The post বৃষ্টিস্নাত মুনথুমের সবুজ-সান্নিধ্যে appeared first on Bhramon Online.
]]>পাহাড়ের ঢালে ধাপে ধাপে কয়েকটি বাঁশের কটেজ। সব থেকে ওপরের কটেজটি রাস্তা থেকে কিছুটা নেমেই। আর সব থেকে নীচের কটেজে যেতে হলে এই বর্ষায় আপনাকে কিছুটা পরিশ্রম করতে হবে। হাঁটুর জোর অত্যন্ত জরুরি। আর বর্ষাকাল বলে সিঁড়িও কিছুটা পিছল। ফলে সাবধানে পা ফেলতে হবে।
এই ছোটো ছোটো বাঁশের কটেজ, একটি ডাইনিং হল এবং কয়েকটি বাঁশের মণ্ডপ নিয়েই তৈরি মুনথুম ভিলেজ হোমস্টে। ডাইনিং হলে গদির ওপর আসনপিঁড়ি হয়ে বসে টেবিলে খাবার খাওয়ার ব্যবস্থা।
সবুজকে পুরোপুরি বাঁচিয়ে রেখে অত্যন্ত সৃজনশীল ভাবে গোটা হোমস্টেটা তৈরি করা হয়েছে।
কিছুক্ষণ আগেই যে কষ্টটা হচ্ছিল, মাত্র চারশো মিটার পাহাড়ি পথ ভাঙতে গিয়েও প্রবল গরমের মধ্যে ঘেমেনেয়ে একশা হলাম, সেই কষ্টটা এই হোমস্টে পৌঁছে নিমেষের মধ্যে উধাও হয়ে গেল।
হোমস্টেতে পৌঁছোতেই আমাদের সাদর অভ্যর্থনা জানালেন নীতা গুরুং। এখানকার মালকিন। স্বামী বিশালের সঙ্গে এই হোমস্টেটা তৈরি করেছেন। পাহাড়ি মানুষের আতিথেয়তা বরাবরই মনভোলানো। যথারীতি নীতা যে ভাবে অভ্যর্থনা জানালেন, তাতে যাবতীয় কষ্ট দূর হয়ে গেল।
আমি নিয়ে দলে ৭ জন। আমাদের পাঁচ জনের ঠাঁই হল ওপরের একটু বড়ো কটেজে। এই বাঁশের কটেজটা খুব সুন্দর করে তৈরি করা। এখানে দু’টো বেডরুম রয়েছে। রয়েছে একটা বসার জায়গা, একটি চেঞ্জিং রুম এবং একটি বাথরুম। বাকি দু’ জন চলে গেলেন নীচের কটেজে। সেটাও অসাধারণ সুন্দর করে সাজানো। তবে দলের সবাই প্রবীণ হওয়ার ফলে একদম নীচের কটেজটায় যাওয়া বেশ পরিশ্রমের।

নীতা-বিশালের ডেরায় পা রাখতেই ঝেঁপে বৃষ্টি নামল। আজ সারাটা দিন কোনো বৃষ্টি পাইনি দেখে বেশ অবাকই হচ্ছিলাম। জুলাইয়ের পাহাড়ে একটা গোটা দিন বৃষ্টিহীন কী ভাবে যেতে পারে। কিন্তু সে নামল অবশেষে।
বৃষ্টির পরিবেশটা এত মায়াবী হয়ে উঠল এই মুনথুমে যা বলে বোঝানো যাবে না। চারিদিকটা নিমেষের মধ্যে আরও সবুজ হয়ে উঠল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মনটাকে ভীষণ রকম চাঙ্গা করে দিল।
আমাদের মুনথুমে পৌঁছোতেই দুপুর গড়িয়ে গেছিল। তাই মধ্যাহ্নভোজ সারতে সারতে প্রায় বিকেল। তবে প্রকৃতি আমাদের পেট ভরিয়ে রেখেছে, সে ভাবে খিদেও পায়নি।
খুব ইচ্ছে ছিল ডাইনিং হলে গিয়ে খেতে। কিন্তু বৃষ্টি আর দলে প্রবীণদের থাকার কারণে অতটা নীচে যাওয়ার সাহস হল না। ঘরেই খাবার চলে এল।
গরম ভাত, গরম ডাল, রাই শাক, ডিমের ঝোলের সঙ্গে শেষ পাতে যে আচারটা দেওয়া হয়েছিল, সেটা এক কথায় অসাধারণ। আচারের মূল সামগ্রী কাঁচা আম। পাহাড়ে আম! এটা কি সমতলের কোথাও থেকে নিয়ে আসা হয়েছে?
নীতাই সেই কৌতূহল দূর করে দিলেন। এই কাঁচা আম তাঁদের চাষের। মুনথুমের উচ্চতা অনেকটা কম হওয়ার ফলে এখানে আমের ফলন ভালোই হয়। তাই নিজেরাই এই আম গাছ লাগিয়েছেন হোমস্টের চত্বরে।
তবে শুধু আম নয়, এখানে পাহাড়ের ধাপে ধাপে জৈব চাষ করা হয়। মুলো, ধান, সরষে, এলাচ, রাই শাক-সহ অনেক কিছুই। নীতা জানান, তাঁরা চেষ্টা করেন পর্যটকদের নিজস্ব চাষের খাঁটি জিনিস খাওয়াতে।
শিলিগুড়ির যুবক বিশাল গুরুং বিয়ে করেন কালিম্পংয়ের নীতাকে। তাঁদের পুরো প্রেমপর্বটাই হয়েছে কলকাতায়। এখানে একটি সংস্থায় কাজ করতেন দু’ জনে। সেখান থেকে ভালোবাসা, তার পর বিবাহ। শুধু প্রেমপর্বই নয়, আরও একটা কারণে কলকাতা তাঁদের কাছে খুব স্পেশাল।
— “আমার মেয়ে হয়েছে কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতালে।”
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার মুখে বিশাল আর নীতার সঙ্গে এ ভাবেই জমে উঠল আমাদের আড্ডা। তাঁদের দু’ জনের পারিবারিক গল্প শোনাচ্ছিলেন বিশাল। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন এল, কলকাতার চাকরি ছেড়ে পাহাড়ে চলে এলেন কেন তিনি?
কলকাতা থেকে পাহাড়ে নয়। মাঝে আরও একটি অধ্যায় আছে বিশালের জীবনে। বিশালের ট্রান্সফার হয়ে যায় দুবাইয়ে। স্ত্রী-মেয়েকে নিয়ে পাড়ি দেন সেখানে। দুবাইতে এক নতুন জীবন। মোটা মাইনের চাকরি ছিল, জীবনটাও নিশ্চিত ছিল, কিন্তু মনে শান্তি ছিল না তাঁর।
— “আমি নিজেকে প্রশ্ন করতাম কোনটা আমার জন্য ভালো, মোটা মাইনের রোজগারের সঙ্গে প্রবল চাপের জীবন? না কি কম রোজগারের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ জীবন এবং ভালো ঘুম?”
শেষে দ্বিতীয় অপশনটাকেই বেছে নেন বিশাল। আমরা যেখানে রয়েছি, এটা নীতার পৈতৃক অর্থাৎ বিশালের শ্বশুরবাড়ির জমি। হোমস্টের শেষ কটেজটা তো রয়েছে কয়েকটা ধাপ নীচে। কিন্তু এই জমিটা আদতে বিশাল এলাকা জুড়ে।
— “৯ একর জমি আছে আমাদের। নীচে একটা নদীর শব্দ শুনতে পাচ্ছেন। ওটা পালা নদী। ওই নদীর ধার পর্যন্ত নেমে গিয়েছে এই জমি।” বললেন নীতা।
পাহাড়ে হোমস্টে তৈরি করতে হলে একটা অলিখিত নিয়ম আছে। যিনি হোমস্টে তৈরি করছেন, তাঁকে এখানকার ভূমিসন্তান হতে হবে কিংবা বিবাহ সূত্রে ভূমিসন্তান হতে হবে। শিলিগুড়ির বিশাল এখন বিবাহসূত্রে এখানকার ভূমিসন্তান।
বিশাল বললেন, “এটা ঠিক যে দুবাইয়ের মতো রোজগার আমার এখানে হচ্ছে না। কিন্তু এখানে অনেক শান্তিতে রয়েছি আমি। এখানে আমিই আমার বস।”
এখানে এক বছর হল রয়েছেন বিশাল আর নীতা। গত বছর সেপ্টেম্বরে এটা ভ্রামণিকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
এখানে থাকতে থাকতে শারীরিক ভাবেও ভীষণ লাভবান হয়েছেন বিশাল। তাঁর কথায়, “২০১৯ পর্যন্ত আমার দু’তিন মাস অন্তর সাইনাসের সমস্যা দেখা দিত। কিন্তু গত এক বছরে এক বারের জন্যও এই সমস্যায় পড়িনি আমি।”
সত্যিই তো, চারিদিকে এত সবুজ, এমন দূষণমুক্ত পরিবেশ যে শারীরিক সমস্যা কোনো ভাবেই দেখা দেবে না। গত কয়েক দিনের উত্তরবঙ্গ সফরে এই কথাটাই বার বার মনে হচ্ছে আমাদেরও। শহুরে জীবন থেকে বেরিয়ে ভীষণ চাঙ্গা লাগছে।

ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামল। হোমস্টের আলো জ্বলে উঠল। এখানে রাতের এই দৃশ্যটাও অসাধারণ। খুব সুন্দর ভাবে আলো দিয়ে সাজানো হয়েছে গোটা চত্বরটাকে। নানা রকম রঙের খেলা। যেখানে সুইমিং পুল রয়েছে, সেখানে বার বার রঙ বদলে যাওয়া আলো। অন্য দিকে, একটি মণ্ডপের আলোকসজ্জা দেখে মনে হচ্ছে কলকাতার কালীপুজোর কোনো মণ্ডপ।
আশেপাশের পরিবেশটা কী মায়াবী! চারিদিকে অপার নির্জনতা। সেই নির্জনতা ভেদ করে ভেসে আসছে পালা নদীর গর্জন। সামনের পাহাড়ে কালিম্পং শহর। জোনাকির মতো জ্বল জ্বল করছে শহরটা।
এর পর যখন চাঁদ উঠল, আরও মনোরম হয়ে উঠল চারপাশ। এই পরিবেশে যে কেউ মোহিত হয়ে যেতে পারেন। যেমন মোহিত হয়ে গিয়েছিলেন অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য।
হ্যাঁ, কিছু দিন আগে এই মুনথুম ভিলেজ হোমস্টেতেই বিশালদের আতিথেয়তা উপভোগ করে গিয়েছেন সস্ত্রীক অনির্বাণ। সেই গল্পটাও আমাদের বললেন বিশাল-নীতা। স্বনামধন্য অভিনেতা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মাটির মানুষ হওয়ার পরিচয়টাও আমাদের দিলেন দু’ জনে।
মাত্র একটা দিনের জন্য বুকিং করেছিলাম মুনথুমে। ভীষণ আপশোশ হচ্ছে সেটার জন্য। নির্জনতাকে ভালোবাসলে এখানে অনায়াসে দু’-তিন দিন কাটিয়ে দেওয়া যায়। গাছগাছালির সান্নিধ্যে থাকা যায়। পাখিদের সঙ্গে গল্প করা যায়। সেই সঙ্গে গ্রামের রাস্তা ধরে ট্রেকিংও করা যায়।

আর একটা কথা, যে কোনো মরশুমেই মুনথুম আসা যায়, কিন্তু একটু কষ্ট করে যদি বর্ষায় আসতে পারেন, তার থেকে দারুণ ব্যাপার কিছু হতে পারে না। বর্ষার মুনথুমের রূপে আপনি মুগ্ধ হবেনই।
পাচেংয়ের বিমল ছেত্রীর মতো, মুনথুমের বিশালের সঙ্গেও নতুন এক সম্পর্ক তৈরি হল। এই সম্পর্কটাও থেকে যাবে। আবার আসব মুনথুমে, একটু বেশি সময় নিয়ে। (চলবে)
***
নীতা আর বিশাল গুরুংয়ের মুনথুম ভিলেজ হোমস্টেতে রাত্রিবাসের যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিতে পারে ট্র্যাভেলিজম (Travelism)। যোগাযোগ করুন: 8276008189 অথবা 9903763296 নম্বরে।
***
The post বৃষ্টিস্নাত মুনথুমের সবুজ-সান্নিধ্যে appeared first on Bhramon Online.
]]>The post এলাম কালিম্পং পাহাড়ে, পৌঁছোলাম মুনথুম appeared first on Bhramon Online.
]]>বর্ষায় পাহাড়কে অন্য রকম ভাবে চেনার জন্য এই সফর করছি আমরা। বেছে নিয়েছি এমন কিছু জায়গা যা বাধা গতের টুরিস্ট সার্কেলের বাইরে। এমনই দু’টো জায়গায় থাকার পালা শেষ হয়ে গেল। এ বার রওনা নতুন একটা জায়গার উদ্দেশে।
আজ পাড়ি দিতে হবে প্রায় ৮০ কিলোমিটার পথ। যাব কালিম্পং পাহাড়ের কোলে ছোট্ট একটি গ্রাম মুনথুমে। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন বিশাল গুরুং। আজ রাতটা তাঁর আতিথেয়তাতেই থাকব।
সকাল ৯টার আগেই বিজনবাড়ি থেকে রওনা হয়ে গেলাম। দার্জিলিং পাহাড়ের সম্পূর্ণ অন্য একটা দিক দিয়ে এগিয়ে চলেছি আমরা। ছোটা রঙ্গিতের বিজনবাড়িকে বিদায় জানিয়ে পুলবাজারের রাস্তা ধরলাম।
বিজনবাড়ি থেকে দার্জিলিং খুবই কাছে। শর্টকাট রাস্তাটায় দূরত্ব মাত্র ১৭ কিলোমিটার। এই অল্প দূরত্বেই রাস্তাটা প্রায় সাড়ে চার হাজার ফুট উঠবে। রাস্তার অবস্থাও বিশেষ ভালো না।
আর একটি রাস্তা আছে পুলবাজার হয়ে। সেটা দিয়ে দূরত্ব ২৬ কিলোমিটার। সেই রাস্তায় সুন্দর একটা টুরিস্ট স্পট যেমন আছে, তেমনই রাস্তার অবস্থাটাও ভালো।
ঘণ্টাখানেক চলার পর সুন্দর একটা জায়গায় এসে গাড়ি থাকল। জামুনি ব্রিজ। ছোটা রঙ্গিতের তীরে ভারী সুন্দর এই জামুনি। ছোট্ট একটা গ্রাম। উচ্চতায় বিজনবাড়ির থেকেও নীচে সে।

এই ছোট্ট মিষ্টি পাহাড়িয়া গ্রামটার মাঝখান দিয়ে নিজের মনে বয়ে চলেছে ছোটা রঙ্গিত নদী। এর ওপর আছে একটা লোহার ব্রিজ। এই সেতুটা এখানকার অন্যতম আকর্ষণ। এখানে আছে একটা সুন্দর পার্ক ও একটা ছোট্ট লেক। লেকে বোটিং-এর ব্যবস্থা আছে। রয়েছে মহাদেব শিবের বিশাল একটা মূর্তি।
এটা দার্জিলিং শহরের অন্যতম দ্রষ্টব্য স্থান। তবে এর পরিচিতি এখনও সে ভাবে হয়নি। ২০০৬ সালের ১ জানুয়ারি এই সেতু উদ্বোধন করেছিলেন দার্জিলিং পাহাড়ের তৎকালীন সর্বেসর্বা সুবাস ঘিসিং। সে কারণে এই ব্রিজটার নাম ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার ব্রিজ।’ পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার শিলান্যাসও তিনিই করেছিলেন।
বর্তমানে এখানে একটি পর্যটক আবাস তৈরি হয়েছে। রয়েছে কয়েকটি কটেজও। তবে এখন করোনাকাল বলে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে এই আবাস এবং কটেজগুলি।
ব্রিজ পেরিয়ে এ বার ক্রমশ ওঠা শুরু। জামুনি ব্রিজের উচ্চতা হাজার দুয়েক ফুট হয়তো হবে। পরবর্তী ১৫ কিলোমিটারে আমাদের উঠতে হবে প্রায় পাঁচ হাজার ফুট। রাস্তা অসম্ভব খাড়াই। কিন্তু পথের সৌন্দর্য অপরিসীম।
সম্পূর্ণ অন্য দিক দিয়ে দার্জিলিং প্রবেশ করলাম। পাহাড়ে যখন বিমল গুরুংয়ের চূড়ান্ত রাজত্ব ছিল, তখন যে জায়গাটার নাম সব থেকে বেশি শোনা যেত সেই পাতলেবাস জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলল আমাদের গাড়ি। এর পর সিংটাম চা বাগান, সিংমারি হয়ে পেছন দিক দিয়ে দার্জিলিং ঢুকলাম।
এক সম্পূর্ণ অচেনা দার্জিলিংয়ের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গেলাম। হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট আর চিড়িয়াখানার প্রবেশপথকে বাঁ দিকে রেখে এগিয়ে গেলাম চকবাজারের দিকে। রাস্তা অসম্ভব ফাঁকা। সকাল সাড়ে দশটায় মনে হচ্ছে বন্ধ চলছে। যে চকবাজারে ভিড়ের ঠেলায় কার্যত টেকা দায়, সেখানে সব দোকানপাট বন্ধ। রাস্তায় মানুষ হাতে গোনা।

তা হলে কিছু দিন আগে সংবাদমাধ্যমের একাংশ যে দাবি করছিল দার্জিলিংয়ের পর্যটকদের ভিড়ে টেকা দায়, তার প্রমাণ কই? হিমাচলের ভিড় দেখে দার্জিলিংকেও এক সরণিতে এনে ফেলেছিল ওই সংবাদমাধ্যমের একাংশ। নিজের চোখে দেখলাম পর্যটকশূন্য দার্জিলিংকে।
তবে যেটা খুব ভালো লাগল তা হল মানুষের মধ্যে কোভিড সচেতনতা। গত জানুয়ারিতেও দার্জিলিং এসেছিলাম। প্রথম ঢেউ তখন শেষ হওয়ার পথে। সংক্রমণ ক্রমশ কমছে। তখন কিন্তু মাস্ক নিয়ে মানুষকে এত সচেতন হতে দেখা যায়নি। তখন দশ জনের মধ্যে ৩-৪ জনকে মাস্ক পরতে দেখতাম। আর আজ এখন যাদের দেখছি সবার মুখে মাস্ক। একদম নাক পর্যন্ত টানা।
হিলকার্ট রোড ধরে দার্জিলিং থেকে ঘুম আসতে সময় লাগল মাত্র ৪-৫ মিনিট। পর্যটক ভরা মরশুমে এই রাস্তায় ৪-৫ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। তখন গাড়ির চাপ সামলাতে ওপরের জলাপাহাড়ের রাস্তাটাও খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু আজ সে সব কিছুই করতে হল না।
ঘুম থেকে ঘুরলাম বাঁ দিকে। পেশক রোড। দার্জিলিং পাহাড়ের অন্যতম প্রাচীন রাস্তা। দার্জিলিং-কালিম্পং সংযোগকারী। এই রাস্তাটায় চা-বাগান নেই। তবে পাইন-ধুপি-দেবদারু গাছগুলো এক অপরূপ মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। কেমন যেন ছায়া ছায়া লাগে। বাঁ দিকটা পুরোটা ফাঁকা। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখানেই খিলখিল করে হাসে কাঞ্চনজঙ্ঘা।
ইচ্ছে ছিল লামাহাট্টার ইকো পার্কটা দেখব, কিন্তু করোনার কারণে সেটা এখন বন্ধ। পর্যটনশূন্য লামাহাট্টার হোটেলগুলো এখন কার্যত মাছি তাড়াচ্ছে।
লামাহাট্টা পেরিয়ে যেতেই উতরাই। রাস্তা এ বার ক্রমশ নামছে। লামাহাট্টার উচ্চতা সমুদ্রতল থেকে ৬ হাজার ফুট। আর এই রাস্তা যেখানে শেষ হয়েছে, সেই তিস্তাবাজার হাজার খানেক ফুট। দূরত্ব মাত্র ১৩ কিলোমিটার।
লপচু এসে পৌঁছোতেই তীব্র গরমের কবলে পড়লাম। আধ ঘণ্টা আগেও লামাহাট্টায় ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছিল। লপচুতে সে সব উধাও। এখন আমরা সমুদ্রতলের প্রায় কাছাকাছি। আরও নামলাম। এসে পৌঁছোলাম লাভার্স মিট ভিউ পয়েন্টে।
দুর্দান্ত একটি ভিউ পয়েন্ট। গাছগাছালি ঘেরা রাস্তার সামনেই কয়েক ধাপ সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়ে উঠেই অনেকটাই নীচে সেই সুন্দর দৃশ্য।

সোজাসুজি দূর থেকে বয়ে আসছে তিস্তা। আর বাঁ দিক থেকে আসছে রঙ্গিত। রঙ্গিত নিজেকে সমর্পণ করছে তিস্তার বুকে। এটা কিন্তু রঙ্গিত। বিজনবাড়িতে দেখা ছোটা রঙ্গিত এ নয়। সেই ছোটা রঙ্গিত জোরথাংয়ের কাছে রঙ্গিতে মিশছে।
লাভার্স মিটে কিছুক্ষণ কাটিয়ে ফের পথ চলা শুরু। আমাদের গন্তব্য তিস্তার অপর প্রান্ত, অর্থাৎ কালিম্পং পাহাড়ে। তিস্তাবাজারে জলে টইটম্বুর তিস্তাকে পেরিয়ে ফের পাহাড়ে ওঠা শুরু।
আবার একটার পর একটা হেয়ারপিন বেন্ড অতিক্রম করে উঠে আসা কালিম্পং শহরে। একই দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পাহাড়ের দুই বড়ো শহর দার্জিলিং আর কালিম্পংকে দেখার সুযোগ কিন্তু খুব বেশি কারও হয় না।
আজ রাস্তায় এক ফোঁটা বৃষ্টি নেই। বরং লামাহাট্টা থেকে যত নেমেছি রীতিমতো ছড়ি ঘুরিয়েছে রোদ। এমনকি এই ৪ হাজার ফুট উচ্চতার কালিম্পংয়ে এসেও বেশ গরমই লাগছে।
বিশাল গুরুংয়ের কথামতো কালিম্পং থেকে আমরা রেলিখোলার রাস্তা ধরলাম। উতরাইয়ে রাস্তা তবে অবস্থা ভালোই। বিশালজির স্ত্রী নিতা এ বার ফোন করলেন। আমাদের অবস্থান সম্পর্কে জানার পর ভালো করে রাস্তা বুঝিয়ে দিলেন। তাঁর নির্দেশমতো এগোতে থাকলাম।
চলে এলাম রেলিখোলা। বর্ষা ছাড়া অন্য কোনো সময়ে এখানে বিশেষ জল থাকে না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি অন্য রকম। খরস্রোতা রেলিখোলা পেরিয়ে আরও কিছুটা এগোলাম। এ বার এল আরও এক নদী, পালাখোলা। প্রবল গর্জনে নেমে আসছে সেও।
“মুনথুমে যাবেন তো।”
পালাখোলা পেরিয়ে কিছুটা এগোতেই, ছোট্ট একটা রাস্তার মোড়ে আমাদের গাড়িদুটিকে দাঁড় করালেন এক যুবক। বুঝতে অসুবিধা হল না আমাদের আজ রাতের আস্তানাতেই কর্মরত তিনি।
ভালো কিছু উপভোগ করতে হলে একটু সমস্যা দেখা দেয়, একটু কষ্ট করতে হয়। সেটা আমাদের ক্ষেত্রেও হল।
বিশালজি আগে থেকেই বলে দিয়েছিলেন তাঁর ‘ভিলেজ হোমস্টে’-তে ঢোকার আগে শেষ চারশো মিটার রাস্তাটা অত্যন্ত খারাপ। বোল্ডারের রাস্তা। বোলেরো কোনো ভাবে সেই রাস্তা অতিক্রম করতে পারলেও ছোটো গাড়ির পক্ষে এখানে আসা সম্ভব নয়।
সে কারণে আমাদের ছোটো গাড়িটাকে মূল রাস্তার মোড়ের মাথায় রেখেই বোলেরোয় এগিয়ে চললাম ভিলেজ হোমস্টের দিকে। (চলবে)
The post এলাম কালিম্পং পাহাড়ে, পৌঁছোলাম মুনথুম appeared first on Bhramon Online.
]]>The post নদী আপন বেগে… বিজনবাড়িতে appeared first on Bhramon Online.
]]>কটেজের অবস্থান দেখেই পথের সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত রাগ এক লহমায় দূর হয়ে গেল। খরস্রোতা ছোটা রঙ্গিত নদী কটেজের গা ঘেঁষে বয়ে যাচ্ছে। বিছানায় একটু গা এলিয়ে দিলেই মনে হচ্ছে নদী আমাকেও ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
এই হল বিজনবাড়ি। এই হল এখানকার ব্যাম্বু রিসর্টের সৌন্দর্য।
দারুণ সুন্দর ছবির মতো একটি জায়গা। আর সেখানেই খুব সুন্দর থাকার জায়গা ব্যাম্বু রিসর্ট।
কিছুক্ষণ আগেও মহাবিরক্তি এসে গিয়েছিল। পাচেং থেকে রওনা হয়েছি সাড়ে দশটায়। মাত্র ৩২ কিলোমিটার রাস্তা। ভেবেছিলাম ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছে যাব বিজনবাড়ি। কিন্তু কোথায় কী! পাক্কা তিন ঘণ্টা লাগল।
ঘুম থেকে বাঁ দিকে সুখিয়াপোখরির দিকে কিলোমিটার খানেক গিয়ে ডান দিকে বিজনবাড়ির রাস্তা ধরলাম। রাস্তা প্রায় নেই বললেই চলে। যত নীচে নামছি, ততই উধাও হয়ে যাচ্ছে রাস্তা। তার বদলে দখল নিচ্ছে কাদা। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে দিচ্ছে বর্ষাকাল। গাড়ির চাকা সেই কাদায় মাঝেমধ্যে ফেঁসেও যাচ্ছে।
এ ভাবেই নেমে এলাম অনেক নীচে। সমুদ্রতল থেকে মাত্র আড়াই হাজার ফুট উচ্চতা। ছোটা রঙ্গিত নদীর ওপরে একটি ব্রিজ পেরিয়েই ঢুকে গেলাম বিজনবাড়ি।
ছোট্ট এবং ঘিঞ্জি শহর এই বিজনবাড়ি। তাকে পেরিয়ে ছোটা রঙ্গিতের ধার ধরে কিছুটা এগিয়েই এসে পৌঁছোলাম এই রিসর্টে।
বিজনবাড়িকে দেখলে মনে হয় কিছুটা অবহেলিত। পর্যটন মানচিত্রে খুব বেশি দিন এর আগমন হয়নি। তবে জায়গাটা এক কথায় অসামান্য।
বলতে গেলে, রিসর্টের ক্যাম্পাসের মধ্যে দিয়েই বয়ে চলেছে ছোটা রঙ্গিত। অপার নির্জনতা ভেদ করে বয়ে আসছে সে। প্রথম দর্শনে মুগ্ধ এখানে হতেই হবে। সমস্ত ক্লান্তি এবং শহুরে ব্যস্ততাকে দূরে সরিয়ে দিতে হবে।

এই নদীটার নাম জেনেছিলাম বেশ কয়েক বছর আগে। একটি টিভি কুইজ প্রতিযোগিতায় প্রশ্ন ছিল, “দার্জিলিংয়ের নীচ দিয়ে যে নদী বয়ে যাচ্ছে, তার নাম কী?” প্রতিযোগী সঠিক উত্তর দিয়েই বলেছিলেন ‘ছোটা রঙ্গিত।’
এর পর বেশ কয়েক বার দার্জিলিং এলেও ছোটা রঙ্গিত দেখার সুযোগ হয়নি। সেই সুযোগটাই এখন এসে গেল। দার্জিলিং শহরটা এখান থেকে অত্যন্ত কাছে। মাত্র ২২ কিলোমিটার।
কম উচ্চতার কারণে এখানে গরমও রয়েছে ভালোই। ঘরে পাখা চলছে বনবন করে। আরামকেদারায় গা এলিয়ে ঘরের ভেতর থেকেই দেখতে থাকলাম নদীটাকে।
ক্লান্তিহীন ভাবে প্রবল গর্জন সহকারে ওপর থেকে বয়ে আসছে সে। ভেসে চলে যাচ্ছে আরও নীচে, জোরথাংয়ের দিকে যেখানে রঙ্গিতের সঙ্গে মিলিত হচ্ছে।
এখানে বলে রাখা ভালো যে রঙ্গিত আর ছোটা রঙ্গিত কিন্তু এক নদী নয়। তিস্তাবাজারের কাছে ‘ত্রিবেণী সংগম’ অঞ্চলে তিস্তার সঙ্গে যে নদীটার সংগম হয়েছে সে রঙ্গিত। সে আসছে সিকিম থেকে। আর এই ছোটা রঙ্গিত আসছে নেপালের দিক থেকে। এর দৈর্ঘ্য বেশি নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও গোটা বিজনবাড়ির প্রাণ এই ছোটা রঙ্গিত।
ঘরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা পাহাড়ি খরস্রোতা নদী দেখতে দেখতেই দুপুরটা কেটে গেল অবলীলায়।
বিকেলে রিসর্টের চৌহদ্দিতেই হাঁটাহাঁটি। বেশ অনেকটা এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে রিসর্টের কটেজগুলো। দু’খানে সুইমিং পুলও রয়েছে। পাচেংয়ের মতো এখানেও সবুজের সমারোহ। তবে উচ্চতা কম বলে বৃষ্টি নেই। ওপরের পাহাড়ের গায়ে লেপটে রয়েছে বর্ষার মেঘ।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতেই নদীর গর্জন যেন আরও বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে রিসর্টের নদী লাগোয়া রেস্তোরাঁয় গরম চা আর পকোড়ার সঙ্গে জমে ওঠে আমাদের আড্ডা।

কিছুক্ষণ পরেই পাহাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে চাঁদ। তিন দিন পরেই পূর্ণিমা। তার জ্যোৎস্নায় যেন নিজেকে আরও মেলে ধরে ছোটা রঙ্গিত।
বৃষ্টিমাখা ভোরে ঘুম ভাঙতেই চমকে যাই ছোটা রঙ্গিতকে দেখে। গর্জন আরও বাড়িয়ে ভয়াল রূপ নিয়েছে সে। আগের দিন যে পাথরগুলো বেরিয়ে ছিল, সব এখন জলের তলায় চলে গিয়েছে। কিছুটা হতচকিত হয়ে যাই।
বর্ষার নদীর জল বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি একটা থাকেই। এই জল কোনো ভাবে রিসর্টের ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়বে কি না সেই খোঁজ নিই কর্মীদের কাছে। ওঁরা আশ্বস্ত করেন, বেলা বাড়লেই নদী জল আপসে কমে যাবে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি থামল। মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল সূর্য। অদ্ভুত ভাবে ছোটা রঙ্গিতও কিছুটা শান্ত হয়ে গেল। ধীরে ধীরে বেরিয়ে পড়তে লাগল পাথরগুলো।
বিজনবাড়ির এই রিসর্ট মানেই খালি বিশ্রাম আর হাঁটাহাঁটি। একটা দিন বাঁধা গতের কোনো সাইটসিয়িং না করে স্রেফ বিশ্রামে কাটিয়ে দিতেও যে কী ভালো লাগে, সেটা বোঝা যায় এই রিসর্টে এসেই।
এখানে নেই দূষণ, আওয়াজ ও বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং। পাহাড়ের নির্জন, শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশে দু’-তিন দিন অনায়াসেই কেটে যাবে। সঙ্গে অপরূপ দৃশ্যপট একদম ফ্রি।
এই দৃশ্যপটেই মুগ্ধ হয়ে বেরিয়ে পড়ি, প্রাতরাশ সেরে। রিসর্টের সামনেই একটা কংক্রিটের ছোটো সেতু। মাইলফলকে লেখা আছে এই সেতু তৈরির বছর – ২০০৩। সেতুর মাঝখানে দাঁড়ালে বহমান ছোটা রঙ্গিতকে দুর্দান্ত ভাবে উপভোগ করা যাবে। যতটা চোখ যাবে, দেখা যাবে ও দুরন্ত শিশুর মতো ছুটে আসছে।
সেতু পেরিয়ে ওপরে উঠি। একটা ছোট্ট গ্রাম। বাসিন্দারা নিজেদের মতো করে কাজকর্মে নেমে পড়েছেন। গ্রামটার সঙ্গে লেপটে রয়েছে চা-বাগান। সকালবেলায় এই চা-বাগানের ব্যস্ততাও রয়েছে। পাতা তোলার কাজে নেমে পড়েছেন গ্রামের মহিলারা। হাঁটতে থাকি উদ্দেশ্যহীন ভাবে। রাস্তা খাড়াই নয়। নদীর ও পারে আমাদের রিসর্টটাকে দেখতে অসাধারণ লাগছে।

ছোটা রঙ্গিতের ভরসাতেই এখানকার জীবন চলছে। কারও বাড়িতে জলের চাহিদা মেটাচ্ছে সে। কেউ কেউ আবার তার বুকে নামছে পাথর ভাঙতে। এই পাথর ভাঙলে কিছু টাকাপয়সা রোজগার হবে।
কাঞ্চনজঙ্ঘাকে এখান থেকেও পাওয়া যাবে না। কিন্তু তার বদলে যে সবুজ রয়েছে, যে খরস্রোতা নদীটা রয়েছে তা আপনার মন ভুলিয়ে দেবে।
বেশ কিছুটা হাঁটাহাঁটি করে ফিরে আসি রিসর্টে। নদীতে জল এখন বেশ কম, তাই তার জলে পা ডোবানোর জন্য কিছুটা নামি। একটা পাথরের ওপরে বসে পা ডুবিয়ে দিই জলে। কনকনে ঠান্ডা জল উপভোগ করতে বেশ লাগে।
তবে জল বেশি থাকলে নদীতে নামা উচিত নয়। তা হলে পাথর দেখা যাবে যা, যেটা বেশ কিছুটা ঝুঁকির হয়ে যেতে পারে। এমনিতে শীতকালে এলে অবশ্য নদীতে নামা নিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত নয়, তখন নেমে যাওয়াই শ্রেয়। বর্ষাতেই সাবধানতা দরকার।
এর পর বাকি দিনটা ছোটা রঙ্গিতের কাছে উৎসর্গ করি নিজেকে। পাহাড়ি কোনো নদীকে এত কাছ থেকে উপভোগ করার সুযোগ খুব একটা পাই না আমরা। সেই সুযোগটাই কিন্তু বিজনবাড়ির এই ব্যাম্বু রিসর্ট করে দিচ্ছে।
ইস, আমার বাড়িটা যদি এখানেই কোথাও একটা হত, তা হলে কী ভালোই না হত! নদীকে দেখতে দেখতে কেটে যেত গোটা দিন। নদীর যেমন ক্লান্তি নেই, তেমনই আমারও কোনো ক্লান্তি আসত না জীবনে।
অবশ্য এখানে বাড়ি হলে কি ভ্রামণিক হতে পারতাম? আমার নিজের রাজ্য, নিজের দেশকে কি ঘুরে দেখার সুযোগ পেতাম? কালকেই যে নতুন একটা জায়গায় যাব, সে সুযোগটাও কি আসত আমার কাছে?
বিজনবাড়ির ব্যাম্বু রিসর্টে রাত্রিবাসের যাবতীয় আয়োজন করে দিতে পারে ট্র্যাভেলিজম (Travelism)। যোগাযোগ করুন: 8276008189 অথবা 9903763296 নম্বরে।
The post নদী আপন বেগে… বিজনবাড়িতে appeared first on Bhramon Online.
]]>The post পাচেংয়ের আতিথেয়তা যে ভোলার নয়! appeared first on Bhramon Online.
]]>“আপনারা খুব শুভ দিনে এসেছেন। এখানে বসুন।”
আমাদের সাত জনের দলটাকে ঢুকতে দেখেই এগিয়ে এলেন লিম্বু দোর্জি ইয়োলমো। এমন ভাবে আমাদের স্বাগত জানালেন, মনে হল আমরা কত দিনের পরিচিত। দেখলাম, আশেপাশে যাঁরা রয়েছেন সবাই আমাদের আপ্যায়নের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
কিঞ্চিৎ অস্বস্তিও লাগছে। একটা ছোট্টো গ্রামের ছোট্টো একটা মনেস্ট্রিতে এসেছি শুধুমাত্র পরিবেশটাকে উপভোগ করব বলে, এমন আপ্যায়ন তো আশা করিনি। এটাই হল পাহাড়ি মানুষের সারল্য। অপরিচিত মানুষকে দেখলে তাঁরা এমন ভাবেই স্বাগত জানান।
পাচেং সফরের দ্বিতীয় দিন আজ। উঠে পড়েছি খুব ভোরে। পাহাড়ের হোমস্টেতে থাকতে হলে সেই বাড়ির নিয়মকানুন মেনে চলা আমাদের, অর্থাৎ ভ্রামণিকদের একান্ত কর্তব্য। তাই বিমলদাজুর কথামতো কাল ন’টাতেই নৈশভোজ সেরে ফেলেছি। ফলে, ঘুমও হয়েছে অনেক তাড়াতাড়ি। সে কারণেই ভোর ৫টাতেই উঠে পড়া।
বৃষ্টি হয়েছে সারা রাত। সেটা কটেজের চালে জল পড়ার শব্দই বুঝিয়ে দিয়েছে। তবে সাংঘাতিক ভারী কিছু হয়নি। এই বৃষ্টির কারণেই ঘুম থেকে উঠে চারিদিকটা আরও যেন সবুজ মনে হল। সেই সিরুবাড়ি ভিউ পয়েন্ট থেকে প্রাতঃভ্রমণ করে এলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে এল প্রাতরাশ। গরম গরম আলুর পরোটা, দই আর আচার দিয়ে পেট ভরিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আশেপাশের কিছু দর্শনীয় স্থান দেখতে।
দিন দশেক আগে পাচেংয়ের এই চিয়াবাড়ি হোমস্টে সম্পর্কে যখন খোঁজখবর নিচ্ছিলাম, তখনই দ্রষ্টব্য স্থানের একটা তালিকা দিয়েছিলেন বিমলদাজু। তবে সব সময় তো তালিকা ধরে মিলিয়ে মিলিয়ে ঘোরা হয় না। গাড়িতে যেতে যেতে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে অপার সবুজ উপভোগ করাও কিন্তু দ্রষ্টব্য স্থানের তালিকাতেই পড়ে।
যাই হোক, আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল একটি অসাধারণ জায়গা, নাম গ্রোটো (Grotto)। পাচেংয়ের একদম গায় লাগানো একটি গ্রাম নালিচৌর। সেখানেই রয়েছে এই গ্রোটো। মূল রাস্তার ওপরেই গেট। সেই গেট দিয়ে ঢুকে খাড়াই পথে কিছুটা উঠে পৌঁছে গেলাম একটা ভিউ পয়েন্টসুলভ জায়গায়।
এখানে ধাপে ধাপে সিঁড়ি করা রয়েছে। সেই সিঁড়ির একদম শেষে রয়েছে ক্রুশবিদ্ধ জিশুর একটা বিশাল মূর্তি। সিঁড়ির প্রত্যেকটা ধাপে রয়েছে ক্রস ও তার সঙ্গে কয়েকটি মূর্তি।

এগুলোর একটি বিশেষ তাৎপর্য আছে। এখানে জিশুর জীবনের অন্তিম যাত্রাপথের বর্ণনা আছে। এটা ‘ক্রুশের পথ’ নামে অভিহিত। গুড ফ্রাইডে’র দিন খ্রিস্টীয় উপাসনার সময় এই পথের ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য আলোচনা করা হয়। খ্রিস্টান জীবনে এর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জায়গাটা দেখলেই অপার শান্তি আসে। বর্তমানে জায়গাটার দেখভাল করছেন থমাস লেপচা, চাকরি থেকে স্বেচ্ছাবসর নিয়ে যিনি নিজেকে প্রভু জিশুর কাজে সঁপে দিয়েছেন।
পরিষ্কার দিনে এখান থেকে আশেপাশের চা-বাগানগুলির অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়। তবে সে দিন মেঘবৃষ্টির যুগলবন্দির কারণে আমরা কিছুই দেখতে পাইনি। যদিও এখানে যতক্ষণ ছিলাম, অসাধারণ লেগেছিল।
গ্রোটো দেখে ফের পথ চলা শুরু। এ বার গন্তব্য ইন্দ্রেনি জলপ্রপাত। সোনাদার দিকে কিছুটা গিয়ে বাঁ দিকের রাস্তা ধরলাম। সঙ্গে সঙ্গে জনবসতি কার্যত উধাও। জঙ্গল বেড়ে গেল। আকাশ থেকে মেঘ নেমে এসেছে। সেই সঙ্গে নানা রকম পোকার ডাক। চারিদিকে একটা রহস্যময় ব্যাপার।
ক্রমশ নীচে নেমে চলেছি। দার্জিলিং পাহাড়ের সম্পূর্ণ অচেনা, অজানা একটি জায়গা দিয়ে আমরা চলেছি। বর্ষায় পাহাড়ি প্রপাতের রূপ কেমন হবে, সেটা ভেবেই শিহরণ জাগছে। কিন্তু প্রপাতটাকে আদৌ দেখা যাবে কি না, সেই প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে। কারণ আমরা এখন পুরোপুরি মেঘের মধ্যে ঢুকে রয়েছি। সামনের কয়েক পা রাস্তা ছাড়া কিছুই যে দেখা যায় না।
এ ভাবেই বেশ কিছুক্ষণ চলার পর আচমকা মেঘের আস্তরণ উঠতে শুরু করল। ম্যাজিকের মতো সব মেঘ উধাও হয়ে গেল। খেয়াল করলাম আমরা ইন্দ্রেনি প্রপাতের একদম কাছাকাছি এসে গিয়েছি।

অসাধারণ একটা জলপ্রপাত। বেশ উঁচু থেকে নামছে। তবে তাকে দূর থেকেই উপভোগ করতে হচ্ছে, কারণ তার কাছে যাওয়ার রাস্তাটি কিছু দিন আগে নামা ধসের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছে।
নেপালিতে ‘ইন্দ্রেনি’ শব্দের অর্থ রামধনু। আন্দাজ করতে পারলাম রোদ থাকলে এই প্রপাতে রামধনুর রঙ ধরে। তখন গোটা ব্যাপারটি আরও মায়াবী হয়ে ওঠে। প্রপাতের কাছাকাছি যেতে পারলাম না ঠিকই, কিন্তু দূর থেকে যা উপভোগ করলাম, সেটাই বা কম কী।
পাচেং ফেরার পথে সারথি বাপিদার জন্যই মনেস্ট্রিটার সন্ধান পেলাম। রাস্তা থেকে কিছুটা নীচে মনেস্ট্রিটা দেখেই মনে ধরল। তাই বেশি অপেক্ষা না করে ঢুকে পড়লাম। সেখানে গিয়ে যা অসাধারণ অভিজ্ঞতা হল, তা বলে বোঝানো যাবে না।

মনেস্ট্রিতে গিয়ে শুনলাম আজই গুরু পদ্মসম্ভবের জন্মতিথি। তাই বিশেষ প্রার্থনাসভার আয়োজন করা হয়েছে।
ছোট্ট একটা গ্রাম। নাম ইয়োলোগাঁও। সেখানেই রয়েছে এই মনাস্ট্রি, নাম তার ‘স্ন্যাং চোইলিং গুরুং গোম্পা।’ আজকের বিশেষ দিন উপলক্ষ্যে গোটা ইয়োলমোগাঁও নেমে এসেছে এই মনেস্ট্রিতে। একজন লামা রয়েছেন, তাঁর নেতৃত্বে প্রার্থনাসভা চলছে। আমরাও সেই প্রার্থনায় একটু যোগ দিলাম।
লিম্বু দোর্জি ইয়োলমো এই গ্রামের বাসিন্দা। তবে চাকরি সূত্রে মেদিনীপুরে অনেক বছর কাটিয়েছেন। কলকাতাতেও থেকেছেন বেশ কয়েক বছর। ঝরঝরে বাংলায় কথা বলছেন তিনি আমাদের সঙ্গে।
তাঁর চায়ের আবদার ফেরানো গেল না। গরম ধূমায়িত এই চায়ের মধ্যে স্থানীয় গ্রামবাসীদের যে ভালোবাসা মেশানো ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
প্রায় মিনিট কুড়ি কাটিয়ে দিলাম এই ছোট্ট মনেস্ট্রিতে। এ বার চললাম পরের গন্তব্যে। না, এ বার কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য কিছু ছিল না। ইচ্ছে ছিল চা-বাগানের মাঝে কোথাও একটা গাড়ি দাঁড় করিয়ে চারিদিক উপভোগ করব।
পাচেংকে ছাড়িয়ে এ বার চললাম নীচের দিকে। গ্রামটা পেরিয়ে চারিদিকে শুধু চা-বাগান আর চা-বাগান। ওই যে বললাম সাত চা-বাগানে ঘেরা এই পাচেং। এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় না ঠিকই, কিন্তু যা দেখা যায়, তাই বা কম কী!

এই চা-বাগান উপভোগ করতেই দু’টো দিন দিব্যি কাটিয়ে দেওয়া যায় পাচেংয়ে। বর্ষা বলে চা-বাগানে কাজ করছেন স্থানীয় মহিলারা। চা-পাতা তোলা হচ্ছে। এই সঙ্গে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি এবং মেঘ। চারিদিকে অদ্ভুত একটা মাদকতা বিরাজ করছে। এই রাস্তাটাই সোজা নেমে গেছে বালাসোন নদীর তীরে। তবে এখন বর্ষার শেষের কিছুটা রাস্তা বেশ খারাপ, তাই বিমলদাজু সেখানে যেতে নিষেধ করেছেন।
ফিরে এলাম হোমস্টেতে। এ বার বাকি দিনটা শুধুই চিয়াবাড়িতে কাটিয়ে দেওয়া। আজই শেষ সন্ধ্যা পাচেংয়ে, তথা চিয়াবাড়িতে। এই দু’ দিন বিমলদাজু আর তাঁর পরিবারকে যে ভাবে পেলাম তা এক কথায় মনোমুগ্ধকর। মাত্র ৩০ ঘণ্টার আলাপে কেউ এতটা আপন হয়ে যেতে পারে, সেটা সম্ভবত পাহাড়ে না এলে বিশ্বাসই করা যায় না।
কাল রওনা বিজনবাড়ির পানে। কিছুটা মন খারাপ আবার অনেক বেশি আনন্দ। কারণ বিমলদাজুর সঙ্গে যে সম্পর্কটা তৈরি হল, সেটা এখন চলবেই। আমাদের পরিবারেরই সদস্য হয়ে গেলেন বিমলদাজু।
চিয়াবড়িতে আপনি কাঞ্চনজঙ্ঘাকে পাবেন না। কিন্তু আশেপাশের সবুজ আপনার মন ভুলিয়ে দেবে। বর্ষা হোক বা শীত, বসন্ত হোক বা গ্রীষ্ম, সব সময় একগাল হাসি নিয়ে আপনাকে স্বাগত জানাতে তৈরি বিমলদাজু ও তাঁর পরিবার। (চলবে)
বিমল ছেত্রীর চিয়াবাড়ি হোমস্টেতে রাত্রিবাসের যাবতীয় আয়োজন করে দিতে পারে ট্র্যাভেলিজম (Travelism)। যোগাযোগ করুন: 8276008189 অথবা 9903763296 নম্বরে।
The post পাচেংয়ের আতিথেয়তা যে ভোলার নয়! appeared first on Bhramon Online.
]]>The post সবুজের সাগরে ভেসে পৌঁছোলাম পাচেং appeared first on Bhramon Online.
]]>“কাঞ্চনজঙ্ঘা তো অনেক বার দেখেছেন, এ বার শুধু সবুজটা দেখুন।”
মধ্যাহ্নভোজনের পর সিরুবাড়ি ভিউ পয়েন্টের দিকে হেঁটে যাচ্ছি। মনে পড়ে গেল কিছুক্ষণ আগেই বিমলদাজুর বলা কথাগুলো। চারিদিকে এত সবুজ যা স্বপ্নেও কল্পনা করা যায় না।
এটা স্বর্গরাজ্যের থেকে কম কী! যে দিকে চোখ যাচ্ছে শুধু চা-বাগান আর চা-বাগান। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ধাপে ধাপে নেমে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে মেঘ এসে ঘিরে দিচ্ছে চারিদিক। আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই সে সরে যাচ্ছে, আবার বেরিয়ে পড়ছে সবুজ বাগিচাগুলো।
মনকে বলতে ইচ্ছে করছে যে শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে, ঝুঁকি নিয়েও এই অদ্ভুত সময় পাহাড়ে বেড়াতে আসার সিদ্ধান্ত সার্থক।
মধ্যাহ্নভোজনের ঠিক আগেই এসে পৌঁছেছি বিমলদাজুর আস্তানা চিয়াবাড়ি হোমস্টেতে। তাঁর এই আস্তানাকে সোশ্যাল মিডিয়ায় খুঁজে বের করেছিলাম। সেখানেই জানতে পারি যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের দাপট কমতে তিনি তাঁর হোমস্টে পর্যটকদের জন্য খুলে দিয়েছেন। ব্যাস, সেটা দু’ দিনের জন্য বুক করতে এক মুহূর্তের জন্যও দেরি করিনি।
এই প্রথম কার্যত নিজের দায়িত্বে ৬ জনের একটা গ্রুপকে বেড়াতে নিয়ে এসেছি। সবাই প্রবীণ। সেকেন্ড ওয়েভের দাপট কমলেও এখনও অনেকেই বেরিয়ে পড়তে ভয় পাচ্ছেন।
কিন্তু আমাদের কাছে মন ভালো রাখার সব থেকে ভালো ওষুধ তো এই বেড়ানো। তা ছাড়া সবারই দু’ দফার টিকাকরণ হয়ে গিয়েছে। কিছুটা ভয় কাজ করলেও তাই সবাইকে রাজি করাতে পারলাম। কথা দিলাম, ভিড়ভাট্টা হতে পারে, এমন জায়গার বাইরে নিয়ে যাব।
তবে করোনার দ্বিতীয় ঢেউই যে শুধু ভয়ের ব্যাপার ছিল, তা কিন্তু নয়। আরও একটা ঝুঁকি ছিল বর্ষায় পাহাড়ে আসা। একাধিক বার উত্তরবঙ্গে এলেও জুলাইয়ের ভরা বর্ষায় কখনও পাহাড়ে যাইনি।
যা-ই হোক, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ আর জগৎজননী মা সারদার নাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য তৃতীয় ঢেউয়ের কারণে এখন পর্যটনস্থলগুলিতে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বেড়াতে গেলে তাই হয় দু’ ডোজ টিকার সার্টিফিকেট লাগবে, কিংবা কোভিড নেগেটিভ রিপোর্ট।
আমাদের গ্রুপের মধ্যে শুধুমাত্র আমারই টিকার দ্বিতীয় ডোজ নেওয়া হয়নি, অগত্যা কোভিড টেস্ট করাতে হয়েছে। নেগেটিভ রিপোর্ট নিয়েই পাহাড়ে এসেছি। দার্জিলিং পাহাড়ে ওঠার আগে রোহিণীতে সে সবের ওপরে কড়া নজরদারি চালাচ্ছে পুলিশ।

পুলিশ চেকিংয়ের পর পাহাড়ে ওঠা শুরু। সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল গোটা রূপ। এই রোহিণী রোড ধরে বেশ কয়েক বার দার্জিলিং গিয়েছি। কিন্তু এ বারের মতো রূপ আগে কোনো বারই চোখে পড়েনি। মেঘবৃষ্টি তো আছেই, সেই সঙ্গে যে সবুজটা এখন দেখছি তা কল্পনারও বাইরে।
— “দাদা দাঁড়াব?”
সারথি বাপিদার কথায় সংবিৎ ফিরল। এতক্ষণ সবুজের সাগরে ভেসে কার্যত কল্পনার জগতে চলে যাচ্ছিলাম। বাপিদার কথা শুনেই ডান দিকে তাকিয়ে দেখি একটা ঝরনা।

এটাই বর্ষার সৌন্দর্য। এর আগে কখনও এইখানে এমন ঝরনা দেখিনি। প্রবল বেগে, কানফাটানো শব্দ নিয়ে সে নেমে আসছে ওপর থেকে। আবার সেই বেগেই সে নেমে যাচ্ছে নীচে। হয়তো কোনো পাহাড়ি নদীতে গিয়ে শেষ হয়েছে তার যাত্রা।
কার্শিয়াং পৌঁছোতেই মিলিত হলাম বিখ্যাত হিলকার্ট রোডের সঙ্গে। এই রাস্তাটাকে দেখলেই আবেগে ভেসে যাই। পাশ দিয়ে যাচ্ছে টয় ট্রেনের লাইন। তবে ট্রেন এখন চলছে না।
ঠান্ডার লেশমাত্র নেই। হতে পারে বর্ষার কারণেই। মেঘে ঢাকা কার্শিয়াংকে অতিক্রম করলাম। ধীরে ধীরে পেরিয়ে গেলাম কার্শিয়াং স্টেশন এবং বাজার এলাকা। তার পর পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের কার্শিয়াং টুরিস্ট লজ পেরোতেই শেষ হয়ে গেল শহরটা।

কিছুক্ষণের জন্য সবুজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম। আবার পড়লাম সবুজের সাগরে। বৃষ্টি হচ্ছে মাঝারি, গাড়ির কাচে যে জল আসছে সেটা সরিয়ে দিচ্ছে ওয়াইপার। কিশোরের গান চলছে গাড়িতে। আহ, এক মায়াবী পরিবেশ।
ছোট্ট স্টেশন টুং পেরিয়ে গেলাম। টয় ট্রেনের লাইনটা কখনও আমাদের বাঁ দিকে আসছে, কখনও চলে যাচ্ছে ডান দিকে। এ ভাবেই এগোতে এগোতে পৌঁছে গেলাম সোনাদা। হিলকার্ট রোডের ওপরে অন্যতম ব্যস্ত এক শহর এই সোনাদা। সমুদ্রতল থেকে উচ্চতা ৬ হাজার ১৪৩ ফুট। বাঙালির অতিপ্রিয় এই সোনাদা থেকেই হিলকার্ট রোড ত্যাগ করলাম। ঘুরলাম বাঁ দিকে, পাচেংগামী পথে।

রাস্তা এ বার ক্রমশ নামতে শুরু করল। দশ মিনিট এ ভাবেই টানা নেমে যাওয়ার পর একটা বাজার এলাকা পড়ল। দোকানের সাইনবোর্ড দেখেই বুঝে গেলাম এসে গিয়েছি আমাদের প্রথম গন্তব্যে। এ বার আমাদের আস্তানাটা খুঁজে বের করতে হবে।
তবে বেশি হ্যাপা পোহাতে হল না। আমাদের অবস্থান সম্পর্কে সব সময় অবগত করে যাচ্ছিলাম বিমলদাজুকে। তাই তিনিও রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষাই করছিলেন। সঠিক আন্দাজ করেই হাত দেখিয়ে আমাদের গাড়ি দাঁড় করালেন। সাদরে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে গেলেন তাঁর বাড়িতে।
নিজের দু’ তলা বাড়ির ওপরের তলাটাকে হোমস্টে করেছেন বিমল ছেত্রী। এ ছাড়াও তাঁর বাগানের ওপরেই আরও দু’টো কটেজও তৈরি করেছেন তিনি। এর মধ্যে একটি কটেজে দু’ জন, অন্যটায় চার-পাঁচ জন আরামে থাকতে পারেন।
এই দুটো কটেজেই আমাদের সকলের ঠাঁই। কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে এলেন বিমলদাজুর স্ত্রী আমিনা। চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী খাদা পরিয়ে আমাদের হোমস্টেতে স্বাগত জানালেন তাঁরা।
বছরখানেকও হয়নি তাঁর বাড়িতে হোমস্টে তৈরি করেছেন বিমলদাজু। এই চত্বরে এটি একমাত্র হোমস্টে। নাম দিয়েছেন চিয়াবাড়ি হোমস্টে।

নেপালিতে চিয়া অর্থাৎ চা। তা হলে কি হোমস্টের সঙ্গে চায়ের সম্পর্ক আছে?
আলবাত আছে। বিমলদাজুই আমাদের মনের কৌতূহল দূর করে দিলেন। আসলে সাতটা বাগানে ঘিরে রেখেছে এই পাচেংকে। তাই নিজের বাড়ির নামও এমন করেছেন তিনি।
পাহাড়ের হোমস্টেতে একটা বড়ো বৈশিষ্ট্য হল সুস্বাদু খাবারদাবার। দীর্ঘ সময়ের জার্নির পর খিদেও পেয়েছিল প্রচণ্ড। আমিনার হাতের অপূর্ব রান্না এক লহমায় এই খিদে আরও বাড়িয়ে দিল।
গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, ডাল, স্কোয়াশের তরকারি আর আলুভাজার সঙ্গে ছিল চিকেন। অপূর্ব তার স্বাদ। এমনকি যে স্কোয়াশের তরকারিকে কলকাতায় বিস্বাদ লাগে, সেটাকেই পাহাড়ি রান্নায় মনে হল অমৃত।
পেট ভরে খাওয়ার পর একটু হাঁটতে মন চায়। বিমলদাজুই সিরুবাড়ির কথা বললেন। রাস্তা খাড়াই নয়, তাই হাঁটাহাঁটি করতেও খুব ভালো লাগবে। আমরা এগিয়ে গেলাম সেই দিকেই।
পাচেং বাজারকে ডান দিকে রেখে বাঁ দিকের রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগলাম। এখন বৃষ্টি নেই, তবে মেঘে ঢাকা চারপাশ। আশেপাশের জঙ্গল থেকে নানা রকম পোকামাকড়ের শব্দ। সে শব্দগুলোও শ্রুতিমধুর। এর মধ্যেই রয়েছে হরেক রকম পাখির ডাক। আমাদের দলে কোনো পক্ষীবিশারদ থাকলে ডাক শুনে এখনই বলে দিতেন পাখির নাম।
আরও কিছুটা এগিয়ে যেতেই চলে এল সিরুবাড়ি ভিউ পয়েন্ট। চা বাগানের দৃশ্য করছে মুগ্ধ। চারিদিকে এত সবুজ দেখে চোখের তো আরাম হচ্ছেই, মনেরও হচ্ছে।

আহ! এমন একটা সময়, এমন একটা জায়গাই তো চাইছিলাম। গত দু’ তিন মাসের সেই দুর্বিষহ সময়টা পেরিয়ে এসেছি। বাড়ি বসে বসে কর্মব্যস্ততার মধ্যে প্রহর গুনেছি কবে এই ছুটিটা পাব। পাহাড় ডেকে যাচ্ছিল সব সময়, মনে হচ্ছিল এক ছুট্টে চলে যাই তার কাছে। কিন্তু সম্ভব হচ্ছিল না।
অবশেষে সুযোগটা এল। জানি না দু’ তিন মাস পর করোনার নতুন করে ঢেউ আসবে কি না। চারিদিকে ভয়ের আবহ এখনও রয়েছে। কিন্তু সেই ভয়কে দূর করে এখন আমাদের কাছে শুধুমাত্র একটায় চাওয়া – এই সবুজ যেন সঙ্গে থাকে পরবর্তী দশ দিনও।
(চলবে)
The post সবুজের সাগরে ভেসে পৌঁছোলাম পাচেং appeared first on Bhramon Online.
]]>