এক টুকরো হাম্পি : দেখুন জেনানা এনক্লোজার

  • by
avijit kumar chatterjee

অভিজিৎ কুমার চ্যাটার্জি

হাম্পির স্থাপত্যগুলি ধর্মনিরপেক্ষ ও ইন্দো ইসলামিক স্থাপত্যের প্রকৃষ্ট উদাহরণ, যেমন, ‘কুইন্স বাথ’, ‘আস্তাবল’ ইত্যাদি। এগুলি প্রমাণ করে হাম্পি, সর্ব ধর্মীয় ও সর্ব জাতিগত সমাজ হিসাবেই প্রতিষ্টিত ছিল।

১৫৬৫ সালের তালিকোটার যুদ্ধে হাম্পি ব্যাপক ভাবে ধ্বংস হয়। বিজয়নগর রাজ্যের ধ্বংসের পূর্বে হাম্পি যে চরম বৈভব ও বিলাসিতার এক উৎকর্ষে পৌঁছেছিল, তার সাক্ষ্য আজ বহন করে চলেছে ধ্বংসপ্রাপ্ত সৌধগুলি।

১৮০০ সালে ভারতের প্রথম সার্ভেয়ার জেনারেল কর্নেল ‘কলিন ম্যাকেঞ্জি’ লোকচক্ষুর আড়াল থেকে বহির্বিশ্বের কাছে তুলে ধরেন হাম্পির এই ধ্বংসাবশেষ।

আরও পড়ুন পুজোর ভ্রমণ-ছক/খবর অনলাইনের বাছাই: কর্নাটক

জেনানা এনক্লোজারের সব চেয়ে সুন্দর বাড়ি ‘পদ্ম মহল’ বা ‘লোটাস মহল’। দোতলাটি মনে হয় পরে তৈরি, কারণ সিঁড়িগুলি ভীষণ সরু ও স্থাপত্য শৈলীর সঙ্গে ঠিক মিশ খায় না! এটির চারপাশ খোলা, অনেকগুলি স্তম্ভ উপরের তলাকে ধরে রেখেছে। দোতলার জানলাগুলিতে কাঠের খড়খড়ি লাগানো, যা বিজয়নগরের আর অন্য কোনো স্থাপত্যে দেখা যায় না। হিন্দু-মুসলিম স্থাপত্যের এক অদ্ভুত মিশেল ঘটেছে এই বাড়িতে। ভাবতে অবাক লাগে, যখন বিজয়নগর আগুনে পুড়ছে, সেই সময়ে এই মহলটি কী করে, আগুনের গ্রাস থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারল!

আর এর ঠিক পেছনেই আছে ‘হাতিশালা’। লম্বা এই বাড়িতে এগারোটা ঘর আছে, ওপরে ছাদে গম্বুজ। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী একে হাতিশালা বলা হলেও এখানে কোনো লোহার আংটা বা রড দেখা যায় না! মনে প্রশ্ন জাগে, হাতিশালা রাজপ্রাসাদ সংলগ্ন এলাকায় না থেকে জেনানা মহলের এত কাছে কেন থাকবে? তা ছাড়া হাতিশালার তুলনায় বাড়িটি বেশি সুন্দর!

তথাকথিত হাতিশালার কাছে দক্ষিণমুখী একটি গথিক ধরনের একটা ভাঙা বাড়ি দেখা যায়। সামনে খিলান দেওয়া বারান্দা। এই বাড়িটিকে অনেকে ‘সংগীত মহল’ও বলে থাকেন। এর প্রবেশদ্বারটি দক্ষিণমুখী এবং একটিই। ছাদ পড়ে যাওয়ায় এর ওপরে কী ছিল বোঝার উপায় নেই। অতীতে রাজ পরিবারের জেনানাদের জন্য মহিলা ও পুরুষ, দু’ রকম রক্ষীই থাকত। তাই জেনানা মহলের মধ্যে বাড়িটি মহিলা রক্ষীদের এবং এই বাড়িটিকে পুরুষ রক্ষীদের ঘর বলে মেনে নেওয়া অনেক যুক্তিসঙ্গত। অনেকে এটি ধর্মশালা বা জেনানা মহলের পুরুষ রক্ষীদের ঘরও বলেছেন। তবে এটাকে সংগীত মহল হিসাবে মেনে নেওয়া যায় না! কারণ এই ধরনের প্রমোদ অনুষ্ঠান ‘পদ্ম মহল’-এই হত।

queen's bath, hampi

রানির স্নানাগার।

পাথরের দরওয়াজা ছেড়ে দক্ষিণের দিকে কাঁচা রাস্তা ধরে এগোলে এসে পড়বেন হাম্পির প্রধান রাস্তায়। ঠিক এখানেই আপনি দেখতে পাবেন ‘কুইন্স বাথ’, রাজকীয় পরিবারের মহিলাদের জলকেলি করার প্রমোদ ভবন।

‘রানির স্নানাগার’ বা ‘কুইন্স বাথ’ ইন্দো-সেরাসেনিক রীতিতে তৈরি একটি বাড়ি এবং প্রাসাদ সংলগ্ন এলাকার মধ্যে অবস্থিত। এটির চার পাশে একটি পরিখার চিহ্ন আছে, যদিও এতে জল এখন আর নেই। বাড়িটির মাঝখানে একটি ছোটো পুকুর বা সাঁতার কাটার জায়গা বা চার পাশে ঝুলবারান্দা দিয়ে ঘেরা। দেওয়ালে বা খিলানে যে কারুকার্যগুলো দেখা যায়, সেগুলি লোটাস মহলেও দেখা যায়। সুতরাং মনে হয় এ দু’টি একই সময়ে তৈরি। একটা তথ্য খুব একটা পরিষ্কার নয় যে, জেনানা মহল থেকে স্নানাগারের দূরত্ব প্রায় আধ মাইল, লোকালয় পূর্ণ এলাকার মধ্যে দিয়ে রানি কি এতদূর স্নান করতে আসতেন? তাই জায়গাটিকে স্নানাগার না বলে প্রমোদ ভবন বলা অনেক বেশি সঠিক হবে।

রানির স্নানাগার থেকে উত্তর পশ্চিম দিকে হাম্পির রাস্তায় কিছু দূর এগোলে একটি বড়ো আটকোনা বাড়ি দেখা যায়। রানির স্নানাগারের মতো এটিও ইন্দো-সেরাসেনিক রীতিতে তৈরি এবং একই সময়ে তৈরি বলে মনে করা হয়। বিভিন্ন দিকে খিলানের মধ্যে দিয়ে ভিতরে যাওয়ার প্রবেশপথ আছে। এর মাঝখানে একটি ফোয়ারা বসানো আছে ও সামনে একটি বড়ো পাথর থেকে কাটা খোলা নালির মতো আছে। মনে করা হয়, উৎসবের সময় গরিব-দুঃখীদের জন্য পানীয় ধরে রাখা হত।

হাম্পি একটা শিলালিপি, যেখানে লেখা আছে এক সময়ের বা মধ্য যুগের সবচেযে বড়ো আধুনিক শহরের কথা। দুর্গ, নানা মন্দির ও নানা রাজকীয় ভবনের সমাহার এখানে। তুঙ্গভদ্রার তীরে হাম্পি তার প্রাচুর্য্যকে ধরে রেখেছিল প্রায় তিনশো বছর!

inside lotus mahal

লোটাস মহলের ভিতরে।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে সরাসরি হাম্পি যেতে হলে চলুন অমরাবতী এক্সপ্রেসে। সপ্তাহে পাঁচ দিন চলে। সময় জানার জন্য দেখে নিন erail.in । হসপেট নামতে হবে। হসপেট থেকে ১২ কিমি, গাড়ি, বাস সব পাবেন। বেঙ্গালুরু থেকে সড়ক পথে হাম্পি ৩৪৩ কিমি, সময় লাগে ৬-৭ ঘন্টা, রাস্তা খুব ভালো। ভারতের যে কোনো বড়ো শহরের সঙ্গে বেঙ্গালুরু রেল ও বিমানপথে যুক্ত।

কোথায় থাকবেন

হাম্পিতে বিদেশিদের বেশ ভিড়। মূলত তাঁরা হাম্পি বাজার এলাকাতেই থাকেন। হাম্পি বাজার এলাকায় মধ্য বাজেটের বেশ কিছু হোটেল ও গেস্ট হাউস আছে, যদিও তাদের গুণগত মানে তারতম্য আছে! এই জায়গাগুলির সন্ধান পাবেন হোটেল বুকিং-এর বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে।

হাম্পিতে থাকার দু’টি সেরা জায়গা হল – ১) কর্নাটক পর্যটনের ‘ময়ূর ভুবনেশ্বরী’, বুকিং-এর জন্য লগ ইন করুন kstdc.co; ২) ব্যাক্তিগত মালিকাধীন ‘হোটেল ক্লার্কস ইন’, বুকিং-এর জন্য লগ ইন করুন clarksinn.in । এই দু’টি হোটেল থেকে হাম্পির সৌধগুলি সবই ২-৩ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে।

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।