গন্তব্যদেশ

শীতে বারাণসী: আধ্যাত্মিকতা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের এক অনন্য অভিজ্ঞতা

ভ্রমণ অনলাইন ডেস্ক: ভারতের প্রাচীনতম জীবন্ত শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম বারাণসী। গঙ্গার তীরে অবস্থিত এই শহরটি শুধু ধর্মীয় গুরুত্বের জন্য নয়, তার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের জন্যও বিশ্ব জুড়ে বিখ্যাত। শীতকাল বারাণসী ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়, কারণ এই সময়ে আবহাওয়া মনোরম থাকে এবং তুলনামূলকভাবে ভিড়ও কম হয়। যারা আধ্যাত্মিক শান্তি, ঐতিহাসিক অনুসন্ধান ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার সন্ধানে আছেন, তাঁদের জন্য বারাণসী এক আদর্শ গন্তব্য।

শীতকালে বারাণসীতে গেলে যে পাঁচটি অভিজ্ঞতা অবশ্যই নেওয়া উচিত, সেগুলি নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হল।

দশাশ্বমেধে গঙ্গারতি দর্শন

বারাণসীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হল দশাশ্বমেধ ঘাটে অনুষ্ঠিত সন্ধ্যার গঙ্গা আরতি। প্রতিদিন সূর্যাস্তের সময় পুরোহিতদের সুশৃঙ্খল আচার-অনুষ্ঠান, শঙ্খধ্বনি, মন্ত্রোচ্চারণ এবং প্রদীপের আলো গঙ্গার বুকে এক অপূর্ব দৃশ্য সৃষ্টি করে। শীতের হালকা ঠান্ডা বাতাস ও কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ এই অভিজ্ঞতাকে আরও আবেগময় করে তোলে। এই আয়োজনে অংশগ্রহণ করলে আত্মিক প্রশান্তি ও এক অনির্বচনীয় অনুভূতি লাভ করা যায়।

নৌকায় বসে গঙ্গারতি দর্শন।

গঙ্গায় নৌকাভ্রমণ

শীতের সকালে গঙ্গায় নৌকাভ্রমণ বারাণসীর অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা। কুয়াশার চাদরে ঢাকা নদী, সূর্যোদয়ের সোনালি আভা এবং ঘাটগুলিতে মানুষের প্রাতঃকালীন পূজা-পাঠ এক রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করে। নৌকা ভেসে চলে বিভিন্ন ঘাটের পাশ দিয়ে, যেখানে দেখা যায় স্নানরত তীর্থযাত্রী, সাধু-সন্ন্যাসী ও প্রার্থনায় নিমগ্ন সাধারণ মানুষ। এই মুহূর্তগুলো বারাণসীর আত্মাকে অনুভব করার এক অনন্য সুযোগ এনে দেয়।

বিশ্বনাথ মন্দির দর্শন

ভগবান শিবের অন্যতম পবিত্র তীর্থস্থান কাশী বিশ্বনাথ মন্দির বারাণসীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। শীতকালে এখানে দর্শনার্থীদের জন্য পরিবেশ থাকে তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক। মন্দির চত্বরে ভক্তদের ভক্তিপূর্ণ আবেগ, ধূপ-ধুনোর সুবাস এবং ঘণ্টাধ্বনি মিলেমিশে এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করে। এই মন্দির দর্শন বহু ভক্তের কাছে জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। বিশেষ টিকিটে সকাল-সন্ধ্যায় আরতি ও রাজবেশ দেখার প্রথাও আছে।

বিশ্বনাথ মন্দির। ছবি উইকিপিডিয়া থেকে নেওয়া।

বারাণসীর অন্যান্য দ্রষ্টব্য দর্শন

বিশ্বনাথ মন্দির লাগোয়া উত্তরে জ্ঞানের কূপ জ্ঞানভাপী। বিশ্বনাথ মন্দিরের বিপরীতে গলিপথেই ১৭২৫-এ পেশোয়া বাজিরাও ১ম-এর তৈরি অন্নপূর্ণা মন্দির। মানমন্দির ঘাটের কাছে রাজা জয় সিংহের গড়া মানমন্দির তথা যন্তর মন্তর। বিশ্বনাথ মন্দির থেকে ৪ কিমি দূরে ১৮ শতকে বাংলার রানি ভবানীর তৈরি নাগারা শৈলীর দুর্গামন্দির অবশ্য দ্রষ্টব্য। কাছেই রামচরিত মানস স্রষ্টা তুলসীদাসের স্মৃতিতে ১৯৬৪-তে তৈরি শিখর-ধর্মী তুলসী মানস মন্দির। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে রয়েছে আর এক বিশ্বনাথ মন্দির।

বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিশ্বনাথ মন্দির।

সরু গলি ও স্থানীয় বাজারে হাঁটা

বারাণসীর সরু গলিপথ ও ঐতিহ্যবাহী বাজার ঘুরে দেখলে শহরের প্রকৃত রূপ ধরা পড়ে। এখানকার বাজারে বিখ্যাত বেনারসি সিল্ক, হস্তশিল্প, ধর্মীয় সামগ্রী ও নানা ধরনের স্মারক দ্রব্য পাওয়া যায়। শীতকালে এই গলিগুলোতে হেঁটে বেড়ানো বেশ আরামদায়ক। পথে পথে ছোট চায়ের দোকানে এক কাপ গরম মসলা চা পান করে স্থানীয় জীবনের স্বাদ নেওয়া এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। আর চায়ের সঙ্গে মেলে জিভে জল আনা লোভনীয় খাবারদাবার।

জিভে জল আনা খাবার — কচুরি-সবজি- জিলিপি ও লস্যি।

সারনাথ ভ্রমণ

বারাণসী থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সারনাথ বৌদ্ধ ধর্মের এক গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। এখানেই গৌতম বুদ্ধ প্রথম ধর্মোপদেশ দেন। শীতকালে মনোরম আবহাওয়ায় ধামেক স্তূপ, প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ এবং সারনাথ প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর ঘুরে দেখার সুযোগ বিশেষভাবে উপভোগ্য। শান্ত পরিবেশে ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধন সারনাথকে এক অনন্য গন্তব্যে পরিণত করেছে।

ধামেক স্তূপ, সারনাথ।

ঘুরে আসুন রামনগর

দশাশ্বমেধ ঘাট থেকে নৌকায় বা গোধুলিয়া থেকে বাসে, অটোয় বা নিজস্ব গাড়ি ভাড়া করে চলুন ১৮ কিমি দূরে রামনগর। দেখে নিন ১৭ শতকের কাশীর রাজবাড়ি, অস্ত্রাগার ও প্রাচীন সংগ্রহশালা। ১৮৭২-এ মূলচাঁদের তৈরি ঘড়িটিও অভিনব। ওই ঘড়িতে চন্দ্র-সূর্যের অবস্থান, দিনক্ষণ-সময়, সবই নির্ভুল মেলে আজও। আর রয়েছে রাজপরিবারের রুপোর পালকি, হাওদা, হাতির দাঁতের মাদুর ইত্যাদি। প্রাসাদের পিছনে গঙ্গাকিনারে রয়েছে রাজা জৈৎ সিংহ নির্মিত দুর্গামন্দিরটিও দেখার মতো।

কাশী-রামনগর পথে পড়ে ব্যাসকাশী। গঙ্গার পাড়ে ব্যাসদেবের মন্দিরে অষ্টধাতুর তিন মূর্তি – মাঝে ব্যাসদেব, দু’পাশে শুকদেব ও বিশ্বনাথ। মন্দিরে ২৫০ বছরের প্রাচীন ব্যাসদেবের একটি কল্পিত তৈলচিত্রও আছে।

শীতকালে বারাণসী ভ্রমণ মানেই ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য সমন্বয়। গঙ্গা আরতির আবেশ, ভোরের নৌকাভ্রমণের প্রশান্তি, মন্দিরের ভক্তিপূর্ণ পরিবেশ, সারনাথের শান্ত ধ্যানমগ্নতা এবং গলির কোলাহল—সব মিলিয়ে বারাণসী এমন এক অভিজ্ঞতা দেয়, যা জীবনে অন্তত একবার অবশ্যই গ্রহণ করা উচিত।

গঙ্গা থেকে রামনগর ফোর্ট তথা রাজবাড়ি।

কী ভাবে যাবেন

বারাণসীর মূল শহর থেকে ২২ কিমি দূরে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সঙ্গে বিমান সংযোগ রয়েছে বারাণসীর। গুগুল সার্চ করলেই বিমানের সময়সূচি পেয়ে যাবেন।

ট্রেনেও বারাণসী যুক্ত দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সঙ্গে। কলকাতা থেকে একাধিক ট্রেন রয়েছে বারাণসী যাওয়ার জন্য। সময় দেখে নিন erail.in থেকে। IRCTC-এর ওয়েবসাইটে গিয়ে টিকিট বুক করতে পারেন।

কলকাতা থেকে সড়কপথেও যেতে পারেন বারাণসী – দূরত্ব ৬৮৩ কিমি। সময় লাগে ১৪ ঘণ্টা মতো। নিজস্ব গাড়িতে যেতে পারেন। বাসেও যেতে পারেন। সব ধরনের বাস পাওয়া যায়। গুগুলে গিয়ে টিকিট বুক করতে পারেন।

কোথায় থাকবেন

বারাণসী থাকার জায়গার অভাব নেই। বারাণসী ও সারনাথে উত্তরপ্রদেশ পর্যটনের (UPSTDC) রাহী ট্যুরিস্ট বাংলো। বুকিং: upstdc.co.in/booking/HotelBooking।

এ ছাড়াও বিভিন্ন দামের ও মানের অসংখ্য হোটেল-রিসর্ট আছে। আছে ধর্মশালা এবং বিভিন্ন আশ্রমের অতিথি ভবন। গুগুল সন্ধান করলেই পেয়ে যাবেন পেয়ে যাবেন এর হদিস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *