Browsing Tag:Zuluk

the-mysterious-silk-route-part-nine-in-the-land-of-snow
sudip paul
সুদীপ পাল

পপকর্ন খেতে খেতে যাত্রা শুরু। কিছুটা যাওয়ার পর গতি মন্থর করে ভূপাল দেখাল – ওই দেখুন পুরোনো সিল্ক রুট।

অনেকগুলো ডব্লিউ-এর আকারে একটা সরু পথ নীচের দিকে নেমে গিয়েছে। দেখামাত্র একটা শিহরণ জাগল। এই সেই সিল্ক রুট! বিশ্বের প্রথম সুপার হাইওয়ে! এ যেন এক জীবন্ত ইতিহাস। এই সেই পথ যার মাধ্যমে সারা বিশ্বের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ হত এক সময়। চলত রেশম, ধাতু, অলংকার, কাপড়, সুগন্ধি দ্রব্য, মশলা, মূল্যবান পাথর প্রভৃতির ব্যবসা-বাণিজ্য। প্রায় ৬৫০০ কিমি এই পথ তিব্বতের রাজধানী লাসা হয়ে (অধুনা চিন) মধ্য এশিয়া চলে গিয়েছে।

আরও পড়ুন রহস্যময় রেশম পথ / পর্ব ৮ : জুলুকের উষ্ণ আপ্যায়ন

দ্বিতীয় খ্রিস্টপূর্বাব্দেও এই পথে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চলত। পরে ইউরোপ থেকেও মধ্য এশিয়া হয়ে বণিকরা আসত লাসায়। লাসা থেকে জেলেপ-লা দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে কুপুপ লেকের পাশ দিয়ে সোজা এই পথে জুলুক হয়ে ক্রমে সমতলে চলে আসত এবং সারা ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চালাত। যারা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে শ্রীলংকা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে চাইত তারা সিল্ক রুট দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে সোজা বঙ্গের তাম্রলিপ্ত বন্দর (অধুনা মেদিনীপুরের তমলুক) দিয়ে জাহাজে সমুদ্রযাত্রা করত।

junction of old and new silk route
পুরোনো ও নতুন রেশম পথের মিলন।

এ পথ শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ ছিল না। এই পথেই যেমন বিভিন্ন দেশের শিল্প-সংস্কৃতি ভারতে প্রবেশ করেছে তেমনই ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতি বিশ্বের দরবারে পৌঁছে গিয়েছে। এই পথেই গ্রিক শিল্পকলা ভারতে এসেছে। এই পথেই ভারত থেকে বৌদ্ধধর্ম বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতের গণিতশাস্ত্র ও বিজ্ঞান আরবে ছড়িয়ে পড়েছিল এই সিল্ক রুট ধরেই। চিনা পরিব্রাজক ফা-হি-য়েন এবং হিউ-এন সাং এ পথেই ভারতে এসেছিলেন। ভারত থেকেও এই পথে তিব্বত বা চিনে গিয়েছেন অতীশ দীপঙ্কর, শান্ত রক্ষিত, শরৎচন্দ্র দাস প্রমুখ পরিব্রাজক। এমনকি রাজা রামমোহন রায়ও  জেলেপ-লা দিয়ে তিব্বত যান।

near thambi view point
থাম্বি ভিউ পয়েন্টের কাছে।

ভারত-চিন যুদ্ধের আগে পর্যন্ত এ পথে ব্যবসা-বাণিজ্য চলত। যুদ্ধের পর এই পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখন অবশ্য এ পথ সক্রিয় করার জন্য ভারত-চিন ভাবনাচিন্তা চালাচ্ছে।

আমরা এগিয়ে চলেছি। কখনও মেঘ আমাদের গ্রাস করছে, আবার কখনও উগরে দিচ্ছে। গাড়িতে ভালো ভালো গান বাজছে, কিন্তু সে দিকে কারওর খেয়াল নেই। জোড়া জোড়া চোখ বন্ধ জানলার বাইরে পাড়ি দিয়েছে। থেকে থেকেই উল্লাসধ্বনি বেরিয়ে আসছে মুখ থেকে। বয়সকে সবাই যেন কখন ছুড়ে ফেলে দিয়েছে পাহাড়ের খাদে।

thambi view point
থাম্বি ভিউ পয়েন্ট।

থাম্বি ভিউ পয়েন্টে যখন গাড়ি থেকে নামলাম মনে হল ঠান্ডায় জমে যাব। চারিদিকে ঘন মেঘ বা কুয়াশায় ৫০ ফুট দূরও দৃশ্যমান নয়। থাম্বি ভিউ পয়েন্টের উচ্চতা ১১২০০ ফুট। এখান থেকে পরিষ্কার আকাশে সুন্দর নিসর্গ দেখা যায়, আমাদের কপাল মন্দ। আমরা ছাড়াও আরও দু’গাড়ি ট্যুরিস্ট এসেছে। চলছে ফটোসেশন। একটা হলুদ কংক্রিটের ফলকে কালো রং দিয়ে ‘থাম্বি ভিউ পয়েন্ট’ লেখা। এই ফলককে পাশে রেখে ছবি তোলারও উন্মাদনা রয়েছে। এখানে আসার প্রমাণ সবাই ছবিতে রাখতে চাইবে, সেটাই তো স্বাভাবিক।

rhodendron flower
আবার রডোডেনড্রন ফুল।

এখানে আবার রডোডেনড্রন ফুল। এ বারে সে রাঙা পোশাকে হাজির হলেও কালকের সেই রূপ আজ আর নেই। কেমন একটা লাবণ্যহীনতা গ্রাস করেছে। গাছে ফুটে থাকা ফুলগুলিকে দু’হাত দিয়ে স্পর্শ করলাম। বড় কোমল এ ফুল। রডোডেনড্রন ফুল থেকে টপ টপ করে ঝরে পড়ছে কুয়াশার জলরূপী অশ্রু, যার ছোঁয়া লাগল আমারও চোখে-মুখে।

playing with snow
বরফ নিয়ে খেলা।

মেঘের পর্দার ওড়াউড়ির ফাঁকে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম লক্ষ্মণচক। জায়গাটা নাথাং এলাকায়। একটা ক্যাফেটেরিয়া কাম গিফট শপের সামনে গাড়ি দাঁড়াল। এটি সিকিম পর্যটন দফতরের তৈরি। এখানে দাঁড়ানোর কারণ দু’টো – এক, এখানেই প্রথম বরফ দেখলাম। ক্যাফেটেরিয়ার চালে কাল রাতে যে বরফ পড়েছিল সেগুলো গড়িয়ে নীচে এসে জড়ো হয়েছে। সেই বরফ একটু ঘাঁটার সাধ হয়েছে। দুই, যদি কেউ গরম চায়ে একটু গলা ভেজাতে চায়। কিন্তু গরম চা বা কফিতে গলা না ভিজিয়ে সবাই বরফ ছোড়াছুড়িতেই ব্যস্ত হয়ে গেল। ক্যাফেটেরিয়ার পাশেই কর্নেল লক্ষ্মণ সিং-এর স্মৃতিসৌধ। তাঁর নামেই এই জায়গার নাম।

tukla valley
টুকলা ভ্যালি।

আবার যাত্রা। যত যাচ্ছি ততই বরফের পরিমাণ অল্প অল্প করে বাড়ছে। জানলার কাচ সামান্য নামিয়ে ফটো তুলছি, গ্লাভস পরা নেই, হাত যেন জমে যাচ্ছে। টুকলা ভ্যালিতে যখন এলাম চারিদিকে কুয়াশায় ভরে গিয়েছে। বরফের ঘনত্ব আরও বেড়েছে। রাস্তার উপরে বরফের পাতলা চাদর।

নাথাং ভ্যালি চলে এলাম। উচ্চতা ১৩১৪০ ফুট। ভিউ পয়েন্টে গাড়ি থামতেই নেমে পড়লাম। রাস্তা থেকে একটা ঢাল নীচে নামতে নামতে কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে গিয়েছে। এখানে বরফ আর কুয়াশা, উভয়েরই আধিক্য বেশি। হাতের সামনে বরফ পেয়ে খুশির অন্ত নেই। বরফে পা হড়কে যাচ্ছে। খুব সাবধানে হাঁটতে হচ্ছে।

gnathang valley view point
নাথাং ভ্যালি ভিউ পয়েন্ট।

গাড়িতে উঠে আবার যাত্রা। একটু এগিয়েই বাঁ দিকে কিছুটা নীচে বেশ কিছু বাড়ি দেখলাম। অনেকেই এখানে এসে রাত্রিযাপন করেন। সম্ভবত এগুলোই সেই সব হোমস্টে। রাস্তায় এখন ইঞ্চি ছয়েক পুরু বরফ। পৃথিবীর সব রং এখান থেকে মুছে গিয়েছে। প্রকৃতি শুধু সাদা আর কালো। এ রকম মনোক্রম প্রকৃতি আগে কখনও দেখিনি। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা।

আমরা এখন পুরোনো বাবামন্দিরের দিকে চলেছি। বরফের আধিক্যে বহু ট্যুরিস্ট গাড়ি ফিরে আসছে। গাড়িগুলিকে পাশ দিতে গিয়ে আমাদের গাড়িকে বারে বারে খাদের কিনারায় চলে যেতে হচ্ছে। এটা খুবই বিপজ্জনক। এই বরফে গাড়িতে ব্রেক মারলেও চাকা স্লিপ করে, ফলে গাড়ির উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এই ভয়েই অধিকাংশ ড্রাইভার ফিরে আসছে। অনেক ড্রাইভারই ইশারায় বা চেঁচিয়ে আমাদের ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিল। ভূপাল কাউকে পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে চলল।

– যাওয়া যাবে তো?

– দেখি না, যত দূর যাওয়া যাবে তত দূর যাব। আট বছর এই রুটে গাড়ি চালাচ্ছি, এদের আমি খুব ভালো করেই জানি। জবাব ভূপালের।

going back
গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে চলা।

কথা না বাড়িয়ে চুপ করে বসে রইলাম। চকলেট, পপকর্ন দিয়ে সবাই মুখ চালাতে লাগল।  কিছু দূর যাওয়ার পর দাঁড়িয়ে পড়তে হল। একটা গাড়ি ফেঁসে গিয়েছে ইউ টার্ন করতে গিয়ে। ঠেলেও গাড়িটাকে নড়ানো যাচ্ছে না। দু’ জন জওয়ানও হাত লাগিয়েছেন। গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। মাটিতে পা দিতেই পুরো জুতোটাই বরফে ঢুকে গেল। অবশেষে সেই গাড়ি ঘুরল। আমরা এগোলাম, আমাদের সঙ্গে এখন আর একটাই গাড়ি। একটা মাইলস্টোন দেখলাম, লেখা কুপুপ ৬ কিমি। ভূপাল জানাল, পুরোনো বাবামন্দির আসতে সামান্যই বাকি।

১০ মিনিট বাদেই চলে এলাম বাবামন্দির। ট্যুরিস্ট বেশি নেই। আমাদের গাড়ি ছাড়া আর গোটা তিনেক গাড়ি। আমাদের সঙ্গে যে গাড়িটা আসছিল সেটাও আছে। পরে জেনেছিলাম ওই গাড়ির সওয়ার পাঁচ বান্ধবী, সিল্ক রুট বেড়াতে এসেছে।

area of old babamandir
বাবা মন্দিরের চারপাশ।

বাবামন্দিরে পিতলের সিংহাসনে বাবা হরভজন সিং-এর একটি মূর্তি ও একটা ফটো রাখা আছে। এ ছাড়াও আরও কিছু ঠাকুর-দেবতার ফটো রাখা আছে এবং শিখ, খ্রিস্টান ও মুসলিমদের কিছু ধর্মীয় ছবিও রাখা আছে।

হরভজন সিং ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর পঞ্জাব রেজিমেন্টের এক জওয়ান। ঠিক এই জায়গাতেই ছিল তাঁর বাঙ্কার। ১৯৬৮ সালে সিকিমে এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে। প্রবল বৃষ্টিতে বন্যা দেখা দেয়। বহু জায়গায় ধস নামে। কয়েকশো মানুষ প্রাণ হারান। ভারতীয় সেনাবাহিনী স্বাভাবিক ভাবেই উদ্ধারকাজে হাত লাগায়। ১৯৬৮ সালের ৪ অক্টোবর হরভজন সিং টুকলাদাড়া কিছু মানুষকে উদ্ধার করে ব্যাটেলিয়ানের হেড কোয়ার্টার ছোঙ্গুচুইলায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথে পা পিছলেই হোক বা জলের তোড়েই হোক তিনি এক খরস্রোতা নালায় পড়ে যান। জোরদার তল্লাশি চালিয়েও সেনাবাহিনী তাঁর দেহ খুঁজে পায় না। অবশেষে পাঁচ দিন পর তাঁর এক সহকর্মীকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে তিনি তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে বলেন। তাঁর দেহ কোন জায়গায় আছে তা-ও বলেন। পরে সেই জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে তাঁর দেহ উদ্ধার হয়।

এর পর তাঁর সহকর্মীরা ছোঙ্গুচুইলায় অর্থাৎ এই স্থানে তাঁর একটি মন্দির তৈরি করেন। শোনা যায় হরভজন সিং-এর আত্মা এখনও এখানে বিরাজমান। বিপদে পড়লে অনেককেই তিনি উদ্ধার করেছেন। ডিউটিরত অবস্থায় ঘুমিয়ে যাওয়ার কারণে বা কর্তব্যে ঢিলে দেওয়ার কারণে অনেক জওয়ানই তাঁর অদৃশ্য হাতের চড় খেয়েছেন।

babaji ki bunker
বাবাজির বাঙ্কার।

মন্দিরের পাশেই হরভজন সিং-এর বাঙ্কারের সিঁড়ি। জুতো খুলে রেখে সেনাবাহিনীর রেখে দেওয়া হাওয়াই চপ্পল পরে যেতে হবে। আর কেউ যাবে না, আমি একাই চললাম। ভূপাল তাড়াতাড়ি আসতে বলল। আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করেছে। বরফ পড়া শুরু হলে ভীষণ বিপদ হয়ে যাবে। ৩০/৩৫টা সিঁড়ি দৌড়ে উঠে। উপরে ছোটো ছোটো তিনটে ঘরে হরভজন সিং-এর ব্যবহৃত জিনিসপত্র রাখা। প্রসঙ্গত বলি, হরভজন সিংকে এখনও সেনাবাহিনীর একজন মনে করা হয়। প্রতি বছর তাঁর জন্য পোশাক ও অন্যান্য জিনিস বরাদ্দ হয়। মিটিং-এ তাঁর জন্য একটা চেয়ার ফাঁকা থাকে। ওই চেয়ারে তাঁর ফটো রাখা থাকে।

মন্দিরের সামনেই একটা স্টিলের গুমটি। তার ভিতরে এক গামলা কিশমিশ রাখা। বাবা হরভজন সিং-এর প্রসাদ। কাছে যেতেই এক জওয়ান আমায় একমুঠো কিশমিশ দিয়ে দিলেন। কিশমিশ গুলো খেতে খেতে গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। টিপটিপ করে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। (চলবে)

ছবি লেখক

0 Comments
Share
the-mysterious-silk-route-part-8-the-warm-reception-at-zuluk
sudip paul
সুদীপ পাল

হোমস্টের বৃদ্ধ মালিকের তত্ত্বাবধানে ভূপাল গাড়ির ছাদ থেকে মালপত্র নামিয়ে দিল। আমরা সেগুলো দু’টো ঘরে নিয়ে এসে রাখলাম। টিনের চাল, টিনের দেওয়াল। ঘরের ভিতরটা প্লাইউড দেওয়া থাকলেও এই স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় ঠান্ডা যেন কামড়ে দিচ্ছে। বিকেলেই এই অবস্থা! রাতে কী হবে ভগবান জানে।

গৃহকর্তা আমাদের হাত-মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে আসতে বললেন। অরূপদা ঠান্ডায় বেশ কাবু হয়ে পড়েছে। তবে যতটা কাবু হয়েছে তার থেকে বেশি আতঙ্কিত। যা-ই হোক, দু’টো ঘরে দু’খানা রুমহিটার জ্বালানো হয়েছে। ১৫০ টাকা করে এক একটার ভাড়া।

খাবার টেবিলে কথাবার্তা চলছে। অবেলা হয়ে গেলেও আমরা অল্প করে ডিমের ঝোল, ভাতই খাচ্ছি। এ ছাড়া কোনো উপায় নেই। রূপের আবার জ্বর আসছে। ওকে নিয়ে খুব চিন্তায় আছি।

রূপের জ্বরের খবর শুনে গৃহকর্তা আশ্বস্ত করলেন। বিকেলে এখানকার মিলিটারি ট্রানজিট ক্যাম্পে ডাক্তারবাবু বসেন। সেখানে নিয়ে যাবেন বললেন। এক জন ভালো ডাক্তার দেখানো যাবে জেনে একটু আশ্বস্ত হলাম।

rows of pine trees
পাইনের সারি।

টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তায় নেমে পড়লাম। আমাদের সামনে বিশাল এক পর্বত দেওয়ালের মতো দাঁড়িয়ে। পাহাড়ের মাথাটা মেঘের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে। তার ফলে পাহাড়টা ঠিক কত উঁচু বুঝতে পারলাম না। সন্ধের মুখে এখনও ট্যুরিস্টবোঝাই গাড়ি ওই পাহাড়ে উঠছে। ওরা এই পথে নাথাং ভ্যালি যাচ্ছে। ওখানেই রাত কাটাবে। এখান থেকে নাথাং পৌঁছোতে আরও প্রায় ৩ ঘণ্টা সময় লাগবে। আকাশের এই অবস্থায় ওই উচ্চতায় পাহাড়ের বুকে অন্ধকারে গাড়ি চালানো! সত্যিই বড়ো দুঃসাহস এঁদের। কাল ভোরবেলা আমরাও ওই পথে যাত্রা করব।

জুলুক আসলে একটি কুলিবস্তি ছিল। এখানকার বাসিন্দারা সেনাবাহিনীর মালপত্র পৌঁছে দেওয়া, ফাইফরমাশ খাটা ও রাস্তা সারাইয়ের কাজ করত। এখনও অনেক বাসিন্দাই এ সব কাজই করে। আমরা যে হোমস্টেতে আছি তার মালিক গাড়ি করে সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে সবজি ও অন্যান্য জিনিস পৌঁছে দিতেন এবং মালকিন রাস্তা সারাইয়ের কাজ করতেন। এখন বার্ধক্যের কারণে সে সব কাজ ছেড়ে হোমস্টে খুলেছেন। ওঁদের ছেলে এখন ট্যুরিস্ট গাড়ি চালায়। শুনলাম সে-ও ট্যুরিস্ট নিয়ে এসেছে এখানে। বাড়িতেই আছে এখন, যদিও তার দেখা পাইনি আমরা।

আরও পড়ুন রহস্যময় রেশম পথ / পর্ব ৭ : অবশেষে জুলুক

৯০০০ ফুট উচ্চতা থেকে জুলুক শুরু হয়ে ১১৫০০ ফুটে গিয়ে শেষ হয়েছে। জুলুকের  দু’টো অংশ – আপার জুলুক ও লোয়ার জুলুক। ট্যুরিস্টরা সব লোয়ার জুলুকেই থাকে। আপার জুলুকে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। একটা মন্দির আছে সেখানে। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি। ঘণ্টার আওয়াজও কানে আসছে। ওখানেও এক চক্কর দেব ভাবলাম। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। অগত্যা আবার হোমস্টের চার দেওয়ালের মধ্যে সেঁধিয়ে গেলাম। অরূপদার বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলের নখ মাংসের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে। বেচারা ঠিকমতো হাঁটতে পারছে না। যন্ত্রণা হচ্ছে। অরূপদাও মিলিটারি ক্যাম্পে ডাক্তার দেখাতে যাবে।

কিছুক্ষণ পরেই হালকা বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ট্রানজিট ক্যাম্প আরও উপর দিকে। পাঁচ মিনিটের রাস্তা। ট্রানজিট ক্যাম্পের গেটে জওয়ানরা আমাদের এখানে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। কারণ জানানোর পর অভ্যর্থনা করে নিয়ে গিয়ে বসালেন। এর আগেও আমি ট্যুরিস্ট হিসাবে সেনাক্যাম্পে গিয়েছি, ওঁদের ব্যবহার সত্যিই মন ছুঁয়ে যায়।

আমাদের নাম-ঠিকানা লিখে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর দু’জন মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট এসে সব জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। তাঁরা অরূপদার পায়ের বুড়ো আঙুল পরীক্ষা করলেন। ডাক্তার আসার আগেই ওই দুই অ্যাসিস্ট্যান্ট পাশের ঘরে অরূপদাকে নিয়ে গিয়ে তাঁর চেঁচামেচির মধ্যেই নখ কেটে মাংস থেকে বের করে দিয়ে ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলেন।

একটু পরে মহিলা ডাক্তার এলেন। রূপকে দেখে জানতে চাইলেন কী হয়েছে। রূপকে কী ওষুধ খাইয়েছি সব বললাম। উনি ওগুলোই চালু রাখতে বললেন, সঙ্গে পেটে ইনফেকশনের একটা সিরাপ দিয়ে দিলেন।

Zuluk Basti
এক ঝলক জুলুক।

সন্ধ্যায় অরূপদার ঘরে আড্ডা চলছে। আমারও কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে। নিঃশ্বাসও খুব সাবলীল লাগছে না। সবটাই উচ্চতাজনিত কারণে। কাল অনেক উপরে উঠব তাই একটু চিন্তায় আছি। একটু কোকা ৩০ খেয়ে নিলাম। রাত আটটায় খাবার টেবিলে চলে গেলাম। লোহার টেবিল, নীচে আগুন জ্বলছে। বেশ আরামদায়ক ব্যাপার।

গল্প করতে করতে খাচ্ছি। গৃহকর্তা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে খাবারের তদারকি করছেন। এই ট্যুরে এই প্রথম হোমস্টের এতটা উষ্ণ আপ্যায়ন পেলাম। মালিকের একটি কন্যাসন্তান আছে। কালিম্পং-এ বিয়ে হয়েছে। এ সব এলাকায় বিয়ের পাত্র হিসাবে ড্রাইভার ছেলের ভীষণ কদর। গাড়ি চালিয়ে তারা প্রচুর উপার্জন করে। একটা গাড়ির উপার্জন থেকে অনেকেই অনেক গাড়ি কিনেছে। অনেকে আবার হোমস্টে, হোটেল পর্যন্ত করে ফেলে।

খাওয়া শেষ করে উঠে পড়লাম। বাইরে তখন মুষলধারায় বৃষ্টি। কনকনে ঠান্ডা। কাল যত সকালে সম্ভব বেরিয়ে পড়তে হবে।

জুলুক ভিউ পয়েন্টে

সারা রাত তুমুল বৃষ্টি হল। বার বার বৃষ্টির আওয়াজে ঘুম ভেঙেছে। যত বার ঘুম ভেঙেছে তত বার জানলার পর্দা সরিয়ে দেখেছি বরফ পড়ছে কিনা। দাম্পত্যজীবনে কখনও কখনও মাথায় বরফ চাপা দিয়ে রাখলেও জীবনে কখনও বরফ পড়া দেখিনি। সকালে দরজা খুলে বাইরে উঁকি মেরেও বরফের চিহ্ন খুঁজে পেলাম না। প্রকৃতি এ যাত্রা বেইমানি করল।

কনকনে ঠান্ডায় হাত-পা পেটে সেঁধিয়ে যাওয়ার দশা। বাড়ির মালিক গরম জলের ব্যবস্থা করে দিলেন। ওই জলের উপর ভরসা করেই আমাদের প্রস্তুতি চলতে লাগল।

তৈরি হয়ে খাবারঘরে চলে এলাম সবাই। টেবিলের তলায় হালকা আগুন করা আছে। চলে এল অরূপদার প্রেসক্রাইব করা গরম গরম রেসিপি। নর সুপের মধ্যে ম্যাগি দিয়ে রান্না করা খাবার। ম্যাগি সুপ নাম দেওয়া যেতে পারে। এক চামচ মুখে দিয়েই আঁতকে উঠলাম। এমন বাজে স্বাদের খাবার আমি জীবনে কখনও খেয়েছি কিনা মনে করার চেষ্টা করলাম। অরূপদা খাবারটা একবার নাড়ছে আর ট্যাবলেট খাওয়ার মতো কোঁত করে গিলে নিচ্ছে। বাকিদেরও মুখ সিঁটকে আছে। এ বার নিজের খাবারের দিকে তাকিয়ে বললাম, খাবারটা দারুণ হয়েছে। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত, তার পরেই হাসিতে ঘর ভরে গেল।

এত উচ্চতায় জার্নির জন্য সহজপাচ্য খাবার খাওয়াই উচিত। সে দিক থেকে দেখলে আজকের জার্নির উপযুক্ত খাবারই খাচ্ছি। বিস্বাদকে সুস্বাদে ফেরাতে বেশ করে টোম্যাটো সস ঢাললাম। আমার দেখাদেখি বাকিরাও তা-ই করল।

white rhododendron
সাদা রডোডেনড্রন।

সকাল ৮টা। আবার যাত্রা। সামনের ওই উঁচু পাহাড়টা আমাদের পেরিয়ে যেতে হবে। পাহাড়ের গায়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে আমাদের চলার পথ। আকাশ এখনও মেঘলা। জায়গায় জায়গায় ঘন কুয়াশা। হঠাৎ ভূপাল গাড়ি থামিয়ে বলল, ওই দেখুন সাদা রডোডেনড্রন। গাড়ি থেকে নেমে ছবি তুললাম। কাল যে লাল রডোডেনড্রন দেখেছিলাম, তার রূপের কাছে এ কিছুই নয়।

এগিয়ে চলেছি। যত এগোচ্ছি ততই মেঘেরা ঘিরে ধরছে। যেন কী একটা আক্রোশে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। পাহাড়শ্রেণির অজানা কোনো গহীন অন্তরাল থেকে তারা দলে দলে ছুটে এসে আমাদের ঘিরে ফেলছে। এরই মাঝে মেঘেদের ফাঁক দিয়ে দূরে অনেক নীচে দেখা গেল আমাদের কাল রাতের আস্তানা। উড়ন্ত ঈগল পাখির চোখে জুলুক কেমন দেখায় তা কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি। সবুজ জুলুক যেন সাদা মেঘের মুকুট পরে আছে। আমাদের ফেলে আসা অর্ধচন্দ্রাকার পথগুলো মনে হচ্ছে তার গলায় ঝুলন্ত মালা।

পাহাড়ের গায়ে শুধুই ঘাস জাতীয় গাছ। মাঝে মাঝে দু-একটা পাইন মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। এক সময় এসে পৌঁছোলাম জুলুক ভিউ পয়েন্টে। উচ্চতা ১০৪৫০ ফুট। এখান থেকে অনেক নীচে জুলুককে বড়ো সুন্দর দেখায়।

Zuluk View Point
জুলুক ভিউ পয়েন্ট।

গাড়ি থেকে নেমে কাঙালের মতো এ-দিক ও-দিক করছি যদি হঠাৎ মেঘ সরে গিয়ে প্রকৃতির দর্শন পাওয়া যায়। আমরা ক’জন ছাড়া এখানে আর এক জনও ট্যুরিস্ট নেই। এখান থেকে ভালো সানরাইজ দেখা যায়, কিন্তু মেঘই বাধা। “বাবুজি খুলজা সিম সিম বলিয়ে। মেঘ ক্লিয়ার হো জায়েগা।” ভূপালের কথায় হেসে ফেললাম। ওর কথা শুনে মৌসুমী চিৎকার জুড়ে দিল, “খুল যা সিম সিম।”

পাশেই বাঁশ ও টিন দিয়ে তৈরি এখানকার একমাত্র দোকানঘরটিতে হাজির হলাম। খানকয়েক পপকর্নের প্যাকেট কিনলাম। পপকর্ন শুধু যে পেট ভরায় তা নয়, এটি উচ্চতাজনিত কারণে শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যা থেকে রক্ষা করে।

দাম মিটিয়ে দুই দোকানির সঙ্গে গল্প জুড়ে দিলাম। ভোরবেলা নাথাংগামী কোনো গাড়িতে করে ওরা এখানে চলে আসে। সারা দিন বেচাকেনা করে বিকেলে ফিরে যায় লোয়ার জুলুক। বড়ো কষ্টের জীবন ওঁদের কিন্তু মুখের হাসিটি বড়ই স্বতঃস্ফূর্ত।

সবাইকে এ বার ডেকে নিলাম। যেতে হবে অনেক দূর। জুলুক থেকে নাথাং, কুপুপ হয়ে গ্যাংটক – ৯৩ কিমি রাস্তা। পথের উচ্চতা আরও বাড়বে। বেলা বাড়লে আবহাওয়া খারাপ হয় এই উচ্চতায়। এক বার আবহাওয়া খারাপ হলে বিপদে পড়তে হতে পারে। (চলবে)

ছবি: লেখক

 

0 Comments
Share
the-mysterious-silk-route-part-7-at-last-reached-zuluk
sudip paul
সুদীপ পাল

নিমাচেনে একটা ঝরনা আছে। নাম কিউখোলা ফল্‌স। এ পথের যাত্রীদের কাছে খুবই পরিচিত ঝরনা। ঝরনার কাছেই আমাদের গাড়ি দাঁড়াল। ১৫ ফুট উপর থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে জল নেমে আসছে। তবে শিস্নের ভুতখোলা ফলসের মতো অত জল নেই। সে অর্থে কিউখোলা ফলস দরিদ্রই বলা যায়। পাশেই বাঁ দিক থেকে একটা জলধারা এসে সমগ্র জায়গাটা জলময় করে রেখেছে। এই জল আন্ডারপাসের মাধ্যমে রাস্তার এ পার থেকে ও পারে গিয়ে কোন অজানার উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছে কে জানে?

ঝরনার পাশে একটা বছর পাঁচেকের শিশু জানি না কীসের খুশিতে আপন মনে হাততালি দিচ্ছে আর লাফাচ্ছে। এই বয়সটাই এমন, কারণে অকারণে মন খুশিতে ভরে যায়। এই শিশুদের কাছে বাস্তবের কোনো গুরুত্ব নেই। বাস্তবকে ছাপিয়ে যায় কল্পনার রং। হয়তো সে স্পাইডারম্যান হয়ে ঝরনার মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে উপরে উঠছে। কিংবা মাছ হয়ে সামনের জলে সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে। কল্পনার রাজ্যে তার অবাধ বিচরণ। আমরা বড়োরা শিশুদের এই কল্পনার রাজ্যে কোনো ভাবেই আর প্রবেশ করতে পারব না। আমাদের ছেলে রূপের বয়সও পাঁচ। তার ড্রইং খাতায় মাঝে মাঝেই কল্পনাশক্তির পরিচয় পাই। হয়তো এরা কী  দেখছে সে সব কয়েক সপ্তাহেই ভুলে যাবে। আকাশের মেঘের মতো সব কিছুই এদের কাছে ক্ষণস্থায়ী হলেও সব কিছুই রামধনুর মতো বর্ণময়।

que khola falls
কিউখোলা ফল্‌স।

আধ ঘণ্টা সময়  এখানে কাটিয়ে কিছু ছবি তুলে গাড়িতে ফিরে এলাম। রাস্তার ও পাশে ফুড কর্নারে ভূপাল কিছু খাওয়াদাওয়া করছে। দুপুর একটা। খিদে পাওয়ারই কথা। আমরাও ভূপালকে দেখে ড্রাই ফুডের প্যাকেট খুলে মুখ চালানো শুরু করলাম। কিছুক্ষণ বাদে ভূপাল ফিরে আসতেই আবার পথ চলা শুরু।

উচ্চতা যে বাড়ছে, গাছপালা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। এর মধ্যে আবার কুয়াশার উৎপাত। এমনিতেই পাহাড়ে বেলা বারোটার পর থেকেই আবহাওয়া খারাপ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে, তার উপর মেঘলা থাকলে তো কথাই নেই।

pamgolakha checkpost
প্যাঙ্গোলাখা চেকপোস্ট।

চলতে চলতে এক সময় গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। আশেপাশে দু’ চারটে বাড়ি দেখতে পাচ্ছি। রাস্তার ডান দিকে একটা সাদা রঙের ঘর। ঘরের দেওয়ালে লেখা আছে ‘প্যাঙ্গোলাখা চেকপোস্ট’। ঘরের পাশে সবুজ রঙের একটা বোর্ডে সাদা রং দিয়ে লেখা ‘ফরেস্ট চেক পয়েন্ট’।

আসলে এখান থেকে শুরু করে ছাঙ্গু লেক পর্যন্ত পুরো এলাকাটাই প্যাঙ্গোলাখা ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি। এখানে সিকিমের রাজ্য পাখি মোনাল তো আছেই এ ছাড়াও সিকিমের রাজ্য পশু রেড পান্ডা , হিমালয়ান মাস্ক ডিয়ার, লেপার্ড, গাউর, ফ্লাইং স্কুইরেল, হিমালয়ান ব্ল্যাক বিয়ার, বুনো শুয়োর, জংলী কুকুর প্রভৃতি আছে। ২০০২ সালে সিকিম সরকার ১২৮ বর্গ কিমির এই জঙ্গল এলাকাকে অভয়ারণ্য হিসাবে ঘোষণা করে। ১৩২০ মিটার উচ্চতা থেকে শুরু করে ৪৬০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত এর বিস্তৃতি।

আরও পড়ুন: রহস্যময় রেশম পথ / পর্ব ৬ : অরিটার হয়ে রংলি ছুঁয়ে জুলুকের পথে

গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। বেশ ঠান্ডা। যে হেতু অভয়ারণ্যে প্রবেশ করছি তাই একটা প্রবেশ মুল্য দিতে হবে। ভূপাল টাকা নিয়ে সাদা ঘরে চলে গেল। আমিও ক্যামেরা নিয়ে রেডি। মিনিট পাঁচেক পরেই শুনি ভূপাল ডাকছে। দুর বাবা, এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল! এখনও তো গাছের ফাঁক দিয়ে কোনো পান্ডা বা ভাল্লুক উঁকি মারছে কিনা তার সন্ধান করা হল না। নীচের দিকে কোনো মাস্ক ডিয়ার ঘাসপাতা চিবাতেও তো পারে। কি আর করব? অগত্যা আবার গাড়িতে গিয়ে বসলাম। আবার চলা শুরু।

towards Zuluk
জুলুকের পথে প্রকৃতির সাথে।

রাস্তার দু’ ধারে কুয়াশায় ঢাকা পাইন গাছের সারি। গাছের ডাল থেকে টপ টপ জল ঝরে পড়ছে। মাঝে মাঝে বৌদ্ধদের রঙবেরঙের প্রেয়ার ফ্ল্যাগ। দূরের পাহাড়গুলো থেকে সাদা মেঘেরা গুঁড়ি মেরে উপরে উঠে আসছে। পথের পাশে আর খাদ দেখা যাচ্ছে না। সমস্ত খাদ কেউ মেঘ ঢেলে ভর্তি করে দিয়েছে। আচমকা চোখে পড়ল লাল থোকা থোকা ফুল ফুটে আছে সামনের একটা গাছে। ভূপাল বলে উঠল, “ওই দেখুন রডোডেনড্রন।“

রডোডেনড্রন! আমার এই সময় এখানে আসার মূল কারণ দু’টি – এক, রডোডেনড্রন ফুল দেখা। এই সময়ই ফোটে এই ফুল। রডোডেনড্রন সিকিমের রাজ্য ফুল। আর দুই, বরফ দেখা, যার দর্শন হয়তো জুলুকের পর থেকে পাব।

“গাড়ি দাঁড় করাও, আমি নামব”, উত্তেজিত ভাবে বলে উঠলাম। আমার স্বপ্নের ফুল। কত ইচ্ছা ছিল রডোডেনড্রন ফুল দেখবো। আজ এই ফুল আমার সামনে! নিজের চোখে দেখেও যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। জীবনে প্রথম দেখছি রডোডেনড্রন ফুল। এর উজ্জ্বল লাল রং দেখে আমি মুগ্ধ।  হিংসুটে কুয়াশা শত চেষ্টা করেও এর রংকে চাপা দিতে পারেনি। কুয়াশা ভেদ করে ফুটে বেরোচ্ছে এর রূপ।

rhododendron flower 1
কুয়াশা মাখা রডোডেনড্রন।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দু’ চোখ ভরে দেখছিলাম রডোডেনড্রন ফুল। সম্বিত ফিরল ভূপালের ডাকে – “চলে আসুন। অনেকটা পথ যেতে হবে। সামনে আরও গাছ আছে, একটা ভালো জায়গা দেখে আবার দাঁড়াব।“

ঝরে পড়া কয়েকটা রডোডেনড্রন ফুল কুড়িয়ে নিয়ে ফিরে এলাম গাড়িতে। আবার পথ চলা শুরু। কিছুক্ষণ পরে মেঘ থেকে বেরিয়ে এলাম। পাইন গাছও আমাদের সঙ্গ ত্যাগ করেছে। এখন রাস্তার দু’পাশে শুধু ঘাস, আখের মতো সরু সরু বাঁশ গাছের ঝাড় আর গুল্মরাজি। পাহাড়ের খাদ তুলোর মতো সাদা মেঘে পরিপূর্ণ। এমন সময় আবার তার দর্শন পেলাম। এ বার ভুপাল নিজেই গাড়ি থামাল। এক গাল হেসে বলল, “এ বার নেমে দেখুন।”

দুমদাম সপার্ষদ গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। যেন নন্দন কাননে এসেছি। কানে যেন বেজে উঠল খিল খিল হাসি। পিছন ঘুরে দেখি রডোডেনড্রন ফুল আমার দিকে তাকিয়ে যেন হাসছে। কোন দিক দেখি? বাঁ দিকে রডোডেনড্রন ফুল আর ডান দিকে নিসর্গ। আমি তালকানা হয়ে গেছি।

rhododendron
মন ভরাল রডোডেনড্রন।

রডোডেনড্রনের সঙ্গে মনে মনে আমার অনেক কথা হল। আমার অবস্থা দেখে মনে হল ও যেন হাসছে। রডোডেনড্রন দেখার জন্য আমার এত বছরের অপেক্ষা আজ সার্থক হল। কিন্তু মেঘগুলো এমন উৎপাত করছে যে ভালো করে দেখা হচ্ছে না তাকে। কিন্তু আমি তো পথিক, আমায় তো এগোতেই হবে। কিন্তু তার আগে কিছু ভালো ছবি চাই তার।

কিন্তু ভালো ছবি পেতে হলে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে হবে যে। চেষ্টা করলাম, পারলাম না। আমার আকুলতা দেখে ভুপাল এগিয়ে এসে কী ভাবে উঠতে হবে দেখিয়ে দিল। ব্যাস আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তরতরিয়ে উঠে গেলাম ফুট দশেক উপরে। রডোডেনড্রন ফুল এল আরও কাছে। স্পর্শ করলাম, ছবি তুললাম। বললাম, এ বার আমায় যেতে হবে।

রডোডেনড্রন তো যেতে দিতে চায় না। সে যেন চায় রাতের আঁধারে চাঁদের আলোয় নীল আকাশের চাঁদোয়ার নীচে মেঘের বিছানায় রাত কাটিয়ে দিই।

না লাল রূপসী। এ বার আমায় যেতেই হবে। আবার দেখা হবে একদিন।

অরূপদা ডাকাডাকি করছে। ঘোর কাটিয়ে নীচে নেমে আবার গাড়িতে গিয়ে বসলাম। ইচ্ছা করছে এখানেই থাকি আজকের রাতটা। কিন্তু বাস্তব বড়ো কঠিন ঠাই। সেখানে ইচ্ছার বড়ো একটা মূল্য নেই।

near zuluk
জুলুকের কাছে।

গাড়ি চলছে, জুলুকের দূরত্ব ক্রমশ কমছে। আকাশে বাড়ছে মেঘের ঘনঘটা। আধ ঘন্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম আমাদের আজকের গন্তব্য জুলুকে। ঘড়ি বলছে এখন বিকাল চারটে। ঘড়ি যা-ই বলুক তাতে আমাদের কিছু যায়-আসে না। আজ আমরা সময়ের দাসত্ব শৃঙ্খলকে ছিন্ন করে ফেলেছি। গাড়ি থামল, শুরু হল টিপ টিপ বৃষ্টি । (চলবে)

ছবি লেখক

0 Comments
Share