পশ্চিমবঙ্গ ভ্রমণ কাহিনি সমুদ্র

সৈকত, লাল কাঁকড়ার দল এবং সাগরসংগ্রামীরা

শ্রয়ণ সেন

“ও রকম ভয়ের রাত আমরা কোনো দিন দেখিনি বাবু। জানি আমরা প্রাণে বেঁচে গিয়েছি, কিন্তু খালি ভাবছি, কাল সকালে উঠে নিজেদের মাথা গোঁজার ঠাঁইটা ঠিকঠাক দেখতে পাব তো!”

কথাটা বলার সময়ে দিলীপ বরের চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট লক্ষ্য করলাম। সত্যিই তো, একদিন সকালে উঠে যদি কেউ দেখেন তাঁদের ভিটেমাটি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে, তা হলে এই মীন বেচে সংসার নির্বাহ করা মানুষগুলো যে বড্ড আতান্তরে পড়বেন।

এখানে পৌঁছোনোর সময়েই দেখেছিলাম সাইক্লোন শেল্টারটা। মে মাসে যখন ফণীর আসার কথা, তখন আশেপাশের গ্রামের সব মানুষকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এই বাড়িটায়। শুকনো খাবার-সহ সব কিছুরই বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু তবুও চিন্তা তো কিছুতেই কাটছিল না। দিলীপ-সহ বাকি সবাই সারা রাত একটাই প্রার্থনা করে গিয়েছেন, এ যাত্রায় যেন ঘূর্ণিঝড়ের হাত থেকে রক্ষা পান তাঁরা।

“সকাল হতেই দেখলাম ঝড়ের বিশেষ কোনো প্রভাব নেই। বৃষ্টি হচ্ছিল, আর দু’একটা গাছের ডাল ভেঙেছে। তখনই বুঝলাম আমাদের ভিটেমাটি সব ঠিক আছে।”— দিলীপের আনন্দ যেন বাধ মানে না।

ফণীর গল্প শোনাচ্ছেন দিলীপ বর।

দিলীপরা এই বগুড়ান এবং তার আশেপাশের সমুদ্র তীরবর্তী গ্রামের বাসিন্দা। মীন বেচে এবং অল্পস্বল্প চাষবাস করেই তাদের সংসার। সকাল হতেই সমুদ্রের ধারে দিগন্তবিস্তৃত বালিরাশির ওপরে বসে পড়েছেন। চলছে মীন বাছা। কিন্তু এত কষ্ট করে, এত ধৈর্যের কাজেও যে লাভ বিশেষ নেই।

“১০০০টা মীনে ১০০ টাকা করে পাই। আর যদি শীতকাল হয়, তা হলে ৩০০ মতো।” তবুও তাঁর মুখে হাসি। নিষ্পাপ, সরল একটা হাসি।

গ্রামটার পুরো নাম বগুড়ান জলপাই। বাংলার সৈকত মানচিত্রে নবতম সংযোজন। আমার দেখা অন্যতম সেরা সৈকত এই বগুড়ানের সৈকত। কাল দু’বার এসেছিলাম, কিন্তু সমুদ্র এবং সৈকতের রূপটা কিছুতেই আমার চোখে ধরা পড়েনি। আজ সকালে অবশ্য তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছি।

মনে পড়ছে কাল হোটেলের ম্যানেজারবাবুর সেই কথাটা, “চিন্তা করবেন না, আজ সন্ধ্যা বা কাল সকালে বিচে যাবেন, অন্য রূপে দেখবেন।”

সূর্য নামে পাটে, বগুড়ান।

আসলে কাল হোটেলে ঢুকেই একপ্রস্থ ঘুরে গিয়েছি বগুড়ান বিচ। তখন দেখেছিলাম কতটা দূরে সমুদ্র। বহু দূরে। ভাটার সময়। তাকে কাছে পেতে গেলে বিচের ওপর দিয়ে অন্তত আধঘণ্টা হাঁটতে হবে। মনে পড়ল ওড়িশার চাঁদিপুরের কথা। ঠিক এ ভাবেই ভাটার সময়ে সেখানে সমুদ্র পিছিয়ে যায়। কিন্তু সমুদ্র পিছিয়ে গিয়েছিল বলে কিছু অনন্য জিনিস লক্ষ করেছিলাম। বালিয়াড়ির ওপরে তৈরি হয়েছে অসাধারণ সব ভাস্কর্য বা টেক্সচার।

এর পরে বিকেলে যখন আবার পা পড়ল এই সৈকতে, সেই টেক্সচার সব উধাও। কারণ সমুদ্র এগিয়ে এসেছে জোয়ারের জন্য। ওই বিকেলে পড়ন্ত সূর্যকে সাক্ষী রেখে আমরা নিজেদের মতো করে ধরা দিলাম সাগরের সামনে। কেউ মেতে উঠল লোকগানে, কারো ইচ্ছে হল প্রকৃতিকে সাক্ষী রেখে একটু শীর্ষাসন করার, আর কেউ বা মেতে উঠলেন নিছক আড্ডায়।

কাল সকালে কাঁথি স্টেশনে নেমে সদল চলে এসেছি এই বগুড়ানে। ভ্রমণ লেখকদের নিয়ে কলকাতার সংগঠন ‘ট্রাভেল রাইটার্স ফোরাম’-এর সদস্য আমরা সবাই। দু’ দিনের আবাসিক ভ্রমণ লিখনশৈলী কর্মশালার আয়োজন হয়েছে এখানে। প্রকৃতির মাঝখানে নির্জন পরিবেশে কিছু পড়াশোনাও হবে, লেখক হিসেবে নিজেদের সমৃদ্ধ করার পাঠও চলবে, আবার সুযোগ বুঝে সমুদ্রকে দর্শন দেওয়াও হবে।

কাঁথি শহর থেকে জুনপুটের রাস্তায় বেশ অনেকটা গিয়ে আলাদারপুট ব্রিজ। সেখান থেকে ডাক দিকে একটা কংক্রিটের সরু রাস্তা বেরোচ্ছে। বাঁ দিকে একটি খাঁড়িকে রেখে এগিয়ে যাচ্ছি বগুড়ানের দিকে। মিনিট কুড়ি পর সাগর নিরালায় ঢুকে পড়ল দয়ালের অটো। এসে পৌঁছোলাম বগুড়ান।

এমন সুন্দর সৈকত, বাংলায় কমই আছে।

হোটেলের পরিবেশ অসাধারণ। ঝাউবনের মাঝেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দু’টো বাড়ি, কয়েকটা কটেজ এবং পাঁচ-ছটা টেন্ট। রয়েছে বেশ কয়েকটা হ্যামক। সেখানে ইচ্ছে করলে আপনি নিজেদের শরীরটা এলিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু সমুদ্র কই?

আগে থেকে পড়াশোনা না করে যিনি এই হোটেলে আসবেন, হতাশ হবেন। কারণ এখান থেকে সমুদ্র দেখা যায় না। তার জন্য আপনার দু’টো পায়ের সাহায্য নিয়ে এগোতে হবে আরও পাঁচ মিনিট।  

আমাদের হতাশ হওয়ার কোনো প্রশ্নই ছিল না, কারণ আমরা জানতাম হোটেলের অবস্থান সম্পর্কে। কিন্তু যার ব্যাপারে বিশেষ কোনো ধারণা ছিল না, সেটা হল এখানকার সৈকতটা। কাল দুপুরে এসে সমুদ্রকে বেশ কিছুটা পেছনে দেখে হতাশ হয়েছিল, বিকেলে বেশিক্ষণ উপভোগ করতে পারিনি, আলো কমে আসার কারণে। কিন্তু আজ চুটিয়ে উপভোগ করছি সাগর এবং তার এই সৈকতকে।

বগুড়ানে পর্যটকের সমাগম কম, তাই লাজলজ্জা ছাড়াই অবাধ বিচরণ করে চলেছে লাল কাঁকড়ার দল। দিঘা-উদয়পুর-তালসারিতে আমরা যেমন সচরাচর দেখি যে কাঁকড়া কিছুতেই আমরা ধরা দিতে চায় না, এখানে সে সবের বালাই নেই। হয়তো তারা বাইরের মানুষকে বুঝতে পারে না, কিংবা তারা অকুতোভয়। আর তাই আমাদের ক্যামেরার সামনে ধরা দিতে কোনো কার্পণ্য নেই তাদের।

উঁকি মারে সে।

প্রথমে সৈকত ধরে পশ্চিম দিকে হাঁটা শুরু করেছিলাম, অর্থাৎ দিঘার দিকে। কিন্তু এই দিকে বেশি হাঁটার উপায় নেই। কারণ একটু পরেই আছে ছোট্ট মোহনা। এখানে সাগর থেকে বেরিয়েছে একটা খাল। মুখ ঘোরালাম উলটো দিকে।

চওড়া সৈকত ধরে এগিয়ে যাচ্ছি, কোথায় যাচ্ছি জানি না। আমার ডান দিকে বঙ্গোপসাগরের বিরামহীন ঢেউ আর বাঁ দিকে ঝাউবন। পর্যটকের ভিড় এখানে নেই, তাই হোটেল গড়ার কোনো তাগিদ নেই, আর তাই নির্বিচারে ঝাউবন নিধনও নেই।

সমুদ্রকে কেন্দ্র করে এখানকার বাসিন্দাদের জীবনসংগ্রাম। তাই সক্কাল হতেই সবাই চলে এসেছেন সমুদ্রের ধারে। সৈকতের বিভিন্ন জায়গায় বসে পড়েছেন অনেকে, চলছে মীন বাছার কাজ। কেউ কেউ জাল নিয়ে চলে গিয়েছেন সমুদ্রের মধ্যে। ঢেউয়ের সঙ্গে সংগ্রাম করে চলেছে মাছ ধরা।

দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, এই সমুদ্রই এখানকার সুখের কারণ, আবার দুঃখেরও। এই সমুদ্র আছে বলে এখানকার মৎস্যজীবী পরিবারগুলির সংসার চলছে। আবার মাঝেমধ্যে এই সমুদ্রের দানব জলোচ্ছ্বাস ভাসিয়ে দেয় এখানকার চাষের জমি।

বগুড়ানের ঝাউবন

এরই মধ্যে দেখা হয়ে গেল দিলীপ বরের সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে আবার দিকশূন্যপুরের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। আমি আজ মুক্ত, নেই কোনো পিছুটান। এখন এখানে শুধু আমি, সমুদ্র আর লাল কাঁকড়া…

হঠাৎ ফোরামের রথীনদার ফোন, “ঋভু, আধঘণ্টার মধ্যে হোটেলে আয়, পরের সেশনটা শুরু করতে হবে।”

কী ভাবে যাবেন

ট্রেনে বা বাসে পৌঁছে যান কাঁথি। এখান থেকে বগুড়ান যাওয়ার জন্য অটো বা গাড়ি পাওয়া যাবে। তবে আগে থেকে হোটেলে বলে রাখলে অটো পাঠিয়ে দেবে তারা। ভাড়া ৩০০ টাকা। যদি ব্যক্তিগত গাড়িতে যেতে চান, তা হলে কাঁথির জুনপুট মোড় থেকে জুনপুটের রাস্তা ধরুন। ছ’কিমি যাওয়ার পর পড়বে আলাদারপুট ব্রিজ। এখান থেকে ডান দিকে সরু কংক্রিটের রাস্তায় বগুড়ান আরও ৬ কিমি।

সাগর নিরালার চত্বরে।

কোথায় থাকবেন

বগুড়ানে থাকার একমাত্র যাওয়া হোটেলে সাগর নিরালায়। এখানে রয়েছে এসি দ্বিশয্যা (২০০০ টাকা ঘরপ্রতি), এসি তিনশয্যা (২৫০০ টাকা ঘরপ্রতি) এবং এসি চারশয্যা (২৮০০ টাকা ঘরপ্রতি)। বুকিংয়ের জন্য যোগাযোগ: ৯৪৩৪০১২২০০, ৯৮০০০৭৫১০৯, ৮৬৭০৫৪৭৪১১

Leave a Comment

Your email address will not be published.

You may also like