Browsing Category:পশ্চিমবঙ্গ

now-you-can-do-online-booking-of-forest-safari-of-north-bengal

ভ্রমণঅনলাইন ডেস্ক: উত্তরবঙ্গ সফরে পর্যটকদের অন্যতম লক্ষ্য থাকে ডুয়ার্সের কোনো এক জঙ্গলে সাফারি করা। কিন্তু সে সাফারির বুকিং করতে গিয়ে কম ঝক্কি পোহাতে হয় না।

বুকিং-এর জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে শেষে দেখলেন টিকিট শেষ। তখন এক রাশ হতাশা।

পর্যটকদের সেই সমস্যা দূর করতেই এ বার উদ্যোগী হয়েছে রাজ্য বন দফতর। এ বার থেকে অনলাইনেই করে ফেলতে ফেলতে পারবেন সাফারি বুকিং।

কী ভাবে এই বুকিং করবেন?

  • প্রথমে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ফরেস্ট ডেভলপমেন্ট এজেন্সির ওয়েবসাইটে (www.wbsfda.org) লগইন করুন
  • এর পরে আপনার স্ক্রিনে ডান দিকে ‘বুক রাইড’ অপশনটা দেখুন। সেখানে ক্লিক করুন।
  • ওই অপশনে ক্লিক করলে আপনি আরও দুটি অপশন পাবেন, জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান এবং গরুমারা জাতীয় উদ্যান।
  • জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানে ক্লিক করলে আপনি চারটে অপশন পাবেন- চিলাপাতা গাড়ি সাফারি, কোদালবস্তি গাড়ি সাফারি, মাদারিহাট গাড়ি সাফারি এবং হলং হাতি সাফারি। আপনার পছন্দের সাফারিতে ক্লিক করে অনলাইনে সেই সাফারি বুক করে নিন।
  • গরুমারা জাতীয় উদ্যানে ক্লিক করলে অবশ্য একটাই জঙ্গল সাফারির অপশন আপনি পাবেন।

বন দফতরের আশা, অনলাইনের মাধ্যমে সাফারি বুকিং শুরু হওয়ায়, উত্তরবঙ্গে পর্যটকদের আনাগোনা আরও বাড়বে।

এই ওয়েবসাইট থেকে আপনি অনেক ইকো-ট্যুরিজম সেন্টারের বুকিং-ও করে ফেলতে পারবেন। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে ইকো-ট্যুরিজম সেন্টারগুলি। বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন ওই ওয়েবসাইটেই।

0 Comments
Share
a-trip-yo-subhasgram-and-other-places-related-to-netaji
jahir raihan
জাহির রায়হান

সাবমেরিন। সংজ্ঞা-সহ সাবমেরিনের ব্যাখ্যা বুঝতে বুঝতেই টের পেয়েছিলাম দেশনায়কের কলজের জোর। কতই বা বয়স তখন, মেরে কেটে বারো-তেরো, ষষ্ঠ শ্রেণির হাফপ্যান্ট-পরা ছাত্র। ক্লাসে দুলালবাবু বলে চলেন, “সাবমেরিন একটি জলযান, জলে ডুবে ডুবে যায়, ওপর থেকে কিছুই বোঝা যায় না।” সেই সাবমেরিন চেপে ইংরেজদের চোখে ধুলো দিয়ে দেশান্তরী হন সুভাষ, মাতৃভূমি ভারতবর্ষকে ব্রিটিশ কবল থেকে মুক্ত করতে। মিঠুন-অমিতাভকে সরিয়ে সেই দিনই আমার বল্গা মনের নায়ক হয়ে বসেন সুভাষচন্দ্র। তার পর একটা একটা করে নতুন শ্রেণিতে উর্ত্তীর্ণ হই, আর একটু একটু করে হৃদয়াকাশে উদ্ভাসিত হতে থাকেন সুভাষচন্দ্র বোস। তাঁর ব্যাপকতা এবং দেশপ্রেম ছাড়িয়ে যায় বাকিদের। এর মধ্যেই একদিন শুনলাম, একবার বেলডাঙা এসেছিলেন তিনি। ঘটনা জানামাত্রই গর্বিত হলাম অতীতের সেই আগমনকে স্মরণ করে। শহরের নেতাজি পার্ক ও নেতাজি তরুণতীর্থের যৌথ উদ্যোগে জানুয়ারি মাসের সপ্তাহব্যাপী নেতাজি স্মরণোৎসবের তাৎপর্য ধরা দিল নব রূপে।

আরও পড়ুন পর্যটনের প্রসারে উত্তরবঙ্গে একাধিক প্রকল্পের শিলান্যাস মুখ্যমন্ত্রীর

গোটা শীত জুড়েই বঙ্গের এ-দিক ও-দিক চরকিপাকের সিদ্ধান্ত নিয়েছি গরমের গুঁতো থাকাকালীনই। তাই মিলনদা কোদালিয়া যাওয়ার কথা বললে রাজি হলাম তৎক্ষণাৎ। ২০১৭’র শেষ দিনে যখন সবাই নতুন বছরকে আবাহনের প্রস্তুতিতে মগ্ন, আমি ছুটলাম সুভাষচন্দ্রের পিতৃদেব জানকীনাথের পৈতৃকভিটে দর্শনে। প্রথমে যাব কোদালিয়া, তার পর এলগিন রোডে নেতাজিভবন। সেইমতো কাউকে কিছু না বলে একা একাই বেরোলাম অমৃতপুত্রের সন্ধানে। ভাগীরথী এক্সপ্রেস দেরি করায় সুভাষগ্রাম যাওয়ার ট্রেন পেতে দেরি হল, তবে মধ্যবর্তী সময়টুকুর সদ্ব্যবহার হল ‘জনআহার’-এর চিকেন বিরিয়ানিতে। ৭৮ টাকায় বছরের শেষ লাঞ্চ। সেই ছাত্রাবস্থা থেকেই শিয়ালদহে যাতায়াত আমার। হাতে সময় বা ট্রেনের দেরি থাকলে স্টেশনের ধাপিতে বসে বসে নানা কিসিমের লোকজন ও তাদের কাণ্ডকারখানা নাগাড়ে খেয়াল করা আমার খুব প্রিয় টাইমপাস। একটা করে ট্রেন ঢোকে আর মিছিলের মতো লোক গলগল করে বেরিয়ে হারিয়ে যায় মহানগরীর পথে পথে। এবং আশ্চর্য, নিজেরটা ছাড়া বাকিরা কোথায় কী কাজে যায় তা আমি একেবারেই জানি না।

kodalia house
কোদালিয়ার বাড়ি, সংস্কারের আগে।

গড়িয়ায় বছর তিনেক ছিলাম আমি, তখন নিউ গড়িয়া স্টেশনটাই ছিল না, ছিল না মেট্রো রেলের বাহাদুরিও। বাঘাযতীন ছাড়ালেই তখনও তেপান্তরের মাঠঘাট চোখে পড়ত, অট্টালিকার বাড়বাড়ন্ত ছিল না। আর একটা ব্যাপারে অবাক হতাম, গড়িয়ার দুই দিকের সিগন্যালই সর্বদা হলুদ হয়েই থাকত, ট্রেন এসেই যেত, এসেই যেত। এখনও আমার বিশ্বাস, সোনারপুর থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত ট্রেন ধরতে কেউই সময় দেখে না, জানে স্টেশনে গেলেই কোনো না কোনো লোকাল পেয়ে যাব ঠিক। ডায়মন্ড হারবার লোকাল গড়িয়া ঢুকতেই এ-দিক সে-দিক উঁকিঝুকি মারলাম, কিছুই ঠাহর হল না। মিলনদা বলে দিয়েছিল, সোনারপুরের পরই সুভাষগ্রাম। সেইমতো গুতোঁগুঁতি বাঁচিয়ে নিলাম নামার প্রস্তুতি। এত ভিড়ের মধ্যেও পল্টু ব্যাটার অস্থিরতা টের পাচ্ছি, সে বুঝি সেই সন্ধিক্ষণের নাগাল পেয়ে গিয়েছে, যার কারণে এখানে আসা। রাজপুর-সোনারপুর পৌরসভার অন্তর্গত সুভাষগ্রাম। রিকশায় উঠে দেখি, চালক পা তুলে হ্যান্ডেল পাকড়ে বসে রয়েছে আর রিকশা চলছে আপন গতিতে। সাধারণ রিকশার এই অসাধারণ আচরণ এর আগে দেখি নাই কখনও। হাঁটতেই চাইছিলাম, কিন্তু এক কাকাবাবুর খপ্পরে পড়েই এই রিকশাবিলাস, উনি লম্বা করে জানালেন চল্লিশ মিনিট হাঁটলে তবেই বোসবাড়ি, অগত্যা!

আরও পড়ুন চণ্ডীদাসের প্রেম ও নানুর

নেতাজি সুভাষের সম্মানেই যে চাংড়িপোতা হয়েছে সুভাষগ্রাম, সে কথা না জানালেও চলে। রিকশা চড়ে রবিবারের সুভাষগ্রামের মহল্লা নজরে রাখতে রাখতেই এগিয়ে চলি হরনাথ বসুর বাড়ির দিকে, যাঁর নাতিকে আজও খুঁজে ফেরে বাঙালি, বিশ্বাস করে দেশের এই দুর্দশায় তিনি নিশ্চিত ভাবেই ফিরে আসবেন, মৃ্ত্যু-বিজ্ঞান হেরে যায় বাঙালি আবেগের কাছে, বারবার। তরুণ সংঘের মাঠ পার করে বাবুদাকে পাওয়া গেল। সৌম্যদর্শন ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দিলেন সেই ভিটেটিকে যার মাটি সৃষ্টি করেছিল এক আপসহীন অগ্নিপুত্রের যিনি অত্যাচারীর চোখে চোখ রেখে কথা বলতে জানতেন। হলুদ রঙা দোতলা বাড়ি, বড়ো বারান্দা, বেশ কিছু ছাদের অংশ ভেঙে পড়েছে, ঘরগুলি তালাবন্ধ। খোলা জানলার ফাঁক দিয়ে কিছু আসবাবপত্রও চোখে পড়ে। বাড়ির সামনেও অনেকটা ফাঁকা জায়গা। ক্ষয়ে যাওয়া ইটগুলিকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়, কেমন ছিল বোসেদের ঘরকন্না? দাদুর বাড়ির ঘরময়, বারান্দা জুড়ে, বাগানে, হামাগুড়ি, দৌড়োদৌড়ি করেছে কি ছোট্ট সুভাষ? কটকে পড়াশোনার ফাঁকে, ছুটিছাটাতে বা বার্ষিক পরীক্ষার শেষে কখনও কি এসেছে দাদু-ঠাকুমার কাছে? কেমনধারা ছিল তার আবদার? কী ভাবে সে পেল এত সাহস? এত শৌর্য? এত তাপ? নিরুত্তর চুনসুরকি ধুলো হয়ে ঝরে পড়ে অবিরত, আমি বসে পড়ি বারান্দায়, ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করি সেই কালকে যা এখন মহাকালের কবলে।

netaji bhawan
এলগিন রোডে নেতাজিভবন।

শঙ্কর ঘোষ এ বাড়ির বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক। বংশপরম্পরায় তাঁরা এই কাজ করে আসছেন। তিনিই জানালেন, রাজ্য সরকারের পূর্ত দফতর বাড়িটি অধিগ্রহণ করেছে, সংস্কার ও সংরক্ষণের কাজও শুরু হবে শীঘ্র। এ তথ্যে নিশ্চিন্ত হয়ে বেরিয়ে এলাম। (এই দু’ বছরে সেই ভবনের সংস্কার হয়েছে।) বাবুদা তখনও ওখানে বসেছিলেন, বললেন এত দূর থেকে এসেছেন বোসেদের পারিবারিক নারায়ণ মন্দির দেখে যান। তাঁর কথামতো ঠাকুরদালান দেখে নিলাম, দুর্গাপুজোও হয় সেখানে, বোস পরিবারের বর্তমান সন্তানসন্ততিরা নাকি এখনও একত্রিত হন পুজোর ক’টা দিন। নির্জন দালানচত্বরটি আমার বেশ লাগল, অনেকক্ষণ বসে রইলাম চুপচাপ, একা একাই। কান পেতে শোনার চেষ্টা করলাম হরনাথ বোস, জানকীনাথ বোস ও তাঁদের পরিবারবর্গের পুজোকালীন হইচই, হাঁকডাক, কলরব যা কালের অভিঘাতে হয়েছে নিরুদ্দেশ। মন্দিরের গেটটিতে লিপিবদ্ধ রয়েছে হরনাথ লজ, পাশেই কোদালিয়া হরনাথ বীনাপাণি লাইব্রেরি, অগ্রদূত এবং কোদালিয়া ডাকঘর যার সামনে প্রশস্ত খেলার মাঠ। সম্পন্ন গৃহস্থ হরনাথ বোসই ছিলেন এ সবের মালিক। পাড়াটিও বেশ, ছিমছাম, কোলাহলমুক্ত, শরৎচন্দ্রের পল্লিসমাজের কথা মনে পড়ায়।

কবি সুভাষ থেকে নেতাজি ভবন মেট্রো স্টেশন। পুরো পথটিতেই কোদালিয়া আচ্ছন্ন করে রাখল আমায়। তবে শুধু নেতাজির দাদুর বাড়ি নয়, আরও এক বিখ্যাত বাঙালি সলিল চৌধুরীর মাতুতালয়ও নাকি কোদালিয়া। এ দিকে ট্রেনে উঠেই এক সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছি, যাব ‘নেতাজি ভবন’, টিকিট করেছি ‘নেতাজি’-এর। এই লাইনে প্রথম যাত্রা আমার, তাই ‘নেতাজি’ আর ‘নেতাজি ভবন’ গিয়েছে গুলিয়ে। ভাড়ায় পুরো পাঁচ টাকার ব্যবধান, বৈদ্যুতিক দরজা খুললে হয়! যা ভেবেছি তা-ই, যেখানে ভূতের ভয় সেখানেই সন্ধে হয়, দরজার কাছে নীল পোশাকের নিরাপত্তারক্ষী আর প্লাস্টিকের গোল চাকতিটিকে অবলীলায় অস্বীকার করল মেশিন বাবাজি, পর পর দু’ বার, চিচিং ফাঁকও হল না। ভয়ানক অপ্রস্তুত পরিস্থিতি, এমন সময় দেখা দিলেন স্বয়ং নারায়ণ, আমার পিছনের ভদ্রলোকটি চাকতিটি কুড়িয়ে মেশিনের ওপর রাখলেন, হাতে থাকা স্মার্ট কার্ডটি চেপে ধরতেই পাঁচ টাকার সীমান্ত খুলে গেল, উনি শুধু বললেন, চলুন চলুন। আপনাদের অনেক আগেই জানিয়েছি ভগবান আমার বখাটেপনা ভালোওবাসেন, প্রশ্রয়ও দেন, আজ আবার প্রমাণ হল।

নতুন নাম লালা লাজপৎ রায় সরণি হলেও আমার ভোট এলগিন রোডের তরে, কেননা এলগিন রোড উচ্চারিত হলেই সাথে সাথে সেই ইতিহাসও মনে এসে ভিড় করে যা নিয়ে বাঙালির গর্বের শেষ নেই। নেতাজিভবনের বিশালতা ও শৈলীতে গা ছম ছম শুরু হবে প্রবেশমাত্রই। প্রথমেই চোখ পড়বে সেই গাড়িটির দিকে যা দেশের স্বাধীনতায় দিকনির্ণয়ী ভূমিকা নিয়েছিল। ভাইপো শিশিরচন্দ্র বসু এই অডি করে কাকা সুভাষ বোসকে পৌঁছে দিয়েছিলেন গোমো। যা ইতিহাসের পাশাপাশি বাঙালিজীবনেও মহানিস্ক্রমণ বলে খ্যাত। এ ইতিহাস যদি আপনার জানা থাকে, তা হলে গাড়িটির সামনে গিয়ে দাঁড়ান, ষ্টিয়ারিং হাতে শিশিরচন্দ্র আর পেছনের সিটে হেলান দিয়ে বসে রয়েছেন স্বয়ং নেতাজি সুভাষ – শুধু এই দৃশ্যটুকু কল্পনা করতে পারলেই মেরুদণ্ডের বৈদ্যুতিক শিরশরানি টের পাবেন নিশ্চিত। এ এমন একটা ঘটনা যা ছাপোষা, সাধারণ, ভীরু বাঙালিকেও আস্পর্ধার পাঠ দেয়, তাকেও বিশ্বাস করতে শেখায় হ্যাঁ বাঙালিও পারে।

the car driven by sisir bose
এই গাড়িতে চাপিয়ে নেতাজিকে গোমো পৌঁছে দিয়েছিলেন ভাইপো শিশির।

নেতাজি রিসার্চ ব্যুরোর যত্নে জানকীনাথ, শরৎচন্দ্র ও সুভাষচন্দ্রের ব্যবহৃত ঘর, বিছানা-সহ আসবাবপত্র দেখানোর আন্তরিক ব্যবস্থাপনা আপনাকে মুগ্ধ করবে। এমন কিছু অনন্য অনুভূতি আপনার মনের দখল নেবে যার নাগাল কখনোই কোথাও বেড়াতে বেরিয়েই আপনি পাননি। মার্বেলপাথরে নির্মিত একজোড়া থালা ও বাটি যা দিয়ে এ বাড়িতে সুভাষের শেষ ডিনার সম্পন্ন হয়েছিল তা দেখে আপনার চোখ ভিজে যাওয়া স্বাভাবিক, যদি আপনি ভাবতে পারেন, এই থালায় খেয়েই ঘরের ছেলেটি দেশান্তরী হয়েছিল। জান্তে অজান্তে সুভাষকে তো আমরা ঘরের ছেলে বলেই মনে করি, তাই না? তাঁর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সংরক্ষিত পদচিহ্নে পা দেবেন না যেন, পারলে ওই মহামানবের পদচিহ্নেই প্রণাম করুন, পুণ্যি হবে। কংগ্রেস সভাপতি থাকাকালীন যে ঘরে বসে কাজকর্ম এবং আগত লোকজনের সঙ্গে উনি দেখা করতেন, তার দেওয়াল ছিল ত্রিবর্ণরঞ্জিত, আজও সে ভাবে রাখা রয়েছে। তিন তলায় সাজিয়ে রাখা তাঁর নিজ হস্তে লেখা চিঠিপত্র, বা জামাকাপড়ের সামনে দাঁড়ালেই আপনার লোম খাড়া হয়ে যাবে অজ্ঞাত মগ্নতায়।

একটা মানুষের কর্মকাণ্ডের ব্যাপ্তি কতখানি হলে তাঁকে ‘নেতাজি’ বলে মেনে নেন স্বয়ং রবিঠাকুর, একটিবার ভেবে দেখুন। কতটা আবেদন থাকলে দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত রাষ্ট্রনায়েকরা ছুটে আসেন তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে আজও, এখনও, সেটাও ভাবার বিষয়। আজ যখন সর্বত্রই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা তখন তাঁর উদাত্ত আহ্বান, তাঁর বলিষ্ঠ প্রত্যয় ভীষণই জরুরি ছিল। নেতাজিভবনের আনাচেকানাচে ইতস্তত পদচারণা করলে শ্রদ্ধায় আপন হতেই মাথা নত হয়ে আসে। মিউজিয়াম বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসি বাড়ি থেকে, রাস্তা হতে লাগাতার ছবি তুলতে থাকি, তবুও যেন আশ মেটে না। মহানিষ্ক্রমণের ৭৫ বছর পেরিয়ে গিয়েছে গত ২০১৬ সালে, তবুও যেন সব জীবন্ত। সব দেখেও মনের খিদে মেটে না, কিন্তু যেতে তো হবে। মেট্রো ধরে মহাত্মা গান্ধী রোড স্টেশন, ওপরে উঠলেই মহাজাতি সদন। যার নামফলকে লেখা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর পরিকল্পিত মহাজাতি সদনের শিলান্যাস করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পরবর্তীতে যার দ্বরোদঘটন হয় ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের হাত থরে। এটাও শেষ নয়, শিয়ালদহ যাব বলে মহাত্মা গান্ধী রোড-চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ ক্রসিংয়ে গিয়ে দেখি আরও একটা স্মৃতিফলক। সেখানেও জ্বলজ্বল করছে সুভাষচন্দ্রের নাম । সে ফলক জানান দিচ্ছে, Through this historical place Netaji Subhas Chandra Bose continued his ambitious and never ending journey to free our motherland-INDIA । সত্তর বছরেরও বেশি হয়ে গেল মাতৃভূমি স্বাধীন হয়েছে, নেতাজির পথচলা শেষ হয়নি, সুভাষ ঘরে ফেরে নাই, আজও।

ছবি: পিন্টু মণ্ডল ও লেখক

0 Comments
Share
various-tourism-projects-foundation-stone-laid-by-chief-minister

ভ্রমণঅনলাইন ডেস্ক: পর্যটনের প্রসারে উত্তরবঙ্গে একাধিক প্রকল্পের শিলান্যাস করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার দার্জিলিং ম্যালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিন পালনের মঞ্চেই এই প্রকল্পগুলির শিলান্যাস হয়। 

যে যে পর্যটন প্রকল্পের শিলান্যাস হয়েছে, সে গুলি হল-

  • ডেলো টুরিস্ট রিসর্ট, কালিম্পং
  • ঝালং টুরিস্ট রিসর্ট, কালিম্পং
  • চালসা টুরিস্ট রিসর্ট, জলপাইগুড়ি
  • ক্যাম্পসাইট, ভোরের আলো, গজোলডোবা
  • টংলু ইকো কটেজ, সান্দাকফু সার্কিট, দার্জিলিং
  • বোদাগঞ্জে বিভিন্ন পর্যটন সুলভ ব্যবস্থা, জলপাইগুড়ি। 

আরও পড়ুন গজলডোবায় চালু হল ‘ভোরের আলো’, দেখে নিন কিছু ছবি

এ দিকে পাহাড়ে পর্যটনের প্রসারে আরও অনেক কিছু প্রকল্পের কাজ চলছে। দার্জিলিং-এর কাছে টাইগার হিলে কটেজের কাজ কিছু দিনের মধ্যেই শেষ হবে। পাশাপাশি কালিম্পং-এ মর্গ্যান হাউস তুরিস্ট লজ সংস্কারের কাজও শেষ হয়েছে। 

মুখ্যমন্ত্রীর আশা, এর পর পর্যটকের কাছে আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে দার্জিলিং পাহাড়। 

0 Comments
Share
a-visit-to-nanur-of-poet-chandidas
writwik das
ঋত্বিক দাস

বাংলা সাহিত্যে একাধিক চণ্ডীদাসের সন্ধান পাওয়া যায়। এই একাধিক চণ্ডীদাস নিয়ে আধুনিক পণ্ডিতরা দ্বিধাবিভক্ত। কেউ কেউ বলেন এক চণ্ডীদাস বৈষ্ণবপদাবলির রচয়িতা। আর অন্য চণ্ডীদাস শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রচয়িতা। এঁদের এক জন বাঁকুড়ার ছাতনার অধিবাসী ছিলেন, আরেক জন বীরভূমের নানুরের। অনেকে আবার বলেন, এই দুই চণ্ডীদাসই এক। বিতর্ক থাক, চণ্ডীদাস সম্পর্কে যে কাহিনি সব চেয়ে বেশি প্রচারিত, সেই কাহিনিই আজ শোনাই, সেই সঙ্গে তাঁর নানুরের কিছু কথা৷

১৩৭০ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন নানোর এবং অধুনা নানুরে চণ্ডীদাসের জন্ম৷ তাঁদের পদবি ছিল ‘বাড়ুজ্জে’ বা ‘বন্দোপাধ্যায়’৷ এই জন্য তাঁকে বড়ু চণ্ডীদাস বলেও ডাকা হয়৷ তাঁর পরিবার খুব দরিদ্র ছিল৷ দারিদ্রের ভারে এক সময় তাঁরা নানুরের ভিটেমাটি ছেড়ে দিয়ে অধুনা বাঁকুড়া জেলার ছাতনা গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন এবং সেখানে পণ্ডিতগিরি করে কিছু অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে দিন অতিবাহিত করতে লাগলেন৷ তাঁর প্রথম স্ত্রীর নাম ছিল পদ্মজা৷ অভাবের জ্বালায় একদিন পদ্মজা তাঁকে ছেড়ে চলে যান কীর্নাহারের বাপের বাড়িতে৷

basulidevi temple
বাসুলীদেবীর মন্দির।

নিঃসঙ্গ অবস্থায় চণ্ডীদাসও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন৷ ঘুরে বেড়িয়ে নিজে কবিতা লিখে সেগুলো বিদ্বজনদের শুনিয়ে বেড়াতে থাকেন৷ সারা দিনে যেটুকু হাতে আসে সেইটুকু দিয়ে রাতেরবেলায় একটি মাটির হাঁড়িতে অন্ন ফুটিয়ে আধাপেটা খেয়ে দিন কাটাতে থাকলেন৷ এ ভাবে ঘুরতে ঘুরতে তিনি একদিন চললেন রাজদরবারের পথে৷ রাজা তখন সভায় বসে মন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনায় ব্যাস্ত৷ তাঁর কানে এল সুন্দর কণ্ঠে ঝুমুর গানের আওয়াজ৷ রাজা আলোচনায় আর মন লাগাতে পারলেন না৷ কোথা দিয়ে আসছে এত সুরেলা কণ্ঠ, এত সুন্দর ঝুমুরগান কেই-বা গাইছে৷ ভাবতে ভাবতে এক ভিখারিকে তাঁর দরবারের দিকে এগিয়ে আসতে দেখলেন৷ রাজদরবার পাহারায় নিয়োজিত সৈন্যরা সেই ভিখারীকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দিলে স্বয়ং রাজা সৈন্যদের থামিয়ে ভিখারি চণ্ডীদাসকে ভেতরে আসার অনুমতি দিলেন এবং সেই সঙ্গে আবদার করলেন, আরও ঝুমুরগান শুনিয়ে তাঁর মন তৃপ্ত করতে হবে৷ এমন অবস্থায় চণ্ডীদাস ঝোলা থেকে তাঁর লেখা পদ্য ও ঝুমুরগানের একখানি সংকলন বার করে বেশ ক’টি গান রাজামশাইকে শোনালেন৷ রাজামশাই যারপরনাই তৃপ্ত চণ্ডীদাসের গানে৷ তাঁর অবস্থার খবর নিয়ে পুরস্কারস্বরূপ রাজা তাঁকে বাসুলীদেবীর মন্দিরের পুরোহিতপদে নিযুক্ত করলেন এবং মন্দিরসংলগ্ন একটি ঘরে থাকার অধিকার দিলেন৷ চণ্ডীদাস জীবনধারণের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণর পদ রচনায় ব্রতী হলেন এবং বাসুলীদেবীর পূজা করতে লাগলেন৷

দেবী বাসুলী বীণারঞ্জিত সরস্বতীদেবী, যদিও তাঁকে দুর্গাদেবী মনে করে শাক্ত রূপে পূজা করা হয়৷ এই দেবীর পূজা করতে করতে চণ্ডীদাস দেবীর ভক্তিপ্রেমে বাঁধা পড়লেন৷ বাসুলীদেবীর উপাসনাই তাঁর জীবনের মুল অঙ্গ হয়ে উঠল৷ দেবীর পূজা করার পাশাপাশি শ্রীকৃষ্ণের ভক্তিরস মাঝেমধ্যে সৃষ্টি করে মুখে আওড়াতে লাগলেন, সঙ্গে সঙ্গে সেই পদগুলি লিখে ফেলতে থাকলেন৷

এমন চলতে চলতে একদিন তাঁর মনে এক দোটানার উদ্ভব হল – যে অঙ্গ দিয়ে শাক্তের উপাসনা করে চলেছেন সেই অঙ্গ দিয়ে কী করে শ্রীকৃষ্ণের পদ রচনা করবেন৷ দিশেহারা তিনি৷ এমন অবস্থায় এক অমাবস্যার রাতে বাসুলীদেবী তাঁকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে পদ রচনার আদেশ দিলেন৷ দেবীর আদেশ পেয়ে চণ্ডীদাস প্রদীপের টিমটিমে আলোয় বসে মহানন্দে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের পদ রচনা করতে লাগলেন৷

teracotta work in nanur temples.
নানুরে মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার কাজ।

এমন ভাবে দিন কাটতে কাটতে চণ্ডীদাসের জীবনে আবার পরিবর্তন এল৷ বাসুলীদেবীর মন্দিরে একদিন আগমণ ঘটল এক পরমা সুন্দরী যুবতীর৷ অপূর্ব মুখশ্রী তাঁর৷ তিনি রজকিনি রামী৷ পিতৃমাতৃহারা রামী মন্দিরে দেবদাসীর কাজ করতে এলেন৷ মন্দিরের কাজ গুছিয়ে করেন রামী৷ ঠাকুরের কাপড় ধোয়া থেকে ঝাঁট দেওয়া, সবেতেই নিখুঁত৷ একদিন ভোগ বিতরণের সময় রামীর সঙ্গে চণ্ডীদাসের মুখোমুখি সাক্ষাৎ ঘটে৷ প্রথম দর্শনেই রামীর রূপে মুগ্ধ হয়ে যান চণ্ডীদাস, তাঁর মনের প্রেমসাগর যেন উত্তাল হয়ে ওঠে৷

স্ত্রী পদ্মজাকে হারিয়ে একাকী জীবন৷ পদ্মজাকে সে ভাবে সুখ দিতে পারেননি৷ অনেক দিন নারীর শরীরসুখ থেকেও বঞ্চিত৷ এমন অবস্থায় রামীর মুখ চণ্ডীদাসকে মাতোয়ারা করে তোলে৷ আহা্ কী সৌন্দর্য্য রামীর! হিরের দ্যুতির মতো মুখের ঔজ্জ্বল্য৷ বিদ্যুতের ঝলকানির মতো বাহুযুগল, তন্বী শরীর – সব মিলিয়ে চণ্ডীদাসের দু’ নয়নে শুধুই রামীর উপস্থিতি৷ কখনও বা বাসুলীদেবীর সঙ্গে রামীকে গুলিয়ে ফেলছেন আবার কখনও শ্রীরাধিকার সঙ্গে৷ “ইস্ একবার এসে যদি রামী তাঁর কাছে বসে বুকে তাঁর সুন্দর হাতখানি ছোঁয়াতেন”, “যদি কখনও রামীর শরীর স্পর্শ করার মতো সুখ কপালে জুটত”৷ রাতের একাকী বিছানায় শুধুই এমন ভাবনা তাঁর৷

“ব্রহ্মাণ্ড ব্যাপিয়া আছয়ে যে জন, কেহ না জানয়ে তারে।
প্রেমের আরতি যে জন জানয়ে সেই সে চিনিতে পারে।।”

basulidevi
বাসুলীদেবী।

এ ভাবে এক দিন উঠোন নিকোনোর সময় সুপুরুষ রামীর পথ আগলে দাঁড়ান চণ্ডীদাস এবং রামীকে প্রেম নিবেদন করেন৷ রামী কিঞ্চিৎ লজ্জিত। চণ্ডীদাস তাঁকে আলিঙ্গন করতে অগ্রসর হলেন৷ রামী তখন চণ্ডীদাসকে মনেমনে গ্রহণ করে প্রস্তাব দিলেন – ঠাকুর, তুমি তোমার সব কাম-বাসনা, সর্বশরীর এবং পুরো সম্মতিতে আমাকে গ্রহণ করো, তা হলেই আমি তোমার হতে পারব৷

চণ্ডীদাস এ বার খুশিতে পাগলপারা হয়ে বললেন, আজ থেকে আমার শরীর, এই বাসুলীদেবীর মন্দিরের দায়িত্ব সব তোমার৷ তুমি শুধু আমার৷ তুমি এই একাকী উত্তপ্ত মন ও শরীরকে শান্ত করো৷ চণ্ডীদাসের প্রেম গ্রহণ করলেন রামী৷ সঙ্গে ভয় পেলেন, যদি পাড়ার লোক তাঁদের প্রেমে বাধা দেয়৷ রামী বললেন, “না ঠাকুর, আমাকে ছাড়ো এতে তোমার বিপদ”৷ “আসুক বিপদ, শুধু তুমি আমাকে ভালোবাসো আমি সব সময় তোমার”- চণ্ডীদাসের জবাব৷ “তবে তা-ই হোক, আজ থেকে আর কোনো লোকলজ্জাকে ভয় নয়” – স্পষ্ট উক্তি রামীর৷

“মরম না জানে, মরম বাথানে, এমন আছয়ে যারা।
কাজ নাই সখি, তাদের কথায়, বাহিরে রহুন তারা।
আমার বাহির দুয়ারে কপাট লেগেছে – ভিতর দুয়ার খোলা।”

প্রেমের টানে পদাবলি রচনায় যাতে বাধার সৃষ্টি না হয় সে ব্যাপারে সংযত চণ্ডীদাস৷ রামী, বাসুলীদেবী ও কৃষ্ণের পদ – এই তিনটি বিষয় আবর্তিত হতে লাগল চণ্ডীদাসের জীবন৷

বাসুলীদেবীর প্রতি ভক্তি ও রামীর প্রতি প্রেমসুখ, দুয়ে মিলে পরমসুখে এ বার জোর কদমে শ্রীকৃষ্ণ পদাবলি লিখতে লাগলেন চণ্ডীদাস৷ কখনও ভাবের ঘোরে নিজেদের প্রেমকাহিনি স্থান পেল পদাবলির কাব্যে৷ এ ভাবে একদিন সৃষ্টি হল বাংলার প্রথম সাহিত্য শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের৷

আজ যেখানে মাটির ঢিবি অতীতে সেখানে সাঁঝের বেলায় চণ্ডীদাস  ও রামী কীর্তনের আসর বসাতেন যাতে গ্রামের মানুষ তাদের দু’জনের সম্পর্ককে গুরুশিষ্যার মতো করেই দেখেন৷ তাঁদের কীর্তন শুনতে জড়ো হতেন গ্রামের প্রায় সকলেই৷

চণ্ডীদাস ও রামীর মৃত্যু নিয়ে প্রচলিত কাহিনির কথায় আসি। সেই সময় বাংলার পাঠান সুলতান কিরগিজ খাঁ জোর করে বিয়ে করলেন এক হিন্দু কন্যাকে৷ সেই সুলতানের পত্নীও প্রায়ই আসতেন চণ্ডীদাসের কীর্তন শুনতে৷ ধীরে ধীরে সুলতানের সেই স্ত্রীও চণ্ডীদাসের প্রেমে পড়লেন৷ সুলতান তাঁর স্ত্রীর কাছে সব ব্যাপার জানতে চাইলেন৷ চণ্ডীদাসের প্রেমে পড়ার কথা সুলতানের স্ত্রী নিজমুখে স্বীকার করে নিলে কিরগিজ এক সন্ধেবেলা নিজ স্ত্রীকে বাসগৃহে আটকে রেখে চণ্ডীদাসের কীর্তনের আসরে আচমকা গোলাবর্ষণ করেন৷ ঘটনাস্থলেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যান চণ্ডীদাস, রামী-সহ বেশ ক’জন গ্রামবাসী৷ ধ্বংস হয় বাসুলীদেবীর মন্দির৷

that mound in nanur
সেই ঢিবি।

তবে চণ্ডীদাসের মৃত্যু নিয়ে আরেকটি মত প্রচলিত৷ চণ্ডীদাস ও রামির প্রেমকাহিনি গ্রামবাসীরা জানতে পেরে রেগে ফুঁসে ওঠে এক রাতে দু’জনকেই বেধড়ক পিটিয়ে মেরে ফেলে৷ পরে তাঁদের দুজনের মৃতদেহের ওপর মাটি জড়ো করে ঢিবি বানিয়ে দেয়৷

এই সব কাহিনি কতটা বিশ্বাসযোগ্য, সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। বিশেষ করে, চণ্ডীদাসের সময় গোলা, বিশ্বাস করা যায় না।

১৭-১৮ শতক নাগাদ এই অঞ্চলের তিলি সম্প্রদায়ের মানুষ মাটি খুঁড়ে বাসুলীদেবীর মূর্তি পুনরুদ্ধার করেন এবং মাটির ঢিবির পাশেই মন্দিরগুলি নির্মাণ করেন৷ পরবর্তীকালে ১৯৪৫ সাল নাগাদ সরকারি ভাবে খনন চালিয়ে অতীত পুনরুদ্ধার করা হয়৷ বর্তমানে বাসুলীদেবীর মন্দির-সহ আরও ১৪টি শিবমন্দির রয়েছে মন্দিরচত্বরে৷ সব ক’টাই চারচালাবিশিষ্ট৷ এর মধ্যে দু’টি শিবমন্দিরে টেরাকোটার সুন্দর কাজ লক্ষ করা যায়৷ মন্দিরদু’টির দেওয়ালে টেরাকোটার কাজে রাধাকৃষ্ণের লীলাকেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে৷

এ ছাড়া মন্দিরচত্বরের দু’ পাশে চারটি করে শিবমন্দিরে পঙ্খের অতি সুন্দর কারুকাজ দৃশ্যমান৷ বাকি শিবমন্দিরগুলি সাধারণ ইটে তৈরি এবং চারচালা চূড়াবিশিষ্ট৷

narayan mandir,nanur
নারায়ণ মন্দির।

বাসুলীদেবীর মন্দিরের ডান দিকে চারচালার সমতল ছাদবিশিষ্ট মন্দিরটিতে নারায়ণের পূজা হয়৷ আর সামনের ঘরটিতে বিভিন্ন মৃন্ময়ী দেবদেবীর পূজা হয়৷

বাসুলিদেবীর মন্দির সমতল চারচালাবিশিষ্ট, ইটের তৈরি, মন্দিরের মাথায় একটি চূড়া৷ মন্দিরের গর্ভগৃহে চণ্ডীদাস পূজিত দেবীমূর্তি৷ কালো কষ্টিপাথরের দেবীমূর্তি বীণারঞ্জিত হলেও মুলত শাক্তমতে তাঁর পূজা হয়৷ আশ্বিন মাসে শারদোৎসবের সময় পাঁচ দিন ধরে দেবীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়৷ সেই সময় মোষবলিও হয়৷

এই মন্দিরচত্বর থেকে সামান্য দূরে থানার পাশে যে পুকুরটি আছে সেখানেই রামী কাপড় কাচতে যেতেন৷ এখনও পুকুরধারে রক্ষাকালী মন্দিরের এক দিকে রামীর কাপড় কাচার পাটাটি সংরক্ষিত আছে৷

washing stone of Rami
রামীর কাপড় কাচার পাটা।

নানুরে বাসস্ট্যান্ডের মোড়ে রয়েছে চণ্ডীদাস ও রামীর বড়ো মূর্তি৷ এ ছাড়া নানুরের কাঁথার কাজের খ্যাতি উল্লেখযোগ্য৷ নানুর সফরে সেখানকার মিষ্টির স্বাদ নিতে ভুলবেন না৷

কী ভাবে যাবেন

রেলপথে হাওড়া/শিয়ালদা-রামপুরহাট লাইনে বোলপুর-শান্তিনিকেতন পৌছে সেখান থেকে বাসে বা গাড়ি ভাড়া করে যেতে পারেন নানুর, মাত্র ২১ কিলোমিটা৷ বোলপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে মুহুর্মুহু বাস যাচ্ছে নানুর গ্রাম হয়ে৷ কলকাতা থেকে সড়কপথ দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বর্ধমান, সেখান থেকে মঙ্গলকোট-নতুনহাট হয়ে নানুর।

কোথায় থাকবেন

নানুরে থাকার তেমন জায়গা নেই৷ শান্তিনিকেতন বেড়াতে গিয়ে ঘুরে নিন নানুর। শান্তিনিকেতনে নানা বাজেটের হোটেল আছে। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের রয়েছে শান্তিনিকেতন ট্যুরিস্ট লজ ও রাঙাবিতান ট্যুরিস্ট কমপ্লেক্স। দু’টোরই অনলাইন বুকিং www.wbtdcl.com। বেসরকারি হোটেলের সন্ধান পাওয়া যাবে goibibo, makemytrip, trivago, booking.com, tripadvisor, yatra.com, cleartrip প্রভৃতি ওয়েবসাইট থেকে।

ছবি: লেখক

 

 

 

 

 

 

0 Comments
Share
mamata-makes-big-announcements-on-plassey-mayapur-and-nabadwip

নদিয়া: পলাশিতে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং নবদ্বীপ, মায়াপুরকে হেরিটেজ সিটি হিসেবে ঘোষণা করা এখন রাজ্য সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই ব্যাপারে কাজ কতটা এগিয়েছে, নদিয়া জেলা সফরে এসেছে জেলাশাসক সুমিত গুপ্তের কাছে জানতে চাইলেন তিনি।

তবে জেলাশাসক জানিয়ে দিয়েছেন জমির কোনো সমস্যা নেই। এর পরেই মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ, যত দ্রুত সম্ভব এই কাজ শেষ করতে হবে।

উল্লেখ্য, পলাশির যুদ্ধকে স্মরণ করে সেখানে একটি পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে। সেই কাজ কিছুটা এগিয়ে গিয়েছে। অন্য দিকে গৌরাঙ্গের নবদ্বীপ এবং মায়াপুরে দেশবিদেশ থেকে প্রচুর পর্যটক আসেন। সে কারণেই হেরিটেজ সিটি হিসেবে গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

অন্য দিকে নদিয়া জেলার খেজুর গুড়কে কেন্দ্র করেও কিছু করা যায় কি না সেই দিকটাও দেখার নির্দেশ দিয়েছেন মমতা। গুড়কে প্যাকেজিং করে বাইরে বিক্রি করার ব্যাপারটিও কেন্দ্রকে দেখতে বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। জেলার সমস্ত উন্নয়নের কাজ যাতে সঠিক ভাবে হয় এবং সেই সব কাজে সব স্তরের নেতা–কর্মী, এমনকি জেলা পরিষদের নির্বাচিত সদ্যস্যরা যুক্ত হতে পারেন, সেই দিকটাও দেখার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

0 Comments
Share
see-the-pics-of-snow-covered-sandakphu

ভ্রমণঅনলাইন ডেস্ক: ফেটাইয়ের প্রভাবে সান্দাকফু-ফালুট অঞ্চলে তুষারপাত হতে পারে তেমন পূর্বাভাস ছিলই, কিন্তু সেটা যে এতটা বেশি হবে সে আন্দাজ করা যায়নি। সোমবার রাত থেকেই বরফ পড়তে শুরু করে সান্দাকফু-ফালুটের একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। সাধারণ এই অঞ্চলে জানুয়ারির শেষ থেকে মার্চ পর্যন্তই বরফের দেখা মেলে, কিন্তু সব কিছুই আগাম চলছে। বড়োদিনের এক সপ্তাহ আগে শেষ বার এই অঞ্চল কবে বরফ দেখেছিল, তা অনেকেই মনে করতে পারছেন না।

যাইহোক, আবহাওয়া পরিষ্কার হতে শুরু করেছে বুধবার সকাল থেকে। উঠেছে রোদ। সেই সঙ্গে আরও মায়াবী হয়ে উঠেছে সান্দাকফু। তুষারে ঢাকা সান্দাকফুর এই ছবিগুলো দেখুন। এই ছবি আপনাকে মোহিত করবেই।

তখন প্রবল তুষারপাত চলছে।
বরফ পড়ছে অবিরাম

 

মেঘ সরিয়ে অবশেষে বেরোচ্ছে রোদ।
বরফে ঢাকা সান্দাকফুর আনন্দ নিচ্ছেন পর্যটকরা।
বরফের চাদরে মুড়ে রয়েছে বাংলার সর্বোচ্চ স্থান।
মায়াবী সান্দাকফু

ছবি সৌজন্য: ওম গুরুং (ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

0 Comments
Share
guest-houses-run-by-wbsfdc

ওয়েবডেস্ক: পর্যটন দফতর, বন দফতরের পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় রিসর্ট রয়েছে মৎস্য দফতরেরও। বকখালির কাছে হেনরি আইল্যান্ড হোক, বা উদয়পুর সৈকতের কাছে ওশিয়ানা হোক, পর্যটকদের কাছে এই রিসর্টগুলি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

কিন্তু এর পাশাপাশি রাজ্যের আরও কয়েকটি জায়গাতেও রিসর্ট রয়েছে মৎস্য উন্নয়ন নিগমের। কোথায় কোথায় এই রিসর্ট রয়েছে এবং তাদের কত ভাড়া, জেনে নেব বিস্তারিত ভাবে।

যমুনাদিঘি কমপ্লেক্স

১) হেনরি আইল্যান্ড

*** সুন্দরি কমপ্লেক্স (নন-এসি দ্বিশয্যা ৮০০ টাকা, এসি দ্বিশয্যা ৯৯৯/১২০০ টাকা)।

*** ম্যানগ্রোভ কমপ্লেক্স (নন-এসি দ্বিশয্যা ২০০/৩০০ টাকা,  এসি দ্বিশয্যা ১০০০/১২০০/১৪০০ টাকা)।

২) বকখালি (ফ্রেজারগঞ্জ)

ফ্রেজারগঞ্জ কমপ্লেক্স (নন-এসি দ্বিশয্যা ৬০০ টাকা, এসি দ্বিশয্যা ১২০০ টাকা)।

৩) দিঘা

*** ওল্ড দিঘা কমপ্লেক্স- বাংলো ১ (এসি দ্বিশয্যা ৯৯৯ টাকা) এবং বাংলো ২ (এসি ডরমিটরি ৩৫০ টাকা)।

*** ওশিয়ানা- কমপ্লেক্স ১ এবং কমপ্লেক্স ২ (এসি দ্বিশয্যা ১২০০ টাকা) এবং কমপ্লেক্স ২ (সাধারণ এসি দ্বিশয্যা ১২০০ টাকা, ডিলাক্স এসি দ্বিশয্যা ১৪০০/১৫০০ টাকা, সুপার ডিলাক্স এসি দ্বিশয্যা ১৬০০ টাকা, স্পেশ্যাল রুম ২০০০ টাকা)।

ওশিয়ানা কমপ্লেক্স

৪) পেটুয়াঘাট (পূর্ব মেদিনীপুর)

পেটুয়াঘাট গেস্ট হাউস (এসি দ্বিশয্যা ৯৯৯ টাকা)।

৫) শঙ্করপুর

মৎস্যগন্ধা কমপ্লেক্স (এসি দ্বিশয্যা ৯৯৯ টাকা)।

৬) বর্ধমান

যমুনাদিঘি আম্রপালি কমপ্লেক্স (নন-এসি দ্বিশয্যা ৬০০/৮০০ টাকা, এসি দ্বিশয্যা ১২০০ টাকা)

৭) শিলিগুড়ি

গিরিরাজ কমপ্লেক্স (নন-এসি দ্বিশয্যা ২৫০/৩৫০/৪০০ টাকা, এসি দ্বিশয্যা ৮০০/১০০০ টাকা)

৮) বিষ্ণুপুর

কৃষ্ণবাঁধ টুরিস্ট কমপ্লেক্স (এসি দ্বিশয্যা ৯৯৯/ ১২০০ টাকা)।

মৎস্যগন্ধা কমপ্লেক্স।

৯) কলকাতা

*** নলবন ফুড পার্ক (দ্বিশয্যা এসি কটেজ ১৪০০ টাকা)।

*** ক্যাপ্টেন ভেড়ি (দ্বিশয্যা এসি ২০০০ টাকা)।

অনলাইন পরিষেবার মধ্যে দিয়ে এই রিসর্টগুলি আপনি বুক করতে পারেন। বুক করার জন্য লগইন করুন http://wbsfdc.com/tourism/-এ।

0 Comments
Share
online-booking-for-gajoldoba-starts
ভ্রমণ অনলাইনডেস্ক: গত ৩ অক্টোবর গজলডোবায় চালু হয়েছে পর্যটন প্রকল্প ‘ভোরের আলো‘। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত দিয়ে ওই নতুন প্রকল্পের উদ্বোধনের পরই চালু হয়ে গেল অনলাইনে বুকিং পরিষেবা। ফলে পুজোর ছুটিতে নির্ভেজাল আনন্দের টানে ভোরের আলোয় থাকার প্ল্যান থাকলে নিতে পারেন ওই অনলাইন পরিষেবার সুবিধা।
ভোরের আলোয় রয়েছে পাঁচটি কটেজ এবং দু’টি এসি টেন্ট। কটেজের ভাড়া প্রতি রাতের জন্য মাত্র আড়াই হাজার টাকা। সঙ্গে ১৮ শতাংশ হারে জিএসটি। কটেজে পাওয়া যাবে ওয়েস্টার্ন স্টাইলের টয়লেট-সহ অ্যাটাচড বাথরুম। আর ২৪ ঘণ্টা জেনারেটর ব্যবস্থা তো থাকছেই। অন্য দিকে এসি টেন্টে থাকতে হলে আপনাকে খরচ করতে হবে মাত্র ১১০০ টাকা। তবে যদি নিজের পছন্দ মতো দিনে কটেজ বা টেন্ট খালি থাকে তবেই মিটতে পারে মনের খিদে।
তাই অনলাইনের বুকিং পরিষেবার মাধ্যমে প্রথমেই জেনে নেওয়া যেতে পারে আপনার পছন্দের নির্দিষ্ট দিনটিতে কোনো কটেজ বা টেন্ট ফাঁকা রয়েছে কি না। যদি না পান একই সঙ্গে জেনে নেওয়া যাবে কোন কোন দিন তা পাওয়া যেতে পারে। ক্লিক করুন পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের এই লিঙ্কে:হোম ভোরের আলো অনলাইন বুকিং
আরও পড়ুন  গজলডোবায় চালু হল ‘ভোরের আলো’, দেখে নিন কিছু ছবি
বলে রাখা ভালো, কটেজগুলি ছাড়াও বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গলে সাইক্লিং এবং বোটিং প্রকল্পেরও সূচনা করে দেওয়া হয়েছে। কটেজগুলি রাজ্য পর্যটন নিগমের অন্তর্গত। শুরুতে অনলাইন বুকিং পরিষেবা চালু না হলেও বুকিংয়ের জন্য নির্ধারিত ৮৯৪২৮৪৪৫১৬ ফোন নম্বরে অনবরত আগ্রহীরা ফোন করতে থাকেন। নিগমের কর্তারা জানিয়েছেন, অনলাইন বুকিং চালু হওয়ার পরেও ওই ফোন নম্বরেও সমান ভাবে জেনে নেওয়া যাবে বিশদ তথ্য।
0 Comments
Share
tourism-dept-special-initiative-for-the-homestays-of-north-bengal
ভ্রমণঅনলাইন ডেস্ক: পাহাড় এবং তরাই-ডুয়ার্সের হোমস্টেগুলিকে আরও উন্নত করতে এবং হোমস্টে কেন্দ্রিক পর্যটনকে আরও উন্নত করতে বিশেষ উদ্যোগ নিল রাজ্য পর্যটন দফতর। হোমস্টেগুলো সংস্কারের জন্য সরকারের তরফ থেকে অর্থসাহায্য করা হবে। পুজোর পর এই কাজ জোরকদমে শুরু হবে বলে জানিয়েছেন পর্যটনমন্ত্রী গৌতম দেব।
সম্প্রতি পাহাড় সফরে এসে হোমস্টে-কেন্দ্রিক পর্যটনের ডাক দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বলেছিলেন, এর ফলে একদিকে যেমন মানুষ স্বনির্ভর হবে, তেমনই পর্যটনের বিকাশও হবে। এ, বি এবং সি, এই তিনটে বিভাগে হোমস্টেগুলিকে বিভক্ত করা হবে। এর ভিত্তিতেই দেখা হবে কাকে কত আর্থিক বরাদ্দ করা হবে। এর মধ্যেই সংস্কারের কাজের জন্য ৪০০ উপভোক্তার নাম নথিভুক্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে রাজ্য পর্যটনমন্ত্রী গৌতম দেব বলেন, “এই মুহূর্তে হোমস্টে-কেন্দ্রিক পর্যটনে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। এই জন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।” তরাই এবং ডুয়ার্সে পর্যটন দফতর এই কাজ করলেও, পাহাড়ে এই কাজের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন বোর্ডকে।

গৌতমবাবু আরও জানান, এই প্রকল্পের মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের কয়েকটি গ্রামকে চিহ্নিত করে সেখানেও হোমস্টে তৈরি করার ব্যাপারে উৎসাহ দেওয়া হবে। এই কাজে প্রয়োজনে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতরের সাহায্য নেওয়া হতে পারে বলেও জানিয়েছেন পর্যটনমন্ত্রী।

0 Comments
Share
in-and-around-tarapith
papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

তারাপীঠ অনেকেই যান। আর পাঁচ জনের মতো আমরা যখন রামপুরহাট স্টেশনে নামলাম তখন চাঁদিফাটা ঝলসানি বুঝিয়ে দিচ্ছিল তীর্থস্থানের কী মহিমা। স্টেশনের ট্রেকার-অটো আর টোটোর ধাক্কা সামলিয়ে দু’টি পরিবারের সঙ্গে একটি বড়ো গাড়িতে পৌঁছোলাম তারাপীঠ মন্দিরের গলির মুখে।

মায়ের মন্দিরের কয়েক পা আগে আমাদের ঠিক করা হোটেল ‘মায়ের দান’ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। ভদ্র-নম্র যুবক হোটেল ম্যানেজার সুব্রত মণ্ডল আমাদের জন্য নির্ধারিত ঘরে পৌঁছে দিয়ে এলেন। আহা কোথায় এলাম। মনে মনে ধন্যবাদ জানালাম আমাদের কলকাতার বন্ধুকে এমন ঘর পাইয়ে দেওয়ার জন্য। বারান্দার দরজা খুলতেই জীবিত কুণ্ড আর তার গা ঘেঁষে মায়ের মন্দির। সন্ধ্যারতি শুনতে পাব এই ভেবেই মনটা খুশিতে ভরে উঠল। তবে সন্ধের অপেক্ষা করতে হল না। বিকেলেই মন্দিরে গিয়ে জায়গা নিয়ে বসে পড়লাম। কী অপূর্ব পরিবেশ। আন্দাজ করতে অসুবিধে হল না ভোরে ঘুম ভাঙবে মায়ের আরতির ছন্দে।

temple of tarama
তারামায়ের মন্দির।

সন্ধ্যারতি দেখে পূর্ব পরিচিত পলাশবাবুর দোকানে আড্ডায় বসলাম। পলাশবরণ চট্টোপাধ্যায়। সকলেই চেনে পলাশদার দোকান। তার আগে এক চক্র ঘুরে নিয়েছি মন্দির প্রাঙ্গণ। তারামায়ের ভৈরব চন্দ্রচূড় শিবের মন্দির দর্শন করে এসেছি। নানা কথায় উঠে এল মায়ের বিশ্রামকক্ষের কথা। শুনছিলাম ভাদ্র, কার্তিক ও পৌষ অমাবস্যায় বিশেষ পুজো হয়। এখানে মেলা বসে। আর আশ্বিন মাসের শুক্লা চতুর্দশীতে মূল মন্দির থেকে মাকে বের করে এনে রাখা হয় বিরামঘরে। নাটমন্দিরের ডান দিকে একটু উঁচুতে সেটি। সকলেই যাতে দর্শন পায়। তিন-চার দিনের একটা ছোট্ট ছুটি মায়ের কাছে কাটাব বলে এসেছি। তারাপীঠ ঘিরে ছড়িয়ে আছে নানা দর্শনীয় স্থান। দোকানে বসে চপমুড়ি খাচ্ছিল শানু। অটোচালক। মিষ্টি, ভদ্র ছেলেটি যোগ দিল আমাদের সঙ্গে। ও-ই বলে দিল কোথায় কোথায় যাওয়া যেতে পারে।

আরও পড়ুন জলসাঘরের করুণ সুরে নিমতিতা রাজবাড়ি

 

পরের দিন শানুর অটো চলল বীরচক্রপুরের একচক্রগ্রামে। এখানে ‘নিতাইবাড়ি’ ঘিরে আরও মন্দির গড়ে উঠেছে। প্রথমে গেলাম বাঁকারায়ের অন্তর্ধানস্থল ‘জানুকুণ্ড’ বা ‘হাঁটুগাড়া’ আশ্রম। প্রভু নিত্যানন্দ স্নানের জন্য মায়ের ইচ্ছে পুরণের জন্য সব তীর্থ থেকে জল এনে এই কুণ্ডের সৃষ্টি করেন। কথিত এই কুণ্ডে সপ্তসাগর ও সপ্তনদী বিদ্যমান। কয়েক পা দূরে, ন’চূড়ার মন্দিরে শ্রীগুরু শ্রীগৌর ও শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর মন্দির। মন্দির ঘিরে গড়ে উঠেছে আশ্রম। এখান থেকে গন্তব্য হল পঞ্চপাণ্ডবতলা। পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাসের স্থান। আছে মাতাকুন্তী সহ পাঁচপুত্র ও ব্যাসদেবের মূর্তি ও শ্রীকৃষ্ণের মন্দির, যা ছোটো বৃন্দাবন নামে পরিচিত। রামনবমী ও দোলে মহা উৎসব পালিত হয়। তারাপীঠ থেকে সাঁইথিয়ামুখী ১০ কিলোমিটার দূরত্বে বলরামের অবতাররূপী নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর জন্মস্থান গর্ভাবাস নামে প্রসিদ্ধ বৈষ্ণবতীর্থ বীরচন্দ্রপুর। এখানে আছে নিতাইয়ের আসল জন্মস্থান সূতিকামন্দির, ষষ্ঠীতলা, বিশ্বরূপতলা, সন্ন্যাসীতলা ও মালাতলা। শ্রীক্ষেত্রের দেবতা জগন্নাথদেবের মন্দির। কিছু দূরে ইস্কনের সুদৃশ্য মন্দির। সেখানকার সাফাইকর্মী বেণু পাল মন্দিরের নিয়মকানুন জানিয়ে দিলেন। আগে থেকে জানিয়ে দিলে তিনশো টাকায় থাকার সুযোগ মেলে। অর্থের বিনিময়ে ভোগ (৫০), রাতের খাবার (৪০) ও জলখাবার (৩০) পাওয়া যায়। ছায়াঘেরা শান্ত পরিবেশ সহজেই মন কেড়ে নিল।

sutika mandir
বীরচন্দ্রপুরের সূতিকা মন্দির।

শুনেছি সাধক বামাক্ষ্যামার জন্মস্থান এখানেই। তাই এ বার আটলার পথ ধরা। তারাপীঠ থেকে সোজা পথ ধরলে মাত্র ৪ কিলোমিটার। মসৃণ রাস্তার দু’ধারে গাছ লাগানোর ব্যবস্থা। শানু তার বাবার মুখের শোনা কথা বলতে লাগল। আগে এই রাস্তা ছিল একবারে মাটির। আর বর্ষাকালে অবস্থা আরও খারাপ। তবুও মানুষের ভিড় লেগেই থাকত। পায়ে হেঁটে মানুষের যাতায়াত ছিল। রাস্তা দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। ২৬ কাটা জমিতে গড়ে উঠেছে বামাক্ষ্যাপার মন্দির ও কালীমায়ের মন্দির। এখানেই তাঁর জন্মভিটের মূল চালাটি রেখে নির্মাণ হয়েছে মন্দির। ফিরে এসে তারামায়ের নাটমন্দিরে বিশ্রাম। আমাদের পূজারি পলাশদার কাছে আবদার ছিল মায়ের অন্নভোগ খাওয়ার। মায়ের আশিসে তা মিলেও গেল। নাটমন্দিরে বসিয়ে নিজের হাতে পরিবেশন করে তবে তিনি গেলেন বিশ্রামে। আমাদের জানা ছিল না, এই ভোগ কিনতেও পাওয়া যায়। আর আমিষ ভোগ খেতে গেলে আগে থেকে জানাতে হয়। টিকিট করতে হয়। তবে সবটাই মায়ের কৃপা। কী ছিল না সেই ভোগে। পোলাও, আলুভাজা, সিমভাজা, বেগুনভাজা, ফুলকপি ও বাঁধাকপির তরকারি, ভেটকিমাছের ঝাল, টমেটোর চাটনি ও পায়েস।

দুপুরে হোটেলে বিশ্রাম নিয়ে এলাম মায়ের আরতি দেখতে। আগে যখন এসেছিলাম তখনকার থেকে এখন ব্যবস্থা অনেক সুশৃঙ্খল। প্রত্যেক ভক্ত যাতে আরতি দেখতে পান তার খেয়াল রাখছে মন্দির নিরাপত্তা কর্মীরা। এ দিকে বাইরেও জায়েন্ট স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে মন্দিরের ভিতরের অংশ। আরতি শেষে পলাশদার দোকানে এ বার আড্ডা তেলেভাজা মুড়ি নিয়ে। আমাদের পরের দিনের সূচি ঠিক হল ভদ্রপুরে আকালীপুরের গুহ্যকালী, নলহাটেশ্বরী, মুলুটিগ্রামের মৌলাক্ষীমায়ের কাছে যাওয়ার।

gujhjhyakali of akalipur
আকালীপুরের গুহ্যকালী।

বাবু দাস আমাদের চার চাকার সারথি। ভোরের হাওয়ায় আমরা আকালীপুরের দিকে রওনা দিলাম। তারাপীঠ থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটারের পথ ভদ্রপুর। রাজা নন্দকুমারের জন্মস্থান। ভদ্রপুর বাসস্ট্যাণ্ডের ডান দিকে আকালীপুরের দেবী আকালীর মন্দির। আটকোণা গর্ভগৃহে মহারাজ নন্দকুমারের স্বপ্নে পাওয়া দেবী কালীর মূর্তিতে বৈচিত্র্য আছে। এখানে দেবী সর্পাসনা, সর্পাভরনা, বরাভয়দায়িনী দ্বিভূজা। শ্মশানবাসিনী শ্রীশ্রীগুহ্যকালীকার মূর্তি কষ্টিপাথরের। মন্দিরটি নির্মাণের সময় উত্তর দিকের দেওয়ালটি বিদীর্ণ হয়। আজও সেই ফাটল সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। আটকোণা মন্দিরের চূড়াতেও উত্থিত ফণাযুক্ত সর্পালংকৃত। ব্রাহ্মণী নদীর তীরে শ্মশান ঘেঁষে এই মন্দির। ওয়ারেন হেস্টিংসের অসাধুতার প্রতিবাদ করায় মন্দিরটির অসম্পূর্ণ অবস্থায় ফাঁসি হয় নন্দকুমারের। কথিত, মগধরাজ জরাসন্ধের পূজিত দেবীকে ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলায় আনেন উত্তর ভারত থেকে। প্রাথমিক সখ্যতার সুবাদে সেই মূর্তি পান নন্দকুমার।

আরও পড়ুন এক টুকরো ইতিহাস – বাণগড়

এখান থেকে ১২ কিলোমিটার পথে নলহাটেশ্বরী। এই অঞ্চল থেকে ১৪ কিলোমিটার রামপুরহাট ও ১০ কিলোমিটার তারাপীঠ। অনুচ্চ টিলার ঢালে দেবীপার্বতী বা নলহাটেশ্বরী মন্দিরের জন্য নলহাটি বিখ্যাত। বিষ্ণুচক্রে খণ্ডিত দেবীর কন্ঠহাড় এখানে পড়ায় তাই পীঠে পরিণত হয়েছে। দ্বিমতে নলক বা নলা বা নুলো অর্থাৎ কনুইয়ের হাড় পড়ে এখানে। ভোর ৪টেয় তাকে তেল-হলুদ মাখিয়ে স্নান করানো হয়। এবং তা স্পর্শ করা যায় তখন। চারচালা মন্দিরে লাল কাপড়ে আচ্ছাদিত সিঁদুর মাখানো পাথরে রুপোর চোখ-নাক-মুখ বসিয়ে দেবীরূপে পূজিত হন। শোনা যায়, ২৫২ বঙ্গাব্দে স্বপ্নাদেশে কামদেবের আবিষ্কার। মন্দির গড়েন নাটোরের রানি ভবানী। মন্দিরের ডান দিকে আছে বিঘ্ননাশক গণেশমন্দির ও সিঁড়িপথে আছেন দেবীর ভৈরব যোগেশ্বরের মন্দির। মন্দিরের পিছনে টিলারের আকারে বর্গিযুদ্ধে শহিদ পীর কেবলা আনাশাহী মাজার শরিফ। শান্ত-স্নিগ্ধ ছায়াঘেরা পরিবেশ। দুপুরের আহারের জন্য রামপুরহাটে ফিরে এলাম।

temple ma moulakhhi
মা মৌলাক্ষীর মন্দির।

ঝাড়খণ্ডের মুলোটি গ্রামে মা মৌলাক্ষীর মন্দির। রামপুরহাট-দুমকা বাসে ১২ কিলোমিটার গিয়ে সুঁড়িচুয়ার মোড় থেকে বাঁ দিকে আরও ৪ কিলোমিটার পথ। আমরা চলেছি গাড়িতে। খর রোদে আর অসাধারণ নৈঃশব্দতা চিরে বাবু দাসের গাড়ি ছুটছিল। জনমানবহীন পরিবেশে ভয় যে একবারে পাইনি তা নয়। তবুও দেখে আসি মৌলাক্ষী মাকে। বাংলা-বিহার সীমান্তে শক্তি-সাধকদের তন্ত্রভূমি দুমকার গুপ্তকালী মুলোটি বা মালুটি বা মল্লহাটি গ্রাম। এখানে দেবীর মন্দির ছাড়াও চোখশান্তি করা টেরাকোটার কাজ করা ৭২টি শিবমন্দির আছে। ছিল ১০৮টি। অবক্ষয়ের পথে যা অবশিষ্ট। প্রতি মন্দিরে শিবলিঙ্গ বর্তমান। এক একটি মন্দিরে টেরাকোটার কাজ দিয়ে পৌরাণিক আখ্যান চিত্রিত।

মৌলাক্ষী মন্দিরে যখন পৌঁছোলাম তখন মধ্যদুপুর পার হয়ে গিয়েছে। আশপাশে ছিলেন পুরোহিত। আমাদের ঘোরাঘুরি দেখে এগিয়ে এলেন। বললেন কিছু কথাও মন্দির নিয়ে। রাজা রাক্ষসচন্দ্র রায় প্রতিষ্ঠিত এই মন্দির। এই মায়ের কাছে এসে প্রথম সাধনা করেন বামাক্ষ্যাপা। পরে তারাপীঠে যান ও মন্দিরের কাছে বিস্তৃত শ্মশানই সাধনক্ষেত্র রূপে বিখ্যাত হয়ে ওঠে। আগেই লিখেছি আশ্বিন মাসের শুক্লা চতুর্দশীতে মূল মন্দির থেকে মাকে বের করে এনে রাখা হয় বিরামঘরে। তখন তারামায়ের মুখ এই মৌলাক্ষী মায়ের মন্দিরের দিকে ফেরানো থাকে। জানা গেল, ইনি বড়মা। তারামা ছোট। এখানে আগে পুজো-বলিদান শুরু হলে তার পরে শুরু হয় তারাপীঠের পুজো। দ্বারকা নদের এ-পার ও-পার।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে রামপুরহাট। সেখান থেকে অটোয় তারাপীঠ। তারাপীঠ রোড স্টেশনে নেমেও যেতে পারেন। তবে সব ট্রেন তারাপীঠ রোডে থামে না। ট্রেনের সময়ের জন্য দেখে নিন erail.in

সড়কপথে কলকাতা থেকে দূরত্ব ২২৩ কিমি, পথ জাতীয় সড়ক ১৯ (পূর্বতন জাতীয় সড়ক ২, দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে) হয়ে বর্ধমান, তার পর জাতীয় সড়ক ১১৪ বরাবর গুসকরা, শান্তিনিকেতন, সাঁইথিয়া হয়ে তারাপীঠ।

কোথায় থাকবেন

তারাপীঠে থাকার জন্য প্রচুর বেসরকারি হোটেল ও লজ আছে। আগাম সংরক্ষণের দরকার হয় না। তবু যদি চান খোঁজ পাবেন makemytrip, goibibo, trivago, cleartrip ইত্যাদি ওয়েবসাইট থেকে।

ছবি : লেখক

0 Comments
Share