The post করোনা-কালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে/শেষ পর্ব: বিদায় ব্রহ্মকুণ্ড, বিদায় হর কি পৌড়ী appeared first on Bhramon Online.
]]>এমন সুযোগ কদাচ মেলে। সুবর্ণ সুযোগ। হ্যাঁ, একজন জৈন দিগম্বর দাঁড়িয়ে আছেন। আমজনতার স্নান দেখছেন। উদাস দৃষ্টি। জনস্রোত আর গঙ্গার স্রোত মিশে বয়ে চলেছে ব্রহ্মকুণ্ড থেকে অরূপকুণ্ডে। এই জৈন দিগম্বর মুনিজি মাস্কহীন, মুখ উন্মুক্ত। দক্ষিণ হস্তে ছোট্ট একটি মৃত্তিকাপাত্র। গায়ে একটি ছোট্ট শুভ্র চাদর। মুখে ধর্মীয় ঢাকনাও অনুপস্থিত। দিগম্বরের সঙ্গে বাক্যালাপ করে আমি তাঁকে বিব্রত করিনি। কিছুক্ষণ স্থির থেকে, ধীর পদক্ষেপে উনি চললেন আপন আশ্রম সুখীনালার নিকটবর্তী। ওঁর নাম সংযম সাগর (দিগম্বরজি)। সামনের তিথিতে হেঁটে যাবেন গোমুখে, উনি একাই। এত শত জানলাম কেমন করে, একটি শব্দও বিনিময় না করে? সংযোগে সাহায্য করেছিলেন ভ্রাতৃপ্রতিম বন্ধু, জৈন মন্দির বিশেষজ্ঞ পুরুলিয়া-চেলিয়ামার সুভাষ রায়। অপূর্ব সব তথ্য পেলাম তখুনি রাজস্থানে ফোন করে। সিনিয়ার দিগম্বর মণীষ ব্রহ্মচারীজির কাছে। ইউপি-র মানুষ।
মন খিঁচড়ে গেছে। কুম্ভমেলা টাল খেয়েছে। আমার ফেরার টিকিট এপ্রিলের শেষ দিনে। ক্লান্তিকর চুপচাপ একা ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের ঘরে এখনও প্রায় দু’ হপ্তা। ফুয়েল (সদ্ অর্থে) বাড়ন্ত। হাঁটতে পারব না। চড়া ভাড়ায় রিকশা/অটো নিতে পারব না। শরীরের চার্জারও ডাউন। সন্ধ্যায় সুসংবাদ, ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের কোটায়, গ্রুপ টিকিটে আমারও স্থান হয়েছে। জয় গুরুমহারাজ।
হরিদ্বারে এলে কনখলে এই হাসপাতালে অন্তত এক বার আমাকে দর্শন দিতেই হয়। ২০১০ সালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভমেলা কভার করতে এসে জ্বর-সর্দিতে কাবু হয়ে গেছিলাম। এখানকার চিকিৎসাতেই সুস্থ হয় উঠি। হাসপাতালের নাম ‘রামকৃষ্ণ মিশন সেবাশ্রম’। সাধারণের কাছে রামকৃষ্ণ মিশন হাসপাতাল। রিকশা, অটো এবং টাঙার ঘোড়াও জানে-চেনে ‘বাঙালি হাসপাতাল’। অবশ্য রামকৃষ্ণ মিশন হাসপাতাল/সেবাশ্রম বললেও চিনবে।
গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী অসুস্থ হলে তাঁদের চিকিৎসা পরিষেবা কে দেবে? সময়টা ছিল বিশ শতকের একেবারে গোড়ার দিক। তখনকার হরিদ্বারে কোনো হাসপাতাল ছিল না। এই সংকটে স্বামী বিবেকানন্দের নির্দেশে তৈরি করা হয় এই হাসপাতাল। ১৯০১ সালে কল্যাণানন্দজি স্থাপন করেন। শুরুতেই কল্যাণানন্দজির সঙ্গে সাথ দেন নিশ্চয়ানন্দজি। ভারতে হসপিটাল সার্ভিসের ইতিহাসে এই হাসপাতাল এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত।
এখন তো এখানে সাধু-সন্ন্যাসী ছাড়াও আমজনতা পরিষেবা পেয়ে থাকেন। সেখানে গেলাম। আমার এবং প্রহরীর, দু’ জনেরই মুখে মাস্ক। করোনাবিধি। কাউকে বিরক্ত না করে গেটে মাথা ঠেকালাম। নিশ্চিত আমি, আমার এই প্রণাম আমার দেশের মানুষ কামারপুকুরে শ্রীরামকৃষ্ণদেব এবং জয়রামবাটীতে আমার মায়ের কাছে পৌঁছোবে।
অনেক দূরে, প্রায় প্রান্ত কনখলে পাইলটবাবার শুনসান আশ্রম। খুব সকাল সকাল হাজির হলাম। করোনার কারণে একা কুম্ভ রক্ষা করে বসে আছেন নীলকণ্ঠানন্দজি। আমার বিশেষ পরিচিত। আদি দেশ বেহালা থানা সংলগ্ন। সামান্য কথা হল। বাইপাস হয়ে গেছে ওঁর। পালিত কন্যা শিউলি পুত্র-সহ মথুরায় সংসার পেতেছে। বড়ো নিঃসঙ্গতাবোধে আক্রান্ত উনি। জলদি বেরিয়ে এলাম। লকডাউন শুরু হবে একটু পরেই। অনেক ভাড়ার কড়ারে পথে বের হওয়া রিকশা আমার অপেক্ষায়। গেটে হর্ন বাজিয়ে আমায় ডাকছে।

কনখলের আনন্দময়ী মায়ের আশ্রমের বন্ধ গেটের সামনে এই আটসকালে এক দল দণ্ডীস্বামী সন্ন্যাসী এবং সন্ন্যাসিনীরা গেট খোলার অপেক্ষায়। করোনা-কাল বলেই এই কনখলে শ্মশানের স্তব্ধতা। গেটেই মাথা ঠেকাই। করোনার চক্রান্ত না থাকলে অন্য সব আশ্রমের মতোই মা আনন্দময়ী মায়ের সংসার গমগম করত। আমিও সকালের নাস্তা পেতাম।
যেতে পারলাম না। অসম্পূর্ণ আমার এ বারের করোনাক্রান্ত হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভ ভ্রমণ। কলকাতার ‘সংবাদমন্থন’ পত্রিকার (সম্পাদক জিতেন নন্দী) ভ্রাতৃপ্রতিম লেখক-সাংবাদিক সমস্ত ঠিকানা দিয়েছিলেন। তবুও যেতে পারলাম না কনখলে শিবানন্দ সরস্বতীজির মাতৃসদন আশ্রম। এরা গঙ্গা-মাফিয়ার বিরুদ্ধে নীরবে আন্দোলন করে চলেছে প্রায় সিকি শতক ধরে। সত্যাগ্রহ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন। নীরব প্রতিবাদ। অনশন করে চলেছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে পাঠ নিয়েছেন শিবানন্দজি। স্কুলে পড়াতেন। কেশরাম কটন মিলে একদা জীবিকা। পরে সন্ন্যাসীজীবন এবং গঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনে নিবেদিত অন্যান্য আশ্রমিককে নিয়ে। লড়ছেন শিবানন্দ সরস্বতীজি।
চলেছি হরিদ্বারের লালতারা পুল পেরিয়ে জুগতরাম মিশন মার্গে উদাসীন আশ্রমে, গঙ্গাদাস উদাসীনের কাছে। এঁরা সস্ত্রীক আশ্রম করেছেন এবং আশ্রমেই থাকেন। গুরু গ্রন্থসাহেব পাঠ করেন শিষ্যদের নিয়ে। বন্ধ গেট থেকেই দু’ জনে কুশল বিনিময়। জানালেন, “বাহার সে কোই অন্দর না আ সকে।” ফেরত-পথে পরের পংক্তি মনে মনে, “অন্দর সে কোই বাহার না জা সকে।”
“কে এই গঙ্গাদাস উদাসীনজি?” আমার প্রশ্ন।
উত্তর দিল ধর্মাশোক – “গুরু জুগতরাম এবং শিষ্য গঙ্গাদাসের দেশ ছিল অবিভক্ত ভারতের সিন্ধু প্রদেশের সকুর জেলায়। ১৯৪৭-এ বাস্তুচ্যুত হয়ে ইন্ডিয়ায়। অবশ্য গঙ্গাদাসের জন্ম পাকুড়ে (ঝাড়খণ্ড) এবং কর্ম কলকাতায়। পুত্র মহেশলাল এখন সাঁই মহেশলাল। ছত্তীসগঢ়ে রায়পুরের লাখিনগরে ১৯৯৮ সালে গড়েছেন স্বামী জুগতরাম মিশন। সস্ত্রীক সেখানেই অবস্থান করছেন। উদাসীন সম্প্রদায় গুরু নানক-আশ্রিত এবং গুরু গ্রন্থসাহেব-পঠিত।”
কিন্তু এ সব তো সাধারণ ব্যক্তিক তথ্য। আসলে ঠিক কী বলতে চাও তুমি, ধর্মাশোক?
বলতে চাই, সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো মহান্ত বা মহামণ্ডলেশ্বর মূল সংগঠনে থেকেই নিজের (ব্যক্তিগত) এক বা একাধিক আশ্রম গড়তে পারেন। মূল আখাড়ার অনুমতি নিয়েই। অনেক আখাড়া সম্মতি দেয়, অনেকে দেয় না। আখাড়ার অনুমতি সাপেক্ষে এবং শর্তা সাপেক্ষে একজন মহান্ত বা মণ্ডলেশ্বর দীক্ষা দেন, নিজস্ব সম্পদও বানান। কুম্ভমেলায় এলে এই বৈভব চোখে পড়ে। এ ব্যাপারে গুজরাতি সন্ন্যাসীরা সবার থেকে এগিয়ে। তবে দিন বদলাচ্ছে। অতি উচ্চশিক্ষিতা মহিলা মাতাজি এবং উচ্চশিক্ষিত বাবাজিরা অনেকটা এগিয়ে। এঁদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলা যায়, এঁরা কর্পোরেট সন্ন্যাসী বা কর্পোরেট স্যাফ্রন।
ওরে বাপস! আমার চোখ পানিপুরি হয়ে ওঠে।
ধর্মাশোক যোগ করল, সাঁই মহেশলালের এডুকেশনাল কোয়ালিফিকেশন? স্কুলিং হরিদ্বার ডিপিএস। আইএমএস দেহরাদুন। এমবিএ গুরুকুল কাংড়ি। একাধিক ভারতীয় ভাষা জানেন। এই নয়া পিঁড়ির (প্রজন্ম) তরুণ-তরুণীরা নিজের সংগঠনকে ধনে-মানে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবেন। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে ফান্ড রেজ করবেন। আশ্রমের নানা শাখা গড়বেন। ক্ষতি কী? একটা শিক্ষালয় গড়লে সার্বিক উন্নতি। এমপ্লয়মেন্ট হবে কত কত!
পূর্ণকুম্ভ স্নানযাত্রার ঠিক আগে চলে বর্ণময় পদযাত্রা, যা জুলুস (জৌলুস) নামেই পরিচিত এবং ধর্মীয় গুরুদের তা স্টেটাস। অথবা এ ভাবেও বলা চলে, বিত্তের প্রদর্শন। বহু ব্যয়ে, বহু বাজি ফাটিয়ে আখাড়ার পুণ্যস্নানের ঘোষণা, অমৃতময় বাতাসকে ধোঁয়া ও গরলে ভরে দেয়। ভিন্ন আখাড়ার সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা। অবশ্য হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে দু’টি বৈভবাক্রান্ত আখাড়াকেই একাধিক তোপধ্বনি, অসংখ্য বাজি ফাটাতে দেখেছি। মনে হয় কোনো বিয়ে উপলক্ষ্যে হবু গর্বী বর চলেছে নিরীহ কনের বাড়ির দিকে। এই বছরে বাজির উৎপাত ছিল না। ছিল না অসংখ্য জুলুসের বর্ণময় সুসজ্জিত ট্রাক্টরের সংখ্যাধিক্য। কিন্তু ছিল, কম হলেও। তিনমুখো ডিজে বক্স শব্দদূষণ ছড়ায়নি বোধ করি। কারণ উহা ঈশ্বরের শব্দময় সচল পদযাত্রা।

জ্বালাপুরে মুসলিমদের আছে একাধিক ব্যান্ড, বিখ্যাত। নানা রকম জুলুসে তাঁরা বাজনা বাজান। দলের প্রধান কণ্ঠশ্রী একটি গান দু’ রকম স্বরে গেয়ে গণপথ, স্নানযাত্রার পথকে বিশেষ মাত্রা দেন। বেশ লাগে। তবে তখন আমার মনে পড়ে যায়, বর্ধমান জেলার প্রত্যন্ত এক গ্রাম সোনাপলাশির নবদ্বীপ হালদারের কথা। সে যুগের বিখ্যাত কমেডিয়ান, একাধিক স্বরে গেয়েছিলেন ‘খাওয়াদাওয়া’।
“তবে তো দেখতেই পাচ্ছ বন্ধু, পৃথিবীতে যা কিছু সবই পুরাতন, প্রাচীন। শুধু ফিরে ফিরে দেখা হয় নয়নের মণিতে, কনীনিকায় ফেরে জন্ম-মৃত্যু, ঈশ্বর-পৃথিবী ও ভালোবাসা”, উদাস চয়ন, উদাস বচন ধর্মাশোকের।
আমি শান্ত স্বরে কই, “আচ্ছা একটা কথা বুঝিয়ে কও তো ধর্মাশোক। কুম্ভমেলা কত দিনের পুরোনো? আখাড়া-মঠপ্রধানদের অনেকেই বলে থাকেন, হাজার-লক্ষ বছরের। এমনকি বৈদিক যুগের সময় থেকেই চলে আসছে। সত্যিই কি তা-ই?”
ধর্মাশোক: এটা কেমন করে সম্ভব? সমুদ্রমন্থনের কাহিনি সুখপাঠ্য, বিস্ময়কর, মধুচিত্রিত এক ফ্যান্টাসি। শাস্ত্রে দেব-দানবদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু অমৃত, সমুদ্রমন্থন, হলাহল, নীলকণ্ঠ শিবের উপস্থিতি কল্পমায়ায় আবেশিত। বেদ-উপনিষদ বা মহাকাব্যের যুগে এমন কাহিনি অনুপস্থিত। পৌরাণিক যুগে সমুদ্রমন্থন নেই। সমুদ্রমন্থনের যে কাহিনি-কাঠামো তাতে করে অনুমান, কালিদাস, ভবভূতির সাহিত্যের স্বর্ণযুগের পরে এর উদ্ভব হয়ে থাকতে পারে। আবার বলি, আমি পাথুরে প্রমাণ, শিলালিপিতে পাইনি। সমুদ্রমন্থনে উঠে আসা অমৃতের হাঁড়ি নিয়ে অসুরদের বঞ্চনা করে পালানোর একাধিক মিথ রচিত। সেটিই বা হয় কেমন করে? সত্য এক, সত্য অবিচল।
সমুদ্রমন্থনের যে গল্প, তাকে কেন্দ্র করে পুণ্যকুম্ভের স্নানমেলা, এমনকি অর্ধকুম্ভের স্নানমেলার শাস্ত্রীয় সত্য কোথাও পাইনি। তা ছাড়া, অসুরদের যৌন লালসায় ভোলানোর জন্য বিষ্ণুর নারী-শরীর ধারণ, লাস্যনৃত্য – এই সবে আমার জ্ঞান–রুচির অনুমোদন নেই। আর মানুষের ভাবাবেগ, যুক্তিহীন বিশ্বাস আমি থামাবার কে? তাঁরা থামবেনই বা কেন?
যদিও ঐতিহাসিক সত্যতা আছে ‘মেলা’র ভিন্ন একটি রূপে। স্থান ইলাহাবাদ সংগমতট। এবং তা কুম্ভমেলা বলে পরিচিত নয়। এই মেলার সঙ্গে হর্ষবর্ধনের নাম জড়িয়ে আছে। তিনি পাঁচ বছর অন্তর রাজকোষাগারে সঞ্চিত অর্থ দান করতেন টানা চার দিন। প্রাপকেরা হলেন ব্রাহ্মণ সন্ন্যাসী, বৌদ্ধ ভিক্ষুক এবং গরিব প্রজা। প্রয়াগের সংগমস্থলে মেলা বসত। চার দিন ধরে একটানা দান-অনুষ্ঠান চলত। ‘মহামোক্ষ পরিষদ’ নাম ছিল ওই মেলার। কুম্ভ, সমুদ্রমন্থনের মিথ এখানে অনুপস্থিত। এই সমস্ত মেলা-বিবরণ চৈনিক পরিব্রাজক হিউসেন সাঙ (৬০২-৬৬৪ খ্রিস্টাব্দ) লিখেছেন তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে।
সম্রাট হর্ষবর্ধনের জীবনকাল (৫৯০–৬৪৭ খ্রিস্টাব্দ)। এখন এই তারিখের সঙ্গে বেদ-উপনিষদ-মহাকাব্যের সময়কাল এবং আদি শংকরাচার্যের জীবনকাল মেলালে আজকের কুম্ভমেলার পুরোনো ইতিহাস যা মৌখিক, তা স্থাপিত হয় না। ধর্মাশোকের দীর্ঘ বিবরণে আমার মাথা হিন্দুস্তান-পাকিস্তান। হাওড়া-শেয়ালদা। নাইব, না গা ধোব। তাজ্জিম মাজ্জিম করছে।
আমি বেবাক বোবা হয়ে পাঁচ মিনিট পরে বোতলের জল পান করি। গলা শুকিয়ে কাঠ। দম নিই। প্রশ্ন করি ধর্মাশোককে, তার চোখে চোখ রেখে – “তা হলে এত শ্রম, এত সংঘর্ষ, মঠ-মিশন, মসজিদ-মক্তব চার্চ – এগুলো কেন? ঈশ্বর তো এক কল্পিত বাসনার উড্ডীন ধ্বজা। এক ঈশ্বর অন্য ঈশ্বরের আবাসস্থলে অগ্নিসংযোগ করে এবং সেই ভস্ম উড়িয়ে উল্লাস করে। জীবনের কী পরিহাস! বুঝতে পারিনি বুঝেও। আজও কাঁদে কাননে।”
ধর্মাশোক: চলো হে। এত কর্কশ কোলাহলে ঈশ্বর নেই। এত বৈভবে ঈশ্বর থাকতে পারেন না। চলো গঙ্গার পুব পারে। ওখানে নাগরিক হরিদ্বার অনেকটাই অনুপস্থিত। গাছের তলে ভবঘুরে ঈশ্বর-ঈশ্বরীরা বসে – কেউ জটার জট ছাড়াচ্ছে, কেউ বড়ো চিমটে বাজাচ্ছে। বরং চলো ও দিকটায় হাঁটা যাক। ধর্মাশোকের পিছু নিই আমি।

পার হই লালতারা পুল। একই গঙ্গার ঘাটে ঘাটে কত কত বিচিত্র জীবনের সচল ছবি। ওই তো কত কত চেনা মুখ। সামান্য একটু দূরে দেখো – এক মা পা মেলে সুখাসনে। সামনে তার মাধুকরীর পাত্র। কোলের শিশুটিকে বক্ষসুধা, অমৃতের অধিক, পান করাচ্ছে। আমাদের অবিবেচনার পাপ, ‘সভ্যতা’র গরল আবর্জনা, মা গঙ্গা বহন করে চলেছে। তিনিও ক্লান্ত। অবসন্ন। পশ্চিম পাড়ে ব্রহ্মকুণ্ড ঘিরে পুণ্যের জলকেলি – বাসি চৈত্রসংক্রান্তির স্নান, যা শাহিস্নানের একটি, গতকাল ছিল। আজও তার জের চলছে উন্মাদ পঞ্জিকালিপিতে। মাস পয়লা, বছর পয়লা, বাঙালির বিশেষ দিনের স্নান। যাহ! জীবন থেকে একটা বাংলা বছর চলে গেল, চলে গেল ১৪২৭। এল ১৪২৮। আমরাও তবে এগিয়ে চলেছি মৃত্যুর দিকে, আবার ধেয়ে আসতে পারে মৃত্যুর তৃতীয় ঢেউ, করোনার তৃতীয় ঢেউ।
কারা এই করোনা জীবাণু ছড়াল বিশ্ববাতাসে? চিন চিন করে ওঠে বুকের বাম অলিন্দ। ক্রোধে রক্ত ওঠে মাথায়। কত কত বন্ধু, ‘অচেনা’ বান্ধব, সুজন স্বজন মিলিয়ে গেল ব্যোমে। কিছুই হারায় না। এক্ষণে তারা ঘুরছে মহাকাশে, সপ্তাকাশে। যাচ্ছি বন্ধু। আবার দেখা হবে। নিয়ে আসব তোমাদের সকলকে। এই মৃত্যু-উপত্যকায় আবার আমরা রচিব নব পত্রবিন্যাস। আমি শ্রমিক। তোমাদের সকলের বোঝা, ক্লেদ-গ্লানি-ঘাম-কান্না এবং হাস্যকৌতুকের ভার আমি বয়ে নিয়ে চলব সংগমে, কাবেরী ও শিপ্রার জলে করব তর্পণ। আমি হব ভগীরথ। বাজাব দক্ষিণাবর্ত। তোমাদের বিলিয়ে দেব অমৃতভাণ্ড।
গঙ্গার জলে অঞ্জলি ডোবাই। তাকিয়ে দেখি, সচল মালুপাতার বাটি, ভেসে চলেছে। ভেসে চলেছে জ্বলন্ত কর্পূর-দীপশিখা। কে ভাসিয়েছে কার উদ্দেশে? হয়তো আমারই উদ্দেশে তোমার প্রেমজল। কোভিডে প্রয়াত সুজন স্বজন চিকিৎসক সেবিকা গৃহী ভোগী যোগী – সচল মা গঙ্গার স্রোতের উদ্দেশে সকলের জন্যই বলি:
ওগো মা গঙ্গা মাগো মা গঙ্গা/ দিনু ভাসায়ে মোর স্বজনে/তুমি দেখো তারে।…
বিদায় হরিদ্বার। বিদায় ব্রহ্মকুণ্ড। বিদায় হর কি পৌড়ী। বারো বছর পরে। আবার এক যুগ পরে। কে রয়! কে ভেসে যায় ব্যোমে! সাষ্টাঙ্গ প্রণমি। নমামি, উর্বর এই দেশমৃত্তিকার অপূর্ব মিথাশ্রিত সমুদ্রমন্থন।(শেষ)
The post করোনা-কালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে/শেষ পর্ব: বিদায় ব্রহ্মকুণ্ড, বিদায় হর কি পৌড়ী appeared first on Bhramon Online.
]]>The post করোনা-কালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে/৮: সুদৃশ্য বর্ণময় জুলুস ধর্মীয় নেতাদের, দূরত্ববিধি শিকেয় appeared first on Bhramon Online.
]]>কুম্ভমেলার অমৃত, স্নানমেলার পুণ্যডুবকি ঘেঁটে ‘ঘ’। ধনে-মানে নাগা (নাঙ্গা) সন্ন্যাসীরা (ফৌজ) সংখ্যায় (প্রাচীনতায় নয়, প্রাচীনতম হল শ্রীপঞ্চদশনাম আবাহন আখাড়া, প্রতিষ্ঠাবর্ষ ৫৪৭ খ্রিস্টাব্দ) গরিষ্ঠ। তারা হু-হুংকার ছাড়ছে করোনা-কুম্ভমেলা নিয়ে। দাবি বৈরাগীদের, মেলা চলবে মেলার স্থায়িত্ব রামনবমী অর্থাৎ ২১ এপ্রিল পর্যন্ত। শ্রীরামজি, রামমন্দির এখন কট্টর হিন্দু ভারতীয়দের নাভিকুণ্ড। সুতরাং রামনবমীর আগেই কুম্ভমেলা, কুম্ভস্নান রোধে কার সাধ্য! তাই মেলা যেমন চলত তেমনি চলছে, চলবে। অমৃত, সমুদ্রমন্থন অমর রহে। যুগ যুগ জিও।
প্রায় হাজার কোটি রুপির মেলা-মচ্ছব-মালসাভোগ। এ দেশ ঋষিপ্রধান। এ দেশ কৃষিপ্রধান। কৃষকেরা বসে আছেন রাস্তায় ২০০ দিন হল (এই কপি যখন লিখছি তখন আন্দোলনকারী কৃষকদের দু’শো দিন পার হল)। ধর্মগুরুদের ফুৎকারে উড়ে যেতে পারে রাজ-মসনদের পায়া। সামনেই ভারতের সব চেয়ে বড়ো রাজ্য ইউপিতে নির্বাচন, যে রাজ্যটি আবার ভারতের অন্যতম প্রাচীন শৈব্যপন্থী কর্তৃক পরিচালিত। এবং তার পরেই, পর পর একাধিক রাজ্যে ‘পবিত্র’ গণতন্ত্রের ফাইনাল গেম। উত্তপ্ত লাভার ওপরে বসে আছেন দেশের শাসকেরা, যাঁরা আবার কট্টর হিন্দু-আশ্রিত। কড়া সিদ্ধান্ত নিয়ে, করোনাবিধিকে মান্যতা দিয়ে, তাঁরা কুম্ভমেলা সংক্ষিপ্ততম করতে পারেন? আলবাত না। প্রায়াসম্ভব। একশো তিরিশ কোটির মধ্যে ওই সামান্য সংখ্যা মরে-হেজে গেলে কার কী? তারা প্রাণহীন হয়ে গঙ্গায় ভাসল তো বয়েই গেল। তীরে কোলাহল তীব্র হবে না। বরং শাল-শোল-বোয়াল-মাগুর-সিং মাছেদের মহোৎসব হবে। জয় গুরু।
আমার ধারণা তৈরি হয়েছিল হরিদ্বারে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘে বসেই, কুম্ভস্নান পুরোটাই হবে। যেমন হয়ে থাকে, হয়েছে আগের বছর, তার আগের আগে, অমৃতকুম্ভে। নানা রকমের সিদ্ধান্ত রাজ্য সরকারের, কেন্দ্রীয় সরকারের, স্থানীয় প্রশাসনের এবং আমজনতার। ফলে সংশয়-সংকোচ-শঙ্কায় মাখো মাখো স্নানমেলার সিদ্ধান্ত। মহাশিবরাত্রি (১১ মার্চ) থেকে রামনবমী, তা থেকে চৈত্রপূর্ণিমা – ক’ দিন হয় কাকা? দেড় মাসের অধিক। এই বলছ সংকুচিত কুম্ভমেলা এক মাসের। কখনও বলছ প্রতীকী ডুবকি। আবার বলছ ভার্চুয়াল স্নান। পাগল না পেটখারাপ?

এক বার দেখে নেওয়া যাক কুম্ভমেলার ক্যালেন্ডার, যা উত্তরাখণ্ড সরকার প্রচারিত এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্ট্যাম্প মারা। সঙ্গে আছে গুগুল জ্যাঠা। হবে জয়।
১৪.০১ থেকে হরিদ্বারে কুম্ভস্নানযোগ অর্থাৎ পুণ্যস্নানের যোগ লাগছে। ১৪.০১ থেকে ১৩.০৩ পর্যন্ত চারটি পুণ্যস্নানের দিন। এই স্নানগুলিকে বিশেষ অভিধায় বলা হয়েছে ‘প্রমুখ স্নান’। অর্থ হল, আরম্ভ বা সূত্রপাত। সূত্রপাত কীসের? পুণ্যস্নানের নিশ্চয়ই। হরিদ্বারের পূর্ণকুম্ভের সময়ে যখন এই তথ্য প্রকাশ করছে সরকার, তখন তা অবশ্যই কুম্ভস্নান সম্পর্কিত। তাই তো?
সকল সন্ন্যাসীই গেরুয়াধারী। কিন্তু সব গেরুয়াধারীই সাধু নন। সজ্জন নাও হতে পারেন, সে তো জানি। তেমনি সব নির্বাচিত গণপ্রতিনিধি দেশসেবক নন। ঠিক তেমনি সব স্নানই পুণ্যের। কিন্তু সব স্নানই কুম্ভস্নান নয়। একটা উদাহরণ: ১৪.০১ মকর সংক্রান্তি, সমগ্র ভারতবর্ষে পুণ্যস্নান। এবং এটি বিশেষ, রয়্যাল বা শাহিস্নান। কিন্তু এটি ইলাহাবাদ কুম্ভমেলার সঙ্গেই যুক্ত। এটি কোনো ভাবেই হরিদ্বার কুম্ভমেলার স্নানের সঙ্গে যুক্ত নয়। তা হলে হরিদ্বার কুম্ভমেলার ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছে কেন? ট্যুরিজিম প্রোমোশন? আমদানি-রফতানির হিস্যা? এর চেয়ে বলো না কেন জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত গামছা পরে ব্রহ্মকুণ্ডের গলা জলে বসে থাকো। এমনিতে সমগ্র সভ্যতাটা তো ‘বেনের পুঁটুলি’তে, লাভ-ক্ষতির জাবেদা খাতায় কুম্ভসংস্কৃতি ভরে ফেলেছ কাকা। থাক না ওইটুকু ভূখণ্ড। ওই সাড়ে তিন হাত মিট্টি।
হরিদ্বার ২০২১-এর করোনাক্রান্ত কুম্ভ থেকে ঘরে (কলকাতায়) ফিরে লিখছি, রিপোর্ট বা প্রতিবেদন নয়। সে তো হরিদ্বারে বসে মেলার নিত্যদিনের প্রতিবেদন, যা গরমাগরম লিখেছি। পাঠিয়েছি। ছাপাও হয়েছে সেই সময়ে। ছেপেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্র। তা তো চুকেবুকে গেছে। এখন লিখছি গরলামৃত, গ্রন্থের জন্য। দীর্ঘ লেখা, ইন ডিটেল। জায়গার অভাব বা শব্দসংখ্যার সংকোচন নয়। ভাবছি আর দেখছি চোখের পিছনে, সামনে, সেই প্রতি দিনের পথ হাঁটার ছবি। নিজের সঙ্গে কথা বলার পিকচার গ্যালারি – হাওড়ার পুল দেখো, কালীঘাট দেখো, উত্তমকুমারের পকেটে সুচিত্রা সেন দেখো, দক্ষিণেশ্বর দেখো, মহারানি ভিক্টোরিয়া দেখো, আর দেখো পরেশনাথ মন্দির…। গ্রামিক মেলায় দেখা রহস্যময় বাক্সের ভিতরের সচল ফোটো। গোলাকার কাটা অংশে চোখ ডুবিয়ে, শৈশবের অমৃত।
বারে বারে এই বর্ণনা লিখতে বসে ভাবছি, মানবসভ্যতার সংকটে ধর্ম বুঝি পিছিয়ে নিয়ে যাবে ভারতকে। শৃঙ্খলিত করবে, কারাগারে বন্দি করবে ইন্ডিয়াকে। তবে কি মানবমন নবাগতকে ভয় পায়? ভয় পায় বিজ্ঞানকে? পায় বই-কি। শাস্ত্রবাহক পুরোহিতরা কি পুড়িয়ে মারেনি বিজ্ঞানীকে, সমাজসংস্কারকদের! মন ভার হয়। তাই যদি সত্য হয়, তো কী হবে এই সব লেখালেখি করে? কী হবে শব্দের, বাক্যের সমিধ জ্বেলে? কী হবে আপন হাড়ে আগুন জ্বেলে?

অথচ একদা সমস্ত ধর্মই অতীতে এই সভ্যতাকে দিয়েছিল যথাসর্বস্ব। সংগীত, সাহিত্য, অঙ্কন, চিত্র-স্থাপত্য…। এখন সকল ধর্মের ইজারাদাররা মানবসভ্যতাকে দিচ্ছে শুধুই গরল। গরলই অগতির গতি। বন্ধ্যার পতি। আহাম্মকের চালকুমড়ো।
হরিদ্বারের পথঘাট স্বাভাবিক কারণেই (তীর্থযাত্রীর সংখ্যা কম) পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন। তবে করোনার কারণে কি আরও সতর্ক হওয়া উচিত নয়? সতর্ক হওয়া কি যেত না? যত্রতত্র মুখ দিয়ে রক্তবমন, গুটখার থুথু, পান পরাগের বমি। ফুটপাত অধিকৃত খাটাল, ভগবতী মায়ের সঙ্গে কচি বাচ্চা। মা ডাকল হাম্বা। ‘বেশ করছি। আমরা এখানে মলমূত্র ত্যাগ করি। খুব দোষের না? আর কুম্ভস্থলে যে তোমাদের আশ্রমের ক্যান্টিলিভার গঙ্গার কোলে বসে আছে, তার বেলা? হাম্বা। আমরা নিরীহ বলে তোমাদের গাত্রজ্বালা! হাম্বা হাম্বা হাম্বা’।
সচল বিষ্ঠা পড়ছে টাঙার ঘোড়া থেকে। কাটা ফলও বিক্রি হচ্ছে, সংখ্যায় কম হলেও। ওদের ঠ্যালাগাড়িতে যে মোটা কালো ধূপ জ্বলে তা আমার কাছে আনন্দ, সুগন্ধে ভরপুর। আপেল-বেদানার থেকে কম মিষ্টি নয়। এ বছরও যাযাবরী-বেদেনি সুন্দরীরা উপস্থিত, তবে সংখ্যায় কম। রঙিন পাথর-সহ একমুখী থেকে বহুমুখী রুদ্রাক্ষ। সুন্দরীদের শুধু আমি একলাই দেখি না, বুড়ো সন্ন্যাসী, ছোকরা ব্রহ্মচারীরাও দেখেন। জপমালা কেনার ছলে। যাযাবরীরা বড্ড গুটখার ছিবড়ে ফেলে, থুতু-সহ। শুধু হরিজনরাই, বিশেষত কুম্ভমেলার সময়, সড়ক পরিষ্কার রাখে ৭X২৪ ঘণ্টা। করোনার বয়ে গেছে বিদায় নিতে।
ধর্মীয় নেতাদের স্নানযাত্রার জুলুস, বর্ণময় মিছিল অতীব সুদৃশ্য। কিন্তু কোভিড-কুম্ভে দূরত্ববিধি কোথায়? গৃহী-সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারীদের মিছিল যেমন প্রতি বার হয়, পূর্বেও যেমন হয়েছে, এ বারেও হচ্ছে সংখ্যায় কম হলেও। সচল জুলুসে অনেকেরই মুখে নেই মাস্ক। খুলে যাচ্ছে। ভুলে যাচ্ছে। গায়ে গায়ে ঠেকে যাচ্ছে লরির মধ্যে। চামর দোলাচ্ছে গুরুর মাথায়। এবং মাস্ক পরে আপনআপন সম্প্রদায়-ইষ্টদেবের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে মজা নেই। খুলে রাখো। আপাতত পকেটে রাখো মাস্ক।
‘… তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না,/করে শুধু মিছে কোলাহল…’।
বাল্মীকি চৌকের আগের চৌমাথায় শিবমূর্তি হলাহল পান করেছেন। শুভ্র পাথরের শিবমূর্তি নিজের মাথায় নিজেই জল ঢালছেন। বিষে, অমৃতকুম্ভের বিষে জর্জরিত শরীরে, তিনি নিজেই দু’ হাতে জলপূর্ণ কলস ঢেলে আসছেন, সেই সত্যযুগ থেকে। ভোলেভালে মহেশ্বর। মা দুগ্গার টাইম নেই। রান্নাঘরে ডালে ফোড়ন দিচ্ছেন। এই সব ভাবছি আর দেখছি শান্তিতে। ভিড় তো বিশেষ নেই, হরিদ্বারের করোনা- কুম্ভে, ২০২১-এ।

চলেছি ভোলাগিরি আশ্রমের দিকে, হরিদ্বারে আমার প্রিয় স্থানে। আয়তনে বিপুল। আশ্রমপ্রধান দেবানন্দ সরস্বতীজি প্রয়াত। পরবর্তী প্রধান, তরুণ সন্ন্যাসী গহনানন্দজিও (বর্ধমান জেলার মানুষ) প্রয়াত। পরমানন্দজিও (দক্ষিণী মানুষ) প্রয়াত। এঁরা সকলেই আমার পরিচিত। প্রথম দু’ জনের প্রয়াণের কথা জানতাম। আশ্রমে গিয়ে ফুলের বাগানের দিকে তাকিয়ে আছি মুগ্ধতায়। সাইকেল মহারাজের কাছে জানলাম পরমানন্দজির প্রয়াণের কথা। ঝুপ করে গোটা ফুলের বাগানে আঁধার নেমে এল মধ্যদুপুরে।
সামলে নিলাম। ‘…তবু অনন্ত জাগে…’। সাইকেল মহারাজ, কোন মরুভূমির কে জানে, রসালো খেজুর দিয়ে বললেন, “প্যাকেটটা রাখুন। টং টং করে ঘোরেন। কিছু না জুটলে দু’টো মুখে ফেলবেন। পিত্তি পড়বে না। আপনার লিভারটা বাঁচবে।” কোষাধ্যক্ষ মহারাজ নির্মলানন্দ সরস্বতীজি ছড়া কাটলেন। দেবানন্দজির কাছে শোনা: ‘কুম্ভ হল টাকার খেলা/মহাকুম্ভ ভক্তের খেলা’ (ভক্তরা টাকা না দিলে কুম্ভের বৈভব চুপসে যাবে)। কত যে ছড়া বলতেন দেবানন্দজি! বর্তমান প্রেসিডেন্ট মহারাজ তেজসানন্দজি মিঠে হেসে বললেন, “বাব্বা, মিডিয়ার মানুষকে আশ্রয়-অন্ন, দু’টোই দিতে হয়। তা না হলে বিপদ। কবে আসছেন, অগ্রিম জানাবেন।” (চলবে)
The post করোনা-কালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে/৮: সুদৃশ্য বর্ণময় জুলুস ধর্মীয় নেতাদের, দূরত্ববিধি শিকেয় appeared first on Bhramon Online.
]]>The post করোনা-কালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে/৭: সরকারি ঘোষণার পরে লেগে গেল স্নান-রাজনীতি appeared first on Bhramon Online.
]]>কে আর হাঁটে এই চড়া রোদে। পঙ্গতে সম্মাননীয় অতিথি হয়ে ধর্মগুরুদের বিপরীতে লাইনে দূরত্ব রেখে বসেছিলাম। এটাই কানুন। এবং এ-ও কানুন, ভোজন শেষে সম্মানী-খাম সকলের হাতে দেন আয়োজক মঠপ্রধান। কিন্তু তা বলে এতটা! দু’টো কড়কড়ে পাঁচশোর নোট। চলো মুরারি, হিরো বন গয়া!
“এই রিকশা, নীলধারা জায়েগা?” ম্যায় তো শাহা বন গয়া। একটু টিপে চললে রাহা খরচাটা দিন চার চলবে। “কী বলো ধর্মাশোক?”
“সে আর বলতে? খুঁজে পেতে আরও খান তিন-চার পঙ্গত বের করে দিচ্ছি। স্মরণ রেখো ভাই। মাল কিন্তু বখরা হবে ফিফটি ফিফটি।”
আমি এমন উত্তরে অবাক। এই পুণ্যভূমিতে আধাআধি হিস্যা? তুমি আমার কত আপন, অন্তরঙ্গ জন।
ধর্মাশোকের বাস্তব ও হৃদয়হীন উত্তর – কেন? রাজা হরিশচন্দ্র শ্মশানে আপন স্ত্রীর কাছে মৃত সন্তানের দাহকাজে ঘাট-খরচ মকুব করেছিল? শৈব্যার অশ্রুসিক্ত কাতর অনুনয়, বিদ্যুৎ চমকে দেখতে পাওয়া পুত্রের মৃত মুখ কি হরিশচন্দ্রকে আপ্লুত করেছিল?
নীলধারার আদি প্রবাহের পুব দিকে চিতা জ্বলছে। আমি সেই দিকেই চলেছি রিকশা ছেড়ে দিয়ে। এই স্থল আমার বড়ো প্রিয়।
হরিদ্বার ভ্রমণে দু’-এক দিন এখানে অবশ্যই আসি এবং এখানকার চড়ায় শুয়ে পড়ি, পাই ‘পাথুরে বিশ্রাম’। কোনো শ্মশান-বৈরাগ্য না। জন্ম-মৃত্যু-জীবন-যৌবন কেমন করে গ্রাস করে অগ্নি! সে স্মৃতি খায়। প্রীতি উগরে দেয়। ব্যোমে বিলীন হয়। বীজ-সূত্র-সম্পর্ক রেখে যায় সন্তানের করতলে। এই তো জীবনমন্থন। অমৃত পরম্পরা। এই সব ভাবি বিশ্রামের মধ্যে।
ধর্মাশোক চলে গেছে কিছুটা দূরে কেশব আশ্রমে। ওখানে সে আমার জন্য অপেক্ষা করবে লাহিড়ী, শ্যামাচরণজির শ্বেতমর্মর মূর্তির পদতলে। ওই স্থানটিও শান্ত। আমার হরিদ্বার ভ্রমণে বিশেষ দ্রষ্টব্যস্থল। এত বড়ো ক্রিয়াযোগী আর কি আসবেন?
এ বার প্রত্যেকের বাধানিষেধ না মেনে কুম্ভভ্রমণে এসেছি। ঘরসংসার, নিকটজন প্রত্যেকেই হতাশ হয়েছে আমার জেদে। শুধু এক তরুণ ভ্রামণিক পোর্টাল-সাংবাদিক ঋভুবুড়ো আমাকে সাহস দিয়ে বলেছিল, “তোমায় কুম্ভ ডাকছে, তুমি নিশ্চয়ই যাবে। মনের জোরই তোমার সেকেন্ড ডোজ। করোনার ফার্স্ট ডোজ তো নিয়েছ।” হরিদ্বারে এ বার পূর্ণকুম্ভে এসে ঋভুবুড়োর কথা প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল – “কিচ্ছু হবে না। মনের জোরে তুমি পার হবে। অবশ্যই কোভিড-বিধি মেনো। একাধিক মাস্ক নিও। স্যানিটাইজার নিও। আর দূরত্ববিধি অবশ্যই মানবে।” আমি অবশ্য ঋভুবুড়োর নির্দেশ পালন করেছি সর্বত্র।

এত সংকটেও আমি পাঠক-পরিষেবার কাজে গাফিলতি করিনি। হরিদ্বারের আগেই নামা, জ্বালাপুরে করোনা টেস্টের জ্বলুনি। দুপুরে চৈত্রের রোদ, রিকশার গোলকধাম, পুলিশের হুজ্জতি। পিঠের বোঝা-সহ আরেক সচল বোঝা (ট্রলি) টেনে আশ্রমে পৌঁছে কুকুর ধোঁকা। তার পর এন্ট্রি। ঘরের অ্যালটমেন্ট। আশ্রমের আই কার্ড নিয়ে দোতলায় ঘরে ঢুকে, হাত ধুয়ে, স্যানিটাইজার স্প্রে করে বিছানায় চিতপটাং। থ্রি বেডেড রুম উইথ অ্যাটাচড বাথ দেখে মন খুশ। করোনার জন্য আশ্রমে যাত্রী কম। বিছানায় শুয়েই মড়া। ঘণ্টাখানেক পরে ঘুম ভাঙল বন্ধুর ফোনে। নিরাপদে পৌঁছোনোর সংবাদ জানতে চাইল। আমার হাত-পা তখনও সামান্য সামান্য কাঁপছিল – জার্নি আর তৎসংক্রান্ত ধকলে।
লিখতে বসে গেলাম। এপ্রিলের ১২ তারিখে সোমবতি অমাবস্যার স্নান তো হয়ে গেছে সকালের পুণ্য লগ্নে। এটি দ্বিতীয় শাহি স্নান। প্রথম শাহি স্নান তো হইচই করে কবেই হয়ে গেছে – ১১ মার্চে, মহাশিবরাত্রিতে। প্রসঙ্গত জানাই, মহাশিবরাত্রির স্নানে কোভিডবিধি শিকেয় তুলে জলে ডুবকি দিলেন হাজার হাজার নাগাবাবা, যাঁরা প্রতিটি আখাড়া-প্রধানের অনুগামী হয়েছিলেন। সেই স্থানে অনুগামী হয়ে সন্ন্যাসীদের পরেই ডুবকি মেরেছিল বুভুক্ষু পুণ্যলোভী ভারতবর্ষ। কোথায় করোনা? স্নান করা, না-করা নিয়ে পুলিশের সঙ্গে বচসা, লাঠালাঠি, মৃদু চার্জ – সংবাদে আসেনি। হৃষীকেশের বাঙালিবাবা সূত্রে প্রাপ্ত। মার খেয়েছিল পুলিশই।
১২ এপ্রিল, সন্ধ্যা ৭টায় কপি গেল। ছাপা হল ১৩ এপ্রিলের দৈনিকে। কপি পৌঁছোনোর পরে হাঁফ ছাড়া। কাল আবার দেখা যাবে। আশ্রমের বেসমেন্টে নামলাম হাত-মুখ ধুয়ে। পূজারতি দেখে শরীর কিছুটা ধাতস্থ হল। বড়ো রাস্তায় কিছুটা পায়চারি করে প্রসাদের (রাতের খাবার) ঘণ্টার অনুসরণ করলাম। স্বেচ্ছাসেবকদের অনেকেই চেনা মুখ। অসীম, গণেশরা এসেছেন। বাবু গায়েনের আধমণি ভুঁড়ি কমেছে। বাবু হেড কুক। অনেক দিন, মাস, বছর পরে আবার দেখা। পেট পুরে খেয়ে এক ঘুমে কোকিল ডাকল। ভোরের কোকিল।
১৪ এপ্রিল বুধবার, মহাবিষুব সংক্রান্তি। সহজ কথায় চৈত্রসংক্রান্তি। লোকউৎসবে বিশেষিত এ দিন, সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে গাজন-চড়ক উৎসব। এবং কুম্ভমেলায় এ দিন পুণ্যস্নান। সর্বভারতীয় সন্ন্যাসী-বৈরাগী-উদাসীন ও সমস্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে মহাবিষুব সংক্রান্তি এবং এই স্নানযোগ একটি শাহি বা বিশেষও বটে।
ভোরেই পৌঁছে গেছি স্নানঘাটে। কে বলবে হরিদ্বার নামক তীর্থের কুম্ভে করোনা এসেছিল নীরবে। থাকছেও নীরবে। মহাপ্রস্থানের পথে নিয়েও গেল একাধিক প্রাণ। ঠিক কত জনকে? তার সঠিক হিসাব সরকারি সিন্দুকেও নেই। নিন্দুকে বলছে, মৃতের সংখ্যায় সরকারি বেনোজল। চ্যাংড়া ফাজিলরা বলছে, মড়া ইজ মড়া। ওরা কি কথা বলবে? জানান দেবে, করোনায় খেয়েছে মোদের পরমায়ু-প্রাণ? কী হবে মড়ার হিসেবে? তা-ই দিয়ে কোন পঞ্চশালা হবে? ছোড়ো না ইয়ার।
হরিদ্বারে আখাড়ায়, সাধু-সন্ন্যাসীদের ডেরায়, পরীক্ষিত সত্য, করোনা নীরবে ঢুকে পড়েছে। এর পরে ভারতীয় অন্ধ ধর্মবিশ্বাসীরা বলবেন, গোমূত্র এবং গোবর দিয়েই করোনা করব জয়। ও সব করোনা-টরোনা ফালতু। শাহিস্নানে ডুবকি মারো। ‘রমতা সাধু, অওর বহতা পানি’। করোনা মরবে। ওর বাপ মরবে। ওর চোদ্দো পুরুষ মরবে। মা গঙ্গার বহতা পানি করোনার মৃতদেহ লীন করে দেবে পুণ্য নীরে। ‘লাগ ভেলকি লাগ, ঘুরে ফিরে লাগ’।
লেগে গেছে ভেলকি। বাচ্চালোগ তালি বজাও। সরকার ঘোষিত নীতি: সংক্ষিপ্ত হয়েছে কুম্ভের সময়। মাত্র ৩০ দিনের। ১১ মার্চের মহাশিবরাত্রির পর থেকে এক মাস মানে তো ১১ এপ্রিল পর্যন্ত, সে তো পেরিয়ে গেছে। এর পর ১২ এপ্রিল সোমবতি অমাবস্যার স্নান তো হল। পরের দিন নীলপুজো, সে স্নানও হল, হল চৈত্রসংক্রান্তির স্নানও। সরকারি ঘোষণা মোতাবেক পূর্ণকুম্ভ তো শেষ। তা হলে বৈরাগীদের (বৈষ্ণব) গুরুত্বপূর্ণ স্নান – রামনবমী (২১.০৪.২১) এবং চৈত্রপূর্ণিমার (২৭.০৪.২১) স্নান বাতিল? শৈব্যদের (সন্ন্যাসী) মুখ্য স্নানগুলোর শেষে এই ঘোষণা কেন? কুম্ভমেলাটা কি শুধু শৈব্যদের (সন্ন্যাসী)? ভারতবর্ষের অধাত্ম্যবাদের এরাই শুধু রক্ষক-প্রচারক? বৈরাগীরা (বৈষ্ণব) কি ভেসে এল পাকিস্তান থেকে, সিন্ধু-স্রোত ধরে?

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদীজি জুনা আখাড়ার প্রধান আচার্য-মহামণ্ডলেশ্বর স্বামী অত্তধেশানন্দ গিরিজিকে অনুরোধ করেছেন, স্নানমেলা সংক্ষিপ্ত করতে। মোদীজির অনুরোধকে সম্মান জানিয়ে অত্তধেশানন্দজি টুইট করে পুণ্যলোভী, পুণ্যপ্রেমিক ভক্তদের এই পরিস্থিতিতে স্নানে না আসতে অনুরোধ করেছেন।
বৃন্দাবনের বৈরাগী (বৈষ্ণব) সমাজের একাধিক বাবাজি ফোনেই উত্তর দিলেন, “করোনা-সংকটে দেশ ভুগছে, প্রায় ডুবতে বসেছে। ঠিক কথা। তা হলে তো অনেক আগেই, শুরুতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারত। এক্কেবারে মহাশিবরাত্রির আগেই কুম্ভ ভার্চুয়াল হতে পারত। ধর্মীয় সংগঠনের সব প্রধানই শুধু ডুবকি দিয়ে দেশবাসীকে বার্তা দিতে পারতেন (এক গলা জলে দাঁড়িয়ে?) কোভিড শর্তাবলি মেনে নিয়ে এই স্নান। তখন কি নাকে শেফলা তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন ওঁরা?”
লেগে গেছে স্নান-রাজনীতি। হরিদ্বারে অত্যন্ত পাওয়ারফুল বড়া ও নয়া উদাসীন। এখন বিতর্ক-বাহাস ভাষ্যে মার্জার-কলহ শুরু হয়ে গেছে নির্বাণী বনাম নির্মোহী। এ দু’টি সংগঠনই হরিদ্বার কাঁপাতে পারে। প্রতিযোগিতা চলছে কে কাকে রগড়ে দিতে পারে। ধুয়ে দিতে পারে। মিডিয়া এই সব নিয়ে পায়সান্ন রাঁধছে। এখন পাতে মুচমুচে নিম-বেগুন ভাজা দিচ্ছে।
জগতে, আমার মতে সেরা কাজ হল, নিরাপদ দূরত্বে বসে গৃহী-গেরুয়া-তিলকধারী এবং আপাত পণ্ডিতদের মূর্খামি দেখা ও শোনা।
তবে সেরা লোকায়ত পুণ্যস্নানের খবর আমায় দিয়েছে ধর্মাশোক। শুনুন।
গঙ্গায় নায়ে পাপীতাপী/ভোরে নায়ে চোর। (তস্কররা ফিরে এসে ভোরে স্নান করে নিত। কারণ গায়ে সিঁধ কাটার ধুলো ও পিচ্ছিল তেল গায়ে লেগে থাকত)/কল-গঙ্গায় নায়ে বটে/বহুত পুণ্যের জোর।
এর সমান্তরাল পাঠ, ভিন্ন সুরে শোনাই –
গঙ্গায় নাইলে চার পো পুন্যি/নদীতে নাইলে আধা/পুষ্করিণীতে সিকি বটে/ডোবায় নাইলে গাধা।
আমার এক পাতানো মায়ের কাছে শোনা। প্রতিমা গায়েন, কাজিরহাট, পোস্ট- লাকুড্ডি, বিটি কলেজ মোড়, বর্ধমান। (চলবে)
আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন
The post করোনা-কালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে/৭: সরকারি ঘোষণার পরে লেগে গেল স্নান-রাজনীতি appeared first on Bhramon Online.
]]>The post করোনা-কালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে/৬: শামিল হলাম অগ্নি আখাড়ার পঙ্গতে appeared first on Bhramon Online.
]]>সুপারস্প্রেডার করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে আক্রান্ত ২০২১-এর পূর্ণকুম্ভের হরিদ্বার ছিল বিশেষ সংকটের, অন্তত আমার কাছে। সকল পরিচিত-প্রিয়জনের নিষেধ না মেনে, অসুস্থ শরীরে, প্রায় সত্তর ছুঁই ছুঁই বয়সে আসা।
ছিল তিনটে প্রধান সংকট। এক: এ বার কুম্ভ ঘুরতে প্রচুর ব্যয় হবে জানতাম। দুই: কোনো সংস্থার পরিচয়পত্র হাতে ছিল না। এক জন ফ্রিল্যান্সার হিসাবে তা দাবি করি না। দাবি করতে পারি না। আমি বিখ্যাত লেখক বা ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হলেও বা সম্মান, পরিচয়পত্র-সহ সাম্মানিক ও পাব্বুনির কলাটা-মুলোটা পেতে পারতাম। তিন: সংকট ও শঙ্কা ছিল, করোনাক্রান্ত হয়ে অমৃতশহরের কুম্ভে মরলে ঝামেলার একশেষ হত। কে দায়িত্ব নেবে? ঝামেলা আমার নয়। আশ্রয়দাতা ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের সন্ন্যাসীরা অসুবিধায় পড়তেন। বেশি করে পড়তেন সঙ্ঘ সম্পাদক দিলীপ মহারাজ এবং সহকারী সম্পাদক ভাস্করানন্দজি। করোনার মুর্দা কুষ্ঠাক্রান্ত মৃতদেহের মতোই আতংকের।
কথায় বলে, যে খায় চিনি/তাকে জোগায় চিন্তামণি। কোনো অমৃত-মজুরি ছাড়াই অমৃতের সন্ধানে মজে দু’ হপ্তার বেশি করোনাক্রান্ত হরিদ্বারে কাটিয়ে তো এলাম। লিখলাম। ডেলি রিপোর্ট ছাপা হল দৈনিকে। ‘এই সময়’ কাগজে। মহাকাল, অত্যাধুনিক ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে সব সাফ করে দেয়। থাকে শুধু কর্মের সুগন্ধ-সমাচার, ধরণির এক কোণে। মহাকাল তাকে ঝাঁটায় না। লাথায় না। মাথায় করেই রাখে। তা না হলে মহাকাল নিজেই অস্তিত্বের সংকটে পড়বে। সবটাই সে খারাপ করে না। যেমন এই আজকে শ্রীপঞ্চদশনাম পঞ্চাগ্নি আখাড়া বা অগ্নি আখাড়ায় গিয়ে যে সন্দেশ (সংবাদ অর্থে) পেলাম, তা টেক্সট হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদিও সব কথা লেখা যাবে না, উচিতও নয়। আমরাও কি জীবনের, সংসারের সব কথা বলতে পারি? স্বীকারোক্তিতেও কত কত বাধা-সংকোচ-সংশয় থেকে যায়। তা সব না বলেই চলে যেতে হয়। তা ছাড়া আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলাম সব কিছু লিখব না। ভাসা ভাসা লিখলেও তা, ‘সূত্র মারফত খবর পাওয়া গেল’ বলে লেখা যেতে পারে। যেমন লেখেন সাংবাদিকতায় যুক্ত মানুষরা। নিউজ সোর্সের নাম উল্লেখ করতে নেই। তাতে দু’ পক্ষেরই অসুবিধা।
সুরেশানন্দজি আলাপ করিয়ে দিলেন। দেখলাম বাছা বাছা মাথা, উচ্চপদাধিকারীদের মধ্যে আমার চেনা দু’-চার জন উপস্থিত। গুজরাতের গিরনারের সব চেয়ে বড়ো বাড়িটি অগ্নি আখাড়ার। ওখানে বিখ্যাত শিবরাত্রির মেলায় আশ্রয়-অন্ন পেয়েছিলাম এক সপ্তাহ। দায়িত্বে থাকা প্রেসিডেন্ট ব্রহ্মচারীজি, কাশীর মঠের কোষাধ্যক্ষ ব্রহ্মচারীজি এবং আরও দু’-চার জনের প্রশ্ন, “বাঙ্গাল কে বেটা, কিতাব কব নিকলেগা?” আমার গলায় ঝুলছে, এ যাবৎ পাওয়া নানা সনের চারটি কুম্ভের একাধিক প্রেসকার্ড।

সংগীতানন্দজি খুব গর্ব করে ছোটো করে আমার পরিচয় দিলেন। এবং বললেন, উনহোনে নোকরি ছোড় কর দো হাজার চার সাল সে আভি তক কুম্ভমেলা মে ঘুমতে রহে। স্রিফ এক কিতাব লিখনে কে লিয়ে।
সকলেই আশীর্বাদ জানালেন। আমি বললান, উপাস্যমাতা দেবী গায়ত্রীমাকে প্রণাম। সমস্ত অধিষ্ঠিত সন্ত, ব্রহ্মচারীকে প্রণাম। জয় গিরনারিবাবা। জয় বরফানি (বরফগলা জল হরিদ্বারে প্রথম সমতল পাচ্ছে, তাই এখানের কুম্ভকে বরফানি কুম্ভ বলে) কুম্ভ, প্রণাম গঙ্গাদেবী। আপনাদের আশীর্বাদে এই পুণ্যকুম্ভের গ্রন্থ যেন দ্রুত আমার মাতৃভাষা বাংলায় প্রথমে এবং পরে হিন্দি ও ইংরেজিতে প্রকাশ পায়। এই আমার জীবনের ব্রত।
মিটিং শুরু হবে শিগগির। সেখানে আখাড়া-আশ্রমের বিশেষ কিছু পদাধিকারী ছাড়া আর কেউ থাকতে পারেন না। এ বার কোভিড-কুম্ভের জটিলতা সম্পূর্ণ আলাদা। রয়েছে টেনশন, চলছে দড়ি টানাটানি ধর্ম বনাম ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতির। আর এই সবে বাজিগরের ভূমিকায় হরিদ্বারের কোভিড-কুম্ভ মেলা। এক বছর পরেই উত্তরাখণ্ড ও লাগোয়া উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন। এই দুই রাজ্যের গদিতে এবং দিল্লির মসনদে আসীন শাসকদলের সামনের নির্বাচনে সাফল্য বা ব্যর্থতা অনেকটাই নির্ভর করবে এই কোভিড-কুম্ভের উপর। এবং তাতে জল ঢেলে দিতে পারেন তেরো আখাড়ার প্রধানরা। ধর্মগুরুরা ফোঁস করলে রাজসিংহাসনের পায়া ভাঙবে। এই অবস্থা বরাবর ছিল। রাজতন্ত্রের সঙ্গে ধর্মগুরুদের জোরালো সম্পর্ক বরাবরই ছিল। ছিল না এখনকার মতো ধর্মের শপিং মল, বেচাকেনা, কুটিল-জটিল লেনা-দেনার বেনেগিরি।
আমায় বসিয়ে (সদ অর্থে) দিয়ে গেলেন বেশ কিছুটা দূরে, বারান্দায়। নির্দেশ আখাড়া সভাপতির। আমাকে পঙ্গত (আখাড়ায় দুপুরের প্রসাদ গ্রহণের অনুষ্ঠান) করে যেতে হবে। মানে, আরও ঘণ্টা দুই-আড়াই। কোনো কাজ ছাড়াই। তবে নোজ ফর নিউজ থাকলে যে কোনো সাংবাদিক আন্দাজ করতে পারবেন বড়ো কিছু একটা ঘটবে। অন্তত নিউজ স্টোরির সূত্র-সন্ধান থাকবেই। তার পদধ্বনি পাচ্ছি।
দূর বারান্দার এক কোণে একটা চুপচাপ ভিজে বিড়াল হয়ে বসে আছি। বই পড়ছি। না, পড়ার ভানে। বড়ো বড়ো দামি গাড়িতে নানা ধর্মীয় মাথারা, থুড়ি গৈরিক সিইও, গৈরিক এমডি, সাদা কাপড়ের বাবাজি খড়ম খটখটিয়ে, কেউ গলায় বিশ ভরির সোনার হার (ভক্তের দেওয়া, গরিব সন্ন্যাসী পাবেন কোথায়?) ঝুলিয়ে, পারফিউমের ভুরভুর গন্ধ উড়িয়ে, আসছেন। আসছেন ভারতবর্ষের অধ্যাত্মবাদীরা অগ্নিতে সমিধ দিতে। প্রতি জনের সঙ্গে এক জন করে সেবক, কম্বলের আসন বগলে বা জলচৌকি হাতে – প্রভুজির জন্য। অন্যের পাতা আসনে, ফরাসে এমনকি পশমিনার আসনেও বসবেন না। আপনা আপনা বৈরাগ্যের শুদ্ধতাকে বাঁচিয়ে রাখা। জয় গুরু।
দূর থেকে আলোচনার যে ‘মিউমিউ’ স্বর শুনতে পাচ্ছি তার সারাংশ হল, মেলা কত দিন চালানো হবে? বা চলবে? উত্তরাখণ্ড এবং কেন্দ্র, দু’টোই বিজেপিশাসিত। উত্তরাখণ্ড সরকার তো মেলা সংকুচিত করেছে। পয়লা এপ্রিল থেকে (এপ্রিল ফুল নয়তো?) এক মাস। তা তো নয়। করোনা না থাকলে তো দেড় মাস চলত। কিন্তু ৩২৫ কোটি টাকা কেন্দ্রের অনুদান। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উত্তরাখণ্ডের ম্যাচিং গ্রান্ট। এবং কেন্দ্রের আপৎকালীন আরও গ্রান্ট। সব মিলিয়ে প্রায় হাজার ছুঁই ছুঁই। অবশ্য খরচও বিস্তর। রাস্তাঘাট, লিঙ্ক ব্রিজ, কানেক্টিং রোড, হাজার হাজার তাঁবু আংশিক খরচ। কিছুটা পকেটে, কিছুটা ফোকটে।

কিন্তু এ বার কনখল থেকে হৃষীকেশ অবধি, এই বিশাল মেলামাঠে, কোভিডের কারণে কোনো তাঁবুই পড়েনি। বিশাল মেলামাঠ একেবারে টেন্টহীন। একটা বড়ো খরচ বেঁচে গেছে, রাজ্য সরকারের এবং আখাড়ার। বাজেট তো কমেনি। সে তো বেড়েছে। যে সমস্ত ধর্মীয় সংগঠনের হরিদ্বার হোমল্যান্ড অর্থাৎ স্থায়ী ঠিকানা, তাদের আশ্রমের ভিতরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য সরকার। এবং সূত্র বলছে, মঠ-মিশন ও আখাড়ার জন্য সরকার মাত্র এক কোটি করে দিয়েছে। এতে আদৌ সন্তুষ্ট নন ভারতীয় ধর্মগুরুরা। সেখানেই লেগেছে পেটকাটি চাঁদিয়াল বনাম শঙ্খচিল বনাম তাগড়াই বাজের লড়াই। হরিদ্বার ‘কুরুক্ষেত্র’। ভক্ত-গুরু বনাম কোভিড। আখাড়া-রাজ্য সরকার বনাম সুপারস্প্রেডার করোনা-কুম্ভ। কেউ জিতবে না। যুদ্ধে ক্ষয় অনিবার্য। তা জেনে বুঝেও যুদ্ধ লাগায় মানুষ। শেষে, হালালনামা লেখেও সেই মানুষ। তা থেকেও এই গৃহত্যাগীরা, সংসারীরা কোনো পাঠ গ্রহণ করেনি। ‘খোদা অ্যায়সা চিজ/রুপিয়া কা পাশ উনিশ বিশ’।
প্রতিটি কুম্ভে নানা রকমের বখরা নিয়ে হল্লা, ঘাপলা শুনেছি, দেখেছি। কিন্তু এ বারের প্রেক্ষাপট, মৃত্যুর খাদে দাঁড়ানো মানুষ। করোনা-আক্রান্ত কুম্ভনগরী। হৃষীকেশ-মুসৌরি-হরিদ্বার করোনার চাপে ও টেম্পারেচারে। মারা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও লকডাউন দিনের কিছুটা। এবং সেই বিপদকালে ‘বিশুদ্ধ’ গঙ্গাজলে ধৌত গণতান্ত্রিক সরকার ও ধর্মীয় ভারতের ত্যাগী সন্তানেরা বখরা নিয়ে ব্যস্ত। হায় শংকর! হায় উমানাথ! হায় মায়াপুরী! হায় হরির চরণ! সতীর জঠর পড়েছিল এই পুণ্যপীঠে। তাই কি মানুষ – সন্ন্যাসী, বৈরাগী, মন্ত্রী-সান্ত্রীদের জঠর জ্বলে এখানে দিবারাত্র?
আমারও জঠর জ্বলছে। সাত সকালের একটি মশলা দোসা আর এক গ্লাস লস্যি মিলিয়ে গেছে। সংগীতানন্দজি নিচু স্বরে বললেন, “সামহাল কো লিখনা। নহি তো দোনো নাশ হো জায়ে গা। চলো পঙ্গত কো নিশানা।”
আরও এক দফা প্রণামপর্ব এবং খাবারের লাইনে। এক দিকে নামীদামি সন্তজন আর একটু দূরে আমার মতো গুটি কয়েক অতিথি। করোনার কারণে ভক্তজন প্রায় নেই। উঠে দাঁড়িয়ে করজোড়ে ইষ্টদেবী ও অন্নপূর্ণা মাকে প্রণাম। সমস্ত উপস্থিত সন্তজনকে প্রণাম।
মুগ্ধ হয়ে আমার শিষ্টাচার দেখে বাবাজিরা অবাক। গলায় ঝুলছে একাধিক প্রেসকার্ড। আমাকে নিয়ে চলছে গুঞ্জন। (চলবে)
(এই পর্বে কিছু সন্ন্যাসীর নাম পরিবর্তিত)
আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন
The post করোনা-কালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে/৬: শামিল হলাম অগ্নি আখাড়ার পঙ্গতে appeared first on Bhramon Online.
]]>The post করোনা-কালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে/৫: ডুবকি লাগাও, বচন শোনো, করোনা ভাগ জায়েগা appeared first on Bhramon Online.
]]>সকাল ৭টা-সাড়ে ৭টায় সংগীতানন্দজির আখাড়ায় গিয়ে লাভ নেই। বসে থাকতে হবে বা মূল গেটের বাইরে পায়চারি করতে হবে। করোনার কারণে সমস্ত আখাড়া-আশ্রমের মূল গেট বন্ধ। প্রহরী প্রহরায় নেই। থাকবেও না কেউ। অথচ কোভিড অতিমারি না থাকলে, আজ এই পর্বে, পূর্ণকুম্ভ পর্বে, দেবনগরী হরদুয়ার, বাঙালির হরিদ্বার, পুরোনো সন্ন্যাসীদের বরফানি কুম্ভ, মহাপ্রস্থানের পথে সমতলের শেষ ধরম-ধ্বজা হরিদ্বার গমগম করত। সেই গমগমানিতে হরিদুয়ারের রাজাজি ন্যাশনাল পার্কের অরণ্য থেকে হিরণ ভয়ে বাইরে আসত না। এলেও, লেজ গুটিয়ে ‘বাপরে-মারে’ করে পালাত।
সংগীতানন্দজির আখাড়া-আশ্রম যেতে হলে ব্রহ্মকুণ্ড পার হতে হবে। ওখানে চার দিকটা দেখে নিলাম। সাপে কাটলে যেমন মানুষ, ধর্মবিশ্বাসীরা গুনিন ডাকে, রোগীর চোখ উলটে গেলেও মা মনসার মূর্তির পা-ছোঁয়ানো ‘বিষ কাটানো’ জল মুখে দিয়ে দেয়, তেমনি এই ভোরে কোভিডের দূরত্ববিধি গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ে মানুষ ডুবকি মারছে। কোমরজলে, দুরন্ত স্রোতে শিকল ধরে কত্তা-গিন্নি পরস্পরকে ডোবাচ্ছে, ভাসাচ্ছে। এমনিতে তো সংসারে ডেলি চুলোচুলির ডিসি কারেন্ট। তথাপি পুণ্যস্নানে মা গঙ্গার স্রোতে এই যৌথ অবগাহন, সত্যই মধুর স্মৃতি। ‘ধরা’ বেঁচে থাক স্মৃতি ও সুধায়। কিন্তু দুগ্ধপোষ্য বাচ্চার তো পাপ-পুণ্য নেই। মা-বাবার পাপ-পুণ্য থাকে যদি থাকুক। কিন্তু ওই শিশুকে কোলে নিয়ে, ওই কৃত্রিম খরস্রোতে পুণ্যস্নান! যদি শিকল ফসকায়! ভয়ে চোখ সরিয়ে নিলাম। ভাবাবেগের এত জোরালো স্রোত মা গঙ্গার বরকেও ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। সাধ্য কার, রোধে তার গতি।

ব্রহ্মকুণ্ডের লাগোয়া দোকানে মশালা দোসা ও এক গ্লাস লস্যি মেরে ক্ষুধাগ্নি সামলে হাঁটা। দেখতে দেখতে, ধীরে ধীরে হাঁটা। হরিদ্বারের গঙ্গার দু’ দিকের পাড়ে বাঁধানো মেঝে জুড়ে দূরত্ববিধি রক্ষার্থে অসংখ্য গোলাকার, নিখুঁত বৃত্ত। একটিও মোছেনি। কে জানে কী দিয়ে এঁকেছে লক্ষ্মণের গণ্ডি।
জনতার বয়ে গেছে। স্নানের পরে ভিজে কাপড় থেকে জল গড়িয়ে গণ্ডি পার হয়ে, গঙ্গার পানি গঙ্গায় চলেছে। পুণ্যস্নান সেরে কাপড় বদলে মুখে মাস্ক পরে কোভিড থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করল। হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। এ বার দোকানে গরমাগরম ফোলা ফোলা, কথা-বলা পুরি, টোকা মারলেই গরম শ্বাস ফেলবে এবং তার সঙ্গে হালুয়া। পাতে সবুজ লঙ্কা-সেদ্ধ, মশলা মিশেল, থাকবে গোটা দু’-চার। শেষে রসগুল্লা, জলেবি আর লাড্ডু। তার পর কুকুর-চমকানো উদ্গার তুলে সপরিবার ঘরের পথে তথা ধরমশালায়। অথবা দামি দম্পতি এক্সট্রা কটওয়ালা গঙ্গা ফেসিং ডবল বেডরুমে। ওরা ভিজে জামাকাপড়ের পলিপ্যাক খুলে বুঝতে পারবে ভিজে শাড়িটা ফেলে এসেছে।
না, না। সে শাড়ি এখন নীলধারার পাড়ে শুকোনো হচ্ছে। নিয়ে পালিয়েছে ঘাটে ঘোরা, পথের, ঠিকানাহীন, মা-বাপে খেদানো কিশোর-কিশোরীরা হাত সাফাই করে। গোটা দু’-চার এমন অপারেশন দেখলাম। অন্যায় বিশেষ কিছু মনে হল না। কারণ যুগ যুগ ধরে আমরা ওদের মায়েদের দ্রৌপদী করেছি। ওদের খাবার নিয়ে ভাঁড়ার ভরেছি। জয় গুরু।
ফুলকো পুরি ডাকছিল। অনেক কষ্টে সামলালাম। আমার লিভারটার অনেকটা গেছে (মদ্যপান না করেও)। ডা. অভিজিৎ চৌধুরীর নির্দেশ, নুন-মশলা-তেল-ঝাল, দূর হটো। পালিয়ে এলাম দোকানের সামনে থেকে। আর নয়। মনে করালো ধর্মাশোক, এ বার দেরি হলে কিন্তু বিরক্ত হবেন সংগীতানন্দজি। চলো তবে ত্বরা করি।

বড়ো গেটে সংকোচ নিয়ে ঠকঠকাই। লাঠি কাম বর্শা হাতে সুবেশ দ্বাররক্ষী গেটের ছোট্ট চৌকো জানলা খুলে, ‘কোন হ্যায়?’ একটু আগে বন্ধুবর ধর্মাশোক মিথ্যা ‘সদাচার’ শিখিয়ে দিয়ে আপাতত ভ্যানিশ। কী মিথ্যে! কী পাঠ দিল ধর্মাশোক!
আমি সকাল আটটা নাগাদ এসেছিনু। গেটে কলিংবেল বাজানু। শুনতে পায়নি হয়তো কেউ। কেন না সকালের পূজাপাঠের আরতি ও ঘণ্টাধ্বনিতে শুনতে পায়নি কেউ। সেই কারণেই ব্রহ্মকুণ্ডে মা গঙ্গাকে এক বার পরশ-প্রণাম করে এলাম, তাই এত দেরি। (এর পর কোভিড দূরত্ববিধি মেনে প্রণাম।)। সাত খুন মাফ।
জোরেই বললাম সঙ্গী, বন্ধু, পরমাত্মীয় ধর্মাশোককে – ধর্মস্থানে অধর্ম হবে না? পাপ হবে না এই মিথ্যে বাক্যে?
ধর্মাশোক হাত নাড়ল। সংকেত দিল, হবে না।
আমার মন বলল, পুণ্যক্ষেত্রে, কুম্ভনগরীতে সব পাপ ধুয়ে দেয় মা গঙ্গা। ভাসিয়ে নিয়ে যায় খরস্রোতে সব পাপ। এমনকি মন্ত্রী, গেরুয়াজীবী, ধর্মধারীরাও বলছেন, করোনার জীবাণুও ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে মা গঙ্গা। ‘তৃতীয় নেত্রে’ ওঁরা দেখতে পাচ্ছেন, ভেসে যাচ্ছে সুপারস্প্রেডার করোনার বীজ-বীজাণু। তা হলে গোমূত্র, গোবর? ওগুলো প্রাইমারি ভোজ ছিল। এখন কুম্ভ এসে গেছে, পূর্ণ এবং পুণ্য ডুবকি। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ? সুপার-ডুপার স্প্রেডার করোনাকে কবরে এবং চিতায় ফেলবে গঙ্গামাঈয়ার স্রোতে ভেসে যাওয়া ওই সব তুচ্ছ জীবাণূ।
হায় স্বদেশ! হায় মা গঙ্গা! হায় হিন্দু ধরম! এত অসম্মান তোমাদের হতে দেখিনি এতটা বয়সে। বেবাক বোবা হয়ে যাই। চোখ মুছি রুমালে। সামান্য চোখের বারিশ-বুঁদে মন ভিজবে না এই সব অবিবেচক ধর্মধ্বজাধারীর। তারা হোমাগ্নি ছুঁয়ে বলবে, রাতে ঈশ্বর এসে আমার কানে কানে বলে গেছে এই সব অমৃতবাণী। এসো, ডুবকি লাগাও। বচন শোনো। করোনা ভাগ জায়েগা।
গেট খুলল সুবেশ বর্শাধারী। চোগা-চাপকান, কোমরে জরির কোমরবন্ধনী ঝকমকাচ্ছে। দ্বাররক্ষী খুব সম্মাননীয় পদ আখাড়ায়। নানা ধর্মীয় উৎসবে এরা সুসজ্জিত হয়ে ধর্মের পয়লা প্রবেশপথ রক্ষা করে। কুম্ভমেলা ছাড়াও সর্বভারতীয় নানা মেলায় দেখেছি। এরা ঘোষকের কাজও করে। প্রধান কর্তার নির্দেশ এরা আমজনতাকে বাতলে দেয়। পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমের পূর্ব যুগ। সুকণ্ঠ, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হয়। চাপা দাড়ি, মোচ থাকা চাই। বিশ্বাসী এই দ্বারীর পোস্ট বংশ পরম্পরায় রক্ষিত।

হিন্দিতে লিখলে বহু ভুল হবে। তাই মাতৃভাষার স্মরণ নিলাম। যদিও কথা বলেছিলাম ভাঙা ও ভুল হিন্দিতেই। পহেলা প্রণাম আখাড়া কো আরাধ্য কে লিয়ে। প্রণাম দুয়ারবান। প্রণাম বিশ্বাসী, ধর্মীয় দ্বারী। সক্কলের শুভ হোক। আমি বাংলা থেকে এলাম।
গলে গেল দ্বারী। কিসকো মিলনা হ্যায়? আপনি তো দু’ বার এখানে এসেছেন। এক বার তো ধুতি পরে। শুভ নাম আপকা? ভুল গিয়া ম্যায় নে।
অশোককুমার। মুম্বই কা নহি, কলকাত্তা কা। মিলনা চাহে তো সংগীতানন্দজি কো। উনি ভেট করার জন্য আজ টাইম দিয়েছেন।
জরুর। সাক্ষাৎ হয়ে যাবে। বসুন।
এত বছর কুম্ভের, আখাড়ার, সন্ন্যাসী-বৈরাগী-উদাসীন, এঁদের কাছে পৌঁছে পয়লা ধাপের এটিকেট সম্পর্কে সতর্ক থাকি। প্রতিটি আখাড়ার উপাস্যদেবের (দেবী শুধু অগ্নি আখাড়ার, গায়ত্রীমাতা) নাম মনে রেখে পয়লা দানেই তাঁকে প্রণাম জানাই। সুকণ্ঠে, স্থির চিত্তে উপাস্যকে স্মরণ করলে সম্মান বাড়ে ভক্তের। উপস্থিত পত্রকার/লেখক/কবির প্রতি তখন সন্ন্যাসীরা বিশেষ মনোযোগ দেন। এগুলো পাঠ্যবইয়ে নেই। জীবন-গ্রন্থ, পথের পুথিতে জমে আছে। ঘাম ঝরাতে হয়। শরীর ক্ষয় হয়। আলসার হয়। কিডনি ও লিভার ক্লান্ত হয়। তবেই অমৃত মেলে। তার পর অমৃত-অভিজ্ঞতার ধুসর পাণ্ডুলিপি রেখে চলে যেতে হয়। ‘রাম নাম সচ হ্যায়’।
সুসজ্জিত, একেবারে দশনামী, শ্রীপঞ্চদশনাম পঞ্চাগ্নি আখাড়া, সংক্ষেপে অগ্নি আখাড়ার ড্রেস কোডে। এই আখাড়ার সন্ন্যাসীরা অন্য দশনামীদের মতন পোশাক পরেন না। এবং অন্য দশনামী আখাড়ার সন্ন্যাসীরা গেরুয়াধারী হলেও, এঁরা, অগ্নি আখাড়ার সকলেই ব্রহ্মচারী। তাই ব্রহ্মচারীর বেশ। গৈরিক বসন নয়। সাদা কাছামুক্ত ব্রহ্মচারী।
ইতনা দের কিঁউ?
সাড়ে সাত পৌনে আটটায় এসেছিলাম। তখন পূজার ঘণ্টা-আরতি-শিঙার শব্দে কেউ শুনতে পায়নি হয়তো। তখন গেটম্যান মন্দিরে গিয়েছিল। তাই আমি গঙ্গামাঈকে পরশ-প্রণাম করে এলাম। কাজে বেরিয়েছি কিনা।
বহত অচ্ছা কিয়া। তুরন্ত আ যাও। প্রেসিডেন্ট মহারাজ কো সাথ ভেট করো। ম্যায় নে পুজ্যপাদ স্বামীকে পাশ তুমার লিয়ে ইনফরমেশন দে দিয়া। জলদি চলো। আধা ঘণ্টা বাদ মিটিং শুরু হো জায়েগা। উসি টাইম বাহার কা আদমি অ্যালাও নহি।
জয়গুরু। (চলবে)
আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন
The post করোনা-কালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে/৫: ডুবকি লাগাও, বচন শোনো, করোনা ভাগ জায়েগা appeared first on Bhramon Online.
]]>The post করোনা-কালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে/৪: হাঁটি বহতা গঙ্গার পাড় ধরে, ঘুরে আসি ভীমগোড়া, কনখল appeared first on Bhramon Online.
]]>কুম্ভের পাঠকদের কষ্ট দিয়েছি। তিন সত্যি। তিনটি পর্বে তত্ত্বের আলোচনা। অমৃতকুম্ভের যাত্রা-বিবরণ ছিল সামান্যই। তত্ত্বমসি না হলে দুধে ছানা কাটবে না? কুম্ভ নিয়ে কত যে ভুলভ্রান্তি আম-জাম-রাধে-শ্যামদের। অথচ বাউলের রূপকাশ্রিত দেহতত্ত্বের গান তো মন-প্রাণ-হৃদয় দিয়ে শোনে পাঠক। তা হলে আমরা যারা কুম্ভমেলা নিয়ে লিখি, তাদের লিখনে কোথাও খামতি, ঘাটতি থেকে যাচ্ছে কি?
বেশির ভাগ গ্রন্থে, বাংলা ভাষায় লেখা গ্রন্থে, গদগদে অধ্যাত্মের নালা-ঝোলা। লেখকের পরিষ্কার ধারণা নেই কিছুই, বিষয়বস্তু সম্পর্কে অজ্ঞ। পাঠক নাকি এই ভাবাবেগের মাখো মাখো ‘রসা’ পচ্ছন্দ করে। একদম ভুল। অনেক ক্ষেত্রে বানানো অলৌকিক ঘটনার বিবরণ। এ তো পাঠককে ঠকানো। এবং আমি বিশ্বাস করি আজও, এমন গদগদ অকারণ বিনয় প্রয়াত মহাত্মাদের অসম্মান।
ফোন আসছে প্রায় আধ ঘণ্টা, এক ঘণ্টা ছাড়া ছাড়া। আমি পথে হাঁটন্ত অবস্থায় মোবাইল দেখি না। হয় ঘরে ফিরে বা রাস্তায় কোনো নিরাপদ স্থানে দাঁড়িয়ে দেখে নিই। কার ফোন। কী বলতে চায়। মানুষের এত ধৈর্য কেড়ে নিয়েছে এই যান্ত্রিক যন্ত্র, মোবাইল। কিছু বলার নেই। ফোন দেরিতে ধরলে ও প্রান্ত থেকে অভিমান। অভিমান থেকে ক্রোধ। ক্রোধ থেকে আক্রোশ। ফোনে প্রতি-উত্তর দিতে চাইলে তিনিও ফোন ধরবেন না। গৃহিণী হলে, পারলে এসএমএস-এ ডিভোর্স।
অচেনা ফোন সাধারণত ধরি না। নানা ফ্যাঁকড়া। হাউস লোন, কার লোন ইত্যাদি প্রভৃতি। আরে আমি নিজের সঙ্গেই লোনলি হয়ে আছি।
শরীরে টান ধরছে, অর্থাভাবে ‘ডবল হাফ’ ফেভারিট কেবিনে। কোনোক্রমে মাইল চার হেঁটে অকুস্থলে। ফেরার সময় ক্লান্ত দুপুরে কুকুর-ধোঁকা। রিকশায় ফেরা ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘে। মেলা মরশুমে প্রচুর ভাড়া রিকশায়। তা ছাড়া রাস্তায় রিকশার সংখ্যাও অত্যন্ত কম। অটো (এখানে বলে বিক্রম), বেশ বড়ো। আট জন যাত্রী ধরে। পুরো রিজার্ভ করতে হবে। তা না হলে সাত জন সওয়ারির পরেও অপেক্ষা করতে হবে অষ্টম জনের জন্য। ঘোড়ার গাড়ি বেরিয়েছে কিছু, পথে পথে ঘুরছে যাত্রীর জন্য।

বারে বারে নানা জনের ফোন। পাঁচ ধরনের চরিত্র। একদল পরিচিত। একদা সহকর্মী, বন্ধুজন। তাদের গালাগাল, উপদেশ বা সতর্কবাণী। এই বয়সে এই করোনা-আক্রান্ত কুম্ভে কেন গেছ হরিদ্বারে? না গেলে অমৃতকুম্ভের, হরিদ্বারের বা যে কাগজের মৌখিক অনুমতি নিয়ে গেছ, কার কী ক্ষতি হত? করোনায় মরতে চাও? এক বার তো করোনা হয়ে গেছে। শহিদ হতে চাও? এত বার কুম্ভে গিয়েও আশ মেটেনি?
আর এক দলের সতর্কবাণী, টেক কেয়ার। সাবধানে, সতর্ক থেকো। তবে সতর্ক থেকেও করোনা হতে পারে। একমাত্র মহৌষধ, বাড়িতে থাকা। কোথাও না বেরিয়ে। সত্যিই কি তা-ই?
তৃতীয় দল কুম্ভের বিবরণ শুনতে চায়, জ্যান্ত প্রতিবেদকের কণ্ঠে। তা-ই দিয়ে, হরিদ্বার সূত্রে জানা গেল বলে বা সূত্রের নাম উল্লেখ করে ফেসবুকে চমকানো আঠারো কাহন।
চতুর্থ দলের গভীর আগ্রহ, হোটেলের ঘর, আশ্রমের বুকিং ইত্যাদি নিয়ে। খাবার কী পাওয়া যাচ্ছে। অথবা রাঙামাসির বড়ো ছেলে তিন বন্ধু মিলে হরিদ্বার গিয়েছে। আপনার/তোমার/তোর ফোন নম্বর দিয়েছি। ওরা যোগাযোগ করবে।
পঞ্চম দলের আবেদন – এটা তো মোবাইলের যুগ, ‘এই সময়’ ডেলি আমরা শুধু সানডেতে নিই। যে দিন যে দিন লেখা বের হচ্ছে, তার লিঙ্কটা পাঠিয়ে দেবেন/দেবে/দিস প্লিজ।
কুম্ভমেলা নিয়ে সামান্য কিছু তত্ত্ব-তথ্য জানি হয়তো বা। কিন্তু ঘর পাওয়া, হোটেল ভাড়া, কোথায় ভালো খাবার মিলবে, এ সব জানার প্রয়োজন আমার পড়ে না। হরিদ্বারে হোটেলের ঘরভাড়া, একেবারে ব্রহ্মকুম্ভের নাকের ডগায় বা গোড়ালির কাছে – কেমন করে জানব? অনেক ক্ষেত্রে সেকেন্ড ওপিনিয়নের জন্য আমার সঙ্গে যোগাযোগ। আসলে কেউ পরিশ্রম করবে না। সব্বার ফিডিং বোতল চাই। আমার পকেট থেকে টাকা দিয়ে ঘর বুকিং করলাম, তিনি আসতে পারলেন না। পাছায় ফোঁড়া। ছোটো ছেলেটার ধুম জ্বর। বড়ো মেয়েটার পেট ছাড়ল। কত্তার অফিস ছুটি ক্যানসেল করে দিল। কিন্তু এক বারও জানাল না, বুকিং-এর টাকা যে আমার পকেট থেকে দিলাম, তার কী হবে। অনেকের ধারণা, আমরা তো থাকিইনি। বুকিং ক্যানসেল করেছি। তা হলে টাকা কেন?
এ রকম কত কত তিক্ত অভিজ্ঞতা এত বছর কুম্ভে জমেছে। এ বারে হরিদ্বারের হোটেল ও ধর্মশালার অঘোষিত সিদ্ধান্ত, নতুন বুকিং আর নেওয়া হবে না। এটা প্রশাসনেরও সিদ্ধান্ত – জানিয়ে দিলাম সকলকে।
গরম কেমন? বৃষ্টি হবে কিনা? ছাতা নেব কিনা? একজনাকে বললাম, ভোর রাতে বড্ড শীত, একটা কাঁথাও আনবেন সঙ্গে। হরিদ্বারে সুপার স্প্রেডার করোনার পূর্ণকুম্ভে এই সব করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। ঘাট থেকে ফিরি ছাতা মাথায়। যাই খুব সকালে।

কোনো দিন হাঁটি বহতা গঙ্গার পুব পাড়ে। কোনো দিন পশ্চিমে। একদিন বাজার ঘুরি। ইচ্ছে ছিল একদিন যাব উত্তরে, হৃষীকেশে। পারিনি, খুব বেশি ভাড়ার কারণে। তবুও একদিন গেলাম ভীমগোড়ায়। আট সওয়ারির অটো, থুড়ি ‘বিক্রম’-এ চড়ে। কনখলে দু’ দিন গিয়ে আশ মেটে না। বড়ো শান্ত স্থল, বিশেষত গঙ্গার পাড় এবং দক্ষযজ্ঞের মন্দির।
যদুনাথ সরকারের লেখা ‘আ হিস্ট্রি অব দশনামী নাগা সন্ন্যাসিস’, প্রথম প্রকাশক: শ্রীপঞ্চায়েতী আখাড়া, দারাগঞ্জ, ইলাহাবাদ। এরই পেপারব্যাক এডিশন দেখলাম, সামান্য কপি বিক্রি হচ্ছে। এক তরুণ ব্রহ্মচারী বিক্রি করছেন। আসল দামের উপরে চিপ্পু। আসল দাম ছিল দশ টাকা। বর্তমানে কাগজের চিপ্পু মেরে একটা অতিরিক্ত শূন্য ডাইনে। মানে একশো টাকা। সাব্বাস ব্রহ্মচারীজি। বৈরাগ্যের শুরুতেই তোমার মোক্ষলাভ করতলগত। ভারতীয় অধ্যাত্মের পরম্পরা? প্রিন্টার্সের পাতাটা আলোর দিকে ধরলে পুরাতন দাম পড়া যায়। তবুও কিনলাম এক কপি।
ঘরে ফিরে উপহার দিয়েছি সাংবাদিক বন্ধু কুবলয়কে। এবং বাইরের দাম দু’ নম্বরি করে বাড়ানোর জন্য মহানির্বাণীর উপাস্য (আরাধ্য) দেব কপিল মুনিজির (সাগরমেলার মন্দির) কাছে বিচার চেয়ে রাখলাম। জানি, ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় রায় পেতে বাদী-ফরিয়াদি-বিচারকদের না স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটে!
কুম্ভমেলার সঙ্গে যতই দিন যাচ্ছে ততই তার ক্লেদ-গ্লানি-গাদ দেখতে পাচ্ছি। আখাড়ায় আখাড়ায় আক্রোশ। ভাষা ও বাক্যেও হিংস্রতার ‘পান’ দিচ্ছে। কোথাও শান দিচ্ছে। দেব-দেবী নয়, টাকাই ঈশ্বর। টাকাই উপাস্য-উমানাথ-শংকর। এত টাকা টাকা করলে সন্ন্যাসজীবনের ধরম-করম কখন করেন হে সন্ন্যাসী?
সবাই এক লপ্তে একই রকম নন, এ কথা বলাই বাহুল্য। তাই তো এখনও মানুষ ঘাম ঝরায় কলকে ফুলের শিকড়ে। ফুলের আশে। ফুল ফোটে। ভোরে ব্রাহ্মমুহূর্তে, ওহে জীবন। জীবনদেবতা, তোমারে সুর শোনায়ে বেঁচে থাকে প্রেমিক পতঙ্গ। পাখি গান গায়। জলে ফোটে লাল ফুল।

থমকে দাঁড়াই। পায়ে পায়ে জড়ায়। কে ডাকল না? “রিপোর্টার, তুম কব আয়ে, কলকাত্তা কা বেটা?”
প্রণাম মহারাজ, শ্রীমৎ সংগীতানন্দজি। পহেলে প্রণাম ইষ্টদেব। প্রণাম গিরনারিবাবা। এক হপ্তা হো গিয়া। হালচাল সব ঠিক হ্যায় না? গ্যারা এপ্রিল আয়া।
বিলকুল ঠিক।
করোনা কা টাইম মে এক এক কাঠ্ঠা হো কর ক্যায়সে পুণ্যস্নান হোগা। কুম্ভমেলা পুরা দেড় মাহিনাতক চলেগি?
জরুর চলেগি। তব অফসর লোগ মেলা কো সংকোচন কর দিয়া। এপ্রিল মাস পুরা চলে গা। এক মাহিনা।
বছর পাঁচেক আগে শিবরাত্রির মেলা দেখতে গুজরাতের ছোট্ট জনপদ গিরনারে গিয়েছিলাম। সংগীতানন্দজি তাঁর আশ্রমে অনেক যত্নআত্তি করেছিলেন। সন্ন্যাস- আখাড়া-কুম্ভমেলা নিয়ে অনেক তথ্য দিয়েছিলেন। মনে আছে দু’ জনের দু’ জনকে। আমার এই আড়াই দশকের অধিককাল কুম্ভভ্রমণের কারণে খুবই স্নেহ করেন। প্রতি বার কুম্ভে দেখা করি। উনি আমাকে দু’ টাকার আশীর্বাদী কয়েন দেন এবং নানা গুজরাতি প্রসাদ (খাবার) দেন।
কাল সুবে সাত বাজে হমারি টাইম। তুমহারি রিপোর্টিং কা যাদা রসদ মিল যায়েগা।
প্রণাম করলাম। কোথাকার মাস্ক কোথায় পরেছে বাবাজি (মনে মনে বললাম)। শুভ্র সফেদ কৌপীন যৌনাঙ্গে। মুখ খোলা। (চলবে)
আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন
The post করোনা-কালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে/৪: হাঁটি বহতা গঙ্গার পাড় ধরে, ঘুরে আসি ভীমগোড়া, কনখল appeared first on Bhramon Online.
]]>The post করোনা-কালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে/৩: তিনটি প্রশ্নের উত্তরের খোঁজে appeared first on Bhramon Online.
]]>এ বার এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক। প্রথমত, সুপার স্প্রেডার করোনা পৃথিবীকে গ্রাস করেছে। কুম্ভের হরিদ্বার তার বাইরে নয়। ভক্তি বড়ো, না ভক্তের জীবন বড়ো? করোনা কিন্তু চতুঃসম্প্রদায়, দশনামী, বৈরাগী (বৈষ্ণব), উদাসীন, গুরু-শিষ্য – কাউকেই ছাড়ছে না। না, ছাড়ছে না রাজা-উজির কাউকেই।
তা হলে ধর্মগুরুকুল কেন এই কুম্ভস্নান বন্ধ রাখলেন না? প্রতীকী পুণ্যস্নান করে, তেরো আখাড়ার প্রধানরা জলে ডুব দিয়ে করোনা-মুক্তির প্রার্থনা করতে পারতেন। এই প্রশ্নের উত্তর মিশে আছে হরিদ্বার কুম্ভের (২০২১) সোয়া চার হাজার কোটি টাকার বাজেটে। দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি – কুম্ভ বন্ধ রাখার ক্ষমতা কারও নেই। দরকার হলে, সোয়াশো কোটি ভক্ত, আমজনতা ‘সিয়ারাম’ হোক। কুম্ভ বন্ধ করতে হলে মসনদ উলটে যাবে। কুম্ভ বন্ধ হলে ওই সোয়া চার হাজার কোটির ভাগবাঁটোয়ারা কী ভাবে হবে? আসুক সুপার ডুপার স্প্রেডার করোনা। মরুক কিছু লোক। তা নিয়ে ছাতারে পাখির কামড়াকামড়ি চলবে টিভিতে। এই তো আমার মহান ভারতবর্ষ।
কুম্ভস্নান বন্ধ হলে বিভিন্ন ধর্মীয় দলের নেতারা পরস্পরকে ছিঁড়ে খাবে। ও দু’-চারটে, দশ-বিশটা করোনার লাশ ভেসে যাক গঙ্গায়। ছিঁড়ে খাক কুকুর-শিয়াল-শকুনে। জীয়ন্তেই জীবনের দাম নেই। মুরদার, প্রাণহীনের আবার দাম কী? ক’ দিন মিডিয়া চিল্লাবে, চিল্লাক। তার পরে আবার নতুন খেলা। নতুন গল্প। নতুন সওয়াল-জবাব। নতুন অদূর দর্শনে। নেট-পাড়ার বীরেরা ড্রয়িংরুমে বসে চিল্লাবে। আবার নব গ্রাউন্ড-জিরোর খোঁজ। গ্রাউন্ড-জিরো থেকে আমরাই প্রথম।
গ্রাউন্ড-জিরো। নতুন এক্সক্লুসিভ। নির্বোধ এবং অবিবেচকের যৌথ প্রয়াসে করোনা তাড়ানোর যাগযজ্ঞ। একই সঙ্গে করোনা ভ্যাকসিনের জন্য চিৎকার। এবং ধর্মগুরুরা গলায় সাড়ে বত্রিশ ভরির হার পরে আমজনতার উদ্দেশে টিভিতে অমৃতবাণী বিলোচ্ছেন, “মাস্ক পরে স্নান করো। জলে দূরত্ব বজায় রেখে ডুবকি মারো।” উনি দেখতে পাচ্ছেন জলে লক্ষণরেখার বৃত্ত স্পষ্ট ভাসছে। এ সব ধর্মগুরু গৃহস্থের মঙ্গল করে স্বপ্নরাজ্য প্রতিষ্ঠা করবেন। এবং স্নান করা, না-করা নিয়ে ঐকমত্য হবে না তেরো আখাড়া এবং অসংখ্য ধর্মীয় দল-উপদলে। সে-ও ওই বস্তু-সম্পদ বা বাসি বিবাদ। না-মেটা পুরাতন শোক-উল্লাস। সুতরাং করোনা-কুম্ভ চলবে হরিদ্বারের অমৃতস্নানে। গঙ্গামাঈয়ের আশীর্বাদে করোনার জীবাণু মরে ধুয়ে মুছে ভেসে যাবে। আপাতত স্নান চলুক। যে সমস্ত রাজনৈতিক নেতা এই সব বাণী দিচ্ছেন, তাঁরা স্ত্রী-পুত্র-পরিবার-কন্যা নিয়ে ওই ভিড়ে স্নান করে ভক্তিটা দেখাতে পারতেন। সে গুড়ে বালি।
প্রথম এবং দ্বিতীয় প্রশ্ন যে হেতু অবিচ্ছিন্ন, তাই একই সঙ্গে উত্তর দেওয়া হল। দীর্ঘ উত্তর।

এ বার তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর। গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান-অধিষ্ঠান, যার উপর নির্ভর করে কুম্ভমেলা। শুধু কুম্ভমেলা কেন, সমস্ত ভারতীয় কাজে প্রথমে আসে ব্রাহ্মণ এবং তার সঙ্গে পঞ্জিকা। তা না হলে মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ যাবে, তারও যাত্রার মঙ্গলমুহূর্ত নির্ণয় করা হয় পঞ্জিকা থেকে। রকেট ফেটে গেলে টেকনিক্যাল ফল্ট। সফল হলে পঞ্জিকা নির্দেশিত শুভকাল এবং প্রচারক ব্রাহ্মণের মন্ত্রযশ। হায় রে আমার হতভাগ্য স্বদেশ-সমাচার।
এই পঞ্জিকাতেও আছে নানা প্রাদেশিক বিবাদ। কেউ কাউকে মানে না। এই বিবাদ মেটাতে প্রথম উদ্যোগী হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। তিনি দায়িত্ব দেন বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহাকে। তৈরি হয় ‘রাষ্ট্রীয় পঞ্চাঙ্গ’। সেটা করতে গিয়ে প্রচুর বিবাদ-বিপত্তি। প্রধানমন্ত্রী ও বিজ্ঞানী বিব্রত বোধ করেন। অবশেষে ‘রাষ্ট্রীয় পঞ্চাঙ্গ’ অনুমোদিত হয়। ভারত সরকারের পাবলিকেশন বিভাগ থেকে আজও প্রকাশিত হয়ে আসছে এই বাৎসরিক পঞ্জিকা। তবে এই পঞ্জিকা যতটা না হিন্দুধর্মের অনুসরণ করেছে, তার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান তথা অ্যাস্ট্রোনমি চর্চায়। অবশ্যই গ্রহ-নক্ষত্রের চর্চা আছে বই-কি! কিন্তু আধুনিক ভারতের দুর্ভাগ্য, সে হেরে গেল প্রাচীন ভারতের একাধিক ধর্মবিশ্বাসের কাছে। ‘রাষ্ট্রীয় পঞ্চাঙ্গ’ ভারতীয় সমাজ মেনে নিল না।
তৃতীয় প্রশ্ন, হরিদ্বারের পূর্ণকুম্ভ এক বছর এগিয়ে এল কেন এবং কী ভাবে? এই প্রশ্নের উত্তরে যাওয়ার আগে ২০১০-এ হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে পুণ্যস্নানের দিনগুলো কী ছিল, তা এক বার দেখে নেওয়া যাক –
(১) ১২ ফেব্রুয়ারি – মহাশিবরাত্রি, প্রথম শাহি বা প্রধান স্নান।
(২) ১৫ মার্চ – সোমবতী অমাবস্যা, দ্বিতীয় শাহিস্নান।
(৩) ১৬ মার্চ – নও সম্বত (রাজা বিক্রমাদিত্য প্রচলিত ক্যালেন্ডার সম্বত তথা বিক্রম সম্বত মোতাবেক নববর্ষ)। পূর্ব ভারত ও দক্ষিণ ভারত ছাড়া ভারতের অন্যত্র এই ক্যালেন্ডারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, রাজস্থান, গুজরাত প্রভৃতি রাজ্যে নববর্ষ বলতে এই দিনটিকেই বোঝায়।
(৪) ২৪ মার্চ – শ্রীরামনবমী। বৈষ্ণবদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
(৫) ৩০ মার্চ – চৈত্র পূর্ণিমা।
(৬) ১৪ এপ্রিল – মেষ সংক্রান্তি তথা চৈত্র সংক্রান্তি, তৃতীয় শাহিস্নান।
(৭) ২৮ এপ্রিল – বৈশাখ অধিবাস, পূর্ণিমা।
২০১০ খ্রিস্টাব্দের এই স্নানপঞ্জি প্রকাশ করেছিল উত্তরাখণ্ড সরকার। এটা মনে রাখা দরকার, শিবরাত্রি, সোমবতী অমাবস্যা এবং নও সম্বতের দিনগুলোয় স্নান চলবে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে, গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের যে তারিখেই পড়ুক না কেন। আর হরিদ্বারে শাহিস্নানের সংখ্যা তিনটিই। এই সংখ্যা অপরিবর্তিত।
১৪ জানুয়ারি (মকরসংক্রান্তি), ১৫ জানুয়ারি (মৌনী অমাবস্যা), ২০ জানুয়ারি (বসন্তপঞ্চমী) ও ৩০ জানুয়ারি (মাঘীপূর্ণিমা) – এই চারটি দিনকে স্নানপঞ্জিতে যোগ করেছে সরকারি বিভাগ। এগুলি পুণ্যস্নান অবশ্যই। তবে তা হরিদ্বারের পূর্ণকুম্ভের স্নানের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে গ্রহ-নক্ষত্র, তার ভালো-মন্দ নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে যিনি নাড়াচাড়া করছেন সেই বন্ধুবর গোঁসাইজির কাছে। আধুনিক আকাশচর্চার কথা শুনিয়েছেন। পুরো নাম রজত গোস্বামী। এবং গ্রহ-নক্ষত্র-আকাশ চর্চায় রত স্কাই ওয়াচার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ঢাকুরিয়া, কলকাতা) প্রেসিডেন্ট অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক বাসুদেব ভট্টাচার্য। অশীতিপর যুবক। এখনও ক্যাম্পে যান। আমি একাধিকবার ওঁর বাড়িতে গিয়েছি। বহু বার ফোনে উত্ত্যক্ত করেছি। কানে শোনা তথ্য লিখে ডাক যোগে বা হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে অথবা কাছে গিয়ে সংশোধন করে নিয়েছি। বাসুদেবদা সত্যিকারের শিক্ষক। পুরাতন মানুষ বলেই সংস্কৃত ভাষা, সাহিত্য ও বিজ্ঞান ভালো ভাবে পড়েছেন। ফলে ত্রিধারায় নেই বিরোধ। তবে বিজ্ঞান অগ্রে।
বাসুদেববাবু জানালেন, অন্যান্য কুম্ভমেলার মতোই হরিদ্বারের দু’টি পূর্ণকুম্ভের মধ্যের সময়ের ব্যবধান ঠিক ১২ বছর (প্রধানত আমরা বলি বারো বছর এক যুগ) নয়, ১১.৮৬ বছর অর্থাৎ ১১ বছর ১০ মাস। এ বার এই সামান্য ভগ্নাংশ, প্রায় ২ মাসটাই ৬ নং (ষষ্ঠ, ২০২১–এর পূর্ণকুম্ভ ছেড়ে দিয়ে ধরলে) পূর্ণকুম্ভে ২X৬=১২ মাস এগিয়ে আসবে। একমাত্র হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভেই এই ঘটনা ঘটবে। অর্থাৎ সেই পূর্ণকুম্ভ হবে আজ থেকে ৭১ বছর পরে।
রজত গোস্বামীর মতে, হরিদ্বারের পূর্ণকুম্ভমেলার আবশ্যিক শর্ত দু’টি। প্রথম শর্ত: বৃহস্পতি গ্রহ থাকবেন কুম্ভ রাশির ঘরে। দ্বিতীয় শর্ত: রবি বা সূর্য থাকবেন মেষ রাশির ঘরে। সূর্যের অবস্থানেই মাস চিহ্নিত হয়। ফল রবি (সূর্য) যখন মেষ রাশির ঘরে তখন বৈশাখ মাস।
হরিদ্বারে ২০২২ সালে (আগের পূর্ণকুম্ভ হয়েছিল ২০১০ সালে। সাধারণ নিয়মে ১২ বছর বা এক যুগ পরে পূর্ণকুম্ভ) না হয়ে ২০২১ সালে হল। ২০২২ সালে হবে না। কারণ যে দু’টি প্রধান আবশ্যিক শর্ত, তার একটি পূরণ হবে না। কারণ বৃহস্পতি ঘর পরিবর্তন করবেন। ভিন্ন ঘরে তথা মীন রাশির ঘরে চলে আসবেন।
অবশ্য ৭১ বছর পরে আমি দেখতে আসব না। দেখতে হলে আমাকে ১৪১ বছর পরমায়ু পেতে হয়। সত্তরে পা দিয়েছি। পেতাম এই পরমায়ু। দেবতারা বিট্রে করল। অমৃতের ছিটেফোঁটাও দিল না। অথচ পরিশ্রম করলাম। আধাআধি বখরা হল না। চিরকাল দেবতারা ঠকিয়েছে অসুরদের, আমাদের মতো অ-ব্রাহ্মণ প্রান্তবাসী শূদ্রদের। এটি অবশ্যই নিতান্তই লেখকের মত।
এ বছর কিছু সংবাদমাধ্যমে খবর হল, সন্ন্যাসীকুল ও একটি রাজনৈতিক দলের যোগসাজশে কুম্ভমেলা এক বছর এগিয়ে এনে এ বছরে করা হচ্ছে। এটি ২০২২ সালেও করা যেত। তাদের বলি, পঞ্জিকা না মানলে কুম্ভমেলা যে কোনো সময়ে করা যেতে পারে। কিন্তু গ্রহ-নক্ষত্র-রাশিরা রাজনৈতিক দল, পণ্ডিত সম্পাদক, মন্ত্রী-ষড়যন্ত্রী, কারও কথাই যে শোনেন না। এমনকি বক্রীগতি বা বক্রগতির পরে, কুম্ভের কাছে বৃহস্পতির ‘দ্বিতীয়’ বার ফিরে আসাকে মান্যতা দেওয়া হয় না। সুতরাং ২০২২ সালে কুম্ভযোগ সঠিক নয়। আবার বলি, শাস্ত্র মানলে ২০২১ সালটাই কুম্ভের সঠিক সময়। (চলবে)
The post করোনা-কালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে/৩: তিনটি প্রশ্নের উত্তরের খোঁজে appeared first on Bhramon Online.
]]>The post করোনা-কালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে/২: ‘থ্রি বেডেড উইথ অ্যাটাচড বাথ’-এ আমি একা appeared first on Bhramon Online.
]]>জ্বালাপুরে নেমে সে কী কেচ্ছা, সীমাহীন! একে গন্তব্যচ্যুত মানুষ, তার ওপর মধ্যদুপুর এবং ক্ষুধার্ত। এর মধ্যে অনেকেরই দু’ ডোজের সার্টিফিকেটও রয়েছে। তা হলে কেন এমন হয়রানি করবে সরকার? মজার ব্যাপার, ভুল হিন্দিতে গজরাচ্ছে। টনটনে জ্ঞান। উত্তরাখণ্ড। রেগেমেগে বাঙালি ইংরেজি বলেনি। সকলের হিন্দি শুনে আমি বোবা। কারণ আমার হিন্দি ইহার চেয়েও খারাপ। মাথা গরম করে লাভ নেই। নিমের হাওয়া ভালো। বাঁধানো গোলাকার চাতালে বসলাম। ব্যতিব্যস্ত মানুষদের দেখছি। নিম পেড়ের নীচে বসে, পক্ব পত্রের মতো।
অসংখ্য গোলাকার ছাতার তলে সুন্দর যুবক-যুবতীরা টেস্টটিউব হাতে। তাঁদের গাইড করছেন সিনিয়র বয়স্করা। অনেক ছাতা গোটা জায়গাটায়। টেস্ট করাও। সরকারি বাস দাঁড়িয়ে। মুফতে জ্বালাপুর থেকে হরিদ্বার স্টেশনের কাছে পৌঁছে দেবে। হুড়মুড়িয়ে সেই বাসে। কে জানলার ধারে বসবে। কে সামনে বসবে। কে পরের বাসে যাবে। মানুষ, আমজনতা আসলে এক অবিবেচক অস্থির প্রাণী। মনে হল আমার, দূরে বসে দেখতে দেখতে।
নিমগাছের পাতা ঝরে পড়ছে। একটা আমগাছে কচি আমের শুঁটি। দূরে একটা ছাতার নীচে সুদৃশ্য – এক জোড়া প্রেমে ডুবে। দেখো বাপু, টেস্টে ভুল কোরো না। কত রকম মুখের লাইন-ড্রয়িং। গলা থেকে লালারস নেওয়ার পরে সে এক যন্ত্রণা। তুলো-সহ দণ্ড ঢোকানোর এবং বের করার পরে মুখে বিরক্তির চরাচর। কে একজন হেঁচে ফেলল। সর্বনাশ! ভাগ্যিস, প্লাস্টিক দণ্ড বের করে নিয়েছিল। প্লাস্টিক না কাচ, কে জানে। ভেঙে গেলে এই বিদেশবিভূঁইয়ে কী হত কে জানে?
সেই রিপোর্ট হাতে আসেনি তখনও। স্বামীর সংশয়, আশঙ্কা। “যদি এখানের রিপোর্টে করোনা পজিটিভ হয়? তখন কী হবে? কলকাতায় এক বার একই জিনিসের দু’ রকম হল না সে বার? কী একটা সুগার না কী যেন? মনে নেই?”
স্ত্রী উত্তর দিলেন – “তোমার যেমন মাথা। এখানের রিপোর্টটা মা গঙ্গায় ভাসিয়ে দেব। আর কলকাতার নেগেটিভটা দেখাব।” সত্যিই নারীর বৈষয়িক বুদ্ধি!
“তা হলে এখানে আবার টেস্ট করানোর দরকার কী ছিল?” স্বামীর বিরক্তিকর প্রশ্ন আবার। তবে স্ত্রীর উত্তরখানি খাসা। “তোমার যেমন বুদ্ধি! কী করে অপিস চালাও। গোটা অপিসটাই কি তোমার মতন? বলি, কলকাতায় তো প্রাইভেটে কত টাকা নিয়েছিল দু’ জনের টেস্টে! এখানে তো নিখরচায়। বুঝলে না?”
আমি বুঝলাম। ওঁর উনিও বুঝলেন কি না জানি না। তবে এই জীবনের সারাংশ, অমৃত, নারী না থাকলে সংসারে সমুদ্রমন্থন এক্কেবারে দফারফা হয়ে যেত। তবে সংসারে নারী না থাকলে সমুদ্রমন্থনের দরকারই হত না। আপনা হাত জগন্নাথ। ভাতে ভাত ফোটাও। তার পর সময় হলেই ফুটে যাও।

“আঙ্কল, মে আই হেলপ্ ইউ?” ছাতার ছায়া সরিয়ে মিষ্টি কণ্ঠে ডাকলেন মেডিক্যাল টিমের সুন্দরী। ভিড় অনেকটাই পাতলা। এগিয়ে গেলাম। পাশেই মেডিক্যাল ভ্যান দাঁড়িয়ে। আবার সেই গলায় কাঠি। নাকে কাঠি। সারা জীবন কাঠি করে ও কাঠি খেয়েই গেল। বিশ্বাস হবে কি না জানি না। দশ-পনেরো মিনিট পরেই এক টুকরো সাদা (সত্যিই এক টুকরো) কাগজে, রবার স্ট্যাম্প মারা, এগিয়ে দিয়ে বললেন ওই রমণী, “হো গিয়া। জাইয়ে আঙ্কলজি। বাস খাড়া হ্যায় হরিদ্বার জানে কে লিয়ে।”
জানি না, এই দশ-পনেরো মিনিটে কোভিড ১৯ টেস্ট সম্ভব কি না। মেডিক্যাল সায়েন্সের মানুষ বলতে পারবেন। চৌকো সাদা কাগজে ফরম্যাট করা আছে। নাম-লিঙ্গ-বয়স-স্থান-রাজ্য-তহশিল। পাশে বেগুনি কালিতে রবার স্ট্যাম্প মারা। রিপোর্টের ঘরে করোনা পজিটিভ বা নেগেটিভ। হাসি পেল বই-কি! পরমায়ু বোধ করি যমের হাতে। এ-ও শুনলাম, হরিদ্বারে নানা স্থানে এমন সেন্টার একাধিক। যে চিরকুট দেওয়া হল, তার পরমায়ু বাহাত্তর ঘণ্টা। আবার টেস্ট। আবার চিরকুট। আবার টেস্ট। আবার পুণ্যের ডুবকি। আবার স্রোতে অবগাহন। ও মা গঙ্গা, মাগো মা, বিচার করো মা।
ডাক্তারি পরীক্ষার পরে পোঁটলা-পুঁটলি নিয়ে বাসে উঠলাম। কনখলের কাছে বাস থেমে গেল। আর যাবে না। এই তার সীমারেখা। এ বার রিকশা নাও। পথ ধরো। হাত-পা কাঁপছে। বাসের ড্রাইভার-কনডাক্টর বলল, এই তো কাছেই হরদুয়ার রেলস্টেশন। উঠে পড়লাম তিন চাকার রিকশায়। উঠলেই আশি থেকে একশো টাকা ভাড়া, যে যেমন পারে। এই তথ্য সকলের জানা। মেলার সময় মানুষ মুরগি। যে যেমন পারে, যাকে যেমন পারে জবাই করে, হালাল অথবা ঝটকা।
একটু পরেই পুলিশ-ঘেরাও মানে ব্যারিকেড। কারণ রিকশা ঢোকা মানা। ওদের লৌহকপাটও টপকানো যাবে না। উপায়, অনেক ঘুরে, ঘুরিয়ে নাক দেখানো। অনেক বচসা। অনেক তর্কবিতর্ক। ঘেমে একশেষ। শেষে ছাড়। রিকশা অবশ্য সংখ্যায় সামান্য। যাব মহারাজা অগ্রসেন চৌক। মহারাজার মূর্তির বামেই ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ।
এক কথায়, বলাই ষাট, ষাট টাকা বলল রিকশাওয়ালা। রাস্তা সামান্যই। মেলা না থাকলে তিরিশ টাকা ভাড়া হত। তা হোক। আমরা তো শপিং মলে সায়লেন্ট, ভদ্র ক্রেতা। যত চোটপাট এই প্রান্তবাসীদের সঙ্গে। মিনিট পাঁচ-সাতের মধ্যেই ভারত সেবাশ্রমের বিশাল আশ্রম। এই ক’ বছরে আরও বড়ো হয়েছে। তবে খোলা চাতালটি বেশ বড়ো, অপূর্ব। তিনখানা আমগাছ। ভরন্ত ফলে শ্রীময়ী। আশ্রমের অফিসে কাগজপত্র সব মিটিয়ে ঘরের স্লিপ পেলাম। বলে রেখেছিলেন সঙ্ঘের বর্তমান সম্পাদক দিলীপ মহারাজজি। সহ-সম্পাদক ভাস্করানন্দজি মেলার সময় আশ্রম পরিচালনের জন্য আগেভাগে এসে গেছেন। আশ্রম ফাঁকা ফাঁকা। করোনার কারণে অনেকেই বুকিং ক্যানসেল করেছেন, শুনলাম।
বড়ো, থ্রি বেডেড উইথ অ্যাটাচড বাথ। আমি একা। দোতলায়। রয়েছে বারান্দা। হাত-মুখ ধুয়ে বড়ো রাস্তায় বের হয়ে দোসা আর লস্যি। দোসা একশো, লস্যি আশি। তবে হরিদ্বারে দুগ্ধজাত সব কিছু সস্তা ও ভালো। দুধের বেশিটাই মহিষের, গোরু কম এখানে। লস্যি খেয়ে জান তর। মশালা দোসায় মাথা ঠান্ডা। ঘরে ফিরে করোনায় বিদ্ধ হরিদ্বার কুম্ভের প্রথম দিনের বিবরণ। অনেক কষ্টে লিখলাম। কষ্ট এ কারণেই যে, যাত্রাপথের হুজ্জতি এখনও যে থিতোয়নি।

এ বারে এই কুম্ভ অধিকতম বিশেষ। একাধিক কারণে।
প্রথমত, এই প্রথম পৃথিবী জুড়ে অতিমারি। একশো বছর আগে স্প্যানিশ ফ্লুর কথা ধরছি না। যাই হোক, সেই অতিমারি থেকে তো বাইরে নয় ভারতের ধর্মশহর, কুম্ভনগরী এই হরিদ্বার।
দ্বিতীয়ত, উঠছে প্রশ্ন, পৃথিবী জুড়ে এই অতিমারি-কালে কি বন্ধ করা যেত না এই স্নান? ভারত ছাড়া অন্য সব দেশে তো জমায়েত বাতিল। সব রকমের জমায়েত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সরকারি ঘোষণায়। এ এক অদ্ভুত মন! সে দ্রুতগতির ট্রেন চাইছে, ফাইভ জিবি চাইছে, অত্যাধিক সমরাস্ত্র চাইছে। অথচ তার ধর্মীয় বিশ্বাস, ‘শিকড়ে দাঁতের পোকা বের করি মা’, ‘ভিটের দোষ কাটাই’। কিছু বলা হলে দিল্লির জামা মসজিদের জমায়েতের তুলনা টানছে সন্তসমাজ। বলছে, কুম্ভস্নানের আগে যে পশ্চিমবঙ্গ-সহ পাঁচ রাজ্য আর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটের নামে হাজার হাজার মানুষের জমায়েত হল, তার বিচার করবে কে। হিন্দু সন্তসমাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ধর্মবাদী পুণ্যপিয়াসিরা। এ নিয়ে তর্কবিতর্ক ভারতের সঙ্গে ইন্ডিয়ার, পেটকাটি-চাঁদিয়ালে।
তৃতীয়ত, হরিদ্বারে এ বার পূর্ণকুম্ভের যোগ পড়েছে ২০২১ সালে। একই স্থানে, হরিদ্বারে, গত বার পূর্ণকুম্ভ হয়েছিল ২০১০ সালে। সরল পাটিগণিতের হিসেব অনুযায়ী ১২ বছর পরে পূর্ণকুম্ভের যোগ আসা উচিত। তা হলে গ্রহ-নক্ষত্রে এমন কী বিবাদ হল যে পূর্ণকুম্ভ এগিয়ে এল এক বছর? ২০২২ সালে না হয়ে হচ্ছে ২০২১ সালে। কেন? (চলবে)
আরও পড়ুন: করোনা-কালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে/১: হরিদ্বারে নয়, নামতে হল জ্বালাপুরে
The post করোনা-কালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে/২: ‘থ্রি বেডেড উইথ অ্যাটাচড বাথ’-এ আমি একা appeared first on Bhramon Online.
]]>The post করোনা-কালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে/১: হরিদ্বারে নয়, নামতে হল জ্বালাপুরে appeared first on Bhramon Online.
]]>চলেছি হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভের স্নানে। এই করোনা-কালে। আমার উদ্দেশ্য কিছু মহৎ না। পূর্ণকুম্ভে স্নানমেলা দেখা এবং মেলার ‘বিবরণ বেচা’ (বন্ধুর ব্যাঙ্গাত্মক শব্দবন্ধ) – একটি দৈনিক সংবাদপত্রের কাজ নিয়ে। চলো মন হরিদ্বার।
“প্রথমেই ভুল করলেন। জায়গাটা হরিদ্বার না হরদ্বার। হরি তো মথুরা-বৃন্দাবনে থাকে। হরিদ্বার হইল মহাদেবের জায়গা। আচ্ছা যাউগ্গা…।” (ভানু এল কলকাতায়)
হরি হরি। জয়গুরু। দুগ্গা দুগ্গা। যাত্রাপথের শুরুতে কোনো বাহাস-বিতর্কে জড়াব না। পথে অমঙ্গল হবে। তার পরে এই হতায়ু (শতায়ু) ঢাকাইয়া বাঙালের সঙ্গে তর্কে জড়ালে কী হতে পারে তা আমি নিরীহ ঘটি জানি। তাই খুব মাখো মাখো বিনয়ের সঙ্গে বললাম, তা যা বলেছেন হতায়ু ভানুবাবু।
ভুল, সবই ভুল। তবে হরিদ্বার রেলস্টেশনের বোর্ডে ইংরেজিতে Haridwar, হিন্দিতে হরিদ্বার লেখা। তবে উর্দুতে কী লেখা পড়তে পারলাম না। কিন্তু হিন্দুস্তানি উচ্চারণে ‘হরদুয়ার’-ই শুনেছি। এই সব আর বললাম না ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় মশাইকে।
ভুলের কথা যখন উঠল, তখন দু’ ছত্তর কয়ে নিই। সেই ১৯৯৬, ইলাহাবাদ অর্ধকুম্ভ থেকে অমৃত খোঁজা। ছেদহীন, এই ২০২১ সালেও। মানে ২৬ বছর। মানে কতগুলো কুম্ভ? ধরো না কেন, ইলাহাবাদ অর্ধ-পূর্ণ-মাঘমেলা মিলিয়ে সাত বার। হরিদ্বার অর্ধ, পূর্ণকুম্ভে পাঁচ বার। নাসিক এবং উজ্জয়িনী তিন বার করে ছ’ বার। মানে, একুনে দাঁড়াল গিয়ে যাকে বলে ১৯ বার। অবশ্য চারটি কুম্ভস্থলে ক্ষেত্রসমীক্ষার জন্য চার বার যাওয়া। কুম্ভের হট্টগোলে স্পট সমীক্ষা ভালো হয় না – এ আমার অভিজ্ঞতা।
মাঝেমাঝেই মন শুধোয়, “পেলে কিছু অমৃতকুম্ভে? হাতে তবে কী?” আমি উত্তর দিই, “হাতে আছে জেল পেন।” জীবন মুচকি হাসে অন্তরালে। গেল কী? গেল তো সবই – সময়, অর্থ, পরমায়ু। পরমায়ু তো এমনিই যেত। তবে লাভ ওই অভিজ্ঞতাটুকু। আর সেই অভিজ্ঞতালাভের লোভে করোনা-আক্রান্ত কুম্ভের পথে নামা। ২০২১ সালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে। কিন্তু সেটা তো দেখা যেত নেট-টিভি-সোশ্যাল মিডিয়ায়। এ সব তো ছিল। অকারণে তৎকাল-এসি করে অর্থনাশ। অবশ্য গরম পড়েছে বিস্তর। তবু এক যুগ, প্রায় ১২ বছর আগে ২০১০ সালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে তো এসেছিলে সাধারণ কম্পার্টমেন্টে। অবশ্য রিজার্ভ করে। তা হলে এ বার? জোশ নেই। তাকত নেই। সত্বরই পা দেব সত্তরে। ফলে এই অর্থদণ্ড দিয়েই যাত্রাপথ। অনেকটাই আরামে, এসিতে।
কিন্তু টিকিটের এত আকাল কেন? এই করোনা-কালেও অনেকেই টিকিট কেটে রেখেছে। ট্রেনে উঠে মালুম হল, কিছুক্ষণ পরে। দু’-এক দিন আগে অনেকেই টিকিট ক্যানসেল করেছে করোনার ভয়ে। হয়তো কাগজ বা টিভি, নয়তো সোশ্যাল মিডিয়া থেকে জেনেছে, হরিদ্বারে এ বছর করোনার কারণে বড়োই কড়াকড়ি। চাই দু’ ডোজ টিকা নেওয়ার সার্টিফিকেট, নয়তো হাসপাতাল-নার্সিংহোম থেকে করোনা নেগেটিভের সার্টিফিকেট। তা না হলে কোয়ারেন্টাইন। তার পর মেলায় ঘোরার অনুমতি।
১৯৫৪ সালের ইলাহাবাদ পূর্ণকুম্ভের পটস্মৃতি (অমৃত কুম্ভের সন্ধানে, কালকূট) এল মনে। কলেরার ইনজেকশন নেওয়ার সার্টিফিকেট না আনলে আটকে রাখছিল মেলা কর্তৃপক্ষ। যাত্রীদের ত্রিপল ঘেরা খোলা জায়গায় রেখে কলেরার ইনজেকশন দেওয়া। এ বার সেই ভয়েই অনেকে পূর্ণকুম্ভের যাত্রা বাতিল করেছেন।
আমারও খেসারতের খবর বিস্তর। এ সব কড়াকড়ির কথা হরিদ্বার থেকে আগাম জানতে পেরে কলকাতার নামী নার্সিংহোমে পরীক্ষা করিয়ে করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট পেতে হাজার দেড়েক। যাত্রা শুরুর দু’ দিন আগে থেকে সে কী উদ্বেগ! ট্রেন ছাড়ল দুপুরে। তখন মোবাইলের স্ক্রিনে বিজ্ঞপ্তি – আমার করোনা নেগেটিভ। অবশ্য তারও ক’ ঘণ্টা আগে রেল দফতর জানাল, আমার বগি ও বার্থ নম্বর। অর্থাৎ ওয়েটিং লিস্টের টিকিট কনফার্মড। যাক বাঁচা গেল!
বাঁচা কি পুরো গেল? না যায়? জীবনদেবতা তো আধমরা করে বাঁচিয়ে রেখেছে। বেঁচে থাকা মানে তো নানাবিধ হুজ্জত। এই যেমন, সরকারি উদ্যোগে করোনা-টিকার প্রথম ডোজ পেয়েছি। দ্বিতীয় ডোজের তারিখ ছিল এপ্রিলের আট। আমার হরিদ্বার-যাত্রা শুরু এগারো এপ্রিল। তার মানে, সঠিক দিনে দ্বিতীয় ডোজ পেলে বুক ফুলিয়ে যেতে পারতাম। সরকার জানাল, আপাতত আট এপ্রিল তারিখটা বাতিল। এবং এই বাতিল না হলে আট এপ্রিল টিকা পেতাম এবং যাত্রাপথেই পেতাম দ্বিতীয় টিকার সার্টিফিকেট। তা আর হল কই?

আপাতত দুপুরের ট্রেনে উঠলাম। হাওড়া-দেহরাদুন। গনগনে হাওড়া স্টেশন ছেড়ে এসি কামরায়। বাঁচলাম ঠান্ডায়। আহ! নীচের বার্থ, পুণ্য পথের ঠিকানা। লোটাকম্বলের বহর বেশ ভালোই। একটা ট্রলি। পিঠে আধুনিক বস্তা। ডান হাতে বিগ শপার। অতিরিক্ত, নিজের ভার। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ভারও বেড়ে চলেছে।
এক এক সময় মনে হয় মানুষ একটি ভারবাহী প্রাণী। সে সমগ্র জীবন ধরে কত রকমের ভার বয়ে চলে। অন্যের ভার, সংসারের ভার, কর্মস্থলের ভার, নিজের ভার এবং সর্বোপরি স্মৃতির ভার। ভাঙা স্মৃতি, গোটা স্মৃতি, রক্তাক্ত স্মৃতি এবং ব্যর্থ অথচ জীবিত স্মৃতি। পথে পথিক কখনও দেখিনি যার দু’ হাত খালি। মুচকি হেসে চলেছে সে একা, নীল আকাশের নীচে। ওই মাত্র দু’ বারই সে ভারমুক্ত হয়ে দেখা দেয়। প্রথম, যে দিন সে এসেছিল। শে্ষ যে দিন সে চলে যায়।
আপাতত যতই গন্তব্যের দিকে যায় ট্রেন, ততই সহযাত্রীরা সংকোচ ভেঙে কাছে আসে। পড়শি হয়ে ওঠে। তা ছাড়া এই ট্রেনের যাত্রীদের অধিকাংশই হরিদ্বারগামী, তীর্থকামী, পুণ্যপিয়াসি। একেবারে সামনেই বাপ-বেটিতে চলেছে। বাপ অরিন্দম গুপ্ত রামরাজাতলার বাসিন্দা, কন্যা অনুপ্রভা হাওড়া সেন্ট মারিয়ার ছাত্রী। অরিন্দম অফিসের কাজে দেহরাদুন। কন্যা হরিদ্বারে এই প্রথম। দেহরাদুন হয়ে, মসুরি (মুসৌরি) হয়ে হরিদ্বারের কুম্ভমেলা দেখা। অর্থাৎ রথ দেখা, কলা-মুলো বেচা এবং ঘরে ফেরা। আমি অবশ্য থাকব, সরকারি ঘোষণা মোতাবেক ‘সংক্ষিপ্ত কুম্ভ’ যত দিন চলবে অর্থাৎ এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত। ওই দিন রাতের ট্রেনে ঘরে ফেরা।
চুঁচুড়ার ঘড়িমোড়ের কাছে বাড়ি অমরনাথ দত্তের, সঙ্গে স্ত্রী জয়ন্তী। এঁদের সঙ্গে পাড়ার অনেকে। যেমন রিনা ঘোষ। সকলেই তীর্থভ্রমণে। মসুরি-দেহরাদুন-হৃষীকেশ হয়ে হরিদ্বারের ব্রহ্মকুণ্ডে মা গঙ্গায় ডুবকি। সব পাপ ধুয়ে মুছে ঘরে ফেরা। এমনিতে ট্রেন ছুটছে। যাত্রীরা এ-পাশ ও-পাশ করে সময় কাটাচ্ছে। ট্রেনে অবশ্য খাবার মিলছে। ডিম কারি, সবজি, দই এবং সকালে ডিম, পাউরুটি। অন্য কিছু নয়। কোভিডের কারণে মাছ-মাংস বাদ। চা এবং বিস্কুট যথেষ্ট। এবং নানাবিধ স্যুপ।
যাত্রীরা চনমনে হয়ে ওঠে, ট্রেন গন্তব্যের দিকে যতই এগিয়ে যায়। সেটাই স্বাভাবিক। সামনেই জ্বালাপুর। তার মানে তো। তার মানে তো এসেই গেছি। স্ত্রী স্বামীকে বলছে, করোনার ইনজেকশনের সার্টিফিকেট পকেটে রাখো। ওটাই তো আগে লাগবে। স্বামী এ রকম অসংখ্য সাবধানবাণী অসংখ্য বার শুনেছেন সংসারজীবনে। বিশেষ গা করলেন না। তার মানে, ঠিক আছে সব।
ঠিক যে নেই বোঝা গেল জ্বালাপুরে এসে। অসংখ্য পুলিশ আর তাদের সাহায্যকারী। গোটা ট্রেনে এক যোগে কড়া নির্দেশ – জ্বালাপুরে নেমে পড়ো, এই ট্রেন হরিদ্বারে দাঁড়াবে না। কারণ জানা গেল। জ্বালাপুরে কোভিড ক্যাম্পে সব যাত্রীর করোনা পরীক্ষা করা হবে। উত্তরাখণ্ড স্বাস্থ্য দফতরের এটাই নির্দেশ।
ওঃ কী জ্বালা! (চলবে)
The post করোনা-কালে হরিদ্বার পূর্ণকুম্ভে/১: হরিদ্বারে নয়, নামতে হল জ্বালাপুরে appeared first on Bhramon Online.
]]>