Browsing Category:অন্য রাজ্য

meditation-cave-at-kedarnath-is-open-to-all-rented-by-gmvn

ভ্রমণঅনলাইন ডেস্ক: সপ্তম তথা শেষ দফার ভোটের প্রচার শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী চলে গেলেন কেদারনাথে, গুহায় কাটিয়ে এলেন ১৭ ঘণ্টা, করলেন ধ্যান। চাইলে আপনিও মোদীর মতো কেদারনাথের গুহায় ধ্যানে বসতে পারেন। সব ব্যবস্থা রেখেছে গাড়োয়াল মণ্ডল বিকাশ নিগম (জিএমভিএন)। শুধু একটাই শর্ত, শারীরিক ভাবে সক্ষম হতে হবে আপনাকে।

গত বছরেই উত্তরাখণ্ড সরকারের উদ্যোগে এই গুহা খোলা হয়। ‘রুদ্র ধ্যান গুহা’র দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে জিএমভিএন। কেদারনাথ মন্দিরের বাঁ দিকে পাহাড়ি পথে ১ কিমি গেলে ওই গুহা। ওই গুহায় থাকার মতো প্রয়োজনীয় সমস্ত ব্যবস্থা আছে। গুহা থেকেই দেখা যায় কেদারনাথ ও ভৈরবনাথ মন্দির।

গুহায় যে সব সুবিধা রয়েছে

পানীয় জল।

বিদ্যুৎ, চার্জিং-এর ব্যবস্থা।

একটি শয্যা।

বেড টি, ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ইভিনিং টি আর ডিনার।

২৪ ঘণ্টা অ্যাটেনড্যান্ট, তাঁকে ডাকার জন্য বেলের ব্যবস্থা।

জরুরি প্রয়োজনে ফেসিলিটি ম্যানেজারকে ডাকার জন্য টেলিফোন।

তবে এই গুহায় থাকতে হলে কিছু শর্ত পালন করতে হবে

অত্যন্ত তিন দিনের জন্য গুহা বুক করতে হবে।

যে দিন থেকে বুকিং তার দু’ দিন আগে জিএমভিএন গুপ্তকাশীতে রিপোর্ট করতে হবে।  

দুটো মেডিক্যাল টেস্ট দিতে হবে, একটি গুপ্তকাশীতে এবং আরও একটি কেদারনাথে। যদি দেখা যায় আপনি শারীরিক ও মানসিক ভাবে সক্ষম তখনই আপনাকে ওই গুহায় থাকার অনুমতি দেওয়া হবে।

গুহায় একজনেরই থাকার ব্যবস্থা আছে।

কেদারনাথ ধ্যান গুহায় থাকার খরচ প্রতিদিন ৯৯০ টাকা। বুকিং অনলাইনে জিএমভিএন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে। বিস্তারিত জানতে এখানে দেখুন।    

  ছবি সৌজন্যে জিএমভিএন

0 Comments
Share
a-visit-to-chinnamasta-mandir-at-rajrappa
writwik das
ঋত্বিক দাস

অরণ্যসুন্দরী ঝাড়খণ্ডের কোনায় কোনায় অপরূপ প্রাকৃতিক শোভা। প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য্যের পাশাপাশি দেবতাদেরও প্রিয় স্থান এই আদিবাসী অধ্যুষিত রাজ্যটি। দিকে দিকে নানা মন্দির ও তাকে ঘিরে থাকা নানান লোককাহিনি এবং তার সঙ্গে জুড়ে আছে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। তাই তো পর্যটন শিল্পের বিকাশে দুয়োরানি হলেও কত শত প্রকৃতি-পুজারির চিত্তহরণ করে চলেছে এই রাজ্যটি।

এ বার আমার গন্তব্য ঝাড়খণ্ড রাজ্যের রাজধানী রাঁচি থেকে মাত্র ৬৮ কিলোমিটার দুরে অন্যতম সিদ্ধপীঠ রাজরাপ্পা। এখানে দেবী মহামায়া ছিন্নমস্তা রূপে বিরাজিতা। ভারতবর্ষে মাত্র যে কয়েকটি ছিন্নমস্তা দেবীর মন্দির আছে তার মধ্যে রাজরাপ্পা প্রধান সিদ্ধপীঠ হিসেবে খ্যাত।

দশমহাবিদ্যার অন্যতম রূপ ছিন্নমস্তা বা ছিন্নমস্তিকা। একদা দক্ষের যজ্ঞ উপলক্ষ্যে সতীর পিতৃগৃহে যাওয়ায় বাধা দিলে শিবের ওপর প্রচণ্ড রেগে দেবী দশটি রুদ্ররূপ ধারণ করে মহাদেবকে ভয় দেখান। মায়ের সেই দশটি রূপের অর্থাৎ দশ মহাবিদ্যার তৃতীয় রূপ হলেন মা ছিন্নমস্তা।

আরও পড়ুন জৌলুসের অন্তরালে বিশ্বাসঘাতকতা : দেশের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের সাক্ষী গ্বালিয়র

দেখতে ভয়ংকরী হলেও মায়ের সব চেয়ে দয়াময়ী রূপ ছিন্নমস্তা। একদা ডাকিনী ও যোগিনী-সহ এক সরোবরে স্নানরত ছিলেন দেবী। সেই সময় ডাকিনী ও যোগিনীর বড্ড খিদে পায়। খিদের যন্ত্রণায় তারা কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। এই অবস্থায় কোথাও খাবার না পেয়ে মাতৃহৃদয় বড়োই ব্যথিত হয়। তখন উপায় না দেখে মা নিজেরই নখ দিয়ে গলা চিরে নিজের মুণ্ডু বাম হস্তে ধারণ করেন। গলা দিয়ে তিনটি রক্তধারার একটি ডাকিনী, একটি যোগিনী এবং আর একটি মায়ের নিজ মুখমণ্ডলে প্রবেশ করে। মায়ের গলায় নরমুণ্ড শোভিত। কাম ও রতির ওপর দণ্ডায়মানা এই রূপে ভয়ের পরিবর্তে সন্তানবৎসল মাতৃরূপটিই প্রকাশিত হয়। মা এখানে দয়াময়ী। কামলালসাকে সংযম করেন দেবী।

হিন্দুধর্ম ছাড়াও তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্মে দেবী ছিন্নমস্তা পূজিতা। মূলত উত্তর ভারত ও নেপালে ছিন্নমস্তার কয়েকটি মন্দির থাকলেও মায়ের মূল সিদ্ধপীঠ রাঁচি জেলার রাজরাপ্পায় অবস্থিত।

রাজরাপ্পা নামটির সঙ্গেও এটি সুন্দর কাহিনি জুড়ে রয়েছে। প্রাচীনকালে এখানকার এক জনপ্রিয় রাজা ছিলেন ‘রাজা’, তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল ‘রুম্পা’। পরবর্তীকালে রাজা ও রুম্পার নামে জায়গার নাম হয় রাজরাপ্পা। রাঁচি, রামগড় ও হাজারিবাগের পুরো পথটাই বসন্তে পলাশ ফুলে সেজে ওঠে। তখন প্রকৃতি আরও মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। জলবায়ুও সাস্থ্যকর।

এক দিকে দামোদর, আর এক দিকে বইছে ভৈরবী নদী, স্থানীয়রা বলেন ভেরা। দুইয়ের সঙ্গমস্থলে এক অনুচ্চ টিলার টঙে মায়ের মন্দির। মায়ের পূজার প্রধান অর্ঘ্য নারকেল, প্যাঁড়া, চিঁড়ে, নকুলদানা জবার মালা ইত্যাদি। যে কোনো শাক্তপীঠ বা সিদ্ধপীঠের মতো এখানেও বলিপ্রথা প্রচলিত। মানসপূরণে ভক্তরা ছাগবলি দিয়ে থাকেন।

এই অঞ্চলটি ভৌগোলিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে একটি অনুচ্চ পাহাড় থেকে পুরো ভৈরবী নদী দামোদর নদের বুকে আছড়ে পড়ছে। ভৈরবী নদীকে নারী আর দামোদর নদকে পুরুষ মনে করলে নদ ও নদী অথবা নারী-পুরুষের সেই চির সঙ্গম হচ্ছে এই স্থানটিতে। টিলায় ঘেরা দামোদরকে কী অপরূপ লাগে। সেই রূপ একবার যে দেখেছে সে জন্ম জন্মান্তরেও তা ভুলবে না। পুরো পরিবেশটাই নয়নাভিরাম। মূল মন্দির ছাড়াও মহাদেবের মন্দির, দক্ষিণাকালী মন্দির ও কিছু দূরে অষ্টমাতৃকা মন্দির। মায়ের ভৈরবরূপী শিবলিঙ্গটি বেশ উঁচু।

পূজা দেওয়ার জন্য মন্দিরচত্বরের সামনে পেছনে রয়েছে পূজাসামগ্রীর অসংখ্য  দোকান। পছন্দমতো পূজার অর্ঘ্য নিয়ে মায়ের চরণে পূজা নিবেদন করে চলে আসুন দামোদরের কাছে। অনেক নৌকা এখানে অপেক্ষা করে আছে আপনাকে নিয়ে ভেসে পড়ার জন্য। তার মধ্যে যে কোনো একটিতে কুড়ি-তিরিশ টাকার বিনিময়ে ভেসেই পড়ুন দামোদরের বুকে। মার্বেল রকের মতো দু’পাশে পাথরের পাহাড়, তার মাঝখান দিয়ে ভাসতে ভাসতে পৌঁছে যান জলপ্রপাতের কাছে। কয়েক মিনিট ঠান্ডা আবহে আর ঝরনার গর্জন শুনতে শুনতে হারিয়ে যান মন-কেমনের রাজ্যে। চাইলে নৌকো করে আরও কিছুটা ঘুরেফিরে আসুন। ফেরার পথে নিস্তব্ধ জঙ্গলে প্রকৃতিকে সঙ্গী করে দর্শন করে নিন অষ্টমাতৃকা মন্দির। এখানে অরণ্যের শীতল ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রামও করে নিতে পারেন। আহারের জন্য অনেক দোকান আছে মন্দির চত্বরের বাইরে। সেখান থেকে আহারপর্ব সেরে ফেলুন। চাইলে রাজরাপ্পায় রাতও কাটাতে পারেন।  

ফেরার পথেও রামগড়ে পুরোনো শিবমন্দিরের সামনে নেমে পড়ুন। ইটের মন্দিরটির অবস্থা আজ জীর্ণ। বহু ইতিহাসের পথ পেরোনো মন্দিরটি বেশ বড়ো এবং দেখলেই বোঝা যায় এক সময় মন্দিরটির গায়ে অনেক কারুকার্য ছিল। এখন সে সব ক্ষয়প্রাপ্ত। বেশ ক’টা বড়ো বড়ো সিঁড়ি ভেঙে মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করতে হয়। পুরাতত্ত্বের জীবন্ত দলিল দর্শন সেরে একটা অটো ধরে চলে আসুন রামগড় বাসস্ট্যান্ডে। সেখান থেকে বরকাকানা, রাঁচি বা হাজারিবাগ হয়ে ঘরে ফিরুন। স্মারক হিসেবে রাজরাপ্পা থেকে বড়ো বড়ো প্যাঁড়াসন্দেশ নিয়েও আসতে পারেন।

কী ভাবে যাবেন

যে কোনো জায়গা থেকে ট্রেনে বরকাকানা বা রাঁচি আসুন। ট্রেনের সময়ের জন্য দেখে নিন erail.in। বরকাকানা জংশন স্টেশন থেকে ম্যাজিক ভ্যান বা অটোয় চেপে চলে আসুন মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরের রামগড় শহরে। রামগড় থেকে ৩২ কিলোমিটার রাজরাপ্পা, দিনভর বাস, ট্রেকার চলে। রাঁচি থেকে রামগড় ৩৭ কিলোমিটার, হাজারিবাগ থেকে রামগড় ৪৮ কিলোমিটার। দু’ জায়গা থেকেই বাস পাওয়া যায়। তা না হলে রাঁচি বা হাজারিবাগ থেকে গাড়ি ভাড়া করে চলে আসতে পারেন। কলকাতার এসপ্ল্যানেড থেকে রাতের বাস ধরে ভোরে নেমে পড়তে পারেন রাঁচিতে।  

কোথায় থাকবেন

সাধারণত রাঁচি বা হাজারিবাগ বেড়াতে এসে ঘুরে যাওয়া যায় রাজরাপ্পা। তবু রাজরাপ্পায় থাকার ইচ্ছে হলে থাকতে পারেন ঝাড়খণ্ড ট্যুরিজমের ‘দেবলোক’-এ। ফোন ৮২৪০৩০৯৩২৮, অনলাইন বুকিং http://jharkhandtourism.gov.in

ছবি: লেখক

0 Comments
Share
visit-to-gwalior-the-witness-of-countrys-first-war-of-independence

sahana chakraborty
সাহানা চক্রবর্তী

হাতে যদি চার-পাঁচ দিনের ছুটি থাকে, আর থাকে ইতিহাসের প্রতি টান, তা হলে অনায়াসেই ঘুরে আসা যেতে পারে মধ্যপ্রদেশের সব চেয়ে আকর্ষণীয় শহর গ্বালিয়রে। কলকাতা থেকে প্রায় ২৪ ঘণ্টা, আর রাজধানী দিল্লি থেকে মাত্র ৫ ঘণ্টার দূরত্ব অতিক্রম করলেই পৌঁছে যাওয়া যায় প্রাচীনকালের গোপাদ্রি তথা মধ্যপ্রদেশের গ্বালিয়র শহরে।

ইতিহাস আর রূপকথা যেখানে হাত ধরাধরি করে চলে, সেই হল গ্বালিয়র (গোয়ালিয়র)। বিশ্বাস আর বিশ্বাসঘাতকতা, ভালোবাসা আর হিংস্রতা, হিন্দু-মুসলিম স্থাপত্যের সঙ্গে চৈনিক স্থাপত্য শিল্প যেখানে মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছে, সেই হল গ্বালিয়র। এই শহর দেশকে দিয়েছে তানসেন, বৈজু বাওরা থেকে হকির জাদুকর ধ্যানচাঁদকে। এই শহর দেখেছে ঔরঙ্গজেবের হিংস্রতা, দেখেছে মানসিং তোমরের ভালোবাসা। দেখেছে ঝাঁসির রানির দেশপ্রেম, সয়েছে সিপাহি বিদ্রোহের আঘাত। এখান থেকেই দেশের ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ। প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের সাক্ষী এই শহরেই পাওয়া গিয়েছে পৃথিবীর প্রথম শূন্যের নিদর্শন।

আরও পড়ুন ভারতভূমের সাহেবপাড়া ম্যাকলুস্কিগঞ্জ

প্রাচীন কালে এই শহরের নাম ছিল গোপাদ্রি বা গোপগিরি। দ্বিতীয় শতকে এখানে নাগবংশ রাজত্ব করত। তাদের রাজধানী ছিল বিদিশা। যদিও পরে ভীমনাগ তাঁর রাজধানী স্থানান্তরিত করেন পদ্মাবতীতে। গুপ্তবংশের রাজা সমুদ্রগুপ্তের হাতে নাগ-শাসনের অবসান ঘটে। মধ্য যুগে মহম্মদ ঘোরীর হাতে আক্রান্ত হয় এই শহর। পরবর্তীকালে দাস বংশের শাসনকালে ইলতুৎমিসের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এখানে। অতঃপর হিন্দু তোমর বংশের হাত ঘুরে পানীপতের (পানিপথ) প্রথম যুদ্ধের পর এই শহর বাবর তথা মুঘলদের অধীনে আসে। বাবর তাঁর আত্মজীবনীতে গোয়ালিয়র দুর্গকে ‘ভারতের দুর্গগুলির মধ্যে নেকলেসের মুক্ত’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।

jain tirthankars' statues
জৈন তীর্থঙ্করদের মূর্তি।

বাস্তবিকই, এই শহরের মূল আকর্ষণ দুর্গ। শহরের মধ্যেই প্রায় তিন বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে দাঁড়িয়ে। দুর্গে প্রবেশপথের দু’ধারে চোখে পড়বে পাহাড়ের গায়ে খোদিত জৈন তীর্থঙ্করদের মূর্তি। এদের বয়স পাঁচশো থেকে তেরোশো বছর। এগুলির মধ্যে সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য জৈনগুরু আদিনাথের ৫৮ ফুট উঁচু দণ্ডায়মান মূর্তিটি। প্রায় ৩৫ ফুট উঁচু পদ্মাসনা আরও একটি মূর্তি নজর কাড়ে। দুর্গে ঢোকার গোপাচল পাহাড়ের গায়ে বিভিন্ন আকারের জৈন স্থাপত্য-মূর্তি পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই। মূর্তিগুলির অধিকাংশই ‍১৩৪১ থেকে ১৪৭৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রাজা দুঙ্গর সিং ও তোমররাজ কীর্তি সিংহের আমলে খোদিত বলে জানা যায়। তবে এগুলির মধ্যে পারশনাথের ৪২ ফুট উঁচু মূর্তিটি অবাক করে। ১৫২৭ সালে মুঘলসম্রাট বাবরের আক্রমণকালে এই জৈন স্থাপত্যগুলি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার নিদর্শন আজও বিদ্যমান।

এ বার মূল দুর্গ। কবে দুর্গ তৈরি হয়েছিল, সঠিক জানা যায় না, জানা যায় না নির্মাণকারী রাজার নামও। জনশ্রুতি, খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকে সুরজ সেন নামে এক রাজা এই দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। গ্বালিপা নামে এক সাধু এক পবিত্র পুকুরের জল ছিটিয়ে দিয়ে তাঁর কুষ্ঠরোগ সারিয়েছিলেন। সেই কথা মনে রেখে কৃতজ্ঞ রাজা দুর্গটি নির্মাণ করেন। পুকুরটি দুর্গের মধ্যেই। রাজাকে ‌‘পাল’(রক্ষক) উপাধিতে ভূষিত করেন সাধু । আর বলেন, যত দিন তাঁরা এই উপাধি ব্যবহার করবেন, তত দিন পর্যন্ত এই দুর্গ তাঁদের পরিবারের দখলে থাকবে। সত্য সত্যই সুরজ সেন পালের ৮৩ জন উত্তরাধিকারী এই দুর্গে রাজত্ব করেন। কিন্তু ৮৪তম বংশধর তেজকরণের আমলে এই দুর্গ ওই পরিবারের হাতছাড়া হয়।

আরও পড়ুন বিশ্বনাথের বারাণসী, বারাণসীর বিসমিল্লাহ

দুর্গের নির্মাণকাল নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক, খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকের আগেই যে এটি নির্মিত হয়েছিল, বিভিন্ন প্রমাণ থেকে সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। গজনীর সুলতান মামুদ চার দিন এই দুর্গ অধিকার করে রেখেছিলেন। কুতুবউদ্দিন আইবক, ইলতুৎমিসের হাত ঘুরে ১৩৯৮ সালে এই দুর্গের মালিকানা যায় তোমর রাজবংশের হাতে। এই তোমর রাজবংশের শাসনকালকেই বলা হয় গ্বালিয়রের স্বর্ণযুগ। এই বংশের সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য রাজা মানসিং তোমর। তাঁর আমলেই এই দুর্গে সাতটি নতুন নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। কিন্তু শীঘ্রই সিকান্দার লোদির চোখ পড়ে এই দুর্গ। অবশেষে ইব্রাহিম লোদির হাতে মানসিং নিহত হন। এর পর দুর্গের দখল নেন বাবর। মুঘলদের থেকে দুর্গের মালিকানা ছিনিয়ে নেন শেরশাহ। কিন্তু আকবর ফের দুর্গের দখলদারি পুনরুদ্ধার করেন। সেই থেকেই এই দুর্গ হয়ে যায় মুঘলদের কারাগার। ঔরঙ্গজেব তাঁর ভাই মুরাদকে নেশাগ্রস্ত করে এখানেই বন্দি করে রেখেছিলেন। পরে এখানেই তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

gwalior man mandir
মানমন্দির প্রাসাদ।

দুর্গে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই পর্যটকদের নজর কাড়ে মানমন্দির প্রাসাদ, আর তার মীনাকারি। ১৮৫৭-য় সিপাহি বিদ্রোহের সময় অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানমন্দির, যদিও পরে তা পুনর্নিমিত হয়। কিন্তু প্রাচীন গঠনশৈলীর সঙ্গে পুনর্নিমিত অংশের ফারাকটা অতি বড়ো আনাড়ির চোখেও ধরা পড়ে।

ডান দিকে হাতি পোল গেট। এক সময় ওই দরজা দিয়েই চলাচল করত রাজকীয় হস্তিবাহিনী। বাঁ দিকে মিউজিয়াম। দুর্গ থেকে দেখা যায় গোটা শহরটাকে। দুর্গের ওপর থেকেই কিছুটা দূরে দেখা যায় তানসেনের সমাধিস্থল।

আরও পড়ুন ওখরে-হিলে-ভার্সে, যেন মেঘ-বালিকার গল্প

দুর্গের মূল অংশ দু’টি — মানমন্দির এবং গুজারি মহল। প্রিয় রানি মৃগনয়নীর জন্য গুজারি মহল নির্মাণ করিয়েছিলেন রাজা মানসিং। তবে মূল আকর্ষণ কিন্তু মানমন্দিরই। বাইরে-ভেতরে অপূর্ব স্থাপত্য, ভারতীয় শিল্পকলার সঙ্গে চৈনিক স্থাপত্যশিল্পের অপূর্ব সংমিশ্রণ সত্যিই দেখার মতো। এখানে রানিদের দোলনা-ঘরে রয়েছে প্রাচীন টেলিফোনিক ব্যবস্থার নিদর্শনও। ওপর থেকে নেমে এসেছে একটি পাইপ। পুরোটাই ‘কনসিলড’। সেটিতে কান রাখলে স্পষ্ট শোনা যায় ওপর থেকে পাঠানো কোনো বার্তা। আর চমকে যাওয়ার মতো ঘটনা হল, এই দোলনা-ঘরেই বন্দি ছিলেন মুরাদ আর এখানেই তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। গোটা মানমন্দিরের জৌলুসের মধ্যে এই ঘরটিতেই যেন কোথাও একটা হাহাকার ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। 

অবাক করে সে যুগের নির্মাণশৈলীতে ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা। গোটা মানমন্দির জুড়ে আলো এবং বায়ু চলাচলের অভিনব ব্যবস্থা বিস্ময় জাগায়।

sas bahu temple
সাস বহু মন্দির।

মানমন্দির থেকে বেরিয়ে দুর্গের চত্বরের মধ্যেই আরও কয়েকটি প্রাচীন নিদর্শন দেখার পালা। প্রতিহাররাজ মিহিরভোজের আমলে তৈরি তেলি কা মন্দির, গরুড়স্তম্ভ, রাণা ভীম সিংহের ছত্রী ইত্যাদি। আর সাস-বহু মন্দিরের অপূর্ব কারুকাজের জন্য একে গ্বালিয়রের ‘দিলওয়ারা মন্দির’ বলাই যায়। এ ছাড়া রয়েছে কর্ণ মহল, বিক্রম মহল ইত্যাদি। দুর্গের মধ্যেই রয়েছে গুরুদ্বার দাতা বন্দি ছোর। মুঘল বাদশাহ জাহাঙ্গীরের নির্দেশে যেখানে ষষ্ঠ শিখগুরু হরগোবিন্দ সিংকে বন্দি রাখা হয়েছিল, সেখানেই নির্মিত এই গুরুদ্বারটি। আমরা জানি, শূন্যের আবিষ্কর্তা ভারতীয়রাই। দুর্গের এককোণে চতুর্ভুজ মন্দিরে রয়েছে পৃথিবীর প্রাচীনতম শূন্যের নিদর্শন।

jai vilas palace
জয়বিলাস প্রাসাদ।

এ বার জয়বিলাস প্যালেস। পাশ্চাত্য স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই প্রাসাদ নির্মাণের দায়িত্বে ছিলেন স্যার মাইকেল ফিলোস। নির্মিত হয় রাজা জয়াজিরাও সিন্ধিয়ার আমলে। এখানে রয়েছে আধুনিক গ্বালিয়রের রূপকার মাধবরাও সিন্ধিয়ার নামে গোটা একটি গ্যালারি। রয়েছে সিন্ধিয়া পরিবারের ব্যবহৃত নানা জিনিসপত্র। তবে এর মূল আকর্ষণ হল ১০০ X ৫০ X ৪১ ফুট উঁচু দরবার হলটি। আর সাড়ে ১২ মিটার লম্বা সাড়ে তিন টন ওজনের দু’টি ঝাড়লণ্ঠন। শোনা যায়, এই দু’টি ঝাড়লণ্ঠনই হল বিশ্বের সব থেকে বড়ো ঝাড়লণ্ঠন। আর রয়েছে এক কার্পেট, যা বুনতে নাকি লেগে গিয়েছিল ১২ বছর।

rani laxmi bai statue
রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের স্ট্যাচু।

আরও একটি উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থল হল ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাইয়ের সমাধিস্থল। এই শহরেই ব্রিটিশদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে প্রাণ দিয়েছিলেন লক্ষ্মীবাই। কিংবদন্তি বলে, সিন্ধিয়াদের বিশ্বাসঘাতকতার জন্যই ঝাঁসির রানির বীরত্ব হেরে গিয়েছিল ব্রিটিশদের কাছে। তারা ইচ্ছাকৃত ভাবেই একটি দুর্বল ঘোড়া সরবরাহ করেছিল রানিকে, যাতে তিনি সহজেই ব্রিটিশদের হাতে বন্দি হয়ে যান। ফুলবাগ এলাকায় অত্যন্ত অনাড়ম্বরভাবে রক্ষিত এই মহীয়সী রানির সমাধি। রেলস্টেশন থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যেই অবস্থিত এই সমাধিস্থল। সেখানে প্রস্তর ফলকের ওপর লেখা, ‘‘জ্যোতি জ্বালাই আজাদি কি/দে কর কে কুরবানি/যুগ যুগ তক ইতিহাস কহেগা/তেরি শৌর্য কি কহানি।’’  ২৪ ঘণ্টা জ্বলছে ‘অমরজ্যোতি’, ঝাঁসির রানির অমর বীরত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে।

এই শহর হল দেশের একাধিক নামজাদা শিল্পীর জন্মস্থান। তাঁদেরই একজন হাফিজ আলি খান। তাঁর পৈতৃক বাড়িতে সরোদ ঘর (সংগীত মিউজিয়াম) অবশ্যই দেখবেন। প্রাচীন বাদ্যযন্ত্রের প্রভূত সংগ্রহ রয়েছে এখানে।

কেনাকাটা

কেনাকাটার জন্য যেতে হবে পটঙ্কর বাজার। এখানে রয়েছে ট্র্যাডিশনাল মাহেশ্বরী এবং চান্দেরী শাড়ির সম্ভার। এ ছাড়াও, এখানকার ওয়াল হ্যাঙ্গিং, হাতে বোনা কার্পেট, ধাতুর তৈরি নানা হস্তশিল্প, চামড়ার পোশাক, আর গোয়ালিয়র শ্যুটিং-শার্টিং তো অত্যন্ত বিখ্যাত। 

খাবার

এখানকার নোনতা খাবার অত্যন্ত বিখ্যাত। গজক, নিমকি, গুড়ের বিভিন্ন রকমারি খাবার, বিভিন্ন রকমের চাট অবশ্যই খেয়ে দেখবেন।

tansen tomb
তানসেনের সমাধি।

উৎসব

আকবরের অত্যন্ত প্রিয় সভাসদ তানসেনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হয় তানসেন সংগীত সমারোহ। তানসেনের সমাধিস্থলে চার দিন ধরে চলা এই অনুষ্ঠানে দেশের প্রতিটি রাজ্য থেকে নামজাদা শিল্পীরা হাজির হন। কাজেই ডিসেম্বর মাসে এলে এই অনুষ্ঠানে দেখতে ভুলবেন না। আগে থেকে ইন্টারনেটে অনুষ্ঠানের দিন দেখে যাত্রা করলে বাড়তি পাওনা হিসেবে দেশের বেশ কয়েক জন নামজাদা শিল্পীর অনুষ্ঠান সামনে থেকে দেখার অভিজ্ঞতা হয়ে যেতে পারে।

কী ভাবে যাবেন

রাজধানী দিল্লি থেকে গ্বালিয়রের দূরত্ব ৩৪৩ কিলোমিটার, ট্রেনে পাঁচ-ছ’ ঘণ্টা। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত দিল্লি থেকে অজস্র ট্রেন। আর হাওড়া থেকে গ্বালিয়রের দূরত্ব ১২৮৫ কিলোমিটার। চম্বল এক্সপ্রেসে লাগে প্রায় ২৪ ঘণ্টা। ১২১৭৫ চম্বল এক্সপ্রেস ছাড়ে মঙ্গল, বুধ, ও রবি এবং ১২১৭৭ চম্বল এক্সপ্রেস শুক্রবারে। সপ্তাহে চার দিনই বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে হাওড়া থেকে ছাড়ে। 

কোথায় থাকবেন

এখানে সব রকম পর্যটকদের জন্যই হোটেল রয়েছে। বাজেট হোটেল থেকে পাঁচতারা হোটেল সবই রয়েছে। এ সব হোটেলের সন্ধান পাবেন makemytrip, goibibo, trivago, cleartrip, holidayiq  ইত্যাদি ওয়েবসাইট থেকে। আগে থেকে বুক করে রাখলে অনেক হোটেল কর্তৃপক্ষই স্টেশনে গাড়ি পাঠিয়ে দেন।

এ ছাড়াও এমপি পর্যটনের ‘তানসেন রেসিডেন্সি’ও রয়েছে। অনলাইন বুকিং www.mptourism.com ।  

 

 

0 Comments
Share
does-snowfall-really-occurs-in-daringbadi
শ্রয়ণ সেন

শুরু হয়েছিল সেপ্টেম্বরেই। সময়ের বরফে ঢেকে গিয়েছিল হিমাচলের লাহুল-স্পিতি। তার পর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ। তুষারপাতে ঢেকে গেল কেদার-বদরী। ডিসেম্বরের শুরুতেই বরফ পড়ল শিমলায়। গত দশ বছরে বড়োদিনের এত আগে বরফ দেখেনি শিমলা। এর কিছু দিনের মধ্যেই দার্জিলিং, সিকিম, ভুটান। ‘ফেটাই’-এর প্রভাবে প্রবল তুষারপাত হল সান্দাকফুতে। সাদা হয়ে গেল ছাঙ্গু হ্রদ। বরফের আনন্দে একদিনের ছুটি ঘোষণা করল ভুটান সরকার। সময়ের আগেই এ বার বরফ পাচ্ছে হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চল।

স্বভাবতই অনেক মানুষের মধ্যেই প্রশ্ন জেগেছে, ওড়িশার দারিংবাড়িতে কি এ বার তুষারপাত হবে? সোশ্যাল মিডিয়ায় কান পাতলেই দেখা যাচ্ছে, অনেক মানুষের প্রশ্ন। দারিংবাড়িতে বরফ পড়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছেন তাঁরা।

এ রকম পোস্টই ছড়িয়ে পড়ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।

দারিংবাড়ি। সমুদ্রতল থেকে তিন হাজারের ফুটের কিছু বেশি উচ্চতায় অবস্থিত এই জায়গাটি ওড়িশার কাশ্মীর হিসেবে পরিচিত। ইদানীং পর্যটকদের, আরও পরিষ্কার করে বললে, বাঙালি পর্যটকদের কাছে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এই দারিংবাড়ি।

দক্ষিণ ওড়িশার কন্ধমল জেলায় অবস্থিত এই শৈলশহর। একটা সময় ছিল, যখন মাওবাদীদের দাপট ছিল এই অঞ্চলে। তাই ওড়িশা পর্যটনের একটা পান্থনিবাস থাকলেও, ধীরে ধীরে পর্যটকের অভাবে সেটা বন্ধ হয়ে যায়। তার পর মাওবাদীদের দাপট কমলে আবার দারিংবাড়ির রমরমা। এ বার আরও জোরদার। দারিংবাড়িকে পর্যটনের মানচিত্রে নিয়ে আসার জন্য অনিল সোয়েনের অবদানও কম কিছু নয়। তিনিই এখানে ইকো হোম তৈরি করেন। দারিংবাড়ি জনপদের একটু বাইরে অবস্থিত এই ইকো হোম থেকে সামনের উপত্যকাটি বেশ লাগে। পর্যটক সমাগম বাড়তে শুরু করায় এখন আরও দু’একটি হোটেল তৈরি হয়েছে বাজার সংলগ্ন এলাকায়। ওড়িশা ইকো ট্যুরিজম দফতরও একটি সুন্দর রিসোর্ট তৈরি করেছে এখানে।

সুতরাং এ সব থেকেই বোঝা যায় দারিংবাড়ি ঠিক কতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

এ বার আসা যাক মূল বক্তব্যে। দারিংবাড়িতে সত্যিই বরফ পড়ে? সেই সত্যিটা উদ্ঘাটন করার জন্য এটি লেখা। ব্যাপারটা এ বার বিশ্লেষণ করা যাক।

দারিংবাড়ির ইকো হোম থেকে।

প্রথমেই বলা যাক দারিংবাড়িতে তুষারপাত হয় না। অতীতে কোনো দিনই দারিংবাড়িতে বরফ পড়েনি, আর ভবিষ্যতেও পড়বে না। তা হলে বরফ পড়ার প্রসঙ্গ আসছে কেন?

এটা স্রেফ সংবাদমাধ্যমের একটা অংশের তৈরি করে দেওয়া বিভ্রান্তি। যে বিভ্রান্তিতে সওয়ার হয়ে সাধারণ পর্যটকও বিশ্বাস করেন এখানে বরফ পড়ে।

দারিংবাড়িতে তুষারপাত হয় না, কিন্তু শীতকালে মাঝেমধ্যে যেটা হয় তা হল গ্রাউন্ড ফ্রস্ট। অর্থাৎ, প্রবল ঠান্ডায় রাতে পড়া শিশিরই ভোরের দিকে জমে বরফ হয়ে যায়। ভোরবেলায় সাধারণ মানুষ ঘুম থেকে উঠেই খেলায় করেন মাঠঘাটে সাদা বরফের একটা আস্তরণ তৈরি হয়ে গিয়েছে। প্রতি বছরই এই ঘটনাটি ঘটে। এ বছর জানুয়ারির ২৭-২৮ তারিখেও এমন ভাবেই বরফের আস্তরণ দেখা গিয়েছিল।

গ্রাউন্ড ফ্রস্ট এবং তুষারপাতের মধ্যে পার্থক্য কী?

তুষারপাত হতে গেলে প্রাথমিক ভাবে যেটা দরকার তা হল মেঘ এবং বৃষ্টি। বৃষ্টির পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলে, কোনো ভাবেই তুষারপাত হবে না। অন্য দিকে গ্রাউন্ড ফ্রস্টের জন্য দরকার পরিষ্কার আকাশ, জম্পেশ ঠান্ডা।

এ ভাবেই গাছের ওপরে পড়া শিশির জমে বরফ হয়ে যায় দারিংবাড়িতে।

বেসরকারি আবহাওয়া সংস্থা ওয়েদার আল্টিমার কর্ণধার রবীন্দ্র গোয়েঙ্কা বলেন, উত্তর এবং মধ্য ভারত যখন প্রবল শৈত্যপ্রবাহের কবলে পড়ে, তার প্রভাব আসে দারিংবাড়ির ওপরেও। তাঁর কথায়, “ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দারিংবাড়ির সর্বনিম্ন তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রির কাছাকাছি চলে যাওয়া কোনো ভাবেই অস্বাভাবিক নয়। কারণ মধ্য ভারতের প্রবল ঠান্ডার প্রভাব পড়ে দারিংবাড়ি এবং সমগ্র কন্ধমল জেলা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে।” সর্বনিম্ন তাপমাত্রা শূন্যর কাছাকাছি চলে গেলেই দেখা দেবে গ্রাউন্ড ফ্রস্ট।

কখনও যদি শীতে দারিংবাড়িতে বৃষ্টির পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা হলে কোনো ভাবেই সেখানে তুষারপাত হবে না। কারণ তুষারপাত হতে গেলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রাকে পৌঁছে যেতে হবে শূন্যের কাছে আর দারিংবাড়িতে শীতে বৃষ্টি হলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কমবে তো না-ই, বরং অনেকটাই বেড়ে যাবে। কারণ বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয় বাষ্প ঢুকবে এই অঞ্চলের ওপরে।

উচ্চতাজনিত কারণ

কখনও শুনেছেন রুদ্রপ্রয়াগে বরফ পড়ছে? রুদ্রপ্রয়াগ এবং দারিংবাড়ির উচ্চতা কিন্তু প্রায় একই রকম। হিমালয়ের কোলে অবস্থান করা রুদ্রপ্রয়াগেই যদি বরফ না পড়ে, তা হলে দারিংবাড়িতে বরফ পড়ার ব্যাপারটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

এটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রবীন্দ্রবাবু বলেছেন, “দারিংবাড়ি এক হাজার মিটার উচ্চতায় অবস্থিত হলেও নিরক্ষরেখার অনেকটাই কাছে। ফলে এখানে ক্রান্তীয় বা গ্রীষ্মপ্রধান আবহাওয়ার প্রাধান্যই বেশি। সুতরাং কোনো ভাবেই এখানে তুষারপাত সম্ভব নয়।”

দারিংবাড়ির ইকো হোমের কটেজগুলি।

তা হলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? দারিংবাড়িতে তুষারপাত হয় না। কিন্তু মাঝেমধ্যে গ্রাউন্ড ফ্রস্ট দেখা দেয়। তাই তুষারপাতের আকাঙ্খায় দারিংবাড়ি গেলে ব্যর্থ হবেন। কিন্তু আপনার ভাগ্য যদি অত্যন্ত ভালো হয়, তা হলে কড়া শীতের কোনো এক ভোরে দেখবেন আপনার ঘরের বাইরে শিশির জমে বরফ হয়ে গিয়েছে। এটাই দারিংবাড়ির সৌন্দর্য।

0 Comments
Share
a-visit-to-maccluskieganj

writwick das
ঋত্বিক দাস

ইংরেজ সরকারের হাতে ভারত তখন বন্দি৷ শুধু শাসন করাই নয়, এই দেশের সম্পত্তি বিদেশে রফতানি করে কী ভাবে ফুলেফেঁপে উঠতে হয় তা ব্রিটিশকর্তারা তখন ভালোই জেনে গিয়েছেন৷ ব্রিটিশ সরকার খোঁজ পেল ছোটোনাগপুর অঞ্চলের খনিজ সম্পদ আর দামোদরের উপত্যকায় ছড়িয়ে থাকা কয়লা-সহ বিভিন্ন খনিজ দ্রব্যের ভাণ্ডার৷ সেই সম্পদ বিদেশের মাটিতে পৌঁছে দিতে পারলেই পকেট আরও ফুলেফেঁপে উঠবে৷

আরও পড়ুন ‘লাল কাঁকড়ার দেশ’- তাজপুর

কিন্তু বাধ সাধল ছোটোনাগপুরের গভীর জঙ্গল৷ এত সম্পদ এই জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পরিবহণ করে কলকাতা বন্দরে আনা কী ভাবে সম্ভব? পরিকল্পনা হল, জঙ্গল কেটে রেলপথ তৈরি করার৷ কলকাতা-দিল্লি রেলপথের গোমো স্টেশন৷ সেখান থেকে ডালটনগঞ্জ দিয়ে লাইন নিয়ে যাওয়ার কাজ শুরু হল৷ রেললাইনের স্লিপার করতে বহু গাছ কাটা পড়ল৷ স্লিপার তৈরির বরাত দেওয়া হল কলকাতার কিছু ঠিকাদারকে৷

evening coming in maccluskieganj
শেষ বিকেলে ম্যাকলুস্কিগঞ্জ।

এক বার এমনই রেলের কাজের দায়িত্ব নিয়ে এলেন আর্নেস্ট টিমোথি ম্যাকলুস্কি নামে এক কলকাতাবাসী এক ব্রিটিশ ব্যবসায়ী৷ ম্যাকলুস্কি সাহেবের জায়গাটা বেশ ভালো লেগে গেল৷ তখন ওই অঞ্চলে লাপড়া, কঙ্কা ও হেসাল, এই তিনটি জঙ্গলময় বসতি ছিল৷ পরিবেশটা পুরো বিলেতের মতো৷ সারা বছরই ঠান্ডা আবহাওয়া৷ পাহাড়ে ঘেরা, অরণ্যে মোড়া এক মনোরম জায়গা, গোটা পরিবেশটাই যেন বিলেতের একটা ছোটো সংস্করণ৷

ম্যাকলুস্কি সাহেব জায়গাটির প্রেমে পড়ে গেলেন এবং এখানেই স্থায়ী ভাবে বসতি গড়লেন৷ পাশাপাশি বন্ধু আত্মীয়পরিজনকে এখানে এসে থাকার আহ্বান জানালেন৷ সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বেশ কিছু পরিবার এখানে এসে বসতি স্থাপন করলেন৷

আরও পড়ুন কুমারী সৈকত চাঁদপুরে একটা দিন

ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ইংল্যান্ডকে কোণঠাসা করে ফেলল। ইংল্যান্ডের অর্থনীতি ক্রমশ ভেঙে পড়তে লাগল। তার প্রভাব এসে পড়ল এ দেশে অ্যাংলো সাহেবদের ওপর৷ ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো এ দেশে একের পর এক অ্যাংলো সাহেবকে কর্মচ্যুত করতে লাগল তুচ্ছ অজুহাতে৷ এই সময় বহু অ্যাংলো কাজ হারালেন৷ তাঁরা ঠিক করলেন এই ঘটনা তাঁরা ব্রিটেনে গিয়ে মহারানিকে সরাসরি জানাবেন৷ এতে ঘোরতর বিপদ বুঝে ব্রিটিশ সরকার অ্যাংলোদের ব্রিটেনে যাওয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করল৷

another view from watchtower
ওয়াচটাওয়ার থেকে আরও দৃশ্য।

এমনিতেই অ্যাংলোদের কোনো স্থায়ী জায়গা ছিল না ভারতে, তার ওপর কর্মচ্যুত হওয়ার পর তাদের প্রতিবাদ ভাবিত করে তুলল ব্রিটিশ সরকারকে৷ সরকার প্রমাদ গনল। অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে সমঝোতা করতে রাজি হল৷ ডেকে পাঠানো হল  ম্যাকলুস্কি সাহেবকে৷ তিনি এসে এই জায়গার (আজকের ম্যাকলুস্কিগঞ্জ) কথা সবাইকে বলেন৷ তিনি অ্যাংলোদের বোঝালেন, “চলো, কাছেই আমাদের বিলেতের মতো একটি গ্রাম আছে। সেখানে আমরা সবাই মিলে বসতি স্থাপন করে তাকে ইংল্যান্ডের রূপের পরিপূর্ণতা দিই।”

১৯৩৩-এ তৈরি হল কলোনাইজেশন সোসাইটি অব ইন্ডিয়া। ঠিক হল, এই সমবায়ে অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা শেয়ার কিনলে তাদের এক টুকরো করে জমি দেওয়া হবে। ভারতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় দু’ লক্ষ অ্যাংলো ইন্ডিয়ানকে এই অঞ্চলে বসতি গড়ার জন্য আহ্বান জানালেন ম্যাকলুস্কি।

আরও পড়ুন বিশ্বনাথের বারাণসী, বারাণসীর বিসমিল্লাহ

ম্যাকলুস্কি সাহেবের ডাকে সাড়া দিয়ে প্রায় ৪০০ অ্যাংলো পরিবার এই স্থানে পাকাপাকি ভাবে বসতি স্থাপন করে৷ ১৯৩৪ সাল নাগাদ রাতু মহারাজের কাছ থেকে লাপড়া, কঙ্কা ও হেসাল, এই তিনটি অঞ্চল দান হিসেবে চেয়ে নিলেন ম্যাকলুস্কি সাহেব৷ রাতু মহারাজ সেই আবদারে রাজি হয়ে অঞ্চল তিনটি ম্যাকলুস্কি সাহেবকে দান করলেন৷ ম্যাকলুস্কি সাহেবের নামে নাম হল ম্যাকলুস্কিগঞ্জ৷ অনেক অ্যাংলো স্কুল এখানে গড়ে উঠল৷ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অ্যাংলো ছেলেমেয়েরা এই সব স্কুলে পড়তে এল৷ তাদের থাকার জন্য অনেক হোস্টেল তৈরি হল৷ ব্রিটিশরা ম্যাকলুস্কিগঞ্জকে ঝাড়খণ্ডের স্কটল্যান্ড বলেও ডাকত৷ আজও অনেকে এই স্থানটিকে ‘স্কটল্যান্ড অব ঝাড়খণ্ড’ বলে ডেকে থাকেন৷

dugadagi
ডুগাডগি।

তবে অ্যাংলোদের বসতি স্থাপন সুখের হয়নি৷ তাদের সঙ্গে স্থানীয় আদিবাসীদের সম্পর্ক ক্রমশ খারাপের দিকে এগোতে থাকে৷ আদিবাসীরা নিজেদের পুরোনো জায়গায় কেমন যেন পর হয়ে গেল৷ অ্যাংলোদের কাছে তারা চাকরের মতো হয়ে গেল৷ গাছের ফলে হাত দিলে জুটত অপমান, এমনকি কখনও মারও৷ একই জায়গায় থেকেও নিজেদের মধ্যে মেলামেশা করতে পারত না আদিবাসীরা৷ সব সময় সাহেবরা বন্দুক নিয়ে ঘুরত আর তাদের ওপর নজর রাখত৷ এমন অবস্থায় আদিবাসীরা ক্রমশ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে৷ যার ফলস্বরূপ স্বাধীনতা লাভের পর বহু অ্যাংলো পরিবারকে ম্যাকলুস্কিগঞ্জ ছাড়তে হল।

এর পরও বেশ কিছু অ্যাংলো পরিবার এখানে থেকে গেল নিজেদের জমি আঁকড়ে। পরবর্তীকালে তাদের উত্তরসূরিরাও একে একে পাড়ি জমাল বিদেশে রোজগারের সূত্রে৷ ক্রমশ সাহেবদের বাড়িগুলো পরিত্যক্ত হতে শুরু করল৷ সেগুলো পরে স্থানীয় ক্ষমতাশালী মানুষজন ও ব্যবসায়ীরা নেন৷ কিছু অ্যাংলো পরিবার অবশ্য এই অঞ্চলেই নিজেদের বাড়িতে থেকে গেল৷

আরও পড়ুন তারাপীঠকে ‘বুড়ি’ করে

সত্যি কথা বলতে কি বাঙালির কাছে ম্যাকলুস্কিগঞ্জকে পরিচিত করেছেন সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ৷ যথারীতি আমারও এই জায়গাটার প্রতি আকর্ষণ ছিল। আমার সেই আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিল আমার এক ছোটো ভাই সৌম্যদীপ মণ্ডল। শেষ পর্যন্ত নভেম্বর মাসের ২৩ তারিখে উঠে পড়লাম ট্রেনে৷

প্রথম বার গিয়েই প্রেমে পড়ে গেলাম ম্যাকলুস্কিগঞ্জের৷ তবে এখানে ‘এলাম দেখলাম আর জয় করলাম’, এমন মনোভাব নিয়ে এলে নিরাশই হতে হবে৷ এখানে দু’টো দিন হাতে নিয়ে আসতে হবে৷ আর প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার ইচ্ছা থাকলেই এখানে আসা সার্থক৷ এখানে সে ভাবে কোনো ট্যুরিস্ট স্পট নেই৷ শুধু ভোরের সুর্য ওঠা থেকে শুরু করে বিকেলের সুর্যাস্ত পর্যন্ত রেললাইনের পাশ দিয়ে কিংবা মেঠো রাস্তা দিয়ে প্রকৃতিকে আপন করে ঘুরে বেড়ানো৷

আসলে সত্যিকারের প্রকৃতিপ্রেমিকদের কাছে আদর্শ জায়গা এই ম্যাকলুস্কিগঞ্জ। লাল কাঁকুড়ে পথঘাট, আশেপাশে সাহেবদের কটেজ৷ দূরে অরণ্য ও পাহাড়ের হাতছানি৷ পূর্ণিমার রাতে মায়াবী রূপ ধরে প্রকৃতি৷ বসন্তে পলাশ, শিমুলের সঙ্গে জাকারান্ডায় ছেয়ে যায় চারি দিক৷ সেই রূপ আরও মোহময়ী৷ এক অপার্থিব নিস্তব্ধতায় হিমেল হাওয়ার স্পর্শ৷ দিনের বেলায় শুধুই পাখির কুজন।

view from watchtower
ওয়াচটাওয়ার থেকে।

ম্যাকলুস্কিগঞ্জের আশেপাশে কিছু জায়গা আছে যেগুলোকে যুক্ত করে একটা সুন্দর ট্রিপ হতে পারে৷ এই প্রসঙ্গে প্রথমেই আসি ওয়াচটাওয়ারের কথায়৷ স্টেশন থেকে প্রায় আড়াই কিমি দূরে ছোটো একটি টিলার টঙে এই ওয়াচ টাওয়ার। সেখান থেকে গোটা অঞ্চলটিকে ছবির মতো দেখায়৷ ১৮০ ডিগ্রি বৃত্তাকারে পাহাড়শ্রেণি ম্যাকলুস্কিগঞ্জকে ঘিরে রেখেছে৷

ডুলি
ডুলি উপাসনাস্থল।

চলুন, এ বার যাওয়া যাক ডুলি উপসনাস্থলে৷ স্টেশন থেকে প্রায় ন’ কিমি। হিন্দু, ইসলাম, শিখ আর খ্রিস্টান, এই চার ধর্মের এক সঙ্গে পাশাপাশি উপাসনার বেদি৷ জায়গাটি সর্বধর্ম সমন্বয়ের বার্তা বহন করে৷

duli forest
ডুলি ফরেস্ট।

ডুলির পাশেই একটি ছোটো দিঘি, নাম তার সীতাকুণ্ড৷ স্থানীয়রা এই কুণ্ডকে খুব মান্যি করে৷ রাস্তার দু’ধারে ডুলি ফরেস্ট। মাঝেমধ্যে হাতি অভিসারে আসে এই অরণ্যে৷

এখান থেকে সামান্য দুরে জাগৃতিবিহার৷ আদিবাসীদের হস্তশিল্পের সমবায়৷

Chatti river
চাট্টি নদী।

জাগৃতি বিহার থেকে কিছুটা দূরে চাট্টিনদীর পাড়৷ জায়গাটির নাম ডুগাডগি বা ডিগাডগি৷ চাট্টি ম্যাকলুস্কিগঞ্জের নিজস্ব নদী৷ দামোদর থেকে এর উৎপত্তি৷ টিলাময় এই জায়গা৷ জায়গাটায় দু’ দণ্ড বসে চার পাশের দৃশ্য বেশ সুখকর লাগে৷

রেলগেটের বাঁহাতি পথে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে দামোদর নদীর ব্রিজ৷ ব্রিজের ওপর থেকে দামোদর নদী আর চাট্টি নদীর মিলনস্থল দেখা যায়৷ এখান থেকে সূর্যাস্ত বা সুর্যোদয়ের দৃশ্যও মনোরম৷ এখান থেকে প্রায় ৫০ কিমি দূরে একটি পাহাড়ের ঝোরা থেকে দামোদরের উৎপত্তি৷

আর একটি জায়গা হল ম্যাকলুস্কি সাহেবের কবরখানা৷

এ ছাড়া চলতে ফিরতে অসংখ্য হোস্টেল রয়েছে জায়গাটিকে ঘিরে৷ এক সঙ্গে এত হোস্টেল খুব কম জায়গায়ই দেখা যায়।

দুপুরের খাওয়াদাওয়া করে বেরিয়ে পড়ুন। ৮০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে রফা করে গাড়ি বা অটো নিয়ে ঘুরে আসুন। সন্ধে নামার আগেই হোটেলে ফিরে আসা যায়৷ তবে সব সময় সন্ধের অন্ধকার নামার আগে গেস্টহাউসে ফিরে আসা ভালো৷

এ ছাড়াও ম্যাকলুস্কিগঞ্জকে কেন্দ্র করে ঘুরে আসতে পারেন ৫০ কিমি দুরের লাতেহারের জঙ্গল থেকে৷

পাহাড়, জঙ্গল, স্থাপত্য, নদী সব মিলিয়ে ম্যাকলুস্কিগঞ্জ এক স্বয়ংসম্পূর্ণ জায়গা৷ সপ্তাহান্তে দু’-তিন দিন হাতে নিয়ে এখানে ঘুরে আসতে পারলে সেটা জীবনের একটা স্মৃতি হয়েই থাকবে৷

যাওয়া 

হাওড়া থেকে রাঁচিগামী ট্রেনে রাঁচি পৌঁছে সেখান থেকে গাড়িতে প্রায় ৬৪ কিলোমিটার দুরে ম্যাকলুস্কিগঞ্জ৷ এ ছাড়া হাওড়া থেকে সরাসরি শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেস ম্যাকলুস্কিগঞ্জ পৌঁছে দেয় রাত পৌনে ১১টায়৷ হোটেল/গেস্টহাউসে বলে রাখলে তারা স্টেশনে গাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করে৷ তবে হাওড়া থেকে রাতের ট্রেন ধরে সকালে রাঁচি পৌঁছে সেখান থেকে ম্যাকলুস্কিগঞ্জ যাওয়াই ভালো।

maccluskieganj station
ম্যাকলুস্কিগঞ্জ স্টেশন।

থাকা 

ম্যাকলুস্কিগঞ্জ গিয়ে দিন দুয়েক থাকতেই হবে৷ থাকার জন্য সব চেয়ে উপযুক্ত হল গর্ডন গেস্টহাউস৷ ফোন নম্বর: ০৯৮৩৫৭৭০৬৭৯/৯৪৭০৯৩০২৩০৷ এ ছাড়া আছে মাউন্টেন হলিডে রিসর্ট৷ ফোন নম্বর: ২৭৬৩৫৭/৭৭৩৯০৮৯০৫২

Gordon guest house
গর্ডন গেস্ট হাউস।

খাওয়া

যে গেস্টহাউসে থাকবেন সেই গেস্টহাউসে বলে রাখলে তারা দুপুর বা রাতের খাবারের ব্যবস্থা করে দেয়৷ এ ছাড়া বাইরে অনেক খাবারের হোটেল আছে৷ তাদের বলে রাখলে আপনার পছন্দসই খাবারের ব্যবস্থা করে, এমনকি গেস্টহাউসে পৌঁছেও দেয়৷ স্টেশনের সামনে সুরেশের শিঙাড়ার স্বাদ নিন৷ আর স্টেশনের বাইরেই এক জন চাউমিন বানান, স্বাদ খুব ভালো৷ এ ছাড়া ম্যাকলুস্কিগঞ্জের তেলেভাজা, কচুরি, জিলিপি ও চাল দিয়ে তৈরি ধোস্কার স্বাদ নিতে ভুলবেন না৷

ঘোরাফেরা

auto available in station
স্টেশনেই মিলবে অটো।

স্টেশন থেকেই অটো পেয়ে যাবেন৷ গেস্টহাউস থেকেও অটো বা গাড়ির ব্যাবস্থা করা হয়৷ অটোর জন্য যোগাযোগ করতে পারেন সুখেন্দ্র মুন্ডার সঙ্গে, ফোন নম্বর: ৮৫২১৪৫৩৫৪০

ছবি লেখক
0 Comments
Share
a-visit-to-varanasi-of-bismillah-khan

jahir raihan
জাহির রায়হান

‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ অর্থাৎ শুরু সেই দয়া পরবেশ ক্ষমাশীল খোদাতলার স্মরণ করে। ইসলাম মতে ‘বিসমিল্লাহ’ শব্দের গুরুত্ব অপরিসীম। যে কোনো শুভ কাজের শুরুয়াৎ, এমনকি খাদ্যগ্রহণের সময়ও নিষ্ঠাভরে খোদাকে স্মরণ করা হয় ‘বিসমিল্লাহ’ উচ্চারণে, নিয়মিত। আবার রোজকার ব্যবহারিক জীবনে কোনো কাজ শুরুতেই বিফল হলে বলা হয় বিসমিল্লায় দ। অর্থাৎ সূচনাতেই গলদ।

যতখানি সময় সোশ্যাল মিডিয়াতে ব্যয় করেছি অদ্যাবধি তার কিয়দাংশ অনন্য উপহার হয়ে ফিরে ফিরে আসছে ইদানীং। এমনই এক উপহার শ্রীঅসীম মৌলিক। অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্ককর্মী, পাশের জেলা নদিয়ার মানুষ, এখন কলকাতাবাসী। চাক্ষুষ আলাপ নেই এখনও, ফোনালাপ হয়েছে বারকয়েক, তাঁর কন্ঠের উষ্ণতায় অনুভব করেছি তিনি আমায় স্নেহ করেন বড়ো দাদার মতো। ব্যক্তিজীবনে আমি পরিবারের প্রথম সন্তান, বড়োদাদা বা বড়োদিদির অভাব এবং তাঁদের সান্নিধ্যের একটা নিভৃত আকাঙ্ক্ষা নিরন্তর কাজ করে আমার অন্তরে। তাই বড়দা-তুল্য অসীমবাবুর উষ্ণতার আঁচে হৃদয়ে মন-কেমন-করা ভালো-লাগা বাসা বাঁধে, বুঝি আমি। অসীমবাবু বেনারস ভ্রমণের কথা শুনে যখন বলেন, “ভাই জাহির, বেনারস কিন্তু শুধু বাবা বিশ্বনাথের নয়, বেনারস বিসমিল্লাহ খান সাহেবেরও, আমার ইচ্ছে তুমি একবার ওনার বাসায় যাও, শ্রদ্ধা জানিয়ে এসো, তোমার কলমে ওনার প্রতি তোমার অনুভূতি আমি অনুধাবন করতে আগ্রহী”, বিশ্বাস করুন আমি কুন্ঠিত হয়ে পড়ি এমন মরমি প্রত্যাশায়।

আরও পড়ুন জলসাঘরের করুণ সুরে নিমতিতা রাজবাড়ি

আমার যে খানকতক শুভাকাঙ্ক্ষী পাঠকবন্ধু রয়েছেন, তাঁরাও জেনে গেছেন ইত্যবসরে, যে আমি মূলত পথিক, পথ চলতেই ভালোবাসি। বেনারসের গলি, তস্য গলি এবং অলিগলি পদ সঞ্চালনে ঘোরার চক্করেই আমি আর বন্ধু শিবাজির বেনারস যাত্রার পরিকল্পনা। এটা জেনেই অসীমবাবুর আন্তরিক ফরমায়েস আর আমার উচ্চচাপের সূত্রপাত। এমন নয় যে বিসমিল্লাহ খান সাহেবের নাম শুনিনি ইতিপূর্বে, শুনেছিলাম, ধরে রাখতে পারিনি আসলে, পড়েছিলাম বিশ্বনাথ মন্দিরের কোনো একটি অনুষ্ঠানের সূচনা খানসাহেবের সানাই পরিবেশন বিনা ছিল অসম্ভব অথবা অনুষ্ঠানের সমাপ্তি পর্যায়, তাঁরই সানাইয়ের মূর্ত মূর্ছনায়। শুধু সেই জানাটুকু ভর করে দাদাকে কথা দিলাম, যদিও রাগ, সংগীত ও সানাইয়ের সমঝদার শ্রোতা নই আমি, তবুও একবার চোখ মেলে আসব সেই উর্বর অঙ্গনে যেথায় একদা হুটোপুটি করেছেন আজকের ভারতরত্ন ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান।

road named after bismillah khan
ভারতরত্ন উস্তাদ বিসমিল্লা খাঁ মার্গ।

শীতের এক সকালে গঙ্গাস্নান সেরে রওনা দিলাম ওস্তাদজির ভিটের পানে। নয়াসড়ক থেকে যে রাস্তাটি চলেছে সানাই-সম্রাটের বাড়ির পথে, তার নাম ‘ভারতরত্ন উস্তাদ বিসমিল্লা খাঁ মার্গ’। নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে বোঝা গেল ঘোরাঘুরির সময় বহু বার এ রাস্তার আশেপাশে এসেছি, শুধু বোঝা যায়নি এ অঞ্চলেই তাঁর আবাস। এলাকাটি দশাশ্বমেধ ঘাট হতে সর্বাধিক মিনিট পনেরোর হাঁটাপথ। রাস্তা হতে একটি গলি ধরে কিছুটা এগিয়েই এক দুধসাদা দোতলা বাড়ির সম্মুখে উপস্থিত, সন্নিবিষ্ট লেটারবক্স ওস্তাদ নায়ের হুসেন খানের নামে, ঠিকানা – সি কে ৪৬/৬২, সারাই হারাহা, বারাণসী। ছবি তোলার দ্বিধায় যখন দ্বিধান্বিত, এক কিশোর দরজা খুলে আহ্বান জানাল। উন্মুক্ততার আলোয় নজরে এল ঘরের দেওয়াল জুড়ে নানান আলোকচিত্রের প্রদর্শনী, এক ভদ্রলোক ব্যস্ত রয়েছেন সেগুলির যত্নে। পরবর্তী চল্লিশ মিনিট এমনই নিরুচ্চার অভিজ্ঞতার মগ্ন মূহূর্ত, যা সহসা আসে না জীবনাকাশে।

letterbox on bismillah's house
লেটারবক্স ওস্তাদ নায়ের হুসেন খানের নামে।

জুতো পায়ে প্রবেশের অনুমতি রইলেও মনের সায় ছিল না। তাই জুতো রইল বাইরে, অদ্ভুত এক অজ্ঞাত আবেশে প্রবেশ করলাম ওস্তাদজির বৈঠকখানার অন্দরে, যার প্রতিটি অংশে বর্তমান ভারতরত্নের স্পর্শময়তার অদৃশ্য অস্ত্বিত্ব। পুরোনো একটি চৌকি, একটি দিন-যাওয়া সোফা, খানদুই গদিআঁটা চেয়ার আর ঘরময় ফ্রেমবন্দি ওস্তাদজির জীবনবোধের নানান সোনালি সফর। আলাপ হল বিসমিল্লাহ সাহেবের নাতি ওস্তাদ নাসির আব্বাস খানের সঙ্গে। আমার মা বলেন, বাচনভঙ্গি আর তার লয়েই ধরা পড়ে পারিবারিক শিক্ষাদীক্ষা ও রুচিশীলতা। আব্বাস সাহেবের কথামালায় সেই ঐতিহ্যেরই আবহমান তরঙ্গ।

বাবা পয়গম্বর খান ও মা মিঠান দ্বিতীয় সন্তানকে প্রথম ডেকেছিলেন আমিরুদ্দিন নামে।  কিন্তু পিতামহ নবজাতককে দেখে উচ্চারণ করলেন ‘বিসমিল্লাহ’ আর এই ভাবেই আমিরুদ্দিন হয়ে গেলেন বিসমিল্লাহ খান। তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন বিহারের ডুমরাঁও রাজ্যের রাজ-সংগীতজ্ঞ। সংগীতগুরু প্রয়াত আলী বকস্ বিলায়াতু, সম্পর্কে ওস্তাদজির মামা, যিনি ছিলেন  বিশ্বনাথ মন্দিরের প্রখ্যাত সানাইবাদক। প্রাত্যহিক জীবনে একজন অত্যন্ত ধার্মিক শিয়া মুসলিম হলেও ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান সাহেব জ্ঞান ও সংগীতের দেবী সরস্বতীরও আরাধনা করতেন সুনিপুণ নিষ্ঠায়।

আরও পড়ুন ওখরে-হিলে-ভার্সে, যেন মেঘ-বালিকার গল্প

তাঁর সাংগীতিক নিষ্ঠা, তাঁর জীবনবোধ ছিল বহতা গঙ্গার মতোই সাবলীল, পবিত্র। তাঁর সংগীত ও বেনারসী গঙ্গা যেন একে অপরের পরিপূরক, আত্মজ। বেনারসের অলিগলি, আকাশ-বাতাস, ধূলিকণা, পথপ্রান্তর সবই ছিল ওস্তাদজির বড় আপনজন। রামনগর রাজবাড়ির দিগন্ত থেকে কখনও বা মেঘ জমছে আকাশে, একটু একটূ করে কালোয় ছেয়ে যাচ্ছে বেনারসের নীলাকাশ। গঙ্গার ওপর দিয়ে বইছে আসন্ন বৃষ্টির পূর্বাভাস, নদীতে ভাসমান পল্টন ব্রিজে লাগল দোলা সেই প্রবাহী পবনের মৃদু সংঘাতে। অনুভবে ওস্তাদেরও মন ছুঁয়ে গেল মেঘবালিকার আকুতি, তার ঝরে পড়ার অভিপ্রায়ে ওস্তাদের হৃদয় হতেও হয়তো উৎসারিত হল সুর, উঠল ঝড় তাঁর সংগীত-মননে। মেঘমল্লারের সুরমূর্ছনায় মুখরিত হতে থাকল তাঁর প্রিয় বেনারস। নিশি কালো মেঘ কখন যেন তরল হয়ে অবিশ্রান্ত বৃষ্টিধারায় ঝরতে থাকল ধরণীর বুকে, স্নিগ্ধ শীতল হল খানসাহেবের বাসভূমি। এক দিকে প্রকৃতির খেয়ালি সুর, গঙ্গার সঙ্গে বৃষ্টির জলকেলির সুখশ্রাব্য ধ্বনি, অন্য দিকে সানাইয়ের হৃদয়লালিত সঙ্গত, একাত্ম হয়ে সৃষ্টি করল এক অদ্ভুত সুরেলা জগৎ, যাঁর অধীশ্বর স্বয়ং ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান, যাঁর ভিটেতে আমরা দুই বঙ্গবাসী, আত্মবিভোর হয়ে।

photos on bismillah's life
ঘরময় ফ্রেমবন্দি ওস্তাদজির জীবনবোধের নানান সোনালি সফর।

সানাইকে ভারত তথা বিশ্বমঞ্চের উচ্চাঙ্গসংগীত জগতের কৌলিন্যে এক অমূল্য বাদ্যযন্ত্র রূপে প্রতিষ্ঠিত করার একক কারিগর তিনি। ১৯৩৭ সালে কলকাতায় অল ইন্ডিয়া মিউজিক কনফারেন্সে সানাই বাজিয়ে একে ভারতীয় সংগীতের মূল দরবারে দেন প্রতিষ্ঠা।  ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট, স্বাধীনতার স্বাদে উদ্বেল ভারতবাসীর সামনে লালকেল্লায় সানাইবাদনের বিরল কৃতিত্ব তাঁরই। ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০, ওই লালকেল্লাতেই পালিত ভারতের প্রথম প্রজাতন্ত্র দিবসে তাঁর অন্তরের মাধুরী ঢেলে রাগ কাফি পরিবেশন, মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করেছিল তামাম স্বাধীন ভারতসন্তানকে। তাঁর সুযোগ্যতার নিরিখে সানাই এবং ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান প্রায় সমার্থক। দূরদর্শনের স্বাধীনতা দিবসের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সেথায় তাঁর সানাইয়ের সংগত এক অবিচ্ছেদ্য শ্রুতিময়তার বৈভব। লালকেল্লায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পর পরই ভারতীয় দূরদর্শনে সানাইগুরুর মেহফিল সম্প্রচারিত হত সরাসরি। পণ্ডিত নেহরুর সময় হতেই তরঙ্গিত এই  রাগ পরম্পরা।

আফগানিস্তান, ইউরোপের নানা দেশ, ইরান, ইরাক, কানাডা, পশ্চিম আফ্রিকা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, জাপান, হংকং-সহ পৃথিবীর প্রায় সকল দেশই আন্দোলিত হয়েছে ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান সাহেবের সাংগীতিক পরশে। রিপাবলিক অফ ইরান প্রদান করেছে সে দেশের সংগীত বিষয়ক শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। নিজ দেশ আপন করে নিয়েছে তাঁকে ‘ভারতরত্ন’ হিসেবে। এ ছাড়াও দেশবিদেশ থেকে পেয়েছেন অজস্র সম্মান। তাঁর বাঙালি-যোগও আছে বই-কি, কাজ করেছেন সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসাঘরে’।

আরও পড়ুন এক টুকরো ইতিহাস – বাণগড়

এত সুনাম এবং অর্জন সত্ত্বেও অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন খানসাহেব। সব সময়ই রইতেন বারাণসীর পুরোনো পৃথিবীর অলিন্দে। সাইকেল রিকশাই ছিল তাঁর চলাচলের মূলবাহন। অত্যন্ত অন্তর্মুখী বিনম্র এই সংগীতগুরু বিশ্বাস করতেন, সংগীত শ্রবণের বিষয়, দেখার বা দেখাবার নয়। সে কথায় বিশ্বাস রাখেন তাঁর বর্তমান প্রজন্মও। আব্বাস সাহেরের গলায় আতিথেয়তার উষ্ণতা। তিনি  চায়ের আমন্ত্রণ জানালেন। আমাদের অসম্মতিতে বললেন, “দাদাজি বলতেন, ‘আগর মেহমান আয়ে ঘর মে তো উনহে বাঠনে কা জাগা দো, ঔর কুছ নেহী মিলে তো থোড়া পিনে কা পানি দো, তুমহে ঔর মেহমান দোনো কো হি এক সকুন মিলেগা’।” আমাদের জন্য চা নিয়ে এল নাসির সাহেবের পুত্র রামিস হাসান। কথা চলতে থাকে আর আমরা বিহ্বল হতে থাকি। এত বড়ো মানুষ, এত বড়ো ঐতিহ্যের অধিকারী এক ভিটেয় বসে রয়েছি অচঞ্চল, ভাবতেই শিহরিত হচ্ছি। নাসির সাহেব জানালেন, তাঁর বাবা সানাই বাজাতেন, পরিবেশন করেন তিনি নিজেও, আমাদের অনুরোধও জানালেন কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের নানান উৎসব অনুষ্ঠান বা বিয়েশাদিতে তাঁদের আমন্ত্রণের জন্য কেননা তাঁর ইচ্ছা যে সানাইয়ের সুর তাঁর দাদাজির হাত ধরে তাঁদের পরিবারকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে, দিয়েছে সম্মান ও মর্যাদা, সেই সুরধারা প্রবাহিত হোক আগামী প্রজন্মের জীবনতরীতেও। সব চেয়ে গভীর মুহূর্ত ঘনাল সেই সময়, যখন আমি প্রস্তাব করলাম ওস্তাদজির পারিবারিক জীবন নিয়ে প্রকাশিত হোক ছোটো একটি পুস্তিকা এবং তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিয়ে বাড়িতেই গড়ে উঠুক অভিনব এক পারিবারিক সংগ্রহাগার। প্রয়োজনে আমরাও এ ব্যাপারে কায়িক শ্রমদানে উৎসাহী। এ কথা বলার সময়ই নিকটবর্তী মসজিদ হতে ভেসে এল যোহরের আজান, অদ্ভুত চাঞ্চল্যের খেলা তখন নাসির আব্বাস খানের মুখমণ্ডলে, আমার দু’ হাত জড়িয়ে ধরে তিনি বললেন, “বাতচিত কি ওয়ক্ত যব আজান কি আওয়াজ শুনাই দেতি হ্যায়, সমঝ লো খোদা ভি এহি চাহতে হ্যায়।”

২১ আগস্ট ২০০৬, ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান ইহলোক ত্যাগ করেন বারাণসীর পুণ্যভূমিতেই। গঙ্গা অন্তপ্রাণ ওস্তাদজিকে সমাহিত করা হয় পুরোনো বারাণসীর কবরস্থানে এক নিমগাছের ছায়াময়তায়, সঙ্গে দেওয়া হয় একটি সানাই, স্ত্রীর মৃত্যুর পর যে সানাইকে তিনি তাঁর ‘বেগম’ বলেই মানতেন। তাঁর নশ্বর দেহ বিলীন হয়ে গেছে প্রায় এক দশক, তবুও তিনি ভাস্বর হয়ে রয়েছেন হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির এক উজ্বল উদাহরণস্বরূপ জনমানসের মনে, মননে, আজও। বেনারসে যত দিন রইবেন বিশ্বনাথ, তত দিন রইবেন বিসমিল্লাহ আর রইবে তাঁর বিশ্বাস – “Even if the world ends, the music will still survive”

ছবি: লেখক

0 Comments
Share
sirpur-of-chattisgarh

ভ্রমণ অনলাইনডেস্ক: একটা সময় ছিল, যখন মাওবাদী সমস্যায় জর্জরিত ছিল ছত্তীসগঢ়। কিন্তু সে সব এখন কার্যত অতীত। মাওবাদীদের রমরমা অনেকটাই কমে গিয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন মানচিত্রে ছত্তীসগঢ়কে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর সে রাজ্যের সরকার। পর্যটকদের কাছে নতুন নতুন জায়গা তুলে ধরছে ছত্তীসগঢ় পর্যটন।

না, জায়গাগুলো নতুন নয়। বরং ঐতিহাসিক ভাবে এদের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু বছর তিন-চার হল পর্যটকদের কাছে ক্রমশ পরিচয় পাচ্ছে সে জায়গাগুলি। এমনই একটি জায়গা হল সিরপুর।

ছত্তীসগঢ়ে বেড়ানোর জায়গা বলতে আমরা অনেকেই বুঝি জগদলপুর, চিত্রকূট, গাংরেল ইত্যাদি, কিন্তু মহানদীর পাড়ে সিরপুর সত্যিই এক অনন্য জায়গা।

বৌদ্ধ, জৈন এবং হিন্দু ধর্মচর্চার অন্যতম পীঠস্থান ছিল সিরপুর। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত এখানে বৌদ্ধ মনাস্টেরি, জৈন এবং হিন্দু মন্দির গড়ে উঠেছিল। সাম্প্রতিক কালে খননকাজের মধ্যে দিয়ে সেগুলিকে আবার উদ্ধার করা হয়েছে। খননের পরে বেরিয়ে এসেছে ১২টি বৌদ্ধ বিহার, একটি জৈন বিহার, বুদ্ধ এবং মহাবীরের মূর্তি, ২২টি শিব মন্দির এবং ৫টি বিষ্ণু মন্দির। ভূপর্যটক হুয়েন সাং এসেছিলেন এখানে। এই সব সৌধ নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘সিরপুর গ্রুপ অফ টেম্পল্‌স।’ এ ছাড়াও সিরপুরের অন্যতম আকর্ষণ লক্ষ্মণ মন্দির এবং গন্ধেশ্বর মন্দির।

sirpur chattisgarh
মহানদী। সিরপুর।

তবে শুধুমাত্র মহানদীর ধারে হাওয়া খেলে এবং সৌধ দেখে সময় কাটালেই তো চলবে না। সাইটসিয়িং-ও তো করতে হবে। সেই সুযোগও রয়েছে আপনার কাছে। সিরপুর থেকে ৭৫ কিমি দূরেই পাহাড়ের কোলে অবস্থিত বর্নপাড়া অভয়ারণ্য। বাইসন, সম্বর, চিতল, নীলগাই, বুনো শুয়োরের দেখা মিলবে এখানে।

আরও পড়ুন সবুজ প্রকৃতি আর জলাধার নিয়ে গাংরেল

কী ভাবে যাবেন

ছত্তীসগঢ়ের রাজধানী রায়পুর থেকে ৭৮ কিমি দূরে সিরপুর। কলকাতা থেকে রায়পুর যাওয়ার একগাদা ট্রেন রয়েছে। তবে শালিমার-লোকমান্য তিলক এক্সপ্রেস গেলে দ্বিতীয় দিন সকাল সকাল রায়পুর পৌঁছোনো যাবে। সে ক্ষেত্রে বেলা দশটার মধ্যেই সিরপুর পৌঁছে যেতে পারবেন।

কোথায় থাকবেন?

হুয়েং সাং টুরিস্ট রিসর্টের ঘর

সিরপুরে থাকার সব থেকে ভালো ব্যবস্থা ছত্তীসগঢ় পর্যটনের হুয়েন সাং টুরিস্ট রিসর্টে। এসি দ্বিশয্যা ঘর ২০০০ টাকা। অনলাইনে বুক করার জন্য লগইন করুন visitcg.in-এ।

0 Comments
Share
new-road-connectiong-manali-to-kargil

ভ্রমণ অনলাইন ডেস্ক : জাঁসকার অঞ্চলের ওপর দিয়ে গাড়ি চলাচলের নতুন রাস্তা তৈরি হওয়ার ফলে মানালি থেকে কার্গিল পৌঁছে যাওয়া যাবে লেহকে বাদ দিয়েই। নতুন এই রাস্তা দিয়ে গেলে নতুন একটি জায়গা উপভোগ করার সুযোগও থাকছে আপনার কাছে।

হিমাচলের লাহুল স্পিতির দারচা থেকে কাশ্মীরের জাঁসকারের পাদুম পর্যন্ত একটি ট্রেক রুট ছিল। ১৬,৬০০ ফুট ওপরের শিঙ্কু লা পাসের ওপর দিয়ে এই ট্রেক রুটটিকে চওড়া করে গাড়ি চলাচলের যোগ্য করে তুলেছে বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশন (বিআরও)।

কেলং থেকে দারচা ৩২ কিলোমিটার। দারচা থেকে পাদুম ১৪৮ কিলোমিটার। অন্য দিকে পাদুম থেকে ২৩০ কিলোমিটার দূরে কার্গিলের সরু রাস্তাটি দিয়ে গাড়ি চলাচল আগে থেকেই করে। এখন দারচা থেকে পাদুম গাড়ি চলাচলের যোগ্য হয়ে ওঠায় দারচা থেকে পাদুম হয়ে সরাসরি পৌঁছে যাওয়া যাবে কার্গিল।

এই মুহূর্তে দারচা থেকে পাদুম পর্যন্ত রাস্তাটির অবস্থা এখনও ভালো নয়। তবে কয়েক মাসের মধ্যেই সেটি পুরোপুরি ঠিকঠাক করে দেওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন সেনার আধিকারিকরা। পাশাপাশি শিঙ্কু লা পাসের নীচে দিয়ে একটি টানেল তৈরিরও চেষ্টা হচ্ছে যাতে সারা বছরই এই রাস্তায় গাড়ি চলাচল করতে পারে।

0 Comments
Share
pm-modi-innaugurates-pekong-airport

পেকং: শিলান্যাসের ন’বছর পরে উদ্বোধন হল সিকিমের একমাত্র বিমানবন্দরের। সোমবার গ্যাংটকের কাছে পেকং বিমানবন্দর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

সমুদ্রতল থেকে সাড়ে চার হাজার ফুট উচ্চতায় তৈরি এই বিমানবন্দরটিকে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বিস্ময় বলে ব্যাখ্যা করেন মোদী। বিমানবন্দর উদ্বোধন করার জন্য রবিবারই গ্যাংটকে পা রেখেছিলেন মোদী।

আরও পড়ুন পর্যটকদের কাছে খুশির খবর! পুজোর ছুটির আগেই রোহটাং-এ তুষারপাত, দেখুন ভিডিও

৬০৫ কোটি টাকা ব্যয় তৈরি এই বিমানবন্দরের ফলে ভারতের উড়ান মানচিত্রে ঢুকে পড়ল সিকিমও। এতদিন পর্যন্ত শুধুমাত্র সিকিমেরই কোনো বিমানবন্দর ছিল না। বিমান ধরার জন্য শিলিগুড়ির বাগডোগরা বিমানবন্দরের ওপরে ভরসা করতে হত তাদের। ১.৭৫ কিমি দীর্ঘ এই বিমানবন্দরের রানওয়ে। সিকিম সরকারের আশা এর ফলে পর্যটনের আরও প্রসার ঘটবে রাজ্যে।

সোমবার উদ্বোধন হলেও ৪ অক্টোবর প্রথম বাণিজ্যিক উড়ান নামবে এই বিমানবন্দরে। স্পাইসজেটের কলকাতা-পেকং উড়ানই হবে এই বিমানবন্দরে নামা প্রথম বাণিজ্যিক উড়ান।

দেখে নিন এই বিমানবন্দরের কিছু ছবি।

ছবি সৌজন্য: প্রধানমন্ত্রীর অফিস

0 Comments
Share
rohtang-pass-receives-snowfall

ভ্রমণঅনলাইন ডেস্ক: পুজোর ছুটি এখনও দিন কুড়ি দূরে। এ বার পুজোর ছুটিতে যাঁরা হিমাচল যাবেন, তাঁদের কাছে খুশির খবর! শনিবারই মরশুমের প্রথম তুষারপাত হয়ে গেল রোহটাং পাসে। রোহটাং ছাড়াও তুষারপাত হয়েছে হিমাচল, কাশ্মীর এবং উত্তরাখণ্ডের উচু জায়গাগুলিতেও। 

ঘূর্ণিঝড় ‘দায়ে’র পরোক্ষ প্রভাবে শনিবার থেকেই প্রবল বৃষ্টি হয়েছে উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে। শুক্রবার প্রথমে তুষারপাত হয় হিমাচল এবং উত্তরাখণ্ডের তুষারশৃঙ্গগুলিতে। বরফ পায় কেদার, নীলকণ্ঠ, চৌখাম্বা, ত্রিশূল, কৈলাশ, মণিমহেশের মতো শৃঙ্গগুলি। 

শনিবার বরফ পড়তে শুরু করে রোহটাং-এও। প্রায় চার ইঞ্চি বরফ পড়ার পরে পুরো সাদা হয়ে যায় রোহটাং। অন্য দিকে লাহুল-স্পিতির কেলং এবং কাজাতেও হালকা তুষারপাত হয়। বরফ পড়েছে কাংড়া উপত্যকার ধৌলাধার পাহাড়শ্রেণিতেও। 

আরও পড়ুন হারিয়ে গিয়েছে চিত্রভানুর সেই রঙ, জানে তা কি কালিম্পং

তবে প্রবল বৃষ্টির ফলে সাধারণ মানুষের কিছু সমস্যা হচ্ছে। আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় আরও বৃষ্টি হবে এই সব রাজ্যে, তার পর ধীরে ধীরে উন্নতি হবে আবহাওয়ার। তবে প্রথম বরফ যখন সেপ্টেম্বরেই পড়ে গিয়েছে, তখন শীতের মরশুমে রেকর্ড বরফ পড়তে পারে বলে আশাবাদী এখানকার পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষজন।  

0 Comments
Share