিত হবে। হরিদ্বারকে গাড়োয়ালের প্রবেশদ্বার বলা যায়। এখান থেকেই শুরু করা যায় গাড়োয়াল হিমালয় ভ্রমণ। সেইমতো বিমানে দমদম থেকে দিল্লি, সেখানে রাত কাটিয়ে পরের দিন ভোরে দেরাদুন শতাব্দী ধরে সাড়ে এগারোটা নাগাদ হরিদ্বারে পৌঁছে গেলাম।

আরও পড়ুন ‘লাল কাঁকড়ার দেশ’- তাজপুর

হরিদ্বার বা হরদুয়ার, হরির দ্বার আর হরেরও দ্বার। হর-কি-পউড়ি ঘাট এর প্রাণকেন্দ্র। আমাদের হোটেলের নামও হোটেল হর কি পউড়ি। একদম ঘাটের পাশে। আরও অনেক হোটেলই ঘাটের আশেপাশে আছে। তবে গঙ্গা লাগোয়া হোটেলগুলির রেট খুব চড়া। স্টেশন থেকে এই সব হোটেলে পৌঁছোতে অটো বা টোটো ভরসা। নো এন্ট্রির ভয় দেখিয়ে প্রথমেই অনেক ভাড়া চাইবে, দরাদরিতে কমবে। নিরমিষ খাবার। তবে হৃষীকেশের দিকে রাস্তায় কিছু আমিষ খাবার পাওয়া যায়। খাবারের মান খারাপ নয়, তবে দাম বেশি। জনপ্রতি ১০০-১২০ টাকা লাগবেই এক এক বেলা খেতে।

har ki pauri
হর-কি-পৌড়ি।

আমরা হরিদ্বার পৌঁছে একটু বিশ্রাম নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম ঘাট দেখতে। ঘাটে পৌঁছোনোর জন্য ব্রিজ আছে, ব্রিজ থেকে ঘড়িঘর দেখা যায়। ঘাটে পৌঁছে মাথায় গঙ্গাজল নিলাম। এখানে মূল গঙ্গা নয়, রয়েছে গঙ্গার একটি ধারা, কৃত্রিম চ্যানেল দিয়ে দ্রুত বয়ে চলেছে। দূরে মহাদেবের সুউচ্চ মন্দির। এখানেই বিকেলে আরতি ও পূজাপাঠ হবে।

ইচ্ছা হল কঙ্খল যাওয়ার। ২৫০ টাকায় অটো ভাড়া করে আমরা ৫ জন চলে গেলাম সেখানে। কঙ্খল শহরের দক্ষিণে। এখানকার দ্রষ্টব্য দক্ষেশ্বর মহাদেব মন্দির, সতীকুণ্ড, মা মনসা মন্দির, আনন্দময়ী মায়ের মন্দির ইত্যাদি। আমাদের প্রথম গন্তব্য দক্ষেশ্বর মহাদেব। মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে গঙ্গা। দক্ষযজ্ঞের স্মরণে নিবেদিত এই মন্দির। পাশেই সতীকুণ্ড (বলা হয় এখানেই সতী জীবন ত্যাগ করেন) ও মা মনসা মন্দির। সেখান থেকে একটু এগিয়ে আনন্দময়ী মায়ের আশ্রম। বাঙালি অধ্যুষিত এই আশ্রমে ঢুকলে মন শান্তিতে ভরে যায়।

dakkha temple
দক্ষ মন্দির।

কঙ্খল থেকে ফিরে এলাম হর-কি-পউড়িতে। সিগাল জাতীয় কিছু পাখির খানিক আনাগোনা দেখে আসন গ্রহণ করতে হল ঘাটের ঠিক উলটো দিকে। ভালো ভিড় এর মধ্যেই। পূজার সময় গোনা শুরু। উলটো দিকের ঘাটের সিঁড়িতে বসে গঙ্গাপূজা দেখতে লাগলাম। সাড়ে পাঁচটা থেকে আধ ঘণ্টা মতো পূজাপাঠ হওয়ার পর শুরু হল আরতি। এর মধ্যে অনেকেই পাতার ভেলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে নদীতে ভাসিয়ে দিচ্ছেন। এ যেন এক স্বর্গীয় অনুভুতি। কম করে ১০ জন পুরোহিত ১৫ মিনিট ধরে গঙ্গামায়ের আরতি করলেন। সঙ্গে ঘণ্টাবাদন ও স্তোত্রপাঠ পরিবেশকে ভাবগম্ভীর করে তুলল। ‘জয় গঙ্গা মাইয়া’ ধ্বনি দিয়ে আরতি শেষ হওয়ার পর আর বিশেষ কিছু করার ছিল না, হোটেলে ফিরে পরের দিনের প্রস্তুতি নেওয়া ছাড়া। দুঃখ একটাই, আমাদের এই ভ্রমণসূচিতে হৃষীকেশ নেই, তাই রামঝুলা, লক্ষণঝুলা পরের বারের জন্য তোলা থাকল। তবে হরিদ্বার বা দেরাদুনে দু’ দিন থাকলে হৃষীকেশ দেখে আসা সম্ভব।

গাড়োয়াল-সুন্দরী ধনৌলটি

পরের দিন সকাল ৮ টায় হরিদ্বার থেকে টেম্পো ট্রাভেলারে চেপে দেরাদুন হয়ে চললাম ধনৌলটি। দেরাদুন পেরোতেই চড়াই শুরু। তার আগে রাস্তায় প্রাতরাশ সেরে নিলাম। ধনৌলটির খ্যাতি লালিগুরাস বা রডোডেন্ড্রন-সহ বিভিন্ন ফুল ও দিগন্তবিস্তৃত বরফাবৃত পর্বতমালা দর্শনের জন্য। প্রায় চার ঘণ্টা সড়কযাত্রায় আমাদের উন্মাদনা তুঙ্গে, সঙ্গে চলছে নতুন স্বপ্ন বোনা। পথিমধ্যে হনুমানকুলকে বাই বাই করে, অজস্র বার ছবি তুলে আমরা পৌঁছোলাম ধনৌলটি ইকোপার্ক সংলগ্ন ‘আওয়ারা ক্যাম্পে’। এই ‘আওয়ারা ক্যাম্প’ আজ আমাদের ঠিকানা। রাস্তা থেকে প্রায় ৫০০-৬০০ ফুট নীচে পর পর তাঁবু খাটানো। কিন্তু নামা-ওঠার পথটি বিপদসঙ্কুল। পথটি বেশ খাড়া, সাবধানে না নামলে স্লিপ করে পড়ে চোট লাগার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে অনেকখানি জায়গা জুড়ে ছড়ানোছেটানো তাঁবুর সারিতে পৌঁছে যাওয়ার পর মজাই আলাদা। কনকনে ঠান্ডা। চারিদিক খোলা, তাই ঠান্ডা হাওয়ার দাপট খুব। ১৮০ ডিগ্রি খোলা অঞ্চলে হিমালয়ের তুষারাবৃত শৃঙ্গরাজি দর্শন দেবে আমাদের।

আরও পড়ুন কুমারী সৈকত চাঁদপুরে একটা দিন

এক ধাপ উঁচুতে এদের রান্নঘর। বুকিং-এর সময়েই জনপ্রতি থাকা-খাওয়া খরচ এক সঙ্গে দেওয়া আছে। সুন্দর পানীয়র মাধ্যমে স্বাগত জানানো হল। অনেকটা নামার কষ্ট এক নিমিষে উধাও। দুপুরের খাওয়া ভালোই ছিল। খাওয়া শেষে যে যার তাঁবুতে গিয়ে হালকা বিশ্রাম নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম। মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে কেউ কেউ দর্শন দিলেন আমাদের। শ্রীকান্ত, গঙ্গোত্রীর তিনটি চূড়া ও থলয়সাগর আমাদের দর্শন দিলেন। সোনালি আবিরের খেলায় মেতে উঠল দিগন্ত। অবগুণ্ঠন খুলে ধীরে ধীরে স্বপ্নপুরী বানিয়ে ফেললেন হিমালয়। দোলনা খাটানো ছিল। সেখানে বসে দোল খেতে খেতে সূর্যাস্তের পর্বতমালা দর্শন যেন শুরুতেই জানিয়ে দিল কী হতে চলেছে এই ভ্রমণ। এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু ‘আওয়ারা ক্যাম্প’ আমাদের জন্য ক্যাম্পফায়ার, নাচগানের আয়োজন করে ওই ঠান্ডার রাতকে আরও মায়াবী করে তুলল।

রাতে ঠান্ডা ভালোই ছিল। কিন্তু রাত কাটতেই যে দৃশ্য চোখের সামনে এল তা ভুলিয়ে দিল সমস্ত কষ্ট। হিমালয়ের দিগন্তবিস্তৃত শৃঙ্গরাজি খানিকক্ষণের জন্য সবার সামনে আবার উন্মুক্ত হল। কিন্তু বিধি বাম। বেশিক্ষণ থাকলেন না তাঁরা। চলে গেলেন মেঘের আড়ালে। যেন লুকোচুরি খেলা। আমরাও আর তাঁদের জন্য অপেক্ষা করতে পারলাম না। একটু পরেই বেরিয়ে পড়তে হবে টিহরির উদ্দেশে। প্রাতরাশ সেরেই শুরু হল পরের গন্তব্যে যাওয়ার প্রস্তুতি।

more view from dhanaulti
ধনৌলটি থেকে আরও দৃশ্য।

৫০০-৬০০ ফুট খাড়া পথ ভেঙে ফের ওপরে উঠে আসা সহজ ছিল না, বিশেষ করে বয়স্কদের। তার ওপর খাড়াই পথে পা হড়কে যাওয়ার ভয় থাকে। ভালো গ্রিপের জুতো পরে আসা আবশ্যক। আমার স্ত্রী-কন্যা দ্রুত উঠে গেল। মালপত্র নিয়ে চলে গেল ক্যাম্পের লোকজন। আমি মিনিট ১৫ সময় নিয়ে ওপরে উঠে এলাম। রাস্থার পাশেই গাড়ি রাখা ছিল। শুরু হল আবার সড়কযাত্রা। একটু এগোতেই রাস্তার ধারে পাইনের সারি জানান দিল এটাই ধনৌলটি ইকোপার্ক। এখানেই পাইনের সারির ফাঁক দিয়ে সূর্যের রশ্মি ঝলমলিয়ে ওঠে। ব্যাকগ্রাউন্ডে পর্বতরাজি। যেন এক স্বপ্নপুরী।

মোহময়ী টিহরী

প্রায় ঘণ্টা তিনেক চলার পর চাম্বা পেরোতেই এক দিকে এঁকেবেঁকে ভাগীরথী। এখানে ভাগীরথীর ওপর বাঁধ হয়েছে। এই বাঁধ নিয়ে তো অনেক সংগ্রামের কাহিনি, সে সব শুনলাম স্থানীয়দের কাছে। পুরাতন টিহরী এখন বসবাসের অযোগ্য। বাঁধ তৈরির ফলে যাঁরা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, তাঁদের নিয়েই একটু ওপরে তৈরি হয়েছে নতুন টিহরী। এখানে ছোটো একটি জলধারা ভাগীরথীতে মিশেছে। এবং জলাধারকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক সুন্দর লেক। জলের গতি বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় এখানে ভাগীরথী ধীরস্থির। কিন্তু চারিদিকে সুউচ্চ পর্বতমালা লেকের সৌন্দর্য কয়েক গুণ বাড়িয়ে তুলেছে। আমাদের দলের বেশির ভাগেরই জায়গা হোটেল মনার-এ। ১২০০ টাকা ঘরভাড়ায় এখানে প্রায় সবাই থাকলেও দু’টি পরিবারের জন্য অন্যত্র ব্যবস্থা করতে হবে। গাড়োয়াল মণ্ডল বিকাশ নিগমের সুন্দর কটেজ আছে। তৈরি হয়েছে ভাসমান কটেজও। সেগুলি লেকের ওপরে ভেলায় ভাসমান। পারে যাতায়াতের জন্য নৌকা আছে। কিন্তু সবেরই দাম আকাশছোঁয়া। গেলাম টিহরী হাইড্রো ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন কিমিটেডের অতিথিনিবাসে। এখানে থাকার ঘর পাওয়া মুশকিল, কিন্তু ফাঁকা থাকলে দিয়ে দেয়। ভাগ্যক্রমে দু’টি ঘর পাওয়া গেল। ভাড়া ২৫০ টাকা করে। সব চেয়ে সস্তা, কিন্তু সুন্দর। ঘরগুলি সাজানো, একেবারে নদীর পাশেই। সামনে বিস্তৃত খোলা অঞ্চল, পেছনের ফুলের বাগানের পাশেই ভাগীরথীর বহমান ধারা এবং একটু দূরে বাঁধ। যেন এক স্বর্গীয় অনুভুতি। সকলের খাওয়া কিন্তু হোটেল মানাআরে। হোটেল মানাআর থেকে দৃশ্য একটু আলাদা। অনেকটা পাখির চোখের দৃশ্য। কিন্তু দু’ জায়গা থেকেই সুন্দর দৃশ্য দেখা যায়।

বিকেলে গেলাম জলক্রীড়ায়। এখানে বোটে করে ভাগীরথীর এ-পার ও-পার করায়, আধ ঘণ্টা জনপ্রতি ৪০০ টাকায়। এ ছাড়া রয়েছে ওয়াটার স্কুটারও। দাম একটু চড়া। ছাউনিদেওয়া সাধারণ মোটরবোটে লেকতুল্য নদীতে এ-পার ও-পার করে পড়ন্ত সূর্যালোকে টিহরীকে অবলোকন করলাম।  মোহময়ী টিহরী যেন মায়ালোকে পরিণত। সূর্য ডোবার সাথে সাথে ঠান্ডা বাড়তে লাগল। তাই অন্ধকার হতেই সবাই ঘরবন্দি হয়ে গেলাম। কালকের গন্তব্য উত্তরকাশী। (চলবে)

ছবি লেখক 

1 Comments
Share
puja-destinations-selections-of-bhramononline-visit-to-garhwal

পুজোর ছুটিতে বেড়াতে যাওয়ার জন্য ট্রেনে আসন সংরক্ষণ চলছে। পুজোর ছুটি মানে তো আর পুজোর পাঁচ দিন নয়, পুজোর ছুটি মানে একেবারে সেই দেওয়ালি ছাড়িয়ে। সুতরাং এখনও সময় আছে, বেড়ানোর প্ল্যান করে ট্রেনের টিকিট কেটে ফেলার। আর যদি বিমানে যেতে চান, যত আগে টিকিট কাটবেন, ততই ভাড়া কম হবে। যাই হোক, এখনও যদি পুজোর ছুটিতে বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান না করে উঠতে পারেন তা হলে খবর অনলাইন রয়েছে, আপনাদের জন্য সাজিয়ে দিচ্ছে ভ্রমণ-ছক। শুরু হয়েছিল উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে। তার পর সিকিম। এর পর সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে মহারাষ্ট্র-গোয়া, উত্তরপ্রদেশ, কুমায়ুন। এই পর্বে গাড়োয়াল।

sahastradhara
সহস্রধারা।

ভ্রমণ-ছক ১: দেহরাদুন-ডাকপাথার-চক্রাতা-বারকোট-উত্তরকাশী-হরসিল-গঙ্গোত্রী

প্রথম দিন – দেহরাদুন থেকে চলুন ডাকপাথার, দূরত্ব ৪০ কিমি। তার আগে দেহরাদুন দেখে নিন টনস্‌ নদীর তীরে তপকেশ্বর মহাদেব (স্টেশন থেকে সাড়ে ৫ কিমি), সহস্রধারা (১৩ কিমি) ও টনস্‌ নদীর কাছে রবার্স কেভ (৮ কিমি)। রাত্রিবাস যমুনার ধারে ডাকপাথারে।

দ্বিতীয় দিন – ডাকপাথার থেকে প্রথমে চলুন হিমাচলের পাওনটা সাহেব — গুরু গোবিন্দ সিং-এর স্মৃতিবিজড়িত, ২৫ কিমি। এর পর আরও ৬ কিমি গিয়ে নাহান – শিবালিকের কোলে সুন্দর পাহাড়ি শহর। সব শেষে আরও ৪৫ কিমি গিয়ে রেণুকাজি, হিমাচলের বৃহত্তম লেক, পাহাড়ে ঘেরা। পরশুরামের মায়ের নামে লেক, রয়েছে পরশুরাম লেকও। তার পাড়ে পরশুরাম মন্দির। আরও নানা মন্দির। ফিরুন গিরি নদীর পাড় ধরে পাওনটা হয়ে ডাকপাথারে, ৭২ কিমি। পথে পড়বে যমুনার ওপর আসান ব্যারেজ, ডাকপাথারের ১১ কিমি আগে। রাত্রিবাস ডাকপাথার।

তৃতীয় দিন – ভোরেই চলুন শৈলশহর চক্রাতা (২১৫৩ মিটার), দূরত্ব ৫১ কিমি। ডাকপাথার থেকে ৭ কিমি গেলেই পড়বে কালসি। এখানে দেখে নিন ১৮৬০ সালে আবিষ্কৃত সম্রাট অশোকের শিলালিপি। এখান থেকেই গাড়ি উঠতে শুরু করে পাহাড়ে, পৌঁছে যায় সেনাশহর চক্রাতায়। তুষারাবৃত বন্দরপুঞ্ছ শৃঙ্গ দৃশ্যমান। রাত্রিবাস চক্রাতা।

a view from chakrata
চক্রাতা থেকে।

চতুর্থ দিন – আজও থাকুন চক্রাতায়।

চক্রাতায় দ্রষ্টব্য – চিন্তাহরণ মহাদেব (চক্রাতা বাজার থেকে কিছুটা নেমে), খারাম্বা চুড়ো (৩০৮৪ মি, ৩ কিমি), চিলমিরি সানসেট পয়েন্ট (৫ কিমি), থানাডাণ্ডা (চিরিমিরি থেকে ১ কিমি চড়াই উঠে), রামতাল গার্ডেন (৮ কিমি), চানি চুরানি (১৮ কিমি, সুন্দর নৈসর্গিক দৃশ্য), কানাসার (বিশাল বিশাল কাণ্ডওয়ালা বহু প্রাচীন দেবদারুর জঙ্গল ও কানাসার দেবতার মন্দির, ২৬ কিমি), দেওবন  (তুষারমৌলী হিমালয়ের দৃশ্য, ১০ কিমি, শেষ ২ কিমি হাঁটা)।

(চক্রাতায় পৌঁছে প্রথম দিন স্থানীয় দ্রষ্টব্য দেখে নিন। পরের দিন সকালে ঘুরে আসুন কানাসার ও দেওবন। চক্রাতা ফিরে দুপুরে খেয়ে চলুন রামতাল গার্ডেন ও চানি চুরানি।)

পঞ্চম দিন – সকালেই বেরিয়ে পড়ুন, চলুন বারকোট, ৮৫ কিলোমিটার। পথে দেখে নিন টাইগার ফলস্‌ (চক্রাতা থেকে ১৯ কিমি), লাখামণ্ডল (চক্রাতা থেকে ৬৬ কিমি, নানা দেবতার মন্দিররাজি। পাহাড়ের গায়ে বিশাল কিছু গহ্বর। জনশ্রুতি, পঞ্চপাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারার জন্য এখানেই তৈরি হয়েছিল লাক্ষার জতুগৃহ। নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে বার্নি নদী)। যমুনার ধারে বারকোটে এ দিনটা বিশ্রাম করুন। দেখুন তুষারাবৃত বন্দরপুঞ্ছ শৃঙ্গ।

ষষ্ঠ দিন – সকালেই চলুন উত্তরকাশী ১১৮০ মিটার, ৮০ কিমি। এখানে দেখে নিন বিশ্বনাথ ও অন্যান্য মন্দির এবং ভাগীরথীর ধারে কেদারঘাট। রাত্রিবাস উত্তরকাশী।

nachiketa tal
নচিকেতা তাল।

সপ্তম দিন – আজ চলুন নচিকেতা তাল (২৪৫৩ মিটার, ৩২ কিমি)। চৌরঙ্গি খাল পর্যন্ত গাড়িতে গিয়ে ৩ কিমি ট্রেক জঙ্গলের মধ্য দিয়ে। উদ্দালক মুনির ছেলে নচিকেতার নামে এই লেক। কাছেই নাগ দেবতা মন্দির। রাত্রিবাস উত্তরকাশী।

অষ্টম দিন – ভোরেই বেরিয়ে পড়ুন, চলুন হরসিল (২৬২০ মিটার, ৭৫ কিমি)। পথে দেখে নিন গাংনানির উষ্ণ প্রস্রবণ। রাত্রিবাস হরসিল।

নবম দিন – ভাগীরথী উপত্যকায় পাইন ও দেওদারে ছাওয়া অনুপম সৌন্দর্যের পাহাড়ি জনপদ হরসিল। চলুন ৩ কিমি দূরে ধারালি। ভাগীরথী পেরিয়ে ১ কিমি চড়াই ভেঙে মুখবা গ্রাম, গঙ্গোত্রী মন্দিরের বিগ্রহ মা গঙ্গার শীতকালীন আবাস। মুখবা গ্রাম থেকে দেখুন সুদর্শন, শিবলিঙ্গ, ভাগীরথী-সহ হিমালয়ের বিভিন্ন তুষারশৃঙ্গ। ধারালি থেকে ৩ কিমি চড়াই ভেঙে উঠতে পারেন সাততাল (কুমায়ুনের সাততালের সঙ্গে গোলাবেন না), বিভিন্ন উচ্চতায় সাতটি লেক, যার অনেকগুলিই আজ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তবে যা আছে, সেটাই উপভোগ করার মতো।

দশম দিন – আজও থাকুন হরসিলে। সকালেই চলুন গঙ্গোত্রী (৩০৪২ মি), ২৫ কিমি। উপভোগ করুন গঙ্গোত্রীর নিসর্গ। মন্দির বন্ধ হলে ফিরে আসুন হরসিলে।

একাদশ দিন – হরসিল থেকে ভোর বেলায় রওনা হয়ে ফিরে আসুন হরিদ্বার। রাত্রিবাস হরিদ্বার।

দ্বাদশ দিন – বাড়ির পথে।

Dakpathar
ডাকপাথার।

ভ্রমণ-ছক ২: দেহরাদুন-ডাকপাথার-চক্রাতা-মুসোরি-ধনোলটি

প্রথম দিন থেকে চতুর্থ দিনভ্রমণ-ছক ১-এর মতো।

পঞ্চম দিন – আজও থাকুন চক্রাতায়। ঘুরে আসুন টাইগার ফলস্‌ (চক্রাতা থেকে ১৯ কিমি), লাখামণ্ডল (চক্রাতা থেকে ৬৬ কিমি, নানা দেবতার মন্দিররাজি। পাহাড়ের গায়ে বিশাল কিছু গহ্বর। জনশ্রুতি, পঞ্চপাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারার জন্য এখানেই তৈরি হয়েছিল লাক্ষার জতুগৃহ। নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে বার্নি নদী)।

ষষ্ঠ দিন – চলুন মুসোরি, ৮০ কিমি। পথে দেখে নিন কেম্পটি ফলস। রাত্রিবাস মুসোরি।

mall road, mussorie
মল রোড, মুসোরি।

সপ্তম দিন – আজও থাকুন মুসোরিতে। হাঁটাহাঁটি করুন ম্যালে। দেখে নিন ক্যামেলস ব্যাক রোডে দুর্গা মন্দির, ভাট্টা ফলস, নাগ দেবতা মন্দির, গান হিল পয়েন্ট, মোসি ফলস, ফ্লাগ হিল, লাল টিব্বা (২৬১০ মি), মালসি ডিয়ার পার্ক। গান হিল বেড়িয়ে নিন রোপওয়ে চেপে। রাত্রিবাস মুসৌরি।

অষ্টম দিন – মুসোরি থেকে ধনোলটি (২২৮৬ মি)। দূরত্ব ৩২ কিমি। মুসোরি থেকে এলে ধনোলটিতে রাস্তার বাঁ দিক বরাবর গাড়োয়াল হিমালয়ের বিশাল রেঞ্জ চোখে পড়ে। সকাল সকাল চলে আসুন, যাতে সারা দিন ধরে ধনোলটির সৌন্দর্য উপভোগ করুন। বিকেল হওয়ার আগে চলুন ধনোলটি ভিউ পয়েন্ট। দেড় কিমি ট্রেক। উপরে উঠে বিস্তীর্ণ বুগিয়াল। নয়নাভিরাম সূর্যাস্ত। রাত্রিবাস ধনোলটি।

নবম দিন – ভোরেই চলুন ৩০৪৯ মিটার উচ্চতায় সুরখণ্ডাদেবীর (দুর্গা) মন্দির। চাম্বার পথে ৫ কিমি গিয়ে ২ কিমি চড়াই ভাঙা। হিমালয়ের দৃশ্য ভোলার নয়। দুপুরের আগে ধনোলটি ফিরে চলুন হরিদ্বার, ১১২ কিমি। রাত্রিবাস ধনোলটি।

দশম দিন – বাড়ির পথে।

ভ্রমণ-ছক ৩: দেহরাদুন-মুসোরি-ধনোলটি-শ্রীনগর-খিরসু-পৌড়ী-ল্যান্সডাউন

প্রথম দিন– দেহরাদুন থেকে চলুন মুসোরি (২০০৬ মিটার), দূরত্ব ৪০ কিমি। তার আগে দেহরাদুন দেখে নিন টনস্‌ নদীর তীরে তপকেশ্বর মহাদেব (স্টেশন থেকে সাড়ে ৫ কিমি), সহস্রধারা (১৩ কিমি) ও টনস্‌ নদীর কাছে রবার্স কেভ (৮ কিমি)। পথে দেখে নিন মালসি ডিয়ার পার্ক। রাত্রিবাস মুসোরি।

দ্বিতীয় দিন – আজও থাকুন মুসোরিতে। হাঁটাহাঁটি করুন ম্যালে। দেখে নিন ক্যামেলস ব্যাক রোডে দুর্গা মন্দির, ভাট্টা ফলস, নাগ দেবতা মন্দির, গান হিল পয়েন্ট, মোসি ফলস, ফ্লাগ হিল, লাল টিব্বা (২৬১০ মি)। গান হিল বেড়িয়ে নিন রোপওয়ে চেপে। ঘুরে আসুন কেম্পটি ফলস্‌ (১৫ কিমি)।

a view from dhanaulti
ধনোলটি থেকে।

তৃতীয় ও চতুর্থ দিন – এই দু’ দিন থাকুন ধনোলটিতে। দেখুন ভ্রমণ ছক ২-এর অষ্টম ও নবম দিন

পঞ্চম দিন – চলুন অলকানন্দা তীরে শ্রীনগর (৫৬০ মি, কাশ্মীরের নয়), ১২৪ কিমি। এখানে দেখে নিন কমলেশ্বর মহাদেব মন্দির (জনশ্রুতি, এই মন্দিরেই রাম হাজার পদ্মের অর্ঘ্য দেন দেবতা শিবকে। এখানেই নাকি একটা চোখ কম পড়াতে রাম নিজের চোখ উৎসর্গ করতে চান। সেই থেকে রামকে বলা হয় কমল নয়ন)), আদি শংকরাচার্য প্রতিষ্ঠিত কিকিলেশ্বর মহাদেব মন্দির, কেশোরাই মঠ, ৩ কিমি দূরে বাবা গোরখনাথ গুহার উলটো দিকে শংকর মঠ, ১৭ কিমি দূরে পৌড়ী-গাড়োয়াল রাজ্যের রাজধানী দেবলগড় (এখানে গাড়োয়ালি স্থাপত্যের নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে গৌরী দেবী মন্দির, মা রাজেশ্বরী মন্দির ইত্যাদি।

ষষ্ঠ দিন – শ্রীনগর থেকে চলুন খিরসু, ৩৫ কিমি। হিমালয়ের দিগন্তবিস্তৃত শিখররাজির (তিনশোরও বেশি) জন্য খ্যাতি খিরসুর (১৭০০ মি)। রাত্রিবাস খিরসু।

সপ্তম দিন – খিরসু থেকে চলুন পৌড়ী (১৯ কিমি, ১৮১৪ মি)। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তে ত্রিশূল, হাতি পর্বত, নীলকণ্ঠ, কেদারনাথ, চৌখাম্বা, ভৃগুপন্থ, গঙ্গোত্রী গ্রুপ, বন্দরপুঞ্ছ ছাড়াও তুষারে মোড়া হিমালয়ের শিখররাজির শোভা দেখুন। দেখুন বাসস্ট্যান্ডে লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির, ২ কিমি দূরে ঘন জঙ্গলে কান্ডোলিয়া শিবমন্দির, ৩ কিমি পাহাড় চড়ে ৮ শতকের কঙ্কালেশ্বর শিব মন্দির। রাত্রিবাস পৌড়ী।

lansdowne
ল্যান্সডাউন।

অষ্টম দিন – চলুন ল্যান্সডাউন (১৭১৬ মি), ৮৬ কিমি। রাত্রিবাস ল্যান্সডাউন।

নবম দিন – আজও থাকুন ল্যান্সডাউনে। টিপ-এন-টপ পয়েন্ট থেকে দেখুন অসংখ্য গিরিশিরা। রমণীয় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত। আরও দেখুন দরওয়ান সিং মিউজিয়াম, ভুল্লা তাল, সেন্ট মেরি চার্চ, সেন্ট জন চার্চ, কালেশ্বর শিব মন্দির, শাকম্ভরী মন্দির, সেনাবাহিনীর দুর্গা মন্দির, ভীম পকোড়া, হাওয়া ঘর ইত্যাদি।

দশম দিন – ল্যান্সডাউন থেকে নাজিবাবাদ (৬৩ কিমি) বা হরিদ্বার (১০৬ কিমি) এসে সেখান থেকে ফেরার ট্রেন ধরতে পারেন। পথে সম্ভব হলে দেখে নিন কোটদ্বার থেকে ১৪ কিমি দূরে কণ্বাশ্রম, শকুন্তলার বড়ো হওয়ার জায়গা কণ্ব মুনির আশ্রম।

ভ্রমণ-ছক ৪:  গঙ্গোত্রী-বদরীনাথ

প্রথম দিন – হরিদ্বার থেকে চলুন উত্তরকাশী। দূরত্ব ১৮৫ কিমি। রাত্রিবাস উত্তরকাশী (১১৫৮ মি)।

দ্বিতীয় দিন – সকালে উত্তরকাশীর বিশ্বনাথ ও অন্যান্য মন্দির দেখে এবং ভাগীরথীর ধারে কেদারঘাট ঘুরে চলুন ভাগীরথী উপত্যকায় পাইন ও দেওদারে ছাওয়া অনুপম সৌন্দর্যের পাহাড়ি জনপদ হরসিল (২৬২০ মি), দূরত্ব ৭৫ কিমি। পথে দেখে নিন গাংনানির উষ্ণপ্রস্রবণ। রাত্রিবাস হরসিল।

gangotri
গঙ্গোত্রী।

তৃতীয় দিন – ঘুরে আসুন গঙ্গোত্রী (৩০৪২ মি), ২৫ কিমি। উপভোগ করুন গঙ্গোত্রীর নিসর্গ। মন্দির বন্ধ হলে ফিরে আসুন হরসিলে। রাত্রিবাস হরসিল।

চতুর্থ দিন – হরসিল থেকে চলুন অলকানন্দা তীরে শ্রীনগর (৫৭৯ মি), ২২১ কিমি। রাত্রিবাস শ্রীনগর।

পঞ্চম দিন – শ্রীনগর থেকে চলুন জোশীমঠ (১৮৭৫ মি), ১২৩ কিমি। দেখে নিন বাসস্ট্যান্ডের ১ কিমি নীচে নৃসিংহ মন্দির, বাসস্ট্যান্ডের উপরে শংকরাচার্য প্রতিষ্ঠিত জ্যোতির্মঠ। রাত্রিবাস জোশীমঠ।

ষষ্ঠ দিন – ভোরেই চলুন বদরীনাথ (৩১৫৫ মি), দূরত্ব ৪৬ কিমি। পথে পড়বে বিষ্ণুপ্রয়াগ, অলকানন্দা ও ধৌলিগঙ্গার সঙ্গম। শ্বেতশুভ্র নীলকণ্ঠ (৬৫৯৬ মি) মুকুট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বদরীনাথের শিরে। রাত্রিবাস বদরীনাথ।

badrinath
বদরীনাথ।

বদরীনাথে দেখে নিন- 

নীলকণ্ঠে সূর্যোদয়, দোকানপাটের মধ্যে দিয়ে নেমে ঝোলাপুলে অলকানন্দা পেরিয়ে বদরীনাথের মন্দির, সন্ধ্যায় দেখুন আরতি, চলুন মানা গ্রাম (তিব্বতের পথে শেষ বসতি, ৩ কিমি)। দেখে নিন ব্যাস গুহা, অলকানন্দা ও সরস্বতীর সঙ্গম কেশবপ্রয়াগ, সরস্বতীর ওপরে পাথরের ভীম পুল (এখান থেকে ৫ কিমি হেঁটে বসুধারা ফলস্‌, ১২২ মিটার উঁচু), চরণপাদুকা (জিএমভিএন ট্যুরিস্ট লজ থেকে ৩ কিমি হাঁটা, খুব চড়াই নয়। জনশ্রুতি, পাথরে বিষ্ণুর পায়ের চিহ্ন)।

সপ্তম দিন – বদরীনাথ থেকে আউলি (২৫১৯ মি), দূরত্ব ৫৬ কিমি। পুরোটা গাড়িতে যেতে পারেন, আবার জোশীমঠ থেকে কেবল কারেও ঘুরে আসতে পারেন। আউলিতে দেখুন দিগন্তবিস্তৃত হিমালয়ের শৃঙ্গরাজিশৃঙ্গরাজির মাথায় সূর্যাস্ত অতুলনীয়।

(কেবল কারেই চলুন। প্রথমে চলুন ১০ নম্বর টাওয়ার স্টেশনে, কেবল কার এতটাই আসে। এখানে নেমে গড়সন বুগিয়াল দেখে ফেরার পথে ৮ নম্বর টাওয়ার স্টেশনে নেমে সেখান থেকে চেয়ার কারে আউলি চলে আসুন। জোশীমঠে কেবল কার স্টেশনে টিকিট কাটার সময় আপনার প্ল্যান জানিয়ে দিলে সেইমতো ব্যবস্থা হয়ে যাবে। টিকিটে যাতায়াতের ভাড়া ধরা। ফেরার দিন জানিয়ে দেবেন। সঙ্গে গাড়ি থাকলে জোশীমঠে এক দিন রেখে দেবেন।)

on chair car, auli
চেয়ার কারে আউলি।

অষ্টম দিন – আজও থাকুন আউলিতে, উপভোগ করুন এর সৌন্দর্য, বিশ্রাম নিন।

নবম দিন – আউলি থেকে চলুন রুদ্রপ্রয়াগ (৬১০মি), অলকানন্দা-মন্দাকিনী সঙ্গম, ১২৪ কিমি। পথে দেখুন নন্দপ্রয়াগ (অলকানন্দা ও নন্দাকিনীর সঙ্গম) এবং কর্ণপ্রয়াগ (অলকানন্দা ও পিন্ডারগঙ্গার সঙ্গম)। বিকেলে ঘুরে নিন সঙ্গমের কাছে রুদ্রনাথ শিবমন্দির, জগদম্বা মন্দির, অন্নপূর্ণা মন্দির। রাত্রিবাস রুদ্রপ্রয়াগ।

দশম দিন– রুদ্রপ্রয়াগ থেকে হরিদ্বার, ১৬৪ কিমি। পথে দেখে নিন দেবপ্রয়াগ, অলকানন্দা ও ভাগীরথীর সঙ্গম। এখানেই অলকানন্দার যাত্রা শেষ। গঙ্গার পথ চলা শুরু। রাত্রিবাস হরিদ্বার।

একাদশ দিন – আজও থাকুন হরিদ্বারে। হরিদ্বারে দেখে নিন গঙ্গারতি, মনসা পাহাড়, চণ্ডী পাহাড়, কনখল ইত্যাদি। মনসা পাহাড়, চণ্ডী পাহাড় যাওয়ার জন্য রোপওয়ে-ও আছে।

দ্বাদশ দিন – বাড়ির পথে।

yamunotri
যমুনোত্রী।

ভ্রমণ-ছক ৫: প্রথাগত চারধাম যাত্রা

প্রথম দিন – হরিদ্বার থেকে জানকীচটি, ২২১ কিমি। রাত্রিবাস জানকীচটি।

দ্বিতীয় দিন – যমুনোত্রী (৩২৯১ মি) ঘুরে আসা। যাতায়াতে ১০ কিমি মতো হাঁটা। রাত্রিবাস জানকীচটি।

তৃতীয় দিন – সক্কালে যাত্রা করুন গঙ্গোত্রীর উদ্দেশে, ২২০ কিমি। রাত্রিবাস গঙ্গোত্রী

চতুর্থ দিন – আজও থাকুন গঙ্গোত্রীতে (৩০৪২ মি)। উপভোগ করুন ভাগীরথী ও কেদারগঙ্গার সঙ্গমে গঙ্গোত্রীর সৌন্দর্য।

পঞ্চম দিন – গঙ্গোত্রী থেকে উত্তরকাশী, ৯৫ কিমি। ঘোরাঘুরি। রাত্রিবাস উত্তরকাশী। (দেখুন ভ্রমণ-ছক ১, ষষ্ঠ দিন)

ষষ্ঠ দিন – চলুন গুপ্তকাশী, ১৯৪ কিমি। দেখে নিন বাসপথের কিছুটা উপরে কেদারের মন্দিরের আদলে তৈরি শিবমন্দির। রাত্রিবাস গুপ্তকাশী।

সপ্তম দিন – ভোরে বেরিয়ে গুপ্তকাশী থেকে শোনপ্রয়াগ (৩০ কিমি) পৌঁছে হাঁটা শুরু। ১০ কিমি হেঁটে রাত্রিবাস ভীমবলী (৮৭৩০ ফুট)। অথবা আরও ৬ কিমি এগিয়ে লিনচোলিতেও (১০৩৩০ ফুট) থাকতে পারেন।

kedarnath
কেদারনাথ।

অষ্টম দিন – ভীমবলী হলে ১০ কিমি হেঁটে অথবা লিনচোলি হলে ৪ কিমি হেঁটে কেদারনাথ (১১৭৫৫ ফুট)। রাত্রিবাস কেদারনাথ।

নবম দিন – কেদার থেকে হেঁটে শোনপ্রয়াগ আসুন (২০ কিমি), চলুন উখিমঠ (১৩১১ মি), ৪৪ কিমি। মন্দির দর্শন। রাত্রিবাস উখিমঠ।

দশম দিন – উখিমঠ থেকে চলুন জোশীমঠ, ১২৯ কিমি। রাত্রিবাস জোশীমঠ। (দেখুন ভ্রমণ-ছক ৪, পঞ্চম দিন)।

একাদশ দিন – চলুন বদরীনাথ। (দেখুন ভ্রমণ-ছক ৪, ষষ্ঠ দিন)।

দ্বাদশ দিন – বদরীনাথ থেকে পৌঁছে যান হরিদ্বার, ৩১৬ কিমি। রাত্রিবাস হরিদ্বার।

ত্রয়োদশ দিন – ঘরের পানে।

কী ভাবে যাবেন ও ফিরবেন

হাওড়া থেকে দেহরাদুন যাওয়ার জন্য সব থেকে ভালো ট্রেন উপাসনা এক্সপ্রেস। প্রতি মঙ্গল এবং শুক্রবার দুপুর ১টায় হাওড়া ছেড়ে দেহরাদুন পৌঁছোয় পরের দিন সন্ধ্যা ৬.১০-এ। রয়েছে দুন এক্সপ্রেস, প্রতিদিন রাত ৮.২৫ মিনিটে হাওড়া থেকে ছেড়ে দেহরাদুন পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল ৭.৩৫-এ।

দিল্লি থেকে দেহরাদুন আসার ট্রেন আছে পাঁচটা। এ ছাড়াও দেশের সব বড়ো শহরের সঙ্গেই ট্রেন যোগাযোগ আছে দেহরাদুনের। ট্রেনের অভাবে দিল্লি হয়ে দেহরাদুন আসাই ভালো।

বিমানেও দিল্লি এসে দেহরাদুন আসতে পারেন বিমানে। ট্রেনে, বাসে বা গাড়িতে। সড়ক পথে দিল্লি থেকে দেহরাদুন ২৫১ কিমি।

haridwar
হরিদ্বার।

হাওড়া থেকে হরিদ্বার যাওয়ার জন্য রয়েছে উপাসনা এক্সপ্রেস। প্রতি মঙ্গল এবং শুক্রবার দুপুর একটায় ছেড়ে হরিদ্বার পৌঁছোয় পরের দিন বিকেল ৩:৫০-এ। রয়েছে কুম্ভ এক্সপ্রেস, মঙ্গল এবং শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহে পাঁচ দিন দুপুর একটায় হাওড়া থেকে ছেড়ে হরিদ্বার পৌঁছোয় পরের দিন বিকেল ৪:৪০। রয়েছে দুন এক্সপ্রেসও। হাওড়া থেকে রাত ৮.২৫-এ ছেড়ে হরিদ্বার তৃতীয় দিন ভোর পৌনে ৫টায়।

দিল্লি হয়েও আসতে পারেন। হাওড়া থেকে রাজধানী বা দুরন্ত ধরে বা শিয়ালদহ থেকে রাজধানী বা দুরন্ত ধরে দ্বিতীয় দিন দিল্লি আসুন। দিল্লি থেকে হরিদ্বার ১৮০ কিমি। গাড়িতে আসতে পারেন, মুহুর্মুহু বাসও পাবেন।)

নাজিবাবাদ থেকে হাওড়া ফেরার জন্য রয়েছে দুন এক্সপ্রেস। রাত ১১:৪৫-এ ছেড়ে হাওড়া পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল ৬:৫৫-এ। রয়েছে অমৃতসর-হাওড়া মেল, রোজ রাত ২.৪৯-এ, হাওড়া পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল ৭.২০-তে। রয়েছে অকাল তখৎ এক্সপ্রেস। প্রতি মঙ্গল এবং শুক্রবার দুপুর ১:০৭-এ ছেড়ে কলকাতা স্টেশন পৌঁছোয় পরের দিন বিকেল ৩:১৫-এ। এ ছাড়া আছে ডাউন জম্মু তাওয়াই এক্সপ্রেস। প্রতিদিন সকাল ৮.০৩-এ ছেড়ে কলকাতা স্টেশন পৌঁছোয় পরের দিন বিকেল ৩:৫৫-এ। অমৃতসর-হাওড়া এক্সপ্রেস প্রতিদিন রাত ২.৩৩-এ ছেড়ে হাওড়া পৌঁছোয় তৃতীয় দিন বিকেল পৌনে ৪টেয়।

হরিদ্বার থেকে ফেরার ট্রেন। উপাসনা এক্সপ্রেস প্রতি বুধ এবং শনিবার রাত ১১:৫০-এ ছেড়ে, হাওড়া পৌঁছোয় তৃতীয় দিন ভোর ৩:১৫-এ। বাকি পাঁচদিন একই সময় রয়েছে কুম্ভ এক্সপ্রেস। দুন এক্সপ্রেস রোজ রাত্রি ১০.১০-এ ছেড়ে তৃতীয় দিন সকাল ৬.৫৫-য় হাওড়া। এ ছাড়াও দিল্লি হয়ে ফিরতে পারেন।

সারা দিনে হরিদ্বার থেকে দিল্লি আসার অনেক ট্রেন আছে। ট্রেনের মান অনুযায়ী সময় লাগে সাড়ে চার ঘণ্টা থেকে বারো ঘণ্টা। দেশের অন্য শহরের সঙ্গে হরিদ্বারের ট্রেন যোগাযোগ থাকলেও তা খুব সীমিত। তাই সে ক্ষেত্রে দিল্লি হয়ে যাতায়াত করাই ভালো।

ট্রেনের বিস্তারিত সময়ের জন্য দেখে নিন erail.in

tiger fall, chakrata
টাইগার ফল, চক্রাতা।
কী ভাবে ঘুরবেন

সব জায়গায় বাস পরিষেবা পাবেন। কিন্তু পাহাড়ি জায়গা, বাসের সংখ্যা কম। তার ওপর স্থানীয় মানুষের ভরসা বাসই। তাই মালপত্র নিয়ে বাসে যাওয়া কষ্টকর। শেয়ার গাড়িও মেলে কোনো কোনো জায়গায়, তবে সব জায়গায় নয়। তবে ভ্রমণের সময়সূচি অক্ষুণ্ণ রাখতে, একটু আরামে ঘুরতে গাড়ি ভাড়া করে নেওয়াই ভালো। সে ক্ষেত্রে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার জন্য গাড়ি ভাড়া করে সেখানে পৌঁছে স্থানীয় যান বা হেঁটে ঘোরা যেতে পারে। ভ্রমণ-ছক ২ ও ৩-এর ক্ষেত্রে এটা করা যেতেই পারে। আর বাকি তিনটি ছকের ক্ষেত্রে দেহরাদুন বা হরিদ্বার থেকে গাড়ি ভাড়া করে নেওয়া ভালো। হরিদ্বারে স্টেশনের কাছেই ট্যাক্সি ইউনিয়নের স্ট্যান্ড।

কোথায় থাকবেন

চক্রাতা ছাড়া সব জায়গাতেই রয়েছে গাড়োয়াল মণ্ডল বিকাশ নিগমের (জিএমভিএন) বিশ্রামাবাস। অনলাইন বুকিং gmvnl.in । তবে অনলাইনে বুক করার ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন পর্যটকরা। সে ক্ষেত্রে জিএমভিএনের বিভিন্ন অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। জিএমভিএনের কলকাতা অফিসের ঠিকানা- রুম নং- ২২৪, মার্শাল হাউস, ৩৩/১ এসএফ, নেতাজি সুভাষ রোড। ফোন- ২২৬১০৫৫৪।

চক্রাতায় থাকার জন্য অনেক বেসরকারি হোটেল রয়েছে, কিন্তু সব থেকে ভালো জায়গা হোটেল স্নো-ভিউ। যোগাযোগ- ৯৪১১৩৬৩২৩১, ৯৪১০৮২৩২০৭ । ওয়েবসাইট www.chakratasnowview.co  ইমেল- [email protected]

gmvn trh, khirsu
জিএমভিএন টুরিস্ট রেস্ট হাউস, খিরসু।

এ ছাড়া প্রায় সব জায়গাতেই বেসরকারি হোটেল রয়েছে। এদের সন্ধান পাবেন makemytrip, goibibo, trivago, cleartrip, holidayiq  ইত্যাদি ওয়েবসাইট থেকে।

মনে রাখবেন

(১) চক্রাতায় অনেক জায়গা আছে, যেখানে জিপই ভরসা।

(২) কেদারযাত্রীদের শোনপ্রয়াগ থেকে কেদার যাত্রার ছাড়পত্র সংগ্রহ করতে হবে।

(৩) ভীম পুল থেকে যদি বসুধারা ফলস্‌ যেতে চান, তা হলে একটা দিন বেশি থাকতে হবে বদরীনাথে। এমনিতেই হাতে সময় থাকলে বদরীনাথে থাকাটা দু’ দিন করলে ভালো।

(৪) ইচ্ছা করলে হরিদ্বারে একাধিক দিন থাকতে পারেন। গঙ্গার ধারে যদি থাকার জায়গা পান, তা হলে তার চেয়ে মনোরম আর কিছু হয় না।

 

0 Comments
Share