ঘরে বসে মানসভ্রমণ: মরুশহর বাড়মের

  • by

ভ্রমণঅনলাইন ডেস্ক: রাজস্থানের মরুশহর ভ্রমণ বলতেই আমাদের প্রথমেই মনে আসে জৈসলমেরের কথা। ‘সোনার কেল্লা’ করে সত্যজিৎ রায় যে শহরের স্থায়ী জায়গা করে দিয়েছেন পর্যটন মানচিত্রে। বাঙালি তো জৈসলমের বলতে অজ্ঞান। না হওয়ার কোনো কারণ নেই। ‘সোনার কেল্লা’ ছাড়াও এই শহর ও তার আশেপাশে এত দ্রষ্টব্য আছে যে অনায়াসে ৩-৪টে কাটিয়ে দেওয়া যায় মরুশহরে। তাই জোধপুর বা বিকানের থেকে জৈসলমের এসে সেখানে দু-চারটে দিন কাটিয়ে বাঙালি ছুটে চলে পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশে, যেটা কখনোই বাড়মের নয়। অবহেলায় পড়ে থাকে আরেক মরুশহর বাড়মের।

স্যান্ড ডিউনস এবং সেখান থেকে সূর্যাস্ত দেখতে আমরা ছুটে যাই জৈসলমের থেকে সাম (৩৬ কিমি) বা খুরি (৪৯ কিমি)। কিন্তু বাড়মেরের কাছে মহাবার বালিয়াড়ি নিঃসন্দেহে হার মানায় সাম-খুরিকে।  

গড় মন্দির।

ভ্রমণঅনলাইন ‘আনলক’-এর প্রথম পর্বে আজ বাড়মের নিয়ে যাচ্ছে মানসভ্রমণে।

থর মরুভূমির বুকে রমণীয় মরূদ্যান বাড়মের। এর আগের নাম ছিল মাল্লানি। ১৩ শতকের শাসক বাহাড় রাও পারমারের রাজধানী ছিল জুনা। রাওয়াত ভিম সেখান থেকে রাজধানী সরিয়ে আনেন মাল্লানিতে, শহরের নাম হয় বাহাড়মের যার অর্থ বাহাড়ার পাহাড়ি দুর্গ, বাহাড়মের কালক্রমে হল  বাড়মের।        

কী দেখবেন

(১) বাড়মের ফোর্ট ও গড় মন্দির – বাড়মের শহরে পাহাড়ের গায়ে ১৫৫২ খ্রিস্টাব্দে দুর্গ তৈরি করেন তৎকালীন শাসক রাওয়াত ভিম। পাহাড়ের উচ্চতা ১৩৮৩ ফুট। কিন্তু রাওয়াত ভিম গড় তৈরি করেন ৬৭৬ ফুট উচ্চতায়। তিনি মনে করেছিলেন, পাহাড়ের শীর্ষদেশ থেকে ওই জায়গাটি বেশি নিরাপদ। গড়ের মূল প্রবেশপথ উত্তর দিকে। নিরাপত্তার জন্য পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তৈরি করা হয় বুর্জ। গড়ের চার দিকেই মন্দিরগুচ্ছ। তার মধ্যে দু’টি মন্দির দর্শনীয় – এক, পাহাড়শীর্ষে অষ্টভুজা দুর্গা তথা যোগমায়া দেবীর মন্দির, ৪৫০ ধাপ সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়; দুই, ৫০০ ফুট উচ্চতায় নাগনেচি মাতা মন্দির। যোগমায়া দেবীর মন্দির হল গড় মন্দির। গড় মন্দির থেকে বাড়মের শহরের দৃশ্য দারুণ লাগে।

(২) চিন্তামণি পার্শ্বনাথ জৈন মন্দির – বাড়মের শহরের পশ্চিমপ্রান্তে টিলার মাথায় এই মন্দির, ১৬ শতকে নির্মিত। জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথকে নিবেদিত এই মন্দিরের ভেতরের কাজ দেখার মতো।

(৩) বঙ্কাল মাতা মন্দির – বাড়মের শহরের পশ্চিমপ্রান্তে ৬৭৫ ফুট উঁচু পাহাড়ের মাথায় এই মন্দির। এখান থেকে দূরের পাহাড়রাজি, সমতলভূমি, উপত্যকাভূমি এবং মরুপ্রান্তর দারুণ লাগে।             

মহাবার থেকে সূর্যাস্ত।

(৪) মহাবার বালিয়াড়ি – সূর্যাস্তের জন্য বিখ্যাত – বাড়মের থেকে ৭ কিমি, সাঞ্চোরমুখী রাস্তায় কিছুটা গিয়ে বাঁ হাতি রাস্তা। ৩ কিমি গিয়ে রাস্তার ধারেই বোর্ডে লেখা মহাবার, ডানহাতি পিচঢালা পথ সামান্য। বালি-পাহাড়ের পাদদেশ। এখানকার বালি-পাহাড় উচ্চতায় হার মানায় সাম-খুরিকে। বালির পাহাড়ে চড়ে পৌঁছে যান সূর্যাস্ত-বিন্দুতে। সামনে পশ্চিম আর উত্তর দিক পাহাড়ে ঘেরা। সেই পাহাড়ের অন্তরালে চলে যাবে সোনালি সূর্য। সাম-খুরির নাম আছে, মহাবার অখ্যাত। কিন্তু নির্দ্বিধায় বলা যায় মহাবারের সূর্যাস্ত হার মানায় সাম-খুরিকে।

(৫) সফেদ আখাড়া – মহাবার যেতেই পড়ে সফেদ আখাড়া তথা সিদ্ধেশ্বর মহাদেব মন্দির। এখানে রয়েছে শিব, কৃষ্ণ ও রাধা এবং হনুমানের মন্দির। মন্দিরের বাগানটি ভারী সুন্দর, সেখানে চরে বেরায় ময়ূর। মন্দিরের শান্ত পরিবেশ উপভোগ করতে আপনার দ্রষ্টব্যের তালিকায় অবশ্যই রাখবেন এই সফেদ আখাড়াকে।

(৬) বান্দ্রা তথা বান্দারা – বাড়মের থেকে ১০ কিমি, অতীতের রাজস্থানি শহর – হাভেলি, ম্যানসন ও এখানকার রাস্তাঘাট সুদূর অতীতে নিয়ে যায়। এখানে আরও একটি দর্শনীয় স্থান হল ‘বাপ কা তলাও’।   

(৭) জুনা ফোর্ট ও মন্দির – বাহাড় রাও পারমারের রাজধানী ছিল জুনা, বাড়মের থেকে ২৫ কিমি। পাহাড়ে ঘেরা জুনা, অতীত ঐতিহ্য ও আভিজাত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে রয়েছে ছোটো একটি লেক, গড়ের ধ্বংসাবশেষ, জৈন মন্দির তথা বালার্ক সূর্য মন্দির।             

কিরাডুর মন্দির।

(৮) কিরাডুর মন্দির – বাড়মের ৩৮ কিমি। পশ্চিম সীমান্তের মুনাবাওয়ের রাস্তায় ৩২ কিমি গেলে হাতমা। সেখান থেকে ৫ কিমি ডানহাতি রাস্তায় গিয়ে বাঁ দিকের পথ পৌঁছে গেছে কিরাডু বা কেরাডুতে। এখানকার মূল মন্দিরটি হাজার বছরের পুরোনো সোমেশ্বর মন্দির – দ্বারমণ্ডপ, মহামণ্ডপ ও গর্ভগৃহ নিয়ে এই মন্দির। মন্দিরের গায়ে পাথরের খোদাই করা পুরাণ, মহাভারত, রামায়ণের নানা ঘটনা। শরশয্যায় ভীষ্ম চোখে পড়ে। এ ছাড়াও রয়েছে আরও তিন শিবমন্দির ও বিষ্ণুমন্দির, ১১-১২ শতকের। মারু-গুর্জর স্থাপত্যকলার নিদর্শন।

কী ভাবে যাবেন

সাধারণত রাজস্থান ভ্রমণের অঙ্গ হিসাবে ঘুরে নিতে পারেন বাড়মের।

(১) রেলপথে বাড়মের যেতে হলে দিল্লি বা জোধপুরে ট্রেন বদল করতে হবে।

দিল্লি থেকে বাড়মের যাওয়ার ট্রেন মাল্লানি এক্সপ্রেস। রোজ বিকেল ৫.৩৫ মিনিটে দিল্লি ছেড়ে বাড়মের পৌঁছোয় পরের দিন সকাল সাড়ে ৯টায়।

জোধপুর থেকে বাড়মের যাওয়ার একগুচ্ছ ট্রেন আছে। ট্রেন বিশেষে সময় লাগে সাড়ে তিন ঘণ্টা থেকে পৌনে পাঁচ ঘণ্টা।

আরও পড়ুন: ঘরে বসে মানসভ্রমণ: কেরলের শৈলশহর ভাগামন

কলকাতা থেকে জোধপুর যাওয়ার ট্রেন জোধপুর এক্সপ্রেস। রোজ হাওড়া থেকে ছাড়ে রাত্রি ১১.৪০ মিনিটে, জোধপুর পৌঁছোয় তৃতীয় দিন সকাল ৭টায়।

(২) সড়কপথে বাড়মেরের দূরত্ব জৈসলমের থেকে ১৫৭ কিমি, জোধপুর থেকে ১৯৭ কিমি, বাসে আসতে পারেন বা গাড়ি ভাড়া করেও আসতে পারেন। জয়পুর, উদয়পুর, বিকানেরের সঙ্গেও বাস যোগাযোগ আছে বাড়মেরের।

(৩) বিমানে জোধপুর পৌঁছে সেখান থেকে বাস বা গাড়ি ভাড়া করে চলে যাওয়া যায় বাড়মের।

সফেদ আখাড়ায় ময়ূর।

কোথায় থাকবেন

বাড়মেরে আগে রাজস্থান পর্যটনের একটি হোটেল ছিল। কিন্তু অব্যবস্থার ফলে উঠে যায়। তবে নানা মানের, নানা দামের প্রচুর বেসরকারি হোটেল আছে বাড়মেরে। নেট সার্চ করলেই খুঁজে পাওয়া যাবে।

কেনাকাটা

হস্তশিল্পের জন্য বিখ্যাত বাড়মের। শহরে প্রচুর হস্তশিল্পের দোকান আছে। সমস্ত দ্রব্যই এখানকার শিল্পীদের নিজের হাতে তৈরি। আছে সূচিশিল্পের জিনিসপত্র, হাতে বোনা উলের কার্পেট, কাঠ খোদাই করা শিল্পদ্রব্য, রঙে চোবানো কাপড় ইত্যাদি। বাড়মেরের হস্তশিল্প এখন পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় বস্তু। না কিনুন, চোখে অন্তত দেখে আসুন।

মনে রাখুন

ট্রেনের সময় সম্পর্কে বিশদ তথ্য জানার জন্য দেখুন erail.in ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।